The Silent Manor part 65
Dayna Imrose lucky
আহির ও মীর গভীর রাত করে বাড়ি ফিরে।মীর যেতে যেতে ভয় পাচ্ছিল শালুক এর জন্য।মীর এত গভীর রাতেও বাড়ির বাইরে ছিল জানতে পারলে ভীষণ চেঁচাবেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে শালুক সজাগ ছিলেন না তখন।সদর দরজা খুলে দিয়েছিল বুলবুল। মীর কে বুলবুল হুম’কিও দিয়েছিল ‘আপনি রাত করে বাড়ি ফিরেছেন, মালকিন কে বলে দেব।’ মীর জবাবে বলেছিল ‘তোর টাকা চাই তাই তো!কত টাকা লাগবে বল!’ এরপর বুলবুল টাকা চায়।মীর পড়ে দিবে বলে তখন ওঁর মুখ বন্ধ করে।
ঘড়ির কাঁটা এখন ঠিক তিনটে এসে থেমেছে।আহির মুখ গম্ভীর করে বসে আছে বারান্দায়। বারান্দার গ্রিল থেকে শো শো করে বাতাস ঢুকছে।শীতল বাতাসে আহির এর শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে।তবু সেখানেই বসে আছে। গৌরী ওরফে জেসিয়া সারওয়ারি’ মেয়েটিকে সে ভীষণ রকম ভাবে ভালবাসে।আজ সাহস করে বলেই দিয়েছে তাঁর ভালোবাসার কথা। কিন্তু বিপরীতে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আহির এর চোখে জল জমে। কখনো সে অল্পতে কাঁদেনি।আজ কান্না পাচ্ছে। প্রচুর কান্না পাচ্ছে।গৌরী তাঁর হবে না, তাঁকে পাবে না, ভাবতেই তাঁর কষ্ট হচ্ছে।ইজি চেয়ারে বসে মাথা হেলিয়ে রেখেছে। দৃষ্টি তাঁর উপরের দিকে।একটু পর পর দীর্ঘ নিঃশ্বাস আসছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মনস্থির করে আগামীকাল গৌরীর সাথে শেষ আরো কিছু কথা বলবে। বোঝানোর চেষ্টা করবে। যদি গৌরী তাঁর প্রস্তাবে রাজি হয়, তবে সে তাঁর মা বাবা কে নিয়ে আসবে। তাঁদের দোয়া নিয়ে তবেই গৌরী কে ঘরের বউ করবে।আহির তাঁর মা বাবার একমাত্র সন্তান। তাঁর আবদার ফেলবেন না তাঁর মা বাবা।আহির নিশ্চিত।
আহির ইজি চেয়ারে দোল খেতে খেতে ঘুমিয়ে যায়।ঘুমের ঘোরে মিষ্টি একটা স্বপ্ন দেখা দেয়।গৌরীর কাছে গিয়ে আবারও তাঁকে বোঝাচ্ছে।তবে আজ গৌরীর মুখে উজ্জ্বল হাঁসি।আহির এর হাতে একটা ফুল।আহির বলল “আমার প্রস্তাব গ্রহন করো।কথা দিলাম এই তোমাকে ছুঁয়ে! কখনো আমার অন্তরের তোমার জায়গাটায় পরিবর্তন আসবে না। আমার ভালোবাসা ক্রমাশ বাড়বে। কমবে না। দরকার হয় তোমার জন্য জীবন দেব,তবু তোমার জীবনটা নষ্ট হতে দেব না।” বলে গৌরীর দিকে ফুলটা এগিয়ে দিল। গৌরী কাঁপা হাতে ফুলটি নিল। আশেপাশে তাকাল বারেবারে। না’কেউ নেই। তাঁর মাথা নিচু।আহির ঝুঁকে বলল “কিছুতো অন্তত বলো!”
গৌরী গোলাপ ফুলের মত ফোলা ফোলা ঠোঁটে হাঁসি আঁকে। তাঁর নিখুঁত হাঁসি আহির দেখল। নিখুঁত চোখ, নিখুঁত নাক,ভ্রু। সবকিছু মিলে যেন গৌরীর সৌন্দর্য সূর্যের মতই চিকচিক করছে। গৌরী পিঠ ঘুরে তাকিয়ে বলল “আপনার মা বাবাকে নিয়ে আসবেন।আমি অপেক্ষা করব।” বলে গৌরী ছুটে যায় বাড়ির দিকে।আহির তাঁর জবাবে খুশিতে আপ্লুত হয়ে উঠল।
ঘুমটা আচমকা ভেঙ্গে গেল।মীর আসাতে।এসেই আহির কে ডাকা শুরু করেছে।আহির চোখ মেলে তাকাল। স্বপ্নের কথাটা মনে পড়ে। যদি সত্যিই গৌরী রাজি হয়ে যেত! আফসোস এর সাথে ভাবছে।
মীর তাঁর পাশে বসে বলল “এখনো ঘুমোসনি কেন?কি ভাবতে ছিলিস?”
“ঘুম আসছে না। কিছু ভালো লাগছে না।তুই ঘুমোসনি কেন?”
মীর নির্বিকার কণ্ঠে বলল “ঘুমের চেষ্টা করেছিলাম।ঘুম আসছে না। আমারও কিছু ভালো লাগছে না। কখনো এরকম অনূভুতি হয় না।আজ হচ্ছে। এতক্ষণ ছাদে বসে কাবির হোসেন এর সাথে কথা বলছিলাম।বেশ মজার মানুষ উনি।”
“যা,এখন ঘুমা। আগামীকাল কথা হবে।”
“আগামীকাল কেন,এখনি যত খুশি বলে নেই। আগামীকাল বেঁচে থাকব, তাঁর কোন নিশ্চয়তা নেই!”
“বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা যখন নেই, তখন ভালো পথে ফিরে আয়।”
“পথ তো ভালোই হয়।খা’রাপ কোথায়!” বলল মীর। সিগারেট ধরাল।ঠোঁটের মাঝে রেখে একটা টান দিয়ে বলল “তুই ঘুমিয়ে যা।নয়ত শোক পালন কর।আমি আসছি।” বলে উঠে গেল।
আহির এর ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটল মায়ার ঘরের উদ্দেশ্য। রাফিদ রাত আটটার পড়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।সকাল থেকে সে অনেক খেটেছে। ক্লান্ত শরীর।মীর তখন ডাকলেও ওঠেনি। আহির যেন মর্মাহত হয়ে পড়ে আছে।মীর এর মনটা উদাস হয়ে আছে। কিছু ভালো লাগছে না। শুধু ভাবছে কি যেন কি হবে।মনটা আপাতত সর্ব পরিষ্কার করতে হবে।মায়ার উল্টোপাল্টা কথা শুনলে নিশ্চয়ই মন ভালো হবে। ভেবে তাঁর ঘরের দিকেই এগোচ্ছে।
যেতে যেতে পথে দেখা হয় বুলবুল এর সাথে। মধ্যরাতে জল খাওয়ার অভ্যাসটা ওঁর আজও যায়নি।তখন জল খেতে উঠে দেখে জগে জল নেই।জল নিতে নিচে রওনা হতেই মীর এর সামনে থমকে দাঁড়ায়।মীর ও দাঁড়িয়ে যায়।তাঁদের প্রথমে চোখে চোখে কথা হয়। বুলবুল মীর এর পথ ধরে সামনে তাকাল। সামনে মায়ার ঘর। তাঁর ঘরে যাচ্ছে বুঝে প্রশ্ন করল “আবার কি মতলব আপনার?
মীর যেন বুলবুল এর প্রশ্নে ক্লান্তি অনুভব করল। শরীর এর ভাঁজ ভেঙ্গে বলল “ম্যাচ খেলতে যাচ্ছিলাম।আর কোন প্রশ্ন?
“কিন্তু, একদিনে এতবার?
“তোর সমস্যা?”
“না।আমি কি আসব?’
“আমার গোলকিপার এর দরকার নেই।আমি একাই সব।” বলে মীর বুলবুল কে ছেড়ে এগোলো।
মীর মায়ার ঘরের সামনে এসে থামে।হাতের সিগারেট ফেলে দেয় মেঝেতে।পা দিয়ে পিষে ফেলল।মায়ার ঘরের দরজা খোলা। ভেতরের বাতি নেভানো। কয়েকটি মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা।সে ধীরস্থির পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। মোমবাতির আলোয় ঘরটা মৃদু আলোকিত।
মীর এর দু’চোখ মায়াকে খুঁজছে। বিছানায় তাকায়।কম্বল জড় করা। নিশ্চয়ই ঘুমাচ্ছে।মীর বিছানার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।মায়ার পাশে বসে।মায়া কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে।মীর তা দেখে বলল “আজ কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছ?আগে তো কখনো ঘুমাওনি!” থেমে আবার বলল “এটা আমি কি বলছি, আমি কি কখনো তোমার সাথে রাতে থেকেছি!যে জানব! আজকাল না আমি বোকা বোকা কথা বলছি। যাক গে ছাড়ো সেসব। তুমি হঠাৎ এভাবে ঘুমাচ্ছ?খুব ঠাণ্ডা লাগছে? না কি লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করছো! নতুবা ভূতের ভয়ে কম্বল মুড়ি দিয়েছো! তুমি নিশ্চয়ই আমার কথা শুনছো।তবু চুপ করে আছো!” এই পর্যন্ত বলে মীর থামে। কম্বল টা নড়ে উঠল।মীর বলল “তুমি নড়ছো।
তারমানে তোমার ঘুম নেই চোখে। ঘাপটি মেরে আছো আমার ভয়ে।ভয় নেই উঠতে পারো। কিছু করব না। এখন অস’ভ্যর ব্যখ্যা বুঝাতে ইচ্ছে করছে না। শরীরে শক্তি নেই।” মীর দেখল মায়া উঠছে না। পুনরায় কম্বল নড়ল।মীর এবার একটু বিরক্ত হল। মায়াকে যেভাবে হোক উঠাতে হবে। কিভাবে উঠাবে ভেবে মীর হুট করে মায়ার শরীরের উপর উঠে দু পা দুদিকে নিয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে মায়ার উপর দূরত্ব বজায় রেখে বসে। এরপর মায়ার দিকে আর একটু ঝুঁকে বলল “এই মেয়ে,আমি তোমার উপরে, দরজা লাগিয়ে দিয়েছি। যদি তোমার উপর আক্রমণ করে বসি!ভয় পাচ্ছ না!” কম্বল এর নিচ থেকে কোন সাড়াশব্দ এল না।মীর এবার কিছুটা তির্যক কণ্ঠে বলল “এই মেয়ে ওঠ,নয় ঝাঁপিয়ে পড়লাম।”
কথাটা শেষ করতে না করতেই কম্বল টা মুখের উপর সরিয়ে ফেললেন জয়ন্তন বেগম।মীর জয়ন্তন বেগম কে দেখে হকচকিয়ে উঠল। ছিটকে দূরে সরে যায়। বেখেয়ালি ভাবে মীর খাট থেকেই পড়ে যায়। থতমত খেয়ে বলল “দাদু তু.. তুমি!” বলে মীর ঢোঁক গিলল। জয়ন্তন বেগম শোয়া থেকে উঠে বসে।মীর এর দিকে চেয়ে বলল “কখন থেইকা আমি তোর উল্টোপাল্টা কথা হুনতাসি, কি সব নোংরা নোংরা কথা। দাঁড়া তোরে দেখাইতেছি মজা।” বলে জয়ন্তন বেগম খাট থেকে নেমে তাঁর ছড়িটা হাতে নিয়ে মীর কে পেটাতে শুরু করল। পেটাতে পেটাতে বললেন “তোর খুব সখ আমার উপরে ঝাপাই পড়নের, নিজের শক্তি দেখাইবার আইছো, ছিঃ।”
মীর জয়ন্তন কে আটকাতে চাইল। বলল “আরে দাদু আগে আমার কথা শোনো,আমি তোমার উপর শক্তি কেন দেখাব, তোমার নাতনীর উপর দেখাতে এসেছিলাম। তুমি ওঁর ঘরে আমি কিভাবে জানব?
“তুই কি করে জানবি মানে,এই মাঝ রাইতে তুই ওর ঘরে ক্যান” মীর জয়ন্তন এর ছড়িটা টেনে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।বলল “অনেক মে’রেছো,এখন শোনো! আমাকে ও অ’সভ্য বলেছিল,তাই প্রতি’শোধ নিতে এসেছিলাম। কিন্তু এসে আমি নিজেই বলির পাঁঠা হয়ে গেছি।”
জয়ন্তন বেগম সোজা হয়ে দাঁড়ান।ঘরের আলো জ্বালান। বললেন “আর একটু হইলে তো তুই আমার শইল্লে ভর দিতি।তোরে বিদেশে এই শিক্ষা দিছে! হতচ্ছাড়া।”
“শিক্ষা অনেক পাইছি। কিন্তু কেউ আমারে অ’সভ্য কয় নাই।আইজ তুমি আমারে কইলা। আমার কষ্টে কান্না করতে মন চাইতেছে।” বলে থামে মীর।মীর এর মুখে আঞ্চলিক ভাষা শুনে জয়ন্তন কিছুটা অবাক হলেন।চোখ ছোট করে মীর এর দিকে তাকিয়ে রইলেন।মীর ছড়ির দিকে চেয়ে এতক্ষণ কথা বলছিল। জয়ন্তন কে চুপচাপ দেখে চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকাল। নিজের বলা আঞ্চলিক ভাষার কথাগুলো তাঁর কানের কাছে ভেসে উঠল। বিড়বিড় করে বলল “এ আমি কি বললাম!কি ভাষায় কথা বললাম!”
“তোর মাথাটা গেছে নাকি?
“বুড়ি, তোমার জন্য আমার ভাষা পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার সাথে কথা বলতে হলে আগে শুদ্ধ ভাষা শিখে এসো।”
“আহা আমার কালাচান নাতী,উনার লগে কথা কইতে আমার বইয়াই (বয়েই) গেছে।এই ঘরতন বাইরা।”
মীর ছড়িটা জয়ন্তন এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল “যেতেই এসেছি, থাকতে নয়। বিশেষ করে তোমার মতন বুড়ির সাথে।”
“তোর থেইকা ভালোই আছি।তুই হাতে দেছো সা’পের মতন কি সব,তার লগে ঝাঁকানাকা প্যান্ট,মাথার চুল গুলা ভেরার মত,চোখ দুইটা বিড়ালের মতন, তারপরও তো তোরে আমার লগে মানায় না। বাঁদরের মতন লাগতেছে।”
মীর ভেংচি কেটে বলল “উমমম-তোমার সাথে মানাতেও চাই না, আমার ভার সহ্য করতে পারবে না।”
এতটুকু বলতেই জয়ন্তন পুনরায় ছড়ি দিয়ে মীর কে মার শুরু করলেন। বললেন “ঘর থেইকা বাইর হ। মুখে কিছু আটকায় না।” মীর আর কিছু না বলে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বের হয়। জয়ন্তন ঘরের ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেন।মীর হাঁটুর উপর হাত রেখে তাঁতে নিজের ভর রেখে দম ছাড়ল। লক্ষ্য করল তাঁর পেছনে কেউ। ঘুরে তাকাল। বুলবুল জগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে।মীর তাকাতে তাঁর এর দিকে এগিয়ে আসল।মীর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল “তুই আজও এখানে!”
“আপনি বললেন না আজ ম্যাচ খেলবেন,তাই আগে থেকেই জল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আপনি খুব হাঁপাচ্ছেন।নিন জল খান।” বুলবুল জলের জগটা এগিয়ে দিল।মীর কটমট চোখে ওঁর দিকে তাকাল।মীর জলটা খেয়ে ফেলল। বুলবুল বলল “খেলায় কে জিতল?
মীর কিছুক্ষণ আগে অপমানিত হয়েছে। তাঁর দাদীর কাছে ধরা খেয়েছে। বুলবুল কে বলতে চাইছে না। কিন্তু আন্দাজ করতে পারছে বুলবুল সব শুনেছে।তবু নিজের মনোভাব ধরে রাখার চেষ্টা করে বলল “কে জিতবে!ঐ বুড়ি জিতেছে।এটা ব্যাপার না।”
“বুড়ি মানে?ম্যাচ খেলা হল না?”
মীর মাথা নাড়াল ‘না’। বুলবুল জগটা মীর এর হাত থেকে নিয়ে বলল “তাহলে জল খেয়ে কি করলেন, শুধু শুধু জলটা শেষ করলেন।ধরা খেয়েছেন আপনার দাদীর কাছে?”
মীর নিশ্চুপ ভঙ্গিতে মাথা আওড়ালো ‘হ্যাঁ”
বুলবুল সশব্দে হেসে উঠল।হাসির সময়টা দীর্ঘ হয়।মীর এর শরীর জ্বলে উঠল ওঁর হাঁসি দেখে। বুলবুল হাঁসি থামিয়ে বেশ কৌতূহল ভঙ্গিতে বলল “আচ্ছা এই ম্যাচ খেলাটা কি? মানে এর আগে কোনদিন শুনিনি এই নাম!”
মীর কোন জবাব না দিয়ে বিরক্ত হয়ে হাঁটতে শুরু করল। বুলবুল তাঁর পিছু নিল।পেছন থেকেই প্রশ্ন ছুঁড়ছে “বলুন না ম্যাচ খেলার মানে কি?
মীর থম মেরে দাঁড়িয়ে বলল “ থাইল্যান্ডে এক ধরণের খেলা হয় ওটাকে ম্যাচ বলে।”
“চলুন আমি আর আপনিও খেলি। আমি কখনো খেলিনি।” বুলবুল এর মুখে কথাটি শুনে মীর কপাল চাপড়িয়ে ছাদের দিকে চলে যায়।
ছাদে এখনো বসে আছে মায়া ও তৃষ্ণা। তৃষ্ণা রাত জাগতে চায়নি।মায়ার জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে ছাদে বসে আছে।মায়ার ঘুম নেই আজ।রাত পোহালে বিয়ের তর্জমা।রাত শেষ এর দিকে।
শেফালী এসেছে।ওকেও মায়া বেশ কিছুক্ষণ আগে ডেকে এসেছিল।চা চেয়ে এসেছিল।মাথা ব্যথা করছে সে-ই কখন থেকে মায়ার।তখনি শেফালী কে ডেকে চা তৈরি করতে বলেছিল।আদা দিয়ে।
শেফালী চা এনে দেয় মায়াকে।মায়া তাৎক্ষণিক চা খাবে না বলল।মন ওঠানামা করল। শেফালী তীব্র রেগে গেল। মাঝরাতে ওঁর ঘুম ভেঙেছে। তাঁর উপর রাত করে চা করতে হয়েছে।এখন খাবে না বলছে।
মায়া চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছে।মীর কে তাঁর মনের কথা সরাসরি বলবে কিনা ভাবছে। আত্মসম্মানবোধ এর কথা চিন্তা করে আবার নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। ভালোবাসা যেখানে সেখানে আত্মসম্মানবোধ আগে? মায়ার সত্তা তাঁকেই প্রশ্ন করল।জবাব যেন মিলছে না।
শেফালী মায়ার দিকে এগিয়ে এল। “চা-টা খান।মাথা ব্যথা কমবে। না খাইলে আমার কষ্ট বৃথা যাইব।”
“উফ’একা ছাড় আমায়।তোর চা তুই খা।”
“এখনো চা অনেক গরম। শেষবার জিগামু,খাইবেন না?”
“শেষবার জিজ্ঞেস করবি সেটাও আবার বলে’নিস।যা এখান থেকে।’
শেফালী বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলল ছাদ থেকে নিচে।ছাদ এর দরজার কাছে এসেই মীর এর সাথে ধাক্কা খেয়ে শেফালী পড়ে যায় মেঝেতে।মীর ব্যস্ত পায়ে ছুটেই আসছিল।তখন জয়ন্তন এর সামনে লজ্জায় পড়েছিল। মেজাজ বিগড়ে আছে। সে-ই ক্রোধ যেন তাঁর হাঁটার গতির উপর ছিল।
শেফালী পায়ে ব্যথায় ককিয়ে উঠল। ওঁর মা বলে চেঁচিয়ে ওঠা শব্দে মায়া ও তৃষ্ণা এগিয়ে আসে।মীর মাথায় হাত দিয়ে বলল “আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠে কার মুখ দেখেছিলাম কে জানে!” পরক্ষনেই মনে পড়ে আজ রাত শেষ পর্যায়ে।আগাম দিন ইতিমধ্যে হাজির।সে তো নির্ঘুম কাটিয়েছে।
পুনরায় মীর মায়াকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল “ধাক্কা খেলাম তো খেলাম,অন্য কারো সাথে খেলে ভালো হত।”
মায়া মীর এর মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে বলল “এত রাতে এখানে কি?আর শেফালী কে ধাক্কা দিলেন কেন?
‘আমি ওকে ধাক্কা কোথায় দিলাম,বরং ও এসে আমার গায়ে পড়েছে।শত হোক, আমার মত সুদর্শন সুপুরুষ কে সবারই মনে লাগে।ও না হয় একটু দেহে লাগাতে চেয়েছে।”
“আপনি খুব বা’জে।”
“লেখা আছে কোথাও?
“আপনার সাড়া শরীরেই লেখা!”
শুনে মীর পরনের জ্যাকেট খুলতে চাইল।বলল “তাহলে কাপড় খুলে দেখাচ্ছি।”
“ছিঃ।চলে যান এখান থেকে। আপনার জন্য কোন শান্তি পাচ্ছি না।”
“তোমাকে চির শান্তি দিতেই এসেছিলাম। কিন্তু ঘুরেফিরে শয়’তান এর সাথে দেখা হয়েছে।”
মায়া ঠোঁট চেপে হেঁসে বলল “দাদুর সাথে নিশ্চয়ই দেখা হয়েছে। আমার ঘরে গিয়েছিলেন! আমাকে বলা কথাগুলো উনাকে বলেছেন!উনি আপনাকে নিশ্চয়ই লাঠিপেটা করেছে!” মায়া এক শ্বাসে কথাগুলো বলল খুব উৎফুল্লের সাথে।বলা শেষে হেঁসে উঠল।অট্ট হাসিতে তলিয়ে গেল সে।
মীর মায়ার মুগ্ধকর হাঁসি দেখছে নেশা ভরা চোখ জোড়া নিয়ে। এসেছিল মায়াকে ধমকাবে বলে। কিন্তু তাঁর মসৃণ, স্নিগ্ধ হাসিতে তাঁর রাগ গলে গেল মোমের মতন। তাঁর ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ভেসে উঠল।মায়া হাঁসিমাখা মুখটি একদিকে সরিয়ে নিল।মীর ঘাড় কাত করে সেদিক পানে চেয়ে দেখছে।
মীর দু ঠোঁট সরু করে শ্বাস ছেড়ে বলল “মায়াবতী’এভাবে হেসো না। তোমার আ’গুন মাখা হাসিতে যেন হৃদয় গলে যায়।”
মায়া হাঁসি থামিয়ে দিল।মীর এর দিকে তাকাল।মীর তাৎক্ষণিক নিজের বক্তব্য ঘুরিয়ে ফেলতে চাইল। “এটা তোমাকে বলিনি। একজন লেখিকার কথা।”
শেফালী ও তৃষ্ণা ছাদ থেকে চলে যায়। মায়া চিলেকোঠার পাশে এসে দাঁড়াল আলগোছে দেয়ালের সাথে।মীর তাঁর সামনে পায়চারি করল কিছুক্ষণ। এরপর সেও দু হাত সম্মুখে রেখে দেয়ালের সাথে মায়ার পাশেই দাঁড়ালো।মায়া তাঁর দিকে চেয়ে শীতল কণ্ঠে বলল “আমার হাসির প্রশংসা করেছিলেন!”
“একদমই না।আমি মীর কোনদিন মেয়েদের প্রশংসা করি না।”
“তবে একজন আছে,যে আমার অনেক পছন্দ করে।”
“কে সে?
“আছে, মাস্টার এর বড় ছেলে। আমাকে অনেক পছন্দ করে। কিন্তু কোনদিন আমার বাবার ভয়ে বলতে পারেনি।হয়ত আমার বিয়ে হয়ে যাওয়ার জন্য কষ্টও পাচ্ছে। একদিন তো আমার হাত পর্যন্ত ধরেছিল। আমার হাত নাকি খুব নরম সেটাও বলেছিল।”
মীর ভ্রু উঁচিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল।মায়া লক্ষ্য করল মীর এর অভিব্যক্তি।মনে হচ্ছে সে কোন কারণে রেগে গেছে হঠাৎ।রাগে জ্বলছে।সেই তাপ মায়া পাচ্ছে। তাঁর কারণটা ঠিক আন্দাজ করতে পারল না মায়া।তবু আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে “আপনি রেগে আছেন মনে হচ্ছে?
“কোথায়, না তো” বলে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটার চেষ্টা করছে।
মায়া প্রসঙ্গ বদলে বলল “তখন নিশ্চয়ই দাদুর মার খেয়েছেন?”
“তুমি মার খাইয়েছো!এর শোধ আমি তুলব।”
“অপেক্ষায় রইলাম।”
The Silent Manor part 64
“আমিও অপেক্ষায় আছি সে-ই উত্তম সময়ের।” বলে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে মায়া। তাঁর হাসির কারণ মীর মার খেয়েছে বলে।মীর তাঁর সামনে গিয়ে বলল “খুব মজা পাচ্ছ তাইনা!” কণ্ঠে যেন মীর এর সুর মাখা।
মায়া কিছু না বলে পুনরায় বলল “সত্যিই হাঁসি পাচ্ছে।মীর বাঘ,হানতান কত কি বলেছিলেন’” থেমে আবারও হাসে মায়া।মীর তাকিয়ে আছে বিনা পলকে।
মায়া মীর দৃষ্টি লক্ষ্য করে বলল “ওভাবে কি দেখছেন?’
“তোমাকে যতই দেখি ততই যেন দেখতে ইচ্ছে করে।তবু দেখার তৃষ্ণা যেন মিটে না।”
