Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 16

Naar e Ishq part 16

Naar e Ishq part 16
তুরঙ্গনা

বাড়ির প্রশস্ত ড্রয়িংরুমটি আজ আলোকোজ্জ্বল। শহরের সব বাঘা বাঘা মানুষ উপস্থিত। জাভিয়ান চৌধুরী তার আভিজাত্যের সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন আজকের আয়োজনে। সুহিনকে যখন দোতলা থেকে নামিয়ে আনা হলো, পুরো ড্রয়িংরুমে মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এল।
সোফায় একপাশে বেশ খোশমেজাজে বসে আছে কেকের বন্ধু সাদ হাম্মাদি। সে বরাবরই চঞ্চল আর হাসিখুশি। পুরো বাড়িতে সুহিনই একমাত্র মানুষ যার সাথে সে ভালোমতো স্বাচ্ছন্দ্যে দুই-একটা কথা বলার সাহস পেতো। কিন্তু আজ হুট করে সুহিনের বিয়ের কথা শুনে তার মনটা বিষিয়ে গেছে।
একইসাথে সাদের কাছে কেকে আর সুহিনের সম্পর্কটাও স্রেফ ভাই-বোনের। সাদ আশেপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে, পাশে বসে থাকা তালহার উদ্দেশ্যে বলল,

​”এ তালহা, এসব কি হচ্ছে আমায় বলতো? জাভিয়ান আঙ্কেল হঠাৎ সুহিনকে বিয়ে দেওয়ার জন্য এমন উঠেপড়ে লাগলেন কেন? মেয়েটা তো এখনো ছোট। কেবল পড়ালেখা করছে। আর কেকে-র হাবভাব দেখছিস? র’ক্তের না হোক, একমাত্র ছোট বোনকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে, অথচ ও কেমন স্ট্যাচু হয়ে বসে আছে! কোনো দায়দায়িত্বও নেই? ছোট বোনটার বিয়ে, অথচ মুখে একটু খুশি-টুশিও নেই।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

​তালহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর মুখে বসে রইল। সে কেকের মতোই স্বল্পভাষী। কেকের সাথে সবচেয়ে বেশি সখ্যতা যদি কারো থেকে থাকে,তবে তার নিজেরই। যেমন, সাদ ভাবতেও পারছে না এই মুহূর্তে সে কোন আগ্নেয়গিরির খেলার সম্মূখে বসে আছে। কিন্তু তালহা তো জানে, সুহিন কেকের বোন নয়, বরং কাবিন করা স্ত্রী। আর নিজের চোখের সামনে নিজের স্ত্রীকে অন্য কারো ঘরনী করার এই ‘নাটক’ কেকে কীভাবে হজম করছে, সেটা ভেবেই তালহার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে নিচু স্বরে সাদের উদ্দেশ্যে বলল,

​”বেশি কথা বলিস না সাদ। পরিস্থিতি এমনিতেই জটিল। শুধু চুপচাপ দেখ কী হয়।”
সাদ তালহার ভাবগাম্ভীর্য দেখে,বিরক্তির স্বরে বলে,
“আরে ভাই, আমি তো সুহিনের সাথেই কথা বলে একটু মজা পেতাম। এখন বিয়ে হয়ে গেলে তো সব শেষ! পাত্র হিসেবে যে ছেলেটা আসছে, ও নাকি মির্জা গ্রুপের একমাত্র ওয়ারিশ। কেকে-র তো উচিত ছিল অন্তত পাত্রকে একটু যাচাই-বাছাই করা। ও তো সুহিনকে শাসন ছাড়া আর কিছুই করে না!আসলেই বেটা পুরো ধাপ্পাবাজ, কোনো কাজের না।”

​এদিকে কেকে তখন তাদের থেকে একটু দূরে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। তার পরনে আজ কালো শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। তার সেই চেনা শান্ত-গম্ভীর ইমেজের আড়ালে আজ এক দানবীয় নীরবতা। পাত্রপক্ষ অর্থাৎ আরশাদ মির্জা এবং তার ছেলে সাফওয়ান মির্জা ততক্ষণে চলে এসেছেন। জাভিয়ান চৌধুরী তাদের সাথে উচ্চৈঃস্বরে ব্যবসায়িক আলাপ করছেন। কেকে সেই আলাপে নেই। সে কেবল নিজের দুই উরুতে কনুই ঠেকিয়ে, হাতে সফট ডিংকস্ এর গ্লাস নিয়ে, একদৃষ্টিতে সামনের দিকে চেয়ে আছে।
​জাভিয়ান চৌধুরী ইশারা করতেই দুইজন মেড দোতলায় গেল। কিছুক্ষণ বাদেই সিঁড়ির মাথায় ছায়া পড়ল। সুহিন নেমে আসছে।

​মুহূর্তেই পুরো হলের গুঞ্জন যেন মন্ত্রবলে থেমে গেল। সুহিন শুভ্র-সাদা রঙের এক জমকালো জামদানী পরেছে। সাদা রঙের গাঢ় আস্তরণে তার গায়ের রং যেন আরো শ্বেতশুভ্র হয়ে উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল তার চোখজোড়া। সবসময় মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে থাকা সেই নীলচে চোখজোড়া আজ উন্মুক্ত। ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় সুহিনের নীল চোখজোড়া হিরের মতো জ্বলজ্বল করছে।
হালকা কোঁকড়ানো গাঢ় বাদামী চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা, যার কিছু অবাধ্য অংশ তার কপালের দুপাশে ছড়িয়ে রাখা। গোলাপি ঠোঁট জোড়ায় গাঢ় লাল রঙের লিপস্টিকের হালকা প্রলেপ৷ এছাড়া আর কোনো প্রসাধনী নজরে পড়ল না। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সুহিন প্রচণ্ড ভীত হয়ে মাথা নুইয়ে নামছে। তার শরীর একপ্রকার ক্ষীণ কম্পনে অনবরত কাঁপছে।

কিন্তু কেকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ালো না একটা বিষয়। সুহিন তার বাম হাতের মুঠোয়, শাড়ির আঁচলের চিপায় শক্ত করে কিছু একটা চেপে ধরে আছে—ওটাই মূলত তার চশমা। হঠাৎ আজ চমশা না পড়ায় তার সৌন্দর্য্যে ভিন্ন এক প্রভাব পড়লেও,কেকের বিষয়টা মোটেও পছন্দ হলো না। কোথায় না কোথাও গিয়ে, সুহিনের এসবের সবকিছুতেই তার প্রচন্ড রাগ হলো।
গ্লাস ধরে রাখা হাতটা বেশ দৃঢ় হলো। তীক্ষ্ণ চোয়াল হলো মুহূর্তেই পাথরের মতো শক্ত। চোখজোড়া হিং”স্র তীক্ষ্ণতায় ভরে উঠল। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরছে—’এতো সাজসজ্জার আদৌও কি খুব প্রয়োজন ছিল? নাহ, একদমই না।”
​এদিকে সাদ অস্ফুটস্বরে মুগ্ধতার সাথে বলে উঠল,

“ওয়াউ! হাউ ইজ শী সো বিউটিফুল! একদম প্রিন্সেসের মতো লাগছে,তাই না?”
​সাদ কিছুক্ষণ আগেই কেকের পাশের সোফায় এসে বসেছিল। যার ফলে কথাটাও সে তালহা আর কেকে’কে উদ্দেশ্য করেই বলল। অন্যদিকে কেকের অন্যপাশে বসে আছে ফারিস আর জানান। কেকে সাদের কথার কোনো উত্তর না দিলেও, আড়চোখে তাকিয়ে দেখল—বাকিদের মতো তারা দুজনেও হা করে সুহিনের দিকে চেয়ে আছে।
অথচ তার নীরবতা যেন এক তপ্ত লাভা। তালহা আড়চোখে কেকে-র দিকে তাকালো। সে দেখতে পাচ্ছে কেকের হাতের রগগুলো নীল হয়ে ফুলে উঠছে। কিন্তু মাথায় ঢুকছে না, বান্দা এসব চুপচাপ দেখছে কিভাবে? এর মাথায় আদতে চলছেটা কি? আর করতেই বা চাইছে কি?
​তালহার চিন্তাভাবনার মাঝেই, সুহিন সবার মাঝে এসে হাজির হলো। মেডরা তাকে নিয়ে কেকের ঠিক সম্মূখের অপর প্রান্তের ফাঁকা সোফাটাতে বসিয়ে দিল। সুহিন আশেপাশে কোনোদিকেই তাকাচ্ছে না। সে কেবল অদ্ভুত এক সংশয়ে ভীত হয়ে আছে।

​পাত্রের বাবা আরশাদ মির্জা মুগ্ধ হয়ে সুহিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“মাশাআল্লাহ! যা ভেবেছিলাম, এ তো তার চেয়েও অসম্ভব সুন্দরী মেয়ে, জাভিয়ান! বিশেষ করে ওর চোখ দুটো… জাস্ট আনবিলিভেবল! মা, তোমার পুরো নামটা যেন কী?”
​সুহিন চকিতে একবার মাথা তুলল। চোখ তুলতেই তার নজর পড়ল কেকের দিকে। কেকে তখন দুআঙুলে ধরে রাখা স্বচ্ছ গ্লাসে সফট ড্রিংকস খাচ্ছে। কিন্তু তার তপ্ত স্থির দৃষ্টি তীরের মতো বিদ্ধ করছে সুহিনের নীল চোখদুটোকে। এলোমেলো ওল্ফ কাটের চুলগুলো তার পুরো ললাটে ছড়িয়ে আছে, তবুও সেই তীক্ষ্ণ গ্রেইশ-ব্ল্যাক চোখজোড়া যেন স্ফূলিঙ্গের ন্যায় উদীপ্ত ছড়াচ্ছে। সুহিন বেশিক্ষণ তার চোখের সাথে চোখ মিলিয়ে থাকতে না পেরে শুষ্ক ঢোক গিলল। পুনরায় মাথা নুইয়ে ম্লান স্বরে ইতস্তত হয়ে বলল,

​”উ…উম্মে হানি সুহিন।”
—“বাহ! চমৎকার নাম। নামের মতোই তুমিও চমৎকার।”
এরিমধ্যে আরশাদ মির্জার পাশে বসে থাকা তার ছেলে সাফওয়ান মির্জা বাবার কানে কানে কিছু একটা বলে উঠল। ছেলের কথায় ক্ষীণ মুচকি হেসে ড্রয়িংরুমের গুমোট নীরবতা ভাঙলেন আরশাদ মির্জা। তিনি হাসিমুখে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“জাভিয়ান সাহেব, আমাদের তো মেয়ে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তবে সাফওয়ান চাচ্ছিল সুহিন মা’র সাথে আলাদাভাবে একটু কথা বলতে। আজকালকার ছেলেমেয়েদের তো বোঝেনই,একটু বোঝাপড়া না হলে ঠিক স্বস্তি পায় না।”
​জাভিয়ান চৌধুরী তৎক্ষণাৎ সায় দিলেন। কেকে ততক্ষণে সাফওয়ানকে একনজরে পরখ করেও নিল। প্রশস্ত বুক,চওড়া কাঁধ, ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল, ভাবগম্ভীর্যেও দৃঢ়তা—সবমিলিয়ে যথেষ্ট চমৎকার একজন যুবক। অথচ কেকে’র অজান্তেই ইচ্ছে করল,এই গাধাটাকে ধরে আছাড় মারতে। কেকে নজর সরিয়ে নেয়৷ হাতে ধরে রাখা গ্লাসটায় আরো দৃঢ় বল প্রয়োগ করে।

“অবশ্যই, কেন নয়! সুহিন, সাফওয়ানকে নিয়ে তুমি ভেতরে যাও। আমাদের লাইব্রেরি বা পেছনের লনটা ঘুরে দেখাও।”,নির্বিকার স্বরে জাভিয়ান বলল।
​এদিকে সুহিন ভড়কে গিয়ে, পাথর হয়ে বসে রইল। তার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। সে আড়চোখে একবার মাথা তুলে কেকের দিকে তাকালো। দেখল কেকে তখনও বরফশীতল ভঙ্গিতে গ্লাসে সফট ড্রিংকস খাচ্ছে। আর তার ঐ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটুকু হিং”স্রাত্মক ভঙ্গিতে তার দিকে নিক্ষেপ করে রেখেছে। শক্ত তীক্ষ্ণ চোয়াল ব্যতীত মুখচ্ছবিতে কোনো বিকার নেই, অথচ হাতের গ্লাসটা সে এমনভাবে ধরে আছে যেন এখনই ওটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। শ্বাসরুদ্ধ সুহিন আবারও খেয়াল দেখল কেকের দৃষ্টি তার দিকেই স্থির—সে যেন ইশারায় বারংবার বলছে,

‘ভুলেও যাওয়ার সাহস করিস না’।
​কিন্তু জাভিয়ানের কড়া কণ্ঠস্বর তাকে বাধ্য করল।—”সুহিন! যাও মা।”
​সুহিন অবশ পায়ে উঠে দাঁড়াল। সাফওয়ান নামের ছেলেটি বেশ চটপটে ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে সুহিনকে পথ দেখিয়ে আগে যাওয়ার ইঙ্গিত দিল। সুহিন মাথা নিচু করে সাফওয়ানের পেছনে পেছনে সিঁড়ির পেছনের নির্জন করিডোর দিয়ে এগিয়ে গেল।
অন্যদিকে কেকের পাশে বসে থাকা সাদ, একপ্রকার তীব্র বিরক্তি নিয়ে আওড়াল,

“কি এক হাঁদারাম এই বেটা। এরচেয়ে তো আমিই ঠিক ছিলাম। চোখের সামনে আমি থাকার পরও, জাভিয়ান আঙ্কেল যে কেনো আমায় দেখলেন না! ধুর ছাই,তাহলে বোকা মেয়েটাকে আমিই বিয়ে করে নিতে পারতাম।”
​সাদ আনমনে কথাটা বলে ফেললেও,তালহা কিংবা কেকে দুজনেই তা স্পষ্টত শুনতে পেল। তৎক্ষনাৎ দুজন খানিক বিস্ময়ের নজরে সাদের দিকে ফিরে তাকালো। সাদ তখনও সুহিনের চলে যাবার পানে চেয়ে থেকে, হতাশায় কেবল একঢোক সফট ড্রিংকস মুখে তুলেছে। ওমনি পাশে মুখ ফেরাতেই দু’জোড়া বিস্ময়ে ক্ষিপ্ত চাহুনি দেখে সে ভড়কে গিয়ে একপ্রকার কেশে উঠল। তালহা তার কথায় হতভম্ব হয়ে ভাবছে, কেকে এবার কি রিয়েক্ট করবে। অন্যদিকে কেকে পারছে না কেবল,সুহিন সহ সবার রাগ একবারেই ঢেলে দিয়ে, নিজের শীতল-হিং”স্র চোখজোড়া দিয়ে সাদকে গিলে খেতে।
এরিমধ্যে সাদ ইতস্তত ভঙ্গিতে হেসে হেসে কেকের উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে বলল,

“আরে ভাই চেতোস কেন? মানলাম ভাইয়েরা সবসময় বোনের জন্য ভালো ছেলেই খোঁজে, কিন্তু আমিও তো তোর বন্ধু হই। কিছুটা হলেও জানিস আমায়। আমি তো খারাপ না৷ ঐ আগে কি করেছি…বিয়ের আগে একটু-আধটু দোষ সবারই থাকে। বিয়ে হলেই ঠিক হয়ে যেতো আরকি।”
সাদ কোনোমতে কথাটা শেষ করে,আমতা-আমতা করতে লাগল। শুষ্ক ঢোক গিলে মাথা নুইয়ে বসে রইল।
কেকে আর কথা বাড়াল না। ধীরস্থিরভাবে গ্লাসের পানীয়টুকু শেষ করে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোয়াল এখন পাথরের মতো শক্ত। তালহা চকিতে কেকের দিকে তাকালো। সে চেনে এই দৃষ্টি। তথাকথিক এটাই সেই ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ কেকের রূপ, যে কোনো আইন বা নিয়মের তোয়াক্কা করে না। অথচ সে সবার সামনে যতটুকু দেখায়, তার ব্যক্তিত্ব সেই গল্পের আড়ালে বিস্তৃত এক রহস্যে পূর্ণ।
তালহা নিচু স্বরে, কেকের উদ্দেশ্যে বলল,

“কেকে, মাথা ঠাণ্ডা রাখিস! পরে তোর সাথে জরুরী কিছু কথা বলব।”
কেকে একপলক তালহাকে দেখে নিয়েই, আর দাঁড়াল না। তাকে ভরা বৈঠক হতে চলে যেতে দেখে, জাভিয়ান কিছুটা বিচলিত স্বরে বলল,
“কাশিফ,কোথায় যাচ্ছো?”
কেকে কোনো উত্তর না দিয়ে বাড়ির ভিন্ন সাইডে চলে গেল। জবাব না পেয়ে জাভিয়ান শুরুতে কিছুটা বিচলিত হলেও,তাকে সুহিনের দিকে যেতে না দেখে মনে মনে ঠিকই স্বস্তিতে শ্বাস ফেলল।

সিঁড়ির পেছনের দিকের করিডোরে সাফওয়ান ও সুহিন একত্রে দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলছে। সাফওয়ান বারবার নানান সব প্রেমিকসুলভ কথাবার্তা বললেও, সুহিন সেসব আমলে নিচ্ছে না। সে ভাবছে অন্যকিছু। তার বুকটা অজানা এক ভয়ে কাঁপছে।
—“মিস সুহিন, আপনি তো কিছু বলছেনই না। আপনি কি আমার সাথে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করছেন?”
সুহিন হকচকিয়ে যায়।ইতস্তত হয়ে আওড়ায়,
“আ…হ্যাঁ,না মানে…তেমন কিছু না। আমি কথা একটু কমই বলি।”
সাফওয়ান হেসে জবাব দেয়,
“ওহ আচ্ছা, আপনি কিন্তু দেখতে আসলেই চমৎকার সুন্দর। আর আপনার এই ব্লু-আইজ…যাস্ট আউটস্ট্যান্ডিং!”
সুহিন জোরপূর্বক হেসে আওড়ায়,
“আ…ধন্যবাদ।”

—” আচ্ছা, আপনি কিন্তু সত্যিই বেশ ঘাবড়ে আছেন। আপনি কি কোনো কিছু নিয়ে ভয় পাচ্ছেন? এই বিয়েতে আপনার কোনো আপত্তি নেই তো?”
—“না,না, আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি ঠিক আছি।”
সাফওয়ান আবারও হাসল। সুহিনকে একপলকে সম্পূর্ণ পরখ করে দেখে নিয়ে, ক্ষীণ হেসে বলল,
“তাহলে আমরা এগোতে পারি, তাই তো?”
—“আ…হ্যাঁ,অবশ্যই।”
এরিমধ্যে সাফওয়ান আচমকা এক’পা এগিয়ে এসে,সুহিনের হাতদুটো আলগোছে ধরে। সুহিন চমকে গিয়ে হাত সরাতে চেয়েও পারে না। শুষ্ক ঢোক গিলে মুখ তুলে দেখে, সাফওয়ানকে। এই একই দৃশ্য দূর হতে দেখে আরো একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ।

—“সুহিন, বিশ্বাস করবেন কিনা…আমি সবসময় চেয়েছি আমার জীবনে আপনার মতোই কেউ…”
সাফওয়ানের কথা সম্পূর্ণ হলো না। বরং তার আগেই সেখানে উপস্থিত হলো,কালো শার্টের হাতা গুটিয়ে তাদের দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে আসতে থাকা তীক্ষ্ণ চোয়াল সম্পন্ন কেকে। তাকে দেখে সাফওয়ান কিছুটা ইতস্তত বোধ করল। কেকে সরাসরি দুজনের হাতের দিকে তাকাতেই,সাফওয়ান সুহিনের হাতদুটো ছেড়ে দিল। কেকের দিকে ফিরে তার উদ্দেশ্য বলল,

“আ…আপনি?…আপনি সুহিনের কে হোন যেন?”
কেকে তার নির্লিপ্ত শীতল চাহনিতে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। সুহিন তখন মাথা নুইয়ে নিজের শাড়ির কুঁচির দিকে ভীত ইতস্তত চোখে তাকিয়ে।
এদিকে কেকে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর, সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“ওখানে তোমাকে সবাই ডাকছে।”
কেকের গুরুগম্ভীর স্বরে, সাফওয়ানের আর চেয়েও কিছু বলার রইল না। সে যেতে সম্মতি জানিয়ে, সুহিনের উদ্দেশ্যে বলল,

“সুহিন, চলুন। আপনাকেও…”
—“ওকে কেউ ডাকেনি।”
পুনরায় কেকের রুক্ষ গলার স্বরে সাফওয়ান চুপ করে যায়। একবার সুহিন তো একবার কেকে’কে দেখে নিয়েই আওড়ায়,
“আমি তবে আসছি।”
সাফওয়ান চলে যেতেই সুহিন উসখুস করতে লাগল। এদিকটায় লাইটের আলো কম। সে আঁড়চোখে মাথা তুলে কেকের দিকে তাকাল। কেকে নির্বিঘ্নে তার দিকে চেয়ে আছে। ভাবগম্ভীর্য এখন শিথিল—সুহিন ঠিক বুঝতে পারছে না।
এরিমধ্যে কেকে আচমকা তার দিকে পা বাড়ায়। সুহিন হকচকিয়ে কয়েক-পা পিছিয়ে যায়। কিন্তু কেকে থামল না। দৃঢ় পায়ে শার্টের হাতা ঠিকমতো গুটিয়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে, তার দিকে এগিয়ে যেতেই—সুহিন হুড়মুড়িয়ে পেছাতে গিয়ে সোজায় সিঁড়ির পেছনের কোণার দেয়ালের সাথে গিয়ে ঠেকল। কেকেও সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তার অতি সন্নিকটে কাছে ঘেঁসে দাঁড়িয়ে, ভগ্ন স্বরে বলল,

“এখন ভয় পাচ্ছিস কেন?”
সুহিন শুষ্ক ঢোক গিলে মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। কেকে শান্ত চোখে কিছুক্ষণ তাকে দেখার পর মূহুর্তেই, চোখ-মুখ শক্ত করে অকস্মাৎ সুহিনের দুপাশে দেওয়ালে হাত ঠেকিয়ে,মুখের কাছে মুখ এনে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“এতো সেজেছিস কার জন্য,তা আগে বল!”
সুহিন চোখ-মুখ খিঁচে নেয়। ভীত হয়ে পুনরায় চোখ দুটো খুলে আমতাআমতা করে আওড়ায়,
“কোথায় এতো সেজেছি…শুধু শাড়ি আর লিপস্টিকই তো দিলাম…”
এই বলেই সে পুনরায় ভীত মনে চোখ দুটো খিঁচে নেয়। দেয়ালের সাথে পারলে একবারেই মিশে যায়। কিছুক্ষণ সবকিছু নীরব রইলেও, খানিকক্ষণ বাদেই সুহিন তার অধরে আঙুলের খসখসে স্পর্শে চমকে ওঠে। চোখ মেলতেই দেখে কেকে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ঠোঁট থেকে লিপস্টিকের লাল রঙের প্রলেপ আঙুলের ডগায় তুলে নিয়েছে। এবং তা আঁড়চোখে পরখ করেই, হালকা শুঁকে নিয়ে বলল,

“এই লিপস্টিক খাওয়া যাবে?”
সুহিন ফ্যালফ্যাল করে কেকে’র দিকে চেয়ে রইল। নিজেকে তটস্থ করে ইতস্তত হয়ে বলল,
“আ…না,কিন্তু আপনি লিপস্টিক কেন খেতে চাচ্ছেন? বাড়িতে তো গেস্টদের সাথে সাথে বাকিদের জন্যও রাতের রান্না করা হয়েছে।”
সুহিন কেকের অভিব্যক্তি বুঝতে পারেনি দেখে,কেকে ক্ষীণ তির্যক হাসল। পরক্ষণেই ঘাড়টা কাত করে বোকা সুহিনের দিকে আরেকটু ঝুকে ফিসফিস করে আওড়াল,
“এরপর থেকে এভাবে কখনো সাজতে ইচ্ছে হলে, অবশ্যই আমার পারমিশন নিবি। মেক-আপ,টেক-আপ করবি না, ওতে তোকে পেত্নীর মতো লাগবে। এভাবেই ঠিক আছে। আর যদি খুব বেশিই প্রয়োজন পড়ে লিপস্টিক দেওয়ার তবে—এডিবল লিপস্টিক ইউজ করবি। গট ইট?”
(এডিবল=খাওয়ার যোগ্য)

সুহিন কথাগুলো সেভাবে আমলে নিল না। এখান থেকে সরতে পারলেই হলো। ভেতর ভেতর অস্থির হয়ে উঠেছে সে। যথারীতি কেকের কথায় কেবল মাথাটা দুবার ঝাঁকিয়ে আওড়ায়,
“হুম।”
এই বলেই সে উসখুস করতে থাকে কেকের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার। কিন্তু কেকে তো আজ ভিন্ন মেজাজেই আছে। সে তো তার কথাই শুরু করেনি এখনো। অন্তত বাড়ির সব উটকো মেহমান গুলো চলে না যাওয়া পর্যন্ত সুহিনকে ওদিকে যেতেও দেবে না।

—“এখন বল, বারবার নিষেধ করার পরও তুই গেইস্টদের সামনে এভাবে সেজেগুজে কেনো এসেছিস? আমি মানা করেছিলাম না? তাহলে শুনলি না কেন বল?”
যথারীতি হুট করে, নিজের ভাবগম্ভীর্য এক লহমায় পাল্টে কেকে সুহিনের ডান বাহুটা নিজের বাম হাতে শক্ত করে চেপে ধরল। সুহিন এতে চমকে উঠলেও,কেকে দমলো না।
—“আমার জবাব দে হানি!”
সুহিন হকচকিয়ে যায়। বুঝে উঠতে পারে পারে না সে বলবেই বা কি!
—“সেজেগুজে এসেছিস ভালো কথা, কিন্তু আবার কোন সাহসে আমার ইশারা বোঝার পরও, তুই ঐ গাধাটার সাথে এই চিপায় এসেছিস? বলেছিলাম না, কোনোপ্রকার আদিখ্যেতা করতে যেন না দেখি! তারপরও কেনো আমার কথা শুনিস না গাধা!”

কেকে সুহিনের হাতে আরো দৃঢ়ভাবে বল প্রয়োগ করতেই, সুহিন ব্যাথায় কিছুটা কুঁকড়ে গিয়ে ঠোঁট উল্টে আওড়াল,
“আ…ব্যাথা পাচ্ছি আমি।”
—“লাগুক ব্যাথা। এতো নিষেধাজ্ঞার পরও আমার কথা শুনিস না কেন, গাধা!”
সুহিন এবার না চাইতেও,ঠোঁট উল্টে নিঃশব্দে কেঁদে ফেলে। বাচ্চাদের মতো ঠোঁট চেপেও কান্না আটকাতে না পেরে, অভিযোগের স্বরে আওড়ায়,
“আমার কি দোষ! আমি তো শুরুতেই বলেছিলাম আমি এসব করতে পারব না। নিজেই জোর করে এসব করতে বললেন,এখন আবার নিজেই বকা দিচ্ছেন।”
সুহিনের এমন প্রতিক্রিয়ায় কেকে’ও খানিকটা স্তম্ভিত হলো। সে হাতের দিকে তাকাতেই হুঁশ হলো—সুহিন আসলেই ব্যাথা পাচ্ছে। যথারীতি তৎক্ষনাৎ হাতটা সরিয়ে নিয়ে, সে ভারী শ্বাস টেনে আচমকা সুহিনকে বাম’হাতে আগলে নিয়ে—নিজের বুকের বা’পাশে জড়িয়ে আঁকড়ে ধরল। সুহিনের মাথার উপর চিবুক ঠেকিয়ে, অচিরেই ভারী শ্বাস ফেলে বলল,

“বকা খাওয়ার মতো কাজ করলে, বকা তো দেবোই গাধা!”
যথারীতি এতে সদ্য কান্না করতে উদ্যত সুহিনও হতভম্ব হয়ে পড়ল। শক্তপোক্ত বুকে মুখটা চেপে রাখায়, এতোক্ষণে হয়তো দমটা বন্ধ হয়ে যেতো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এমন কিছুই হলো না। উল্টো সুহিন খেয়াল করে দেখল, এই লোকটার হৃদপিন্ড যেন থমকে আছে। বাকিদের যেমন বুকের এই বা’পাশটা দ্রিমদ্রিম শব্দ শোনা যায়, এই নেকড় মানবের মতো অদ্ভুত লোকটার ক্ষেত্রে এমন কিছুই ঘটছে না।
সুহিন কৌতুহলে সব ভুলে আচমকা মুখ তুলে তাকাল। কেকের চোখের সাথে চোখাচোখি হতেই, কেকে তার বোকা বোকা সন্দিহান চাহুনির দিকে চেয়ে ভ্রু-কুটি করে বলল,

“কি হয়েছে?”
সুহিন চোখজোড়া দুবার পিটপিট করে কেকে’কে আরেক ঝলক দেখে নিয়ে আওড়াল,—“কিছু না।”
এই বলেই সে তৎক্ষনাৎ কেকের কাছ থেকে দূরে সরে গেল। কেকেও আর সেসব তোয়াক্কা না করে, দুদণ্ড কিছু একটা ভেবে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“চুপচাপ নিজের রুমে চলে যা। দুনিয়া উল্টে গেলেও তোকে যেন এখন আর নিচে না দেখি। গেস্টরা চলে যাবে,তারপর যা ইচ্ছে তাই করবি।”
সুহিন তার কথায় মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানায়। সুহিন চলে যাবে এমন মূহুর্তে কেকে আবারও ভারিক্কি স্বরে বলল,
“আগেই কোথায় যাচ্ছিস? আমি যেতে বলেছি?”
সুহিন থমকে গিয়ে তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। কেকে আর কথা না বাড়িয়ে, প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গের উদ্দেশ্যে বলল,

“শোন, ঐ গাধাটার থেকে আগামী দুদিন যতটা পারবি দূরে থাকবি।”
সুহিন শুরুতেই মাথা নেড়ে, পরক্ষণেই কৌতুহল বশত আওড়াল,
“আচ্ছা…কিন্তু কোন গাধা?”
—“এখানে গাধা কয়টা আছে? তোর সাথে যে গাধাটার বিয়ে ঠিক হয়েছে,ওর কথাই বলেছি।”
—“আ…না মানে, আপনি তো সবাইকেই গাধা বলেন। আমাকেও গাধা বলেন।”
—“তো ঠিকই তো আছে। তোর নাম সুহিন আর ওই গাধাটার নাম সাফওয়ান। ফাস্ট লেটার মিলে গেসে,তারমানে তোরা দুজন ভাইবোন।”
সুহিন কেকের কথা আগা মাথা কিছু বুঝল না। এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়েছে? বিয়েও করতে বলে, আবার বলে নামের প্রথম অক্ষর এক, তাই তারা ভাইবোন?
এরিমধ্যে কেকে কি যেন একটা ভেবে, অচিরেই ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“আরো একটা গাধা আছে।”
কেকের চোয়াল শক্ত হয়। সুহিন ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ওটা আবার কে?”

—“সাদ!”, কেকে দাঁত কিড়মিড়িয়ে আওড়ায়। সুহিন বিস্ময়ের স্বরে বলল,
“আপনার বন্ধু সাদ?”
—“হুম, ওটার নামও এস(S) দিয়ে। সুহিন,সাদ,সাফওয়ান। গ্রেট! তিনটাই মিলে গিয়েছে, তাই তোরা তিনজনই এখন থেকে কেবল ভাইবোন। আর কিচ্ছু না।”
—“কিন্তু, সাদ ভাইয়ার সাথেই বা কেনো…”
—“কারণ আমি চেয়েছি। এখন যা এখান থেকে!”
সুহিন আর কথা বাড়ায় না। চলে যাবার জন্য আবারও উদ্যত ঠিক তৎক্ষনাৎ কেকে আবারও তার হাত চেপে ধরে। সুহিন উৎসুক স্বরে আওড়ায়,
“আবার কি…”
—“তোর গ্লাসেস কোথায়?”
সুহিন এবার হকচকিয়ে যায়। কোমড়ের আঁচলের নিচে গুঁজে রাখা চশমাটা আলগোছে ইতস্তত ভঙ্গিতে বের করে। কেকে তা ভ্রুকুটি করে দেখতে দেখতেই, বিরক্তির স্বরে বলল,
“কোমড়ে কে চশমা গুঁজে রাখে?”

—“আ…মানে…”
সুহিনের ইতস্তততার মাঝেই, কেকে তার হাত থেকে চশমাটা নিয়ে, তার চোখে পড়িয়ে দিতে দিতে রুক্ষ স্বরে বলল,
“ঢং করে এটা খুলতে কেনো গিয়েছিলি? দেখছিলাম তো, সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় একবার পড়ে গেলেই হাড়-গোড় সব চুরমার হতো।”
কেকের কথা শেষ হতে না হতেই, সুহিন আমতা-আমতা করে বলল,
“আ…আমি কি কানা নাকি?”
—“নোস তুই?”,কেকে চশমা পড়ানো শেষে হাতদুটো প্যান্টের পকেটে গুঁজে আওড়াল। হতবাক সুহিন জবাব না দিয়ে, মুখ ফুলিয়ে কেকের দিকে তাকিয়ে রইল। কেকে তাকে একঝলক আরো একবার দেখে নিয়ে, ক্ষীণ তাচ্ছিল্যের সহিত হেসে বলল,

“গাধা,এবার যা এখান থেকে!”
সুহিন আর একটা কথাও না বাড়িয়ে, তৎক্ষনাৎ সিঁড়ির ওপাশ দিয়ে বেয়ে চলে গেল। এদিকে কেকে পেছন ফিরে করিডোরের দিকে এগিয়ে যাবে তৎক্ষনাৎ পাশ থেকে আওয়াজ এলো,
“কাশিফ, দাঁড়াও!”
কেকে দাঁড়িয়ে যায়। পাশে ফিরতেই দেখে জাভিয়ান আর আরশাদ মির্জা তার দিকে এগিয়ে আসছে। কেকে প্রশস্ত বুক টেনে,শ্বাস ফেলল।
এরিমধ্যে জাভিয়ান আরশাদ মির্জাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“উনি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চান।”
কেকে সম্মতি দিয়ে মাথা নুইয়ে আওড়ায়,

“জ্বী, বলুন।”
কেকের ভাবগম্ভীর্য প্রখর তা আরশাদ মির্জাও জানে। তাই একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। যদিও এখন যে বিষয়ে কথা বলবে সেটিও হয়তো খানিকটা অস্বস্তিকর।
সে যাই হোক, আরশাদ মির্জা কেকের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“মিস্টার কেকে! তুমি করে বলবো নাকি আপনি…আচ্ছা আপনিই বলি—যেহেতু নতুন সম্পর্ক গড়তে চলেছে।…আপনার বাবার সাথে আমার একসময় টুকটাক ভালোই আলাপ-পরিচিতি ছিল। এরপর তো উনি…আল্লাহ জান্নাত নসিব করুক। তো বলতে চাচ্ছিলাম, সুহিনকে আমাদের সত্যিই অনেক পছন্দ হয়েছে। যেহেতু বর্তমানে আপনিই ওর আসল গার্ডিয়ান সেহেতু…”

আরশাদ থেমে যায়। পাশ থেকে জাভিয়ান কেবল সবটা শুনছে। কেকে’ও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আরশাদের দিকে চেয়ে। আরশাদ মির্জা খানিক থেমে আবারও বলতে শুরু করে,
“সত্যি বলতে, লোকে হয়তো নানান কথাই বলবে। কিন্তু আপনি বাবা হয়ে,মেয়েটার প্রতি যে দায়িত্বটা নিয়েছিলেন তা আসলেই প্রশংসাযোগ্য। এখন সুহিনকে মির্জা বাড়ির বউ হিসেবে সেই দায়িত্বটা আমাদের উপর হস্তান্তর করলে, আজীবন কৃতজ্ঞ রইব।”

জাভিয়ান আর আরশাদ দুজনেই কেকের উত্তরের আশায় দাঁড়িয়ে। যদিও কেকের চোয়াল ক্রমশই শক্ত হয়ে উঠেছে। তবে তার চোখজোড়া অদ্ভুদ রকমের শান্ত।
কেকে বেশ খানিকটা সময় নিয়ে, জাভিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সবকিছুর দায়িত্ব যখন জাভিয়ান আঙ্কেল নিয়েছে,তখন আমায় এতোসব কিছু বলার কোনো মানে নেই।”
কেকের কথায় আরশাদ মির্জা আশ্বস্ত হলেন। একপ্রকার বেশ উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল,
“চমৎকার, তবে আগামী-পরশুর মধ্যে এনগেজমেন্টটা সেরে ফেলি!”
এই বলেই নিজ হতে আরো কিছু সৌজন্যমূলক কথাবার্তা শেষ করে, আরশাদ মির্জা চলে গেলেন। পুরো সময়টাতে কেকে একটা শব্দও করল না। আরশাদ চলে যাওয়ার পরপরই, কেকে নিজেও চলে যেতে উদ্যত হলো। তবে তৎক্ষনাৎ তাকে থামিয়ে দিয়ে, জাভিয়ান বলে উঠল,

“কাশিফ,দাঁড়াও!”
জাভিয়ানের কন্ঠস্বর খানিক অদ্ভুত শোনালো। কেকে নির্বিকার ভঙ্গিতে পেছনে ফিরতেই, জাভিয়ান তার একদম নিকটে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুটা সময় নিয়ে, কেকের চোখে চোখ রেখে, খানিক দ্বিধাগ্রস্ত স্বরেই বলল,
“কেকে! ভুলে যাও ওকে। সে তোমার সৎ মেয়ে। এ সম্পর্ক ঠিক না। সমাজ মানবে না।”
আচমকা জাভিয়ানের থেমে থেমে বলা এহেন অভিব্যক্তিতে কেকে কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জাভিয়ান চেয়ে রইল তার জবাবের আশায়। কিন্তু কেকে অচিরেই অকস্মাৎ বিস্তৃত তির্যক হেসে, কয়েক পা পিছিয়ে যেতে যেতে আওড়াল,

“সইতে পারব না হারানোর ব্যাথা, বলে তো দিয়েছি আমি হৃদয়ের কথা!”
ভগ্নস্বরে গাওয়া তার এই গানের দু’লাইনে সে কি বোঝাতে চাইল,তা জাভিয়ানের বোধগম্য হলো না। সে ভ্রু কুঁচকে কেকের দিকে চেয়ে রইল। কেকে নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকে একপ্রকার অগ্রাহ্য করে চলে যাবার তাগিদে পেছন ফিরল। কয়েক পা এগোতে না এগোতেই, পুনরায় জাভিয়ান তীক্ষ্ণতার সাথে বলে উঠল,
“এসব করে কি বোঝাতে চাইছো কেকে? তুমি কিন্তু বারবার ভুলে যাচ্ছো…”
কেকে ঘাড় বাঁকিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। বাম ভ্রু উঁচিয়ে, বিদ্ধ চাহুনিতে ইশারায় জানতে চায় সে আদতে কি ভুলে যাচ্ছে। একপ্রকার জাভিয়ানের কথাটাকে আমলেই নিল না সে।
এরিমধ্যে জাভিয়ান আচমকা তার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে, ক্ষীণ হেসে বলল,

“অতীতের দোষ-ত্রুটি থাকলে মানুষ তা ভুলে যেতে চায়। কিন্তু নিজের অতীত চিরতরে ভুলে যাওয়াটাও বোধহয় ঠিক নয়। অতীত কি ছিল না ছিল, সে প্রেক্ষাপটে না যাই। কিন্তু সুহিন যে সম্পর্কে তোমার মেয়ে…এটা তুমি আমি না মানলেও পুরো পৃথিবীকে তো আর অস্বীকার করাতে পারবে না!”
কেকে স্তম্ভিত দৃষ্টিতে জাভিয়ানের দিকে চেয়ে রইল। চোয়াল শক্ত করে,দাঁতে দাঁত পিষে গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,
“কি বলতে চাচ্ছেন আপনি?”

আচমকা কেকের ভাবগম্ভীর্য সম্পূর্ণ পাল্টে যাওয়ায়, জাভিয়ান তাচ্ছিল্যের সহিত ক্ষীণ হেসে আবারও বলে উঠল,
“জানোই তো, সুহিনের মায়ের মৃত্যুর সময় সে অন্তঃসত্ত্বা ছিল।”
জাভিয়ান আর একটা শব্দও করল না। কেকের দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে চেয়ে, সে ক্ষীণ হাসল। যেন চোখ-মুখের ভাবভঙ্গিতেই কেকে’কে কিছু একটা বোঝার ইঙ্গিত করছে।
নিমিষেই কেকের চোখেমুখের ভাবগম্ভীর্য সম্পূর্ণ বদলে গেল। একপ্রকার হিংস্র নেকড়ে রূপে তেড়ে এসে, সে জাভিয়ানের পাঞ্জাবির কলার দু’হাতে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বলল,
“হাউ ডেয়ার ইউ!”

জাভিয়ান নিজেকে সামলানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। কেকের অত্যধিক আক্রোশে গলায় চাপ পড়ে শ্বাস নিতে কিছুটা কষ্ট হলেও,সে অচিরেই বলে উঠল,
“সরি, আমি কিছু বলছি না। কিন্তু লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে, হয়তো তারা আজও বলবে…সেই অনাগত সন্তান তোমারই ছিল…”
জাভিয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই, কেকে জাভিয়ানের মতো চওড়ালম্বা মানুষটাকে একপ্রকার ঝাঁকিয়ে পুনরায় গলার কাছে কলারদুটো শক্ত করে চেপে ধরল। জাভিয়ানও নিজেকে ছাড়াতে কেকের হাতদুটো ধরে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে তাকে নিজের কাছ থেকে সরাতে। কিন্তু হিং*স্র নেকড়ে সত্তার এই মানবটার কাছে, বারবারই ব্যর্থ হচ্ছে।
এরিমধ্য কেকে জাভিয়ানের চোখে চোখ রেখে,হিসহিসিয়ে চাপা স্বরে বলে উঠল,
“ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট, বা**স্টার্ড!”

জাভিয়ান খুব বেশি অবাক হলো না কেকের এই আচরণে। সে কিছুটা হলেও জানে কেকে কি জিনিস। সে যতটুকু দেখায় সবটাই তার ব্যক্তিত্বরে ক্ষুদ্রাংশ। বাকি সবটাই রাখে লোকচক্ষুর আড়ালে। কিন্তু কথা শেষে কেকের ওমন অশোভন শব্দ প্রয়োগে জাভিয়ানের চেপে রাখা রাগটাও বেশ প্রখর হলো।
খানিক সুযোগ পেতেই,সেও কেকের হাতদুটো শক্ত করে চেপে ঝাপটে তাকে দূরে সরাতে চাইল, কিন্তু এবারও ব্যর্থ হলো। তবুও সে থামল না। বরং কেকের ঐ শীতল স্ফূলিঙ্গে উদীপ্ত চোখজোড়ার দিকে চেয়ে, জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

Naar e Ishq part 15

“আমিও ঠিক সেটাই বলছি! ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট,কেকে! তুমি মানো বা না মানো, দিনশেষে সুহিনের পরিচয় এটাই যে সে তোমারই সৎ মেয়ে। যা এতোদিন চেপে রাখতে পারলেও, ভবিষ্যতে হয়তো আর পারবে না। যদি না, তুমি এখনই নিজেকে কন্ট্রোল করো।”

Naar e Ishq part 17