ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ১৯+২০
তানিশা ভট্টাচার্য্য
ক্রন্দনরত অবস্থায় বিছানায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে ১৬ বছরের ছোট্ট কিশোরী তানভী। ছোট্ট থেকেই অতিরিক্ত কান্নার দরুন জ্ঞান হারানোর সমস্যাটি রয়েছে তার। এমন সময় ফার্স্ট এইড বক্স হাতে আর্ভিক তানভীর রুমে এলো, ধীরপায়ে এগিয়ে গেল ছোট্ট শুভ্রপরীর দিকে। অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে রইল তার প্রণয়িনীর পানে, এলোমেলো স্কুল ইউনিফর্ম, পায়ের কাটাটা বেশ গভীর সেখান থেকে বের হওয়া রক্ত শুকিয়ে দাগ হয়ে রয়েছে। তার প্রাণভোমরার এমন অবস্থা দেখে নীরবে চোখের জল ফেলল আর্ভিক।
তানভীর মুখের ওপর পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তারপর নিজের ওষ্ঠ জোড়া ছোঁয়ালো তার প্রণয়িনীর কপালে। এরপর তানভীর ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় আরো একবার প্রাণ ভরে দেখে নিল তার প্রণয়িনী কে।
রাত প্রায় সাড়ে ৭ টার দিকে জ্ঞান ফিরেছে তানভীর, আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে এখনো স্কুল ইউনিফর্মে রয়েছে সে। চেঞ্জ করার জন্য উঠতে নিলেই পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হয় তার। মুহূর্তের মধ্যেই মনে পড়ে গেল সকালের সেই ঘটনাটা। তানভী নিজের ক্ষতস্থানটা দেখার জন্য পা তুললে সে দেখতে পায় সেটা ব্যান্ডেজ করা রয়েছে। সে মনে মনে ভাবল
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ব্যান্ডেজ কে করলো ?”
তারপর অনেক কষ্টে উঠে কাবাড থেকে জামা কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হওয়ার জন্য। এদিকে রাত ৮ পর খেতে বসেছে সবাই, তানভী ধীর পায়ে নীচে নেমে এসে চেয়ার টেনে বসলো। তার বিপরীত চেয়ারেই আর্ভিক বসে আপন মনে খাচ্ছে, আর্ভিক কে দেখেই তানভীর হাত পা সব ভয়ে কাঁপাকাঁপি হচ্ছে। কারণ আজকের স্কুলের টেস্টটা দেয়নি। সে যদি জানত যে আর্ভিক এখন থাকবে তাহলে সে কোনো মতেই এখন খেতে আসত না। এর মধ্যে আর্ভিকের মা তানভীর খাবার নিয়ে এলেন। তানভী খুব দ্রুততার সঙ্গে খাবার খেতে লাগল, একপ্রকার যেন নাকে-মুখে গিলছে। সে চায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খাবার শেষ করে চলে যাওয়া। আর্ভিক ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকাল তানভীর দিকে, তারপর কপাল কুঁচকে কন্ঠস্বর দ্বিগুণ গম্ভীর করে বলল
-“তুলে না এক আছাড় দেবো। এভাবে খাচ্ছিস কেন ? কী সমস্যা তোর ?”
তানভীর দৃষ্টি প্লেটের দিকে নিঃশ্বাস আটকে গেছে তার, সারাশরীরের কম্পনের মাত্রা তীব্র হল,ধমক খেয়ে চোখ টলমল করছে তার। মনে মনে ভাবল
“আমাকে আছাড় মারার এত ইচ্ছা আর্ভিক ভাইয়ের।”
অভিক সাহেব আর্ভিকের উপর কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন
-“আর্ভিক! এসব কি ধরনের কথাবার্তা তোমার!? ”
আর্ভিক কিছু একটা বলতে গিয়েও কথাটা গিলে ফেলল। তানভী নিজেকে স্বাভাবিক করে কিছুটা সাহস যুগিয়ে আর্ভিক কে বলল
-“আর্ভিক ভাই… আপনি কি বিদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি ধোপার কাজ করতেন ?”
তানভীর কথায় আর্ভিক কপাল কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল
-“কেন?”
তানভী ভয়ে ভয়ে বলল
-“না মানে… আসলে আপনার আমাকে এত আছাড় মারার প্রবণতা দেখেই মনে হল”
তানভীর কথায় উপস্থিত সবাই হেসে ফেললেন। আর্ভিক চোখ বড় বড় করে তানভীর দিকে তাকিয়ে বলল
-“কী! এই দাঁড়া তোর হচ্ছে। এমন আছাড় দেব না ১ বছরেও বিছানা থেকে উঠতে পারবি না।”
আর্ভিকের কথা শুনে তানভী ভয়ে আঁতকে উঠে খাবার টেবিল ছেড়ে হাত ধুয়ে দৌড় দিল। কিন্তু পায়ে ক্ষত থাকার দরুন সে ঠিক মতো দৌড়াতে পারল না। অনেক কষ্টে রুমে এসে সোজা শুয়ে পড়ল। তারপর তার মায়ের সাথে কথা বলার জন্য ফোনটা খুঁজতে লাগল। হঠাৎ তার মনে পড়ে যে ফোনটা সকালে হাত থেকে পড়ে গিয়ে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কি আর করার তাই সে মন খারাপ চুপচাপ করে ঘুমিয়ে পড়ল।
আজ মঙ্গলবার, সকাল সকাল আর্ভিক ঘুম থেকে উঠে স্নান করে প্রতিদিনের মতো বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে থাকা একটা মহাদেবের মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়ে এসেছে। তানভী আজকে স্কুলে যাবে না, কোচিং ছিল কিন্তু আজকে যাবে না। তাই ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে পড়ার টেবিলে বসে আছে। সামনের মাসেই পরীক্ষা তাই সারাদিনের একটা রুটিন করে নিল তানভী।
সকাল ৯টার পর সবাই ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে। এর মধ্যে আর্ভিক মন্দির থেকে ফিরে অফিসের জন্য রেডি হয়ে একেবারে নেমেছে। তারপর খেতে বসে অভিক সাহেব কে বলল
-“বাবা আমাকে কদিনের জন্য একটু বিদেশে যেতে হবে।”
আর্ভিকের কথাটা উপস্থিত সকলের মনোযোগ কাড়লো।অভিক সাহেব একটু চিন্তিত হয়ে বললেন
-“কেন?”
আর্ভিক স্বভাব সুলভ গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিল
-“আমাদের বিদেশের কোম্পানির ব্রাঞ্চে একটা সমস্যা হয়েছে, সেটা সমাধানের জন্য আমায় যেতে হবে।”
অভিক সাহেব বললেন
-“আচ্ছা! কোনো দরকার হলে আমায় জানিও।”
আর্ভিক মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। তারপর সকলে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। কিছুক্ষণ পর অভিক সাহেব খাওয়া শেষ করে উঠে গেলেন হাত ধুতে। টেবিলে তখন আর্ভিক, ঋষি আর তানভী ছিল। তানভী প্রফুল্ল মেজাজে আর্ভিককে জিজ্ঞেস করে
-“আর্ভিক ভাই কবে যাবেন আপনি ?”
তানভীর কথায় আর্ভিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে তারপর বলে
-“আমার যাওয়া নিয়ে দেখি আমার থেকে বেশি তোর তাড়া। সামনে পরীক্ষা খাওয়া শেষ করে পড়তে বস।”
আর্ভিকের এমন ঠান্ডা ধমকে মাথা নামিয়ে ফেলে তানভী। এরপর খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে রুমে চলে যায়। আর্ভিক তানভীর যাওয়ার পানে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে, আর্ভিক কে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকাতে দেখে ঋষি বলে
-“ভাইয়া তুমি টেনশন করো না আমি বোনু কে দেখে রাখব সবসময় আগলে রাখব। হয়তো তোমার মতো করে পারব না। কিন্তু তাও তোমার প্রনয়িনীর কিছু হতে দেবো না। তুমি সাবধানে নিশ্চিতে কাজ সম্পন্ন করে ফিরো।”
ঋষির কথায় আর্ভিক তার দিকে তাকিয়ে একটা ফ্যাকাশে হাসি দিল। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে খাওয়া আরম্ভ করল।
স্কুল ছুটির পর রিকি মেঘাদ্রির হাত ধরে টেনে একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে এল। মেঘাদ্রি একটু বিরক্তি নিয়ে বলল
-“রিকি!! এসবের মানে কি ? কেন আনলি আমাকে এখানে। আর হাত ছাড় আমার।”
এই বলে মেঘাদ্রি নিজের হাত একটানে ছাড়িয়ে নিল রিকির থেকে। রিকি রাগে কন্ঠ গম্ভীর করে বলল
-“কেন কথা বলবি ওই ছেলেটার সাথে এত হেসে হেসে ?”
মেঘাদ্রি কপাল কুঁচকে বলল
-“আমি কার সাথে কথা বলব কীভাবে বলব সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। তুই বলার কে ?”
মেঘাদ্রি এইরকম কথা শুনে রিকি প্রচন্ড রেগে গিয়ে মেঘাদ্রির হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরে। রিকি এতটাই জোড়ে চেপে ধরে ছিল যে মেঘাদ্রির হাত লাল বর্ণ ধারণ করেছে। মেঘাদ্রি অনেক কষ্টে হাত ছাড়িয়ে একটা জোরে থাপ্পর মারে রিকি কে তারপর বলে
-“Are you out of your mind, Ricky? কী করছিস এসব। ছাড় আমায়।”
রিকি মেঘাদ্রি কে ছেড়ে কিছুটা দূরে চলে গেল তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
-“Yes, I’m out of my mind for you মেঘাদ্রি। তোকে মনে করে প্ৰতিনিয়ত নিজেকে অস্থির করেছি
একনজর দেখার জন্য চোখকে কত অপেক্ষা করিয়েছি।
জানি তুই আমাকে শুধুই বেস্ট ফ্রেন্ড মানিস কিন্তু বিশ্বাস কর আমি তোকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। I love you very much মেঘাদ্রি।”
শেষের কথাগুলো বলার সময় রিকির কন্ঠস্বর কেঁপে উঠল। মেঘাদ্রি বিস্ফারিত নয়নে চেয়ে রইলো রিকির পানে। রিকির দুই চোখে জল টলমল করছে। মেঘাদ্রি সেসবের পাত্তা না দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে গম্ভীর কণ্ঠে রিকিকে বলল
-“আমি তোর থেকে এটা আশা করিনি রিকি। তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু, আর শেষে তুই কিনা…. তোর আর আমার মধ্যে সব বন্ধুত্ব আজ এখনই এই মুহূর্তে শেষ।”
এই বলে মেঘাদ্রি বড় বড় পা ফেলে চলে গেল সেই জায়গা থেকে। আর রিকি বোকার মত চেয়ে রইল মেঘাদ্রির যাওয়ার পানে।
বর্ষাকাল প্রকৃতির এক মায়াবীর রূপ। বর্ষণের ধারা যেন ধরনীর তৃষ্ণা মিটিয়ে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন নিয়ে আসে। এমন বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় তানভী জানালার পাশে বসে প্রকৃতির এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করছে। হঠাৎ রুমে কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে তাকালো সেদিকে। তাকিয়ে দেখে আর্ভিক দাঁড়িয়ে আছে। আর্ভিক তানভীকে ডাকল, তানভী গিয়ে আর্ভিকের সামনে দাঁড়ায়। এরপর আর্ভিক তানভীর হাতে একটা নতুন iPhone ও কোচিংয়ের নোটস গুলো দিয়ে বলে
-“কোচিং এর নোটস গুলো মুখস্থ করে রেডি করে রাখ। আর এই ফোনটাতে তোর প্রয়োজনীয় সব Apps আর নম্বর সেভ করা আছে। আর কাল থেকে স্কুলে যেতে হবে না বাড়িতে ভালো করে পড়। কোন অসুবিধা হলে আমাকে জানাবি।”
তানভী হ্যাঁ সূচক মাথা দোলানো। আর্ভিক রুম থেকে বের হয়ে গেল।
কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। সময় যেন বয়ে চলেছে স্রোতের গতিতে। আজ থেকে তানভীর স্কুলের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৭টা ছুঁই ছুঁই তানভী সেই কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে সব পড়াগুলো রিভিশন করছে। তার প্রচন্ড টেনশন হচ্ছে আজ। সে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে দেখল। ঘড়ির কাঁটা যেন এক প্রকার দৌড়াচ্ছে। তারপর পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে রেডি হতে গেলে।
নিচে সোফায় অভিক সাহেব বসে চা খাচ্ছেন। রাখী রায়চৌধুরী রান্নাঘরে রান্না করছেন, ঋষি খাবার টেবিলে বসে ফোনে নোটস দেখছে কারণ আজকে তারও ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা আছে। সব পরীক্ষা শেষ শুধুমাত্র দুটো হলেই হয়ে যাবে। এমন সময় তানভী রেডি হয়ে নিচে এলো। এসে আগে ঠাকুর ঘরে গিয়ে ঠাকুরকে প্রণাম করলো। তারপর ধীর পায়ে অভিক সাহেবের কাছে এসে ওনাকে প্রনাম করল। অভিক সাহেব তানভীর মাথায় হাত রেখে হাসিমুখে বললেন
-“খুব ভালো করে পরীক্ষা দিও মামনি।”
তানভী মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে চলে গেল ওর বড়মার কাছে। রাখী রায়চৌধুরী উল্টো দিকে ঘুরে রান্না করছিলেন। তানভী চুপচাপ গিয়ে ওনাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। রাখী রায়চৌধুরী তানভীর স্পর্শ বুঝতে পেরে মুচকি হেসে তানভীর দুই বাহু ধরে নিজের সামনে নিয়ে আসেন। এরপর তানভী ওনাকে প্রনাম করল। রাখী রায়চৌধুরী তানভীর মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন। তারপর প্রফুল্ল মেজাজে বললেন
-“ভালো করে পরীক্ষা দিস সোনা”
এরপর স্বাভাবিক কন্ঠে তানভী কে জিজ্ঞেস করেন
-“ঠাকুর কে প্রনাম করছিস ?”
তানভী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। রাখী রায়চৌধুরী বললেন
-“আচ্ছা বেশ, যা গিয়ে বস আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
তারপর তানভী সেখান থেকে বের হয়ে আসে। ততক্ষণে আর্ভিকও অফিসের জন্য রেডি হয়ে নেমেছে । আর্ভিক এসে চেয়ার টেনে বসতে নিলে তানভী তাড়াতাড়ি করে এসে আর্ভিকের সামনে দাঁড়ায়। আর্ভিক কপাল কুঁচকে কিছু একটা তাকে বলতে যাবে তখনই তানভী ঝুঁকে নিজের দুহাত বাড়িয়ে আর্ভিক কে প্রনাম করতে যায়। আর্ভিক তৎক্ষণাৎ তার হাত ধরে ফেলে কন্ঠ তিনগুণ ভারী করে বলে
-“এসব আমার পছন্দ নয়। Next time থেকে আমার সাথে এসব করতে আসবি না।”
আর্ভিকের কথায় তানভীর বেশ খারাপ লাগল। সে তো শুধুই প্রনাম করতে এসেছিল তাও এইরকম করল তার সাথে। তানভী চিবুক নামিয়ে ঋষির কাছে গেল। তাকে দেখে ঋষি বলে
-“আমাকে প্রনাম করতে হবে না বোনু। ভালো করে পরীক্ষা দিস তাহলেই হবে।”
এরমধ্যে অভিক সাহেব খাওয়ার টেবিলে উপস্থিত হলেন। রাখী রায়চৌধুরী সবাই কে খাবার পরিবেশন করতে লাগলেন। তানভী মাথা নিচু করে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। দৃষ্টি তার সম্পূর্ণ প্লেটে। একবার ও দৃষ্টি তুলে তাকাল না। কারণ তার বিপরীত চেয়ারে আর্ভিক বসে রয়েছে। তানভী চায় না তার সাথে আর্ভিকের চোখাচোখি হোক। এদিকে আর্ভিক নিষ্পলক ভাবে তানভীর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছে
“ক্ষমা করিস আমায় ব্লু বার্ড। আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি। আর কখনও ভবিষ্যতে আমর পা ছুঁতে আসবি না। তোর স্থান আমার পায়ে নয়, তোর স্থান সর্বদা আমার বুকের বাম পাশে।”
আর্ভিক মনে মনে এসব বলছিল তখনই তানভী খাবারের প্লেট থেকে মুখ তুলে তাকালো মুহুর্তেই চোখাচোখি হল দুজনের। তানভীর সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি নামিয়ে নিল, আর্ভিক তখনও নিষ্পলক তাকিয়ে রইল তানভীর দিকে। তারপর স্বাভাবিক হয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
পরীক্ষা শুরু হতে এখনও ১০ মিনিট বাকি আছে। তানভী আর রিকি বাইরে মেঘাদ্রির জন্য অপেক্ষা করছে। ৫ মিনিট পর মেঘাদ্রি এল সেখানে, তারপর তানভীকে বলে
-“চল, না হলে দেরি হয়ে যাবে।”
এরপর ওরা তিনজনে চলে যায় পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষার শেষে তানভী একটা জিনিস খেয়াল করে যে, মেঘাদ্রি আর রিকি দুজনেই চুপচাপ আছে মেঘাদ্রি মাঝে মধ্যে তানভীর সাথে বললেও রিকির সাথে কোনো কথা বলছে না। আর রিকি একদম চুপচাপ হয়ে আছে। তানভী ভাবে হয়ত পরীক্ষার জন্য চিন্তায় আছে। তাই সে কিছু বলল না।
মাঝখানে কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। কাল তানভীর শেষ পরীক্ষা যেটা অ্যাকাউন্টস্ এর। ঘড়িতে তখন রাত ১০ টা বাজে। তানভীর দুটো অঙ্ক বুঝতে একটু সমস্যা হচ্ছে। তাই সে বিরক্ত হয়ে বলে
-“উফ্! এই অঙ্ক দুটো… পুরো আর্ভিক ভাইয়ের মতো। কিছুতেই বুঝতে পারছি না।”
তানভী অঙ্ক দুটোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে
“আর্ভিক ভাই বলেছিলেন যে কোনো কিছু সমস্যা হলে ওনার কাছে যেতে….. কিন্তু…এত রাতে যাওয়াটা কি ঠিক হবে..!! আবার না গেলে অঙ্কগুলো করব কি করে।”
এত কিছু ভাবতে ভাবতে তানভী রুম থেকে বের হয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়েছে আর্ভিক ভাইয়ের রুমের দিকে। রাত তখন ১০.৩০ এর উপরে। ড্রয়িং রুমে একটা হালকা আলোর বাল্ব জ্বলছে, পুরো বাড়ি অন্ধকার। তানভী আর্ভিরের রুমের সামনে দাঁড়ালো। দরজা চাপানো, আস্তে করে ধাক্কা দিলো তানভী। চেক করতে চাইছিলো খোলা কি বন্ধ। তানভীর হালকা ধাক্কাতেই খুলে গেলো দরজা। কিছুটা ঘাবড়ে গেল তানভী। আস্তে করে উঁকি দিলো রুমে। রুমের বেলকানিতে বাল্ব জ্বলছে। সেটার আলো রুমে আসছে। মোটামুটি আলোকিত হয়ে আছে রুমটা। আর্ভিককে রুমে কোথাও দেখতে পেল না সে। বিছানা টানটান করে পাতানো। টেবিলে বই, কাগজপত্র এলোমেলো হয়ে আছে। তানভী মনে মনে ভাবছে,
“আর্ভিক ভাই কি রুমে নেই?”
তাই সে রুমের দরজা লাগিয়ে আবারো নিজের রুমের দিকে এগোতে গেল। এককদম এগোতেই আর্ভিকের রুম থেকে কানে ভেসে আসে গানের সুর। দাঁড়িয়ে পরলো তানভী, মনে মনে ভাবছে,
“গান কে গাইছে, আর্ভিক ভাই?”
আবারও ঘুরে এগিয়ে গেলো আর্ভিকের রুমের দিকে। তানভী ধীর পায়ে আর্ভিকের রুমে প্রবেশ করল। শব্দটা আর্ভিকের বেলকানি থেকে আসছে। তানভী সেদিকে এগিয়ে গেল। তানভী দেখল আর্ভিক গান করছে।
“আমার দেহ-মাঝে মিশে যাও না তুমি
একই দেহ নিয়ে রবো তুমি আমি
আমার দেহ-মাঝে মিশে যাও না তুমি
একই দেহ নিয়ে রবো তুমি আমি
তুমি দূরে গেলে, ও বন্ধু আমার
ফুলের মতই যাবো যে ঝরে
আমায় দুনিয়া থেকে চুরি করে
তোমার বুকের ভেতর রাখো ভরে
যেন কেউ জানে না আমি কোথায় আছি
এমন আপন করে নাও মোরে”
তানভী উদ্বিগ্ন নয়নে তাকিয়ে আছে আর্ভিক ভাইয়ের দিকে। হঠাৎ করেই আর্ভিক গান থামিয়ে তাকাল তানভীর দিকে। তানভী চমকে উঠল। আর্ভিক তানভীকে বলে
-“এত রাতে এখানে, কিছু হয়েছে?”
তানভী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। আর্ভিক বিস্মিত কন্ঠে বলল
-“কি হয়েছে?”
তানভী মাথা নিচু করে আস্তে ধীরে বলল
-“দুটো অঙ্ক বুঝতে সমস্যা হচ্ছে, বুঝিয়ে দেবেন?”
আর্ভিক ঠাট্টার স্বরে শুধাল
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ১৭+১৮
-“সারাদিন কি ঘোড়ার ঘাস কাটছিলি! যে এখন এত রাতে অঙ্ক বুঝতে এসেছিস”
আর্ভিকের এমন কথায় তানভী আহম্মকের মতো তাকিয়ে রইল। তারপর আবদারী কন্ঠে বলল
-“দিন না বুঝিয়ে প্লিজ”
আর্ভিক সহসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলো
-“যা গিয়ে রুমে লাইট জ্বালিয়ে বস! আমি আসছি।”
