The Silent Manor part 75
Dayna Imrose lucky
রাফিদ চমকে উঠল। ‘মানে?আর কেনই বা মেরেছে?’
“সম্মান। মানসম্মান এর ভয়ে। তোমার আর মোহিনীর মধ্যে প্রেম চলছিল,এটা মাস্টার আগে থেকেই সন্দেহ করছিলেন। এরপর প্রমাণও পান। তিনি মোহিনী কে অনেক বোঝালেন। তোমাকে ভুলে যেন অন্য কাউকে বিয়ে করে নেয়। কেননা, তাঁর সাথে তোমার বাবার ভালো একটা সম্পর্ক। যদি আমজাদ চৌধুরী জানতে পারতেন, তবে মোহিনী কে দোষারোপ করত। মাস্টার কে দোষারোপ করত।
তাঁর সম্মান, শিক্ষা নিয়ে কথা বলতেন। উনি এসব ভেবেই মোহিনী শেষবারের মত বলে তোমাকে ভুলে অন্য কাউকে বিয়ে করতে। কিন্তু মোহিনী রাজি হয়নি,বরং জানায় ও ওদিন রাতে তোমার সাথে পালিয়ে যাবে। তোমাকে বিয়ে করবে।আর মাস্টার নিজের সম্মান কে রক্ষা করতে নিজের মেয়েকে বলি দিয়েছে। যেভাবে পাঁঠা বলি দেয়া হয়।মীর এর বিয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পড়েই তিনি মোহিনী কে খু’ন করেন। এরপর আমাকে দিয়েই মেয়ের জানাযা সম্পন্ন করেন। পরদিন রাতে তোমরা আমাকে উনার সাথে দেখেছিলে। ওদিন ই উনার সাথে শেষ দেখা হয়েছে।এখন কোথায় গেছে জানি না।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রাফিদ সবটা শোনার পর ভেঙ্গে পড়ল।দু চোখ বেয়ে ঝড়তে শুরু করে নোনাজল। মৌলভী চলে যান।আহির রাফিদ এর কাঁধে হাত রেখে বলল “সামলা নিজেকে। তবে তোকে কি বলে শান্তনা দেব বুঝতে পারছি না। আমি এরকম পাষান বাবা দেখিনি। নিজের সম্মানের কথা ভেবে নিজের মেয়েকে কোরবানি করল।সমাজ, সভ্যতা,ধন দৌলত এর কাছে এই ভালোবাসা গুলো হেরে কেন যায়!’ আহির নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল।যার উত্তর তাঁর কাছেও নেই।
দিন ফুরিয়ে বিকেলের আগমন নেমে আসে ধরণীতে।মায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি বুকে জড়িয়ে রেখেছে। ভাবনার জগতে পাখা মেলে উড়ছিল সে। সেখানে মীর ছিল। দমকা হাওয়া এসে ভাবনাটা ভাঙ্গিয়ে দেয়।মায়া ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসে।বইটি বুকে থেকে সরিয়ে দেখে। আলতো হাতে ছুঁইয়ে দেয়। ভাবে সুফিয়ান হায়দার এর কথা। মানুষটি জীবনে কিছুই পেল না। আক্ষেপ নিয়েই জীবনের ইতি টানল।ফারদিনাকে শেষবারের মত দেখেনি। ছুঁতে পারেনি। তাঁর সন্তান কে দেখেনি। অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছিল তাঁর জীবন। তাঁর রক্ত বইছিল মীর এর শরীরে। ভাবতেই অবাক হচ্ছে মায়া। কিন্তু যখনই তাঁর মনে পড়ল তাঁর স্বামী আর দুনিয়াতে নেই,বুকটা কেঁপে উঠে।
তৃষ্ণা আসে তাঁর ঘরে। আজকাল মায়া তৃষ্ণার সাথেও খুব একটা মিশে না।কারো সাথে তাঁর কথা বলতে ভালো লাগে না। গতকাল থেকে গৌরী কে খুঁজেছে। হঠাৎ মনে পড়ে তাঁর কথা।সবাই বলে গৌরী কোথাও চলে গেছে।মায়া আবার একজন কে বোধহয় হারিয়ে ফেলেছে। কষ্ট হচ্ছিলো তার।
তৃষ্ণা মায়ার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়।বলল “সারাদিন মন ভার করে বসে থাকিস।এভাবে থেকে তো বেঁচে থেকেও মরে যাবি।চল বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”
মায়া মাথা নাড়িয়ে বলে সে যাবে না। তৃষ্ণা আবার ও বলল “না বলিস না।চল!দেখ,তোর জন্য কারোরই মন ভালো নেই।মীর ভাইয়া চলে যাওয়ার পর থেকে সবার অবস্থা নাজেহাল। তার উপর তুই এরকম থাকলে তাঁরা কিন্তু আরো কষ্ট পাবে।তাই নিজেকে একটু সময় দে।আর ডাক্তার,হাকিম তাঁরা বলেছেন, তোকে হাসাতে। ভালোবাসা দিতে। এমন কোন ঘটনা তোর চোখের সামনে ঘটুক যাতে তুই কথা বলিস।” বলে তৃষ্ণা হাসে।
মায়া কোন প্রতিক্রিয়া করছে না। ঘুরেফিরে দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি দেখছে। তৃষ্ণা গাল বাঁকিয়ে ব্যথিত হাঁসি হেঁসে বলল “এটা দেখে আর কি হবে,সব তো শেষ। সুফিয়ান হায়দার শেষ কি বলতে চেয়েছিল সেটা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। তিনি বিদেশের মাটিতে এত বছর কেন ছিলেন কেউ জানে না।”
মায়া ঘন দম ফেলল।তখন শালুক ও এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি। শুধু বলেছিলেন, সুফিয়ান হায়দার একজন রহস্যময় মানব ছিলেন।মায়ার আফসোস হচ্ছে, সবকিছু অজানা বলে। রহস্যময় মানবের সবকিছু কি রহস্যই থেকে যাবে?
মায়া বলল ‘চল যাই! উত্তর এর ওদিকে যাব। জঙ্গল টা শুনেছি কেটেকুটে আবার সাফ করেছে। সুন্দর দেখায় এখন আরো।তুই এই সাদা রঙের শাড়ি বদলে নে।আমিও তৈরি হয়ে আসছি।” বলে তৃষ্ণা চলে গেলেও মায়ার বাইরে বের হওয়ার এতটুকু আগ্রহ নেই।সে বারান্দা ছেড়ে ঘরে এসে খাটের উপর বসে।বইটা পাশে রেখে দেয়।মীর এর কথা ভাবতেই বালিশের নিচে হাত ঢুকিয়ে তাঁর দেয়া বাঁশিটি বের করে। চোখের মৃদু জল এসে বাঁশিতে পড়ল।মায়া তাৎক্ষণিক মুছে ফেলল।এমন সময় শালুক আসেন একগ্লাস দুধ নিয়ে।তখন দেখেছিলেন মায়ার শরীরে জ্বর। তিনি দুধটা টেবিলে রেখে বাঁশিটি দেখে। কিছুটা আশ্চর্য হয়ে বললেন “বাঁশিটা কোথায় পেলি!কত সুন্দর!কে দিয়েছে!”
মায়া শালুকের প্রশ্নে বিব্রত হয়।মীর এর বলা অনুযায়ী বাঁশিটি শালুক দিয়েছেন। তবে তাঁর অবাক হওয়ার তো কোন কারণ দেখতে পাচ্ছে না সে। এরপর ইশারায় বলল “বাঁশিটা মীর দিয়েছিল।আর তুমিই তো তাঁকে এটা উপহার দিয়েছো!”
শালুক নির্বাক হয়ে বললেন “আমি কেন ওকে বাঁশি দেব!ও তো বাশিই বাজাতে পারে না।”
মায়া বোঝায় “মা তুমি কি নিশ্চিত?”
“হুম। শতভাগ।মীর কখনো বাঁশি ছুঁয়ে দেখেনি।আর ও বাঁশি বাজাতে পারে না নিশ্চিত।হয়ত সুফিয়ান হায়দার বাজাতে পারতেন। তবে মীর দেখতে এবং ব্যক্তিত্ব সুফিয়ান হায়দার অর্থাৎ বংশের মত হলেও বাঁশি ও কখনো বাজাতে পারত না।”
মায়া শালুকের কণ্ঠে এহেন কথা শুনে আকস্মিক হকচকিয়ে গেল।মীর তাঁর সাথে মিথ্যা বলেছে। কিন্তু কেন বলেছে? তাহলে জঙ্গলে সেদিন কার বাঁশির সুর শুনেই বা মায়া ছুটে গিয়েছিল!মীর এর কাছে এরুপ বাঁশি কিভাবে এল!মায়া একাধিক প্রশ্নে জড়জড়ির হয়ে গেল। শালুক হাতে দুধটা নিলেন। বললেন ‘দুধটা খেয়ে নে।’ মায়া এক ধ্যানে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে বাঁশিটি।মীর কে অবিশ্বাস করবে,নাকি নিজেই নিজের প্রশ্নের জবাব খুঁজবে! কিচ্ছুটি তাঁর মাথায় আসছে না। শালুক মেয়ের অভিব্যক্তি দেখে দুধটা পাশে রেখে বলেন ‘দুধটা খেয়ে নিস।’ বলে চলে যান তিনি।
মায়া পুনরায় ভাবনার জগতে ডুবে গেল।একটা স্বপ্ন ভেসে উঠে।সকাল হয়েছে।সে সকালের পাখিদের কলকাকলিতে ঘুম থেকে উঠে যায়। শরীরে তখনো বিয়ের সাজ।পাশে তাকিয়ে দেখে মীর ঘুমাচ্ছে।সে হাসে তাঁকে দেখে।ঠিক কিছুক্ষণ পর রোদের কড়া ঝিলিকে ঘুম ভাঙ্গে মীর এর।আর সে মায়াকে আদুরে হাতে স্পর্শ করে কাছে টেনে নেয়।
মায়া ফিরে আসে ভাবনার জগত থেকে।পাশে তৃষ্ণা।সে বলল “তুই কাপড় বদলাসনি! আচ্ছা বদলাতে হবে না।এই অবস্থায় চল। শুধু উপর থেকে একটা শাল জড়িয়ে নে।” তৃষ্ণা বলা শেষে নিজেই জড়িয়ে দেয়।
শেষ বিকেলের উষ্ণতা ছুঁয়ে দেখছে যেন মায়া।আজ অনেকদিন পর বাইরে বেড়িয়েছে। দেহটা তাঁর প্রকৃতির মাঝে হলেও মনটা তাঁর মীর এর কাছে।আর ভাবছে,মীর বাঁশি বাজাতে পারে না, তবে বাঁশি কেন উপহার দিল তাঁকে!কেন বলল এই বাঁশি ছোট্ট মা দিয়েছে! পথে পথে পা বাড়াতেই এসব ভাবছে।
উত্তর এর জঙ্গলে যাওয়ার জন্য দুটো পথ।একটা চা বাগান। অন্যটি বাজারের পথ।যেখান থেকে মানুষ সচরাচর যাতায়াত করে। তাঁরা চা বাগান ধরে হাঁটছে।দুইধারে চা বাগান মাঝখানে তাঁরা দু’জন। কিছু দূরে চোখ মেলে তাকালে দেখা যায় ঢালুতে পাহাড়। কিছু মেয়েরা চা তুলছে।মায়া ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে। তৃষ্ণার বেশ আনন্দ হচ্ছে।এত সুন্দর প্রকৃতির মাঝে যে কারো মন ভালো হবে। কিন্তু যদি হয় বিষাদ ভরা মন সে মন কি আর ভালো হয়!মায়া ক্ষনে ক্ষণে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলছে।
কিছুদূর চলে যাওয়ার পর মায়ার পা থমকে যায়। বাঁশির সুর শুনে। তাঁরা এতক্ষণ চা বাগান অতিক্রম করে চলে এসেছে উত্তর এর জঙ্গলের দিকে। সূর্য হেলে পড়তে শুরু করেছে তাঁর সবটুকু তাপ বিসর্জন দিয়ে। পশ্চিমে সূর্যের রশ্মি ঢলে পড়ার সাথে সাথে ভেসে আসে সুর। আজকের সুরও তৃষ্ণা শুনতে পাচ্ছে। তাঁরা দুজন একে অপরের সাথে চোখাচোখি করল।মায়া কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না তৃষ্ণা বলল “সে-ই বাঁশির সুর,যে সুর শুনে তুই আর আমি সেদিন রাতে বের হয়েছিলাম।চল আজকে এই বাঁশিওয়ালা কে দেখতেই হবে।” বলে তাঁরা পা চালিয়ে হেলে পড়া সূর্যের আলো ধরে সামনে এগোতেই শব্দ আসল অশ্ব দৌড়ের টকটক আওয়াজ। তারা দাঁড়িয়ে পড়ল। কোথাও কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।মায়া হন্তদন্ত হয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতে শুরু করল।
তাঁর চোখ দুটো অস্থির হয়ে উঠছে।রাগ ও হচ্ছে। আজকে এই বাঁশিওয়ালা কে দেখতেই হবে তাঁর। তৃষ্ণা অন্যদিকে খুঁজছে।মায়া হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গল পাড় হয়ে পাহাড়ের শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়াল। কোথাও সে-ই বাঁশিওয়ালা কে দেখতে পেল না। ব্যর্থ সে। ব্যথিত হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভারী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এমতাবস্থায় পাহাড়ের নিচের দিক থেকে একটা সাপ ফণা তুলে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে দেখতে পেল।সে আহত হল।ভয়ে চুপসে গেল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। একবার ভাবে ভুল দেখছে। হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। ভেবে চোখ বন্ধ করে চেয়ে দেখল।ভুল নয়। সাপ। সাপটি হঠাৎ করে তাঁর দিকে তেড়ে আসতে শুরু করে।সে দিগ্বিদিক হারিয়ে পেছন ঘুরে ছুটতে শুরু করলেই অচেনা কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যায়।
সে চোখ তুলে তাকায় তাঁর দিকে। মাথায় পাগড়ি।পরনে শিকারির পোশাক। পায়ে বুট জুতো।পাগড়ির আঁচল দিয়ে মুখটি ঢেকে রাখা। শুধু স্পষ্ট চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে।যার চোখে পৃথিবীর সমস্ত মায়া যেন ঢেলে দেওয়া হয়েছে। যুবকটি সুঠাম দেহের অধিকারী। বেশ লম্বা। যুবকটি মায়ার দিকে হাত বাড়াতেই মুখের উপর থেকে পাগড়ির আঁচল টা সরে যায়। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ এর যুবক।জোড়া ভ্রু। খোঁচা খোঁচা চাপদাড়ি। ঠোঁট দুটো মোটা গোলাপি। নিশ্চয়ই ধুমপান করে না।মায়া এই জঙ্গলে দ্বিতীয়বার যেন জ্বীন রুপি মানুষ দেখছে।নয়ত বাস্তব জ্বীন। জ্বীনরাই বোধহয় সুদর্শন হয়।মায়া যুবকটি কে অতিক্রম করে তাকায়।একটা লাল রঙের অশ্ব দাঁড়িয়ে।
যুবকটি মায়াকে থ’ হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে বলল “কি দেখছো! মাটিতে বিচ্ছু ছিল। উঠে এসো তাড়াতাড়ি।” মায়া হাতটি ইতস্তত বোধ করে বাড়িয়ে উঠে এল। ঘুরে সাপটিকে দেখল। যুবকটি মায়ার দৃষ্টি লক্ষ্য করে সাপটিকে দেখে বলল “মেয়েদের দুর্বল পেয়ে ওঁদের পেছনেই ছুটিস কেন!সাহস থাকে তো আমার পেছনে ছুটে দেখিস!” বলে থামতেই সাপটি চলে যায়।মায়া যুবকটি কে দেখছে। তাঁর শাড়িতে মাটি লেগে আছে। যুবকটি মায়াকে পর্যবেক্ষণ করে বলল “ভয় পেয়েছো?’
মায়া যুবকটি কে দেখে হা হয়েই আছে।তখন তৃষ্ণা মায়াকে খুঁজতে খুঁজতে চলে আসে।সেও যুবকটি কে দেখে। তৃষ্ণা বিশম খেয়ে উঠে।বলল “আপনি বাঁশি বাজাচ্ছিলেন!”
“সন্দেহ আছে?
“লুকিয়ে লুকিয়ে কেন বাজান?
“অচেনা বাঁশিওয়ালা সবসময় লুকিয়েই থাকে।”
“তবে আজ কেন সামনে আসলেন?
“একটা ফুলকে পাহাড়ের শেষ সীমান্তে দৌড়ে আসতে দেখেছি। যেভাবে বেখেয়ালি ভাবে দৌড়াচ্ছিল ভেবেছিলাম নিচে পড়ে যাবে।ওকে বাঁচাতে ছুটে এসেছি। সৌভাগ্যক্রমে তোমরা আমাকে দেখেছো। তোমাদের ভাগ্য অতি ভালো তাই।”
“আপনাকে দেখতে ভাগ্য দরকার হয় বুঝি!”
“আমার মত সুদর্শন যুবক কে একনজর দেখার জন্য নারীরা কৌশল অবলম্বন করে। সে-ই তোমরা অতি সহজে দেখে ফেলেছো।”
“আমার বোনকে বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ।”
“যাকে বাচালাম সে-ই তো ধন্যবাদ দিল না।”
“ও কথা বলতে পারে না। হঠাৎ শক পাওয়াতে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে।”
যুবকটি মায়াকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখল।বলল “সুন্দরী রমণীরা কথা না বলতে পারাটাই ভালো। যেমন খুশি যেভাবে খুশি নাচানো যায়।”
“এরকম ভাবলে বউ জুটবে না।”
তৃষ্ণার মুখে কথাটি শুনে যুবকটি শব্দ করে হেসে উঠল। যেন বহুদিন পর হাসছে।হাসির সময় ডান দিকের একটা দাঁত দেখা গেল।সরুকার দাঁত।যেটা যুবকটির সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। থেমে যুবকটি বলল “বিয়ে করার জন্য মেয়েরা লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু আমার সম্মতি দরকার।”
“অপেক্ষা কেন,করে ফেলেন।”
যুবকটি কিছু বলল না। তাঁর অশ্ব হ্রেষাধ্বনি তুলল। যুবকটি অশ্বের দিকে চেয়ে বলল “ডাকাডাকি করিস না।আসছি।” থামতেই চোখ পড়ে মাটিতে।মায়ার গায়ের শালটা মাটিতে পড়ে আছে। যুবকটি নুইয়ে শালটা উঠিয়ে ঝেড়ে মায়ার শরীরে জড়িয়ে দিতেই মায়া হাত দুটো বুকের কাছে চেপে ধরে। যুবকটি তারপরও শালটা জড়িয়ে দিয়ে বলল “শোনো মেয়ে, আমার মেয়েদের শরীরের প্রতি অবৈধ লোভ লালসা কাজ করে না।টানে না এসবে আমায়।যাও, সোজা বাড়ি ফিরে যাও।আর কখনো বেখেয়ালি ভাবে দৌড়াদৌড়ি করবে না।”
সে-কি তাঁর হুঁশিয়ারি! নিখুঁত কণ্ঠ, নিখুঁত চাহনি, অভিব্যক্তি, সবকিছু যেন দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির সে-ই অমর ছদ্মবেশী রাখাল বাঁশিওয়ালার মতন। তবে ইনি কে! ভাবছে মায়া।
তৃষ্ণা বলল “আপনার নাম কি?
“ আমার চিরচেনা নাম -অচেনা বাঁশিওয়ালা। আমাকে তো তোমরা এই নামেই চিনতে। এখনো এই নামেই চিনে রাখো।”
“তবু প্রতিটি মানুষের একটা নাম থাকে। আপনার নামটা জানার আগ্রহ জন্মাল।” তৃষ্ণা বেহায়ার মত করে জানতে চাইছে। যুবকটি বলছে না। তাঁর বাঁশিটির যত্ন নিচ্ছে। তৃষ্ণা মায়ার দিকে তাকাল।মায়াও তাকায়। তবে সে কিছু বলতে পারছে না।তবু অনেক প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে, সেদিন জঙ্গলে কি সে-ই বাঁশি বাজিয়েছে? এরপর সে-ই রাতে, যেদিন তাঁরা ছুটে গিয়েছিল?সে কি সুফিয়ান হায়দার এর বংশধর!
মায়া একটা প্রশ্ন ও করতে পারছে না। তৃষ্ণা পুনরায় বলল “নামটা বলবেন না?
“সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে।বাড়ি ফিরে যাও।নয় ক্ষুধার্ত পশু হানা আনবে।”
তৃষ্ণা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল “সঠিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেন না!
“না। মেয়েদের সাথে এত কথা বলার রুচি নেই। বিশেষ করে তোমার সাথে।নাক বোচা বোকা মেয়ে।” তৃষ্ণা অপমান বোধ করল।তখন মায়ার ঠোঁটে না চাইতেও একপ্রকার হাঁসি জন্মে। পরক্ষনেই ডুবে যায়। যুবকটি এই হাঁসি আড়ালে দেখে নেয়। তৃষ্ণাও দেখে।আজ কতদিন পর মায়া হাসল।
তৃষ্ণা এবার যুবকটির দিকে এগিয়ে বলল “সত্যিই আমি অসুন্দর?”
যুবকটি বাঁশির দিকে তাকিয়েই জবাব দেয় “খুব সুন্দর।”
“ধন্যবাদ।”
যুবকটি মাথা তুলে তৃষ্ণা কে রেখে মায়ার দিকে চেয়ে বলল “ওঁর হাঁসি সুন্দর। তুমি না।”
যুবকটি অশ্বের পৃষ্ঠায় চেপে বসে। পাগড়ির আঁচল দিয়ে মুখটি পুনরায় ঢেকে নেয়।
তৃষ্ণা পেছন থেকেই জিজ্ঞেস করল “আপনার নামটা বলে যান। আমি না, আমার বোন জিজ্ঞেস করেছে!”
যুবকটি অশ্ব থেকেই পেছন ঘুরে তাকাল।বলল “আমি শ্যামপুরের নওয়াব শেহজাদা।” বলে শেহজাদা চলে যায়।
তৃষ্ণা বলল ‘দেখতে তো রাজকুমার এর মতই—
অন্যদিকে নিষ্ঠুর কাবির হোসেন ওরফে সম্রাট নিষাদ এর বংশধরের একজন লুকিয়ে আছে অন্ধকার একটি ঘরে।সে কি সত্যিই লুকিয়ে আছে,নাকি তাঁর বাসস্থান এটি? তীব্র অন্ধকারে তাঁর ছায়া মুর্তিটি একটি ঘরে পা রাখে।ঘরটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয়, অন্ধকারটি শুধু আলোহীন নয় নতুন কিছুর বার্তা।দরজাটি পেছনে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়, অথচ কেউ ছুঁয়েছে এমন শব্দ শোনা যায় না। তালার ভেতর থেকে ক্ষীণ একটা ক্লিক শব্দ বের হয়, যেন ঘরটি নিজেই তার শিকারকে ভেতরে আটকে ফেলেছে।
বাতাস এখানে ঠান্ডা নয়, স্যাঁতসেঁতে ও ভারী। শ্বাস নিলে বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ পড়ে, মনে হয় বাতাসে ধুলোর চেয়েও বেশি কিছু ভাসছে। দেয়াল গুলোতে নখের আঁচড়ের মতো দাগ—পুরোনো, কিন্তু খুব গভীর।যেন কেউ একসময় বেরোবার জন্য মরিয়া হয়ে খুঁড়েছিল। ছাদের কোণে জমে থাকা কালো ছায়া ধীরে ধীরে নড়ে ওঠে, আলো না থাকলেও তার গা ছমছমে উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে।
হঠাৎ মেঝে থেকে একটি শব্দ,চামড়া টানার মতো কিচকিচে আওয়াজ। তাকালে কিছু দেখা যায় না, কিন্তু শব্দটা আবার হয়, এবার আরও কাছে। ভাঙা আয়নাটির দিকে তাঁর চোখ পড়ে।চোখ পড়লে মনে হয়, প্রতিবিম্বে নিজের মুখটা এক মুহূর্তের জন্য বদলে গেছে চোখের নিচে গভীর অন্ধকার, ঠোঁটের কোণে এমন এক হাসি যা নিজের নয়। শয়তান এর।
দেয়ালের ভেতর থেকে যেন ফিসফিসানি আসে। শব্দগুলো স্পষ্ট নয়, তবু মনে হয় কারো নাম ডাকা হচ্ছে,ধীরে, জেদি স্বরে। ঘড়ি নেই, তবু সময় থমকে আছে বলে মনে হয়। কেননা, ঘরটিতে দিনের আলো ঠুকে না বলে সময় ধরা যায় না।
কাবির এগিয়ে যায় একটু ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে।ঘরটি খুললে দেখা যায় ছোট ক্ষুদ্র একটি বাল্ব জ্বলছে কারো মাথার উপরে। সে-ই আলো সঙ্গী করে একজন বাধা অবস্থায় পড়ে আছে চেয়ারে।হাত দুটো পেছনে শক্ত করে বাঁধা। গায়ে সাদা রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি।পুরো শরীর র’ক্তের, আঘাতের চিহ্ন। তাঁর মুখটি অন্ধকারে ছেয়ে আছে। কাবির একটা চেয়ার টেনে বাঁধা মানুষটির সামনে বসে।হাতে একগ্লাস মদ নিল। ছুঁড়ে মারে তাঁর সামনের বাঁধা যুবকটির মুখে। হঠাৎ মুখে মদ পড়ায় যুবকটি ধাব করে জাগ্রত হয়।চোখ দুটো লাল।কপাল থেকে র’ক্ত ঝড়ছে। ঠোঁটে র’ক্ত! কোনভাবে ক্লান্তি চোখে কাবির এর দিকে চেয়ে বলল “শুয়োরের বাচ্চা, আমাকে আটকে রেখেছিস কেন?”
“তোকে তিলে তিলে মারব বলে।” বলে কাবির আনন্দের হাঁসি হাসে।
ক্লান্ত চোখে যুবকটি জেদী স্বরে কেটে কেটে বলল “মীর জাফান শন ওরফে মীর হায়দার কে হ’ত্যা করা এত সহজ নয়।”
The Silent Manor part 74
মীর কথাটা শেষ করতে না করতেই কাবির উঠে বেত দিয়ে মীর কে আ’ঘাত করতে শুরু করে রাগে আক্রোশে।
মীর শত চেষ্টা করেও হাত দুটোর বাঁধন খুলতে পারল না। শেষ বেতের আ’ঘাত টা পুরো মাথা জুড়ে লাগে।সে কাত হয়ে যায়। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মুখে র’ক্ত। থুথু করে রক্ত ফালায়। ক’দিন ধরে তাকে এভাবে আটকে রেখেছে বুঝতে পারছে না। এখানে রাত দিন বোঝা যায় না। গলাটা শুকিয়ে গেছে তাঁর। শয়তান এর কাছে জল চাইতেও ইচ্ছে করছে না।তবু চাওয়া দরকার। বাঁচতে হলে লড়াই করতে হবে। কিন্তু এখান থেকে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা সে খুব একটাও দেখতে পাচ্ছে না। আপাতত জল দরকার।কাত হওয়া মাথাটা তুলে ঘনঘন দম ফেলে বলল ‘একটু জল দে।খুব জলতেষ্টা পেয়েছে’
কাবির একজন অনুচর কে ডেকে বললেন “ওঁর মুখে মদ ঢেলে দে।’
. . . . অন্তর্বিরতী . . . .
