আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৬
suraiya rafa
ঘন্টা মিনিট সেকেন্ড যেন চোখের পলকে মিলিয়ে গেলো। পেরিয়ে গেলো কয়েক মূহুর্ত। এই কয়েক মূহুর্তকে কয়েক হাজার বছর বলে মনে হলো এরীশের। আত্মাটা ক্ষ’তবি’ক্ষত হয়ে যাওয়ার পরেও শরীরটা যে কোন দৈববলে ম্যানশনের গেট অবধি এসে পৌঁছেছে তা জানেনা মাফিয়া বস ।
ঝড়ের পরবর্তী বি’ধ্ব’স্ত প্রকৃতির মতোই থমকে আছে চারিপাশ। প্রগাঢ় অমানিশায় ডুবে থাকা থমথমে ম্যানশন জুড়ে আলোড়ন তুলেছে অবুঝ শিশুর বুকভাঙা ক্রন্দন। কাঁদতে কাঁদতে গলার স্বর নিভে এসেছে তার। নিগূঢ় নিস্তব্ধতার মাঝে কেবল কানে বাজছে ফ্যাসফ্যাস করা করুন আত’র্নাদ।
এরীশ যতক্ষণে পা রেখেছে ভেতরে, ততক্ষণে demon Knight রা ঘিরে ফেলেছে পুরো ম্যানশন। গার্ডদের কঠোর তৎপরতায় আবারও ফিরে এসেছে সব আলো। খুব কৌশলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেই সঙ্গে সবগুলো সিসিটিভি ফুটেজ ও। আশেপাশের তুষার বিছানো জমিনে অগণিত পায়ের ছাপ। খানিক আগেই যে র’ক্তে’র নৃ’শংস খেলায় মেতেছিল হায়নার দল তা আর অনুমানের অপেক্ষা রাখেনা । আশেপাশের গার্ডরা সব ফরেনসিক নিরীক্ষণে ব্যতিগ্রস্ত।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
পেছন থেকে কালো পোশাকধারী দু’টো গার্ড এরীশকে সঙ্গ দিতে এলে হাতের ইশারায় তাদের থামিয়ে দিলো মাফিয়া বস। একাকী নিশ্চল পদক্ষেপে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো ভেতরে।
উপরের জানালা গলিয়ে নেমে আসা ফেয়ারী লাইটের ঝকঝকে রোশনাইয়ে অদ্ভুতুড়ে সুন্দর লাগছে প্রাসাদ তুল্য ভবনটাকে, অথচ পায়ের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা নৈশপ্রহরীদের ছি”ন্ন’ভিন্ন লা”শ দু’টো পূর্বাভাস দিয়ে দিলো ভয়াবহ এক প্রলয়ঝড়ের। অনুভূতিহীন ফাঁকা মস্তিষ্কের এরীশ লা’শ দুটো যেন দেখেও দেখলো না। নিস্পৃহ ভঙ্গিতে পায়ে মাড়ালো র’ক্তা’ক্ত মেঝে। তার নিস্প্রাণ শূন্য দৃষ্টি তখনও ঘরের মাঝে নিবদ্ধ। ভেতরের ঘরটা এতো সাজানো কেন ? যেন উৎসব লেগেছে আজ। এরীশের সরল কপাল অচিরেই বেঁকে গেলো। আত্মা ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটাকে গলায় আঁটকে অস্থির পায়ে সামনে এগুলো সে।
এক, দুই, তিন…
তিন সেকেন্ডের ব্যবধানে চোখের সামনে থমকে গেলো গোটা পৃথিবী। স্তব্ধ হয়ে গেলো এরীশ ইউভান। ব্যাকুল নেত্রদ্বয় সেখানটাতেই আঁটকে রইলো যেখানটায় র”ক্তে ভেজা শরীর নিয়ে গলা কাঁটা মুরগীর মতো মৃ’ত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে তার প্রেম, তার অনুভূতি, তার জীবন-ম’রণ, তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ তার আঁধার হৃদয়ের আলোর বিচ্যুরণ তার অনিশ্চিত ভবিতব্যের পরিণিতা, তার সাকুরা!
একটা জায়গা বাদ নেই, সমগ্র শরীর ভিজে আছে রঞ্জিত লালিমায়। পড়নের সাদা রঙের ম্যাক্সি ফ্রকটা ধারণ করেছে লাল বর্ণ। কোমল মুখশ্রী, সুন্দর হাত, মোম নরম ফর্সা পা সবখানেই র”ক্ত আর র”ক্ত। শীর্ণকায় শরীরটাতে ক্ষ”তচিহ্নের অভাব নেই। পেটের অগ্রভাগে দু’হাত চেপে ধরে অসহনীয় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মেয়েটা।রুহুটা বোধ হয় গলার কাছে আঁটকে আছে ওর।
ঈশানীকে পুরোপুরি না মে’রে ক্ষান্ত হওয়ার উদ্দেশ্য ছিলনা সাইকোপ্যাথের। তবে মুখোশ খুলে যাওয়ার পর একমূহুর্তও আর সময় নষ্ট করেনি সে, মাফিয়া বসের নখদর্পন থেকে গা বাঁচাতেই দৌড়ে পালিয়েছে যত দ্রুতসম্ভব।
এরীশের পা থমকে আছে,সেই সঙ্গে থমকে আছে হৃদস্পন্দন। রুক্ষ চোখ দু’টো আজ ব্যথায় কাতর, বুকের উপর যেন পাথর চাপিয়ে দিয়েছে কেউ, তেমন করেই রুদ্ধশ্বাসে ডেকে উঠলো মানব,
— প্রেম আমার!
মাফিয়া বসকে এতোটা দূর্বল কেউ কোনোদিন দেখেনি, কেউনা। ও তো মনস্টার, দূর্বলতাকে পুঁজি বানিয়ে মানুষকে নিঃশেষ করে দেওয়াই ওর আত্মিক বাসনা। কিন্তু আজ একি হলো জানোয়ার টার? হৃদয়ের ব্যথায় এতোটা কাতর! এতোটা?
আজকে বোধ হয় নিজের এই ভাঙাচোরা সত্তাটাকে লুকোনোর জন্যই ভেতরে আসতে বারণ করলো অধিনস্ত লোক গুলোকে।
— প্রেম…. আমাররর!
আবারও সেই নিভে আসা কাতর সম্মোহন। জিভটাকে খুব ভারী মনে হচ্ছে, সেইসাথে জড়িয়ে যাচ্ছে কণ্ঠস্বর। এই সেই সম্মোধন যা শুনলে বরাবরই ব্যাকুল হয়ে ওঠে রমণী, অথচ আজ তার সারা নেই, পাশ ফিরে তাকানোর শক্তিটুকু অবধি নেই, ফুরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটুকুও যেন বেদনাক্লিষ্ট আজ । এমন এক যন্ত্রণা যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে ঈশানীর হলেও বুকের ভেতরটা পু’ড়ে দগ্ধ হয়েছে এরীশের। ক্ষ’তবি’ক্ষত হৃদয়ের হদিস না করেই আচ্ছন্ন হয়ে সে এগিয়ে এলো ঈশানীর নিকট। কাছাকাছি আসতেই কোনোকিছুতে পা আঁটকে থমকে গেলো গতি। এরীশ দৃষ্টি নোয়ালো, দেখলো, একটা নীল গোলাপের বাকেট ভারী অবহেলায় পড়ে আছে মেঝেতে। রমনীর বেসামাল র’ক্তেরস্রোতে লালাভ বর্ণ ধারণ করেছে তার সতেজ স্নিগ্ধ পাপড়ি গুলো। তারমাঝে আঁটকে আছে রঙিন উইশকার্ড। এরীশ ঝুঁকলো সেদিকে, অনুভূতিহীন হাতে কার্ডটা তুলে চোখের সামনে ধরলো, র”ক্তে ভিজে লেপ্টে গিয়েছে লেখা তার।তবুও পড়লো,
“আমি ছিলাম খাঁচায় বাঁধা পাখি, যে পাখি গাইতে জানে কিন্তু উড়তে জানেনা। সকলের মনের খোরাক জুগিয়ে সে নিজেকে ভুলে গিয়েছিলো, ভুলে গিয়েছিল মুক্ত আকাশে ডানা ঝাপটানোর অদম্য সুখ। সামান্য দানা,পানি আর বদ্ধ ঘরের দেওয়ালকেই জীবন ভেবে নিয়েছিল পাখিটা,গুটিয়ে ফেলেছিল নিজের আশা, আকাঙ্খা আত্মবিশ্বাস। দিন গেলো, মাস গেলো, কতগুলো বছর পেড়িয়ে গেলো। পাখি তার নির্মম পরিহাসে ক্লান্ত হয়ে পড়লো। দিনরাত ডানা ঝাপটালো মুক্তির আকাঙ্খায় । তারপর যখন একদিন খাঁচা থেকে পালালো, তখন দেখলো তার ওড়ার শক্তি নেই, এই ভালোবাসাহীন রুক্ষ দুনিয়ায় বেঁচে থাকার সাধ্য নেই, ডানা দু’টো যে আগেই ছেটে দিয়েছিল স্বার্থান্বেশীরা । ফলস্বরূপ, মিছে মিছে এই মুক্তির স্বাদ বেশিক্ষণ সইলো না তার কপালে। মানুষ রূপি এক ভ’য়ংকর দৈত্য তুলে নিলো তাকে। পাখিটা আবারও খাঁচায় বন্দী হলো, মুখোমুখি হলো কতশত বিভীষকার।
রাতে ঘুম হতো না, ঘুমের বদলে চোখের পাতায় ধরা দিতো ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। সেই দুঃস্বপ্ন থেকে নিজেকে বাঁচাতেই সুন্দর স্বপ্ন গুলো চিরকুটে টুকে রাখতাম আমি, ধীরে ধীরে সময় গড়ালো, আমার মনে হতে লাগলো এই পাখির মতো বন্দী জীবনে কিছু একটা পরিবর্তন ঘটছে,পাল্টে যাচ্ছে সব, কোনো না কোনো ভাবে সত্যি হয়ে যাচ্ছে আমার সমস্ত সুখের স্বপ্ন।
তখন তো ঘুনাক্ষরেও জানতে পারিনি স্বপ্ন পূরণের নেপথ্যের ব্যক্তিটি ছিল সেই ভয়ংকর দৈত্য। যে সবর্দা আমার ঘৃণায় বেঁচেছিল, অভিশাপের মতো কাল হয়েছিল যার অস্তিত্ব, হঠাৎ করেই সে কলঙ্ক হয়ে আমার সর্বাঙ্গে মিশে গেলো। বুঝতে পারিনি, বিশ্বাস করো বুঝতে পারিনি, কখন যেন ঘৃণার বদলে ভালোবাসতে শুরু করলাম আমি । নীরবে, নিভৃতে একটু একটু করে প্রেমে পড়লাম। এমন ভাবেই উতলা হলাম যে পাপ, তাপ ঘৃণা সব ভুলে শুধু তাকেই চাইলাম, তার অশুভ আঁধারে মিশে ফেরারী হলাম , ডুব দিলাম মরিচীকায়।
ওরা বলেছিল সে নিষ্ঠুর, অনুভূতিহীন ভয়ংকর এক দা’নবতু’ল্য জানোয়ার। অথচ জানোয়ারটা যে এভাবে উন্মাদের মতো ভালোবাসতে পারে তাতো কেউ বলেনি! তুমি নাই-বা করলে নিজের অনুভূতির কাছে আত্মসমর্পণ,কিন্তু আমি জানি তুমি আমায় ভালোবাসো, হতে পারে আমার চাইতেও বেশি। আমি দুনিয়া ঘুরেছি এরীশ,কতশত মানুষ দেখেছি, তবুও তোমার মতো কাউকে পাইনি।কারণ গোটা দুনিয়ার কাছে মরীচিকা হলেও আমার কাছে এক সমুদ্র অনুভূতির নাম এরীশ ইউভান।
আমার রীশ, আমার অরণ্য!
জন্মতিথির অফুরন্ত শুভেচ্ছা তোমায় জান!
ইয়াশের ড্যাডির প্রতিটি দিন জন্মদিনের মতোই শুভ হোক, না পাওয়া খুশি গুলো অবিশ্রাম বারিধারা হয়ে ঝড়ে পরুক তার মনের আঙিনায়। অশুভ দুনিয়ার নিকশ ছায়া না পড়ুক তার জীবনে, কোনোদিন না পড়ুক।
তোমাকে একটুখানি খুশি দেখার বহুদিনের ইচ্ছে আমার রীশ। এই বাড়িতে আসার পর থেকেই ভাবছিলাম কিভাবে তোমায় একটুখানি জীবনের স্বাদ দেওয়া যায়, জানি তুমি সারপ্রাইজড হওনা,এসব তোমার ভালোও লাগেনা, চিরকুট টা পেয়ে হয়তো রেগে যাবে ভীষণ , তবুও তোমায় ভুল প্রমান করার জন্যই এতো এতো প্রচেষ্টা আমার । তুমি বলো তোমার জন্মলগ্ন অশুভ এক অমানিশায়, তোমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টদায়ক, খারাপ দিনটাও আজকেই। কিন্তু আমি আজ তোমার বদ্ধ ধারনা খণ্ডন করলাম মাফিয়া বস। তোমার এই বিশেষ দিনকে সুখের স্মৃতিতে মুড়িয়ে দিলাম। জন্মদিন কখনো কারোর জীবনে খারাপ স্মৃতি বয়ে আনেনা। এই দিন, ই সময়, এই লগ্ন সবকিছু শুভ, শুভ, শুভ……
— মিথ্যে কথা!
চিরকুটটাকে দুমড়েমুচড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো এরীশ। চারিদিকে বজ্রের মতো প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো তার কর্কশ হুংকার।
— মিথ্যে কথা…
পরপর একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি করে হাঁটু ভেঙে ধসে পড়া ইমারতের ন্যায় মেঝেতে বসে পড়লো এরীশ। র’ক্তা’ক্ত মেয়েটার শিয়রে ঝুঁকে ফ্যাসফ্যাস করে ব্যথাক্লিষ্ট কণ্ঠে আওড়ালো,
— আমার কোনো জন্মদিন নেই, আমার কখনো জন্মই হয়নি, আমিতো স্রেফ এক্সিডেন্ট, এক মাফিয়া বসের পাপের ফসল, ভাগ্যের পরিহাসে পৃথিবীতে চলে এসেছি। আজকে সেই দিন যেদিন আমি চোখের সামনে দু’টো নারীর সম্ভ্র”মহানী দেখেছি। তারপর নিজের হাতেই তাদের মৃ”ত্যু লিখেছি, আত্মিক টান ভুলেছি বহু আগেই, তবুও জন্মসূত্রে ওরা আমার মা আর বোন ছিল। আর আজ তুমি আমার সামনে মৃ’ত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করছো, তোমার পেটে থাকা আমার অংশ আমার র’ক্ত ধূলো মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, সেটাও এই দিনেই। তারপরেও এই দিন কিভাবে শুভ হয়? কিভাবে!
মিথ্যে তুমি সাকুরা, ইয়্যু ফাকিং লায়ার!
শেষ বাক্যটা চিৎকার দিয়ে বললো এরীশ। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের ন্যায় ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো ঈশানীর সমস্ত শরীর। মেয়েটা আধো আধো চোখ খুলতেই ওর দিকে ছিটকে এলো এরীশ , দু’হাতের অঞ্জলিতে মেয়েটার র’ক্তা’ক্ত চিবুকখানি তুলে ধরলো মুখের সামনে। তুলতুলে আদুরে চেহারাটা আঘাতের তোড়ে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে,ফর্সা বুকে নখের আঁচড়, এখানে সেখানে জমাট বেঁধেছে কালসিটে যখম। পুরো মুখটাতে চোখ বুলাতে গিয়ে অনুশোচনায় অজস্রবার পু’ড়ে ছাই হলো এরীশের অন্তর।রমণীর পেলব ত্বকে আদরের প্রলেপ বোলাতে গিয়ে চোয়ালের পেশী শক্ত হয়ে গেলো তার, দাঁতে দাঁত পিষে মনেমনে আওড়ালো,
— আমি ওকে ছাড়বো না, ওকে আমি এতোটা যন্ত্রণা দিয়ে মা’রবো, যতটা যন্ত্রণা কেউ কোনোদিন কল্পনাও করেনি। এই ব্যথা, এই যন্ত্রণা, এই বিভীষিকার হাজার গুন বেশি ফেরত দিবো আমি ওকে। ও যেই ম”রণ খেলার সূচনা করেছে, তা আমি নিজের হাতে শেষ করবো, এ্যান্ড আই প্রমিস দ্যাট!
— রীশ!
অস্পষ্ট গোঙানির মতো আওয়াজে ডেকে উঠলো ঈশানী। তৎক্ষনাৎ বিভ্রম থেকে ছিঁটকে বেড়িয়ে এলো এরীশ। রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইলো,
— জান, জান ইয়াশ কোথায়?
মুমূর্ষু ঈশানী প্রত্যুত্তর করতে পারেনা আর
ব্যথায় জর্জরিত তর্জনী তুলে উপরের ঘরটাকে ইশারা করে শুধু। এরীশ ঘাড় বাঁকিয়ে একবার তাকায় সেদিকে, পরপরই প্রেয়সীর র’ক্তা’ক্ত শরীরটাকে তুলে নেয় দু’হাতে,মেয়েটাকে তাড়াহুড়ো কোলে তুলে গলা চিঁড়ে চিৎকার দিয়ে ডেকে ওঠে সে,
— তুষার! তুষার, হোয়েয়ার আর ইউ? কাম অন,হেল্প মি!
চারিপাশে ঝিমঝিম নীরবতা, কোথাও তুষার নেই, অদূর থেকে ছুটে আসছে দু’টো মাফিয়া গার্ড। তাদের দেখেও বজ্রাহাতের ন্যায় এদিকে ওদিক চোখ ঘোরালো এরীশ। তুষারকে দেখতে না পেয়ে আশাহত হয়ে পরলো দৃষ্টি তার, পরক্ষণেই মনে পড়ে গেলো, ও নিজেই তুষারকে দু’দিনের ভ্যাকেসনে পাঠিয়েছিল।
— শীট!
অসহায়ত্ব আর বিরক্তির মিশেলে মুখাবয়ব কুঁচকে ফেললো মাফিয়া বস। ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছে ঈশানীর শরীর, সেদিকে লক্ষ্য করে আর এক মূহুর্তও দাঁড়ালো না সে, শীত নিবারণের অযথা প্রচেষ্টায় মেয়েটাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো শক্ত করে। অতঃপর নিজের অনিয়ন্ত্রিত দৌদুল্যমান শরীরটাকে টেনে তুলে পা বাড়ালো দরজার দিকে। জীবনে প্রথমবার ঈশানীকে বয়ে নিয়ে যেতে এতো বেশি কষ্ট হচ্ছে ওর, শরীরটা ক্রমশ অসার হয়ে যাচ্ছে ,ভেঙে আসছে পা। এক মূহুর্তের জন্য এরীশের মনে হলো সাকুরার ক্ষ”তবিক্ষ’ত শরীরের চেয়ে পৃথিবীতে ভারী আর কিচ্ছু নেই! কিচ্ছু না!
ফেলে যাওয়া র’ক্তের মিছিল, রঞ্জিত পদচ্ছাপ আর মাফিয়া বসের ভগ্নহৃদয়ের তীব্র হাহাকার যেন তখনও থামেনি, বেদনাক্লিষ্ট সুরতরঙ্গের মতোই প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছিল ম্যানশনের প্রতিটি দেওয়াল থেকে দেওয়ালে,
আমার আগুনের ছাই জমে জমে
কত পাহাড় হয়ে যায়….
আমার ফাগুনেরা দিন গুনে গুনে
আর উধাও হয়ে যায়….
ইয়াকুতিয়া রাজ্য,
ইয়াকুতিয়ায় এখন হাড়কাঁপানো শীত। ফ্লোরাদের নিরবিচ্ছিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় আঠেরো ক্রোস দূরে একটা ছোট্ট দুই কামরার রিসোর্ট। ফ্লোরাকে নিয়ে সেখানেই উঠেছে তুষার। ছোট্ট সৌখিন অথচ উষ্ণতায় পরিপূর্ণ। এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, ইন্টারনেট সেটাও মেলানো দুষ্কর । অথচ সময়টা যেন এখানেই আঁটকে আছে, থমকে গিয়েছে পৃথিবী। সকাল পেড়িয়ে বিকেল আসে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে তবুও ভালোবেসে ক্লান্ত হয়না ওরা। গত দু’টো দিনে ঘরের বাইরে পা রাখেনি দু’জন , না তো মুখ দেখেছে কেউ ওদের। তিনবেলা সময় করে বেয়ারা এসে খাবার দিয়ে যায় , ব্যাস এটুকুই। এর বাইরে আর কিছু জানার, বোঝার দেখার প্রয়োজন পড়েনি ।বহুবছরের আকাঙ্খা,আকর্ষন, অব্যক্ত অভিমান সব যেন প্রাপ্তির আনন্দ হয়ে লুটিয়ে পড়েছে ওদের দ্বারে।
বেডরুমের একপাশে ফায়ারপ্লেসে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, কাঠকয়লার খুটখাট আওয়াজ ভেসে আসছে সেখান থেকে, ঠিক তার অন্যপাশে শ্বেত শুভ্র নরম বিছানায় নিজের একমাত্র প্রিয়তমাকে নিয়ে ভালোবাসার অনিন্দ উল্লাসে মাতোয়ারা তুষার। লতানো কমণীয় দেহের প্রতিটি ভাঁজে নিজের সুক্ষ্ম কতৃত্ব ফলিয়ে পরিতৃপ্ত তার অন্তঃকরন। ভালোবাসার আবেশে বুঁজে আছে দু’নয়ন। রুশরমণীর দূর্বল নিরাবরণ শরীরটা ভেঙেচুড়ে পড়ে আছে তার বুকের উপর। একহাতে কম্ফোর্টার টেনে অনাবৃত শরীর দু’টো ঢেকে দিলো তুষার। অতঃপর বুকের সাথে লেপ্টে থাকা প্রিয়াতমার ঘর্মাক্ত ক্লান্ত চেহারায় একপল দৃষ্টি বুলিয়ে প্রশ্রয়ের কণ্ঠে শুধালো,
— আর ইউ্য টায়ার্ড?
সামান্য চোখ তুললো ফ্লোরা। অন্তরঙ্গ মূহুর্তের পর এই লোকের চোখের সাথে কিছুতেই চোখ মেলাতে পারেনা সে। এতোভাবে ভালোবাসার পরেও আড়ষ্টতায় জমে থাকে, জাফরানি রঙে ছেয়ে যায় তার ফর্সা মুখ। ফলস্বরূপ, তুষারের হাবভাবে বিভ্রান্ত হয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়লো মেয়েটা,
— আমাকে দেখে কি মনে হয়?
— প্রচন্ড টায়ার্ড।
ঝটপট উত্তর দিলো তুষার। যা শুনে কপাল বেঁকে গেলো ফ্লোরার, বিরক্তিতে জ্বলে উঠলো তক্ষুনি,
— দেখছেন টায়ার্ড তবুও প্রশ্ন করছেন? আশ্চর্য!
রমণীর রাগ দেখে হেসে ফেললো যন্ত্রমানব। পরপরই ওর কানের কাছে ঠোঁট ছুঁয়িয়ে আচ্ছন্ন স্বরে হিসহিসালো,
— আমি আরও দশঘন্টা তেত্রিশ মিনিট এখানে আছি, বুঝতে পারছো তোমার কি হাল হবে?
তুষারের দুষ্টুমিতে লাজে আরক্ত হলো রমণী। স্বামীর পানে অসহায় দৃষ্টিপাত করে ঠোঁট উল্টে আদুরে গলায় কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বিপ বিপ আওয়াজের অশনি সংকেতে মুখর হয়ে উঠলো কক্ষ। অজ্ঞাত ফ্লোরা এদিক ওদিক দৃষ্টি বুলিয়ে তুষারের উদ্দেশ্যে বললো,
— এটাতো আপনার ঘড়ি।
ফ্লোরার কথায় সচকিত হয়ে উঠলো তুষার। তৎক্ষণাৎ হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো ঘড়িটা। ইন্টারনেট কানেক্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিগন্যাল এসেছে, রেড সিগন্যাল!
— ওমাইগড!
ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো তুষার।ফ্লোরা তৎপর হয়ে শুধালো,
— কি হয়েছে!
— এরীশের হার্টবিট, ব্লাডপ্রেশার দু’টোই হাই।
তুষারের এহেন কথায় উদ্বিগ্নতায় ভাটি পড়লো ফ্লোরার, মেয়েটা নিরুত্তাপ স্বরে বললো,
— হতে পারে এরীশও ঈশুর সঙ্গে….
— নাহ!
বাক্য সম্পন্ন করতে পারলো না ফ্লোরা। তার আগেই ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বিছানা ছাড়লো তুষার।তড়িৎ হাতে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতেই রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলো,
— এটা কখনোই স্বাভাবিক সিগন্যাল নয়। কোনটা বি’পদ”জনক সংকেত সেটা আমি ভালো করেই জানি।
ফ্লোরার হৃদয় খামচে উঠলো,কে জানে আবার কোন বিপদ আসতে চলেছে তার স্বপ্নের মতো সুন্দর জীবনে। সুখের মুখ দেখতে না দেখতেই কেন হারিয়ে যাচ্ছে সব? টলমলে চোখে তুষারের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। ঠিক যেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তেমন ভাবেই রিভলবার বুলেট সব লোড করে গুছিয়ে নিলো সে । যাওয়ার আগে শান্ত চোখে অশ্রুসিক্ত ফ্লোরার দিকে চাইলো একবার। এতটুকু দূরত্বই সহ্য করতে পারছে না, মেয়েটা সারাজীবন কাটাবে কি করে ওর সঙ্গে? বুক ফুঁড়ে বেড়িয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। পরপরই বৃদ্ধাঙ্গুলির ডগায় প্রিয়তমার কম্পমান চিবুক তুলে অনুভূতিহীন বাক্য ছুড়লো যন্ত্রমানব ,
— এটাই আমার জীবন ফ্লোরা, এভাবেই বাঁচতে হবে তোমায়, তাই মানিয়ে নাও।
কান্নায় গলা জড়িয়ে আসে ফ্লোরার। ঠোঁট কামড়ে ফুঁপিয়ে উঠে বলে,
— আবার কবে দেখা হবে আমাদের?
এবারে দু’কদম পিছিয়ে আসে তুষার। অনুভূতির মাপকাঠিতে যথাসম্ভব লাগাম টেনেও লাভ হয়না বিশেষ। রুশরমণীর মায়ায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলেছে অন্তর। এখান থেকে বের হওয়া অসম্ভব। সহসা গ্রীবা বাঁকিয়ে রমণীর মসৃণ কপালে চুম্বন আঁকে যন্ত্রমানব, আদুরে গলায় অভয় দিয়ে বলে,
আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৫
— যত দ্রুত মিশন শেষ হবে।
— আমি অপেক্ষায় থাকবো।
বিপরীতে আবারও ঠোঁটের আগায় অনুভূতির নোঙ্গর ফেললো তুষার, কপালে কপাল ঠেকিয়ে হিসহিসালো,
— ভালোবাসি।
অশ্রুপ্লাবনে কণ্ঠরোধ হয়ে আসে ফ্লোরার। তবুও থেমে থেমে জবাব দেয় সে,
— আমিও ভালোবাসি! ভীষণ ভালোবাসি!

Please next part ta taratari diyen.
Apu Aktu Joldi Kora Uponnas Taka Sus Koran Please
Apu plz aktu joldi joldi part gula dao plz r opekkha korte parchi na