Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৯

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৯

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৯
নওরিন কবির তিশা

নীলদের খানমহলে পৌঁছাতে পৌছাতে বেলা চড়াও হয়েছে খানিকটা;রোদের তেজ বেড়েছে কিঞ্চিৎ। গাড়িটা যখন মহলের সুউচ্চ সিংহদ্বারের সামনে এসে থামল,প্রহরীরা সসম্ভ্রমে বিশাল লৌহ গেটটা খুলে দিল। চাকার ঘর্ষণে নুড়ি পাথরের শব্দ তুলে নীলদের গাড়িটা ভেতরে প্রবেশ করল। বাগানের ভিজে কামিনী আর হাসনাহেনার গাছগুলো রোদ পেয়ে যেন হাসছে অনবরত‌।
গাড়ি থামিয়েই নীল নেমে এল। সে ওপাশে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে তিহুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তিহু নামতে গিয়েও থমকে গেল, শারীরিক আড়ষ্টতা এখনো তার চলনবলনকে মন্থর করে রেখেছে। নীল তা বুঝতে পেরে এক বাঁকা হাসি হেসে বলল,

—’আর ইউ রেডি ম্যাডাম?
তিহু চোখ কুঁচকে মুখ তুলে চাইল নীলের পানে। ভালো করেই বুঝলো তার কথার মর্মার্থ। কিছুটা ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে সে বলল,,
—’দেখুন মিস্টার অসভ্য, এখন অন্তত শান্ত থাকুন।এটা আমাদের বাসা কোন ফাঁকা প্লেস না । তো সরুন আর ছাড়ুন আমার পথ।
নীল ঠোঁট চেপে হেসে বলল,,—’উহুম.. ম্যাডামের দেখি নিজের উপর ওভার কনফিডেন্স! একটু আগেই নড়তে পারছিলেন না আর এখন হেঁটে হেঁটে যাবেন। আচ্ছা যান।
—’আপনি‌ কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করলেন?
—’একদমই না! আপনি যান ম্যাডাম।
—’হ্যাঁ, যাচ্ছি।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

তিহু জেদ করে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল ঠিকই, কিন্তু এক পা বাড়াতেই বুঝতে পারল শরীরটা তার সাথে বেইমানি করছে। কটিদেশের সেই চিনচিনে ব্যথাটা পুনরায় জানান দিল নিজের অস্তিত্ব। তবুও নীলের তীক্ষ্ণ হাসির কাছে হার মানতে নারাজ সে। দাঁতে দাঁত চেপে কয়েক পা এগোতেই তার কপাল বেয়ে ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দুরা জমা হতে শুরু করল। পা দুটো যেন সীসার মতো ভারী হয়ে আসছে। এক সময় বাধ্য হয়েই মহলের মার্বেল পাথরের তৈরি হাতলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে একটু জিরিয়ে নিতে চাইল।

নীল এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুঁজে নিভৃতে এই দৃশ্য উপভোগ করছিল। তিহুকে থেমে যেতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসির রেখাটা আরও দীর্ঘ হলো। সে ধীরলয়ে এগিয়ে এল তিহুর দিকে।তিহু পুনরায় সম্মুখ পানে এগিয়ে যেতেই তার কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা দীর্ঘ ওড়নার আঁচলটা অবাধ্য হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ধুলিকণায় মাখামাখি হতে যাওয়া সেই ওড়নার আঁচল মাটিতে ছোঁয়ার আগেই নীল সেটাকে ছোঁ মেরে তুলে নিল নিজের হাতে।
তিহু সেদিকে লক্ষ্যপাত না করেই এগিয়ে চলল সম্ম ুখে আর নীল চলল তার পিছু পিছু।

নীলের হাতে নিজের ওড়নার আঁচল সঁপে দিয়ে তিহু যখন অতিকষ্টে মহলের প্রশস্ত বারান্দা পেরিয়ে অন্দরমহলে পা রাখল, ঠিক তখনই তার পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল; এক অভাবনীয় দৃশ্য উন্মোচিত হলো তার সামনে।তিহুর শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তের জন্য হিম হয়ে গেল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে এল বিস্ময়ে। সে দেখল সোফায় আসীন হয়ে আছেন তার বাবা আর চাচা!
বাবা চাচাকে এখানে দেখামাত্র হৃদপিণ্ডের স্পন্দন যেন এক লাফে কয়েক গুণ বেড়ে গেল তার । এক মুহূর্তের জন্য সে নিজের শারীরিক ক্লেষ আর আড়ষ্টতার কথা ভুলে গেল। অবচেতন মনেই তার পা দুটো বাবার দিকে এগিয়ে যেতে চাইল— সেই ছোটবেলার মতো।

কিন্তু দুই পা বাড়াতেই হঠাৎ যেন স্মৃতির এক তীব্র দহন তার মস্তিষ্কে বিদ্যুৎরেখার মতো খেলে গেল। তিহু থমকে দাঁড়াল তৎক্ষণাৎ। মনে পড়ে গেল গত কয়েকটা দিনের সেই দুঃসহ প্রহরগুলোর কথা।সেই কঠোর বাক্যবাণগুলো পুনরায় উদিত হয়ে কাঁটার মতো বিঁধল তার হৃদয়ে। কষ্টগুল যেন এক নিমিষেই তার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াল।
ঘরের বাতাস তখন এক ভারী বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থমথমে হয়ে আছে। তিহু যখন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে নিজের অন্তরের দহন সামলাচ্ছে, নীল তখন অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তার ওড়নার প্রান্তটা নিজের হাতে গুছিয়ে নিয়ে ওর ঠিক পাশটিতে এসে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমের সেই থমথমে নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথম কথা বললেন তিহুর বাবা। তাঁর কণ্ঠে সেই আগের কঠোরতা নেই, বরং সেখানে মিশে আছে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ আর ক্লান্তির সুর।
তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কম্পিত কণ্ঠে বললেন,

—’তিহু! মা আমার…! এখনো রাগ করে আছিস আব্বুর ওপর?
বাবার আকুল কণ্ঠে তিহু ভেতরটা মুষড়ে উঠল। হাজার হলেও বাদবাকি মেয়েদের মতই বাবার প্রতি তার দুর্বলতা ছোটবেলা থেকেই প্রখর। বড্ড প্রখর! না চাইতেও আঁখি জোড়া ভিঁজে উঠল তার। ডুকরে কেঁদে উঠে বাবাকে জড়িয়ে বলল,,
—’আমি কখনোই তোমার ওপর রেগে ছিলাম না আব্বু। কিন্তু তোমরা কেন করেছিলে আমার সাথে অমন? আমি তো তোমাকে নেতা সাহেবকে দুজনকেই চেয়েছিলাম। আমি দুজনকেই নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। খুব খুব খুব বেশি আব্বু। তোমরা একজন আমার হৃদস্পন্দন অন্য একজন আমার দৃষ্টিশক্তি। হৃদস্পন্দন থেমে গেলে যেমন মানুষ বাঁচবে না। দৃষ্টিশক্তি হারালেও কিন্তু তার জীবনের কোনো মূল্য নেই।
মেয়ের কথায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন নওশাদ হক। আদুরে মেয়ের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন,,

—’আব্বু খুব করে দুঃখিত মা। ভুল হয়ে গিয়েছিল আমাদের। সামান্য দ্বন্দ্বের দরুণ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদটাকে হারিয়ে ফেলতে চলেছিলাম আমি।
বাবা মেয়ের এমন এমন আলিঙ্গনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সকলে।নিহাল হক এগিয়ে এসে তিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,,
—’ চাচ্চু কেও পারলে মাফ করে দিস মা। যদিও আমি জানি আমি ক্ষমার অযোগ্য হয়ে পড়েছি।
তিহু বাবার বক্ষদেশ থেকে মুখ তুলে চাচ্চুর উদ্দেশ্যে বলল,,—’একদম না চাচ্চু।
নিহাল হকও তিহুকে বুকে আগলালেন। বললেন,,

—’তোকে খুব মিস করেছি আম্মু। খুব বেশি।
তিহুর বাবা আর চাচার সাথে এই আবেগঘন মুহূর্তের রেশ কাটতে না কাটতেই দোতলার সিঁড়িতে কারো পায়ের শব্দ শোনা গেল। তিহুকে দেখামাত্রই আগন্তুক ব্যক্তিটার চোখেমুখে এক চিলতে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল।তিনি দুই হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসে বললেন,

—’আরে! আমাদের মা-মণিটা দেখি কত বড় হয়ে গেছে! কানাডা থাকাকালীনই শুনেছিলাম তোর আগমনী বার্তা। কল্পনায় তো পুতুলের ভেবেছিলাম বাস্তবে তো দেখি মা আমার একদম হুর হয়েছে!
তিহু কিছুটা হকচকিয়ে গেল। চোখের জল মুছে বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আগন্তুকের দিকে। এই মধ্যবয়সী সুঠাম মানুষটিকে সে ঠিক চিনতে পারছে না। তাঁর চেহারায় বাবার আদল থাকলেও তিহুর স্মৃতিতে তিনি অস্তিত্বহীন।তিহুর এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় চাহনি দেখে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন।
নিহাল হক হাসতে হাসতেই বললেন, —’চিনতে পারছিস না তো? কিভাবে চিনবি? আমরাই ভুলতে বসেছি, আর তুই তো কখনো দেখিইস নি।
তিহু বিস্মিত দৃষ্টিতে দৃষ্টি বিনিময় করল নিহাল হকের সঙ্গে, তৎক্ষণাৎ পাশ থেকে নওশাদ হক বললেন,,
—’এটা তোমার বড় চাচ্চু মা। গিয়ে সালাম করো।
তিহু এবার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো মানবটিকে। সালাম দেওয়ার পূর্বেই নওফেল হক তার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,,

—’আমার মামনিটা।
পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে তখন এক অপার্থিব আনন্দধারা বইছে। আর মহলের সকলের উপস্থিতি। খান পরিবার আর হক পরিবারের পুনর্মিলন যেন জানান দিচ্ছে বহু বছর পর কোনো এক বিবাগী সুর তার আপন আলয়ে ফিরে এসেছে। নওশাদ হক আর নিহাল হকের চোখে তখন তৃপ্তির অশ্রু, আর বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের মুখে বিজয়ের হাসি। পরিবারের বিচ্ছিন্ন সুতোগুলো যেন অলক্ষ্যেই এক অদ্ভুত মায়াজালে ফের আবদ্ধ হয়েছে আজ।
তিহু যখন ঘোরের মধ্য দিয়ে এই আনন্দঘন পরিবেশকে অনুভব করার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই তার কানের খুব কাছে এক জোড়া তপ্ত নিঃশ্বাসের স্পর্শ অনুভব করল। নীল তার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। তার এক হাতে এখনো তিহুর ওড়নার সেই অবাধ্য আঁচলটা জড়ানো। নীলের ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা রহস্যময় বাঁকা হাসি। সে কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে অত্যন্ত ধীরলয়ে বলল,,

—’সারপ্রাইজটা কেমন ছিল ম্যাডাম? খুব বেশি শকড হলেন নাকি?’
তিহু বিস্ময় সামলে ঘুরে দাঁড়িয়ে নীলের চোখের দিকে চাইল। ওই চোখের গভীরতা আজ যেন অন্য কথা বলছে। নীল মৃদু হেসে ফের বলল,,
—’নওশাদ আংকেল তো আরও কয়েকদিন আগেই চলে আসতে চেয়েছিলেন। আপনার ঐ জেদি বাবা-চাচার মন গলাতে বেশ কসরত করতে হয়েছে আমাকে যদিও দাদু ভাইয়ের সাথে অনেক আগে থেকে আমার ডিল কনফার্ম হয়েছিল। কিন্তু নওফেল আংকেল একটা জরুরি ব্যবসায়িক কাজ আটকে ছিল কানাডায়, তাই ওনার ফিরতে কয়েকটা দিন দেরি হলো।সে যাই হোক জন্মদিনের ঠিক পরেই এমন একটা ফ্যামিলি রিইউনিয়ন হবে—সেটা কি কখনো ভেবেছিলেন?

তিহু বাকরুদ্ধ। তার মানে এই যে এত নাটক, তাকে নিয়ে নীলের এতসব লুকোচুরি, তার নেপথ্যে ছিল এই বিশাল এক পরিকল্পনা! নীলই তবে সেই কারিগর, যে ভেঙে যাওয়া তাসের ঘরটাকে আবার সযত্নে গড়ে তুলেছে। তিহুর এমন অবস্থায় নীল মৃদু হাসল, তার চোখে তখন এক অদ্ভুত তৃপ্তির ঝিলিক। নওশাদ হক এগিয়ে এসে নীলের কাঁধে হাত রাখলেন। আজ তাঁর চোখে সেই আগের কাঠিন্য নেই, বরং জামাতার প্রতি এক গভীর ভরসা ফুটে উঠেছে। অনুশোচনার স্মিত হেসে ‌তিনি বললেন,

—’আজ আর আমার কোন দ্বিধা নেই এটা বলতে যে ওয়ালিদ বাবা হিসেবে সার্থক। আর আমি সার্থক আমার ইমম্যাচিউর মেয়েকে এমন একটা ছেলে ভালবাসে বলে।নীল বাবা, তুমি যা করেছ তার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই।
নীল সামান্য হেসে কুশল বিনিময় করলেন নওশাদ হকের সঙ্গে।নিহাল হক হাসিমুখে ঘোষণা করলেন,
—’সব তো ঠিক হলো। এবার আমাদের ফেরার পালা। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কালকেই আমরা সবাই মিলে বাড়ি ফিরব। বড় ভাবিকে (রওশন আরা) আমরা সসম্মানে আমাদের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। কোনো মান-অভিমান আর বাকি থাকবে না। যদিও এখানে বাবা নিজেই আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু অসুস্থতার কারণে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
রওশন আরার চোখও তখন ভিজে উঠেছে। জীবনের এতগুলো বছর যে অপমানের বোঝা তিনি বইছিলেন, আজ তা এক নিমিষেই ধুয়ে মুছে গেল।নওশাদ হক একবার তিহু পরক্ষণেই নীলের দিকে তাকিয়ে বললেন,,

—’কিন্তু এও গুড নিউজের ভেতরও তোমাদের জন্য একটা ব্যাড নিউজ আছে।
তিহু মুখ কুঁচকে তাকাতেই নওশাদ হক হেসে বললেন,,
—’বিয়েটা যেহেতু তোমরা লুকিয়ে করেছ, তাই আমরা সবাই চাচ্ছি বড় করে অনুষ্ঠান করে পুনরায় তোমাদের বৈবাহিক কাজ সম্পন্ন করতে।আর সেইজন্য তিহু মাও কাল‌ আমাদের সঙ্গে খুলনা ফিরবে।আর বিয়ে হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই থাকবে।
তিহু মুচকি হেসে চোখ সরু করে নিজের দিকে তাকালো। কিন্তু নীলের ভঙ্গিতে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে কিছুটা গম্ভীর্যময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে। হঠাৎই গায়েব হয়ে গেল তিহুর মুখের হাসি। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নীলের পানে।

বাইরে রাত এখন নিবিড় হয়েছে। খানমহলের বাগানে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর কামিনীর উগ্র সুবাস মিলেমিশে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। অন্দরমহলে তখন সাজ সাজ রব। কাল সকালেই সকলে যাত্রা করবে, তাই গোছগাছের ধুম লেগেছে। কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার ‌তিহুর জামাকাপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সে ক্লান্ত শরীরে আলসেমি মাখা হাতে সুটকেসে কাপড়গুলো ভাঁজ করে রাখছিল।বাবার আদুরে শাসন আর চাচার স্নেহ আজ তার মনের সব গ্লানি ধুয়ে মুছে দিয়েছে, তবুও মনের এক কোণে নীলের সেই গম্ভীর চাহনিটা কাঁটার মতো বিঁধে আছে।
বিয়ের নতুন করে অনুষ্ঠানের কথা শুনে সে এমন বিমর্ষ হয়ে গেল কেন?হঠাৎ ঘরের দরজাটা কোনো সংকেত না দিয়েই সশব্দে খুলে গেল। তিহু চমকে মুখ তুলে চাইল। দেখল, নীল দাঁড়িয়ে আছে চৌকাঠের ওপর। তার অবিন্যস্ত চুল আর চোখের সেই প্রখর দৃষ্টি জানান দিচ্ছে যে মনের ভেতর কোনো এক ঝড়ের পূর্বাভাস বয়ে চলেছে। নীল ঘরে ঢুকে ধীরপদে তিহুর দিকে এগিয়ে এল, তারপর লাথি মেরে সুটকেসটা একপাশে সরিয়ে দিল।তিহু হকচকিয়ে গিয়ে বলল,

—’একী! আপনি এমন করছেন কেন? দেখছেন না আমি প্যাকিং করছি?
নীল কোনো উত্তর দিল না। সে তিহুর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস তিহুর কপালে এসে লাগছে। নীল নিচু স্বরে অথচ অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,
—’প্যাকিং বন্ধ করো নুর। কাল তুমি কোথাও যাচ্ছ না।
তিহু বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল অপার্থিব এক আশঙ্কায়। সে কম্পিত কণ্ঠে শুধাল,,

—’কেন? আব্বু-চাচ্চুরা তো কালই ফিরবেন বললেন। আমি গেলে সমস্যা কোথায়? এমনিতেও আম্মু তাজহীর,পিহু তানহার জন্য মন কেমন করছে আমার….!
নীল এক ঝটকায় তিহুর কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিল। তার চোখের মণি তখন আগুনের মতো জ্বলছে; তীব্র কন্ঠে সে বলল,,

—’আর তুমি চলে গেলে আমার যে শ্বাসরোধ হয়ে আসবে! তার বেলা?তোমার আব্বু বললেন আজ থেকে ‌বিয়ের সেই দিন পর্যন্ত তোমাকে ও বাড়িতে থাকতে হবে, আর আমাকে এখানে একা? কিভাবে সম্ভব নূর? এতগুলো দিন আমি কিভাবে থাকবো তোমাকে ছাড়া?
তিহু নীলের এই আগ্রাসী রূপ দেখে কথা হারিয়ে ফেলল। তার সারা শরীরে এক আশ্চর্য শিহরণ বয়ে গেল। নীলের জেদ আর ভালোবাসার এই সংঘাত যেন রাতের এই নিস্তব্ধতাকে আরও ঘনীভূত করে তুলল। তার চারিধারে শুধু প্রতিফলিত হতে লাগলো নীলের বলা ঐ কথাটা,,
“এতগুলো দিন আমি কিভাবে থাকবো তোমাকে ছাড়া?”
সত্যিই তো শুধু নীল কেন সেও বা কিভাবে থাকবে নীলকে ছাড়া? কিন্তু বাবা দাদার এমন সিদ্ধান্ত তো নেহাতই ফেলে দেওয়ার মত নয়। সে নীলকে বোঝানোর জন্য পায়ের দু আঙুলে ভর করে কিছুটা উঁচু হয়ে নীলের তীক্ষ্ণ চোয়ালের হাত রেখে বলল,,

—’একটু বোঝার চেষ্টা করুন মিস্টার পলিটিশিয়ান। কিছুদিনের জন্য আলাদা থাকা আমাদের সারা জীবনের জন্য একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। শুধু তাই নয় ব্রাদার আর রাফা তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু ফিরে পাবে;জীবনে প্রথমবারের মতো তারা নিজেদের বাড়ি ফিরবে। আপনি কি চান না সেটা বলুন?
নীল যেন কিছুতেই মানতে পারছে না;সে নিজ নাকের ডগা তিহুর নাকে ঘষল। তপ্ত নিঃশ্বাস তিহুর ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে। সে প্রগাঢ় কন্ঠে উন্মাদনা নিয়ে বলল,,

—’কয়েক দিন? তুমি জানো না নুর, এক একটা মুহূর্ত আমার কাছে এক একটা যুগের মতো কাটবে। এই যে চোখের সামনে তোমায় দেখছি, ছুঁতে পারছি—এই অধিকারটুকু হুট করে কেউ কেড়ে নেবে,আই কান্ট টলারেট দিস।
তিহু নীলের উন্মাদনায় মুচকি হাসলো; নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,,
—’কেড়ে কেউ নিচ্ছে না তো। বরং আরও বড় করে সাজিয়ে দিচ্ছে। আমি কথা দিচ্ছি, এই কয়েকটা দিন সারাক্ষণ আপনার সাথে ফোনে কথা বলব।প্রমিস।

তিহুর এই আদুরে আবদার আর শান্ত আশ্বাসে নীলের ভেতরের সেই আগ্নেয়গিরিটা যেন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল। সে দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে তিহুর দিকে তাকাল। তার চোখে তখন আর রাগ নেই, আছে এক গভীর আকুলতা। নীল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে মুখ নামিয়ে তিহুর কাঁধ আর ঘাড়ের সন্ধিস্থলে মুখ গুঁজে দিল।
তিহুর সারা শরীরে বিদ্যুতের মতো এক শিহরণ বয়ে গেল। সে চোখ বুজে শক্ত করে নীলের শার্টের হাতা খামচে ধরল। ঘরের বাতিটা তখন ম্লান হয়ে এসেছে, বাইরে থেকে আসা চাঁদের আলোয় দেখা গেল দুটি ছায়া একাকার হয়ে মিশে আছে। নীল অস্ফুট স্বরে তিহুর ঘাড়েই মুখ রাখা অবস্থায় বলল,

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৮

—’মনে থাকে যেন নুর, এই ঋণ কিন্তু তোমায় সুদে-আসলে মিটিয়ে দিতে হবে। আমি শুধু কয়েকটা দিনের জন্য তোমায় ছুটি দিচ্ছি, তোমার মনটাকে নয়।
তিহু কোনো কথা বলল না, শুধু নীলের চুলে বিলি কেটে তার এই নিঃশব্দ ভালোবাসাকে আপন করে নিল। রাতের নিস্তব্ধতা যেন সাক্ষী হয়ে রইল এই দুই হৃদয়ের অদ্ভুত এক সন্ধির।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫০