Home লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৩

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৩

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৩
অহনা রহমান

খাওয়া-দাওয়া শেষ হিয়ার। সে টেবিল ছেড়ে উঠবে ঠিক এমন সময় রুহি বলল,
“হিয়া একটু আমার রুমে আসিস তো৷ ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে তোর সাথে।”
হিয়া দাঁড়িয়ে গেল রুহির কথা শুনে। ঘুরে কিছু একটা বলবে তার আগে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা নাফি বলে উঠলো,
“রুহি তোমাকে তো সকালে বললামই হিয়া কিন্তু এখন শুধু তোমার বোন নেই৷ ও আমার স্ত্রী অর্থাৎ তোমার বড় জা৷ এই বিষয়টা মাথায় রেখে কথা বলবে ওর সাথে। আর নাম ধরে তো কখনোই না!”

নাসিমা তখন ছিলেন না সেখানে। নাফির কথা শুনে রুহি বেশ অপমানিত বোধ করলো। অপমান হলো রাজও। ও তো এখনো মানতেই পারছে না এসব কিছু৷ ও টেবিলের নিচে থেকে, রুহির একহাত চেপে ধরলো। শান্ত হতে বললো ওকে। রুহি দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“আ’ম স্যরি।” এরপর হিয়ার দিকে ফিরে বলল, “ভাবি একটু আমার রুমে আসবেন?”
হিয়া মাথা নাড়লো। মুখ দিয়ে কিছু বলার পূর্বে নাফি আবারও বলে উঠলো,
“যেহেতু হিয়া বড় সম্পর্কে তাই ওকে অর্ডার করা ভালো দেখায় না রুহি। তোমার প্রয়োজন হলে রুমে গিয়ে কথা বলে আসবে।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

রুহি রাগের তোপে হাত মুঠো করে ফেললো। রাজ রাগী রাগী দৃষ্টিতে তাকালো নাফির দিকে। নাফিও ভাইয়ের দিকেই তাকানো। ঠোঁটে বাঁকা হাসি তার। কোনো পুরোনো প্রতিশোধ নেওয়ার তৃপ্তি চোখেমুখে। যা সহ্য হলো না রাজের। খুব করে চাইলো সামনের সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিতে। কিন্তু ও কোনো সিনক্রিয়েট চায় না। তাছাড়া তুবা ও আছে এখানে। কারো সামনে ও নিজের ইমেজ নষ্ট করতে চায় না। তাই সবকিছু সহ্য করে গেল চুপ করে। রুহিও নিজেকে খুব কষ্টে শান্ত রাখলো। বাড়ুক না যত খুশি, রুহি খুব সহজে ছাড়বে না হিয়াকে৷ এরপর এমন কিছু করবে না, তাতে ওই দুটোকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা।

হিয়া মনে মনে খুশি হলো খুব৷ তার প্রতি নাফি এতটা সিরিয়াস? বাহ! হিয়া আর দাঁড়াতে চাইলো না সেখানে। দ্রুত সরে পড়তে চাইলো। ঠিক তখনই শুনতে পেল রুহির থমথমে গলার স্বর,
“ভাবি স্যরি আমিই আপনার সঙ্গে দেখা করবো। কখন ফ্রী হবেন আমাকে একটু বলবেন প্লিজ।”
নাফি ফের কিছু বলতে উদ্ধত হলো৷ কিন্তু রাজ ও রুহির থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বললো না। রাজের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো একবার। ঘুরে আবারও সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো উপরে। নিচের দিকে না তাকিয়েই বলল,
“তাড়াতাড়ি উপরে এসো রোদ্দুরী।”
হিয়া যেন এরই অপেক্ষায় ছিলো৷ নাফি ডাক শুনতেই সে আর অপেক্ষা করলো না। দ্রুত প্রস্থান করলো৷ এখানের হাওয়া গরম আছে, যেকোনো সময় এখানে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

রুমের মধ্যে পায়চারি করছে রুহি। রাজ বসে আছে বিছানায়। মাথায় হাত দিয়ে বিধ্বস্ত অবস্থায়। ও রাগ করবে নাকি দুঃখ পাবে ঠিক বুঝতে পারছে না। তার আসলে কি করা উচিত? কেন হলো এমন কিছুই জানে না। হিয়াকে কষ্ট দিতে গিয়ে সে যে এই অশান্তির সাগরে ডুবে যাবে, কে জানতো? সে কি ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পেরেছিলো, হিয়া এমন একটা কাজ করে বসবে? রাজ নিজেই তো হিয়াকে জ্বালাতে রুহিকে বিয়ে করেছিলো৷ যদিও কাজের কাজ হয়নি একটুও। রাজ মাথায় হাত দিয়ে ভাবছিলো এসব কথা। তার সম্বিত ফিরলো রুহির ঝাঁঝালো কণ্ঠে।

“তুমি কিছু করবে না রাজ? নাকি এক্স গার্লফ্রেন্ডকে ভাইয়ের সাথে দেখে মরে যাচ্ছো ব্যাথায়।”
রাজ জবাব দিলো না৷ ও একবার শুধু তাকালো রুহির দিকে। আবারও মাথা নিচু করে রইলো। ও নিজের অনুভুতিকেই বুঝতে পারছে না। কেন অন্তরটা এতো পুড়ছে? সবে বিয়ে হলো একদিন, এখনই নাফির পাশে হিয়াকে দেখলে তার রাগ হচ্ছে। অথচ ওরা স্বামী-স্ত্রী ওরা তো একসঙ্গেই থাকবে।
রুহি রাজের কলার চেপে ধরে ওকে দাঁড় করালো। আবারও আগের মতো খেঁকিয়ে বলল,
“কথা শুনতে পারছো না তুমি? তোমার ভাই আমাকে কিভাবে অপমান করলো দেখোনি? তুমি কিছু করবে না?”
রাজের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো। ও রুহিকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারলো। রুহির চোয়াল চেপে ধরে বলল,

“খুব চোপা না তোর? এই চোপার জন্য তুই কখন খুন হবি আমার হাতে। আমি বলেছি কিছু করবো না? আমাকে ভাবতে দে কিছু! নিজে তো বিদ্যার সাগর, বল কি করবো বড় ভাইয়ের বউয়ের সাথে।”
রাজ ঝাড়ি মেরে সরিয়ে দিলো রুহিকে। রুহি পুনরায় ক্ষিপ্ত হয়ে রাজের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। বেয়াদবের মতো রাজের সাথে তুই-তোকারি শুরু করলো।
“শোন তুই ভুলে যাস না, তোর বিরুদ্ধে অনেকগুলো কল রেকর্ড আছে আমার কাছে৷ তুই যে হিয়াকে রেইপ করাতে চেয়েছিস, এটা যদি আমি বলে দিই সবাইকে, ভাবতে পারছিস কি হবে? সো বি কেয়ার ফুল! আমার সাথে মেপে কথা বলবি।”
রাজ আর রুহির কথার প্রতিত্তোর করতে পারলো না৷ নিজের মনে ভিষন অনুশোচনা হলো, কেন এই বস্তি মার্কা মেয়েকে সে বিয়ে করলো। রুহির উপর রাগ করে সে সজোরে দেয়ালে আঘাত করলো রাজ। এরপর গটগট করে বেরিয়ে গেল রুম থেকে৷ ওদিকে রাজ যাওয়ার পরও রুহির মনে কোনো অনুশোচনা দেখা গেল না। সে ব্যস্ত হিয়ার সঙ্গে কি করবে এটা ভাবতে। রাজ তো তার হাতেই আছে।

খাওয়ার টেবিলে যা হলো একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। রাজ অথব রুহি অন্তত নাফির সামনে হিয়ার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে দুইবার ভাববে। দুর্ব্যবহার কি, নাম ধরে ডাকতে ও ভাববে। হিয়া ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার আর কি কাজ? নতুন বউ সে। বাড়িতেও তেমন মেহমান নেই। রেগুলার যেমন থাকে সেরকম। হিয়া উদাস হয়ে আছে। মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব। হিয়া ভাবলো, কল করবে হেলেনার নাম্বারে। ঠিক তখনই নিজের পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেলো। কিছুক্ষণের মাথায় বুঝতে পারলো, এটা নাফি। হিয়া দ্রুত ঘুরে পিছনে তাকালো। নাফি তখন হিয়ার অনেকটাই কাছে চলে এসেছে। হিয়ার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নাফি বলল,

“মন খারাপ ময়না?”
হিয়া নাফির সম্মধনে লজ্জা পেল। এ পর্যন্ত না হলেও পঞ্চাশটা নিক নাম দিয়েছে তার। একেক সময় একেকটা৷ যদিও এতে হিয়ার খারাপ লাগছে না। একটা রোমান্টিক রোমান্টিক ভাইব আছে। এহেম এহেম!
হিয়া নতজানু হয়ে নাফির কথার জবাব দিলো।
“উহুম, মন খারাপ নয়।”
“তাহলে? আচ্ছা ভার্সিটি পাল্টাবে তুমি?”
হঠাৎ নাফির এমন কথাতে হকচকিয়ে গেল হিয়া। তড়িৎ মাথা নাড়লো।
“ক’কেন? হঠাৎ এই কথা কেন?”

“কেননা আমার কাছে তুমি সবচেয়ে আগে হিয়া। আমি তোমার ভার্সিটিতে সবসময় থাকবো না, তোমাকে সেইফ করার জন্য। আর তুমি যে ভুলোমনা পাখি, তুমি নিজেকে কিভাবে সেইফ করবে?”
হিয়া বারংবার লজ্জা পাচ্ছে নাফির সামনে। কিছুতেই এই লজ্জা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। আরেকটু সময় লাগবে তার। সে কোনমতে বলল,
“সমস্যা নেই, আমি পারবো।”
নাফি আরেকটু কাছে এলো হিয়া। হিয়ার নত কপালে নিজের কপাল ঠেকালো। আদুরে স্বরে বলল,
“সমস্যা তো আছেই পাখি। তুমি ওখানে গেলে যে আমি টেনশনে থাকবো ভিষন। নিজের কাজে মনোযোগ দিতে পারবো না৷ তুমি কি চাও এসব?”

হিয়া জবাব দিতে পারলো না। আরও সে কাঁপতে থাকলো। হিয়ার কাঁপন বুঝতে পেরে নাফি সরে গেল। হিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে ব্যালকনির রেলিঙে হেলান দিলো। বলল,
“আমি কাছে এলে এতো কাঁপো কেন হ্যাঁ? অথচ আমি আসল কাজ কিছুই করিনি এখনো।”
হিয়ার কান ঝাঝা করে উঠলো লজ্জায়। গরম ধোঁয়া ও বেরুলো হয়তো৷ ফর্সা মুখখানা লাল হয়ে গেল লাজে। রমনী এদিক সেদিক তাকালো নিজেকে ঠিক করার জন্য।

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২২ (২)

“আচ্ছা বাদ দাও! মায়ের কথা মনে পড়ছে? দেখা করতে যাবে?”
নাফি প্রসঙ্গ পাল্টেছে দেখে হিয়া স্বস্তির শ্বাস ফেললো। বলল,
“কিভাবে দেখা করবো আম্মুর সঙ্গে? দুইদিন পরে না বাড়িতে যেতে হবে?”
“সে তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। গেলে রেডি হও।”
হিয়া মনে মনে খুশিই হলো। মায়ের সাথে দেখা করতে পারবে এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে? হিয়া খুশিখুশি মনে রুমের ভেতরে চলে গেল। এখন তো রেডি হতে হবে। আর দেরি করলে চলে?

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৪