Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৫

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৫

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৫
সাইদা মুন

—এত কোমল, একদম মারশমেলোর মতো, একদম চিবিয়ে ফেলতে মন চাচ্ছে…..
তালহার কথাটা কানে যেতেই মেহরীনের চোখদুটো কেমন যেন দুলে ওঠল। এতক্ষণ যে দৃষ্টিতে সরাসরি তাকিয়ে ছিল, সেই সাহসটুকু মুহূর্তেই লজ্জার আড়ালে সরে গেছে। কথার মানে বুঝতে পারতেই সে চোখ ফিরিয়ে নেয় বেচারি। কৌতূহলে ভরা দৃষ্টিটা এবার অস্থির হয়ে পড়ে, আমতা আমতা করে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। মাথার ভেতর একটাই ভাব ঘুরছে, সে কি বলল?

মেহরীনের এই বিভ্রান্ত অবস্থা তালহার চোখ এড়ায় না। ঠোঁট কামড়ে সে মৃদু হেসে ওঠে। সেই হাসি নিয়েই ঝুঁকে আছে ওর দিকে। মেয়েটাকে এভাবে অপ্রস্তুত করে ফেলতে তার অদ্ভুত এক তৃপ্তি কাজ করে। এই যে মেয়েটা এখন তার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না, কোথায় দৃষ্টি রাখবে সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না। কখনো বাইরের দিকে তাকাচ্ছে, কখনো নিচে। অস্বস্তিতে বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছে। আঙুলগুলো অন্যমনস্কভাবে একে অন্যকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। হালকা বাতাসে সামনের ছোট ছোট চুল কপাল আর গালে এসে পড়ছে, অথচ সেগুলো সরানোর শক্তিটুকুও হারিয়ে বসেছে। এইসব দেখতে ভীষণ মজা লাগছে তার।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ভাবনার মাঝেই নিজের ডান হাত বাড়িয়ে আলতো ছোঁয়ায় চুলগুলো কানের ভাঁজে গুজিয়ে দেয়। তালহার এই হঠাৎ ছোঁয়াটা মেহরীনের কাছে ঠিক যেন হঠাৎ এসে পড়া কোনো নরম হাওয়ার ঝাপটার মতো লাগল, খুব ক্ষণিকের, অথচ ভেতরের সাজানো অনুভূতিগুলো এলোমেলো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। মেহরীন চোখ নামিয়ে নেয়। চোখ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের মনটাকেও যেন আড়াল করতে চাচ্ছে সে। তালহার আঙুলের উষ্ণতা এখনো ত্বকে রয়ে গেছে, যেমন করে সন্ধ্যার পরেও দেয়ালে আটকে থাকে রোদের শেষ আলোটা। বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি শুরু হয়, লজ্জা আর ভালোলাগার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা অনুভূতি।
তালহা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে মেহরীনের লজ্জায় রাঙা মুখটার দিকে। নিজের ওপর তার দৃষ্টি টের পেতেই মেহরীন আরও অস্থির হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলে,

—সমস্যা কি? এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?
তার প্রশ্নে তালহা কপাল কুঁচকে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গেই নির্লিপ্ত স্বরে বলে,
—নিজে যখন তাকিয়ে ছিলে, আমি কিছু বলেছি? তাহলে আমার বেলায় এত ডিস্টার্ব কেন?
মেহরীন থতমত খায়। তাহলে তার তাকিয়ে থাকাটা তালহা দেখেছে। সে তো ভেবেছিল হয়তো খেয়ালই করেনি। মিনমিনিয়ে বলে,
—আপনি তাকালে লজ্জা লাগে।
তালহা চোখ সরু করে তাকায়,
—তা কোথায় লজ্জা লাগে?
এই প্রশ্নে মেহরীন একেবারে চুপসে যায়। এর উত্তর কি আদৌ দেওয়া যায়? লজ্জা তো জায়গা চিনে লাগে না। তার নীরবতা দেখে তালহা চোখ ফিরিয়ে সোজা হয়ে বসে। এবার মেহরীন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু সেই স্বস্তি খুব বেশিক্ষণ টেকল না।

কয়েক সেকেন্ড বসে থেকেই হঠাৎ তালহা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। কোনো সতর্কতা না দিয়েই মেহরীনের গালদুটো চেপে ধরে, মুহূর্তের মধ্যেই ডান গালে কামড় বসিয়ে দেয়। মেহরীন হতভম্ব। চোখ দুটো বিস্ফোরিত হয়ে ওঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে তালহার হাতটা আঁকড়ে ধরে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা শুরু করে। হালকা ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে আসে। তার চেয়েও বেশি মন মুচড়ে আছে তালহার এহেন কান্ডে। শরীর বেয়ে শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সুরসুরি লাগছে কোনো এক অনুভূতির উত্তালপাত্তালের কারণে।
বেশ কিছুক্ষণ পর তালহা নিজে থেকেই ছেড়ে দেয়। মেহরীন গালে হাত চেপে বসে আছে। দাঁতের ছাপটা স্পর্শে স্পষ্ট টের পাচ্ছে। লজ্জায় ঘনঘন শ্বাস পড়ছে। দ্রুত উঠে দাঁড়ায় উদ্দেশ্য এখান থেকে বের হবে। আর একমুহূর্ত ও এখানে টেকা যাবে না। কিন্তু পা বাড়ানোর আগেই তালহা তার হাত চেপে ধরে। প্রশ্নভরা চোখে তাকিয়ে বলে,

—কোথায় যাচ্ছো?
মেহরীন তাড়াহুড়ো করে বলে,
—ঘরে যাবো… ঘুমাতে হবে।
তালহা এক টানে পাশের চেয়ারে বসিয়ে দেয় তাকে। নিজে দুই হাত মাথার পেছনে দিয়ে দেয়ালে হেলান দেয়।
—এইটুকু সময়ই আমার সঙ্গে থাকতে কষ্ট হচ্ছে, মেয়ে। বাকি জীবন কীভাবে সামলাবে?
মেহরীন কোনো উত্তর দেয় না। মনে মনে শুধু বলে, আমার সেই গম্ভীর তালহার সঙ্গে সারাজীবন কাটানো কোনো ব্যাপারই ছিলনা। কিন্তু এই তালহা, যে প্রতিমুহূর্তে তার অপ্রত্যাশিত আচরণে আমাকে লজ্জায় ফেলছে। এই তালহার সঙ্গে থাকা সত্যিই ভীষণ বড়সড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কিছুক্ষন নীরবতায় কাটে এরমাঝে হঠাৎ তালহা বলে ওঠে,

—চলো ঘুরতে যাই।
নীরবতা ভেঙে কথাটুকু বলেই তালহা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মেহরীনের দিকে ফিরে তাকাতেই সে অবাক চোখে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
—এই রাতের বেলা কোথায় ঘুরতে যাবেন?
তালহা ফাজলামোর সুরে বলে,
—যেথায় দু’চোখ যায়…
তার পরপর মেহরীনের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে যোগ করে,
—কেন, তোমার বুঝি ভয় করছে আমার সঙ্গে বেরোতে? তা করবেই বা না কেন, আমি কেই বা লাগি! আচ্ছা থাক, যেতে হবে না।
শেষ কথাগুলো সে এমন মনখারাপি ঢঙে বলল যে মেহরীন আর নিজেকে সামলাতে পারে না। ফিক করে হেসে ওঠে। গম্ভীর মানুষটার হঠাৎ বাচ্চামোতে ভালোই লাগে। মুচকি হেসে তালহার এক বাহু জড়িয়ে ধরে বলল,

—আপনি মশাই, বড্ড ছেলেমানুষী শিখে ফেলছেন।
তালহাও হেসে প্রতিউত্তর দেয়,
—ছেলেমানুষের সঙ্গে থাকার সাইড এফেক্ট।
কথাটা কানে যেতেই মেহরীন নাক ফুলিয়ে তাকায়। কোমড়ে দুই হাত রেখে একেবারে তালহার সামনে এসে দাঁড়ায়,
—এই! আমি ছেলেমানুষ?
তালহা মাথা এদিক-সেদিক ঝাঁকিয়ে বোঝায়,”না”। সেটা দেখে মেহরীন আবার বলে,
—তাহলে ছেলেমানুষ বললেন কেন?
তালহা ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
—আমার ভুল হয়েছে। আমাকে ক্ষমা করে দিন, ম্যাডাম।
মেহরীন মুখ ভেংচিয়ে সরে আসতে আসতে বলে,

—এই ছেলেমানুষই এত বড় দামড়া ছেলের মাথার নাট ঠিক করেছে। নয়তো আপনি যেই রসকষহীন ছিলেন, জীবনে বিয়েই হতো না। আমি জন্ম নিয়েছি বলেই আপনার বিয়ে করার ভাগ্য হয়েছে, নয়তো আজীবন চিরকোমাড়ই থেকে যেতেন। বুঝেছেন? হুঁহ!
বলেই সে বারান্দা ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। পেছন পেছন তালহাও এগিয়ে এসে বারান্দার দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। মেহরীন দরজার কাছে গিয়ে থেমে যায়। যেন কিছু একটা মনে পড়েছে। সাথে সাথে পেছন ফিরে ডাকে,

—এই, শুনুন না…
মেহরীনের ডাক কানে যেতেই তালহার এক হাতে অটোমেটিক বুকে চলে যায়। বুকে যেন প্রশান্তির এক অদ্ভুত ঝাপটা বয়ে যাচ্ছে। মুঁচকি হেসে ধীর গলায় বলে,
—জি, বলুন না..
—আপনি কোন কালারের শার্ট পরবেন?
—আপনি যে কালার বলবেন।
তালহার উত্তরে মেহরীন ভাবতে লাগে। কী কালার বলা যায় এই ভাবনা।
—উমম..
মেহরীনকে ভাবতে দেখে তালহা ওয়ারড্রবের দিকে ইশারা করে বলে ওঠে,

—ম্যাম, মাথায় এত প্রেশার না দিয়ে ওয়ারড্রব খুললেই তো সব চোখের সামনে।
মেহরীনও ভাবল এটাই সহজ হবে। সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে ওয়ারড্রব খুলে একে একে জামাকাপড় দেখতে লাগল। শেষে সাদা রঙের একটি শার্ট বের করল। তারপর খুঁজে বের করল কালো রঙের জ্যাকেট। দুটো বের করে বাকি কাপড়গুলো যত্ন করে গুছিয়ে রাখল। বের করা কাপড়গুলো তালহার হাতে ধরিয়ে দিল।
—বাইরে যেহেতু শীত, অবশ্যই শীতের কাপড় পরতে হবে। তাই এর ওপর এই জ্যাকেটটা পড়বেন।
তালহা মাথা নেড়ে “আচ্ছা” বলতেই মেহরীন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তালহা তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে। ড্রয়ার খুলে একটি সিগারেট বের করে আগুন ধরায়। বারান্দায় গিয়ে এক টান দিয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে ধোঁয়া ছেড়ে দেয়।

—আমার এই রঙহীন জীবনে তুমি এলে রঙের কৌটা হয়ে। আমার প্রেমে পড়ার বয়স ছিলনা তবু তুমি প্রেমে পড়তে বাধ্য করলে। তোমার প্রেমে পড়ে নিজেকে কেমন অল্পবয়সী প্রেমিক করে তুলতে ইচ্ছে জাগে, নিজের গম্ভীর্য ভুলে তোমাতে মেতে থাকতে ইচ্ছে জাগে, ইচ্ছে জাগে তোমাকে সারাটাক্ষন নিজের কাছে আগলে রাখতে। তোমাকে দেখলেই কেনো এত প্রেম প্রেম পায়? কি জাদু করেছো মেহরীন? বড্ড জ্বালায় ফেললে তো মেয়ে।
হাতের সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে সে বারান্দা থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে। মাউথ স্প্রে মুখে প্রেস করে নেয়, তারপর মেহরীনের বেছে দেওয়া কাপড় পোরে নিজেকে তৈরি করে নেয় মেহরীনের পাশে মানানসই পুরুষ হিসেবে।

মেহরীন আলমারির খুলে খুঁজে খুঁজে সাদা রঙের গোল জামাটা বের করে আনে। সাদা জামাটার জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট সূর্যমুখি ফুল দেখতে অনেক কিউট লাগে। কয়েকদিন আগেই তিতলি বেগম মেহরীন আর তাহিয়াকে এই গোলজামাটা বানিয়ে দিয়েছিলেন। আজকাল তাদের দুজনের একইরকম জামা বানানো হয়। আজ এটাই পরবে সে। তালহার সঙ্গে মেচিং করে পড়বে সে। জামাটা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজেকে মেপে নেয়।
এদিকে তাহিয়া কপাল কুঁচকে মেহরীনের এই ব্যস্ততা লক্ষ্য করছিল। ল্যাপটপ অফ করে উঠে বসে সে। এতক্ষণ আরাম করে কম্বলের তলায় ঢুকে মুভি দেখছিল।

—কনটেক্স কী?
তাহিয়ার প্রশ্নে মেহরীন ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
—কিসের কনটেক্স?
—এই যে এত রাতে হঠাৎ সাজুগুজু শুরু করলি, এর কনটেক্স কী?
মেহরীন মুচকি হেসে জামাটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলে,
—উনার সঙ্গে ঘুরতে যাবো।
কথাটা কানে যেতেই তাহিয়া এক লাফে উঠে বসে,
—কীইই, এত রাতে? ভাইয়া বলেছে?
মেহরীন লজ্জা মাখানো হাসি দিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলে,
—হুঁউউ…

তাহিয়া দুই হাত গালে চেপে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, অবাক কন্ঠে মেয়েটি উত্তেজিত হয়ে বলছে,
—মাই গড! আমার ভাই এত রোমান্টিক, আমি তো জানতামই না।
মেহরীন কিছু না বলে হেসে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। জামা বদলে বের হতেই সে থমকে দাঁড়ালো। তাহিয়া দাঁড়িয়ে আছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে। এতক্ষণের গোছানো টেবিলটা এখন যেন ছোটখাটো একটা মেকআপের দোকানে রূপ নিয়েছে। একটার ওপর আরেকটা রেখে হিজিবিজি করে ফেলেছে সব। নিজের যত মেকআপ ছিল, সব মেকআপ বের করে ফেলেছে মেয়েটা।
মেহরীন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

—কিরে, তুই কী করছিস এসব?
তাহিয়া খুশিতে গদগদ করতে করতে এগিয়ে এসে মেহরীনকে টেনে ড্রেসিং টেবিলের চেয়ারে বসিয়ে দেয়। ফাউন্ডেশনের শেড মিলাতে মিলাতে বলে,
—বাহ রে, আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের প্রথম ডেট বলে কথা। আমি সাজিয়ে দেবো না? এই দেখি না, এই শেডটা যাবে না তোর স্কিনের সাথে? উমম না না এটা যাচ্ছেনা, আরেকটু ব্রাইট লাগবে। তাহলে এইটা দেই..
এরকমই নানান মেকআপ নিয়ে তাহিয়া মন দিয়ে মেহরীনকে সাজাতে শুরু করে। প্রথমে ভেবেছিক গর্জিয়াস সাজ দিবে। তবে তার ভাই বেশি সাজগোছ পছন্দ করেনা সেই ভেবে, হালকা ফাউন্ডেশন, গালে হালকা ব্লাশ, চোখে পাতলা আইলাইনার, আর ঠোঁটে ডার্ক রেড লিপস্টিক, সব মিলিয়ে খুব সিম্পল অথচ নজরকাড়া একটা লুকে সাজিয়ে দেয়।
সাজানো শেষ হতেই তাহিয়া মেহরীনের থুতনি ধরে নিজের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়,

—মাশাল্লাহ! এই সামান্য মেকআপেই কী অপ্সরী লাগছে রে আমার মেহুকে। আল্লাহ, আমার ভাই তো হার্ট অ্যাটাক করবে। মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ, কারো নজর না লাগুক।
বলেই নাটকীয় ভঙ্গিতে চোখের নিচ থেকে কাজল নিতে যায়। কিন্তু চোখে কাজল না পড়ায় হাতের ডগায় কিছুই আসল না। কাজল না পেয়ে কাজলের কৌটা থেকে আঙুলে হালকা কাজল লাগিয়ে মেহরীনের কানের পেছনে ছুঁইয়ে দেয়। তাহিয়ার এইসব কাণ্ডকারখানা দেখে মেহরীন তো হেসে হেসে কুটিকুটি।
সবশেষে হাতে সাদা কাচের চুড়ি আর কানে তালহার দেওয়া ঝুমকাজোরা পরে উঠে দাঁড়ায় সে। আয়নার সামনে একবার নিজেকে দেখে নেয়। না, খারাপ লাগছে না। বরং ভালোই লাগছে। এখন শুধু তালহার চোখে ভালো লাগলেই হলো।
ভাবতে ভাবতেই ওড়নাটা ঠিক করে তাহিয়ার দিকে তাকায়। হঠাৎ-ই হাসিখুশি মুখটা একটু ম্লান হয়ে আসে। তাহিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,

—তুইও চল না আমাদের সাথে..
মেহরীনের কথা শুনে তাহিয়া যেন ফুসে ওঠে,
—হপ! কী বলিস। আমি যাবো কী করতে?
মেহরীন মনখারাপ করে বলল,
—আমি যাবো ঘুরতে আর তুই একা একা থাকবি? ভালো লাগবে না আমার।
তাহিয়া মেহরীনের হাত ছাড়িয়ে এক লাফে বিছানায় উঠে পড়ে। গায়ে কম্ফোর্টারটা ভালোমতো জড়িয়ে ল্যাপটপ অন করতে করতে বলল,
—ভাইয়ার ল্যাপটপ আজ আমার দখলে। সারা রাত ইচ্ছেমতো মুভি দেখব। আমার তো আজ মজাই মজা। আমি কেন কাবাব মে হাড্ডি হতে যাবো? যা যা, তোরা যা…

মেহরীন তালহার দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে দরজাটা খুলে যায়। তালহা সামনেই দাঁড়িয়ে মেহরীন ধীর পায়ে ভেতরে ঢোকে। তালহার দিকে চোখ যেতেই আঁটকে দাঁড়ায়।
সাদা শার্টের ওপর কালো জ্যাকেট, সঙ্গে কালো প্যান্ট। এই সাদামাটা কাপড়েও এক অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। চুলগুলো আঁচড়ানো, কিন্তু জেল না দেওয়ায় খানিকটা এলোমেলো হয়ে আছে। কিছু চুল কপালের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আর ঠিক এই এলোমেলোভাবটাই লোকটাকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে। মেহরীন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তালহাকে। চোখ নেমে আসে হাতে। ইয়েস, যেমনটা ভেবেছিল, আউটফিটের সঙ্গে মিল রেখে কালো বেল্টের ঘড়ি হাতে ঝুলছে। লোকটার ঘড়ির প্রতি এই ভালোবাসাটা তার চোখ এড়ায়না কখনো। আর কিছু খেয়াল করে পরুক আর না পরুক, ঘড়িটা হাতে থাকবেই।
তালহা মানিব্যাগ আর মোবাইল পকেটে ঢোকাচ্ছে। এমতাবস্থায়ই মেহরীন প্রশ্ন করল,

—আপনার ঘড়ি খুব পছন্দ?
তালহা মাথা নেড়ে বলে,
—হুমম…
মেহরীনের মাথায় হঠাৎ একটা ভাবনা ঢুকে পড়ল। তাহলে তালহার জন্মদিনে সে ঘড়িই গিফট করবে। পরমুহূর্তেই নিজের ভাবনায় নিজেই থতমত খায়। জন্মদিন কবে, সেটাই তো জানে না। তাহিয়াকে কোনোদিন জিজ্ঞেসও করা হয়নি। ছি ছি.. বউ হয়ে হাসব্যান্ডের জন্মদিনই জানে না। লজ্জা আর খুটখুটানির মাঝেই জিজ্ঞেস করল,
—আপনার জন্মদিন কবে?
—হোয়াই?
—এমনি জানতে ইচ্ছে হলো।
তালহা হেলমেট দুটো নিতে নিতে বলে,
—সতেরো মার্চ…
—ওহ..

এই ফাঁকে তালহা একটি হেলমেট মেহরীনের দিকে এগিয়ে দেয়। মেহরীন সেটা হাতে নেয়। মাথার ভেতর ভাবনাগুলো তখনো চলছে। একটু থেমে আবার প্রশ্ন করল,
—আপনি যে ঘড়িটা পড়েছেন, তার দাম কতো হবে?
তালহা কপাল কুঁচকে তাকায়,
—কেন বলতো?
—আরে বলুন না, জানতে ইচ্ছে করছে।
তালহা এক ভ্রু উঁচু করে নির্লিপ্তভাবে বলল,
—ছয় লাখ সামথিং নিয়েছিল। অনেক আগে কিনেছি, এমাউন্ট ঠিক মনে নেই।
দামটা কানে যেতেই মেহরীন ড্যাবড্যাব চোখে তাকায়। একবার তালহার মুখের দিকে, তো একবার তার হাতের ঘড়ির দিকে। বিস্ময় গলা ভেঙে বেরিয়ে আসে,

—কীইই! এই সামান্য একটা ঘড়ির দামই ছয় লাখ টাকা?
তালহা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাতেই মেহরীনের মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। কি এমন আছে এই ঘড়িতে? সোনা-রুপা দিয়ে বানানো নাকি? বাপরে, সে কিনা এমন ঘড়ি গিফট দেওয়ার কথা ভাবছিল। তার কিডনি বেচলেও তো এত টাকা উঠবে না। নানান প্রশ্ন মাথার ভেতর পাক খেতে খেতেই তালহা বলে,
—মাথায় প্রেশার কম নেন। এটা রোলেক্স ব্র্যান্ডের ঘড়ি। বিদেশ থেকে ইম্পোর্ট করে আনা, তাই দাম একটু বেশি।
মেহরীন বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে,
—একটু বেশি?
—হু..
মেহরীন নিজের মনেই বিরবির করে,
—সামান্য একটা ঘড়ি হাতে পড়বে, তাও এত দামের। অযথা টাকা নষ্ট না..?
তালহা সামনে এগোতে এগোতে শান্ত গলায় বলে,
—সখের জিনিসের দাম একটু বেশি হয়।

চাঁদের হালকা আলোয় অন্ধকার চিরে পথ খুঁজে খুঁজে দুজন সিঁড়ি বেয়ে নামছে। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু পায়ের শব্দটুকু যেন অকারণেই বেশি জোরে শোনা যাচ্ছে। মেহরীন ভয়ে ভয়ে পা ফেলছে, এই বুঝি কেউ দেখে ফেলল। বুকের ভেতর ধুকপুকানিটা থামছেই না।
একেবারে শেষ সিঁড়িতে পা রাখতেই হঠাৎ পা ফসকে যায়। ভারসাম্য হারিয়ে পড়তে নিতেই মুহূর্তের মধ্যে তালহার হাত ছুটে আসে। এক হাতে শক্ত করে ধরে ফেলে মেহরীনকে। নিচু গলায় কড়া ধমক,
—ইডিয়েট! বলিনি আস্তে নামতে?
কথা বলতে বলতেই মেহরীনের পুরো শরীর আলগি দিয়ে বাকি দুটো সিঁড়ি পেরিয়ে মেঝেতে নামিয়ে দেয় তাকে। ছাড়তেই দুজন সামনে এগোতে লাগেক। ড্রয়িংরুমের কাছাকাছি আসতেই টেবিলের পাশে কাউকে পানি খেতে দেখা যায়। তালহা সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু মেহরীন দেখেনি, নিজের মতো এগিয়েই চলেছে। তা দেখেই এক টানে মেহরীনকে নিজের কাছে টেনে আনে তালহা। হকচকিয়ে মেহরীন বলে ওঠে,

—কি হয়েছে টা….
বাকি কথাটা বেরোনোর আগেই তালহার হাত তার মুখ চেপে ধরে। মুহূর্তের মধ্যেই দুজন পিছিয়ে যায়, প্রায় দৌড়েই সিঁড়ির নিচে আশ্রয় নেয়। নিজেদের লোকানোর জন্য।
এইদিকে, ঘুমঘুম চোখে হঠাৎ দুটো ছায়ামূর্তি দেখে তানিয়া বেগম চমকে ওঠেন। চোখের ঘুম এক ঝটকায় উড়ে গেছে। পায়ের খসখসে শব্দও স্পষ্ট শুনেছেন তিনি। ছায়াগুলো সিঁড়ির দিকে যেতেই তার প্রাণ শুকিয়ে আসে। ওদিকে তো মায়ের ঘর, চোর? ডাকাত? না কি.. ভূত? কারা ওগুলো?
ভয়ে মুখ দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না তার। চিৎকার দিয়ে যে মানুষ জড়ো করবে সে শক্তি নেই। কোনোমতে পিছু হটতে হটতে নিজের ঘরে ঢুকে পড়েন। ঘুমন্ত স্বামীকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে তোতলান,

—ওগো উঠো, বা..বাড়িতে চ..চোর ঢুকেছে, ডা..ডাকাত পড়েছে…উঠো..
ঘুমের ঘোরে স্ত্রীর এসব বিলাপ শুনে বিল্লাল সাহেব এক লাফে উঠে বসেন।
—কি বলছ? কি বলছ, কখন? কোথায়? কিভাবে?
—ড্রয়িংরুমে…ড্রয়িংরুমে
কথা শেষ না করেই স্বামীকে টেনে বাইরে নিয়ে আসেন। বেরোনোর সময় বিল্লাল সাহেব খাটের নিচে রাখা নিজের লাঠিটা হাতে তুলে নেন। চোর-ডাকাত হলে তো খালি হাতে থাকবে না, নিজের নিরাপত্তা আগে। চারদিকে চোখ বুলিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করেন,

—কোথায়? কোথায় দেখেছ?
তানিয়া বেগম সিঁড়ির দিকে আঙুল তুলে ফিসফিস করে বলেন,
—ওইখানে, সিঁড়ির নিচে যেতে দেখেছি। তুমি দাঁড়াও, আমি লাইট জ্বালাই…
বিল্লাল সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বাধা দেন,
—একদম না। লাইট জ্বালালে ওরা টের পাবে। আগে আমি ধরি, তারপর লাইট।
কথা শেষ করেই তিনি ধীরে ধীরে এক পা, দুই পা করে এগোতে লাগেন। তানিয়া বেগম ভয়ে জায়গাতেই জমে আছে, তার এগোনোর সাহস নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভয়ে দোয়া পড়ছেন। বিল্লাল সাহেব সিঁড়ির একদম কাছে পৌঁছে লাঠিটা উঁচু করেন। সিদ্ধান্ত একটাই, দেখামাত্র উড়াধুরা বারি।

সেভাবেই আরেকটু সামনে যেতেই চোখে পড়ল তখনই সিঁড়ির কোণায় দুটো কালো ছায়া। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চমকে ওঠেন। তাহলে সত্যিই চোর! আর কিছু ভাবার সময় নেই। লাঠি উঁচিয়ে আঘাত করতে নিতেই সামনের লোকটা লাঠির মাথা শক্ত করে চেপে ধরে। বিল্লাল সাহেব কেঁপে ওঠেন। এবার জানের জোরে চিৎকার করতে যাবেন, তার আগেই তালহা টান মেরে তাকে নিজের দিকে এনে মুখ চেপে ধরে। সেই ফাঁকে মেহরীন ঝটপট করে লাঠিটা ছিনিয়ে নেয়।
ভয়ে বিল্লাল সাহেব যেন নড়তে পারছেন না। তালহা তাড়াতাড়ি ফিসফিসিয়ে বলে,

—আরে বাপের ভাই চাচা, আমি তোমার ভাতিজা।
চেনা কণ্ঠ পেয়ে বিল্লাল সাহেব ফট করে চোখ মেলে তাকান। তালহা হাত সরাতেই তিনি যেন হাপ ছেড়ে বাঁচেন। জানে একটু পানি আসল। বুক চাপড়ে থুথু দিয়ে বলেন,
—ভাইয়ের ছেলে ভাতিজা, এগুলো কী কাণ্ড আমাকে বোঝা।
মেহরীন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দুজনের কথোপকথন শুনছে। এরা কি সিরিয়াল মুহূর্তে কবিতা আবৃত্তি করছে ? এদিকে ভয়ে তার জান যায় যায় অবস্থা। তালহা আবার নিচু গলায় বলে ওঠে,
—তোমার বউমাকে নিয়ে একটু বের হতাম। কিন্তু তোমার বউ তো পুরো পথ আঁটকে দিল।
বিল্লাল সাহেব বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইলেন,
—কি, এত রাতে মেহরীনকে নিয়ে বের হবি?
তালহা চোখ কুঁচকে বিরক্ত গলায় বলল,

—আস্তে কথা বলো। তোমার বউয়ের কান খুব ধারালো। এখন এইটা আলোচনার জায়গা না। ঘটনা হলো, তোমার বউ তুমি সামলাও, আমি আমারটা নিয়ে বের হচ্ছি।
—এহহ।
—এহহ না, হ্যাঁ।
বিল্লাল সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে চিন্তিত গলায় বললেন,
—এত রাতে বের হবি। কেউ দেখলে?
তালহা একেবারে গা-ছাড়া ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
—ধরা পড়লে তুমি সামলাবে।

এই কথা বলে সে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না চাচার কোনো কথা না শুনেই। হালকা ঠেলা দিয়ে চাচাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিল। ইশারায় বুঝিয়ে দিল, তানিয়া বেগমকে নিয়ে ঘরে ফিরে যেতে। বিল্লাল সাহেব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কড়া চোখে তাকিয়ে রইলেন। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। বেঁচে থাকতে বাপ জ্বালাতো, এখন ছেলে। দুই প্রজন্ম, একই জাতের যন্ত্রণা। মনে পড়ে গেল তালহার মা বাবার কান্ড। প্রায়ই রাতের বেলা বউ নিয়ে বের হতো আর কেউ যেন টের না পায় সে পাহারায় ভাইদের রেখে যেত। ছেলেটা হয়েছে একদম বাপের কার্বণ কপি।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই আচমকা মনটা নরম হয়ে এলো। চোখ জ্বালা করতে লাগল। কেন এমন হচ্ছে, বুঝে উঠতে পারছেন না। বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল। ঠিক তখনই তানিয়া বেগম ছুটে এলেন,

—কি গো, কাউকে দেখেছো?
বিল্লাল সাহেব হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
—চলো ঘরে। কেউ না। হুদাই তুমি ভুল দেখেছো। সারাক্ষণ স্টার জলসা আর জি বাংলা নিয়ে পড়ে থাকলে তো এমনই হবে। এবার এসো, ঘুমাবে।
স্ত্রীর হাত ধরে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লেন।
তানিয়া বেগমের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। ভুল দেখতেই পারেন, কিন্তু এই ভুলের সঙ্গে স্টার জলসা-জি বাংলার সম্পর্কটা ঠিক কোথায়? কিছু হলেই স্বামীর তির ওই দিকেই যায়। বিরক্তিতে দরজা বন্ধ করতে যায়। মনে সন্দেহ আছেই তাই দরজা লাগানোর আগে আরেকবার সিড়ির দিকে চোখ বোলালেন। তিনি নিশ্চিত কিছু একটা দেখেছিলেন। আবার মনে হচ্ছে, হয়তো মনের ভুল।
বিছানার কাছে আসতেই চোখে পড়ল, বিল্লাল সাহেব এক হাত চোখের ওপর রেখে শুয়ে আছেন। কপাল কুঁচকে গেল তার। এই মানুষটা তো টেনশন ছাড়া এমন করে শোয় না। তবে কি কিছু নিয়ে ভীষণ ভাবনায়? ধীরে এগিয়ে এসে স্বামীর হাত সরাতেই বুকটা ধক করে উঠল। চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। তানিয়া বেগম কেঁপে উঠলেন। বিচলিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

—ওগো, কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?
বিল্লাল সাহেব দ্রুত চোখ মুছে নিজেকে শক্ত করলেন,
—কিছু না।
কিন্তু তানিয়া বেগম জানেন, এই মানুষটা অল্পতে ভেঙে পড়ার নয়। বারবার জিজ্ঞেস করতেই থাকলেন। শেষমেশ আর পারলেন না। বিল্লাল সাহেব স্ত্রীকে শক্ত করে বুকে টেনে নিলেন। গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন,
—বড় ভাইটার কথা খুব মনে পড়ছে। মানুষটা নেই কত বছর হয়ে গেল… অথচ আমরা দিব্যি আছি। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে অফিসের কাজে একটু দূরে গেলেই কী অস্থির হয়ে পড়তাম। দু’ভাই মিলে ভাইয়ার হাত আঁকড়ে ধরতাম। বলতাম, ভাইয়া তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না, পারব না…

কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে এলো। তানিয়া বেগমও নীরবে কাঁদছেন। মানুষটা বড্ড ভালো ছিল, নিজের বড় ভাইয়ের মতো ছিল। হয়তো তাই আল্লাহ তাড়াতাড়ি ডেকে নিয়েছেন। এই বাড়িতে প্রথম পা রাখার দিনটার কথা মনে পড়ে যায়। তখন তো কেউ খুব একটা আপন করে নেয়নি, শুধু এই মানুষটাই বড় ভাইয়ের মতো ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল মাথার ওপর। আজকের এই সুখের সংসারের পেছনে, সবচেয়ে বড় অবদান তারই।

তালহা মেহরীনকে নিয়ে গেটের বাইরে এসে পৌঁছাল। আগেভাগেই দারোয়ান কাকাকে বলে রেখেছিল, বাইকটা যেন গ্যারেজে না ঢুকিয়ে বাইরে রাখা হয়। ফলে আলাদা করে বের করার ঝামেলায় পড়তে হলো না। রাতের নীরবতার ভেতর সবকিছুই চুপচাপ ঘটছে, কেউ টের পাওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না।
গেটের কাছে পৌঁছাতেই দারোয়ান নিজে থেকেই গেট খুলে দিলেন সাবধানে। যেন তিনিও বুঝে গেছেন এরা যে সকলের আড়ালে বের হচ্ছে। তিনি বসে ছিলেন তাহসানের অপেক্ষায়। তিতলি বেগম বলে রেখেছিলেন, তাহসান রাতের মধ্যেই ফিরবে। তাই লোকটা ভেবেছিল, সে এলেই তালা মেরে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাবে। তালহা সুযোগ বুঝে তার পকেটে কিছু টাকা গুঁজে দিল। নীরব থাকার বিনিময়ে। এই রাতের গল্প যেন রাতের মধ্যেই চাপা পড়ে যায়, এই নিশ্চয়তার দরকার ছিল। তিনিও টাকা পেয়ে হেসে ফেললেন যার অর্থ এ কথা আর দুকান হবে না।
এরপর তালহা সাবধানে বাইকটা বের করল। সিটে বসেই হেলমেট মাথায় চাপাল। সঙ্গে সঙ্গেই চোখের ইশারায় মেহরীনকে বোঝাল, হেলমেট পরতে। কিন্তু মেহরীন হেলমেটটা হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে রইল। কিভাবে পরতে হয়, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। দেখেছে তালহা কিভাবে পড়ে, কিন্তু চেষ্টা করার সাহস করছে না।

তা দেখে তালহা আর অপেক্ষা করল না। এক টানে মেহরীনকে নিজের সামনে টেনে আনল। মাথার ওড়নাটা টেনে ঠিক করে দিল, তার ওপর আলতোভাবে হেলমেটটা পরিয়ে দিল। গলার নিচের বেল্টটা আটকাল। তারপর চোখের সামনের কাঁচটা তুলে মেহরীনের নাকটা ধরে হালকা টান দিল। মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে হাত ঠেলে সরিয়ে দিল। তালহা ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি এনে ইশারা করল,

—পেছনে বসতে।
মেহরীন আর দেরি করল না। আগেও বসেছে, তাই এবার উঠতে অস্বস্তি লাগল না। একপাশে দু’পা রেখে বসতে যেতেই তালহা হঠাৎ আপত্তি করল,
—এভাবে না। ওইভাবে বসো। আজ অনেক স্পিডে চালাবো।
কথা শেষ হতে না হতেই মেহরীন দু’পাশে দু’পা দিয়ে বসে পড়ল। দু’হাত তুলে তালহার কাঁধে রাখল। তালহা আয়নায় চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,
—অল ওকে?
মেহরীন পেছন থেকে উঁকি দিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—ইয়েস, ওল ওকে।
তালহা আর কিছু বলল না। শুধু বাইক স্টার্ট দিল।
মুহূর্তের মধ্যেই গর্জে উঠল ইঞ্জিন। মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে তালহার জ্যাকেটটা খামচে ধরল। চলতে শুরু করেছে বাইক। প্রথমে ধীরে, তারপর ক্রমশ গতি বাড়ল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা বাড়ির গলি পেছনে ফেলে অনেক দূরে চলল।
এদিকে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা একজন নিঃশব্দে সবকিছু দেখছিল। তাহসান তাকিয়ে আসে সেই রাস্তার ধুলো উড়া বাতাসের দিকে। যেদিক দিয়ে সবেমাত্র বাইকটা গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে সিটে হেলান দিল। যার জন্য কুমিল্লা থেকে ঢাকায় রাতারাতি ছুটে আসা, সে যে এভাবে শান্তি দেবে, কল্পনাও করেনি। তাহলে কি এ দৃশ্যটা দেখার জন্যই তার ফেরা?
চোখ বন্ধ করে নেয় সে। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত।
তার থেকেও বেশি ক্লান্ত তার হৃদয়। বোঝাতে চায় কত কথা, কিন্তু কাউকে বোঝাতে পারে না। হঠাৎ বুকের ভেতর অসহ্য এক যন্ত্রণা নিয়ে ফিসফিসিয়ে ওঠে,
—বাস্তবে তোমার আমার সংসার হোক আর না হোক, তবে কল্পনাতে আমাদের সংসারটা ভীষণ সুন্দর মেহুপরি।

বাইকটা শহরের জমে ওঠা কোলাহলময় রাস্তায় এগোচ্ছে। রাত এখন প্রায় বারোটা ত্রিশ, কিন্তু শহর নিঃশব্দ নয়। রাস্তার আলো ঝলমল করছে, হর্নের আওয়াজ, চাকা ঘষার শব্দ, পথচারীর হট্টগোল, সব মিলিয়ে শহর যেন রাতেও নিজের ছন্দ বজায় রাখছে। হোটেলের ঝলমলে আলো, ছোট-বড় দোকান পার্টের মানুষের আনাগোনা।
ফুটপাতে কিছু খাবারের ছোট ছোট দোকানও রঙিন আলো জ্বেলে বসে আছে। তালহার চোখ পড়ে এক পিঠার ভ্যানে। বাইকটা ধীরে সাইডে নিয়ে দাঁড়ালো।
—ম্যাডাম, পিঠা খাবেন?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল,
—ভালোই হয়। শীতের রাতে গরম গরম পিঠা।
তালহা বাইক থামিয়ে ইশারা করতেই মেহরীনে নেমে দাঁড়াল। তারপর নিজেও নেমে দাঁড়াল। নিজের হেলমেট খুলে মেহরীনের হাতে ধরাল। তারপর মেহরীনের হেলমেটটাও খুলে দিল। দুজন গিয়ে বসল দোকানের পাশে রাখা চেয়ার টেবিলে।
দোকানদারের উদ্দেশ্যে বলল,

—মামা, চারটা ভাপা পিঠা দিবেন,
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না না, আমি চিতই পিঠা খাবো, ভর্তা দিয়ে।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে নাক ছিটকে বলল,
—ইইই এসব পচা মাছের ভর্তা খাবে?
মেহরীন চোখ বড় করে তাকাল,
—পচা মাছ.?
—তো আবার এসব মাছ পচিয়ে বানানো হয়। না, খেতে হবেনা।
মেহরীন হেসে বলল,
—আপনি বেশি জানেন? এগুলো শুটকি ভর্তা। রোদে শুকিয়ে তারপর ভেজে ভর্তা বানিয়ে সবাই খায়, অনেক মজার হয়। আজ আপনিও ট্রাই করুন।
—না না, এসব জংলি খাবার আমি খাবো না, তুমিই খাও।
দোকানদার দুটো ভাপা পিঠা তালহার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর চিতই পিঠা ভর্তাসহ মেহরীনের হাতে দিয়ে গেল। মেহরীন পিঠা ছিঁড়ে ভর্তা লাগিয়ে মুখে তুলল, সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে নিল। তালহা নাকমুখ কুঁচকে দেখছে। মেয়েটার খাওয়া দেখে মনে হচ্ছে কি যেন মজার জিনিস খাচ্ছে। মেহরীন এক টুকরো তুলে তালহার মুখের কাছে ধরল, তালহা দ্রুত মুখ সরাল।

—ছি এসব খাই না ইয়াক…
—মিস করছেন, খেয়ে দেখুন, অনেক টেস্টি।
—লাগবেনা…
ফুটপাতে আরও ছোট ছোট খাবারের দোকানপার্ট বসেছে। প্রথমে তালহা সেসব ভাজাপোড়া খেতে মানা করলেও। মেহরীনের আগ্রহ দেখে তালহা নিজেই এখন সব ট্রাই করাচ্ছে তাকে। বিভিন্ন রকমের ভাজা, ঝালমুড়ি, চটপটি, সবই মোটামুটি আছে এখানে।
মেহরীন খুশিমনে কথা বলছে, হেসে খাচ্ছে। আজ যেন মুখ স্বাভাবিক আচরণ করছে। মেয়েটা আগের তুলনায় বেশ প্রানবন্ত লাগছে। তালহা তো তার বাচ্চামোতে সঙ্গ দিচ্ছে তাই হয়তো তালহার সঙ্গে এতটা প্রানবন্ত আচরণ করছে মেয়েটা। উপভোগ করছে মেহরীনের কাজকর্ম তালহা।

সেখান থেকে তারা আবারও বাইকে চড়ে বসল। তালহা বাইক স্টার্ট দিতেই এবার মেহরীন নিজ থেকেই হেলমেটটা পড়ে নিল দুবার দেখে শিখে নিয়েছে। তালহার বলার আগেই সে উঠেও বসল। তালহাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। তালহার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তিমাখা হাসি। সে স্বার্থক কান্নায় ভেঙে পড়া মেয়েটার মন ভালো করতে পেরেছে সে।
বাইক চলছে আপন গতিতে। চলছে তাদের কথাবার্তা, হালকা বাতাসে উড়ছে মেহরীনের চুল, রাস্তার আলো ঝলমল করছে, সব মিলিয়ে রাতের এই ফুটপাত, শহরের কোলাহল, এবং দুজনের মধ্যেকার ছোটখাটো আনন্দ এক অনন্য আবহ সৃষ্টি করছে। মাঝে মাঝেই রাস্তা ফাঁকা পেলেই মেহরীন দুহাত মেলে দিচ্ছে। তালহাও সঙ্গে সঙ্গে বা হাত পেছনে এনে মেহরীনের কোমড় পেচিয়ে ধরে। যেন পড়ে না যায়।

বাইকটা এসে থামল হাতিরঝিলের পাশে। রাতটা এখানে এসে যেন একটু থেমে যায়। শহরের কোলাহল দূরে কোথাও মিলিয়ে যায়, শুধু নদীর ধারে জমে থাকা নীরবতা আর ঠান্ডা বাতাস। বাইকটা সাইড করে রেখে তালহা আর মেহরীন বসে আছে নদীর ধারের এক পুরোনো ব্রেঞ্চে। চারপাশে ঝিলের জল চুপচাপ শুয়ে আছে, চাঁদের আলোয় সেই জল ঝিলমিল করে কাঁপছে স্রোতের সাথে।
মেহরীন তালহার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। দৃষ্টিটা নদীর শান্ত জলের ওপর স্থির, মনটা ভীষণ ভালো তার শান্তি শান্তি লাগছে। তালহা সযত্নে তাকে আগলে ধরে রেখেছে, যেন এই রাত, এই ঠান্ডা, এই পৃথিবী, সবকিছু থেকে তাকে ঢেকে রাখছে। তালহার মনোযোগ পুরোটা জুড়ে আছে বউটার মুখখানায়। একবার তাকায়, আবার তাকায়, আবার তাকায়, বারবার তাকায়। মাঝে মাঝে কপালে কিংবা গালে এসে পড়া চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দেয়। পিচ্চি বউটা আজ তার জন্য সেজেছে, সাধারণ সাজেও ভীষণ মায়াবী লাগছে মেয়েটাকে। মেয়েটার চোখে-মুখে একরকম নরম আলো, যা তালহার বুকের ভেতরটা অজান্তেই উষ্ণ করে তোলে।
এভাবেই বেশকিছু সময় পার হয়। মাঝে মাঝে মেহরীন হালকা কেঁপে উঠছে। সেই কাঁপুনি তালহার চোখ এড়ায় না। সে মেহরীনের গায়ের দিকে খেয়াল করতেই দেখে, মেয়েটির গায়ে শীতের কিছু নেই। মুহূর্তেই কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে পড়ে,

—তুমি শীতের কিছু গায়ে দাওনি?
মেহরীন ঠোঁট উল্টে বলল,
—মনে ছিল না।
তালহার মুখে খানিকটা বিরক্তিমাখা রাগ ভর করল, খানিকটা নিজের ওপর রাগ।
—শিট আমিও তো খেয়াল করিনি।
বলেই নিজের জ্যাকেট খুলতে শুরু করে। তা দেখে মেহরীন তাকে আঁটকাতে চাইলে তালহা ঝারি মেরে বসল,
—চুপ করে বসো স্টুপিড। আকাম করবে পদে পদে।
নিজের জ্যাকেটটা মেহরীনের গায়ে পরিয়ে দিয়ে সে চারপাশে চোখ বোলাতে লাগল। কইছু খুঁজছে। একটু পর উঠে গিয়ে হঠাৎ কাগজ জড়ো করতে শুরু করল। সেই কাণ্ড দেখে মেহরীনও উঠে এল,

—কি করবেন এগুলো দিয়ে?
তালহা হালকা গম্ভীর গলায় বলল,
—আগুন জ্বালাবো।
কথাটা শুনে মেহরীনও আর দেরি করল না। আশেপাশে পড়ে থাকা কাগজ, চিপ্সের প্যাকেট খুঁজতে লাগল। তালহাও সঙ্গে সঙ্গে কিছু শুকনো ঢালপালা জোগাড় করল। তাদের দুজনের কাজকর্ম দেখে মেহরীন ফাকে একবার বলে উঠল,
—নিজদের কেমন টোকাই টোকাই লাগছে।
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই তালহার একটা ঝারিও অবশ্য খেয়েছে। এই যেমন,
—স্টুপিড ফালতু চিন্তা ছাড়া মাথায় ভালো চিন্তা নেই?
ঝারি খেয়ে রাগের বদলে মেহরীন আরও মিটিমিটি হেসে উঠেছিল। এই তালহাই ঠিকাছে, ঝারি ছাড়া তালহা যেন ঠিক জমে না। কিছুক্ষণ পর দুজনেই বসে পড়ল শিশিরভেজা ঘাসের ওপর।
তালহা একে একে কাগজগুলো একটা আরেকটার উপর জড়ো করছে, তার ওপর ভেঙে রাখা ঢালপালাগুলো রাখছে। মেহরীন চুপচাপ তাকিয়ে আছে। তার মনে প্রশ্ন জাগে, আগুন ধরাবে কীভাবে? ভাবনার মাঝেই তালহা পকেট থেকে একটা লাইটার বের করতেই মেহরীন ছোট ছোট চোখে তাকায়,

—এই আপনি লাইটার দিয়ে কি করেন?
মেহরীনের আচমকা প্রশ্নে তালহা একটু হকচকিয়ে যায়। আমতা-আমতা করতে করতে বলে,
—এ..এমনি মাঝে মাঝে আগুন ধরাতে কাজে লাগে।
মুহূর্তেই মেহরীনের চোখমুখ শক্ত হয়ে আসে,
—কার পাছায় আগুন ধরান আমি লাগে জানিনা।
তালহা বড় বড় চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কার পাছা ?
মেহরীন রাগী কণ্ঠে বলল,
—সি*গারেটের পাছা..
তালহা সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেলল,
—ছি ছি কিসব বলো এসব আমি খাই না।
মেহরীন মুখ ভেংচে অন্যদিকে তাকাল। এখন আর কিছু বলবে না। একদিন হাতেনাতে ধরেই এর খাওয়া বন্ধ করাবে, মনে মনে ঠিক করে রাখে।

তালহা একটা কাগজে আগুন ধরিয়ে ধীরে ধীরে জমিয়ে রাখা বাকি কাগজগুলোর ওপর রাখতেই আগুনটা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে। শীতের রাত, নদীর ধারের নীরবতা আর আগুনের উষ্ণতা, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি। দুজনেই হাত বাড়িয়ে আগুনের তাপ নিচ্ছে।
আগুনের হলদে আলোয় মেহরীনের মুখখানা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চকচকে চোখ দুটো, আলোর ঝিলিক লেগে আরও গভীর লাগছে। আগুনের শিখা উঠানামার সঙ্গে সঙ্গে আলোটা কখনো তার গালে পড়ে, কখনো চোখের পাতায়। তালহা ক্ষণে ক্ষণে তাকিয়ে দেখছে মেয়েটাকে, আবার তার গ্রামের নানান ছোট ছোট গল্পও মন দিয়ে শুনছে। আবার খেয়ালও রাখছে আগুনের কাছাকাছি না চলে যায় তার বউটা।
হঠাৎ কথার মাঝেই মেহরীন বলে উঠল,
—শুনুন না, কানটা ভীষণ ভারী ভারী লাগছে, হালকা ব্যথাও করছে।
মেহরীনের কথায় তালহা এবার তার কানের দিকে তাকাল। বড় বড় দুটো ঝুমকো কানে লটকে আছে, আগুনের আলোয় সেগুলোও ঝিলমিল করছে। তালহার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ে।

—তাহলে ঝুমকাটা খুলে ফেলো।
তালহার কথায় মেহরীন তাই করতে গেল। হাত তুলেই থেমে গেল। পরমুহূর্তে মনে পড়ল, ব্যাগ আনেনি। হুদাই হাতে করে রাখতে ঝামেলা, কোথাও পড়ে গেলে? এই ভেবেই বলল,
—কিন্তু ব্যাগ আনিনি তো.. থাক, কানেই থাক।
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তালহা একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল। কিছু না বলেই সে হাত বাড়াল মেহরীনের কানের দিকে। আঙুলের ছোঁয়ায় সাবধানে ঝুমকোর হুকটা খুলতে খুলতেই নিচু স্বরে বলল,
—তোমার গায়ে যদি ব্যথা লাগে, সে ব্যথার নামও আমার হওয়া চাই, অন্য কোনো কষ্ট তোমাকে ছুঁবে, অসহ্য ব্যাপার।
কথাগুলো আগুনের তাপের মতোই মেহরীনের বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে তার মুখে আবেশে চোখ নামিয়ে নেয়। ঝুমকোজোড়া খুলে তালহা সযত্নে নিজের শার্টের পকেটে রেখে দিল, যেন খুব দামী কিছু।

তালহার এই কাণ্ডে মেহরীন আরও গালভর্তি হেসে তার কাঁধে মাথা রাখল। এই রাতটা তার ভীষণ ভালো লাগছে। আগুন, নদী, ঠান্ডা হাওয়া, সঙ্গে প্রিয় মানুষটা, সব মিলিয়ে যেন স্বপ্নের ভেতর আছে সে। ইচ্ছে করছে সময় এখানেই থেমে যাক। বাকিজীবন যদি এভাবেই পাশাপাশি কাটিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু বাস্তবটা তো এমন না। হঠাৎ করেই টনক নড়ল। বাড়ি গেলে তো আবার আলাদা হয়ে যেতে হবে, অচেনা হয়ে থাকতে হবে। তপ্ত একটা শ্বাস ফেলে মেহরীন নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—আমাদের বিয়েটা সবার সামনে কখন আসবে?
প্রশ্নটা শুনে তালহা কিছুটা থমকে গেল। আগুনের দিকে তাকিয়ে কয়েক পলক চুপ করে রইল। যেন উত্তরটা বেছে নিচ্ছে। তারপর শান্ত কন্ঠে বলল,

—আসবে আসবে খুব শীগ্রই আসবে। তুমি শুধু আর একটু ধৈর্য ধরো।
মেহরীনের বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা শ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসল। আফসোসের একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে তালহার এক বাহু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
—যত দিন যাচ্ছে আপনাকে হারানোর ভয় তীব্র হচ্ছে, ধৈর্য ধরা কঠিন মনে হচ্ছে।
তালহা মৃদু হেসে তার মাথার উপর চিবুক ঠেকিয়ে বলল,

—হারিয়ে গেলে তুমি হয়তো যেতে পারো। তবে আমি হারাচ্ছি না সাহেবা। আপনার সাথে সমুদ্রবিলাস বাকি, মাঝ রাতের চন্দ্রবিলাস বাকি, আপনাকে বুকে নিয়ে শান্তির একটা ঘুম দেওয়া বাকি। এত সহজে ছাড়ছি না।
এই কথাগুলো শুনতে শুনতেই মেহরীন তালহার বুকে মুখ গুঁজে দেয়। তালহা তাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নেয়। দুজনের নিঃশ্বাস একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এভাবেই কেটে যায় আরও অনেকটা সময়।
একসময় মেহরীন গুটিশুটি মেরে তালহার বুকেই ঘুমিয়ে পড়ে। আগুনের শিখা ধীরে ধীরে নিভে আসছে, চারপাশের ঠান্ডা আরও বাড়ছে। তবু তালহা উঠতে পারছে না, মেহরীনের ঘুমটা ভেঙে যাওয়ার চিন্তায়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সে এই একইভাবে এই শীতেই বসে থাকল, নিজের শরীরে একটা শার্ট ছাড়া আর কিছু নেই, তাতে কোনো ভাবনা নেই। তার সব চিন্তা শুধু একটাই, মেহরীনের ঠান্ডা লাগছে কিনা।
নিজের কোলের ওপর তাকে একদম ছোট একটা বিড়ালছানার মতো আগলে রেখেছে। তবু বাইরের ঠান্ডা হাওয়ায় মেয়েটা বারবার কেঁপে উঠছে। কার আনলে হয়তো ঘুমের মধ্যেই তাকে নিয়ে যাওয়া যেত, কিন্তু সে তো বাইক নিয়ে এসেছে।

একসময় বাধ্য হয়েই তালহা মেহরীনকে ডেকে তোলে। গভীর ঘুমের ঘোরে মেয়েটা উঠে বসতে গিয়েও ঠিকমতো বসতে পারে না। চোখদুটো আধখোলা, শরীরটা ঢুলে পড়ছে। তালহা পাশে থাকা বোতল থেকে একটু পানি নিয়ে তার চোখে-মুখে আলতো করে ছিটিয়ে দেয়, যেন কোনোভাবে বাসায় পৌঁছানো পর্যন্ত ঘুমটা আর না নামে।
বাইকটার ওপর উঠে বসে তালহা। পেছনে মেহরীন বসতেই নরম গলায় বলল,
—শক্ত করে ধরে রাখবে কেমন?
মেহরীন ঘুমঘুম কণ্ঠে জবাব দিল,
—হু..
তালহা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যায়, এই “হু” ভরসার নয়। গলায় খানিকটা কড়া ভাব এনে বলে,
—হু কি? সুন্দর করে বল ঘুমিয়ে যাচ্ছো নাকি আবার? এই মেহরীন।
মেহরীন এবার তালহার কোমর পেঁচিয়ে ধরে, পিঠে মাথা ঠেকিয়ে বলল,

—না সজাগ আছি। তবে ঘুম ঘুম পাচ্ছে।
তালহার বুকের ভেতর দুশ্চিন্তাটা আরও জমে ওঠে। গলা নিচু করে বলে,
—বিশটা মিনিট সজাগ থাক জান তারপর যত খুশি ঘুমাস।
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে আবার হু হু করল। কিন্তু তাতেও তালহার বিশ্বাস হলো না। আর এক মুহূর্তও না ভেবে সে নিজের প্যান্টের বেল্টটা টেনে খুলে ফেলে। পেছন থেকে মেহরীনের কোমর ঘিরে এনে নিজের পেটের কাছে শক্ত করে বেল্টটা বেঁধে নেয়। ব্যস, এবার একটু নিশ্চিন্ত। ঘুমে ঢুলে পড়তে নিলে অন্তত সে বুঝে গাড়ি থামাতে পারবে।
গাড়ি চলতে শুরু করল ফুল স্পিডে। বিশ মিনিটের রাস্তা দশ মিনিটে পার করার তাড়া। রাতটা ফাঁকা, রাস্তার আলো একটার পর একটা পিছনে ছুটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে স্পিড কমিয়ে বাম হাতটা হ্যান্ডেল থেকে সরিয়ে পেছনে নিয়ে যায়, মেহরীন ঠিক আছে কিনা, জেগে আছে কিনা, বারবার ছুঁয়ে দেখে, ডেকে দেখে।

বাসার সামনে যখন আসে তখন তিনটার ওপর বাজে। বাইকেই বসে দারোয়ানকে ফোন করে। লোকটা ঘুমঘুম চোখে গেইট খুলে দিতেই তালহা ভেতরে গাড়িটা ঢুকিয়ে রাখে। তারপর নেমে এক মুহূর্তও দেরি না করে মেহরীনকে কোলে তুলে নেয়। শরীরটা একেবারে ঢলে পড়েছে তার বুকে। আস্তে ধীরে মেইন দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে একবার মেহরীনের ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকায়। ফুস করে একটা শ্বাস ছাড়ে। কোথায় ভেবেছিল মাঝরাতে চন্দ্রবিলাস করবে, আজ সুযোগ পেয়ে। অথচ মহারানী তার আগেই ঘুমবিলাসে চলে গেছে। তাহিয়ার রুমের দরজাটা খোলা। ভেতরে ঢুকেই চোখে পড়ে ঘুমন্ত তাহিয়াকে, ল্যাপটপটা এখনো অন, হয়তো মুভি দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার পাশের খালি জায়গায় মেহরীনকে শুইয়ে দেয় তালহা। আলতো করে তার পায়ের জুতোজোড়া খুলে রাখে। তারপর কম্ফোর্টারটা টেনে তার গায়ে দেয়।

এরপর তাহিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। বোনের গায়ের কম্ফোর্টারটা ঠিক করে দেয়, পাশে রাখা চশমাটা তুলে টেবিলে রাখে। ল্যাপটপ বন্ধ করে সেটাও টেবিলে রেখে কোলবালিশটা তাহিয়ার সাইডে গুঁজে দেয়।
দুজনকে ঠিক করে৷ স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে বের হতে গিয়েও হঠাৎ থেমে যায় তালহা। কী মনে করে আবার মেহরীনের কাছে ফিরে আসে। ধীরে ঝুঁকে তার কপালে গভীর একটা ঠোঁটের স্পর্শ একে দেয়। তারপর কানের লতিতে একটা চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়ায়।

তারপর নীরবে দরজা টেনে বন্ধ করে বেরিয়ে আসে। নিজের রুমের দিকে যেতে গিয়েও তালহা থেমে যায়। পা দুটো যেন আপনাতেই নিচের দিকে মোড় নেয়। দাদির রুমের সামনে এসে দেখে দরজাটা খোলা। এক ঝলক তাকিয়েই সে বুঝে যায়, তার মা এখানে নেই। কিছু না বলেই পেছন ফিরে এবার মা-বাবার রুমের দিকে এগোয়।
দূর থেকেই চোখে পড়ে, লাইট জ্বলছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন শক্ত হয়ে আসে। লাইট জ্বলা মানে তার মা এখানেই আছেন। দরজার কাছে পৌঁছাতেই কানে আসে গুনগুন করে কান্নার শব্দ। খুব চাপা, খুব ধীর, তবু সেই কান্না যেন বুকের হাড়ে হাড়ে ধাক্কা মারছে। তালহার হাত মুঠো হয়ে আসে, দাঁত খিচিয়ে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। ভেতরে কী হচ্ছে, সেটা জানার জন্য দরজা খুলতে হল না। প্রতিদিনের মতো আজও তার মা গভীর রাতের নামাজের সেজদায় পড়ে তার আব্বুর জন্য কাঁদছেন। দোয়া করছেন স্বামীর মঙ্গল চেয়ে।

ভালোবাসা এমনও হয়? বাবা মারা গেছেন আজ কত বছর। তবু এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও মায়ের চোখে, মায়ের দোয়ায়, মায়ের কান্নায়, বাবার জন্য ভালোবাসার এক ফোঁটাও কমতে দেখেনি তালহা। বরং দিন দিন যেন বৃদ্ধি পাচ্ছে, না দেখে না ছুয়ে না পাশে পেয়েও এত ভালোবাসা যায়?
সারাদিন যে নারীটা হাসিখুশি থাকে, সংসারের সব ভার নিজের কাঁধে নিয়ে চলে, দিনশেষে সেই মানুষটাই আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে নিজের বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্ট নিঃশব্দে উজাড় করে দেয়।

কয়েক ফোঁটা পানি তালহার চোখ বেয়ে অজান্তেই গড়িয়ে পড়ে। সে আর দাঁড়ায় না। চুপচাপ পেছন ফিরে নিজের রুমে চলে আসে। এক মুহূর্ত দেরি না করে সরাসরি ঢুকে পড়ে ওয়াশরুমে। গোসল করে নেয় বেশ সময় লাগিয়ে, ওযু করে বের হয়। বুকের ভেতরের ভারটা যেন কমানোর রাস্তা খুঁজছে। জায়নামাজটা বিছিয়ে নিয়ে সেও বসে পড়ে।
কতক্ষণ যে সেখানে বসে নিজের ভেতরের সব দুঃখ, ভয়, দ্বিধা আর প্রার্থনা বলেছে, তার হিসাব নেই। সময় যেন নিজের নিয়ম ভুলে গেছে। সে উঠেছে একেবারে ফজরের আজান শুনে। নামাজটা পড়তে মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হয়। সেখানে পড়েই বাড়ি ফিরে আসে। তবে বাড়ির ভেতরে ঢুকে না, সোজা চলে যায় বাড়ির পেছনের দিকে। এখানেই তার আব্বুসহ বাকি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পারিবারিক কবরস্থান।

নীরবে বাবার কবরের সামনে দাঁড়ায়। বাবার সঙ্গে সঙ্গে সবার কবর জেয়ারত করে। ঠান্ডা ভোরের বাতাসে চোখদুটো আবার ভিজে আসে, তবে এবার কান্না নেই, শুধু একরাশ ভারী অনুভূতি।
সাড়ে ছয়টার দিকে রুমে ফেরে তালহা। ঘরে যাওয়ার পথে মায়ের সঙ্গে দেখা হয়। চোখের কোণে ক্লান্তি, মুখে চাপা ব্যথা। হয়তো সারারাত কান্নাকাটি করে মাথা ধরেছে, তাই চা বানাতেই বের হয়েছেন। তালহা কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরে চলে আসে। অথচ তাকিয়ে থাকার মধ্যেই মা-ছেলে দুজনের সব কথা বলা হয়ে গেছে।

আজ শুক্রবার। সকালে ওঠার তাড়া নেই কারোরই। ঘরজুড়ে একটা আলসেমি, একটা ধীরতা আজ। সূর্যটা বেশ খানিকটা ওপরে উঠে এসেছে, তবু বাড়ির ভেতরে সকালের কোলাহল নেই। আজ সকালের নাশতা হয়েছে এগারোটায়।
নাশতার পর মেহরীন, তাহিয়া, মেহেদি আর ফাইজা বসে আছে দাদির রুমে। ঘরটায় পুরোনো দিনের গন্ধ, আলমারির কাঠ, পুরোনো বই আর সময়ের সাথে জমে থাকা স্মৃতির মেলা। অনেকবারই ছেলেরা বলেছে নতুন আসবাবপত্র এই ঘরের জন্য বানাতে তবে উনার একটাই কথা এই ঘড়টা তেমনই থাকবে যেমন তার স্বামী তাকে সাজিয়ে দিয়েছিল।

তালহা এখনো ওঠেনি। নামাজে যাওয়ার আগে ডেকে দেবে তিতলি বেগম, এই ভরসাতেই কেউ আর বিরক্ত করছে না। দাদি গল্প বলতে শুরু করেছে। নানান সময়ের কথা, নানান মানুষের কথা। কে কবে কী কাণ্ড করেছে, কে কেমন ছিল, সবকিছুতেই মিশে আছে হাসি আর স্মৃতির উষ্ণতা। মেয়েগুলো মন দিয়ে শুনছে। মাঝে মাঝে কেউ হেসে উঠছে, কেউ আবার অবাক হয়ে প্রশ্ন করছে। এই আড্ডামহলটা জমে উঠেছে কিছুক্ষণেই। হঠাৎ দাদি উঠে গিয়ে আলমারির ভেতর থেকে একটা পুরোনো অ্যালবাম বের করল। সেই আগের আমলের অ্যালবাম। কভারটা একটু মলিন, পাতাগুলো হলদে। অ্যালবাম খুলতেই সময় যেন উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল। একে একে দেখাতে লাগল সবার ছোটবেলার ছবি।

কোনো ছবিতে কেউ হাঁটতে শিখছে, কোথাও কেউ কোলে, কোথাও বা স্কুলের ইউনিফর্মে দাঁড়িয়ে। হাসি-তামাশা চলছেই। তালহার আর তাহিয়ার একবছরের ছবি দেখে তো সবাই পুরাই অবাক। দুই ভাইবোনকে একদম একই লাগছিল। দুজনেই গুলোমুলু, মটুশটু, চেনার উপায় নেই কে কোনটা। দাদি নিজেই হেসে বলে উঠল, কে কে।
এভাবে একেকজনের ছবি দেখতে দেখতে পাতাগুলো এগোতে থাকে। তারপর দেখাতে লাগেন নিজের ছেলেদের বিয়ের ছবি। একে একে সব দেখাচ্ছেন, কোনটা কার বিয়ে, কে কার পাশে দাঁড়ানো, কে কী পরেছিল। সেই ছবি ঘিরে ছোট বড় মজার ঘটনাও বলছেন তিনি। সবাই মনোযোগ দিয়ে দেখছে, শুনছে, হাসছে। ঘরটা ভরে আছে নরম হাসিতে।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৪

এই সবের মাঝেই হঠাৎ একটা ছবিতে চোখ পড়তেই মেহরীন থমকে যায়। মুলহের হাসিটা মিয়িয়ে আসে, চোখ দুটো হঠাৎ ছানাবড়া হয়ে ওঠে। বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। দাদি পরের পেইজ উল্টাতে নিলে মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দেয়। গলাটা কেঁপে আসে, অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে,
—আ..আম্মু…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৬

1 COMMENT

  1. আপু তারাতারি ৪৬ পর্ব টা দেন আর ধৈর্য ধরা যাইতাছে না প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ 🫵🤌

Comments are closed.