Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৬

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৬

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৬
নওরিন কবির তিশা

নিউ ইয়র্ক সিটির আকাশছোঁয়া অট্টালিকাগুলোর ভিড়ে ম্যানহাটনের এই পেন্টহাউসটা যেন এক রাজপ্রাসাদ। জানালার বাইরে তাকালে দেখা যায় দিগন্ত বিস্তৃত হাডসন নদী আর স্ট্যাচু অফ লিবার্টির আবছা অবয়ব। শহরের ব্যস্ততা নিচে পড়ে থাকলেও এখানে কেবল এক গভীর নিস্তব্ধতা।
তিহু, নীলের বর্তমান অবস্থানের রুমটা বিশাল। ঘরের একদিকের পুরো দেওয়ালটাই স্বচ্ছ কাঁচের, যেখান থেকে রাতের নিউওয়ার্ককে জ্বলজ্বলে হীরের কার্পেটের মতো দেখাচ্ছে। রুমের মাঝখানে রাজকীয় এক কিং সাইজ বেড, যার চারপাশ ঘিরে রয়েছে দুধসাদা সিল্কের পর্দা। ঘরের এক কোণে একটা ছোট লাইব্রেরি আর অন্য কোণে রয়েছে আধুনিক ফায়ারপ্লেস, যদিও এই আবহাওয়াতে তার প্রয়োজন নেই। রুমের বাতাসে স্যান্ডালউড আর ল্যাভেন্ডারের এক মিশ্র সুবাস।

তিহু জানালার সামনে দাঁড়িয়ে নিচের আলোকোজ্জ্বল শহরটার দিকে তাকিয়ে ছিল। পরনে নীলের সেই কালো ওভারসাইজড হুডি, যেটার হাতাগুলো তার হাতের কবজি ছাপিয়ে ঝুলে আছে।হঠাৎ পেছন থেকে একজোড়া বলিষ্ঠ হাত তিহুর কোমর জড়িয়ে ধরল। নীল তার থুতনিটা তিহুর কাঁধে রেখে গভীর এক প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। কাঁচের দেয়ালে ওদের দুজনের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে—একদিকে দীর্ঘদেহী, গম্ভীর এক পুরুষ, আর তার বুকে মিশে থাকা ছোট্ট এক মানবী।নীলের আফটারশেভের সেই মোহময় ঘ্রাণ আর তপ্ত নিঃশ্বাসে তিহুর সারা শরীরে যেন এক মৃদু শিহরণ বয়ে গেল।
তিহু একটু নড়েচড়ে উঠে কাঁধটা ঈষৎ সংকুচিত করে আদুরে গলায় বলল,,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—’উফ মিস্টার পলিটিশিয়ান!
নীল ফিসফিস করে বলল, —’কি দেখছেন ম্যাডাম?
তিহু একটু ঘাড় ঘুরিয়ে নীলের চোখের দিকে তাকালো।ওর চোখের মণি জোড়ায় স্থির দৃষ্টি রাখল;একটু দুষ্টুমি করে বলল,,
—’শহরটা কি সুন্দর তাই না?
নীল প্রগাঢ় কন্ঠে বলল,,—’আমার শহর থেকে বেশি নয়!
তিহু ভ্রুদ্বয় সামান্য কুঁচকে বলল,,—’মানে?
নীল আর কোন কথা না বলে সরাসরি তাজা কলে তুলে নিলো। আকস্মিক নীলের এমন কাণ্ডে অপ্রস্তুত হয়ে উঠল তিহু। তৎক্ষণাৎ নীলের গলা জড়িয়ে ধরল ব্যস্ত হাতে। ওর বুকের ভেতরটা তখন দুরুদুরু কাঁপছে, ঘন পালক বিশিষ্ট ডাগর চক্ষুদ্বয় সামান্য ঝাপটে নীলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,,

—’কি করছেন?নামান!
নীল নেশাক্ত কণ্ঠে বলল,,—’আমার শহরটাকে আঁগলে রেখেছি জাস্ট। যেই শহরে শুধু আমারই রাজত্ব, অন্য কারো নয়।
নীলের অকপটে বলা উক্তিটায় তিহুর ফর্সা চোয়াল মুহুর্তে রক্তিমাভ বর্ণ ধারণ করল। লাজুক হেসে তিহু মুখ লুকালো নীলের প্রশস্ত বক্ষদেশে। নীল মৃদু হেসে তাকে নিয়ে এগিয়ে চলল কিচেন এরিয়ার দিকে।

কোলে করেই নীল ওকে নিয়ে এলো ডাইনিং স্পেসে। সেখানে আগে থেকেই নীল নিজের হাতে সব আয়োজন করে রেখেছে। মোমবাতির মৃদু আলোয় টেবিলটা ঝলমল করছে। টেবিল জুড়ে বাহারি খাবারের পসরা সাজিয়েছে নীল।পাস্তা, নুডুলস বিরিয়ানি,বোরহানি সহ তিহুর পছন্দের সব খাবারগুলো।তিহু মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে আছে সেগুলোর দিকে।পরপর তাকালো নীলের দিকে।
নীল চেয়ার টেনে তিহুর পাশে বস তড়িঘড়ি কন্ঠে বলল,,
—’স্যরি অর্কিড। আকচুয়ালি টাইম এর শর্টনেস এর কারণে মাত্র..
মোমবাতির নিয়ন আলোয় নীলের সুদর্শন মুখশ্রী বড্ড দীপ্তিমান। তীক্ষ্ণ চোয়াল, সূক্ষ্ম জ লাইন আর বরাবরের ন্যায় সেই নীল চোখের এক নেশাক্ত দৃষ্টি।যা এক নিমেষেই প্রলয়ংকারী ঝড়ের সৃষ্টি করে চঞ্চল হৃদয়ে।তিহু প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি মেলে বলল,,

—’এতকিছু!
—’ কোথায় এতকিছু?
—’ তা নয় তো কি?
নীল মৃদু হেসে পাশ থেকে খবর তুলে বাটিতে রাখলো।ধীরে ধীরে খাইয়ে দিল তিহুকে। তিহুর দৃষ্টি টলমল। হৃদয়ে অদ্ভুত উচাটন, ক্ষীণ কায়ায় অজানা শিহরণ। হৃদয়ের গভীরে বারংবার প্রতিধ্বনিত হলো শুধু একটাই কথা ‘ভালবাসলে তার নেতা সাহেবের মতই বাসা উচিৎ’।

হক মেনশন এর পরিবেশটা বিগত কয়েকদিন যাবত ভারাক্রান্ত,কয়েকদিন ধরে যেথায় কেবল কান্নার রোল শোনা যাচ্ছিল, আজ সেখানে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করছে। তিহুকে খুঁজে পাওয়ার খবরটা যেন এক পশলা বৃষ্টির মতো সবার দগ্ধ মনে শীতলতা এনে দিয়েছে।
দুশ্চিন্তার সেই কালো মেঘগুলো সরে গিয়ে তিহুর পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্যের মুখে এখন এক প্রশান্তির হাসি। বাড়ির বড়রা সবাই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন।পুরো বাড়িতে এখন সাজ সাজ রব। আহ্লাদি বনহরিনীটিকে ফিরে পাওয়ার এই খুশিতে সবার মনের অবস্থাই এখন শরতের আকাশের মতো নির্মল।

বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে এগারোটা।হক ম্যানশান জুড়ে নিস্তব্ধতা।খাওয়া দাওয়া শেষে সকলে নিজ নিজ কক্ষে বিশ্রামে তৎপর।মুন্নি,রাওফিন,মাহা,নাহা,তাজহীর, তাওহীদ, সাজ্জাদ,রাফা,নীরা,রিশাদ ,সারা তানহা সহ ‌নবকুড়িগুলো সব পিহুর কক্ষে গল্পে মগ্ন।কথপোকথনের মাঝেই চলছে কপোত-কপতির দৃষ্টির অন্তরালে প্রেম বিনিময়।রিশাদ তখন থেকে সকলের অগচরে নীরার দিকে চেয়ে আছে অপলক।কিন্তু নীরা তাকালেই দৃষ্টি সরাচ্ছে তৎক্ষণাৎ।
ব্যাপারটা বেশ উপভোগ্য পিহু,রাফা আর সারার কাছে।
হুট করে সকলের হয়ে পিহু রিশাদের দিকে তাকিয়ে বলল,,
—’ আরে রিশাদ ভাই তুমিই সে না,যে তান্নু (তানহা) কে বিয়ে করতে চাইতেন?
অকস্মাৎ পিহুর এমন কথায় এতক্ষণের উচ্ছসিত পরিবেশে ছেদ পড়ল। হাসাহাসির পরিবেশটা স্তব্ধ হলো মূহুর্তেই।সকলে তাকালো ছোট্ট তানহার দিকে। উপস্থিত সকলের মাঝে সবচেয়ে ছোট তানহা।বয়স সবে নয় কি দশ।এদিকে রিশাদ বিশ বছরের তাগড়া যুবক। তাই পিহুর এমন উল্টাপাল্টা কথায় বিরক্ত হলো মাহা ব্যাতিত সকলে।তাজহীর পিহুর মাথায় গাট্টা মেরে বলল,,

—’ভেজাটা শুকিয়ে খাইছোস নাকি শুকনোটা ভিজিয়ে?
পিহু প্রতিবাদে কিছু বলতে গিয়েও থামলো।মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,,
—’ মানে?
—’ মানে তোর মাথা আর আমার মুণ্ডু।কিসব উল্টাপাল্টা বলছিস? মা”তা”ল!
পিহু তাজহীরকে থাপ্পড় মারে বলল,,—’ সবাইকে নিজের মত ভাবিস? ম*দ*ন!
সাজ্জাদ তাদের থামিয়ে ধমকে বলল,—’তাজহীর তো ঠিক কাজই করেছে। সবসময় উল্টাপাল্টা কথা বলিস কেন?
পিহু সাজ্জাদের দিকে তাকিয়ে বলল,,—’আরে ভাইয়া বিশ্বাস করো আমি একদম মিথ্যা কথা বলিনি।
পরক্ষণেই সে রিশাদের দিকে ফিরে বলল,,—’রিশাদ ভাইয়া তুমিই বলোনা।
পিহুর কথা শেষ হতেই পুরো ঘর যেন হঠাৎ সাইক্লিং রেসের মতো থেমে গেল। রিশাদের চনমনে মুখটা মুহূর্তেই তামাটে বর্ণ ধারণ করল। সে অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। আসলে ঘটনাটা ছিল বেশ মজার। তানহা হওয়ার পর তিহু যখন ওকে ছবি পাঠিয়েছিল, তখন রিশাদ দুষ্টুমি করে বলেছিল, ‘তোর বোন তো আমার জন্য স্পেশাল!’ সেই থেকে তিহুকে সে মজা করে ‘শালিকা’ বলে ডাকত। কিন্তু পিহু যে ভরা মজলিসে সেই পুরোনো কাসুন্দি এমনভাবে ঘেঁটে রিশাদের মান সম্মানের তন্দুরি বানাবে, সেটা রিশাদের কল্পনার বাইরে ছিল।
রিশাদ একবার নীরার দিকে আড়চোখে তাকালো। নীরা তখন মুখ টিপে হাসছে, যা দেখে রিশাদের অস্বস্তি আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল,,

—’ইয়ে মানে আমি তো শুধু পিচ্চিটাকে দেখে বলেছিলাম।
তাজহীর ফোড়ন কেটে বলল, —’ওহ, তাইলে মতলব আগে থেকেই খারাপ ছিল? আমাদের ছোট তান্নুর ওপর শেষমেষ তোমার এই নজর!
রিশাদ এবার কাঁচুমাচু হয়ে হেসেই ফেলল। হঠাৎ ঘরের গুমোট ভাবটা নিমিষেই কেটে গেল। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। তানহা অবুঝের মতো সবার হাসিমুখ দেখছে, হঠাৎ মাহা তানহার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,,
—’দেখেছো তো কিউটি, বড় হওয়ার আগেই তোমার পাত্র রেডি।
রিশাদ চোখ পাকিয়ে তাকালো মাহার দিকে। মুহূর্তেই অট্টহাসিতে ছেয়ে গেল চারিপাশ।হাসাহাসির এই চরম মুহূর্তে হঠাৎ মুন্নির ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। সবার মনোযোগ সেদিকে গেল। মুন্নি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো, পরক্ষণেই সবার উদ্দেশ্য মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল রুম থেকে ।

—’কি অবস্থা ম্যাডাম? ভুলে গেলেন নাকি? সেদিনের পর থেকে একটা বার ফোনও দিলেন না। কি অকৃতজ্ঞ রে বাবা!
ভেসে আসা পৌরুষ কন্ঠটায় চোখে কুঁচকে তাকালো মুন্নি। চিনতে পারলেও প্রশ্ন করে বলল,,
—’মিস্টার শেহেতাজ?
শেহেতাজ ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বলল,,—’চিনলেন তাহলে?
মুন্নি গম্ভীর ভঙ্গিমায় বলল,,—’কিছু বলবেন?
—’এতো তাড়া কিসের ম্যাডাম?
—’তাড়া কিছুর নাই বাট আমি অপরিচিত লোকের সঙ্গে দীর্ঘ বাক্যালাপ পছন্দ করি না।
শেহেতাজ রীতিমতো অবাক হয়ে বলল,,—’আমি অপরিচিত?
—’পরিচিত ছিলেন বুঝি?
—’এজন্যই বলে নারী জাতি ছলনাময়ী।কিছুদিন আগে যাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের অবিবাহিত জীবনটাকে স্বেচ্ছায় দাফ*ন করছিলাম আজ নাকি সে আমায় চিনে না!এ জীবন রেখে কি লাভ!
মুন্নি সামান্য হেঁসে উঠল শেহেতাজের এমন কথায়।পরপর বলল,,

—’কেমন আছেন মিস্টার?
—’এই চলছে কোনরকম।
—’ ওহ।
—’তো?ঢাকা ব্যাক করবেন কবে?
—’ গড নোজ!
—’ মানে?
—’ মানে এখানে কিছু কাজ আছে এখনো।তারপর ফিরব।
—’সিরিয়াস কিছু? মানে!
শেহেতাজের হঠাৎ মুন্নির চোখের সামনে ভেসে উঠলো নীল আর তিহুর পরিণয়ের মুহূর্ত আর তার নিজের অবস্থান। সঙ্গে সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রীতে বাসা বাঁধলো একরাশ মলিনতা।তৎক্ষণাৎ শেহেতাজের উদ্দেশ্যে সে বললো ,,
—’ফোন রাখুন!
‘মানে?’—-শেহেতাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই মুন্নি কল কেটে দিলো।শেহেতাজ বেচারা অবাক হয়ে চেয়ে রইলো স্ক্রীনের দিকে।বেচারা বুঝলো না মুন্নির হঠাৎ এমন মুড সুয়িংয়ের কারণ।

সেপ্টেম্বর মাসের নিউইয়র্ক যেন এক স্বপ্নিল কুহকিনী। শরৎ আর হেমন্তের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা এই সকালটা বড় অদ্ভুত। বাইরের আকাশে মেঘের লেশমাত্র নেই, কেবল এক চিলতে সোনাঝরা মিষ্টি রোদ পেন্টহাউসের বিশাল কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে চোরের মতো ঘরে ঢুকে পড়েছে। সেই অবাধ্য রোদের ছটা এসে লুটোপুটি খাচ্ছে তিহুর ঘুমন্ত মুখের ওপর। ঠিক যেন কোনো নিপুণ চিত্রকর তার তূণ থেকে সবটুকু স্নিগ্ধতা ঢেলে দিয়ে এক জীবন্ত ক্যানভাস এঁকেছেন।

তিহুর ঘুমের ঘোরটা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। সেই তপ্ত অথচ কোমল রোদের পরশ যখন ওর চোখের পাতায় খেলা করতে শুরু করল, ও ঈষৎ ভ্রু কুঁচকে আলতো করে চোখ মেলে তাকাল। জানালার বাইরে অগণিত অট্টালিকার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া আকাশের নীল আর ঘরের ভেতরকার সেই গুমোটহীন নিস্তব্ধতা—সব মিলিয়ে এক গভীর প্রশান্তি তার সর্বাঙ্গে যেন এক মায়া ছড়িয়ে দিল।
তিহু অবচেতন মনেই তার ডান হাতটা পাশে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু সেখানে নীলের সেই চেনা বলিষ্ঠ শরীরের উষ্ণতা নেই। বিছানার সেই দিকটা এখন বড্ড একা, চাদরের সুক্ষ্ম ভাঁজগুলো কেবল তার কিছুক্ষণ আগের অস্তিত্বের নিরব সাক্ষী হয়ে আছে। তিহু ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। এলোমেলো চুলগুলো কপালের ওপর এসে পড়েছে, চোখের পাতা দুবার পিটপিট করে সারা ঘরে দৃষ্টি বুলিয়ে মৃদু স্বরে ডাকল,,

—’মিস্টার পলিটিশিয়ান? শুনছেন?
ঘরটা বড্ড বেশি শান্ত। কোনো উত্তর এল না। তিহু ভাবল, হয়তো নীল কিচেন এরিয়ায় প্রাতঃরাশের আয়োজনে ব্যস্ত। কিন্তু মনটা কেন যেন একটু উচাটন হয়ে উঠল, এক অজানা শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরল। বিছানা ছেড়ে আলস্য ভেঙে ধীরপায়ে সে এগিয়ে গেল ঘরের এক কোণে রাখা সেই বিশালাকার আয়নাটার সামনে। স্বচ্ছ কাঁচের সেই আয়নায় নিজের উস্কোখুস্কো রূপটা দেখে সে নিজেই খানিকটা হাসল।

হঠাৎ আয়নার পাশে রাখা জিনিসের ওপর চোখ পড়তেই তিহুর নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। দীঘল আয়নাটার নিচে ফাঁকা জায়গাটায় রাখা ‌ম্যাট-শাটিন সিল্কের ডার্ক ব্লু শাড়ি;শাড়ির জমিনটা এতটাই মসৃণ যে সকালের আলো পড়ে সেখান থেকে এক অপার্থিব দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ঠিক যেন গভীর সমুদ্রের নীল জলরাশি স্থির হয়ে আছে। তার পাশেই রাখা একজোড়া প্ল্যাটিনামের ঝুমকো যার উপর দৃশ্যমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হীরে কণারা; সঙ্গে এক হাত ভর্তি রিনঝিন করা গাঢ় নীল কাঁচের চুড়ি আর গোলাপ বেলীর মিশ্রণে তৈরি গাঁজরা।
সবকিছুর ঠিক মাঝখানে ধবধবে সাদা একটা চিরকুট। তিহু কম্পিত হাতে চিরকুটটা তুলে নিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি স্থির হলো তার ওপর গোটা গোটা হরফে লেখা কিছু কথাটায়,,

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৫

❝নীল শাড়িতে আমার নীল শহরটাকে আরও একবার নতুন করে রাঙিয়ে দিন ম্যাডাম। আজ এই উজ্জ্বল সকালে চুলগুলো বেঁধে রাখবেন না, মেঘবরণ কেশগুলো আজ না হয় অবাধ্যই থাক। আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।❞
তিহু আনমনে মুচকি হাসলো নীলের কথাগুলোয়। অতঃপর তৈরি হতে পা বাড়ালো ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৭