Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৭+৪৮

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৭+৪৮

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৭+৪৮
সাজিয়া জাহান সুবহা

আকাশে ধূসর বর্ণের মেঘ। তার মাঝে একটুখানি দেখা মিলছে দ্বিখণ্ডিত চাঁদটার। শীতল বাতাস বইছে। কেমন এক স্নিগ্ধ সুভাস সেই বাতাসে। নাজরাত লম্বা করে শ্বাস টানে। বিমোহিত হয় নিস্তব্ধ রাত্রির এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে। নদীর ধারে দাঁড় করানো সাদা গাড়িটির ডিকি’র সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। নদীর স্বচ্ছ জলে চাঁদের আলো পড়ায় চিকিমিকি করছে তা। সেদিকে তাকিয়ে থাকা নাজরাতের ঘোর কাটে পাশে কারো উপস্থিতি-তে। ফিরে তাকালো সে। সাদিফ দাঁড়িয়ে আছে। জরুরি কল আসায় অন্যদিকে গিয়ে কথা বলে মাত্রই ফিরে এসেছে সে। মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে সে চোখ তুলে তাকালো নাজরাতের দিকে। মেয়েটা তাকিয়েই আছে। সাদিফ কাছ ঘেঁষল তার। অধর প্রসারিত করে বললো, ‘ কি দেখছ? ‘

নাজরাত জবাব দিলো না। অনেকগুলো দিন পর স্ব-চক্ষে সাদিফকে দেখছে সে। মুখ ফুটে বলেনি ঠিক। কিন্তু অসম্ভব মিস করেছে সাদিফকে । মাঝে মাঝে সে ভেবে পায়না এত কম সময়ে, এই মানুষটাকে সে কীভাবে এতোটা ভালোবেসে ফেললো? কবে তৈরি হলো মানুষটার প্রতি এতো মায়া? এখন একটা দিন সাদিফের সাথে কথা না হলে দিন দুনিয়া বিষিয়ে উঠে তার। অস্থির লাগে ভীষণ। তারপর সারাদিনের ব্যস্ততার পর সাদিফের ক্লান্ত কন্ঠটা শুনলে ইচ্ছে করে ছুটে চলে যেতে। কাছে গিয়ে প্রিয় মানুষটার ঘর্মাক্ত মুখটা নিজের আঁচলে মুছে দিতে। ক্লান্ত দেহটার ভার নিজের কোলে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে৷ এই ছোট ছোট যত্নগুলো দিতে পারেনা বলে খারাপ লাগে তার। বউ হওয়া স্বত্তেও আজ অবধি একটা দ্বায়িত্বও পালন করতে পারেনি সে। এজন্য তার আফসোস হয় ভীষণ। ভাবে, কি দরকার ছিলো পরীক্ষার পর অনুষ্ঠানের কথা বলার? এই যে সুন্দর সময়গুলো দুরত্বে দুরত্বে চলে যাচ্ছে। এগুলো কি আর ফিরে পাবে তখন? ভাবনার সুতো কাটলো সাদিফের স্পর্শে। গালে হাত ছুঁয়ে সে ধীর কন্ঠে বললো ,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ কি হলো? কি ভাবছ? ‘
‘ এতো শুকিয়ে গেছ কেনো? ‘ মলিন কন্ঠ নাজরাতের।
সম্পর্কে গভীরতায় সম্মোধনও এখন আপনি থেকে তুমি তে নেমেছে। আবদার টা সাদিফেরই ছিলো। যা পূরণ করতে বেশ অনেক দিন লেগেছে নাজরাতের। অবশেষে গিয়ে তুমি’তে অভ্যস্ত হয়েছে সে। কিন্তু এখনো অনেক সময় আপনি তুমি গুলিয়ে ফেলে সে। ফোনকলে নাজরাতের কন্ঠে বহুবার তুমি সম্মোধন শুনলেও, সামনাসামনি এই প্রথম শুনেছে সাদিফ। ব্যাপারটা বেশ ভালো লেগেছে তার। সে মৃদু হেসে নাজরাতকে এক হাতে আলিঙ্গন করে জবাব দিলো,

‘ ভিটামিন বউয়ের অভাববোধ করছি, তাই। ‘
এহেন জবাবে নাজরাতের চুপসানো মুখখানা আরও চুপসে গেলো। কষ্ট পেলো সে। একমাত্র তার পাকনামির জন্য আজ দুজনকেই ভুগতে হচ্ছে৷ আগ বাড়িয়ে বাবার কাছে এমন আবদার না করলে আজ দিনগুলো কত সুন্দর হতো! এমন ক্ষণিক সময়ের জন্য দুজন বাহিরে দেখা না করে, এই রাতগুলো কাটতো বদ্ধ রুমে। কিছু মিষ্টি, প্রেমময়ী মুহূর্ত হয়ে। সব ভেস্তে গেল।

‘ আশ্চর্য! এমন চুপচাপ হয়ে আছো কেনো? এতদিন পর সময় বের করেছি কি বউয়ের গোমড়া মুখ দেখতে? ‘
গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো নাজরাত। এরপর দু’হাতে সাদিফকে জড়িয়ে ধরে মাথা এলিয়ে দিলো বুকে৷ সাদিফ তার এমন নিরবতায় বেশ চিন্তিত। পিঠে হাত রেখে পুণরায় জানতে চাইলো,
‘ কি হয়েছে? ‘
‘ ভালো লাগছে না। ‘
‘ আমাকে? ‘
বলার সাথে সাথে বুক হতে মাথা তুলল নাজরাত। চাঁদের ক্ষীণ আলোয় তার চাহনি দেখেই সাদিফ বেচারা ভড়কে গেলো৷ নিজ থেকেই পুণরায় বউয়ের মাথাটা বুকে চেপে দ্রুত গলায় বলে উঠলো,

‘ সরি, সরি। তুমি বলো। আমি শুনছি। ‘
নাজরাত নিরব থাকে কিছু সময়। সাদিফ ডাকতেই সে তপ্ত শ্বাস বলে,
‘ এই দুরত্ব আর ভালো লাগছে না। কেনো যে বাবাকে বলেছিলাম এক্সামের পর প্রোগ্রাম করার কথা! আপনাকে এতো ভালোবাসবো জানলে কখনো একথা বলতাম না। সব দোষ তোমার। এত ভালো হতে কে বলেছে তোমাকে? ‘
সাদিফ শব্দ করে হাসে একথা শুনে। আরও নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে বউকে। আপনি,তুমি মিলিয়ে বলা কথাগুলো তে এক সমুদ্র ভালোবাসা খুঁজে পায় যেন। নাজরাতের চুলের মাঝে ছোট্ট করে চুমু খেয়ে, চুলে হাত বুলিয়ে দিলো সে। আশ্বস্ত কন্ঠে বললো,

‘ মন খারাপ করছো কেনো? দেখবে দেখতে দেখতে এই সময়গুলোও চলে গেছে। ‘
‘ যাচ্ছে কই! আরও এক বছর আছে। ‘
এক বছর! সাদিফেরও বুক ছটফটিয়ে উঠে ভাবতে গিয়ে। কষ্ট তো তারও হয়। কিন্তু তা প্রকাশ করলে তার বউ একেবারে কষ্টের সাগরে হাবুডুবু খাবে বলে প্রকাশ করছে না৷ নাজরাতকে স্বাভাবিক করতে সে এবার কৌতুক কন্ঠে বলে,
‘ সেদিন আমার এক কলিগ বলছিলো, বিয়ে করে খুব প্যারায় আছে সে। বউ নাকি উঠতে বসতে ঘ্যানঘ্যান করে। একমাত্র বউ বাপের বাড়ি গেলেই একটু শান্তি পায়। সে হিসেবে আমিও শান্তিতে আছি। আরও এক বছর থাকি শান্তিতে। এরপর ভাগ্য কোথায় এনে দাঁড় করাবে কে জানে! ‘

নাজরাতের হাত আলগা হয়ে আসলো। অবাক চোখে তাকালো সে৷ সাদিফের মুখে মিটিমিটি হাসি দেখে এবার সে হাতের জোরে কিল মারে বুকে। সাদিফ হাত চেপে ধরে সেথায়। মুখ দিয়ে নাটকীয়ভাবে আওয়াজ তুলে, ‘আউচ!’
নাজরাত ক্ষুব্ধ চোখে তাকিয়ে। সাদিফের অভিনয় দেখে সে অভিমানী কন্ঠে বলে,
‘ খুব শান্তিতে আছো! আমি কেনো তবে অযথা কষ্ট পাচ্ছি তোমার জন্য। শান্তিতেই থেকো । একবছর কেনো! জনম জনম বউ ছাড়া থেকো। আজই বাবাকে বলছি দাঁড়াও…. ‘

বলতে বলতে গাড়ির দরজার দিকে পা বাড়ালো সে৷ সহসা তার হাত টেনে ধরে সাদিফ। পেছন থেকেই নাজরাতের দেহটা শক্ত করে বেঁধে ফেলে নিজের বাহুবন্ধনে। নাজরাত ছটফটিয়ে উঠে ছাড় পাওয়ার তাগিদে। পরমুহূর্তেই অনুভব করে কানের নিচে উষ্ণ এক স্পর্শ। তৎক্ষনাৎ জমে গেল তার দেহ,মন। সাদিফ বাকা হাসে তাকে স্তব্ধ দেখে। কোন সময়ে বউকে কীভাবে সামলাতে হয়, তা যেন মুখস্থ হয়ে গিয়েছে তার৷ মৃদু হেসে নাজরাতের কাঁধে থুতনি রাখল সে। নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘ মজা করছিলাম তো। রাগ করছো কেনো? আচ্ছা, সেসব কথা থাক। আগে বলো, শাড়ি পরনি কেন? ‘
‘ শাড়ি সব বাড়িতে। মামার বাসায় নিয়ে আসিনি তাই। ‘
সাদিফ তপ্ত শ্বাস ফেলে। নিরবতার মাঝেই মুখ গুজে নাজরাতের চুলের ভাঁজে। এহেন কান্ডে মেয়েটা চমকে উঠে আশেপাশে তাকায়। দ্রুত গলায় বলে,

‘ কি করছো কি! আমরা রাস্তায়। ‘
সাদিফ মহা বিরক্ত এমন আচরণে। নাজরাতকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে সে পুণরায় কাছে টেনে বলে উঠে,
‘ এতো রাতে এখানে কে আছে আমাদের দেখার জন্য? আর যদি দেখেও ফেলে, তাতে কি? আমার বউকে আমি আদর করছি। হোক সেটা রাস্তায় কিংবা বেড….. ‘
কথার মাঝে তার মুখ চেপে ধরে নাজরাত। লজ্জায় চোখ খিচে ফেলে সে। পরমুহূর্তেই গম্ভীর গলায় বলে,
‘ আপনি কি বুঝতে পারছেন যে দিন দিন কতটা অসভ্য হয়ে যাচ্ছেন সেটা? ‘
নাজরাতের হাতের নিচে চাপা পড়া সাদিফের ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি। চোখদুটোও হাসছে যেন সেই তালে। ছাড় পেতেই সে ধীর কন্ঠে বলে উঠে,

‘ বউয়ের কাছে থাকলে সব বর-ই এমন একটু আধটু অসভ্য হয়। আমার বউ এখনো দূরে দূরে আছে বলে জানেনা। ‘
নাজরাত জবাব দিলো না কোনো। পৃথিবীর সব ভদ্র,সভ্য পুরুষ যে বউয়ের কাছে অসভ্য হয়ে যায়, একথার প্রমাণ আজ পেলো সে৷ ভাবনার মাঝেই তার মুখশ্রীর খুব কাছে এগিয়ে আসে সাদিফ। নাজরাত ঢোক গিলে। কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই সাদিফ তর্জনী দ্বারা তার ঠোঁট চেপে ধরে। চোখে চোখ রেখে নিম্ন কন্ঠে বলে,
‘ অনেক্ষন ধরে কন্ট্রোল করে আছি। এতগুলো দিন পর দেখা করেছি কি শুকনো মুখে ফিরে যাওয়ার জন্য? তাকিয়ে দেখো, কেউ নেই এখানে। শুধু শুধু জুলুম করছো আমার উপর। ‘

নাজরাতের বুক ঢিপঢিপ করে এই কন্ঠে৷ সচকিত নয়নে সে আশেপাশে পরখ করে। নিরিবিলি নদীর পাড়ে গাড়ি দাড় করিয়েছে সাদিফ। দূর দূর অব্দি কোনো মানুষের আনাগোনা নেই। গাড়ির হেড লাইট দুটো বন্ধ বিধায় অন্ধকার হয়ে আছে চারিদিক৷ কেবল চাঁদের ক্ষীণ আলোয় একে অপরের অবয়ব দেখতে পাচ্ছে তারা। চোখ ঘুরিয়ে সবদিক পরখ করছিলো নাজরাত। এমন সময় সাদিফ তার ঘাড়ে হাত রেখে কাছে টেনে আনে তাকে। অধৈর্য কন্ঠে বলে,

‘ অনেক দেখেছ। আমি যখন বলেছি কেউ দেখছে না। মানে কেউ-ই দেখছে না। ‘
এই কথার বিপরীতে প্রতিউত্তর করার নূন্যতম সময়টুকু পেলো না নাজরাত। পূর্বেই সাদিফ অবিন্যস্ত রূপে দখল করে নিলো তার কোমল ওষ্ঠদ্বয়। অপ্রস্তুত নাজরাত চোখ খিচে ফেললো। রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ বয়ে গেল যেন৷ শরীরের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেছে তার। কম্পিত হাতজোড়া অবিলম্বে চেপে ধরেছে সাদিফের শার্টের কলার। মৃদু মৃদু বাতাসটা এবার ভীষণ জোরে বইছে। কানে আসছে মেঘের গুড়ুম গুড়ুম শব্দ। শীঘ্রই ধরণীতে বৃষ্টি নামবে বোধহয়। কিন্তু সেদিকে খেয়াল কই এই নব দম্পতির! নিরিবিলি নদীর পাড়ে প্রকৃতির স্নিগ্ধ বাতাসে তারা ভালোবাসায় মত্ত।

কানের কাছে একাধিকবার নিজের নাম-ডাক শুনে আকস্মিক ঘুম ছুটে গেল নাজরাতের৷ চট করে চোখ মেলে তাকালো সে৷ তার মা ডাকছে। দ্রুত মোবাইল হাতড়ে দেখল ন’টা বাজে। দেরি হচ্ছে কলেজের জন্য। দুইদিন আগেই সায়েরীদের বাসা থেকে ফিরে এসেছে সে। তার একদিন পূর্বে সাদিফের কাটানো মুহুর্তগুলো নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেখতেই কিনা এতো দেরি হয়ে গেল। ঘুম ছুটে গেলেও আলসেমি নিয়ে বালিশে মুখ গুজে কিছু সময় থম মেরে রইলো সে। এরপর মোবাইল নিয়ে নির্দিষ্ট আইডি টাতে ঢুকে ছোট্ট করে বার্তা পাঠালো,
‘ মিসিং ইউ। ‘
মেসেজটা ডেলিভার হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সিন হলো। পরমুহূর্তেই বেজে উঠলো রিংটোন। নাজরাত হেসে ফেললো এমন কান্ডে। কিন্তু কল রিসিভ করলো না সে৷ সাইলেন্ট করে রেখে ব্যস্ত হলো নিজের কাজে। বেড থেকে নামতে নামতে লম্বা হাই তুলে ভাবলো,
‘ হাসবেন্ড দের এতো বেশি পাত্তা দিতে নেই। যা দিয়েছি তা যথেষ্ট। ‘

লাইব্রেরি রুমে বসে গুরুত্বপূর্ণ নোটস লিখতে ব্যস্ত চার বান্ধবী। সায়েরী লম্বা হাই তুলে নিজের খাতার দিকে তাকায়। চোখ ভর্তি ঘুম নিয়ে কি যে লিখেছে কে জানে। আজ কালকের মধ্যেই ফলাফল আসবে ফার্স্ট টার্মের। অবশ্য সেটা নিয়েও আপাতত তার মাথাব্যথা নেই। শুধু আবরার দেখতে না চাইলেই হলো। নয়তো আস্ত থাকবে না তার। সায়েরী বাকিদের দিকে লক্ষ্য করে৷ গত পরীক্ষা বেশ খারাপ গিয়েছে বলে এবার নাজরাত বেশ সিরিয়াস। সাফ্রিন তো বরাবরই টপার। একেবারে ভাইয়ের ফটোকপি যেন। আর তোহা! এই মেয়ের মতিগতির ঠিক নেই। তাছাড়া বিগত দুদিন সে আসেনি কলেজে। আজ এসেছে তাও মতো মুখ ভাড় সকাল থেকে। সায়েরী আর ভাবলো না। মোবাইল বের করে নুহাশকে মেসেজ করতেই নিচ্ছিলো, এমন সময় নুহাশের মেসেজ আসলো। সে যেন সায়েরীর মনের ভাব বুঝে ফেলেছে এমন ভাবে লিখেছে,

‘ ফিলিং বিরক্ত? ‘
সায়েরীও একইভাবে জবাব দেয়, ‘ ইয়েস। টু মাচ বিরক্ত। ‘
‘ নিচে চলে আয় তবে। ক্যানটিনে আছি আমরা। ‘
সাথে আবার লজ্জা পাওয়ার ইমুজি দিয়ে লিখেছে,
‘ আমার ক্রাশও আছে। দ্রুত আয়। ‘
সায়েরী হেসে ফেললো সেটা দেখে৷ আসছি বলেই সে ব্যাগ গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তাকে যেতে দেখে সাফ্রিন বলে উঠলো,

‘ এটারই অপেক্ষা করছিলাম। কবে ম্যাডাম ব্যাগ মাথায় তুলে ছুটে পালাবে। তোর কপালে বর হিসেবে কোনো প্রফেসর জুটলে ভালো হবে খুব। তখন গিয়ে শিক্ষা হবে তোর। ‘
সায়েরী পাত্তা দিলো না সেদিকে। হাই তুলে বিড়বিড় করে বললো,
‘ প্রফেসর টা তোর ভাই হলে আমার আপত্তি নেই। ‘
বলেই প্রস্থান করলো সে। সিড়ি বেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে গিয়ে স্বভাবগতভাবে ধরাম করে পড়লো। আকস্মিক এমন সিড়ির মাথায় পড়ে গেলে বেচারি বেশ ব্যাথা পেলো নিতম্ব-তে। নিজের উপর বিরক্ত হয়ে সে কোমরে হাত চেপে বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ আহ!! আমি মরি না কেনো? ‘

পড়েছে তো পড়েছে একেবারে ব্যাঙ্গের মতো হয়ে আছে সে। কোনো রকমে ঠিক করে বসেছে এমন সময় চোখের সামনে দেখা মিললো একজোড়া পায়ের। তা দেখে সায়েরী চট করে মাথা তুলে তাকায়। দৃষ্টি স্থির হয় সাফওয়ানকে দেখে। দুইহাত পকেটে ঢুকিয়ে বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে আছে সে। গম্ভীর, শান্ত চোখজোড়া সায়েরীতে নিবদ্ধ। সেই রাতের পর আজ দুই দিন পর স্ব-চক্ষে সাফওয়ান কে দেখে সায়েরীর বক্ষস্থল শীতল হয়ে আসে। চোখের তৃষ্ণা মিটাতে গিয়ে সে বেমালুম ভুলে বসে দেহের ব্যাথা।
‘ ব্যাঙ্গের মতো বসেই থাকতে হয় যদি অন্য কোথাও গিয়ে বসে থাকো। এটা পাবলিক প্লেস। ‘
সাফওয়ানের গমগমে কন্ঠটা শুনে সায়েরীর ঘোর কাটে। সাফওয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে আছে। অত্যাধিক শান্ত চোখদুটো যেন প্রেয়সীর এই শুকনো মাটিতে আছাড় খাওয়ার ব্যাপারটা দেখে নিরব হাহাকার জানাচ্ছে। বলছে, ‘ আহ! আমি হতাশ! ‘

সায়েরী নিজ থেকেই উঠে দাঁড়ালো। কাপড় ঝাড়ছে এমন মুহূর্তে সাফওয়ান তার পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই সায়েরী দ্রুত গলায় বলে উঠলো,
‘ আপনাকে আমি ফোন করেছিলাম। ‘
সাফওয়ান থামে। সচকিত নয়নে আশেপাশে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
‘ কোনো প্রয়োজন? ‘
সায়েরী দমে গেল এই প্রশ্নে। এ কেমন কথা! প্রয়োজন ছাড়া কি কল করা যায় না নাকি? তপ্ত শ্বাস ফেলে সে মিনমিন কন্ঠে বলে,

‘ আপনি বলেন নি কেনো যে বৃষ্টিতে ভিজলে আপনার জ্বর হয়? ‘
‘ জানলে কি করতে? ‘ ভ্রুঁ কুচকালো সে।
‘ একদম ভিজতে দিতাম না। ‘ স্পষ্ট কন্ঠ সায়েরীর।
জবাবটা শুনামাত্র সাফওয়ান চোখ নামিয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো সায়েরীর দিকে। তার চাহনি দেখে সায়েরীর গাল গরম হয়। কথা খুঁজে না পেয়ে ব্যাগ তুলে প্রস্থান করতেই চাইতেই সাফওয়ান পুণরায় প্রশ্ন করে, ‘ ওদিকে কোথায় যাচ্ছ? ‘
‘ ক্রাশকে দেখতে যাচ্ছি। ‘
‘ হোয়াট? ‘

আকস্মিক সাফওয়ানের গর্জন শুনে সায়েরী লাফিয়ে উঠে। বুকে হাত চেপে চোখ তুলে চাইতেই বাদামি চোখজোড়ার কঠোর চাহনি দেখে আত্মা লাফিয়ে উঠে বেচারির। বুঝে উঠতে পারে না হঠাৎ এমন আচরণের কারণ। তার ভীতু মুখশ্রী দেখেও যেন দেখলো না সাফওয়ান। একটু আগে যে সচকিত চোখে আশেপাশে কেউ আছে কিনা পরখ করছিলো, এখন তা বেমালুম ভুলে গিয়ে পলকের মধ্যে সায়েরীর কাছ ঘেঁষে গাল চেপে ধরলো তার। মুখটা উঁচু করে সে রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ কোন ক্রাশ? কোন ইয়ারের? তোমার সাহস কীভাবে হয় আমার সামনে ক্রাশকে নিয়ে কথা বলার? ‘
সায়েরী উক্ত স্থানেই জমে বরফ একেবারে। সাফওয়ানের এই তেজস্বী কন্ঠ শুনেই তার পরাণ পাখি উড়াল দিবে দিবে ভাব। তবুও কোনো রকমে সে চঞ্চল কন্ঠে জবাব দিলো,

‘ অ..আমার না। নুহাশ..নুহাশের ক্রাশ। ‘
মুহুর্তেই কপালের ভাঁজ শীতল হয়ে আসলো সাফওয়ানের। গাল হতে হাত সরিয়ে নিলো সে। সায়েরী গাল ফুলিয়ে তাকালো তার দিকে। এমন রূড আচরণে কষ্ট পেলো সে। মুখ দেখেই সাফওয়ান বুঝতে পারলো তা। কদম পিছিয়ে নিয়ে সে শীতল কন্ঠে বললো,
‘ ক্যান্টিনে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। লাইব্রেরি-তে ফিরে যাও। ‘
‘ আপনি কি করে জানলেন আমি লাইব্রেরিতে ছিলাম? ‘ সায়েরীর কৌতুহলী কন্ঠ।

সাফওয়ান জবাব দেয় না সেকথার। একটুখানি সরে দাঁড়িয়ে নিরবে বুঝিয়ে দিলো চলে যাওয়ার জন্য। সায়েরী ভেংচি কাটে অগোচরে। সাফওয়ানের আচরণ দেখে ভিতরে ভিতরে রাগে ফুঁসছে সে। যেতে যেতে কানে আসে সাফওয়ানের মোবাইল নোটিফিকেশনের শব্দ। সায়েরী আর ফিরে তাকালো না। কিন্তু সবে মাত্র কয়েক ধাপ উঠেছে এমন সময় পেছন থেকে ভেসে আসলো সাফওয়ানের কন্ঠ, ‘ স্টপ রাইট দেয়ার সুবহা! ‘
সায়েরী থমকাল। পেছনে তাকাতেই দেখল মোবাইল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। মুখজুড়ে বিষ্ময় ভাব তার। হা করে তাকিয়ে আছে মোবাইলের দিকে। যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য জিনিসটা দেখে ফেলেছে সে। সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না তার এমন চাহনির অর্থ। সাফওয়ান নিজেকে সামলে চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। লম্বা লম্বা পা ফেলে মুহুর্তেই সায়েরীর কাছে এসে দাঁড়ালো। এরপর বিনা বাক্যে তার হাত টেনে ঢুকে পড়লো লাইব্রেরি রুমের পাশে ফাঁকা রুমটাতে। সায়েরীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে নিজের মোবাইলটা তার সামনে ধরে বললো,

‘ এসব কি? ‘
সায়েরী নির্লিপ্ত চোখে তাকালো মোবাইল স্ক্রিনে। পরমুহূর্তেই চোখ বড় বড় হয়ে গেলো তার। তার রেজাল্ট শিট! এটা সাফওয়ান ভাই কোথায় পেলো! এখনো তো সে নিজেই পায়নি। খুব সম্ভবত আজই পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার আগেই সাফওয়ান পেয়ে গেল কি করে! প্রতিটি সাবজেক্টের মার্কস দেখে সায়েরী লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ভাবে এই মুখ কীভাবে দেখাবে সে সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে! ছিঃ ছিঃ কতটা লজ্জাজনক বিষয়।

সাফওয়ান বোধহয় কিছু বলতে নিচ্ছিলো এমন সময় ফোন বেজে উঠলো তার। রিসিভ করে তা কানে চাপতেই উপাশের ব্যাক্তির কথাগুলো শুনে সে ছোট্ট করে ‘ আসছি ‘ বলেই কল কাটে। এরপর ঠোঁট চেপে গম্ভীর চোখে কিছু সময় তাকিয়ে থাকে সায়েরীর দিকে। তাকে এভাবে তাকাতে দেখে সায়েরী ফাঁকা ঢোক গিলে। ডানে বামে দৃষ্টি ফেলে মিনমিন কন্ঠে বলে,

‘ এ..এভাবে তাকাচ্ছেন কেনো? পাশ তো করেছি নাকি! ‘
এহেন জবাবে সাফওয়ান যেন জ্বলে উঠলো। গমগমে গলায় বললো,
‘ এটাকে পাশ বলে? আমি ভেবেছি তুমি শুধু আচার আচরণেই মাথামোটা। কিন্তু এখন তো দেখছি, তুমি সব কিছুতেই ঢেঁড়স। ‘
এরপর আবার বিড়বিড় করে বললো,
‘ ফাটা কপাল আমার। ‘

সায়েরী সেটাও শুনে ফেললো। অপমানিত বোধ করে সে উল্টো ফুঁসে ওঠে বললো,
‘ ওহ! আপনি টপার বলে এখন আমাকে পেয়ে আফসোস হচ্ছে? ‘
সাফওয়ান আড়াআড়ি ভাবে ভ্রুঁ কুঁচকালো একথা শুনে। সায়েরীর মতোই করেই জবাব দিলো,
‘ জ্বী না। আমি আফসোস করা শিখিনি। বরং আফসোসের কারণটা কেই মন মত গড়তে শিখেছি। ‘
সায়েরী ভড়কে গেল এহেন জবাবে। ফট করে বলে উঠলো,

‘ মানে? ‘
সাফওয়ান আর কোনো জবাব দিলো না। পুণরায় সায়েরীকে লাইব্রেরিতে ফিরে যাওয়ার আদেশ দিয়ে বেরিয়ে গেল চুপচাপ। সে যেতেই সায়েরী কপাল চাপড়াল নিজের। ন্যাকা কান্না জুড়ে দিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ কোন উল্লুকের ঘাড়ে ঝুলিয়ে দিয়েছ আমাকে! দিনের বেলায় ধমকা ধমকি। এমন ভাব যেন আমাকে চিনেই না। উড়ে এসে জুড়ে বসেছি তার কোলে। আর রাত বিরাতে চু…. ধ্যাৎ! বলতেও লজ্জা লাগছে। নির্ঘাত সেই রাতে জ্বিন ভর করেছিলো উনার উপর। নাহলে সূর্য উঠতে উঠতেই রোমান্স সব হাওয়া হয়ে গেল কিকরে? এই অস্বাভাবিক প্রেমিকটাকেই পেলে আমার মতো নিস্পাপ মেয়েটার জন্য? আমার ভালো কারোরই সহ্য হয়না, না? ‘

প্রেমের শুরুতে প্রতিটা দিন,প্রতিটা মুহুর্ত নাকি অন্যরকম সুন্দর হয়। ভালো লাগার হয়। সারাক্ষণ উড়ুউড়ু এক অনুভূতি বিরাজ করে সর্বত্রে। এসবই শুনেছিলো সায়েরী। নাটক, সিনেমাতেও এমনই দেখে এসেছে। অথচ তার সাথে হলো পুরো উল্টো। প্রথমত ছিলো না কোনো প্রেমনিবেদন, না কোনো স্বীকারোক্তি। সাফওয়ান ভাই কেবল নিজের গম্ভীর কন্ঠে বলেছিলো সে চঞ্চল সুবহা’কে মিস করেছে। সায়েরীর সুন্দর চোখদুটোতে চুমু খেয়ে সুন্দর একখানা বাক্যও আওড়িয়েছিল। কি যেন ছিলো সেটা! মনে করতে পারলো না সায়েরী৷ স্বীকারোক্তি’র কথা নাহয় বাদ দেওয়া যাক। এমন এক মানুষ রূপি অ্যানাকন্ডার কাছ থেকে প্রেমনিবেদনের আশা করাও বিলাসিতা।

পূর্বের সেই রসকষহীন, কাঠখোট্টা মানবটার মনে যে এখন খানিকটা রষ মিশে হৃদয়টা নরম হয়েছে এটাই অনেক সায়েরীর কাছে। অন্তত আগের মতো উঠতে বসতে ধমক শুনতে হয়না সেটা ভেবেই শান্তি লাগছে তার। কিন্তু এসকল স্বস্তি, শান্তি,ভালোলাগা একদম উড়ে জানলা দিয়ে পালিয়ে গেছে গত রাতে৷ আবরার যখন জানালো সায়েরীকে অন্য এক কোচিং-এ ভর্তি করিয়ে এসেছে। এবং কোচিং-এর সময়সূচি হলো সকাল ৮ হতে ১০টা। একথা শুনে ভীমড়ি খেয়ে গেছিল বেচারি। একমাত্র সকাল সকাল উঠতে হবে বলে সে বিকালে কোচিং করতো। এখন সেটাও জলে গেল।

আবরারের মুখের উপর না করার উপায় ছিলো না। তন্মধ্যে সে শুনেছে কোচিং-এর শিক্ষক কিনা আবরারের কোনো এক বন্ধু অথবা সিনিয়র। নামও জানিয়েছিল। সেটা ঠিক মনে নেই সায়েরীর। বিষন্ন মন নিয়েও জম্পেশ ঘুম দিলো সে। নিয়মের বিপরীতে গিয়ে আজ সাত সকালে মেহরিন বেগমের ডাকাডাকি তে অতিষ্ঠ হয়ে ঘুম ছেড়ে উঠতে হয়েছে তাকে৷ তখন বাজে প্রায় সাড়ে সাতটা। একপ্রকার নিজের সাথে যুদ্ধ করে সে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়েছে কোচিং-এর উদ্দেশ্যে৷ মিনিট খানিক হেঁটে বাড়ি হতে কিছুদূর আসতেই রাস্তার পাশে পরিচিত গাড়ি এবং গাড়ির মালিককে দেখে সে থমকে দাঁড়ায়। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দিব্যি মোবাইল টিপছে সাফওয়ান। সায়েরী গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে। তার উপস্থিতি ঠের পেয়ে সাফওয়ান মাথা তুলে তাকালো। পরপরই আবার হাতের অ্যাপল ওয়াচে সময় দেখে বললো,

‘ আটটা দশ বাজে। জীবনে একটা কাজও ঠিক মতো করতে পারো না নাকি? সব কিছুতে গাফিলতি! ‘
সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না সাত সকালে কেন এসব শুনতে হলো তাকে। সে বলেছিল নাকি এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকাতে?
‘ আপনি এখানে কি করছেন? ‘
‘ গাড়িতে উঠো। ‘
‘ আমি কোচিং-এ যাচ্ছি। ‘
‘ জানি আমি। উঠতে বলেছি উঠো। লেইট হচ্ছে আমার। ‘

গম্ভীর কন্ঠটা শুনে সায়েরী আর প্রতিউত্তর করার ভাষা পেলো না। চুপচাপ ফ্রন্ট সিটে বসে পড়লো। গাড়ি চালু হওয়ার পূর্ব মুহুর্তে আচমকা সাফওয়ান সায়েরীর কাছাকাছি ঝুঁকে আসলো। হঠাৎ এমন হওয়ার অপ্রস্তুত সায়েরী চমকে উঠে। কিন্তু সাফওয়ান অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সায়েরীর সিট বেল্ট লাগিয়ে দিয়ে পুণরায় ঠিক হয়ে বসে গাড়ি চালু করে। সায়েরী স্বস্তির শ্বাস ফেললো তা দেখে। কিছুদূর যেতেই আচমকা মনে পড়ার ভঙ্গিতে সে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ ভাইয়াকে রেজাল্টের ব্যাপারে আপনি বলে দিয়েছেন তাইনা? ‘
‘ এটা মনে হওয়ার কারণ? ‘
‘ মনে হবেনা কেনো? নিশ্চয়ই আপনি উস্কে দিয়েছেন৷ নয়তো হুট করে আমাকে অন্য কোচিং-এ ভর্তি করাবে কেনো? ‘

সম্মুখে দৃষ্টি রেখেই সাফওয়ান নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
‘ মাথায় ঘিলু অবশিষ্ট আছে তবে! একদম ঠিক ধরেছ৷ আমি-ই উস্কে দিয়েছি। ‘
রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠল সায়েরী,
‘ কেনো করেছেন এমন? কি ক্ষতি করেছি আপনার যে আমার এই সাত সকাল বেলার ঘুমটা কেড়ে নিলেন? ‘
সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে ফেললো একথা শুনে। শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ এই ঘুমের চক্করে যে রেজাল্ট এনেছো তা আমাকে পোষাচ্ছে না তাই। ‘

‘ আশ্চর্য! আপনাকে পোষাতে হবে কেনো! আমার রেজাল্ট, আমার মন মতো হয়েছে এই অনেক। আপনি কে হন এত কিছুতে হস্তক্ষেপ করার? ‘
কথাটা বলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক কষলো গাড়ির। অপ্রস্তুত সায়েরী খানিকটা হেলে পড়ল সামনের দিকে। ভয় পেল খানিকটা। সোজা হয়ে বসতে গিয়ে কানে আসলো সাফওয়ানের গম্ভীর কন্ঠ,
‘ নামো। ‘
সায়েরীর মনে পড়ে গেল বহু মাস পূর্বের কথা। তার উপর বিরক্ত হয়ে সাফওয়ান মাঝ পথে নামিয়ে দিয়েছিল তাকে। আজও কি এমন করবে নাকি সে? ফাঁকা ঢোক গিলে সায়েরী বাইরে দৃষ্টিপাত করলো। এবং চমকে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে। গ্রীন ভ্যালি! এখানে কেনো এসেছে তারা!

সময় সাড়ে ন’টা। লিভিং রুমের বিশাল ডাইনিং টেবিল-টাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সায়েরীর বই, খাতা। চেয়ারে দুই পা গুটিয়ে বসে আছে সে। চোখ ভর্তি ঘুম আর মন ভর্তি অভিমান তার। গাল ফুলিয়ে বসে আছে সে। এক্ষুনি কেঁদে দিবে এমন একটা ভাব মুখজুড়ে। অথচ সম্মুখে বসা মানবটার যেন নজরই পড়ছে না সেদিকে। সে দিব্যি বই, খাতা নিয়ে কিছু একটা করতে ব্যাস্ত। মিনিট কয়েক যাওয়ার পর সাফওয়ান চোখ তুলে তাকালো। খাতাটা সায়েরীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

‘ ব্রেন তো দেখি ঠিকঠাকই আছে। তাহলে কাজে লাগাও না কেনো? ‘
বিজনেস স্টাডিজ বিভাগের স্টুডেন্ট সায়েরী। সাফওয়ানও তা-ই। ঘন্টা খানিক পূর্বে সাফওয়ান নিজ থেকেই অ্যাকাউন্টিং এর কয়েকটা ম্যাথ বুঝিয়ে দিয়ে সায়েরীকেও দিয়েছিল কয়েকটা সলভ করার জন্য। এবং সবগুলো ঠিকঠাক করেছে দেখে এখন উক্ত কথাটা বলেছে সাফওয়ান। সায়েরীর রাগে যেন ঘি পড়লো একথা শুনে। সে ফুঁসে ওঠে বললো,
‘ আপনার সমস্যাটা কি? ভাইয়াকে কোচিং-এর আইডিয়া দিয়ে আমাকে এখানে এনেছেন কেনো? ‘
‘ আমার মনে হয়েছে তোমার ব্রেইনে যে ঘাটতি আছে, তা আমি ছাড়া আর কেউ পূরণ করতে পারবে না, তাই। ‘
নির্লিপ্ত কন্ঠ সাফওয়ানের। তার এমন দায়সারা ভাব দেখে রাগে, দুঃখে সায়েরীর কান্না পেলো। থমথমে মুখ করে সে বললো,

‘ আপনি চাচ্ছেন টা কি বলুন তো? আপনার এখানে আছি একথা বাসায় জানলে কি হবে তার সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে আপনার? ‘
সাফওয়ান মাথা নেড়ে পূর্বের ন্যায় জবাব দিলো,
‘ একদম আছে। সেজন্যই আমাদের বন্ধু রাতুলের কোচিং-এ ভর্তি করানোর আইডিয়া দিয়েছি আবরার কে। অবশ্য তোমাকে সেখানে ভর্তি করানোর ব্যাপারে কিছু বলতে হয়নি আমাকে। আমি শুধু আমার বন্ধুর একটু গুনগান করেছিলাম। সাথে বলেছি সাফাও সেখানে পড়ে বলে তার রেজাল্ট খুব খুব ভালো হয়েছে। বাদ বাকি তোমার ভাইয়ের দোষ। ‘

সাফওয়ানের শান্ত মস্তিষ্কের এমন রাজনীতি শুনে সায়েরী বিষ্ময়ে হতবুদ্ধি। কেমন ঢপ খাওয়াল তার ভাইকে! বড় গলা করে সব স্বীকার করে এখন আবার বলছে সব দোষ তার ভাইয়ের! কত দুর্দান্ত চালাক এই ছেলে! ইচ্ছে করে বন্ধু রাতুলের কোচিং-এর কথা বলেছে। যেন আবরার সায়েরীর খোঁজ নিলে রাতুল সবটা ম্যানেজ করতে পারে। এতো সেয়ানা!
সায়েরীকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাফওয়ান ভ্রুঁ নাচাল। তা দেখে দ্রুত নজর সরিয়ে নিলো সায়েরী। দুই পা গুটিয়ে বসে ধপ করে মুখ গুঁজে দিলো টেবিলে রাখা বইয়ের ভাজে। মিনমিন কন্ঠে বললো,
‘ আপনার মতো খারাপ মানুষ আমি আর একটাও দেখিনি। ‘
অগোচরে ঠোঁট চেপে একটুখানি হাসলো সাফওয়ান। এরপর সময় দেখে বললো,
‘ দশটা বাজতে চলেছে। গুছিয়ে নাও সব। কলেজে যেতে হবে। ‘

ঘুমের তাড়নায় চোখের পাতা ভারি হয়ে এসেছে সায়েরীর। ইচ্ছে করছে দিন দুনিয়ার মায়া ছেড়ে শুধু ঘুম দিতে। এমন মুহুর্তে সাফওয়ানের কথাটা কর্ণগোচর হতেই বেজায় বিরক্ত হলো সে। বিরক্ত কন্ঠেই জবাব দিলো,
‘ অসম্ভব! এই মুহূর্তে আমি এখান থেকে একটুও নড়ছি না। আপনার যাওয়ার হলে চলে যান। যেখানে খুশি যান কিন্তু আমাকে ডাকবেন না। আমি ঘুমাব। শেষ কবে এতো সকালে উঠেছি কে জানে। মানুষ কিভাবে এত সকালে উঠে ফ্রেশ ফিল করে? হাউ? ‘

বলতে বলতে কন্ঠ বুজে আসলো তার। চোখ জ্বালা করা ঘুম থেকে কিছুতেই নিজেকে দূরে রাখতে পারলো সে। পাড়ি দিলো অসময়ের ঘুমের রাজ্যে। সাফওয়ান চেয়ে চেয়ে দেখল শুধু এই দৃশ্য। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। টেবিলে দুইহাত রেখে তাতে থুতনি ঠেকিয়ে সে অনিমেষ তাকিয়ে রইলো সায়েরীর দিকে। মুখের একাংশ দেখা যাচ্ছে মেয়েটার। তাও আবার বেবি হেয়ার দ্বারা ঢেকে আছে। সাফওয়ান হাত বাড়িয়ে কানের পিঠে গুজে দিলো তা। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ছুঁয়ে দিলো তুলতুলে নরম গালটা। মনে মনে ভাবলো নিজের এবং সায়েরীর অনাকাঙ্ক্ষিত এই সম্পর্কের কথা।

নিজের চেয়ে সম্পূর্ণ রূপে বিপরীত স্বভাবের এই মেয়ের প্রেমে পড়াটা অনাকাঙ্ক্ষিত বটে। কিন্তু ভালো যখন বেসেই ফেলেছে এখন যে সরে আসার ইচ্ছে নেই তার। তাই সে মেয়েটাকে নিজের মতো করে গড়তে চাই। যদিও সায়েরীর এই চঞ্চল, হাস্যজ্বল, বোকাসোকা স্বভাব-টাই বেশ পছন্দ করে সে। তবুও কিছু কিছু ব্যাপার সে পাল্টাতে চায়। স্বার্থপর এই পৃথিবীতে মেয়েটাকে একা বাঁচার মতো করে গড়ে তুলতে চায়। ছোট থেকে বাবা,ভাই,বন্ধু সকলের ছায়াতলে বেড়ে উঠেছে সায়েরী। কিন্তু তাদের অবর্তমানেও নিজেকে রক্ষার করার মতো সাহস,শক্তি জোগাতে চাই মনে। বিগত কয়েক মাসেই তো কত ঝড়, ঝাপ্টা গেল সায়েরীর উপর। যার সবচেয়ে বড় কারণ হলো সায়েরীর এই অবুঝ পনা। ঠিক এই বিষয়গুলো-ই সায়েরীকে বুঝাতে চাই সে। মেয়েটা এখনো কোমল একটি কলি মাত্র। এই কলিকে সাফওয়ান নিজের মন মতো ফুলের আকার দিতে চাই। এবং তার বিশ্বাস, এই প্রচেষ্টায় সে শতভাগ সফল হবে। তাকে যে হতেই হবে।

জাদিদ এহসানের বাসা থেকে বিয়ে নিয়ে বেশ প্রেসার আসছে। কত ভালো প্রস্তাব। ছেলে কার্ডিওলজিস্ট। ছেলের বাবা সাইকিয়াট্রিস্ট। মা বর্তমানে গৃহিণী। কিন্তু বছর কয়েক আগ অবধি কলেজের প্রফেসর ছিলেন। বড় ভাই ভাবি দুজনেই ডক্টর। সিম্পল, শিক্ষিত পরিবার। ছেলে দেখতেও বেশ সুদর্শন। এমন প্রস্তাব কোনো মেয়ের বাবা-ই নাকচ করবে না। ইরা’র বাবাও করলেন না। বিগত কয়েক মাস যাবত একমাত্র ইরার সম্মতি না পাওয়ার কারণে এই প্রস্তাব ঝুলে ছিলো। জাদিদের মা এই কারণে বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন। উনার ভাষ্যমতে সাধারণ এক মেয়ের পেছনে নিজের সোনার টুকরো ছেলের এত সময় ব্যয় করাটা অযাচিত। এর চেয়েও হাজার গুনে ভালো, সুন্দরী মেয়ে পাবেন তিনি।

এমন মনোভাব নিয়ে বেশ কয়েকবার অন্য মেয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন তিনি জাদিদের কাছে। কিন্তু জাদিদ প্রতিবারই ফিরিয়ে দিয়েছে সব প্রস্তাব। গত পাঁচ, ছয় মাস যাবত সে এক ইরা ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। জাদিদের এই মনোভাবে ইরা নিজেও বেশ বিরক্ত। সে কোনো ভাবেই এই মুহূর্তে প্রস্তুত ছিল না বিয়ের জন্য। কিন্তু নিজ পরিবার এবং জাদিদের পরিবার থেকে বেশ চাপ এসেছে। যদিও জাদিদ বারবার তাকে আশ্বস্ত করে বলেছে সময় নিতে। তার পক্ষ হতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কিন্তু ইরার নিজের পরিবারই তাড়াহুড়ো করছে। রীতিমতো জোর করছে তাকে। এদের চাপে পড়েই ইরা রাজি হয়ে গিয়েছিলো বিয়ের জন্য। কিন্তু তবুও সময় চেয়ে নিয়েছে একটু।

কিন্তু জাদিদের পরিবার ছেলের বউ ঘরে তোলার জন্য বেশ উদগ্রীব হয়ে আছে বলে ইরার উপর চাপ পড়ছে। এইতো অল্প কিছুক্ষণ আগেই তার বাবা একদফা চিল্লাফাল্লা করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। যেতে যেতে ইরার সাথে মিহাদকে টেনেও কথা বলতে ভুলেননি। মুখ দিয়ে যত বাজে শব্দ আসে সব উগলে দিয়েছেন মিহাদের উদ্দেশ্যে। সেসব শুনেই ইরা রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। কাঁদতে না চাইলেও চোখের পানি বাঁধা মানল না তার৷ নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিলো অনেক্ষন। এরপর বালিশের পাশ হতে মোবাইলটা তুলে নিল সে। গতকালই নতুন সিম কিনে এনেছিল। কারণ আগের দুটো নাম্বার-ই ব্লক করে রেখেছে মিহাদ। সব যায়গা হতে ব্লক করেছে সে ইরাকে। মিহাদের এমন পদক্ষেপ গুলো ইরাকে প্রতি মুহুর্তে ভাবায়। চোখের পলকে কেমন পালটে গেল ছেলেটা। অথচ নেই কোনো কারণ। আছে কেবল প্রশ্ন আর প্রশ্ন। যে, কেনো করলো সে এমন?

নির্দিষ্ট নাম্বারটি তে ডায়াল করে ফোন কানে চাপলো ইরা। রিং হওয়ার সাথে সাথে তার হৃদস্পন্দন ও কাঁপছে। পরপর চারবার রিং বাজার পর গিয়ে রিসিভ করলো উপাশের ব্যাক্তিটি। ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো, ‘ হ্যালো! ‘
কন্ঠটা শুনে ধ্‌ক করে উঠলো ইরার বুক। পুণরায় টলমল জলে ভরে উঠলো চোখজোড়া। কন্ঠস্বর রূদ্ধ হয়ে এসেছে তার। অন্যদিকে জবাব না পেয়ে মিহাদ পুণরায় বলে উঠলো,

‘ হ্যালো! কে বলছেন? ‘
এবারেও জবাব দিতে পারলো না ইরা। বড় করে শ্বাস ফেলে স্বাভাবিক করতে চাইলো নিজেকে। এরমাঝেই কানে আসলো ধুপধাপ আওয়াজ। ইরা বুঝে উঠতে পারলো না কিছু। পিনপতন নীরবতা বিরাজমান উভয় পক্ষেই। মিনিট খানিক পার হওয়ার পর ভেসে আসলো মিহাদের শান্ত কন্ঠের ডাক, ‘ ইরা!! ‘
সঙ্গে সঙ্গে সর্বাঙ্গে কাঁপন ধরল ইরার৷ মিহাদ কীভাবে বুঝে ফেলল যে সে ফোন দিয়েছে? নিশ্চয়ই অনুভব করতে পেরেছে৷ এমন টান থাকার পরেও ছেলেটা কীভাবে বলতে পারে ভালোবাসে না। কেন এমন করছে সে?

‘ তুই কিছু বলবি? নাকি আমি কল কাটবো? ‘
একথা শুনে ইরা দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো। যথাসম্ভব স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, ‘ কেমন আছিস? ‘
‘ ভালো। ইম্পর্ট্যান্ট কিছু বলার থাকলে বল। আমার কাজ আছে। ‘
কেমন পাষাণ কণ্ঠের বাণী। এই ছেলের নামে বাজে কথা বলেছে শুনে সে কাঁদছিল এতক্ষণ! যে তাকে ছাড়াও দিব্যি পরে পরে ঘুমাচ্ছে৷ একটাবার খোঁজ অবধি নিচ্ছে না কেমন আছে সে। এতটা পালটে গেল কি করে!
‘ কিছু বলবি না আমি.. ‘
‘ ব..বলছি। বলছি। কল কাটিস না প্লিজ! ‘
‘ ঠিক আছে, বল। ‘

‘ অ..আমি দেখা ম..মানে আমি তোর সাথে দেখা করতে চাই মিহাদ। না বলিস না। ভেবে নে এটাই শ..শেষবার। ‘
কন্ঠস্বর অসম্ভব রকমের কাঁপছে ইরার। “শেষবার” এটা বলতে গিয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ বইয়ে যাচ্ছিল যেন। মিহাদকে নিশ্চুপ দেখে সে ফোন চেক করে। নাহ, এখনো ডিসকানেক্ট হয়নি। তা দেখে সে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ এই শেষবার। আর কখনো কোনো আবদার, অভিযোগ, অভিমান নিয়ে আসবো না তোর কাছে। শেষ ইচ্ছেটা অন্তত পূরণ কর। ‘
সেকেন্ড দুয়েক পর শুনা গেলো মিহাদের কন্ঠ,
‘ ঠিক আছে। এড্রেস টেক্স করে দিস। ‘
বলেই কল কেটে দিলো সে। ইরা থমকাল কন্ঠটা শুনে। এমন কেনো শোনাল হঠাৎ মিহাদের কন্ঠস্বর! হঠাৎ কি হলো?

সায়েরীর যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন ঘড়ির কাটায় এগারোটা বরাবর। পিটপিট করে চোখ মেলে সে হাত, পা টান টান করে আলসেমি ছাড়লো । বেশ আরামদায়ক ঘুম হয়েছে। উম উম কোথাও ডুবে আছে যেন সে। ভালো করে চোখ মেলে তাকাতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা ঠেকল তার। ভাবল, এ কোথায় এসে পড়লো সে! পরমুহূর্তেই মনে পড়া মাত্র সে দ্রুত উঠে বসলো শোয়া থেকে। লক্ষ্য করলো লিভিং রুমের বিশালাকৃতির সোফা টাতে শুয়ে আছে সে। গায়ের উপর একখানা পাতলা ব্ল্যাঙ্কেট। মাথায় নিচে নরম কুশনও ছিলো। সব কিছু লক্ষ্য করে সায়েরী আচমকা লজ্জা পেয়ে গেলো। নিঃসন্দেহে এই কাজ সাফওয়ান ভাইয়ের। ইশ! বেক্কলের মতো তখন ঘুমিয়ে গেল কেনো? এখানে কি ঘুমানোর জন্য এসেছে নাকি সে? অবশ্য তখনের আকাশচুম্বী ঘুম গুলোকে কাবু করার সাধ্য তার ছিলোই না৷ সে যাই হোক, ঘরটা এমন নিস্তব্ধ হয়ে আছে কেনো? সাফওয়ান ভাই কোথায়? ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ালো সে। জামা কাপড় ঠিক করতে করতে অনুভব করলো ক্ষুধায় পেট চুঁ চুঁ করছে। সকালেও ঠিক করে কিছু খেয়ে আসেনি সে। ডাইনিং টেবিলে পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা বইগুলোর পাশ থেকে নিজের ব্যাগটা তুলে নিলো সে। মোবাইল বের করে দেখলো এগারোটা বাজে৷ এত সময় কীভাবে পার হয়ে গেল! এতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে!

চোখ ঘুরিয়ে আবারো আশেপাশে তাকিয়ে সাফওয়ান কে খুঁজল সে। ধীর কন্ঠে ডেকেও দেখলো। কিন্তু পেলো না কোথাও। এদিকে ক্ষুধায় পেটে ইঁদুর ছুটছে তার। সহ্য করতে না পেরে এবার সে নিজেই এগিয়ে গেলো কিচেনের দিকে। প্রথমে ঘুরঘুর করে পরখ করলো সবটা। কোথায় কি আছে কে জানে। ফ্রিজে মন মতো কিছু না পেয়ে এবার সে পায়ের পাতা উঁচু করে কেবিনেট খুলে দেখল। প্রথমটা খুলেই সে পায়ে ভর দিয়ে হাত বাড়ালো। দেখতে পারছে না বিধায় হাত দিয়েই কিছু খোঁজার প্রচেষ্টা চালালো। এবং ভগ্যবশত প্যাকেট জাতীয় কিছু খচমচ করে উঠলো তার হাতের চাপে। সায়েরী কিছু না পেয়ে দুই পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করলো প্যাকেট গুলোর নাগাল পাওয়ার। ভাগ্য সহায় ছিল বলে পেয়েও গেল।

টান দিলো সঙ্গে সঙ্গে। মুহুর্তেই সাদা সাদা পাউডার জাতীয় কিছু এসে চুল, চোখ, মুখে পড়লো তার। সেই সাথে ভারী কিছু আঁচড়ে পড়ল ফ্লোরে। সেই শব্দে সায়েরী সহ নিস্তব্ধ বাড়িটিও কেঁপে উঠলো। নিজের এমন বেক্কল মার্কা কাজে সায়েরী নিজেই হতবাক। এদিকে চোখ মেলে তাকাতেও পারছে না৷ শব্দ শুনেই কিছু মুহুর্তের মধ্যে ছুটে আসলো সাফওয়ান। কিচেনে ঢুকে সায়েরীকে এমন অবস্থায় দেখে সে বাকহারা হয়ে গেল। হুশ ফিরল সায়েরী চোখে হাত দিয়ে ছটফট করছে দেখে। দ্রুত কদম ফেলে সে উদ্বিগ্ন কন্ঠে ডাকল, ‘ সুবহা! ‘

সাফওয়ানের উপস্থিতি বুঝে সায়েরী আরও বেশি ছটফটিয়ে উঠল। করুণ কন্ঠে আর্জি জানাল পানি দেওয়ার জন্য। তার অবস্থা বুঝতে পেরে সাফওয়ান দ্রুত সিংকের কাছে নিয়ে গেল তাকে। কল ছেড়ে নিজ হাতেই সায়েরীর মুখে পানি ছিটিয়ে দিল। পরপর কয়েকবার একই কাজ করার পর গিয়ে স্বাভাবিক হলো সায়েরী। চোখ মেলে শুরুতেই দেখতে চাইল ঠিক কোন আকাম ঘটিয়েছে আজ। দেখল কেবিনেটের নিচের তাক হতে ফ্লোরে ছড়িয়ে আছে ময়দা জাতীয় কিছু। সেই সাথে আবার বৈয়ম হতে কিছু সরঞ্জামও ছিটকে পড়েছে। সায়েরী ঢোক গিলে সেসব দেখে। আড়চোখে তাকায় সাফওয়ানের দিকে। তার দিকেই তাকিয়ে আছে ছেলেটা। চোখাচোখি হতেই সায়েরী আমতাআমতা করে বলে উঠলো,

‘ আ..আমি মানে..আসলে.. ‘ কথাটুকু শেষ করতে পারলো না সে৷
তা দেখে সাফওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,
‘ কি করছিলে এখানে? ‘
‘ খিদে পেয়েছিলো। ‘ সায়েরীর নি;সঙ্কোচ জবাব।
পরপরই আবার মিনমিন কন্ঠে বললো, ‘ সরি। ‘
সাফওয়ান জবাব দিলো না সেকথার। পূর্ণ দৃষ্টিতে চাইলো শুধু সায়েরীর দিকে। আগাগোড়া সাদা হয়ে আছে সে। তা দেখে সাফওয়ান শান্ত কন্ঠে আদেশ ছুড়ল,
‘ এসব ক্লিন করে আসো। ‘
সায়েরী যেন এমন কিছু শুনার অপেক্ষতেই ছিলো। তাই তো সাফওয়ানের বলা মাত্র দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল সে। তার গমন দিকে তাকিয়ে পুণরায় ফ্লোরে দৃষ্টিপাত করলো সাফওয়ান। একহাতে কপাল ঘষে বিরক্তিতে ‘চ’ শব্দ করে বিড়বিড় করে আওড়াল, ‘ ঝামেলা!’

সায়েরী নিচ তলার একটা রুমের ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে। সময় লেগেছে প্রায় বিশ মিনিট। চুল সব সাদা হয়ে গিয়েছিলো বলে পানি দ্বারা পরিষ্কার করতে গিয়ে অর্ধেকের বেশি ভিজিয়ে ফেলেছে চুল সব। বাধ্য হয়ে খোপা খোলা রেখেছে তাই। রুমের দরজা খুলে বের হওয়া মাত্র দারুণ এক সুঘ্রাণ এসে ঠেকল নাকে। পেটের আধমরা ইঁদুর সব পুণরায় ছুটাছুটি শুরু করেছে যেন। সায়েরী ঢোক গিয়ে গলা ভেজাল। এরপর ধীর পায়ে এগুল কিচেনের দিকে। প্রবেশ পথে গিয়ে হঠাৎ-ই থমকাল সামনের দৃশ্যটুকু দেখে। চুলোর সামনে কিচেন ক্লথ গায়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। গ্রে কালারের ফুল হাতা টি-শার্ট টা কনুই অবধি ফোল্ড করে রেখেছে। স্প্যাচুলার সাহায্যে ফ্রাই পেন-এ নাড়া দিচ্ছে মৃদু মৃদু। কিচেনের সবদিক একদম চকচকে পরিষ্কার। এসব কিছু লক্ষ্য করে সায়েরীর চোখ ছানাবড়া। বিশেষ করে সাফওয়ান রান্না করছে, এবং তা হতে এমন সুন্দর ঘ্রাণ বেরুচ্ছে দেখেই ভীমড়ি খেয়ে গেছে বেচারি। পেছন থেকেই সাফওয়ানকে আগাগোড়া পরখ করে সে বুকে হাত চেপে বিড়বিড় করে বললো,

‘ ও মাই আল্লাহ! এতো দেখছি আগাগোড়া হাসবেন্ড ম্যাটেরিয়াল! ‘
পরপরই তার নজর গেল পাশে অবস্থানরত সিলভার রঙের ফ্রিজটার দিকে। যার চকচকে গায়ে স্পষ্ট সায়েরীর অবয়ব দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে সায়েরী পুণরায় বিড়বিড়িয়ে উঠলো। ঠোঁট উলটে বলল,
‘ আর তুই হলি এক নাম্বারের অকর্মা। আস্ত ঢেঁড়স। ‘
চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে সে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো সাফওয়ানের কাছে। পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে কৌতুহলী কন্ঠে জানতে চাইলো, ‘ কি করছেন? ‘
সাফওয়ান জবাব দিলো না। সায়েরী নিজেই দেখল পাস্তা রান্না করা হয়েছে। দেখেই জিহ্বে পানি চলে এসেছে তার। উফফ্‌ এত্ত বেশি ক্ষুধা লাগছে কেনো আজ!
‘ দূরে সরো। অন্যদিকে গিয়ে বসো। ‘

বলা মাত্র বাধ্য মেয়ের মতো চুলোর পাশ হতে সরে গেল সায়েরী। এক লাফে সিংকের পাশের স্থানে উঠে বসলো। বেশ আরাম করে, দুই পা গুটিয়ে। এরপর দৃষ্টি দিলো সাফওয়ানের দিকে। তখন পেছন থেকে দেখেছিল বলে ঠিক করে লক্ষ্য করেনি। কিন্তু এখন দেখেই চমকে উঠেছে। আজকে রোদের তাপমাত্রা এমনিতেই বেশি৷ কিচেনের এডজাস্ট ফ্যানিটাও বন্ধ। আগুনের তাপে ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা সাফওয়ানের। মুখটা একদম পাকা টমেটো হয়ে আছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম কপাল,নাক,গলা এবং ঘাড়ে৷ বুকের কাছটায় ভিজে গিয়ে টি-শার্ট লেপ্টে আছে। তাতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে শক্তপোক্ত বুকটার অবকাঠামো। এই দৃশ্যে সায়েরীর বুক কাঁপে। সারাজীবন উপন্যাসের পাতায় মেয়েদের রূপের বর্ণনা পড়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখছে ঠিক উল্টো-টি। সে ভাবল, তার সম্মুখের মানবটার, এই অগোছালো সুদর্শন রূপ দেখলে কবিগণ নির্ঘাত উপন্যাসের পাতায় এই সৌন্দর্য লিখতে বাধ্য হতো। হতেই হতো।

সাফওয়ান সেই কবে প্লেটে পাস্তা তুলে সায়েরীর সামনে ধরে আছে। কিন্তু মেয়েটার ধ্যান নেই সেদিকে৷ সে অনিমেষ তাকিয়ে আছে। সাফওয়ানের ঠোঁটের কোণে না চাইতেও হাসি ফুটে উঠলো এই চাহনি দেখে৷ ভেজা হাতের অবশিষ্ট পানিটুকু সে ছিটিয়ে দিলো সায়েরী’র চোখে,মুখে। তাতেই চমকে উঠে ধ্যান ভগ্ন হলো মেয়েটার। চোখ তুলে চাইতেই সাফওয়ান নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ দেখার জন্য সারাজীবন পড়ে আছে। আপাতত খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো। ‘
সায়েরী লজ্জা পেলো। বললো না কিছু। বিনাবাক্য প্লেট হাতে নিয়ে সে চামচের সাহায্যে দ্রুত পাস্তা মুখে তুলল। খিদে পেটে এই সাধারণ খাবার টাও অমৃত লাগছে তার কাছে। সাফওয়ান আড়চোখে পরখ করে সেটা। সায়েরীকে তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখে সে গর্বের সহিত বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানে। কিচেন অ্যাপ্রোন টা খুলে নিজেও সায়েরীর পাশে দাঁড়িয়ে প্লেট তুলে নিলো হাতে।

‘ আপনাকে যতটা খারাপ ভেবেছিলাম আপনি ততটাও খারাপ না। ভুল ছিলাম। যা-ই হোক, থ্যাঙ্কিউ। ‘
খেতে খেতে বলা কথাটা শুনে সাফওয়ান ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। এটা কমপ্লিমেন্ট ছিল! এই ধরন কমপ্লিমেন্ট দেওয়ার! তাকে তাকাতে দেখে সায়েরী মিটিমিটি হাসে। বলা বাহুল্য, সাফওয়ানের এই কপাল কুঁচকে রাখা, বিরক্তিকর চাহনিতে তাকিয়ে থাকার ব্যাপারটা বেশ এনজয় করছে সে।
‘ দ্রুত শেষ করো। আমার কাজ আছে। তোমাকে পৌঁছে দিতে হবে। ‘
সায়েরী খালি প্লেট নিয়ে সিংকে ধুতে গেলেই সাফওয়ান বলে উঠে,
‘ ওসব থাক। মেইড ক্লিন করবে৷ ‘
‘ মেইড! এখানে আরও কেউ থাকে? ‘
‘ আমি থাকি। মাঝেমাঝে। ‘

এত সুন্দর জয়েন ফ্যামিলি রেখে এমন নিস্তব্ধ ঘরে এসে থাকার মানে খুঁজে পেলো না সায়েরী। হুহ! খাটাশ! সবাই আছে বলেই হয়তো এখানে এসে থাকে।
কথা না বাড়িয়ে প্লেট দুটো সহ অপরিষ্কার পাত্র সব সিংকে রেখে হাত ধুয়ে কিচেন থেকে বের হওয়ার জন্য উদ্যত হতেই আচমকা তার হাত টেনে ধরলো সাফওয়ান। সায়েরী চমকে উঠলো আকস্মিক এমন হওয়ায়। মাথা তুলে তাকাতেই সাফওয়ান তার হাত ছেড়ে আলতো করে চেপে ধরে দুইগাল। এরপর বিনাবাক্যে হাতে থাকা টিস্যুর সাহায্য সায়েরীর ঠোঁটের চারপাশ মুছে দিতে দিতে বিরক্ত মুখে বললো,

‘ তোমার মতো ম্যাসি পারসন আমি আর একটাও দেখিনি। ‘
সায়েরী প্রতিউত্তর করলো না। ছাড় পাওয়া মাত্র দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো। টেবিলে গুছিয়ে রাখা বই,খাতা গুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিতে নিতে বললো,
‘ কাল সকাল সকাল জ্বালাবেন না বলে দিলাম। আর ম্যাথ যা দিয়েছেন ওসব কাল কলেজে দেখিয়ে দিব। তাহলেই তো হলো। ‘
‘ একদম না। কলেজে যেন তোমাকে আমার ধারে কাছেও না দেখি। ‘
একথায় সায়েরী অবাক কন্ঠে সুধায়, ‘ কেনো? ‘

সাফওয়ান নিশ্চুপ। এই তো সপ্তাখানেক পরই ইলেকশন তার বাবার। রাজনৈতিক এসব ঝামেলায় প্রতিমুহূর্ত সাফ্রিন, সাফওয়ান সহ পুরো পরিবারকে সেইফটি মেনে চলতে হচ্ছে। কলেজে দুই দুইবার আক্রমণ হয়েছে সাফওয়ানের উপর। প্রথম বারে সায়েরী নিজেও সাক্ষী ছিলো। এজন্যই সাফওয়ান চাচ্ছে না কেউ তার সাথে সায়েরীকে লক্ষ্য করুক। দুর্বলতা আঁচ করতে পেরে ক্ষতি করুক।
‘ কিছু বলছেন না কেনো? ‘

‘ বলতে চাচ্ছিনা তাই। আর শুনে রাখো, কাল সকাল আটটার আগেই যেন তোমাকে রোডে দেখি। আটটা টু দশটা তুমি এখানেই পড়বে। এরপর কলেজে যাবে। আজ ফাঁকি দিয়েছ বলে রোজ এমন হবে, এমন চিন্তা ছুড়ে ফেলো তোমার এই মোটামাথা থেকে। চলো এখন। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৫+৪৬

গম্ভীর কন্ঠে নিজের মতামত পেশ করে গাড়ির চাবি নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হলো সাফওয়ান। সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না তার ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত এখন। রাগ করবে? রাগ ঝাড়বে? প্রতিবাদ করবে? নাকি হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবে? কাঁদতেই তো ইচ্ছে করছে৷ তাও একদম গলা ফাটিয়ে। রাগে, দুঃখে বই দিয়ে ধুমধাম কপালে বাড়ি দিলো সে। মিছিমিছি কান্নার সুর তুলে বললো,
‘ সবার প্রেমিক এত্তো মিষ্টি। আমার টাই কেনো তিতা করলা হতে হলো খোদা! ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৯+৫০