Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৫

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৫

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৫
jannatul firdaus mithila

❝ হ্যালো স্যার? শুনতে পাচ্ছেন?❞
ঘুম ঘুম চোখদুটোকে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে কোনোরকমে ডলছেন তায়েফ সাহেব।ধীরেসুস্থে কদম ফেলে চলে এলেন বারান্দায়।দখিনা হাওয়া বইছে চারপাশে। শীত আসতে আর খুব বেশি দেরি নেই! পূব গগনে সূর্য উঠলেও তার তেজ যেন গায়ে না লাগবারই যোগাড়! সদ্য ঘুম ভাঙা তায়েফ সাহেব মুখের সামনে হাত ঠেকিয়ে টানলেন এক বিরাট লম্বা হামি।ফোনের ওপাশ থেকে তখনও চেঁচিয়ে যাচ্ছে এসআই রাজন।তায়েফ সাহেব সময় নিলেন।খানিকটা স্থির হয়ে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললেন,

“ কী হয়েছে? এতো সকাল সকাল কল দিলে যে?”
রাজন সাহেব ব্যাপক সিরিয়াস এমুহূর্তে। তিনি তক্ষুনি ব্যস্ত ভঙ্গিতে জবাব দিলেন,
“ স্যার! আপনি গতমাসে কমলাপুর কাস্টম হাউসে রেইড মেরে যে-ই ৫০টা কনটেইনার জব্দ করেছিলেন, তার রিপোর্ট চলে এসেছে।”
মুহুর্তেই চোখ থেকে সকল তন্দ্রা কেঁটে গেলো তায়েফ সাহেবের। চোখে দেখা মিললো এক অদ্ভুত দীপ্তির।মানুষটা কেমন ফটাফট বলে ওঠেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ এই তুমি দাঁড়াও ঐখানে! আমি আধঘন্টার মধ্যে আসছি।”
বলেই তিনি কল কাটলেন।ব্যস্ত ভঙ্গিতে তৎক্ষনাৎ ছুটলেন ওয়াশরুমে।সে-ই মাসখানেক আগে কমলাপুর কাস্টম হাউসে রেইড বসিয়েছিলেন তায়েফ সাহেব। জব্দ করেছিলেন ভিনদেশ থেকে আগত ৫০টি কনটেইনার। কেন যেন সে সময় কনটেইনার গুলো দেখে ব্যাপক সন্দেহ জাগে তায়েফ সাহেবের।তবে সেসব কনটেইনার খুলে দেখার পারমিশন তখনও পাননি তিনি। আজ এতগুলো দিন পর অবশেষে পারমিট ম্যানেজ করতে পারলেন তবে!এ নিয়ে চোখমুখ কেমন চকচক করছে মানুষটার!

ব্যাগপত্র গোছাচ্ছে রৌদ্র। অরিন তৈরি হচ্ছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। মেয়েটার সম্পূর্ণ মুখাবয়ব জুড়ে একরাশ অন্ধকার বিরাজমান! তবে তা কেন? কে জানে! রৌদ্র হাতের কাজকারবার শেষ করে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে ফিরে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় চোখ রেখে গভীর দৃষ্টি ফেললো অরিনের আঁধারে নিমজ্জিত মুখপানে। খানিকটা ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলে সে ধীর-কদমে এগিয়ে আসে অরিনের নিকট। পেছন থেকে দু’হাত দিয়ে অরিনের পাতলা কোমর চেপে ধরে মুখ নামিয়ে রাখলো মেয়েটার কাঁধে। গলায় কেমন সুর টেনে টেনে বলল,

“ কী হয়েছে হানি?”
অরিন ঠোঁট উল্টায়। হিজাবের পিন দুটো হাতে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয় নিজ জায়গায়। খানিকটা নাক টেনে বলে,
“ কী লাভ এতোবার হানিমুনে গিয়ে? যেখানে একটা বাবু এখন অব্ধি পেলাম না আমি!”
মেয়েটার এহেন ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলা দুঃখের কথা শুনে রৌদ্রের নিশ্চয়ই একটুখানি দুঃখ পাওয়া উচিত ছিল! তবে বালাইষাট! ছেলেটা কেমন ঘরশত্রু বিভীষণের ন্যায় আচমকাই ফিক করে হেসে ওঠে। তা শুনে অরিনের বুকটা বুঝি এই খানখান হয়ে গেলো! মেয়েটা তৎক্ষনাৎ এক ঝটকায় রৌদ্রের হাতদুটো সরিয়ে দেয় নিজ কোমর হতে। চোখেমুখে একপ্রকার আগুন লেপ্টে, তাকায় রৌদ্রের পানে। রৌদ্র ভড়কায়।তৎক্ষনাৎ তর্জনী উঁচিয়ে ঠোঁটের ওপর ঠেকায়। এতে ছেলেটার হাসি থামা তো দূর উল্টো বেড়ে গেলো দ্বিগুণ! অরিন এবার তেতে উঠে। কোমরের দু’ধারে হাত রেখে কটমটিয়ে বলে,

“ এখানে হাসার কী হলো?”
রৌদ্র থামলো। নিজের উপচে পড়া হাসিগুলোকে বহুকষ্টে গিলে নিয়ে নিজেকে সামলালো কোনরকমে। মেয়েটার পানে ক্ষুদ্র চোখে তাকিয়ে থেকে মিনমিনে স্বরে বলল,
“ ইয়ে মানে… না তেমন কিছু না।”
অরিন নাক ফুলিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। আগুন চোখদুটো দিয়ে এই বুঝি ঝলসে দিবে রৌদ্রকে।রৌদ্র পেছায় দু-কদম। হুট করেই বিছানার সঙ্গে পা লেগে গিয়ে বেচারা ধুম করে বসে পড়লো বিছানায়। অরিন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। চোয়াল শক্ত করে যেইনা কিছু বলতে যাবে ওমনি রৌদ্র কেমন চমৎকার হাসলো।মেয়েটার আদুরে মুখপানে গভীর চোখে তাকিয়ে থেকে দুষ্ট কন্ঠে বলে ওঠে,

“ সুন্দরীদের এতো রাগ করতে নেই মেয়ে! আদর পায় তো।”
অরিন মুখ বাঁকায়। বুকের কাছে দু’হাত বেঁধে নাক ফোলায় সামান্য। রৌদ্র স্মিত হাসলো।অভিমানীনির রাগ ভাঙাতে নিজ থেকে খানিকটা এগিয়ে এসে আলতো করে মেয়েটাকে টেনে আনে নিজের কাছে। দু’হাতে অরিনকে চেপে ধরে বসালো নিজের বা পায়ের-উরুর ওপর। অরিন বসলো, গাল ফুলিয়ে রাখলো তখনও। রৌদ্র কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার ফোলা ফোলা গালদুটোর দিকে। গালের চামড়ায় রং বসেছে যেন, তাও আবার পাকাঁ টমেটোর রঙ! রৌদ্রের বড্ড লোভ লাগলো তা দেখে। আচমকাই নিজের লোভের তাড়নায় পড়ে ছেলেটা কেমন আলতো করে দাঁত বসিয়ে দিলো মেয়েটার গালদুটোর চামড়ায়। অরিন চোখমুখ কুঁচকে বসে। বসা ছেড়ে উঠতে নিলেই রৌদ্র আঁকড়ে ধরে তার কোমর। মেয়েটার গাল থেকে নাক ঘষতে ঘষতে মুখ নামিয়ে আনলো কান বরাবর। হিসহিসিয়ে বলল,

“ এতো তারাতাড়ি রাগ কমাস না সানশাইন! আমাকে আরেকটু রাগ ভাঙাতে দে!”
হতবাক অরিন! বোকার ন্যায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো কেমন। এদিকে রৌদ্রের কর্মকান্ড গভীর হচ্ছে! তাতো হবারই কথা।ভীষণ মাত্রার ধৈর্য্যশীল ডাক্তার সাহেব, বউকে একটুখানি কাছে পেলেই একটু-আধটু পা পিছলে পড়েন আরকি! এ আর এমন কী? অরিন নড়চড় বাড়ায় এবার।দু’হাতে রৌদ্রের বুক বরাবর ঠেলতে লাগলেই রৌদ্র করে বসে আরেক কান্ড! মেয়েটাকে নিয়েই আচমকা গা এলিয়ে দিলো টানটান করে গুছিয়ে রাখা বিছানার চাদরে।পরমুহূর্তেই চোখের পলকে মেয়েটার ওপর ঝুঁকে আসে বেহায়া ছেলে। অরিন ভড়কায়। হতবিহ্বলের ন্যায় তাকিয়ে থাকে রৌদ্রের দিকে। রৌদ্র কেমন ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে। অরিন ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে। নিজেকে রৌদ্রের ওমন হুটহাট পাগলামিতে মানিয়ে নিয়ে চুপচাপ গলা জড়িয়ে ধরে ছেলেটার। মুচকি হেসে বলতে লাগলো,

“ এতো পাগলামি করো কেনো তুমি?”
রৌদ্র হাসলো নিঃশব্দে। মেয়েটার কপাল বরাবর আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
“ এমনিই!”
অরিন মুগ্ধ চোখে তাকায় এবার।আচমকাই ফের বলে ওঠে,
“ আমায় ভালোবাসো?”
রৌদ্রের দৃষ্টি স্থির। কন্ঠে কোনোরূপ ভনিতা ছাড়াই প্রতিত্তোর করে,
“ হয়তো!”
মুহুর্তেই কপালে ভাজঁ পড়লো অরিনের। হয়তো? তাকে ভালোবাসে কি-না তার প্রতিত্তোরে হয়তো আবার কেমন কথা? অরিন কেমন কাঠকাঠ কন্ঠে জানতে চায়,

“ হয়তো? এটা আবার কেমন কথা? কিসের কথা? কোথাকার কথা?”
পরপর এতগুলো প্রশ্নে মোটেও হেলদোল নেই রৌদ্রের। উল্টো তার দৃষ্টি গভীর হচ্ছে ধীরে ধীরে। এদিকে কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের জবাব না পেয়ে মুখ থমথমে হয়ে এলো অরিনের। গলায় ঝাঁঝ ঢেলে সে আবারও বলে,
“ উত্তর দিচ্ছো না যে!”
রৌদ্র নিশ্চুপ! তার নিশ্বাসের গতি তীব্র হচ্ছে কেন যেন। চোখের পলকটাও তো পড়ছে না একটুও। তা দেখে অরিনের নাক ফুললো আবার। সে দু’হাতে রৌদ্রকে নিজের ওপর থেকে ঠেলে দিতে দিতে কর্কশ গলায় বললো,
“ সরো আমার ওপর থেকে!”
রৌদ্র ঠোঁট কামড়ে হাসলো এবার।এক ভ্রু উঁচিয়ে শান্ত কন্ঠে প্রতিত্তোরে বললো,

“ যদি না সরি?”
অরিনের রাগ বাড়ছে তরতর করে। নাকের পাটা ফুলে একাকার অবস্থা! রৌদ্রের বেশ লাগছে তা দেখতে। অরিন তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে বলে ওঠে,
“ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিবো!”
কথাটা বলতে দেরি, রৌদ্রের ঝুঁকে আসতে দেরি নেই! সে কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মেয়েটার পানে। মুখ নামিয়ে এনেছে অরিনের মুখ বরাবর। ঠোঁটের সনে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কিটোনে তক্ষুনি বলল,
“ সাহস থাকলে জাস্ট একটাবার ধাক্কা দিয়ে দেখ সানশাইন! আই সয়্যার,তুই যতটুকু দূরে সরাবি,পরমুহুর্তেই তারচেয়ে ঠিক দ্বিগুণ কাছে চলে আসবো তোর।”
অরিন ভাষা হারিয়েছে এমুহূর্তে। চোখদুটো কেমন স্থির হয়ে গেলো আপনাআপনি। মনে লেগে গেলো ঘোর! এক অনিয়ন্ত্রিত ঘোর!

একহাতে বিশাল বড় চাবির গোছা নিয়ে হন্তদন্ত পায়ে ছুটছেন এসআই রাজন।গন্তব্য কাস্টম গোডাউনে।সেথায় প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে দাঁড়িয়ে আছেন তায়েফ সাহেব।তা মনে পড়তেই কপালে ঘাম ছুটলো রাজন সাহেবের।এখন গেলেই বোধহয় স্যারের কাছে বেশ কড়া একটা ধমক খেতে হবে তার। কিয়তক্ষন বাদেই রাজন সাহেব এসে উপস্থিত হলেন গোডাউনের বাইরে। তার ঠিক দু’হাত সামনে পিঠ দেখিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তায়েফ সাহেব।গম্ভীর মুখো মানুষটা কোমরের পিঠে বেঁধে রেখেছেন দু’হাত। রাজন খানিক ঢোক গিললো। আমতা আমতা স্বরে পিছু ডাকলো,

“ স্যার!”
তায়েফ সাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। ভ্রু দ্বয়ের সংযোগস্থলে গোটাকতক ভাজঁ ফেলে দিলেন এক জোরালো ধমক!
“ এতক্ষণ লাগে আসতে? কি দিয়ে এসেছো? প্লেন দিয়ে নাকি হেলিকপ্টারে?”
যেমনটা ভেবেছিলেন তেমনটাই হলো বেচারা রাজনের সাথে। লোকটা কেমন কাচুমাচু ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মাথা নুইয়ে। তায়েফ সাহেব ঘাড় সোজা করলেন। গম্ভীর মুখে ফের ধমকে বললেন,
“ কনটেইনার গুলো খোলার কথাটা কী আলাদা নিমন্ত্রন পত্রে বলে পাঠাতে হবে?”

তৎক্ষনাৎ দু’ধারে মাথা নাড়ায় রাজন।ব্যস্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে চাবি দিয়ে খুলতে লাগলো প্রথম কনটেইনারটি। তবে বেশ পুরনো কনটেইনার হওয়ায়,চাবি গুলো কেমন কাজ করছেনা মনে হচ্ছে! বেচারা রাজন ভয়ে ভয়ে একবার স্যারের পানে তাকায়। পরক্ষণে তায়েফ সাহেবের কটমট দৃষ্টি দেখে সামান্য ঢোক গিলে আবারও মনোযোগ দেয় নিজের কাজে।কিন্তু নাহ! বহু চেষ্টার পরও কাজ কিছুতেই হচ্ছে না। এপর্যায়ে মেজাজ চটলো তায়েফ সাহেবের। মানুষটা কেমন শক্ত মুখে এগিয়ে এলেন কনটেইনারের সামনে। রাজন সাহেবকে আরেকদফা ধমক দিয়ে বললেন,
“ দেখি সরো! পুলিশে চাকরি করেও না-কি গায়ে জোর নেই তার! যত্তসব অকর্মার ঢেঁকি!”

রাজন সাহেবের মুখটা কেমন এইটুকুন হয়ে গেলো স্যারের আরেকদফা ধমক খেয়ে। আজ সকালে যে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলেন তিনি কে জানে! একবার যদি সে-ই অলুক্ষ্যণে মানুষটাকে হাতের কাছে পেতো তাহলেই হতো! এক্কেবারে রামধোলাই দিয়েই ছাড়তেন তিনি! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই নিজেকে শান্ত করলেন রাজন সাহেব। তক্ষুনি পা চালিয়ে সরে এলেন কনটেইনারের সামনে থেকে। তায়েফ সাহেব এগিয়ে এলেন এবার।চাবির গোছাটা হাতে নিয়ে, কনটেইনারের বড় তালার ভেতর বড় একখানা চাবি ঢুকিয়ে পরপর দুবার চাপ দিলেন কোনোরকম। ওমনি তালাটা কেমন খট করে শব্দ তুলে খুলে গেলো! পাশ থেকে রাজন সাহেব কেমন হা করে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। তার শরীরে কী তবে সত্যি জোর নেই?

তালা খোলা শেষ। তায়েফ সাহেব আলগোছে হাত বাড়িয়ে রাখলেন কনটেইনারের দরজায়।শরীরের সর্বশক্তি কাজে লাগিয়ে দিলেন এক ধাক্কা। মুহুর্তেই বিশালাকার কন্টেইনারের দরজাটা খ্যাচখ্যাচ শব্দ তুলে খুলে গেলো দুদিকে।পরক্ষণেই কনটেইনারের ভেতরকার পরিবেশ দেখে তায়েফ সাহেবসহ বাদবাকি কর্মকর্তারা থমকালেন। কেউ কেউ অবিশ্বাস্য নজরে তাকিয়ে আছেন হতভম্বের ন্যায়। পুরো কনটেইনার জুড়ে বিদেশি অস্ত্র,বু*লেট! তায়েফ সাহেব হা করে তাকিয়ে রইলেন কিয়তক্ষন। তার অবিশ্বাস্য কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে,

“ মাই গড!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাজন কেমন ভয়ার্ত ঢোক গিললো মনে হচ্ছে। বেচারা পা টিপে টিপে এগিয়ে আসেন তায়েফ সাহেবের একদম পেছনে। চাপা স্বরে বললেন,
“ স্যার! এখানে নিশ্চয়ই উর্ধতন কর্মকর্তাদের সাপোর্ট রয়েছে। নাহলে কোটি কোটি টাকার বেনামি অস্ত্র আমাদের দেশ হয়ে পাচার হতে যাবে কেনো?”
কথাটা মোটেও ভুল বলেননি রাজন সাহেব।তায়েফ সাহেবের বিচক্ষণ মস্তিষ্কেও কথাটা এসেছে ইতোমধ্যেই।তিনি তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। গলা উঁচিয়ে হুংকার ছুঁড়ে বাদবাকি কর্মকর্তাদের আদেশ দিয়ে বললেন,

“ এভরিবডি টেক পজিশন! রাজন সাহেব!”
রাজন সাহেব সটান হয়ে দাড়াঁন। বুক উঁচিয়ে কঠোর গলায় বলেন,
“ জ্বি স্যার!”
তায়েফ সাহেব গম্ভীর অথচ শক্ত গলায় বলতে লাগলেন,
“ সবকটা কনটেইনার চেক করুন। যত অবৈধ এবং বেনামি জিনিসপত্র পাবেন সবগুলো সিজ করুন। ইট’স এন অর্ডার!”
না চাইতেও অর্ডার ফলো করতে হবে রাজন সাহেবের।এ নিয়ে বুকে বড় কষ্ট থাকলেও মুখে একদম স্বাভাবিক তিনি। তায়েফ সাহেব গম্ভীর মুখে সেখান থেকে প্রস্থান করতে নিলেই আবার কী মনে করে পেছনে ফিরলেন।রাজন সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ ঐ ফাইলটা কোথায় যেটা আপনাকে আনতে বলেছিলাম?”
রাজন সাহেব তৎক্ষনাৎ ছুটে গেলেন অন্যত্র।ফিরে এলেন ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মাথায়। হাতে করে নিয়ে এলেন হলুদ রঙের বেশ মোটাতাজা একটা ফাইল।যার গায়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা একটা অপরিচিত কোড — ০৯Kj 8o. রাজন সাহেব কাঁপা কাঁপা হাতে ফাইলটা এগিয়ে দিলেন তায়েফ সাহেবের দিকে। তায়েফ সাহেব খপ করে টেনে ধরেন সে ফাইল। ব্যস্ত হাতে ফাইলটা খুলে নিয়ে দেখতে লাগলেন উল্টেপাল্টে। নাহ! শুরু থেকে শেষাবধি কোথাও এসব কনটেইনারের মালিকের নাম-পরিচয় নেই। তায়েফ সাহেব বেশ আশ্চর্য হলেন এহেন কান্ডে। নামহীন এসব কনটেইনার তাহলে এপ্রুভ করলো কে? তাও আবার কোটি কোটি টাকার অবৈধ অস্ত্র!

তায়েফ সাহেবের চোয়াল শক্ত হলো এবার।দৃষ্টি হলো কঠিন। তিনি তৎক্ষনাৎ ফাইলটাকে গোছাতে ব্যস্ত হতেই হুট করেই ভুলবশত ফাইলটা পড়ে গেলো জমিনে। এতে যেন মহাবিরক্ত হলেন গম্ভীর মুখো মানুষটা। বিরক্ত মুখে একহাঁটু গেঁড়ে বসলেন জমিনে। ফাইলটা গোছাতে গোছাতে হঠাৎ তার দৃষ্টি থমকালো একটা সফেদ রঙা ছোট কাগজের ওপর। যার গায়ে লাল কালি দিয়ে কী যেন একটা লিখে রাখা! তায়েফ সাহেব ভ্রু কুঁচকে হাত বাড়ালেন সেথায়।কাগজটা সম্মুখে এনে দেখলেন — কাগজের গায়ে কেমন গোটা গোটা অক্ষরে একটা গোপন কোড লিখে রাখা। ঠিক যেমনটা ফাইলের গায়ে লেখা ছিল। তায়েফ সাহেব একবার কাগজটার পানে চেয়ে থেকে আওড়ালেন,
“ ০৯Kj 8o! এটা আবার কিসের কোড?”

আইনমন্ত্রীর বাসভবনের চারপাশে বরাবরের ন্যায় মানুষের সমাগমটা খানিক বাড়তি থাকলেও আজ কেন যেন তেমন একটা নেই। এতে অবশ্য মাথা ঘামায়নি তায়েফ সাহেব। গম্ভীর মানুষটা কেমন শক্ত চোখেমুখে গটগট পায়ে রওনা হলেন আইনমন্ত্রীর বাসভবনে। ড্রাইভওয়ে পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোক দু’টো কেমন পথ আঁটকে দাঁড়ালেন তায়েফ সাহেবের। কর্কশ গলায় বলে ওঠে,

“ কে আপনে? কি চাই?”
তায়েফ সাহেব প্রতিত্তোর করলেন না।উল্টো পকেট থেকে নিজের ডিপার্টমেন্টাল আইডি কার্ডটা বের করে এনে এগিয়ে ধরলেন। লোক দু’টো সরু চোখে দেখলো একবার। পরমুহূর্তেই নড়েচড়ে দরজার কাছ থেকে সরে দাঁড়িয়ে বললেন,
“ আচ্ছা যান ভেতরে।”

অনুমতি পাওয়া মাত্রই ভেতরে ঢুকলেন তায়েফ সাহেব। গটগট পায়ে চলে এলেন লিভিং রুমে। সুসজ্জিত বাড়িটায় চারিদিকে আধুনিক কারুকাজের ছোঁয়া। বাড়ির প্রতিটি আসবাবপত্রেও রয়েছে আভিজাত্যের নিদর্শন। তায়েফ সাহেব দাঁড়িয়ে না থেকে বসে পড়লেন সাজিয়ে রাখা সোফার এককোণে। প্রায় মিনিট দশেক পর তার চলমান অপেক্ষার অবসান ঘটলো। পাতলা গায়ের গড়নের বয়স্ক আইনমন্ত্রী রয়েসয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন। তাকে দেখামাত্রই তায়েফ সাহেব দাঁড়িয়ে পড়েন। আইনমন্ত্রী ধীরেসুস্থে এসে দাঁড়ালেন লিভিং রুমে। তার পিছুপিছু লেজ নাড়াতে নাড়াতে চলে এলো তার পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট সিবলু। আইনমন্ত্রী এসেই আগে নিজের চোখের মোটা ফ্রেমের চশমাটা খানিক ঠিকঠাক করে নিয়ে বসলেন বড় সোফার নরম গদিতে। ঘাড় উঁচিয়ে তায়েফ সাহেবের পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, জোরপূর্বক হাসি দিয়ে বললেন,

“ আরেহ! এলাকার ডিসি যে।তা আজ হঠাৎ কী মনে করে?”
তায়েফ সাহেব সোজাসাপটা ভঙ্গিতে হাতের ফাইলটা উপুড় করে রাখলেন সামনের টেবিলটায়।অতঃপর ফের সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঠকাঠ কন্ঠে বলতে লাগলেন,
“ স্যার! কাস্টম হাউসে গতমাসে রেইড বসিয়েছিলাম।জব্দ করেছিলাম ৫০টি কনটেইনার। আজকে সেসব খোলার অনুমতি পেয়েছি বলে খুলতে গিয়ে দেখলাম..!”
থামলেন তায়েফ সাহেব। সামনে বসে থাকা আইনমন্ত্রীর তার দিকে তেমন পাত্তা নেই। তিনি একপ্রকার বেখেয়ালি আচরণ করতে ব্যস্ত। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের পিএকে আদেশ দিয়ে বললেন,

“ আমার কফিটা কই?”
পিএ মশাইও ভারি কাজের মানুষ। অন্যের বেলায় নয়,বরঞ্চ নিজের মালিকের বেলায়।তিনি তক্ষুনি পোষা প্রাণীর ন্যায় গলা উঁচিয়ে গৃহকর্মীকে ডেকে বললেন,
“ আমেনার মা! ঐ আমেনার মা? স্যারের কফি কই?”
ওপাশ থেকে আওয়াজ আসেনি তখনো। তবে কিয়তক্ষন বাদে একজন মধ্যবয়স্ক নারী হাতে এককাপ কফি নিয়ে চলে এসেছেন লিভিং রুমে। কফিটা বেশ রয়েসয়ে মন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে প্রস্থান ঘটালেন তক্ষুনি। এদিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে এসব নাটক হজম করছেন তায়েফ সাহেব। এতবড় জরুরী কথাটাও কেমন শুনতে নারাজ তারা! মন্ত্রী মশাই কফির কাপে চুমুক বসিয়ে পরক্ষণেই বললেন,

“ হ্যা বলুন এবার।কি যেন বলছিলেন তখন?”
তায়েফ সাহেব নাক ফুলিয়ে নিশ্বাস ছাড়লেন। শক্ত গলায় বলতে লাগলেন,
“ আজকে সেসব কনটেইনার চেক করে দেখলাম — সব বিদেশি অস্ত্র! যা কোনোটাই আমাদের দেশের নয়,এমনকি কোন দেশ থেকে এসেছে, কেনো এসেছে, কে পাঠিয়েছে, কে নিয়ে যাচ্ছে, এসবের কোনোরকম কাগজপত্র নেই! সবটাই চলছে বেনামি লেনদেনে।”
তায়েফ সাহেবের কথাটা শেষ হবার পূর্বেই মন্ত্রীর নাকেমুখে উঠে গেলো কেন যেন! বেচারা আধবুড়ো মানুষ, কাশতে কাশতে বুক চেপে ধরলেন তক্ষুনি। পাশ থেকে সিবলু এসে একাধারে পিঠ ডলতে লাগলো তার মনিবের। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর একটুখানি দম খিঁচলেন মন্ত্রী। হতবাক চোখে তায়েফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“ কোন কনটেইনার জব্দ করেছেন আপনি?”
তায়েফ সাহেব ভ্রু কুঁচকান।ঠোঁট উল্টে বলেন,
“ তাতো জানিনা স্যার।তবে এই ফাইলটায় সব ডিটেইলস লেখা আছে।”
মন্ত্রী মশাই একমুহূর্তও দেরি করলেন না। চটপট ভঙ্গিতে টেবিলের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলেন ফাইলটা। ব্যস্ত হাতে ফাইলটা সামান্য সোজা করতেই আচমকা নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো তার। সম্পূর্ণ বদনে ছেয়ে গেলো অনাকাঙ্ক্ষিত কম্পন। হাত থেকে অজান্তেই খসে পড়লো ফাইলখানা।চোখেমুখে তার লেপ্টে গেলো এক অজানা আতঙ্কের ছাপ। তার ভয়ার্ত দৃষ্টি এখনো তাক করে রাখা ফাইলের গায়ে লিখে রাখা কোডটার পানে।এদিকে মন্ত্রীর ওমন ভয়ানক ভাবসাব দেখে হতবুদ্ধির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছেন তায়েফ সাহেব। সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে যেইনা কিছু বলতে যাবেন ওমনি মন্ত্রী কেমন ভয়ে জবুথবু অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়েন বসা ছেড়ে। আতঙ্কিত গলায় তায়েফ সাহেবকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন,

“ এই শালা পাগল! তুই এডা কী করলি? ওরে মাঙ্গের পো… তুই কনটেইনার আটকাইলি? আল্লাহ গো… আমি বাড়ি! হায় হায় আমি এহন কি করি।কই যাবো? কই লুকাবো আমি।আল্লাহ গো! নিয়া নেও আমারে নিয়া নাও।”
ভুলভাল বকতে গিয়ে হঠাৎই সম্বিত ফিরল মন্ত্রীর।তৎক্ষনাৎ জিভে দাঁত কেটে নিজেকে শুধরে ফের বললেন,
“ এই না না! আল্লাহ আমারে এতো তারাতাড়ি নিয়ো না।নিলে ওদের নাও।”
তায়েফ সাহেব হতভম্ব।অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ এমন করছেন কেনো আপনি? কার কনটেইনারের ওগুলো?”
মন্ত্রী মশাই স্থির হলেন।চোখেমুখে একরাশ আতঙ্ক ছড়িয়ে বললেন,

“ তোর বাপের!”
চোয়াল শক্ত হলো তায়েফ সাহেবের। কটমট করে কিছু বলার উদ্দেশ্যে মুখটা খুলবেন তার আগেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন এক বিকট শব্দে। কান খাঁড়া করলেন তক্ষুনি। খুব কাছে কোথাও হেলিকপ্টার উড়ছে বোধহয়। না-কি এখানেই নামবে কি-না কে জানে! ওদিকে মন্ত্রী মশাইয়ের এপর্যায়ে হাঁটু কাঁপছে। লোকটা ভয়ে তটস্থ! আনমনে বিরবির করে বলতে লাগলেন,

“ আইসা পড়ছে রে!”
সিবলু তক্ষুনি ছুটলো বাড়ির বাইরে। হন্তদন্ত পায়ে ছুটতে গিয়ে দুয়েকবার হোঁচট খেতে গিয়েও সামলালো নিজেকে। তড়িঘড়ি করে বাড়ির সদর দরজার কাছে দাঁড়াতেই দেখলো — আকাশ কাপিয়ে এক হেলিকপ্টার বাসভবনের বা-দিকের হেলিপোর্টে নামবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সিবলু চোখেমুখে হাত ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। চারিদিকে উড়ছে ধূলাবালি। একদন্ড দাঁড়িয়ে থাকা দায় হলেও তার যে দেখতেই হবে কে এসেছে। সিবলু যখন চোখমুখ ঢাকতে ব্যস্ত ঠিক তখনি পাশ থেকে একজন চেঁচিয়ে বলতে লাগলো,
“ ভাই সামনে তাকান! দেখেন তারাতাড়ি!”
সিবলু চোখের ওপর আঙুল বেঁধেই খানিকটা চোখ খুলে।দেখে — বাড়ির বাইরে একসাথে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটা নামি-দামি কালো রঙা গাড়ি।কতগুলোর নাম তো ঠিকঠাক মতো উচ্চারণও করতে পারবেনা সে।তবে সেসবের চাইতেও অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে বাড়ির মূল গেট দিয়ে বিনা বাধায় ঢুকে পড়ছে একটা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। সিবলু চেঁচায়,

“ ঐ কিরে? এই গাড়ি ঢুকে কই?”
চেঁচানো কথাটা কানে গেলোনা কারোরই। যাবে কী করে? সামনে নামছে হেলিকপ্টার! তার আওয়াজের সামনে আর কারো আওয়াজ কানে যায়? প্রায় মিনিট পাঁচেক পর, হেলিপোর্টে নামলো হেলিকপ্টার। বিদেশি বেশ নামি-দামি হেলিকপ্টার! হেলিকপ্টারের পাখা নড়তে থাকা অবস্থাতেই হেলিকপ্টারের দরজা খুললো।কিয়তক্ষন বাদে হেলিকপ্টার থেকে বেশ ভাব নিয়ে নেমে আসে এক সুদর্শন যুবক। গায়ে তার কালো রঙা ট্রেঞ্চ কোট। যুবক নির্বিকার ভঙ্গিতে নেমে আসে সেখান থেকে। বাসভবনের মৃদু ঘাসের জমিনে পা ফেলে দাঁড়ায় বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে। একহাতে আলতো করে নিজের মেদহীন পেটের কাছের কোটের বাটনটা খুলে নিয়ে, বলিষ্ঠদেহী যুবক একহাত গুঁজল নিজের প্যান্টের পকেটে।চোখে আটাঁ কালো রঙা রোদচশমা, মাথার ওপরের সূর্যের তীর্যক রশ্মি এসে পড়ছে সুদর্শন যুবকের ফর্সা তীক্ষ্ণ চোয়ালে।

সিবলু ধীরে ধীরে চোখের ওপর থেকে হাত সরায়। অদূরের সুদর্শন বিদেশি যুবককে দেখে চোয়াল কেমন অজান্তেই ফাঁক হয়ে গেলো তার। এদিকে যুবক এবার বাঁকা হাসলো। ধীর কদমে এগিয়ে এলো বাড়ির দিকে। ওদিকে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও ততক্ষণে বাড়ির বাগানে এসে থেমেছে। যুবককে দেখামাত্রই গাড়ি থেকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে নেমে আসেন একজন। দ্রুত হাতে গাড়ির ওপর থেকে একটা মোটা পাইপ নিয়ে এগিয়ে আসে যুবকের নিকট। যুবক থামলো। ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি লেপ্টে রেখে আলগোছে হাত বাড়িয়ে চোখ থেকে সরিয়ে আনলো নিজের কালো রঙা রোদচশমাটা।মুহুর্তেই উম্মুক্ত হলো সুদর্শন যুবকের বাদামী চোখদুটো। সে বেশ ভাব নিয়ে চশমাটা নিজের বুকের কাছের খোলা শার্টের অংশে আটকায়।

পরমুহূর্তে পাশের বান্দার হাত থেকে ভারি পাইপটা তুলে নেয় নিজ হাতে। ওদিকে এমন দৃশ্য দেখামাত্রই গাড়িতে বসে থাকা আরেক লোক তক্ষুনি পাইপের লাইন অন করে দেয়। সাথে সাথে ভীষন বেগে পুরো বাসভবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো তরল। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সিবলুসহ বাদবাকি লোকগুলোও এহেন তরলের বেগ সইতে না পেরে ছিটকে পড়লো অন্যদিকে।বাড়ির ভেতরেও ঢুকছে এহেন তরল।যার বিকট গন্ধে নাক ধরে যাচ্ছে সকলের। আইনমন্ত্রী থরথর করে কাঁপছেন।মানুষটার পায়ের তল দিয়ে ছড়িয়ে গিয়েছে তরলের উপস্থিতি। তিনি কেমন সন্দেহাতীত ভাবে খানিকটা নুইয়ে, তরলে আঙুল ডোবালেন একটু করে। তারপর সে আঙুল নাকের সামনে এনে ধরতেই আঁতকে ওঠেন তিনি। ভয়ার্ত কন্ঠে আমতাআমতা করে বলে ওঠেন

“ পে-পেট্রোল!”
চমকে উঠেন তায়েফ সাহেব। ভয়ংকর চোখে তাকালেন হতভম্বের ন্যায়।এদিকে মন্ত্রী সাহেব ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে চেঁচাতে লাগলেন,
“ এই আমেনার মা! চুলা অফ কর! ঐ তোরা সবাই কারেন্টের লাইন অফ কর।তাগদা কর।”
সিবলুর সর্বাঙ্গ ভিজে নেয়ে একাকার অবস্থা। ছেলেটা কেমন মুখ কুঁচকে উঠে দাঁড়ায়।তবে কি মনে করে একবার নিজের গায়ে নাক ঠেকাতেই আঁতকে উঠল বেচারা। ভয়ার্ত কন্ঠে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে দেয়,
“ আল্লাহ গো! পেট্রোল!”

ভয়ে জড়সড় সকলে।প্রত্যেকেই আতঙ্কে ছোটাছুটি চালাচ্ছে এদিক-ওদিক। প্রায় মিনিট দশেক পর, যুবক থামলো।হাত থেকে মোটা পাইপটা নিচে ফেলে দাঁড়ালো সটান হয়ে। অতঃপর নিজের প্যান্টের পকেট থেকে হাত বাড়িয়ে বের করে আনে সে-ই অতিপরিচিত — মোটা সিগার। ঠোঁটে গুঁজল সময় নিয়ে। অন্য পকেট থেকে লাইটার বের করে আনতেই চিৎকার দিয়ে ওঠে ওপাশের লোকজন। ভয়ার্ত আর্তনাদে ফেটে পড়ে সকলে।যুবক ক্রুর হাসলো। বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে, আলতো করে আগুন ধরালো সিগারের আগায়। ইতোমধ্যেই পুরো বাসভবন ঘেরাও করেছে যুবকের সশস্ত্র বাহিনীর বডিগার্ড। যুবক বেশ বড়সড় একটা টান বসায় সিগারের শেষ প্রান্তে। ঠোঁট গোল করে ধোঁয়া ছেড়ে কদম বাড়ায় বাড়ির দিকে। তার হাতের লাইটার এখনো জ্বলছে।তা দেখে বুক কাঁপছে সকলের। যুবক ধীরে ধীরে চলে গেলো বাড়ির ভেতরে। সম্মুখ দুয়ারে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে একবার চোখ রাখলো লিভিং রুমে। সেথায় তায়েফ সাহেবকে শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাঁকা হাসলো যুবক।গটগট পায়ে চলে এলো লিভিং এ।

মন্ত্রী সাহেবের এবার মৃত্যুর ভয়ে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক হবে। মানুষটা কেমন আতঙ্কিত হয়ে গেলো যুবককে দেখে। ভয়ার্ত ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
“ স্যার! স্যার!”
চমকে তাকান তায়েফ সাহেব। ওমন একটা হাঁটুর বয়সী ছেলেকে স্যার বলে সম্বোধন করা হচ্ছে কেনো? তায়েফ সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকান এবার। এতে অবশ্য সুদর্শন যুবক ওরফে মির্জা সায়ান মুগ্ধের তেমন হেলদোল নেই। সে কেমন নির্বিকার ভঙ্গিতে এসে বসলো বড় সোফায়।তাও আবার পায়ের ওপর পা তুলে।ঠোঁটের কোণে জ্বলছে সিগার। আইনমন্ত্রী আর সময় নষ্ট করলেন না।তক্ষুনি ছুটে এসে বসলেন যুবকের পায়ের ধারে। তা দেখামাত্রই পায়ের তালু জ্বলে ওঠে তায়েফ সাহেবের।কি হচ্ছেটা কী এসব! তাই যেন ভাবছেন তিনি।
এদিকে মুগ্ধ এবার মুখ খুলে।গম্ভীর মুখে ঘাড়টা খানিক এদিক ওদিক নাড়িয়ে বলে,

“ শুনলাম! কে না-কি আমার কনটেইনার আঁটকিয়েছে।”
বুক কেঁপে ওঠে মন্ত্রীর। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে পা চেপে ধরে মুগ্ধের।আমতা আমতা করে বলে,
“ স্যার আমি না! ঐ যে, ঐ বেয়াদব দাঁড়ায় আছে।ওয় করছে।”
মুগ্ধের দৃষ্টি উঠলো ওপরে। ঠোঁটে খেললো রহস্যময় হাসির ছাপ।সে কেমন শান্ত কন্ঠে তায়েফ সাহেবকে বলল,
“ দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? বসে পড়ুন।শত হলেও বয়স হয়েছে, হাঁটুতে ব্যাথা থাকবে নিশ্চয়ই!”
তায়েফ সাহেবের চোয়াল শক্ত। গলায় ঝাঁঝ ঢেলে তিনি পরক্ষণেই বলে ওঠেন,
“ এতোটাও দূর্বল হয়ে যাইনি এখনো!”
মুগ্ধ মাথা নাড়ায়। বাঁকা হেসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তায়েফ সাহেবের দিকে। অতঃপর রহস্যময় কন্ঠে বলে,

“ এতোদিন নাহলেও খুব শীঘ্রই হবেন!”
ভ্রু গোটায় তায়েফ সাহেব। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ছুড়লেন,
“ মানে? কি বলতে চাও তুমি?”
এবারেও রহস্যময় হাসলো মুগ্ধ। সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ালো বসা ছেড়ে। দু-কদম এগিয়ে এসে দাঁড়ালো তায়েফ সাহেবের মুখোমুখি। বেচারা তায়েফ সাহেব কেমন ঘাড় উঁচিয়ে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটার পানে। মুগ্ধ কেমন শীতল কণ্ঠে বলল,

“ তেমন কিছু না। শুধু এটুকুই বলবো — এতো সৎ হতে যাবেন না।আমি আবার খুব বেশি সৎ মানুষ দেখতে পারিনা।শত হলেও অসৎ মানুষ তো,তাই সৎ মানুষ দেখলে এলার্জি হয় আমার!”
তায়েফ সাহেবের রাগ বাড়ছে তরতর করে। এইটুকুন ছেলে না-কি তাকে উপদেশ দেয়।তিনি তক্ষুনি শক্ত গলায় ঝাঁঝ ঢেলে বললেন,
“ আমাকে নিয়ে তোমার চিন্তা না করলেও হবে। তুমি বরং নিজেরটা দেখো!”
দৃষ্টি ছোট করলো মুগ্ধ। বাঁকা হেসে তৎক্ষনাৎ বলল,

“ আরে কি বলেন! এখন থেকে তো সবটা আমাকেই দেখতে হবে!”
“ মানে?”
মুগ্ধের কপালে ভাজঁ পড়লো এবার।ছেলেটা কেমন বিরক্ত কন্ঠে বলল,
“ আপনি বড্ড মানে মানে করেন বুঝলেন! তবে একটা কথা শুনে রাখুন, আমি কাউকে কৈফিয়ত দিতে মোটেও ইচ্ছুক নই!”
মুখের ওপর এহেন বাঁকা ত্যাড়া উত্তরে বেজায় অসন্তুষ্ট তায়েফ সাহেব। চোখ নামালেন তক্ষুনি। মুগ্ধ এবার রহস্যময়গলায় আবারও বলল,

“ নাইস টু মিট ইউ মিস্টার ডিসি সাহেব!”
তায়েফ সাহেব কড়া চোখে তাকালেন। মুখ কুঁচকে পরক্ষণে বললেন,
“ এতো বাজে মিটিংকেও কেউ কীভাবে নাইস বলে? হাস্যকর!”
মুগ্ধ মুচকি হাসে।বাঁকা চোখে ঠেস মেরে বলে,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৪

“ অভ্যাস করে নিন।এ-তো সবে শুরু। এবার থেকে আপনার -আমার দেখা-সাক্ষাৎ তো রোজকার ঘটনা হবে! দিস ইজ জাস্ট দা বিগিনিং!”
চিন্তায় পড়লেন তায়েফ সাহেব। সবে শুরু মানে? এ ছেলে হঠাৎ এ কথা বলছে কেনো? কী চলছে এর মাথায়?

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৬