Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৪

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৪

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৪
আশিকা আক্তার সোহাগী

“চু*মুতে শরীরে অক্সিটোসিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। যার ফলে স্ট্রেস কমে।এছাড়া সাতটা বিশেষ উপকার হয়। এরমাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্যালোরি বার্ন করে।স্বাভাবিক ফ্যান্সি কিসে ৩০ক্যালরি বার্ন হয়। যদি শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত ছাড়া হয় তবে ৯০ক্যালরি বার্ন হয়।হৃদরোগের ঝুকি কমায়। ওজন কমায়।চুমুর ফলে মুখে রক্ত সঞ্চালন বেশি হয় ফলে স্কিন ভালো রাখে।মোষ্ট ইমপর্ট্যান্ট সম্পর্ক সুদূঢ় করে।”
জিয়ানা এতক্ষণ ব্রু কুচকে নিবিড়ের কথা শুনে গেলো।তার শর্তের ফিরতি শর্ত দিয়েছে একশো চুমু খেতে হবে নিবিড়কে।নিবিড় মোটেও কৌতুক করছে না।তার মাঝে কৌতুকের ফাংশন নেই। তবে ইদানীং জিয়ানার সাথে হাঁসি ঠাট্টা সাথে দুষ্টুমিও করে নিবিড়। ডাক্তার বলেছে এটা পজেটিভ সাইন।তার মাঝে সকল স্বাভাবিক জিনিস ঢেকে গেছে অস্বাভাবিক কঠোরতায়।

জিয়ানা খুশি হয় মনে মনে।তবে এই যে ভন্ডামী শুরু করেছে সেই কখন থেকে,থামার নাম নিচ্ছে না।জিয়ানার সত্যি বলতে সেদিনের ভয়টা কাটেনি।নিবিড়ের অবস্থা নিজ চোখে দেখে সে আগানোর সাহস পাচ্ছে না।নিবিড়ের সেশন শেষ প্রায়।আর দুইটা আছে।জিয়ানা ভেবেছে চূড়ান্তভাবে তখনই আগাবে।কিন্তু নিবিড় তো মানছেই না।এই রাতটা এত দীর্ঘ মনে হচ্ছে।মাত্র সন্ধ্যা পাড় হয়েছে। বাকি রাত পড়েই আছে।সে তিন নাম্বার হাত মানে অযুহাত খুঁজে চলেছে মনে মনে। তখনই নিবিড় প্রশ্ন করে ,
-কি কাছেকোলে কোন অযুহাত খুঁজে পাচ্ছো না? তবে আমি আমার কাজ শুরু করি?
-এ্যাই না না।আমি আপনার শর্তে রাজি।তবে এখন না হ্যাঁ? চলুন নিচে গিয়ে আপনার বাবার সাথে দেখা করে আসি।উনি মনে হয় এসে পড়েছেন।
নিবিড় বিছানা ছেড়ে আচম্বিতে দাঁড়িয়ে পড়লো।হাস্যজ্বল চেহারা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠলো।ঠোঁট কামড়ে কিছুটা নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করে বলে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-ফার্দার কখনোই উনাকে আমার বাবা বলবে না। মনে থাকবে?
জিয়ানা বুঝলো এদের সম্পর্ক অতি খারাপ। না না মহা খারাপ পর্যায়ে আছে।তাই বললো,
-ওক্কে।মেহেদীর বাপ বলবো। হয়েছে?
-উনি কারো বাবা হওয়ার যোগ্য না।
বলে রুম থেকে বের হয়ে গেলো সটান।
জিয়ানাও পেছন পেছন যায়। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে আবার রুমে ঢুকে যায়।লাগেজ থেকে একটা স্কার্প বের করে গলায় ঝুলিয়ে বের হয় রুম থেকে।

জিয়ানা সিঁড়ির কাছে যেতেই রাফিন সামনে দাঁড়ায়।কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,
-আমার তোমার সাথে কথা আছে। এদিকে আসো।
-চলুন নিচে সোফায় বসে শুনি।
রাফিনের চেহারা বেশ মলিন হয়ে গেছে।চুল গুলোতে এখন আর মুরগী ছিলা নেই।এলোমেলো হয়ে কপালময় পড়ে আছে।জিয়ানা একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিচের দিকে দেখে।এত লাইট এই বাড়িতে ভেতরে থাকলে বুঝার উপায় নেই দিন না রাত।আচ্ছা এদের মাসিক বিদুৎ বিল কত আসতে পারে? সে যখন হিসেবে মসগুল তখনই তার হাতে টান পড়ে। রাফিন হাত ধরে পাশের খোলা করিডোরে ঢুকে যায়।জিয়ানার মেজাজ অত্যাধিক খারাপ হয়ে গেলো।এদের তিনজনের মাঝে সে না চাইতেও চলে আসায় নিজের উপরও বিরক্ত হলো।স্কুল ,কলেজে একটা ছেলেরও পাত্তা না পাওয়া জিয়ানার মনে হলো “উপওয়ালা যাব দেতাহে ,দেতা ছাপ্পার ফাড়কে।” এখন তিনজনের ঠেলেঠেলি বেজে গেছে।নিজেকে শান্ত রাখার জন্য রাফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

-স্যার আমি একজনের স্ত্রী।হুটহাট এভাবে শরীরে হাত দিবেন না।আমি কিছু বলছি না কিন্তু সুখ দেখলে আপনার হাত আর হাতের জায়গায় থাকবে না।
-জিয়ু প্লিজ।এইভাবে কথা বললো না প্লিজ।তোমার সাথে আমার অনেক কথা আছে।আমি জানি তোমাদের স্বাভাবিক সম্পর্ক না।তুমি এখনো আমাকে পছন্দ করো রাইট?
-ব্যাকবোনলেস মানুষদের আমি পছন্দ করি না স্যার।আমার পছন্দ সুখের মতো কড়কড়ে লোককে।যে নিজের পছন্দের জন্য যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে।
-আমাকে তুমি যা ইচ্ছা বলো।আমি তোমাদের একসাথে দেখতে পারছি না।নিবিড় নট ইউর টাইপ।
-নো হি ইজ। আমার সুখের মতো ডাইভার্সিফাইড লোকই পছন্দ।এই রেগে ফায়ার। আবার বরফের মতো কোল্ড। কখনো অতি রোমান্টিক আবার মেরে তক্তা বানায়।হঠাৎ ফোর্স লাভে বিশ্বাসী ,পরক্ষনেই আবার তুলতুলে অনুভূতির জোয়ারে ভাসায়।হি ইজ সামথিং স্পেশাল স্যার।আপনি বুঝবেন না।
রাফিন এগিয়ে আসে জিয়ানার দিকে। জিয়ানা পিছিয়ে গিয়ে বলে,

-মনোবিজ্ঞানীদের মতে ,যে ব্যাক্তি সবার মাঝে দোষ খোঁজে পায় ,সে মনের কোন না কোন বড় ব্যার্থতায় ভোগছে।কিংবা জীবনে এমন কোন ঘাটতি আছে। যার কারনে সে কোন ব্যাক্তির মাঝে ভালো দেখতে পায় না। আপনি ট্রিটমেন্ট করুন। নইতো ভাবিকে সময় দিন।এসেছে না ভাবি? কই সে?
বলে বের হয়ে আসে করিডোর থেকে।
রাফিন অকুল পাথারে পড়েছে।সে তার বৈবাহিক সম্পর্কে আগানোর কোন কারণই খুঁজে পাচ্ছে না।তার প্রতি নিয়ত মনে হচ্ছে নিজেকে নিজে হারিয়ে ফেলেছে।এই সম্পর্কের কোন ভ্যালু নেই।সে সাফাকে আজ সাফ সাফ জানিয়ে দিবে।সে ডিভোর্স চাই।তার পক্ষে এই অনুভূতির টানাপোড়নে বেঁচে থাকা আর সম্ভব না।
যদি সেদিন নিবিড়ের সাথে সেই ভুলটা না করতো মেহেদী ,নিবিড় আর তার জীবনটা আজ এত এলোমেলো হতো না।না মেহেদী নিবিড়কে ভুল বুঝতো আর না নিবিড় রাফিন কে।
এই অগোছালো সম্পর্ক ,এই এত এত মিস-আন্ডার্স্যান্ডিং কিভাবে কাটবে? আজীবন তাদের এই অগোছালো ভাবেই টেনে বেড়াতে হবে।বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে রাফিনের।

জিয়ানা নিচে নামার সাথে সাথেই মামুন ইসলাম ভেতরে প্রবেশ করলেন।উন্মুক্ত চুলে জিয়ানাকে দেখে মামুন ইসলাম থমকে দাঁড়ালেন।এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছে নীলুফা নামছে সিঁড়ি বেয়ে।উনার চোখ ভিজে উঠলো। জিয়ানা চমৎকার হেঁসে সালাম দিয়ে মামুন ইসলামের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-আমি কি আপনাকে মামু বলতে পারি?
-তুমি আমাকে নাম ধরে ডাকলেও সই জননী।
মামুন ইসলাম জিয়ানার মাথায় হাত রেখে বলেন।জিয়ানা উনার বেশভূষা দেখে অবাক হয় কিছুটা। এই গরমেও কাধে লম্বা পাতলা শাল ফেলে রেখেছেন।অবশ্য এই যাবত কালে যতবার দেখেছে এই শাল উনার জার্সির মতো সঙ্গেই থাকে।হইতো ডান হাতটা যে অকেজো সেটা ঢাকার জন্য।জিয়ানার নজর আটকায় শালের নিচে সুতায় ঝুলতে থাকা একটা শুকনা পাতায়।ভ্রু চুলকানোর অজুহাতে চোখ নিচে নামিয়ে ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখে।
এরমাঝে স্বপ্না চলে আসে তাদের মাঝে।এসেই মামুন ইসলামের কাধ থেকে শালটা নিতে চায়।কিন্তু মামুন ইসলাম হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে জিয়ানাকে জিজ্ঞেস করে ,

-মা জননী তুমি হুবহু নীলুর মতো দেখতে জানো?
জিয়ানা মাথা নাড়িয়ে বলে,
-কিভাবে জানবো বলুন? কখনো তো দেখিনি।
-ও হ্যাঁ তাই তো।আমার কাছে ওর এলবাম আছে। তুমি সময় করে এসো ,আমি দেখাবোনি।তোমার বয়সে ঠিক এমনই ছিলো।তবে তোমার হাইট ওর চেয়ে বেশি।নীলু আমার কাধ পর্যন্ত আর তুমি কান পর্যন্ত।
জিয়ানা মামুন ইসলামের দিকে তাকিয়ে থাকে নিস্তব্ধ হয়ে।উনার চোখে মুখে একসাথে শ্রদ্ধা আর আদর উপচে পড়ছে যেনো।যখনই নীলু বলেন কি নরম করে উচ্চারণ করছে।জিয়ানার এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে এই লোকটা কখনোই খারাপ মানুষ হতে পারে না।উমহু একেবারেই না।যার চোখ কথা বলে সে কিভাবে খারাপ হয়?
-হয়েছে পরেও কথা বলতে পারবেন।ফ্রেশ হয়ে আসুন খাবার রেডি সব।
স্বপ্না মামুন ইসলামকে বলে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,

-যৌথ ফ্যামিলিতে যদি থাকতে চাও তবে টেবিল টাইম মেইনটেইন করতে হবে। কারণ পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হচ্ছে একসাথে খাবার খাওয়ার মুহুর্তটা। একটা পারিবারিক ডাইনিং টেবিল হচ্ছে দশটা সেরা ইউনিভার্সিটির চেয়ে সেরা। কারণ এখানে সন্তানরা যা শিখে সেটা সারা জীবন মনে রাখে।
বলে স্বপ্না রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন। জিয়ানা উনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবলো,
সকালের শাহনাজ স্বনা আর এখনকার স্বপ্নার মাঝে বিস্তার ফারাক।জিয়ানার মাথা ঘুরে। একোন গোলকধাঁধায় পড়লো।এদের প্রত্যেকের কয়টা করে চরিত্র।তিনবেলা যদি তিনরকম চরিত্র ধারণ করে সে কিভাবে চলবে এদের সাথে?
হৈচৈয়ে জিয়ানার ধ্যান ভাঙে। ফিজান আর তাহানি সোফায় বসে টিভির রিমোট নিয়ে মারামারি শুরু করেছে।মাইমুনার কোলে আর একটা বাচ্চা দেখে জিয়ানা এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করে,

-এটা কার বেবি?
-ওহ দেখা হয়নি তোমার সাথে? এটাও আমার ছেলে।তাহা আবরার। বয়স এগারো মাস।
জিয়ানা গাল ধরে আদর দিয়ে ফিজানের দিকে তাকায়।জিয়ানাকে দেখে ফিজান কাচুমাচু করে। জিয়ানা তার কাছে গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করে ,
-কিরে তুলম্বা? সারাদিন কি তুই ঘরেই লুকিয়ে থাকিস?
-দেখো রাগী চাচ্চুর বউ আমার নাম ফিজান ইসলাম।পঁচা নামে ডাকবে না।
-দেখ তুলম্বা আমার নাম জিয়ানা হক। রাগী চাচ্চুর বউ বলে ডাকবি না।
মাইমুনা এদের কান্ড দেখে হেঁসে বলে,

-আগের পরিচয় আছে তোমাদের দেখি।
তাহানি বিড়ালের মতো করে আস্তে করে এসে জিয়ানার কোলে বসে।তারপর কানে কানে কিছু একটা বলায় ,দুইজনই খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে।উম্মে কুলসুমের ড্রয়িংয়ে পা দিয়ে সেই হাঁসির দিকে তাকিয়ে মনে হলো ,হাঁসির শব্দে নূর ম্যানসনে দ্রুতি ছড়াচ্ছে।মরা গাছের ফুল ফোটার মতো প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে।এতকাল সে অযথায় নীলুফার উপর রাগ করে দূরে রেখেছিলো এই জ্যোতিকে।কথায় আছে যে ভাঙে সেই একমাত্র নিখুঁত জোড়াও লাগাতে পারে।নীলুফার জন্য যা ধ্বংস হয়েছে নীলুফার মেয়েই হইতো তার কাফফারা দিয়ে জোড়া লাগাতে পারবে।
এরমাঝে নিবিড় ধপধপ পায়ে হেঁটে এসে জিয়ানার সামনে দাঁড়ায়।জিয়ানা হেঁসেই বলে,

-কি রাগী চাচ্চু আপনার রকেট কত দূর?
নিবিড় কপাল ভাজ করে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায়। জিয়ানা নিজে থেকেই বলে,
-এখানে এসে মনে হচ্ছে আমি নাসায় জব করতে ঢুকেছি।এক একজনের পেছনে রকেটের মতো আগুন জ্বলতেই থাকে।
বলে মাইমুনার সাথে হাই ফাইভ করে মুখ চিপে হাঁসে।নিবিড়কে দেখে তাহানি আর ফিজান চুপসে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে দেখে বলে,
-দেখুন আপনার ইমেজটা কেমন? বাচ্চারা পর্যন্ত আপনাকে অবন্ধু ভাবছে আপনি কিভাবে জনগনের বন্ধু হবেন? প্রতিদিন যতই ক্যাম্পিং করুন না কেনো আপনার বেইল নাই।
নিবিড় নিজের মাইক ফাটা গলায় গমগমিয়ে বলে,

-হয়েছে ইয়ার্কি মারা? এবার রুমে চলো। কথা আছে তোমার সাথে।আমার সাথেই আসবা। রাইট নাও।
ওদের কথার মাঝেই গভর্নেন্স ডাকলো খাবারের জন্য।জিয়ানা তাহানি কে নিয়ে ফটাফট টেবিলের দিকে চলে যায়।
গিয়ে অবাক হয়ে ভাবে,
আরেব্বাস! বিশাল টেবিল ভরা খাবার।অথচ এই বড়লোকেরা এত এত খাবার সামনে নিয়ে ঢং করে চামচ দিয়ে টুংটাং করে খাবার খায় কেন?
গভর্নেন্স একটা চেয়ার টেনে ইশারা করে বসতে।জিয়ানার কাছে মনে হচ্ছে সেকোন রয়েল ফ্যামিলি মেম্বার।আচ্ছা এই গভর্নেন্সদের বিদেশিদের মতো কালো সাদা লেজ লাগানো ফ্রক গুলা পড়ালে কেমন লাগবে?না এই তো খালাম্মা। এদের কে এই শাড়ির উপর দিয়ে এপ্রোন পড়ায় মানিয়েছে।যেমন বাংলাদেশের বিমান বালাদেরকে লাগে বিমানখালা।

জিয়ানার পাশে রাফিন বসে।সামনের বিশাল দেয়াল ঘড়িতে একটা শব্দ হলো ঠং করে।এটাযে ঘড়ি জিয়ানা এতক্ষনে খেয়াল করলো।ভেবেছিলো কোন ওয়াল ডেকোরেশনের আংকিপাংকি কিছু।চেয়ার টানার শব্দে চেয়ে দেখে আরেক পাশে নিবিড় বসেছে।মুখ সামনে সোজা করে দেখে বরাবর মেহেদী বসা।আহা কেয়া লাইফ হে।জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ আর গাছে এনাকন্ডা।
নিবিড় উপরে উঠার জন্য পা বাড়াতেই দেখে রাফিন জিয়ানার পাশে বসেছে।ব্যাস সে ব্রেক করে আরেকপাশে বসে যায়।এদের সাথে বসে খাওয়ার মতো নিবিড়ের সম্পর্ক নেই।কিন্তু বউকে তো একা ছাড়া যাবে না।
জিয়ানা শান্তি মত খেতে চায়।এইসব আজাইরা কামড়া কামড়ির পাবলিক তার পছন্দ না।নিবিড় অল্প একটু স্বামী হিসেবে পছন্দ। বাকি দুইটা গোল্লায় যাক।সে খাবারে কন্সেন্ট্রেশন করে।

মামুন ইসলাম এসে বসার পর একে একে ফারহানা ,ফাইজা মাইমুনা ফিজান সহ সবাই বসে গেলো।রাফিনের বউ সাফাকে দেখে মনে হলো গপি বাহু ।মাথায় ঘোমটা দিয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতো এসে রাফিনের পাশের চেয়ারে বসে।বারো চেয়ারের ডায়নিং যেনো ভরতেই চাচ্ছে না।মেহেদীর মা আর দাদী এলো না শুধু। সাথে অনুরাধার মা কেও দেখা গেলো না।জিয়ানা দেখলো এই নিয়ে কেউ মাথাও ঘামালো না।সবাই খাবার খাওয়াতেই ব্যাস্ত।জিয়ানা অবাক হয়ে দেখে মামুন ইসলাম নিজের বাম হাতে শুধু বিফ আইটেম খাচ্ছে।খাচ্ছে মানে একপ্রকার গিলছে।গান্ডে পিন্ডে যাকে বলে।জিয়ানার ভয় হলো লোকটার না শ্বাস আটকে যায়।ভাবনা বেশিক্ষণ আগালো না ,মামুন ইসলাম উঠে কিছুটা দূরে গিয়ে ঝুকে পড়াতে।একজন গভর্নেন্স নিচে বোল রেখেছে আর উনি হড়বড় করে বমি করে যাচ্ছেন।আশেপাশে কেউ মাথা উঠালো না পর্যন্ত। শুধু সাফা কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। মামুন ইসলাম নিজ কার্য শেষ করে দিব্বি সুস্থ মানুষের মতো হেঁটে আবার চেয়ারে বসে।জিয়ানা ভাবে “জিয়ানা যদি বাঁচতে চাস এই পাগলাগারদ থেকে কালকেই বাক্স পেট্রা নিয়ে পালা”

পরক্ষণেই গভর্নেন্স একটা মাছের পিস জিয়ানার দিকে বাড়িয়ে দিলে রাফিন শব্দ করে বলে উঠে ,
-জিয়ু মাগুর মাছ খায় না।ওকে সেলমনটা দেন।
নিবিড়ের হাত থেমে যায় প্লেটে।সে জিয়ানার প্লেট সরিয়ে রেখে বলে,
-জিয়ানা নিজের হাতেও খায় না।
তারপর চামচ দিয়ে নিবিড়ের প্লেট থেকে খাবার তুলে জিয়ানার মুখের কাছে ধরে।জিয়ানা করুন চোখে একবার নিবিড়ের দিকে তাকায় ,আবার নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে মুখে তুলে নেয় নিবিড়ের চামচ।
মামুন ইসলাম এখন আর খাচ্ছেন না।শুধু দইয়ের বাটি নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।জিয়ানা প্রথমে ভেবেছে একহাড়ি দই আবার সাবার করবে নাতো। তখনই তিনি সবার উদ্দেশ্যে বলেন,

-নিবিড় বেশ হাজবেন্ড ম্যাটারিয়াল।আমি সব সময় তোমাদের তিনজনকে নিয়ে উল্টাপাল্টা প্রেডিকশন করি।
-জ্বি আপনি শুরু থেকেই ভুল জনাব।
বলে নিচু হয়ে খাবার খেতে থাকে মেহেদী।
-আব্বু ভুল না। নিবিড়কে দেখে আমরাও কি ভাবতে পেরেছিলাম বউয়ের প্রতি এতটা পসেসিভ হবে? আমাদের কলেজের সবচেয়ে মিসোজিনিস্ট হয়েও বিয়ে করেছে আবার বউয়ের প্রতি প্রচুর কনসার্ন।
ফারহানা বলে ফিজানকে মাংস ছাড়িয়ে দিলো।মেহেদী বলে উঠলো ,
-বউটা যদি আমাদের নীলু ফুপ্পির মেয়ে হয় তাহলে মিসোজিনিস্ট কেন মহা মিসোজিনিস্টও খাটবে না।
রাফিন খাওয়া বাদ দিয়ে উঠে চলে গেলো।তার পেছন পেছন সাফাও গেলো।মামুন ইসলাম বললেন,

-সংসার করতে নামে দুইজন। কিন্তু গ্লানি টানে একজন, বউ।সবাই মিলে হাতে হাতে কাজ করার মাধ্যমে অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ জয় সম্ভব। সম্ভব ধ্বংসাত্মক সম্পর্ক আবার জোড়া লাগানো।সেখানে পরিবারের সবার অল্প একটু কন্ট্রিবিউশানে পাল্টে যেতে পারে পরস্পরের সম্পর্ক।তোমাদেও উচিত এবার সম্পর্কে নজর দেয়া।
জিয়ানাকে নিবিড় খাবার ঘনঘন মুখে তুলে দিচ্ছে। সে মুখেরটা শেষই করতে পারছে না।তাই মুখের সামনে হাত দিয়ে আটকিয়ে রেখেছে নিবিড়ের চামচ।মুখ খালি করে পানি খায়। তারপর মামুন ইসলামের কথার প্রেক্ষিতে বলে,
-বিশাল বড় বটগাছের শাখা-প্রশাখা কিংবা মূলডাল কাটার পরেও গাছ বেঁচে থাকে। কারণ তার শেকড় মাটির বহু গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। তেমনই পরিবারের নতুন সম্পর্ক কিংবা সাইড সম্পর্ক যেমনই হোক সংসার প্রধানের সম্পর্ক যদি গভীর আর সুন্দর হয় তবে সেই পরিবারের সুসম্পর্ক কখনই নষ্ট হয় না।

নিবিড় মুচকি হাঁসে। সে জানে মুখে মধু অন্তরে বিষ থিউরি জিয়ানার সাথে যায় না।সে যার সাথে মধু তার সাথে সর্বত্র মধু।এই যে মামুন ইসলাম জ্ঞান দিচ্ছে উনি নেজেই তো সম্পর্কে মানে জানে না।ভুয়া একজন লোক ছাড়া কিছুই না।
সবাই খেয়ে যে যার মনে উঠে চলে গেছে।জিয়ানা ডেজার্ট বেশ এনজয় করে আস্তে-ধীরে খাচ্ছে।বেশিভাগ খাবার যেমন ছিলো তেমনই পড়ে রয়েছে।এগুলা দিয়ে কি করে তার জানার ইচ্ছা হলো।সব বিষয়ে তার কৌতূহল এখন তুঙ্গে। এই বাড়ির প্রতিটা মানুষই রহস্যময় আচরণ করছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না।ডেজার্টের বাটিটা হাতে নিয়ে কিচেনে গিয়ে দেখে অনুরাধার মা শুধু নিরামিষ জাতীয় একটা খাবার দিয়ে খাচ্ছে।জিয়ানা কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করে ,

-এত এত ডিস রান্না হয়েছে আপনি শুধু নিরামিষ খাচ্ছেন কেন আন্টি?
জিয়ানাকে দেখে ভদ্র মহিলা একটু ইতস্তত করলেও পরমুহূর্তেই স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দেয়,
-সব খাবারেই পেয়াজ রসুন দেয়া।আমি তো বিধবা ওইসব খেতে নেই।
জিয়ানা অবাক হয়ে উনার সামনে বসে প্রশ্ন করে,
-এখনো ওইসব দিন আছে আন্টি? এগুলা কেউ মানে বলে তো মনে হয় না।আপনি কি একেবারেই আমিষ খান না?
উনি মাথা দিয়ে না করে একমনে খেতে ব্যাস্ত।জিয়ানা আবার প্রশ্ন করে ,
-অসুস্থ হয়ে যাবেন না? আমিষ আর প্রোটিনের দরকার তো সব মানুষেরই।যে মারা গেছে তার জন্য আপনি কেনো বেঁচে থেকে কষ্ট করছেন?

-শাস্ত্র শুধু নিয়ম না। এটা নিজের জন্যও।আমিষ আর পেয়াজ রসুন খেলে শরীর গরম হয়।তাই বিধবাদের না খাওয়াই ভালো।
জিয়ানা প্রথমে বুঝলো না পরমুহূর্তেই যখন বুঝলো গরম মানে উত্তেজনা মিন করেছে ,খিলখিলিয়ে হেঁসে বলে,
-কাল থেকে তবে এই রান্না একটু বেশি করে করবেন।এই বাড়ির সব বউদেরই খাওয়া উচিত এটা।কেউই স্বামী সোহাগী না।আর আন্টি টেবিল ভর্তি খাবার এগুলা কি করেন পরে?
-সব স্টাফ আর গভর্নেন্সরা খায়।যাদের নাইট ডিউটি নেই তারা বেঁচে যাওয়া খাবার নিয়ে বাড়ি যায়।
ডেজার্ট বাটি রেখে কিছু মনে পড়ায় দ্রুত পায়ে রুমের দিকে যাওয়ার সময় সোফায় বসা ফারহানা নিজের দিকে জিয়ানাকে ডাকে।সেখানে মেহেদী পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে মোবাইল দেখছে।ফারহানার পাশে ফিজান ট্যাব নিয়ে গেম খেলছে।টিভিতে সিআইডি চলে।জিয়ানা যাওয়ার পর ফারহানা দাঁড়িয়ে রাগী মুখে জিজ্ঞেস করে ,
-এই মেয়ে তুমি ফিজানকে কি ডাকো? বাচ্চাদের উল্টাপাল্টা নামে ডাকবে না। ওদের মনের উপর নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট পড়ে।ফিজান মানে কি তুমি জানো?

জিয়ানা ফিজানের হাত থেকে ট্যাবটা সোফায় রেখে নিজের কাছে টেনে বলে,
-এই মেয়ে কে? আমার নাম জিয়ানা হক।একদম উল্টাপাল্টা নামে ডাকবেন না জোনাকি ভাবি।আর তুলম্বা হচ্ছে টার্কিশ একটা মিষ্টির নাম।ফিজানের চেয়ে কিউট নাম তুলম্বা।
তারপর ফিজানের দিকে তাকিয়ে ফুলোফুলো গাল টেনে বলে,
-শোন বাপ কাল আমরা একটা মুরগী জবাই করে তোর নাম তুলম্বা রাখবো। ওকে?
ফিজান হাত ছাড়িয়ে মায়ের পেছনে চলে যায়।
মেহেদী হো হো করে হেঁসে বলে,
-মা আর ছেলে একই।আর জিয়ানা জোনাকি নামটা একদম পার্ফেক্ট দিয়েছো।আর একটা এলার্ট করে দেয়।তোমার জোনাকি ভাবি আবার নিবিড়ের ড্রাই হার্ড ফ্যান।ক্রাশও বলতে পারো। স্কুল আর কলেজ থেকে দেওয়ানা ছিলো সে নিবিড়ের উপর।তাই সে তোমাকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে। ওর থেকে সাবধান।
ফারহানা রাগে ফুসে উঠে বলে,

-এক অতীত নিয়ে আর কত খোটা দিবা তুমি মেহেদী? সেই জেদেই তো বিয়ে করে এনেছিলে এই জেলখানায়।তোমার হানিট্যাপে পড়েই আমার জীবনের এই হাল।
জিয়ানা দেখলো ফারহানার ফ্যাসফ্যাসে গলা আরও ভেঙে আসছে। চোখ ভিজে উঠার আগেই ধপাধপ ড্রয়িংরুম থেকে প্রস্থান করে।মেহেদী বাকা হেঁসে আবার মোবাইলে বসে।ফিজান গেইমেই বসে গেছে আবারও।জিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
-শুনেছি আপনি অনেক মেধাবী। কিন্তু আজ জানলাম মেধাবী হলেই কেউ ভালো মানুষ হয় না।স্ত্রীকে সম্মান করতে না পারুন কিন্তু সবার সামনে অপমান করা কোন ব্যাক্তিত্ববান পুরুষের বৈশিষ্ঠ্য না।
তারপর রুমের দিকে চলে আসে।

জিয়ানা রুমে ঢুকেই দেখে তীব্র ধোঁয়ায় ভরে আছে চারপাশ। জিয়ানা কেশে কেশে ধোঁয়ার উৎস খুঁজে দেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভুমভুম করে স্মোক করছে নিবিড়।জিয়ানা এগিয়ে গিয়ে দেখে একসাথে দুইটা ধরিয়ে টানছে।কথাবার্তা ছাড়ায় জিয়ানা টান দিয়ে সিগারেট নিজ হাতে নিয়ে নিজের মুখে পুড়ে দেয়।নিবিড়ের চোখ বড় বড় হয়ে যায়।অপরদিকে সিগারেট টান দেয়ার সাথে সাথে জিয়ানার চোখ মুখ লাল হয়ে প্রচন্ড কাশি শুরু হয়।জিয়ানার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দিয়ে নিচে ফেলে দিয়। হাত উঠায় চ*ড় মারার জন্য।কিন্তু কাশতে কাশতে জিয়ানার বেহাল চেহারা দেখে আবার আস্তে করে হাত নামিয়ে আনে।
জিয়ানা নিজেকে ধাতস্থ করে একপ্রকার জোরেই বলে,

-কি হলো মারবেন না? মারুন? আর যদি কখনো হাত উঠিয়েছেন না ,আমিও হাত ভেঙে দিবো।আপনি খেতে পারলে আমি পারবো না? আজ থেকে আপনি যদি স্মোক করেন আমিও করবো।তিন সড়কের মাথায় দাঁড়িয়ে ভুমভুম করে স্মোক করবো।
নিবিড় জিয়ানাকে চ্যাং দুলা করে ঝুলিয়ে এনে বিছানায় ছুড়ে বলে ,
-আমি যা যা করতে পারবো তুমিও তা পারবে? ঠিক আছে আজ আমার হাত থেকে বেঁচে দেখাও। তবে তোমার সব কথায় মানবো।
বলে খোলা দরজার কাছে যায় লক করতে।জিয়ানা বিছানা থেকে নেমে বলে,

-আরেহ আরেহ। আশ্চর্য সবকিছুই আপনি এক জায়গায় নিয়ে যান কেন?
নিবিড় জিয়ানার কাছে যাওয়ার আগেই জিয়ানা বিছানার অপরপাশে গিয়ে বলে,
-ব্রো ওয়েট।আমরা আলোচনার সাপেক্ষে এগুতে পারি।রাইট?
-কোন আলোচনা নেই। রাফিন তোমার পাশে বসেছে কেন?
জিয়ানা খিলখিলিয়ে হেঁসে বলে,
-আচ্ছা তবে এই জন্য দেবদাস হয়ে বিড়ি টানছিলেন?উনি পাশে বসলে আমি কি করবো?আমি কি ডেকে বসিয়েছি নাকি?
-তুমি মাগুর মাছ খাও না সে কিভাবে জানে?
-আরেহ আশ্চর্য আমরা অনেকদিনের পরিচিত। তাছাড়া এখানে এসে রাফিন স্যারের সাথে আমার রেগুলার কথা হতো।উনি আমাদের সম্পর্কে মোটামুটি সবই জানেন।

-আমাকে একটা লিষ্ট দিবে। তোমার পছন্দ ,অপছন্দ কি কি আছে সব।
-ওরে বাবা খুব কেয়ার দেখছি? যত কিছুই করেন আমি আপনাকে ভোট দিবো না।
-তোমার ভোট আমার লাগবে না।আজ আমি তোমাকে ভোট দিবো।কাম টু মি।
বলে ধমকে উঠলো নিবিড়।কিন্তু জিয়ানা এখনো রাউন্ড রাউন্ড করে বিছানার চারপাশে ঘুরছে।হঠাৎ নিবিড় জিয়ানার পেছনে তাকিয়ে স্যাসি বলে আর্তনাদ করে উঠলো। জিয়ানাও সেদিকে তাকালে এই সুযোগেই নিবিড় বিছানার মাঝ দিয়ে গিয়ে খপ করে জিয়ানাকে ধরে ফেলে।এত দ্রুত ঘটেছে ব্যাপারটা জিয়ানা চমকে উঠেছে দেখে এবার নিবিড় আট্টোহাসি দিয়ে উঠে।হাঁসার সময় নিবিড় হালকা মাথা ছাদের দিকে উপর করায় ,জিয়ানা নিবিড়ের গলায় একটা কাটা দাগ একেবারে কাছ থেকে দেখলো। নিজের হাত দিয়ে সেই দাগে বুলিয়ে আনমনে শিউরে উঠলো জিয়ানা।নিবিড় হাঁসি বন্ধ করে জিয়ানার মুখের দিকে তাকায়।জিয়ানা এই প্রথম শক্ত করে আকড়ে ধরে নিবিড়কে। নিবিড় বিমূর্ত হয়ে থমকে থেমে থাকে।জিয়ানা নিবিড়ের বুকে মাথা রেখে বলে,

-আপনি কি আমাকে চান সুখ?
নিবিড় উত্তর দেয় না।জিয়ানা নিজে থেকেই বলে ,
-যদি চান আমি রেডি। তবে যদি প্যানিক এট্রাক্ট আবার হয় তবে বালিশ চাপা দিয়ে খু*ন করবো আপনাকে বলে দিলাম।
নিবিড় মুচকি হাঁসি দিয়ে জিয়ানার কোমড়ে দুইহাত দিয়ে চেপে উপরে উঠিয়ে তার মুখ বরাবর এনে বলে ,
-চলো একসাথে খু*ন হই?
-আচ্ছা আগে আমি আপনাকে খু*ন করি পরে আপনি আমাকে ঠিক আছে?
বলে ভ্রু অনবরত উঁচু করে মুচকি হাঁসে জিয়ানা।পরক্ষণেই বলে ,
-নামান। নিচে নামান। দরকারী কথা আছে।
নিবিড় বিছানায় বসিয়ে দেয় জিয়ানাকে।জিয়ানা প্যান্টের পকেট থেকে একটা মরা পাতা বের করে বলে,
-দেখুন ওক গাছে পাতা।এটা আপনার বা.. সরি চেয়ারম্যানের চাদরে বেজে ছিলো।এই গাছ এই অত্র এলাকায় নেই।উনার অফিসেও নেই।একমাত্র আছে আপনাদের পুরাতন নূরম্যানসনের পেছনের এড়িয়ায়। রাইট?উনি সেখানে কেনো যান?
নিবিড় সোজা হয়ে বসলো জিয়ানার কথায়।তারপর জিয়ানার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

-একটা জিনিস দেখাচ্ছি।ওয়েট।
তারপর নিজের ল্যাপটপ ওপেন করে পুরাতন নূর ম্যানসনের সমস্ত বাড়ির সিসি ক্যামেরার লাইভ ফুটেজ দেখায়।অন্ধকার ফাঁকা পরিত্যক্ত একটা ভিলা।জিয়ানা কিছুক্ষন স্কিনে তাকিয়ে থাকার পর নিবিড়ের দিকে তাকায়।নিবিড় টাইম ল্যাপস দিয়ে গত দুই দিনের ভিডিও দেখায়।মানুষ কেন কোন কু*কুরও ঢুকেনি সেখানে।জিয়ানার মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগে।নিবিড় ল্যাপটপ অফ করে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,

-এখন যে কথাটা বলবো সেটা শান্ত মাথায় শুনবে ওকে?আমাদের ওই বাড়িটা ব্রিটিশ আমলের করা।নূর জাহান মানে দাদুর মা নিজ পিতার এক সন্তান হওয়াই একপ্রকার জমিদারি সব উনার নামেই থাকে।বাড়িটা করে সম্ভবত ১৯০৪/৫ সালের দিকে।বড় ব্যবসায়ী হওয়াই নূর জাহানের পিতা জমিদারের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলেন না।উনার শত্রু ছিলো নিজ বংশের লোকজনই।উনি এই ভয়ে থাকতো যেকোন দিন তার বাড়িতে হামলা করে হ*ত্যা করতে পারে। তাই বাড়ির নকশা এমন ভাবে বানান যেখানে সিক্রেট পাস আছে অনেক গুলা।আমার দাদা খুজে খুজে বেশিভাগ সিক্রেট পাস বন্ধ করে দিলেও একটা রেখেছিলেন নিজের কাজের জন্য।আর সেই সিক্রেট পাস নূর ম্যানসন থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের অফিসের নিচ পর্যন্ত। যেটা বর্তমানে চেয়ারম্যানের অফিস।
তোমার এই সন্দেহ আমার বহুদিন আগে থেকেই হয়েছে।নকশা আমি বাহ্যিক ভাবে বানাতে পারলেও অভ্যন্তরীণ কাঠামো ড্র করতে পারিনি।আর মামুন ইসলাম নিজ অফিস থেকেও কাজ ছাড়া বের হোন না। তবে নূর ম্যানসনে যাতায়াত কিভাবে হলো?
জিয়ানা বলে,

-সিক্রেট পাস উনি ব্যবহার করছেন? আমার আম্মু আব্বুকে কি ওইখানে আটকিয়ে রেখেছেন? আমরা খুঁজলে কি তাদের পাবো সুখ?
জিয়ানা এগিয়ে এসে নিবিড়ের বাহু ধরে প্রশ্ন করে।কন্ঠে তার একবুক আশার আলো টিমটিম করে জ্বলছে যেনো।নিবিড় জিয়ানার গালে হাত রেখে বলে,
-ধরে রাখো কেউ নিখোঁজ হলে সে আর দুনিয়াতেই নেই।অনুমান করা আমাদের ধর্মেও নিষিদ্ধ করেছেন।যদি পেয়ে যাই সেটা মিরাক্কেল। তবে না পাওয়াটাই স্বাভাবিক চাঁদ।
জিয়ানা মাথা নিচু করে ফেলে।সে ইদানীং কেনো এত আশা করে জানে না।তবে নিবিড়ের উপর তার ভরসা আসে সেন্ট পার্সেন্ট। সে জান প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস আর ভরসা করতে চায়।
নিবিড় আবার ল্যাপটপ ওপেন করে অন্য একটা ভিডিও অন করে।জিয়ানা আড়চোখে চেয়ে দেখে।মাটির একেবারে কাছে ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে ক্যামেরা রান করছে।নিবিড় কিছু একটা টাইপ করায় এক স্কিনে অনেক গুলা স্কিন ভেসে উঠে।সেখানে ভিন্ন ভিন্ন জায়গার মাটির কাছের ভিডিও চলছে।জিয়ানা নিবিড়ের দিকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালে নিবিড় বলে,

-দুই তিনদিনের মাঝেই আমরা সিক্রেট রাস্তাটা জেনে যাবো ইনশাআল্লাহ। অনেক গুলা ইদুর ছাড়া হয়েছে সেখানে। তাদের শরীরে স্পাই মিনি ক্যামেরা ফিট করা।ইদুরের চেয়ে ভালো রাস্তা আর কেউ খুঁজে পায় না নিশ্চয়ই?
জিয়ানা ফট করে মাথা উঠিয়ে নিবিড়ের মুখের দিকে তাকায়।সে মুচকি হাঁসি দিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।জিয়ানার কাছে লাগে “সে এই লোকের কাছে তালিম নিচ্ছে না কেন? এরচেয়ে সহজ আর প্রাকৃতিক উপায় কি হতে পারে? কত্ত ইন্টিলিজেন্ট তার জামাইটা। আজ মনে হলো অনেক বেশি সুদর্শনও বটে। আচম্বিতে বসেই নিবিড়ের গলা জড়িয়ে ধরলো।পেছনে সাপোর্ট না থাকায় নিবিড় জিয়ানাকে নিয়েই বিছানায় ধপ করে পড়ে। নিবিড় একহাতে ল্যাপটপ সরিয়ে আরেক হাতে জিয়ানাকে আগলিয়ে নিয়ে বলে,

“লজ্জা দিয়ে সজ্জা দিয়ে ,দিয়ে আবরণ ,
তোমারে দূর্বল করি করেছে গোপন।
পড়েছে তোমার পরে প্রদ্বীপ বাসনা
অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা।- রবী ঠাকুর”
জিয়ানা মুখ আর ঘাড় উচু করে নিবিড়ের দিকে তাকায়। সে অদ্ভুত ভাবে আগে থেকেই তাকিয়ে আছে জিয়ানার দিকে।জিয়ানা নিবিড়ের বুকে আর একটু সেটে যায়।নাক ডুবায় গলায়।জেনি বলে নিজস্ব পুরুষের শরীরের স্মেল নাকি নামিদামি পারফিউমের চেয়ে ভালো লাগে।জিয়ানার কাছে ঠেকে কথা সত্য।সেখানেই আলতো ঠোঁট ছুয়ে দেয় জিয়ানা।নিবিড়ের শরীরে চারশো বিশ ডিগ্রীর বিদ্যুৎ খেলে যায়।তার সন্ধ্যার শর্তের কথা মনে পড়ে বলে,

-এইবার চু*মু দেয়া শুরু করো ,আমি কাউন্ট করছি।
জিয়ানা কালক্ষেপণ করে না। যেখানে ছিলো সেখানেই ছোট ছোট চু*মু দেয়।নিবিড় কাউন্ট করে,
– ১ ২ ৩ ৪ ৫ ৫ ৫ ৬ ৭ ৭ ৮ ৮….
জিয়ানা থেমে মেকি রাগ নিয়ে নিবিড়ের দিকে তাকালে। নিবিড় হেঁসে উপর থেকে জিয়ানাকে এক মুচড়ে নিচে ফেলে বলে,
-তোমার প্রতিটা অঙ্গে আমি পাঁচ মিনিট করে থামবো। যতবার বাঁধা দিবে সময় তত বাড়বে।এখন স্বীদ্ধান্ত তোমার?
চাপা পড়া জিয়ানা চাপ সহ্য করে বলে,
-থামবেন মানে?আপনি কি ট্রেন? আর আমি কি স্টেশন নাকি?
-হ্যাঁ আমি চলন্ত ট্রেনের মতো প্রতিটা স্টেশনে থেমে নিজের চিহ্ন রেখে যাবো।
-চামে চিকনে হেয়ালি না করে বলুন সেক….উমম…
জিয়ানার জড়তাহীন কথা বন্ধ করে দিলো সিগারেটে পুড়া কালচে ঠোঁটের দংশনে।
কোন রকম নিজেকে ছাড়িয়ে জিয়ানা বলে,

-ভালো লাগে না কিন্তু
-অস্বীকার করতে পারবে ভালো লাগে না?
-হ্যাঁ করলাম অস্বীকার। কি করবেন? হানি-নাট খাওয়া শুরু করবেন?
-হানি-নাট দেখাচ্ছো আমাকে? আজ তোমার খবর আছে।
বলে নিবিড় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নেয় জিয়ানাকে।
-এমা না না।আপনার অনেক পাওয়ার।হানি নাটের মাঝে নাট গাছের গোড়াই যদি আপনি মু*তে আসেন তবে পৃথিবীর সকল পুরুষের আপনার মতো পাওয়ার চলে আসবে।ঠিক এতটাই পাওয়ার আপনার।
-অসভ্য মেয়ে আগামী তিনদিন হাটাচলা বন্ধ যদি না করি আমি সুখনীল নিবিড় না।আমাকে নিয়ে মশকরা?
-আমার বুল হয়েছে।আমাকে মাফ করে দেও।
বলে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে জিয়ানা।

নিবিড়ের ঠোঁট ছেড়ে গিবাদেশে উন্মুক্ত বিচরণে জিয়ানার খিলখিল হাঁসি আরও বেড়ে যায়।এমন মুহূর্তে অন্য মেয়েরা যেখানে লজ্জায় মিহিয়ে যায়। সেখানে এই মেয়ের এমন হেঁসে কুটোকুটি হওয়াই নিবিড় নিজের কাজ থামিয়ে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায়। জিয়ানা হেঁসেই বলে,
-মানুষের অনুভূতি আসলে কোন নির্দিষ্ট থিউরি দিয়ে বিচার করা যায় না। আপি আমাকে বলেছিলো মেরুদন্ডে শীতল শিহরণ বয় কিন্তু আমার নাভিতে সুড়সুড়ির কুঞ্চন। বলে আবার হাঁসা শুরু।
-ঠিক আছে তাহলে সেখানেই নেক্সট স্টেশন আর আমার দশমিনিট স্টপিচ।
বলে নিবিড় নিজ কাজে মত্ত হয়।আর জিয়ানার হাঁসি থেমে যায় এক সর্বনাশা নতুন অনুভূতিতে।
অনুভূতি বেশিদূর গড়ানোর আগেই জিয়ানা বলে,

-ফাইনাল সেশন টা শেষ করে আগাই আমরা সুখ? আপনি প্রচন্ড ঘামছেন। আমার ভয় লাগছে সত্যি।
নিবিড় থামে জিয়ানার কথায়।কিন্তু সরে আসে না।আস্তে করে বলে,
-তুমি কি তুলা খাও জিয়ানা? এমন আদুরে শরীর কেনো? এমন বউ রেখে কোন সুদ্ধ পুরুষও বাসর না করে থাকতে পারবে?
-তো আপনি বাদ আর রাখলেন কোথায়?
-ডিজাইন ,প্ল্যান,কোডিং সব রেডি কিন্তু ফাইনাল সেটাপের আগেই ব্ল্যাক আউট। এই হচ্ছে আমার অবস্থা।
নিবিড়ে জিয়ানার ঘাড়ে মুখ রেখেই বললে ,জিয়ানা খিলখিলে ঠা ঠা করে হেঁসে উঠে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৩

দরজার অপরপ্রান্ত থেকে রাফিন সেই হাঁসির শব্দ শুনে রাগে গমগমিয়ে নিজের রুমে গিয়ে নিজের চুল খামচে ধরে।তার দুনিয়া টলছে। সেই সময় সাফা রুমে ঢুকে।রাফিন পারিপার্শ্বিক সব ভুলে সাফাকে একটানে বিছানায় ফেলে।আজ তার মনের জ্বালা অন্যকিছু দিয়ে মিটাবে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৫