Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬২

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬২

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬২
আরোবা চৌধুরী আরু

দুই দিন ধরে সাইফান জারিনের সাথে কথা বলতে পারছে না। এই দুই দিনে সাইফানের ভিতরে অদ্ভুত একটা অস্থিরতা কাজ করছে, যেটা আগে কখনো হয় নাই। এখন সে বসে আছে রিশার সামনে। রিশা সোফায় আধশোয়া, হাতে ফোন। রিশাকে দিয়েই জারিনের আম্মুর ফোনে কল দেওয়া হচ্ছে। একবার দুইবার না, পাঁচবারের বেশি রিং গেছে, কিন্তু ফোন রিসিভ হয় নাই। ষষ্ঠবারে কল রিসিভ হতেই সাইফান আর রিশা একসাথে ফোনের দিকে তাকায়। সাইফান রিশাকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে ফিসফিস করে বলে,

— কথা বল।
রিশা ফোন কানে দিয়ে বলে,
— আসসালামু আলাইকুম।
ওপাশ থেকে একটু ভারী মহিলা কণ্ঠ শোনা যায়,
— ওয়ালাইকুম আসসালাম। কে বলছো?
— আন্টি, আমি রিশা বলছি। জারিন কই কোথায় ? ওর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না কেন? ফোন ও ধরছে না?
— ওহ রিশা। এমনিতেও তোমাকে ফোন দিতাম। আজকেই জারিনের বিয়ে ঠিক করছি। রাতে বিয়ে।
এই কথা শুনে সাইফানের চোখ বড় হয়ে যায়।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— দুূদিন হলো জারিন তার ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করে রুমে লক করে বসে আছে। ওর ভাইয়ের এক বন্ধুকে ভালোবাসে, বিয়ের জন্য পাগলামি করছে। তাই ওর ভাই আর না পেরে আজই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সায়ফানের চোখ বড় বড় হয়ে যায়, জারিফের সাথে ওর কোন কালেই ভালো সম্পর্ক ছিল না। বন্ধুত্ব তো দূরে থাক তাহলে কার সাথে বিয়ে করবে বলে পাগলামো করছে চশমা। রিশা কানের কাছে সাইফানকে ফিসফিস করে বলল,
— এই তো চশমা বান্ধবী! ওর ভাইয়ের কোন কোন বন্ধুর লগে প্রেম করছে আমাকে ধোঁকা দিয়ে শালীর ঘরের শালী।
রিশা বিরক্ত হয়ে ফোন মিউট করে এক ধাক্কা দিয়ে সাইফানকে সরিয়ে দিলো ।
— চুপ কর। কানের কাছে বিরবির করলে কোনো হেল্প করবো না।
তারপর ফোনে মন দিয়ে বলে,

— আন্টি, জারিনের সাথে একটু কথা বলার সুযোগ দেন। আমি বুঝাই।
জুলেখা বেগম জারিনের কাছে ফোন দিয়ে আসে, জারিফ ওর ফোনটা কেড়ে নিয়ে ছিলো, জারিন রিশা ফোন দিয়েছে শুনে তাড়াতাড়ি করে ফোন কানে ধরে,
— হ্যালো! বিশু?
রিশা কথা বলার আগেই সাইফান ফোন কেড়ে নিলো।
— এই চশমা! তুই আমারে ধোঁকা দিয়া কোন আশিকের সাথে কথা বলছিস বল! এজন্যই ফোন ধরিস নাই? আমারে অমৃত খাইতে দিস না, আর তুই বাংলা সিনেমার ভিলেন মার্কা ভাইয়ের বন্ধুর লগে প্রেম করিস!
ওপাশ থেকে জারিন রেগে চিৎকার করে ওঠে,
— এই বেয়াদব! আমার ভাইয়ের নামে বাজে কথা বলবি না। আমি কারো লগে প্রেম করি নাই। ভাই মিথ্যা বলছে দিয়ে আমার বিয়ে ঠিক করছে। ভাবছিলাম বাড়িতে সব বলবো, কিন্তু তোর কথা শুনে আর বলবো না।
একটু থেমে আবার বলে,

— আগে বল, তুমি ভাইয়ের সাথে কোন বেটির সাথে ঝামেলা করছিস?
সাইফান গলা নামিয়ে বলে,
— তোর বলদ ভাই ভুল বুঝছে। ওই এক শালী মহিলা যত ঝামেলার মূল। আর এই শোন, তুই বিয়ে করবি মানে? অন্য কারো কথা ভাবলেও আমি মেরে ফেলবো। দুইটা রাস্তা। হয় বাড়িতে বলে রাজি করাবি, না হয় আমি আসছি। আমার সাথে ভাগবি।
বলে এর আগের মাথায় সাইফান ফোন কেটে দেয়। রিশা তাকিয়ে বলে,
— এখন কী করবা?
সাইফান দাঁড়িয়ে বলে,
— আজকেই বিয়ে করে বাসার করবো। আর তুই আমাকে হেল্প করবি।
রিশা বিরক্তিতে বলে,
— আমার কোন দায় পড়ে যায়নি তোমার হেল্প করার।
সাইফান হেসে বলে,

— দায় পড়ে যায়নি মানে কি? তুই কি ফুপি করতে চাস না তুই কি চাস না তোর ভাই তাড়াতাড়ি বাচ্চার বাবা হোক।
রিশা বিরক্তি নিয়ে তাকানো.,
— এই তোমার লজ্জা করছে না নিজের বোনের সামনে এসব বলছো।
— লজ্জা তুই ভাতে মেখে খা শুটকি, দিনকে দিন ওর বেয়াদবটার কথা ভেবে টেনশনে আরো শুটকি হচ্ছিস। বাই দা ওয়ে, তোর প্রেমিক বিসিএস এ কে টিকে গেছে। এখন দেখ দুইদিন পর বিয়ে করে ফেলবে। আমার কাছে একটা ভালো আইডিয়া আছে তুই যদি আমাকে হেল্প করিস। তাইলে তোর আকাশ পাতাশকে কিডন্যাপ করতেও আমি হেল্প করবো।
রিশা তাকিয়ে থাকে।
— ঢং করো এখন নিজেই আমাকে থাপ্পড় দিয়েছিলে। আর এখন আবার নিজেই বুদ্ধি দিচ্ছে এইসব আজেবাজে।
সায়ফান হাই তুলে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে,

— ওটুকু না করলে ভাই ভাই ফিলিংস আসবে নাকি। ওটুকু রিয়াক্ট করা একদম আমার জন্য স্বাভাবিক। এখন তুই বল রাজি থাকলে এক চাপ রাজি না থাকলে দুই চাপ। আমি আমার রাস্তা ঠিক দেখে নিতে পারবো।
রিশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর ভাবে কাজটা করা কি ঠিক হবে।
— ওকে আমি রাজি।
আমি সবকিছুর প্ল্যানিং করছি তুই ততক্ষণ সবাইকে ফোন দিয়ে
ভাইয়ের ফ্ল্যাটে। আজ পালাবোই। বাসর করবোই, ফাগুনে পূর্ণিমা রাতে বিয়ে করবোই যেভাবেই হোক।
বলতে বলতে বেরিয়ে গেল।

গাড়িটা জারিনের বাসার একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে । সাইফান, রিশা, রুহি, রায়হান, রিদওয়ান—সবাই একসাথে। নাফিসা জোর করে তাদের সঙ্গে এসেছে, যদিও কেউ চাইছিল না ওকে নিয়ে আসতে। তবে সায়মান হঠাৎ জরুরী কাজে রাজীবের সঙ্গে চলে যাওয়ায় এই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে ওরা। সবাই এক সঙ্গেই পরিকল্পনা অনুযায়ী জারিনকে তুলে আনার জন্য প্রস্তুত।
রিশা ইতিমধ্যেই বাসার ভেতরে ঢুকেছে। সাইফান পিছন থেকে আস্তে আস্তে ভেতরে ঢুকল। ঘরের এক প্রান্তে রিশা জারিনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,
— ভাইয়া ওয়েট করছে বাগানে। চল তারাতাড়ি কেউ দেখে ফেলার আগে।
সাইফান বাগানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ বাগানের দিকে জারিফ প্রবেশ করল। সাইফান জারিফ কে খেয়াল করিনি প্রথমে, মুখ ঘুরিয়ে ঐদিকে তাকাতেই দুজনের চোখে চোখ পড়ে গেল। জারিফ সাইফানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে রাগি ভঙ্গিতে এগিয়ে এল, এসেই সাইফনের কলা চেপে ধরল,

—“এখানে কি করছিস?”
রিশা দৌড়ে জারিনকে নিয়ে সেই সময় বাগানে তার উপস্থিত হলো। দূর থেকেই তারা সায়ফান আর জারিফকে দেখতে পেলো।
সাইফান জারিফ কে কিছু বলতে যাবে কিন্তু হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। চোখ গেল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা,রিশা ও জারিনকে সাথে সাথে ওদের সাথে চোখে চোখ পড়ে গেল। ওদেরকে ইশারায় বাইরের দিকে বের হয়ে যেতে বলল। তারপর সাইফান সব পর্যবেক্ষণ করে ,জারিফের দিকে তাকিয়ে,

— তোকে তাড়াতাড়ি মামা বানাবো, সেজন্য তোর বোনকে নিতে এসেছি।
বলেই সেকেন্ডের ভিতর রুমাল বের করলো পকেটে থেকে, হঠাৎ করেই সাইফান রুমাল জারিফের মুখে ঠেসে দিল। জারিফ চমকে উঠল, কিছু বোঝার আগেই ধীরে ধীরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে নিলে সাইফান ওকে ধরে, আস্তে আস্তে ঘাসের উপর শুয়ে দিল। তারপর পকেট থেকে একটা সুপার গ্লু বের করে সুন্দর করে দুই ঠোটে লাগিয়ে ছোট তো আটকিয়ে দিল। জারিফের কপালে একটা চুমু দিয়ে জোরে বিজয়ের হাসি দিল,
— “আহ! শালাবাবু আপনার কি অবস্থা উফফ সরি শুমুন্দি। এখন আসেন বাংলা সিনেমার ভিলেনদের মতো আমার পিছনে লাগতে সুমুন্দি, তোর জ্ঞান ফিরে কথা বলতে বলতে, তোকে মামা বানানোর প্রথম প্রসেস সম্পূর্ণ করে ফেলবো। ”

সায়ফান এবার দূরত্ব বাইরে বের হয়ে দেখল,রিশা আর জারিন দাঁড়িয়ে আছে একে অপরের হাত ধরে। সায়ফান দৌড়ে গিয়ে জারিন এর হাত ধরে দৌড় দিল।
— “চল, চশমা! আজ ফাগুনী পূর্ণিমা রাতে পালায়ে যাই।”
হঠাৎ টান দেওয়াই জারিন পড়ে যেতে নিয়ে আবার নিজেকে সামলে সাইফানের সাথে তাল মিলিয়ে দৌড়ানোর চেষ্টা করছে আর অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সায়ফানের দিকে। সাইফানের নিজের মতো জারিনের দৃঢ় হাত ধরে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াচ্ছে। রিশা ততক্ষণও ছুটে চলল, ওকে এভাবে ফেলে রাখাই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ওদের পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে চিল্লিয়ে বলল,

— আমাকে ফেলে রেখে যাচ্ছ কেন?
সায়ফান না থেমে দৌড়ানো অবস্থায় চিল্লিয়ে বলল,
— তুইও পালা, শুটকি! পা আছে দৌড় দিবি তোকে আবার নতুন করে আমন্ত্রণ করতে হবে নাকি পালানোর জন্য ?”
জারিনের মনে পড়ল জারিফের কথা ও অবাক হয়ে বলল,
— এই ভাইয়ারকে কি করলে!
সাইফান হেসে ধরে টান দিয়ে বলল,
— বাদ দে ভাইয়ের কথা। পালা চশমা ফাগুনী পূর্ণিমা রাতে আজ পালিয়ে যাই।
হাপাতে হাপাতে সবাই একে একে গাড়িতে উঠে বসলো। একটা বড় গাড়ি দিয়েছে ওরা বিধায় এতগুলো মানুষ একটা গাড়িতে বসতে সমস্যা হয়নি যদি একটু গাদাগাদি হয়েছে তবুও নিজেরা মানিয়ে নিয়েছে। সাইফান সিটে হেলান দিয়ে মাথাটা পিছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। গলা দিয়ে জোরে নিঃশ্বাস বের করে বলে উঠল,

— এট লাস্ট! পালায়ে নিয়ে আসতে পারলাম বাবা। তোর দ্বারা সম্ভব, সাইফান তুই পারিস!
রিশা পাশ থেকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ানো শেষ হইছে?
পেছনের সিট থেকে রায়হান গম্ভীর গলায় বলল,
— জারিফের সাথে কী করলি?
এই প্রশ্নে গাড়ির ভেতর হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো। জারিন এতক্ষণ চুপ করে ছিল, এবার সাইফানের দিকে তাকাল সন্দেহ নিয়ে, সাইফান একদম ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলল,

— ও সমন্ধিকে অজ্ঞান করে রেখে এসেছি। আর জ্ঞান ফিরলেও কথা বলতে পারবে না। ঠোঁটে সুপার গ্লু আঠা মেরে এসেছি।
জারিন সাইফানের বুকে দুইটা ঘুসি মেরে দিল।
— পাগল নাকি! ভাইয়া কিছু হলে?
সাইফান নিজের বুক চাপড়ে হাসি চাপতে চাপতে বলল,
— আমি কি তোমার ঘুসি খাওয়ার জন্য তোমাকে পালায়ে নিয়ে আসছি? দুষ্টু দুষ্টু আচর খাওয়ার জন্য তুলে এনেছি। আরেকটু পর বিয়ে, তারপর বাসরে বোঝাবো—এই সাইফান কী চিজ বেবি !

এই কথা শুনে একসাথে সবাই “হায় হায়” করে হেসে উঠল। রুহি, রিদওয়ান তো হেসে কুটিকুটি। রায়হান মাথা নাড়ে। নাফিসা মিচমিচ করে হাসছে,রিশা বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে সাইফনের দিকে।
জারিন রেগে মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বসল। ঠোঁট চেপে ধরে আছে, কিন্তু কানের ডগা লাল হয়ে গেছে। যদিও বা সাইফানের কথাই রাগ লাগছিলো তবুও সকলের হাসাতে এবার ভীষণ লজ্জা লাগছে তোর।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। এবার গন্তব্য—আকাশ। কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল এক দোকানের সামনে। দোকান বন্ধ, সামনে স্ট্রিটলাইটের আলো। আকাশ দোকানের পাশে দাঁড়ি ফোনে কথা বলছিল। সাইফান দরজা খুলে নামল। ওর পিছনে পিছনে রায়হান আর রিদওয়ান। আকাশ সায়ফানকে দেখে ফোনটা কেটে পকেটে রেখে বিরক্তিতে বলল,
— এত রাত্রে… দেখেছিস কেন আমার। ?
তারপরই পিছনে তাকিয়ে রিদওয়ান আর রায়হানকে দেখে থমকে গেল। দ্রুত মাথা নিচু করে বলল,
— ভাইয়া, কেমন আছেন? তোমরা সবাই এখানে…?
আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। সাইফান ঝট করে পকেট থেকে রুমাল বের করে ওর মুখে চেপে ধরল।তারপর বলল,

— সরি বন্ধু, জরুরি কাজ। আমার শুটকি বোনটা তোমার শোকে আরো শুটকি হয়ে যাচ্ছে। ভাই হিসেবে এটা একদম দেখতে পারি না।
আকাশ একটু ছটফট করল, তারপর শরীর ঢিলে হয়ে গেল। রিদওয়ান আর রায়হান দুই পাশ থেকে ধরে নিল। তিনজনে মিলে “পাজা কোল” করে ওকে তুলে গাড়ির দিকে নিল। সবকিছু এত দ্রুত হলো যে কেউ টের পাওয়ার আগেই আকাশ গাড়ির ভেতর।
গাড়ির ভেতর ঢুকতেই নাফিসা চোখ বড় বড় করে তাকাল। রুহি মুখ ঢেকে বলল,
— আল্লাহ!
জারিন এবার সত্যিই অবাক।
— ওকেও…?
সাইফান গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করতে করতে বলল,
— হে মেরি চশমা জান। আমি একা বাবা হবো এটা কেমন করে হয়। এমন বৈষম্য আমি করি না অন্যদের মতো তাই নিজের সাথে অন্যকে ও বাবা হওয়ার সুযোগ দিচ্ছি।
সবাই একে অপরের দিকে তাকালো রুহি এবার ধমক দিয়ে বলল,

— বাজে না বকে কাহিনি কি বল।
সায়ফান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিশা আর আকাশের বিষয়ে সব খুলে বলল। রুহি আর নাফিসা অবাক হয়ে তাকালো রিশার দিকে বাকি সবাই কম বেশি জানে এই সম্পর্কে। নাফিসা একটু একটু জানতো কিন্তু এত কিছু হয়ে গেছে সেটা জানে না। রিশা এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ তার এত দিনের সপ্ন পূরণ হবে। তার ব্ল্যাক ডায়মন্ড ফাইনালি তার হতে যাচ্ছে।

গাড়িটা এসে থামতেই সাইফান এক মুহূর্তও দেরি করল না। দরজা খুলে নেমেই জারিনের সিটের দিকে ঝুঁকে পড়ল। জারিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত আচরণে জারিন চমকে উঠল, হাত-পা ছুঁড়ে প্রতিবাদ করল। চিৎকার করে উঠল, দুই হাত দিয়ে সাইফানের কাঁধ ধরে,
— এমন করে নিয়ে যাচ্ছ কেন? নামাও আমাকে!
সাইফান ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসি এনে জারিনকে আরও শক্ত করে ধরে বলল,
— চশমা জান আমার, তোমার নামতে কষ্ট হবে তাই তো কলে নিচ্ছি। আরেকটু পরেই বিয়ে আমার তো আনন্দে এখনই সবার সামনে তোমাকে ফট ফট চুমু খেয়ে নিতে ইচ্ছা করছে।

জারিন রেগে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল, কিন্তু লজ্জায় কানের ডগা আগুনের মতো লাল। পেছন থেকে রুহি আল্লাহ করতে করতে নেমে এল। রিদওয়ান আর রায়হান meanwhile আকাশকে দুই পাশ থেকে ধরে নামাল। আকাশ তখনও পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে পায়নি, শরীর ঢিলে হয়ে আছে। নাফিসা আর রিশা সবার শেষে নামল। রিশা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।’আজ সে ঠিক করেছে, ব্ল্যাক ডায়মন্ডকে নিজের করেই ছাড়বে।
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল কাজী অফিসের অবস্থা আরও করুণ। টেবিলের ওপর নথি ছড়িয়ে ছিটিয়ে, চেয়ারে হেলান দিয়ে কাজী সাহেব নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। যেন দুনিয়ার কোনো কাণ্ডই তার ঘুম ভাঙাতে পারবে না। সাইফান জারিনকে কোলে রেখেই সোজা গিয়ে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। তারপর দুই হাত দিয়ে জোরে টেবিল চাপড়ে উঠল।

— ওই কাজীর বাচ্চা! আমাদের বিয়ে পড়ানোর জন্য এত রাত পর্যন্ত তোকে বসায় রাখছি আর তুই ঘুমাইতেছিস? যা টাকা দিছি, অর্ধেক ফেরত দিবি বুড়া বেডা!
কাজী সাহেব ভয়ে চমকে উঠে প্রায় চেয়ার থেকে পড়েই যাচ্ছিল। চোখ কচলাতে কচলাতে কাঁপা গলায় বলল,
— “ইইই… আরে আরে… স্যার প্লিজ… ঘুমাই নাই… চোখ বন্ধ করে দোয়া পড়তেছিলাম।”
তারপর সায়ফানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস,
— “আগে কার বিয়ে পড়াবো?
— “আমারটা এখনই।”
কাজী চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— সাক্ষী?
কাজী প্রশ্ন করতেই পেছন থেকে একে একে সবাই সামনে এসে দাঁড়াল। রিদওয়ান, রায়হান, রুহি, নাফিসা, আর তাদের মাঝখানে অচেতন আকাশ। কাজীর চোখ কপালে উঠে গেল।
— এই ভদ্রলোক তো অজ্ঞান! উনাকে কি হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে এসেছেন নাকি? এই অবস্থায় জনি সাক্ষী দিবে কীভাবে…

কাজীর কথা শেষ হওয়ার আগেই সাইফান এক পা এগিয়ে গেল। কাজীর দিকে আঙুল তুলে বলল,
— কাজীর বাচ্চা, ওর পাশে এত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে চোখে পড়লো না, পড়লো তোর এই অজ্ঞান লোকটা? আর শোন, ওরও বিয়ে পড়াতে হবে।
— মানে… অজ্ঞান অবস্থায়?
কাজী প্রায় কেঁদে ফেলবে এমন অবস্থা।
সাইফান কোনো কথা না বলে পকেট থেকে পানির বোতল বের করল। ঢাকনা খুলে সব পানি নিয়ে আকাশের মুখে ছিটিয়ে দিল। ঠাণ্ডা পানির ছোঁয়ায় আকাশ কাশতে কাশতে চোখ খুলল। কিছুক্ষণ বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর চারপাশটা বুঝে উঠতেই হকচকিয়ে গেল।
— আমি এখানে কেন? এটা কোথায়?
সে উঠে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে সাইফান সামনে এসে দাঁড়াল। গলা নামিয়ে গম্ভীর ভাবে বলল ,
— এইখান থেকে যদি বিয়ে না করে উঠিস, তাহলে তোর টুনটুনি কেটে দিবো চিরকালের বিয়ের স্বাদ আমি মিটিয়ে দিব।

এই কথা শুনে সবাই একসাথে হেসে উঠল। রিশা এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সোজা এগিয়ে গিয়ে সাইফানের পায়ে জোরে এক লাথি মারল।
— আজাইরা কথা বললে তোমার, খবর খারাপ করে দিব আমি বুঝেছ?
তারপর সে আকাশের দিকে তাকাল। গলাটা নরম হয়ে এল।
— ভয় পেও না, আমি আছি।
আকাশ হা হয়ে গেছে কি হচ্ছে বুঝতে পারছে না সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে সাইফান ব্যথায় মুখ কুঁচকে ফেললেও সঙ্গে সঙ্গে রিশার দিকে তাকিয়ে বলল,
— যার জন্য চুরি করলাম, সেই বলে চোর আমাকে মারলি কেন শুটকি?
— আর একটা বাজে কথা বললে তোর দেখছি আমি কী করি—রিশা দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
রায়হান এবার গলা চড়িয়ে বলল,

— চুপ করবি তোরা! কাজী সাহেব, দয়া করে তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করেন।
কাজী আর কোনো ঝামেলায় না গিয়ে দ্রুত নথিপত্র গুছিয়ে নিল। প্রথমে সাইফান আর জারিনের বিয়ে। কবুল বলতে বলো বলবে কাজে কাজী তার আগেই, সাইফান জোরে পরপর তিনবার কবুল বলে উঠল। জারিন চুপ করে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সায়ফানের দিকে।
— এই শালী চশমা, তাড়াতাড়ি কবুল বল। তারপর আমার দিকে নজর দিস।
বলবো না—জারিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল।
কবুল বলবি না ?—সাইফান চোখ কুঁচকে তাকাল।
না বলবো না —জারিন ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে উঠলো ।
পরের মুহূর্তেই সাইফান মাটিতে বসে পড়ল, জারিনের পা ধরে ফেলল।

— চশমা জান , প্লিজ। কবুল বলে দাও জান আর এমন করিস না।
সায়ফানের অবস্থা দেখে কেউ আর হাসি ধরে রাখতে পারল না। রিদওয়ান, রুহি তো হেসে কুটিকুটি। জারিনও শেষমেশ হেসে ফেলল। তারপর শান্ত গলায় বলল, কবুল।
— আলহামদুলিল্লাহ বলে কাজী ঘোষণা করতেই চারপাশে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল।
এরপর রিশা আর আকাশ। আকাশ ধীরে ধীরে রিশার দিকে তাকাল। রিশা চোখ নামাল, তারপর আবার তাকাল। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই যেন বহু না বলা কথা ভেসে উঠল। আকাশ আর নিজের মধ্যে কোন দ্বিধা রাখলো না। প্রিয়সি কে কাছে পাওয়ার লোভ হঠাৎ মাথায় জেঁকে বসলো। এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলো না। কোনো তাড়া নেই, কোনো জোর নেই। দুজনেই ধীরে ধীরে কবুল বলল।
বিয়ে শেষ হতেই সাইফান বাইরে এসে চিৎকার শুরু করল।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬১

— আমার বিয়ে হয়ে গেছে! আমার বিয়ে হয়ে গেছে! আমি….. ফাইনালি অমৃত খাওয়ার লিগাল দলিল পেয়ে গেছি। বাসর করবো এবার উফফ।
সায়ফান নেচে নেচে বেড়াচ্ছে ঠিক সেই সময় একটা গাড়ির হেডলাইট এসে থামল কাজী অফিসের সামনে। সবাই একসাথে তাকাল। মুখের হাসি মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই। সায়মানের গাড়ি।দেখার সাথে সাথে নাফিসা ভয়ে রুহির পেছনে লুকিয়ে পড়ল।সায়মান তাকে বারবার বলে দিয়েছে তার অনুমতি ছাড়া যেন বাড়ি থেকে বের না হয়। এবার… সত্যিই সবার খবর আছে।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬২ (২)