Home The Silent Manor The Silent Manor part 80

The Silent Manor part 80

The Silent Manor part 80
Dayna Imrose lucky

চৌধুরী বাড়ির ওপর রাত নেমে এসেছে গম্ভীর আর ভারী হয়ে। বিশাল দালানের দেয়ালে দেয়ালে লণ্ঠনের আলো ছায়া এঁকে যাচ্ছে।উঠোন জুড়ে নিস্তব্ধতা। দূরের অনুচর এর পায়ের আওয়াজে মনে হয়, এই বাড়ির প্রতিটি ইট যেন শত বছরের গল্প চুপচাপ ধরে রেখেছে।মায়া তাঁর ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাড়ির সামনের দিকেই চেয়ে আছে। আজকে সকালের দৃশ্য চোখের সামনে, মস্তিষ্কের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো একা একাই হাসে। আবার ঠোঁট চেপে যায়।হাত দুটো রেলিং এর উপর।শীত পড়ছে আজ হাল্কা। উত্তরের মসৃণ বাতাস‌। ভালোই লাগছে তাঁর দাঁড়িয়ে থাকতে।

মীর কে ডেকে নিয়েছে বুলবুল। শালুক ডেকেছেন। শরীরের ক্ষত স্থানে ঔষধ লাগানোর জন্য।
মায়া বারান্দা ছেড়ে ঘরে আসে।খাটে বসে গা টা এলিয়ে দেয়‌। সন্ধ্যের দিকে থমাস শন কে কল করা হয়। তিনি মীর এর কণ্ঠ পেয়ে থ’ হয়ে যান।গলার স্বরটা বড্ড ভারী হয়ে যায়।মীর ও ঠিক সে-ই সময়ে জলে চোখ ভেজায়।সময় নিয়ে সবকিছু থমাস কে খুলে বলে।তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া জানান। এবং বলেন যত দ্রুত সম্ভব থাইল্যান্ডে চলে এসো মায়াকে নিয়ে। শালুকও আর বাধা দিচ্ছেন না।
রাত দশটা বেজেছে।মায়ার ঘরের বাইরে থেকে জুতোর আওয়াজ।মায়া নড়েচড়ে বসল।দরজাটা খোলা ছিল।মীর প্রবেশ করে ঘরে। সাদা রঙের শার্ট পরনে।দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে শরীর চুলকায়।মায়া বলল “আপনার কি গুহায় বন্দি থেকে চুলকানি হয়েছে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“ছোট মা কি সব লতাপাতার ঔষধ লাগিয়ে দিল।এখন চুলকাচ্ছে।যদিও জল দিয়ে ধোয়া হয়েছে।”
“খুব মেরেছিল!” মায়ার কণ্ঠটা নির্বাক শোনায়।
মীর থেমে যায়।নীরব পায়ে হেঁটে মায়ার সামনে গিয়ে বসে।মায়া দু পা ও হাঁটু এক করে হাত দিয়ে ধরে রেখেছে।মীর চাওয়াতে সে দৃষ্টি দুটো নত করে ফেলল।
মীর মৃদু হেসে বলল “মেরেছে! তবে আ’ঘাত পাইনি! তবে একটা করুণ দৃশ্য আমাকে নাড়িয়ে তুলেছে।”
“কোন সে-ই দৃশ্য?
“তোমার পরনের লাল শাড়ির বদলে বিধবা শাড়ি যখন দেখেছি, বিশ্বাস করো হৃদয়টা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল।হয়ত আমাদের পূর্ণতা লেখা ছিল!তাই এত এত বাঁধা বিপত্তি পেরিয়েও আবার এক হয়েছি।”
“আপনাকে হারিয়ে সর্বহারা হয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম বেঁচে থাকা বোধহয় আর হবে না।”
মীর মায়ার মুখে হাত দিয়ে বলল “আমার জন্য বেঁচে থাকবে! কখনো আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাববে না। হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তুমি না হয় একটা কারণ খুঁজে নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করেই যেও।”

“আবার হারিয়ে যাবেন!”
মীর এবার একটু মায়ার দিকে এগিয়ে বসে। তাঁর হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে আগলে বলল “তোমার থেকে হারিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারি না! যদি এমনটি কোনদিন ভেবেও থাকি, সেদিন যেন মৃত্যুটা সন্নিকটে চলে আসে।”
চার দেয়ালের ঘরটা বড্ড নিস্তব্ধ।মায়া মেরুন রঙের শাড়িতে গুটিসুটি মেরে বসে আছে।মীর বারান্দায় গিয়ে অগ্নীল কে দূর থেকে একবার দেখল।ফের ঘরে এলো‌। পর্দা টা টেনে দিল।মায়া বসা থেকে উঠে বিছানা গুছিয়ে নিল। গোছানো শেষে যখন শুতে যাবে তখনই চোখ পড়ে দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির দিকে।বইটি টেবিল থেকে তুলে হাতে ছুঁয়ে নেয়।মীর এসে পাশে দাঁড়িয়ে বইটি দেখে বলল “ভাবতেই অবাক লাগছে,দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি জুড়ে সে-ই ঘুরেফিরে আমাদের বংশের কথা লিখা!যেন আমাদেরই কথাই পূর্বের একটা দুনিয়ায় সাজানো ছিল। সুফিয়ান হায়দার এর বংশধর আমি।”

মায়া ভেজা কণ্ঠে বলল “সে তো ফারদিনার জন্য মালিকাকে ঠকিয়েছিল! নিজের সন্তান কে অবধি গ্রহণ করেনি।”
মীর ভ্রুকুটি ভাঁজ করে বলল “তুমি কিভাবে এসব জানলে!”
“সকালে আপনি এসব বললেন,আর আপনিই ভুলে গেলেন! আমার তো ভয় হচ্ছে কবে না জানি আপনিও এমনটা করেন!”

মীর বইটা মায়ার হাত থেকে রেখে তাঁকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে টেনে নিল।মায়ার কাঁধের উপর মীর থুতনি রাখে। তাঁর নিঃশ্বাস টুকু উড়ে যায় মায়ার কানে।কোমল কণ্ঠে বলল “সুফিয়ান হায়দার মালিকার ফাঁদে পড়েছিল। তাঁকে ফাঁদে পালানো হয়েছিল।তাই সে এমনটি করতে বোধহয় বাধ্য হয়েছে। কিন্তু, পিতৃপুরুষ যেমন হোক না কেন, তাঁর বংশধর যে তাঁর মত ওটাই করবে এমনটা কোথাও লেখা নেই। সুফিয়ান হায়দার- তাঁর বাবা সিলমন হায়দার এর কোন দুর্নাম ছিল না।তাই শুধু শুধু তুমি আমাকে এসব বলো না। আমি মীর যতদিন বেঁচে আছি তোমার হয়েই থাকব।”
“এভাবে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলে হাড় ভেঙে যাবে। আস্তে ধরুন!
“কেন যেন মনে হয় তুমি পালিয়ে যাচ্ছ!”
মায়া মসৃণ আওয়াজে হেসে বলল “পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে আপনার অনুপস্থিতিতে শেহজাদার সাথেই যেতে পারতাম।”

শেহজাদার কথা শুনতেই মীর এর তীব্র রাগ হল।চোখ দুটো বুঝে চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলে নিল।মায়া মীর এর অভিব্যক্তি ধরে ফেলল।মীর বলল “দ্বিতীয়বার আর ওর নাম আমার সামনে উচ্চারণ করবে না।”
“হিংসে হচ্ছে!”
“না” মীর ছোট্ট করে জবাব দিল।
মায়া পূর্বের কণ্ঠেই বলল “আপনি হিংসে জ্বলছেন আমি বাইরে থেকেই সে-ই তাপ পাচ্ছি।”
“তবে আর নতুন করে সে-ই তাপ এর উত্তাপ বাড়িও না মেয়ে।”
“কখনো কখনো আমি আপনার মধ্যে পুরোপুরি ভাবে সুফিয়ান হায়দার কে দেখতে পাই।”
“আর আমি কখনো কখনো তোমার ভেতরে ফারদিনা কে দেখতে পাই।”
থেমে মীর মায়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল “আমার খুব শখ জানো,যখন তোমার কোল জুড়ে আমাদের সন্তান আসবে তখন আমাদের যেন কণ্যা সন্তান হয়।আর ওর নাম রাখব সুফিয়ান হায়দার এবং ফারদিনার নামের সাথে মিলিয়ে।”

“কি নাম রাখবেন,ঠিক করেছেন!
“হুঁ।ফারদিনা, সুফিয়ান- দু’জনের নাম মিলিয়ে হয় ফারিয়ান।”
“নামটায় কেন যেন পুরুষের ঘ্রাণ।”
মীর গভীর নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল “আমার নিজের মা বাবার নাম জানি না। নতুন করে জানতে চেয়ে দুঃখটা আর বাড়াতে চাই না।তাই আমি আমার পিতৃপুরুষের নামের সাথে মিলিয়েই আমার সন্তানের নাম রাখব। আমাদের বংশে মেয়ে সন্তান খুব কম।তাই আমি চাই আমার মেয়ে সন্তান হোক,আর ও মেয়ে হলেও হবে বাহাদুর!একদম আমার মতন।সাহস আমার মতন হলেও দেখতে যেন তোমার মতই হয়।”
“আপনার ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষা যেন পূর্ণ হয়। তবে আমার ছোট্ট ইচ্ছে হচ্ছে, আমার প্রথম সন্তান যেন ছেলে হয়।আর আমি ওঁর ভেতরেও যেন আপনাকে খুঁজে পাই।”

“পূর্ণ হওয়ার জন্য যে তোমাকে দরকার রুপবতী”
“আমি আপনার হয়েই আছি।”
“সেটা আমিও জানি।অন্য ভাবেও এখন দরকার!” বলে মীর মায়াকে ছেড়ে দেয়।মায়া বিভ্রান্ত হয়ে বলল “অন্য কিভাবে?”
মীর হেঁসে ঘরের আলো নিভিয়ে দিল।তবু আলো নিভিয়েও নিভল না। খণ্ডিত চাঁদের অংশটি এসে পড়ল জানালা ভেদ করে।ঘরটি আলোকিত হয়।মায়া মীরের দিকে এগিয়ে বলল “আলো নেভালেন কেন?
“তোমার রুপের আলোই যথেষ্ট এ ঘর আলোকিত করার জন্য।তবু মাঝখান থেকে চাঁদটা এসে বাধা সৃষ্টি করল।”
“আমি মোটেও রুপবতী নই”
“তুমি রুপবতী না হলে শ্যামপুরের নওয়াব শেহজাদা কখনো তোমার প্রেমে পড়ত না।”
“মানে?

মীর প্রসঙ্গ এড়াতে হেঁসে উড়িয়ে দিল।সে আগেভাগে গিয়ে খাটে কাত হয়ে হাতের উপর ভর রেখে শোয়।মায়া তাঁর সামনে বসলে তাঁকে তাঁর কোলে শুইয়ে নেয়।মায়ার মাথায় আলতো বা হাতটি বুলিয়ে দিতে দিতে বলল “তোমার জন্য একটা গান মনে পড়েছে‌”
“গেয়ে শোনান”
“আগামীকাল।আজ আর সময় নষ্ট করা যাবে না” বলে মায়ার দিকে হাত বাড়াতেই মায়া ছিটকে তাঁর হাত সরিয়ে বলল “গানটা এখুনি শোনাতে হবে। ধৈর্য নেই এত অপেক্ষা করার”
মীর সেকেন্ড কয়েক মায়ার দিকে চেয়ে দম বন্ধ করে ছেড়ে বলল বলল শোনাচ্ছি।”
মীর বিছানায় এক পা ভাঁজ করে হাত দুটো ছড়িয়ে শোয়।যেন শরীরের শক্তি লোপ পেয়েছে।মায়া তাঁর বুকের উপর হাত রেখে তাঁতে থুতনির ভর রেখে মীর এর দিকে তাকাল।মীর গলা পরিষ্কার করে গাইতে শুরু করে

“ তোমায় দেখে মুগ্ধ চোখে, স্বপ্ন নামে হাজার_
_ প্রথম দেখেই হিয়ার মাঝে লাগল দোলা আমার।
_ রুপবতী কন্যা এলে সাগর জলে ভেসে_
_না জানি হায় এতটা কাল ছিলে যে কোন দেশে_
_এলে সাগর জলে ভেসে _
_এলে আমার মনের দেশে_
_এলে সাগর জলে ভেসে_
_এলে আমার মনের দেশে_

মীর থামে।গানটা শেষ করে চোখের কর্ণিয়ার থেকে জল মুছে। এরপর মাথাটা উঁচিয়ে মায়াকে দেখে। মায়া ঘুমিয়ে পড়েছে।মীর মুগ্ধতা নিয়ে মায়ার মুখখানি দেখল। আবেগী হাতটা তাঁর মাথার উপর বুলিয়ে দেয়। ঘুরে দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকাল।রাত একটা বাজে। তাঁর চোখেও ঘুমের রাজ্যেরা ধীরে ধীরে ভর করছে।ঠিক এমন সময় টেলিফোনটি বেজে উঠল। হঠাৎ কলে সে খানিকটা হকচকিত হল। পুনরায় ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে রিসিভার টা তুলে নিল বলিষ্ঠ হাতটি দিয়ে।সে আগ বাড়িয়ে কিছু বলার আগে ওপাশ থেকে থমাস শন এর কণ্ঠ ভেসে আসে।মীর থমাসের ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে।এত রাতে কল করার কারণ জানতে চায়। ততক্ষণে মায়াও জেগে ওঠে।তখন টেলিফোন এর রিং পেয়েই তাঁর ঘুম হালকা হয়।মায়া ঘুম থেকে ওঠাতে মীর থমাসের উদ্দেশ্য বলল “বাবা আগামীকাল সকালে কল করব!” বলে তাৎক্ষণিক লাইনটা কেটে দেয়।
মায়া জিজ্ঞেস করল “বাবা কি বললেন?
মীর কেটে কেটে বলল “তেমন কিছু নয়। জিজ্ঞেস করছিল আমরা কি করছি, খেয়েছি কিনা,এসব!”
মায়া মীর এর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। তাঁর জবাবে সত্যতা পেল না।মীর এর অভিব্যক্তিও হঠাৎ পরিবর্তন হয়ে যায়।তবু মায়া এখুনি কিছু জিজ্ঞেস করল না।

রাত ফুরিয়ে দিনের আলো ফুটল ধরণীতে। রাফিদ আহির এর সাথে করে কথা বলছিল।মীর এর সাথে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা খুলে বলে।শুনে আহির বাকরুদ্ধ।সে বলে,আমি আলিমনগর আসছি একদিন পড়ে ওর সাথে দেখা করতে। রাফিদ তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত আসতে বলে। কেননা মীর দ্রুতই ফিরবে বিদেশের বাড়ি।কলটা কেটে রাফিদ চুপচাপ হয়ে বসে থাকে বৈঠকখানায়।ভাবে মোহিনীর কথা। হঠাৎ মোহিনী দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়াতে সে ভেতর থেকেই ভেঙ্গে পড়ে।তবু তা বাইরে থেকে মোটেই বোঝা যাচ্ছে না।সেও বুঝতে দিচ্ছে না। শালুক বেগম জয়ন্তন বেগম কে চা দিতে দিতে দেখেন ছেলেকে। নিস্প্রভ হয়ে আছে তাঁর ছেলে।মা হিসেবে দেখতে ভালো লাগে না। তিনি জানেন না মোহিনীর সাথে ঘটে যাওয়া শেষ ঘটনা।জানেন,সে হারিয়ে গেছে। প্রার্থনা করেন ছেলের হাসি যেন পুনরায় ফিরে আসে।

আমজাদ ঘরে ফিরলেন।হাতে, ভিসা, পাসপোর্ট জাতীয় কিছু একটা। তাঁর হাতের দিকে তাকালেন শালুক। কানের কাছের কাপড়টি ঠিক করে ভালো করে মাথায় টেনে নিলেন। আমজাদ এসে বসেন সোফায়। শালুক তার সন্নিকটে দাঁড়িয়ে বললেন ‘হাতে কি!
আমজাদ ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললেন “মায়া ও মীর এর পাসপোর্ট। ওঁদের সুস্থ সবল ভাবে নিজ ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে পারলেই আমি শান্তি।”
“এত তাড়াহুড়া করছেন যে”
“সবকিছু দেখে শুনেও প্রশ্ন করছো!”
শালুক নীরব থেকে জবাব দিল “আপনার যা ভালো মনে হয়।চা খাবেন!”
“দাও,মায়া ও মীরকেও ডাকো। একসাথে খাই।”

আমজাদ কথা শেষ করতে না করতেই টেলিফোনটি বেজে উঠল। তিনি হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলতে না তুলতেই মীর এসে ঝট করে তুলে নিল।ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলছিল,যার জবাবে মীর শুধু বলল ‘আমিই মীর,শুনছি বলুন’! এরপর মিনিট দুয়েক ফোনটা কানের কাছে ধরে রাখল।ওপাশ থেকে ভেসে আসা শব্দগুলো সহনীয় কিছু নয়।যা মীর এর অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শালুক ও আমজাদ নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করলেন।মীর এর আচরণে হতবাক হয়। শালুক কণ্ঠের শব্দ কিছুটা দমিয়ে বললেন “কিছু হয়েছে মীর!”
মীর রিসিভার টা রেখে দেয়।বলল “তেমন কিছু নয়, বাবার কলিগ এর কল ছিল। আমাকে উনিও ভীষণ ভালোবাসেন। আমাকে নিয়ে বড্ড চিন্তা করছেন। সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা,তাই জিজ্ঞেস করছে।”
বলে রাফিদের পাশে গিয়ে বসে।
শালুক আমজাদ কে লক্ষ্য করে বললেন “মীর কে থমাস শন এর কলিগ কি বললেন, অদ্ভুত আচরণ করল যে! কিছু হয়েছে নিশ্চয়ই!”

আমজাদ নড়েচড়ে বসে বললেন “যেটা বলতে চাচ্ছে না সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে নেই। দু’দিন পর ওদের ফ্লাইট। ভাগ্যিস সময় মত ফ্লাইট পেয়েছি।জানোই তো, বর্তমান সময়ে প্রতিদিন যে বিমান চলে এমন নয়। থাইল্যান্ডে যখন ফিরবে তখন বাপ-ছেলে মিলে কোন সমস্যা হলে ঠিক সমাধান করে নিবে।”
শালুক উঠে গেলেন রান্নাঘরে।আজ বুলবুল নেই। ওঁর বাবার শরীর খারাপ বলে গতকাল রাতে বাড়ি ফিরেছে। আপাতত শালুক সব সামলাচ্ছেন। তিনি চান করছেন।চা করার ফাঁকে ফাঁকে মীর কে দেখছে ঘাড় টান করে। রাফিদ কিছু বলছে। কিন্তু সেদিকে মীর এর খেয়াল নেই।সে এক ধ্যানে মগ্ন হয়ে কোথাও কিছু দেখছে। কিছু ভাবছে। তবে তাঁর ভাবনার রাজ্য জুড়ে কি!তা শালুক ধরতে পারছেন না। গতকাল মীর ফেরার পর থেকে হাসিখুশি ছিল। তাঁর সাথে খারাপ কিছু হয়েছে,তা ক্ষতর দিক দিয়ে বোঝা গেলেও, মুখের একগাল হাসিতে বোঝা যায়নি। কিন্তু আজ সে নির্বিকার।

মায়া আসে শালুকের কাছে। খয়েরি রঙের শাড়ি পরনে। মাথায় ঘোমটা টানা। শালুক মেয়ের এরুপ সাজে ভীষণ খুশি হন।মায়ার থুতনি ছুঁয়ে সে চুমু খান।বলেন,তোর জীবনটা সারাজীবন এভাবেই রঙিন থাকুক।”
“মা আমি চা করি!”
শালুক পাশে সরলেন।মায়া বাকিদের জন্য চা তৈরি করল।চা তৈরি করতে করতে গতকাল রাতের কথা মনে পড়তেই শালুক কে বলল “মা!”
মায়ার শব্দে যেন প্রশ্ন।
শালুক মায়ার কাছে ঘেষে বলেন “পাশেই আছি।”

মায়া মীর কে এক নজর দেখে বলল “গতরাতে উনার বাবা কল করেন। মাঝরাতে। উনি কথা বলেন। কিন্তু,উনার বাবা কি বলেছেন, সেসব আর খুলে বলেনি।কথা বলার পর উনার মুখের হাসিটা তাৎক্ষণিক নিভে যায়।”
থমাস শন এর কলিগ কিছুক্ষণ আগেও কল করেছেন। গতরাতের সাথে কিছুক্ষণ আগের ঘটনার মিল পেলেন শালুক।তবু মায়াকে কিছু বললেন না।সে হেসে অগ্রাহ্য করল বিষয়টি। বললেন “দু’দিন পর তো থাইল্যান্ডে চলেই যাচ্ছিস,তখন তোর শশুর এর কিছু হলে তা স্বচোক্ষে দেখবি।যা,এখন চা টা সবাইকে দিয়ে আয়”
মায়া মায়ের কথামতো আর এ বিষয়ে ভাবল না।বাধ্য মেয়ের মত চা হাতে বৈঠকখানায় এসে সবাইকে চা দিল। শেষ এসে মীর এর সামনে দাঁড়ায়। তাঁকে চা দিতে মায়া ঝুঁকলে মীর অস্পষ্ট স্বরে বলল “রঙিন শাড়ি, ভেজা একগাছি চুল কানের কাছে,আজ একদম খাঁটি বউ বউ লাগছে।”

সকালটা একটু গাঢ় হতে শুরু করেছে। সূর্যটা ধীরে ধীরে মাথার উপরে অবস্থান নিচ্ছে।মীর সূর্যটার দিকে চেয়েছিল।কি দেখছিল,সে নিজেও যেন জানে না। দাঁড়িয়ে আছে অশ্বশালার সামনে। অগ্নীল মীর এর কাছে এসে মাথাটা নুইয়ে দেয়।আদর চায়।মীর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল “চলে যাচ্ছি দু’দিন পর, ভাগ্যে থাকলে আবার আমাদের দেখা হবে। ততদিন পর্যন্ত ভালো থাকিস!”
“সবটুকু আদর যেন অগ্নীল এর জন্য” মীর এর পেছন থেকে মায়ার কণ্ঠ এল। ঘুরে তাকাল মীর। একবিন্দু হেঁসে মায়াকে নিজের দিকে টেনে নিল। জড়িয়ে ধরে প্রেমময় কণ্ঠে বলল “তোমাকে কম আদর দিয়েছি কি! তারপরও অগ্নীল এর সাথে হিংসে করছো!”
মায়া অনুরাগপূর্ন গলায় নিচু দৃষ্টিতে বলল “মেয়েরা তাঁর শখের পুরুষের পাশে শেষ বয়সের মহিলাকেও সহ্য করতে পারে না। আমিও আপনার পাশে অন্য কাউকে ভাবতে পারি না। দেখতে তো পারবই না।কখনো কোনদিন যেন এমন দৃশ্য দেখতে না হয়।”

“দেখবে না বউ! আমি মীর ভুলক্রমেও যদি অন্যর হওয়ার পথে পা বাড়াই সেদিন সৃষ্টিকর্তা যেন আমাকে উনার করে নেন চিরদিনের জন্য।এই দুনিয়ার আয়ুরেখা যেন সেদিন টেনে দেন।”
মায়া আশেপাশে দেখল।বলল “কেউ দেখে ফেলবে!”
“দেখুক। আমি আমার বউকে জড়িয়ে রেখেছি, তাঁতে কার বাপের কি!দলিল করা বউ!”
“আপনার সত্যিই লজ্জা নেই!”
“গতরাতেই সব খেয়ে ফেলেছি।”
“আপনার মুখে দেখছি কিছুই আটকায় না!”
“আর আটকে কি হবে,যা হওয়ার তা হয়েই গেছে!”
“অসভ্য লোক।”

মীর মায়াকে ছেড়ে হেঁসে উঠল। হাঁসির সময় দীর্ঘায়িত হয়।মায়া প্রাণময় চাহনি তে দেখে সেই হাঁসি।মনে মনে বলে,এই হাঁসি দেখার জন্য হলেও চিরদিন যেন আল্লাহ তার সঙ্গী করে রাখেন আমাকে।’
মীর হাঁসি থামিয়ে বলল “আজও অসভ্য বললে বউ। তবে আর রাগ হচ্ছে না। শাস্তি তো দিয়েই দিয়েছি।”
“থাইল্যান্ডে ফিরছেন কবে!”
মীর এহেন প্রশ্নে যেন থমকে উঠল। গভীর দম বন্ধ করে ছেড়ে বলল “দু’দিন পর! কিন্তু..!’ বাকি কথা গলায় আটকে যায় মীর এর।
“কিন্তু কি?”
“তুমি যাচ্ছ না আমার সাথে।”
“কেন?” মায়া ভ্রু কুঁচকে ফেলল।

“একটা সমস্যা হয়েছে।বাবার।আর সে-ই সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা যেখানে থাকি সে-ই শহর থেকে দূরে যেতে হবে। বাসায় আমি বাবা আর আয়া ব্যতীত কেউ থাকে না। তোমাকে একা একা রেখে কিভাবে আমি দূরে থাকব! তোমাকে নিয়ে ঝুঁকি নেয়া যাবে না। সমস্যাটা সমাধান হলে, আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব।”
“আমি একা থাকব বাসায়,আর আপনি দূরে থাকবেন কিছুদিন,এটাই কি সমস্যা ? না কি অন্য কোন কারণ! আমার থেকে কিছু লুকাবেন না!”

The Silent Manor part 79

“আমি মীর মিথ্যে বলি না।যা বলেছি সত্য।হয়ত দশ থেকে পনের দিন লেগে যাবে। কেননা, বিমান তো নির্দিষ্ট সময়ে সময়ে দেশ পাড়ি দেয়।নয়ত তার আগেই হয়ত চলে আসতাম।”
মায়া কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকল।মীর মায়ার দিকে এগিয়ে যায়।দু গাল তাঁর চেপে ধরে আলগোছে।বলল “আমি চলে আসব বউ।এসেই তোমাকে নিয়ে যাব!”
মায়ার চোখে জল জমে। গড়িয়ে পড়তেও শুরু করে।মীর মুছে দেয়।মায়া অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল
“আপনি ফিরবেন তো?

The Silent Manor part 81

1 COMMENT

Comments are closed.