নীতিহীন রাজ পর্ব ২০
আশিকা আক্তার সোহাগী
মাঠে না নেমেও খেলার সকল পরিভাষা বুঝে ফেলার ক্ষমতা একজন তুখোড় রাজনীতিবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তেমনি আদালতের বিচারের প্রকোষ্ঠে শুধু বাদী,বিবাদী ,আসামী , সাক্ষী আর আইনের লোকজন ছাড়া জিয়ানাকে দেখে নিবিড়ের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
একটা ঢিলেঢালা সাদা হাতের কাজের ফতুয়া আর লং স্কার্ট সাথে একটা মাল্টিকালারের ওড়না দিয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে ,আসামী পক্ষের উকিলের পেছনে বসে আছে জিয়ানা।নিবিড় প্রথমে চিনতে পারেনি।মেয়েলি সাজে এই প্রথম দেখলো জিয়ানাকে।পরক্ষণেই শান্ত চোখজোড়া শক্ত আর লাল হয়ে উঠছে ক্রমান্বয়ে।
জিয়ানা নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে চমৎকার একটা হাঁসি দিয়ে চার আঙুল দিয়ে হাই দিলো।জেলখানায় থাকলে মানুষ সুন্দর হয় এই প্রথম দেখলো। চুল দাড়ি সব সুবিন্যস্ত ভাবে ট্রিম করা। গায়ের রং আগের চেয়ে খুলে গেছে। এখন আর শ্যামা মনে হচ্ছে না। ভিআইপি সেলে ছিলো মনে হয়। তানাহলে তিনদিনে জিয়াউল পঙ্গু হয়ে ফিরলেন আর নিবিড় তিনমাসে আরও সুদর্শন হয়ে গেছে। সবই টাকার খেলা।
অথচ জিয়ানা ভেবেছে মুমূর্ষু কেলানি খাওয়া ,সাদা কালো চেকের আসামী পোশাকের সাথে হাতে ,পায়ে এমনকি খু*নের আসামি হওয়াই গলাতেও শিকল পড়ানো থাকবে। নিজের চিন্তার উপর নিজেরই হাসি পেলো। অবশ্য তারই বা কি দোষ। সারাজীবন মুভি সিনেমাতে এসব দেখে বড় হয়েছে। খু*নের আসামি নায়ক খুড়াতে খুড়াতে কাতর চেহারায় আসামির কাঠগড়ায় বেচারি হয়ে দাড়িয়ে থাকে।এককক্ষ লোক উপস্থিত থাকে। মাঝেমধ্যে হাত তালি দেয় নায়কের উকিল পয়েন্ট উল্লেখ করতে পারলে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
অথচ বাস্তবে আদালতের বিচারের কক্ষে বাহিরের কেউ প্রবেশ করতে পারে না।মামলা সম্পর্কিত মানুষ ছাড়া। এখানেও তাই।পরিচিতদের মাঝে বদী ,মক্কু ,সমুদ্রের ফ্ল্যাটের দারোয়ান। অপরপাশে আরেকটা বোরকা পড়া মেয়ে আগাগোড়া মুড়িয়ে বসা।
মিনিট পাঁচেক পর মাননীয় বিচারপতি প্রবেশ করলেন। উপস্থিত সকলেই দাঁড়িয়ে সম্মান জানালো।ফৌজিদারি মামলার জজ সাহেব প্রথমে কিছু পেপারে সাক্ষর আর ফর্মালিটি করে স্পিকার অন করে বলে উঠলেন ,
-বিচার ব্যাবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং সময় সাপেক্ষ কাজ।তারমধ্যে ফৌজদারি মামলা আরও বেশি জটিল এবং স্পর্শকাতর। সমুদ্র হত্যা মামলার আসামি সুখনীল নিবিড়ের মামলার আজ চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগে ,আপনি সুখনীল নিবিড় নিজ পক্ষে কিছু বলতে চান?
-আমি কিছু বলতে চাই না। তবে আমার পক্ষের উকিলের কিছু বলার আছে।
-ঠিক আছে আপনাকে পাঁচ মিনিট শেষ বারের মতো সময় দেয়া হলো।
আসামি পক্ষের উকিল শাকিল আহমেদ দাঁড়িয়ে বললো ,
-আজ আমি একজন সাক্ষি হাজির করেছি।উনার সাক্ষ্যপ্রমাণের উপর এই মামলার রায় অনেকাংশ নির্ভরশীল। মহামান্য আদালত আপনার অনুমতি চাচ্ছি।
-পারমিশন গ্রেন্টেড।
পাশ থেকে পেয়াদা হাক ছাড়লো ,,সাক্ষী হাজির।
জিয়ানা অত্যান্ত মেয়েলি ভঙ্গিতে হেঁটে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়ালো।নিবিড় ভ্রু কুচকে এই মেয়ের হাবভাব দেখে চলেছে।আর মনে মনে ঠিক করছে যদি উল্টো পাল্টা কিছু বলে কানের নিচ বরাবর তালা লাগিয়ে দিবে।
-নাম?
জিয়ানা আশেপাশে তাকালো ‘ওকি কি যাহা বলিব সত্য বলিব। সত্য বই মিথ্যা বলিব না ‘ এটা না বলিয়ে সরাসরি নাম? অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে মাথা নিচু করে উত্তর দিলো ,
-জিয়ানা হক।
-বয়স?
-আপনার হাতের ফর্মে সব তো লিখায় আছে। অহেতুক প্রশ্ন না করে কাজের প্রশ্ন করুন।
উকিল কেশে উঠলো। আর জজ এতক্ষন ঝিমিয়ে ছিলো হঠাৎ টানটান করে বসে পড়লেন।
-আপনি আপনার বক্তব্য উপস্থাপন করুন।
-কিভাবে বলবো। একটা মেয়ের সম্মান আর সারাজীবনের ব্যাপার। তবুও একজন নিরপরাধ লোক তো শাস্তি পেতে পারে না।তাই আজ আমি আমার সকল জড়তা-সংকোচ ঝেড়ে আদালতে হাজির হয়েছি।মহামান্য জজ সাহেব।আমি ভালো ফ্যামিলির মেয়ে। রক্ষনশীল যেটা বলে কিন্তু আসামী সুখনীল নিবিড়ের সাথে আমার দীর্ঘদিনের প্রণয় ঘঠিত সম্পর্ক ছিলো। আমরা বহুবার মিলিত হয়েছি।কিন্তু ঘটনার কিছুদিন আগে হঠাৎ করে সে আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করে। অপরদিকে সমুদ্র যেদিন খুন হয় সেদিন আমার বড় বোনকে সমুদ্র আর তার গ্যাং মিলে ধর্ষ*ণ করে। আমি আমার বোনকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর প্রচন্ড ভেঙে পড়ি। সেদিন নিবিড় আমাকে আমার বাড়িতে পৌঁছে দেয়।এবং অনেকরাত পর্যন্ত আমরা একই রুমে কাটায়। মাঝরাতে সে তার পিতার কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য বের হয়ে যায়। আর সেখান থেকে তাকে পুলিশ এরেষ্ট করে।
জিয়ানার হাতের পেনড্রাইভ উকিলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আবার বলে,
-আশা ক্লিনিক আর আমাদের বিল্ডিংয়ের গেটের সিসি ক্যামেরায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সময় আর আমাদের ঢুকার দৃশ্য। তারপর বের হয় যখন তখন রাত প্রায় বারোটা পাড় হয়েছে।আর ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী সমুদ্র খুন হয়েছে সন্ধ্যায়।
নিবিড় দাঁতে দাঁত পিশে জিয়ানার বাকুয়াজ সহ্য করে যাচ্ছে।
উকিল পেনড্রাইভটা জজ সাহেবের পাশের পিওনের কাছে দেয়।জজ সাহেব নিজের ল্যাপটপে কানেক্ট করে ফুটেজ চেক করে প্রশ্ন করে ,
-প্রসিকিউশনের কোন কিছু জিজ্ঞেস করার আছে?
-জ্বি মহামান্য আদালত। আচ্ছা জিয়ানা হক। আপনি হঠাৎ এতদিন পর উদয় হলেন যে? না মানে এতদিন কোথায় ছিলেন?
প্রসিকিউটরের মুখে ব্যাঙ্গ।
-দেখুন আমরা মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা প্রচন্ড ভীতু হই।তাছাড়া নিবিড়ের রেকর্ড মনে হয় জানেন। আমার সাথে প্রতারণা করেছে একপ্রকার। তাই হালকা রাগ সাথে আমার বোনের ধর্ষ*নের ব্যাপার জড়িত ছিলো। সবমিলিয়ে আমি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম।
-আপনি যে সত্যি বলছেন তার প্রমাণ কি? আপনাদের যে গভীর সম্পর্ক ছিলো সেটা আমরা বিশ্বাস করবো কিভাবে?
-আজব তো আমি তো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তো দিয়েছিই।আর এখন কি আমাকে প্রমাণ দেয়ার জন্য বলতে হবে উনার মেশিনে তিল আছে?
বলে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো। আর অপরদিকে আদালতে কেউ কেউ শুকনো কাশি শুরু করলো আবার হাঁসিও শোনা গেলো। জজ সাহেব একটা টিস্যু দিয়ে মুখ মোছার বাহানা করে হাঁসি আটকালো মনে হয় বহু কষ্টে। তারপর আওয়াজ উঁচু করে বললেন,
-সবাই আদালতের পবিত্রতা রক্ষা করুন।আসামি পক্ষের উকিল আমাকে আরেকটা প্রমাণ সাবমিট করেছেন। বাদীপক্ষ সমুদ্রের স্ত্রী নিজে এই মামলা প্রত্যাহার করেছেন। উনাকে হাজির করুন।
আগাগোড়া বোরকা পড়া মেয়েটা ছিলো মৌসুমী।সে নিজের নেকাপ উঠিয়ে জিয়ানা নেমে যাওয়ার পর কাঠগড়ায় উঠলো।
এইবার আর উকিল নাম ধাম জিজ্ঞেস করলো না। সরাসরি বক্তব্য উপস্থাপন করতে বলল।
-আমার স্বামী স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন না। উনার চরিত্রহীনতা থেকে শুরু করে নেশা করা এবং নারী ব্যবসা ছিলো। প্রায় রাতেই প্রচন্ড নেশা করে এসে বাথরুমে ঘুমিয়ে যেতো।কিছুদিন থেকে আমাদের মাঝে প্রচন্ড ঝগড়াঝাটি চলছিলো তাই আমি আমার বান্ধবীর বাসায় উঠি।আমার মনে হয় এটা খুন না। নেশার ঘরে পানিভর্তি বাথটাবে নিজেই ডুবে..
আর কিছু বলতে পারলো না হু হু করে কান্না শুরু করলো। জজ সাহেব শান্ত হতে বলল।জিয়ানা এইবারও আশা হতো হলো। কারণ পাশের হাতুড়ি দিয়ে ভারি দিয়ে অর্ডার অর্ডার করলো না একবারও।
প্রসিকিউশনের চেহারার রং পাল্টে যাচ্ছিলো। বিরক্ত নিয়ে মৌসুমীকে জিজ্ঞেস করলো ,
-আপনিও কেন এতদিন পর আজ সাক্ষী দিচ্ছেন সেটাও বাদী হয়ে বিবাদীর পক্ষে?
-দেখুন আমি মমলা করিনি।করেছে আমার শ্বশুর। উনি পুত্রস্নেহে অন্যায় করতে পারেন কিন্তু আমার বিবেকে বাধছিল।আমার স্বামী গত হয়েছে ,তাই আমি নিশ্চয় এতদিন স্বাভাবিক ছিলাম না?
আসামী পক্ষের উকিল আরও কিছু সাক্ষী ,সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পেশ করলেন।ঘন্টাখানেক সকল কিছু বিচার বিবেচনা করে আদালত নিবিড়কে নির্দোষ ঘোষণা করলো। বদি আর দারোয়ানকে মিথ্যা সাক্ষী দেয়ার জন্য ৩মাসের জেল আর বিশ হাজার টাকা জরিমানা দায় করে মামলা ডিসমিস করে দিলো।নিবিড়ের হেরেসম্যান্টের জন্য অফিসিয়াল দুঃখিত জানিয়েছে আদালত।
পুলিশের ড্রেস পড়া দুইজন নারী থানায় ঢুকলো। আসামির খাবার নিয়ে যাচ্ছিলো অন্য একজন কনস্টেবল। একজন ইশারায় তার হাতে দিতে বললো। কনস্টেবল তাদেরকে খাবারটা দিয়ে লান্সের জন্য বের হয়ে গেলো।লক্ষ্মীপুর থানায় দুপুরের এই সময় একটা কাকও পাওয়া যায় না।প্যান্টের পকেট থেকে সাদা পাউডার প্রথমে পানিতে তারপর ডাল সহ যাবতীয় খাবারে মিশিয়ে দিলো ভালোভাবে । আসামির সেলের নিচ দিয়ে সেই খাবার পাঠিয়ে দুইজন আসামিকে বলল,
-দ্রুত শেষ করুন। সময় তিনমিনিট।
একজন একটু গাইগুই করলেই বাকি দুইজন ভদ্রলোকের মতো গপাগপ গিললো কোনরকম। তৃতীয়জনও বাকিদের দেখাদেখি দ্রুত খেলো।খাবার খেয়ে পানি খাওয়ার সাথে সাথে তিনজনই নিজ হাতে গলা চেপে ধরে তড়পাতে লাগলো।মুখ দিয়ে প্রথমে সাদা তারপর লাল ফেনা বের হওয়া শুরু হলো।গলাকাটা মুরগীর মতো ছটফটিয়ে ,হাত পা দিয়ে পুরো জায়গাটা খচতে খচতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো।একজনের প্রস্রাব ত্যাগের জন্য জায়গাটা ময়লা আর ঘিনঘিনে রুপ নিয়েছে।মেয়ে পুলিশ দুইজন একটা কাগজ সেলের সামনে লাগিয়ে বের হয়ে এলো থানা থেকে।
লান্স শেষে সবাই যখন সেলের সামনে এলো। চারদিকে রীতিমতো হট্টগোল শুরু হয়ে গেলো। থানার ওসি এগিয়ে গিয়ে কাগজটা পড়লেন ,
“মৃত্যু এবং মৃত্যুই একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি ধর্ষ*কদের।
Je Muzita”
সাতদিন পর।
মামুন ইসলাম বিশাল জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছেন। নির্বাচনের আর আছে কয়েকমাস। মুখরোচক সব গাল গপ্প আর যত রকম চাপাবাজী আছে সব রাজনীতিবিদরা এখন মুখ দিয়ে আওড়াবেন। বড় বড় ওয়াদা দিতে দিতে ফেনা ফেনা করে ফেলবেন চারপাশ।
মামুন ইসলাম সেটাই করছেন। সাইডে টানটান করে নিবিড় দাঁড়িয়ে। সাতদিনে সে জিয়ানাকে হাতের কাছে পায়নি।পেলে খপ করে ধরে গিলে ফেলতো।সে ফাইনাল রায়ের দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিলো আপন মানুষের চিনার জন্য।উকিলকে আগে থেকেই ঢিলামিলা করতে বলেছে সে নিজেই।
রাজনীতিতে বন্ধুর তো অভাব ছিলো না।কিন্তু জেলখানায় পড়ার পর দেখেছে সবার রং চেঞ্জ হওয়া।মৌসুমীর স্ট্রেটমেন্টই যে তার নির্দোষ হওয়ার জন্য যথেষ্ট সেটা আগেই ঠিক করা ছিলো।ক্লিনিক আর জিয়ানাদের ব্যাপারটা শক্ত প্রমাণ হলেও সে তাদের সম্মানে আঘাত করতে চায়নি।কিন্তু এই মেয়ে ভরা আদালতে কিভাবে নাটকটা করেছে।এখন আবার সামনে আসে না।ভার্সিটিতে ক্লাসটাও করছে না।
নিবিড়ের ধ্যান কাটলো পিওন আনিসের কথায়।মামুন ইসলামের বক্তব্যের পর ,উনি সাধারণ মানুষদের প্রশ্ন করার সুযোগ দেন।আজ ভার্সিটির পিওন আনিস দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো ,
-চেয়ারম্যান সাব। আমরা জানি আপনি খুব সৎ এবং উপকারী ব্যাক্তি। আপনার দ্বারা আমাদের ওয়ার্ডে সবার উপকৃত হয়ছে।কিন্তু একটা পরিবার শুধু মাত্র আপনার পরিবারের সাথে নাম জড়িয়ে যাওয়ার জন্য আজ খুব লাঞ্চিত আর অপমানিত হচ্ছে এলাকায়।তাদেরকে সবাই একপ্রকার একঘরে করে দিয়েছে।এলাকার কোন মুদির দোকান তাদের সদায় দেয় না।বাজারের গেলে সেখানেও একই অবস্থা।পাড়া প্রতিবেশির লাঞ্চনায় তাদের অবস্থা সূচনীয়।তাদের এই কষ্ট আমরা বিশেষ করে আমি সহ্য করতে পারতাছি না।কারণ সেই পরিবারের মাইয়া আমার সহ অনেকের উপকার করছে।
-কি বলছো? আমার এলাকায় আমার পরিবারের জন্য কাদের এত কষ্ট?
-জিয়াউল হকের পরিবার।তার ছোট মেয়ে জিয়ানা হক আপনার ছেলেকে বাচাতে নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে আদালতে সাক্ষী দিছিলো।আর বড় মেয়ে ধর্ষি*তা সেটা তো জানেনই।
-আমার এলাকায় এত বড় অনাচার তো আমি হতে দিতে পারি না। যেহেতু আমার ছেলের সাথে জড়িয়ে সে মেয়ের সম্মানহানি হয়েছে। তাই আমার ছেলেই তাদের সম্মান ফিরিয়ে দিবে।চলো তোমাদের সামনেই আজ প্রমাণ করবো মামুন ইসলাম কখনো অধর্ম করে না।আমার ছোট ছেলের সাথে আজ এই মুহূর্তে সেই মেয়ের বিয়ে হবে।আর ধর্ষি*তা মেয়েটাকে কেউ বিয়ে করতে যদি এগিয়ে আসো। তবে বুঝবো দুনিয়াতে এখনো ভালো মানুষ আছে।আছো কেউ?
কেউ এগিয়ে এলো না।অপরদিকে নিবিড় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে সব।কোথায় থেকে কি হলো?বিয়ে?জিয়ানা? মানে তার সব প্যাচ লেগে যাচ্ছে।হঠাৎ জিয়ানার ভেজা সিগ্ধ মুখটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। হেঁসে হেঁসে বলছে ,
-কি কাবলিওয়ালা?
না না নিবিড় তার এই ন্যাড়াপ্যাচানো জীবনের সাথে এমন চঞ্চল উড়ন্ত হাঁসিখুশি একটা মেয়েকে জড়িয়ে তার জীবন ধ্বংস করতে পারবে না। পরক্ষণেই মনে হলো ,জেল থেকে বের হয়ে একদম ব্যাস্ত হয়ে পড়ায় খোঁজ খবর কিচ্ছু নেয়া হয়নি।সত্যি কি তাদের এমন মুমূর্ষু অবস্থা চলছে? তাহলে তো সব দোষ তার নিজেরই। আবার মনে হলো,এই মেয়েকে এত পাকনামি কে করতে বলে সব সময়? একটা মেয়ে হয়ে এত বড় স্ট্রেটমেন্ট মানে তো নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।এই বোধটা কি তার নেই?
হঠাৎ মামুন ইসলামের বাহবাহ তে নিবিড় পাশ ফিরে দেখে মক্কুকে একহাতে জড়িয়ে ধরে মামুন ইসলাম বলছে,
-সাব্বাস। এই না হলে পুরুষ মানুষ। আমাদের মুসাদ্দিক ওরফে মক্কু একজন অসহায়কে বিয়ে করতে এগিয়ে এসেছে। সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলুন।
একটু থেমে আবার বলল,
-চলুন সবাই আমার সাথে জিয়াউলের বাড়ি। আমার দুই ছেলের আজ একসাথে বিয়ে হবে।
বিকেলের সময়টা একটা শান্তি শান্তি ভাব থাকে সংসারে।সারাদিনের কর্মচঞ্চল নারীরা একটু থিতু হন।বাচ্চারা পড়াশোনার বাহিরে নিজেদের মতো সময় পায়।বয়স্করা নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকেন।সংসারের শান্তির সময়টাই যেনো বিকেলবেলা।
জিয়ানা বাবু হয়ে বসে গরম সরিষার তেল ঘষে ঘষে মালিশ করছে জিয়াউলের পায়ে।জিয়াউল আধশোয়া হয়ে বইয়ে মুখ গুছে রেখেছেন। আদো বই পড়ছে না ,বইয়ের ফাঁকে মেয়েকে দেখে চলেছে।সত্যি চুলের কারণে কত অপূর্বই না লাগে একজন নারীকে। কারো কাছ থেকে তার বিশেষত কেড়ে নেয়া অন্যায় না রীতিমতো পাপ। জিয়াউল খুবই আত্মগ্লানিতে ভোগে এইজন্য।
-হয়েছে এত গিল্টি ফিল করতে হবে না।
জিয়ানা পায়ের দিকে তাকিয়েই বলে।জিয়াউল মুখটা থমথমে করে জিজ্ঞেস করে ,
-আদালতের ঘটনাটা কতটা বাজে ইমপ্যাক্ট পড়েছে জানিস? তোদের বিয়ে তো এই এলাকায় থাকলে দিতে পারবো না।
-পা হারানো সাথে সাথে আত্মসম্মান আর ব্যাক্তিত্বও হারাতে বসেছো আব্বু।ছোট থেকেই আমি জানি অন্যায়ের সাথে আপোষ নয়।মেয়ে মানেই বিয়ে ,সংসারের আর বাচ্চার গ্লানি টানা নয়।আমার সেই পিতা কোথায় হারিয়ে গেলো।পা ভেঙেছে মেরুদণ্ড টা তো ঠিক আছে তাই না আব্বু?
জিয়াউল আজ কাল সত্যি খুব দূর্বলবোধ করে। মনের দিক দিয়েও ,শরীরের দিক দিয়ে তো মহাদূর্বল।মেয়ে দুইটাকে নিয়ে চিন্তায় মস্তিষ্কও ঠিকঠাক কাজ করে না।
যদি সে শ্যামল হাসানের উপর ভরসা না করতো আজ এই অবস্থা হতো না।
-আব্বু আমাদের কে বরশির টোপ না বানাতো আজ এই দিন আসতো না বল?
-তুই বুঝতে পেরেছিস?
-না পারার কি আছে। হাবিব আংকেল আর শ্যামল হাসান আর কোন যোগাযোগ করেনি।তোমাকে একটাবার সেলেও দেখতে যায়নি। উনারা বিক্রি হয়ে গিয়েছে বলেই তো সব দ্বায় আর ভোগান্তি আমাদের ঝুড়িতে।
-ভেতরগত কোন গেইম চলছে। যেটা আমরা না জেনেই জড়িয়ে গেছি।তবে এই গেইমের মাস্টারমাইন্ড এমন কেউ যা আমরা কল্পনা করতে পারছি না।
-কে আর হবে মামুন ইসলাম ছাড়া?
তখনই জিয়ানাদের বিল্ডিংয়ের সামনে হট্টগোল আর অনেক মানুষের চিল্লাচিল্লি শোনা গেলো।জিয়ানা উঠে জানালা ফাঁক দিয়ে বড় বড় চোখে দেখে যাচ্ছিলো ,পরক্ষণেই তাদের দরজায় নক হলো।
জিয়াউল হুইলচেয়ারে বসে হাত দিয়ে ঠেলার আগেই জিয়ানা ধরে বসার ঘরে উপস্থিত হলো।
আঞ্জুমান দরজা খোলে বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এলাকার সকল গণ্যমান্য ব্যাক্তি সাথে মামুন ইসলাম সহ তাদের দরজায় দাঁড়ানো।আঞ্জুমান মনে মনে ভীষণ ঘাবড়ে গেলো।নিশ্চয় এলাকা ছাড়ার কথা বলতে এসেছে এরা। হঠাৎ করেই তার পায়ের নিচে সবকিছু কেমন শূন্য অনুভূত হলো।
মামুন ইসলাম সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।আঞ্জুমান এগিয়ে এসে আমতা আমতা করছে দেখে মামুন ইসলাম বললেন,
-আমার এলাকায় এসে আপনাদের এত দুর্ভোগ পোহাতে হলো এইজন্য আমি সত্যিই লজ্জিত। আজ সেই লজ্জা বলুন কিংবা দায়িত্ব অথবা পাপমোচন সেই প্রেক্ষিতে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।আমার ছোট পুত্র সুখনীল নিবিড় আর পুত্র সম মুসাদ্দিক মক্কুর সাথে আপনাদের দুইকন্যার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
সাইড থেকে জিয়াউল একপ্রকার চিল্লিয়ে উঠে বলল,
-অসম্ভব। আমার মেয়েরা বানের জলে ভেসে আসেনি যে যার তার কাছে কন্যাদান করবো।আপনারা আসুন।
জিয়ানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একসাইডে। জিয়াউলের আওয়াজে জেনিও বের হয়ে এসেছে।
দরজা দিয়ে একজন মুরুব্বি গোছের লোক প্রবেশ করতে করতে বলল,
-নষ্টা মেয়েদের নিয়ে গলার আওয়াজ এত উঁচু করা মানায় না মিয়া।তোমার মেয়েদের তো রাস্তায় ছেড়ে দিলেও কু*ত্তাও ফিরে তাকাবে না।সেইখানে একমাত্র চেয়ারম্যান সাবের মতো জনদরদী মানুষ আছে বলে আমরা সবাই ভেবেচিন্তে এই প্রস্তাব নিয়ে আসছি।
আরও কিছুলোক হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে হ্যাঁ হ্যাঁ করলো।তখন জিয়ানা এগিয়ে আসলো। সেই মুরুব্বি সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-কু*ত্তা ফিরে না তাকালেও আমাদের চলবে।শুধু আপনাদের অদৃশ্য জিহবা যে লক লক করে সেটা মুখের ভেতরে রাখুন।আর আমাদের চিন্তা আপনাদের করতে হবে না।
-এমন নির্লজ্জ মেয়ে আপনারা আগে কেউ এই এলাকায় দেখেছেন? এই মেয়ের জন্য এলাকার সব মেয়ে নষ্ট হবে।সামান্য আদব কায়দা জানে না। এদের চুন কালি মেখে এই এলাকা ছাড়া করা উচিত।
একসাথে সবাই ঠিক ঠিক বলে উঠলে ,মামুন ইসলাম হাত উঠিয়ে সবাইকে থামার নির্দেশ দিলো।আঞ্জুমান এতক্ষণ সব নিরব হয়ে দেখে যাচ্ছিলো। হঠাৎ করে জিয়ানার সামনে এসে প্রচন্ড জোরে গালে ঠাস করে চর মে*রে দিলো।জিয়ানা চর খেয়ে অবাক চোখে আঞ্জুমানকে দেখে যাচ্ছে।রাগে রি রি করে আঞ্জুমান বলে উঠলো ,
-তোর জন্য আজ আমার পরিবারের এই অবস্থা। তোর জন্মের দোষ না শুধু ,পতোর রক্তেরও দোষ। তোর মা যেমন সব ধ্বংস করেছে তেমন তুইও সব ধ্বংস করতে এসেছিস।দুধ কলা দিয়ে আমি কালসাপ পোষেছি।বের হয়ে যা আমার সংসার থেকে তোর মুখ দেখাও পাপ।
জিয়াউল ধমকে উঠলো আঞ্জুমানকে।
-আঞ্জু চুপ করবে? তোমাদ মাথা ঠিক নেই তুমি ভেতরে যাও।
-না আর কত চুপ করবো? তুমি আর তোমার এই ভাইয়ের মেয়ে আমার সংসার আমার সব নষ্ট করেছো। দাও ফেরত দাও সব। এই যে মৃত্য প্রায় দুধের দুইদিনের বাচ্চাটাকে বুকে আগলে বড় করেছি তার প্রতিদান কি পেয়েছি বল? এই মেয়ের মায়ের জন্য আমার ভরা সংসার জ্বলে পোড়ে ছাই হয়েছিলো আজ আবার তার মেয়ের জন্য আমার চাকরি ,তোমার শখের ফার্ম। সামাজিক মানসম্মান সব কিছু। হ্যাঁ সব কিছুই আজ থেকেও নেই।
আঞ্জুমান জিয়ানার হাতের বাহু ধরে জিয়াউলের সামনে এনে একপ্রকার ছুড়ে মেরে বলল।
জিয়ানা স্তব্ধ বিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে আঞ্জুমানের দিকে।জেনি এগিয়ে এসে আঞ্জুমানের মুখ চেপে ধরে বলল,
-চুপ করো আম্মু। চুপ করো অনেক মানুষ বাসায়।এইসব হাবিজাবি কি বলছো। জিয়ানা তুই ভেতরে যা।
জিয়ানা আঞ্জুমানের সামনে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলো ,
-এগুলা কি সত্যি আ-আম্মু? রাগে এমনি এমনি বলছো তাই না? আমি তোমাদের সন্তান এটাই সত্যি তাই না?
-নাহ তুই আমাদের কেউ না। তুই নীলুফা আর সাগর হকের মেয়ে। এইবার আমাদের মুক্তি দে।তোকে বড় করেছি আমাদের দায়িত্ব শেষ।
জিয়ানা আঞ্জুমানের পা ধরে বসে পড়লো। সেখানেই চুপচাপ বসে বলল,
-যা বলবে সব শুনবো। শুধু এই কথাগুলা ফেরত নাও। আমি তোমাদের মেয়ে।আর কোন পরিচয় নেই।ব্যাস আর কখনো কোন দাবি নিয়ে সামনে আসবো না প্রমিজ।
আঞ্জুমান হাটু নাড়িয়ে পা ছাড়িয়ে নিলো জিয়ানার থেকে।জিয়ানা হাউমাউ করে কেদে উঠে জিয়াউলের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলো ,
-আব্বু ,ও আব্বু ,আম্মু এগুলা রাগ করে বলছে তাই না? আম্মু তো আমার সাথে কথা বলে না। সে না বলুক কথা বলতে হবে না।আমি শুধু তোমাদের মেয়ে এটাই যথেষ্ট। বলো আব্বু? কথা বলো।
জিয়াউলের শক্তবান ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে আজ। সেও অকুল হয়ে কাঁদা শুরু করলো। জিয়ানার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস টুকু পেলো না।আর মামুন ইসলাম আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে জিয়ানার দিকে। নিবিড় এতক্ষণ বাহিরে ছিলো। ঘরের সব কথা শুনে শক্ত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। তারপর জিয়ানার হাত ধরে টেনে উঠিয়ে সোফায় বসিয়ে হাক ছাড়লো।
-কাজি সাহেব ভেতরে আসুন। মক্কু তুইও আয়।
জিয়ানা হিচকি দিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। তার আপাতত কোনকিচ্ছু উপলব্ধি হচ্ছে না। চারপাশ কেমন দুলছে যেনো।নিজেকে আজ অস্তিত্বহীন লাগছে।মাথা আর শরীর অসাড় হয়ে আসছে একসাথে। এটাই কি কিয়ামত। সব কেমন ভেঙে চুড়ে গুড়িয়ে যাচ্ছে যেনো।একবার মাথা উঁচু করে নিবিড়কে দেখলো।কোনকিছুই অনুভূত হলো না।নিবিড় একবার এগিয়ে এসে গলায় ঝুলন্ত ওড়নাটা মেলে মাথায় পড়িয়ে দিলো।
কতক্ষন ,কতপল কেটে গেলো সেই বসা অবস্থায় জিয়ানার সেটা খেয়াল নেই।একবার কেউ একজন বলতে বলল,
নীতিহীন রাজ পর্ব ১৯
-বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল। আবার বলল। আবার বলল।
পাশ থেকে কোন নারী জিয়ানার কানে কানে বলে দিলো বলো।
জিয়ানা মন্ত্রপুতের ন্যায় তিনবার ‘আলহামদুলিল্লাহ কবুল’ বলল।
তারপর আরেকবার নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে মনে হলো সত্যি এই আপন ,নইতো বিপদের সাহারা। একবার বিড়বিড় করলো শুধু “কাবলিওয়ালা। তারপর সব অন্ধকার। শূন্য।
