নীতিহীন রাজ পর্ব ৭১
আশিকা আক্তার সোহাগী
হিউম্যান রিসার্চ এর একটা চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে”আত্মকেন্দ্রিক মানুষ গুলা নিজেকে এতটা ভালোবাসে তারা সেই স্থান অন্য কাউকে দিতে পারে না।এমন কি চাহিদার উর্ধ্বে কাউকে বিশ্বাসও করতে পারে না।”
জিয়ানার মনে হলো নিবিড় ঠিক এই রকম।এই যে সে নিজেকে প্রচন্ড ভালোবাসে। আর নিজের জন্য জিয়ানা একমাত্র চাহিদার জায়গা। আর তাই জিয়ানার পজিশন তার কাছে টপে।কিন্তু নিজের আগে না।
কমন রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে নিবিড়।জিয়ানাকে জেনির কাছে দিয়ে তবেই শোডাউনে বের হবে।দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিমের দিকে এগিয়ে যায়। মিমের শুকনা মুখ দেখে জিয়ানার কপালে ভাজ পড়ে।
‘কিরে তোকে কি জোর করে বিয়ে দিচ্ছে? গরুর পা*ছার মতো করে রেখছিস কেন?’
‘অনেক বয়স্ক এক লোকের সাথে বিয়ে ঠিক করেছে।সরকারি চাকরি দেখে আব্বা আর অন্য কিছু ভাবে নাই।’
মিম থুতনি বুকে নামিয়ে বলে।
‘বয়স্ক বলতে? কেমন বয়স?আমরটার চেয়েও বুড়া?আদর টাদর করতে পারবে তো?’
মিম জিয়ানার বাহুতে চাপর দিয়ে বলে,
‘নিবিড় ভাইয়ের সাথে হলিউড হিরোও ফেইল আর তুই কার সাথে তুলনা দিচ্ছিস? কেন ভাই কি তোকে আদর টাদর করতে পারে না নাকি?’
‘তার আদরের জ্বলায় চাঙ্গে উঠার যোগাড়। ‘
বলে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে জিয়ানা।অন্য মেয়েরাও একবার তাকায় তাদের দিকে।
‘এই দেখ বুড়ার ছবি।’
বলে ফোনের গ্যালারিতে এক আধাপাকা বুড়ার ছবি বের করে দেয় মিম।জিয়ানা ফোন হাতে নিয়ে বলে,
‘যাচ্ছেলে এটা পাত্র না পাত্রের বাপ?ফোন নাম্বার দে?’
মিম ফোন নাম্বার দিলে জিয়ানা কল দেয়।
‘হ্যালো মির কাশেম বলছি।আপনি কে?’
‘আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া আমাকে আপনি চিনবেন না।আমি একজন ঘটক।আপনার জন্য একটা চমৎকার পাত্রী আছে হাতে।’
‘ওহো দুঃখীত আমার তো বিয়ে ঠিক। কালকে কাবিন।’
‘হাই হাই বলেন কি।আমি আপনার হোয়াইস এ্যাপে একটা ছবি পাঠিয়েছি পাত্রীর।এমন পাত্রী দ্বিতীয়টি হয় না।পাত্রী নিজেই আপনাকে পছন্দ করেছে বিদায় আমাকে ফোন দিতে বললো।তাছাড়া পাত্রীর পারিবারিক অবস্থাও খুব ভালো।কিন্তু মনের ব্যাপারে তো কারো হাত নেই।তাই আপনার মতো লোককের মাঝেই সে সালমানকে দেখতে পেয়েছে।তাহলে আর কি রাখি।অভিনন্দন আপনাকে।’
বলে কট করে কেটে দেয়।তামান্নার একটা একটা ছবি পাঠিয়েছে। মিম বলে,
‘কিচ্ছু হবে না্রে এতে।’
‘হবে একটু পর মীর কাসেম থেকে মীর জাফর হয়ে যাবে। ‘
‘আমি ট্রেনে ঝাপ দিবো জিয়ু তবুও এই বুড়ার বউ হবো না।’
‘হইছ না। এই বেডা আজ বিয়ে করে কালকেই মইরা যাইতে পারে। পরে তুই বিধবা হয়ে গান গাইবি
“আমারে কেউ ছুইয়ো না গো সজনী
আমি কুল হারা কলঙ্কিনী”
মিম দুঃখের মাঝেও হেঁসে বলে,’হায়াত মউত কি কেউ বলতে পারে? এমনও তো হতে পারে ইয়াং তাগড়া জামাই পেলাম কিন্তু পুট করে মরে গেলো।তখন?’
‘নিয়তেই সব হয় বুদ্দু।আর খারাপ কথা বলতে হয় না।আম্মু বলে ,খারাপ কথা নাকি বেশি ফলে যায়। দেখ তোর লোভী পাত্র এক্ষুনি ফোন দিলো বলে।
জিয়ানার কথায় ঠিক মিনিট তিনেক পর কল ব্যাক করে বলে,
‘কিন্তু আমি বিয়েটা ভাঙ্গবো কিভাবে? এই মেয়েটা অতি রূপবতী। আর আমার উঠবি ওয়াইফ এভারেজ গার্ল।আপনি আমাকে ডপ দিচ্ছেন নাতো? বহু কষ্টে একটা অল্পবয়সী পাত্রী পেয়েছি?’
‘আরেহ নাহ।আমি আপনাকে একটা আইডি লিংক দিচ্ছি সেই লিংকয়ে ঢুকে ভিডিও কলে কথা বলে নিশ্চিত হোন।’
জিয়ানা ফোন কেটে দ্রুত তামান্নাকে ফোন দিয়ে সব বলে।এদিকে মিমকে নিয়ে জিয়ানা নিবিড়ের গাড়িতে করে রওনা হয় তাদের বাড়ির দিকে।গাড়িতে নিবিড়কেও সব ভেঙে বলে।পরবর্তী মিমদের বাড়িতে কি কি নাটক হতে পারে সেটা ভেবে মনে মনে রেডি হচ্ছে। কারণ মিডিল ক্লাসদের বিয়ে ভাঙ্গা মানে মান সম্মান ভাঙা। গ্রামীণ একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে,
“ভাত পায় না চা খায়
হোন্ডার দিয়ে হাগতে যায়”
মিডিলক্লাসদের অবস্থাও সেইম।শান্তি স্বস্তি রেখে সামাজিক সম্মানের পেছনে ছুটে। অশান্তি বয়ে বেড়াবে তবুও সামাজিকতার গোলামী ছাড়বে না।
নিবিড় জিয়ানার দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হাঁসে। ওসব ব্যাপারে বরাবরই তার বউ ওয়াকিবহাল। বাচ্চা নারীর প্রতি তার হৃদয় সদা প্রস্তুত। নিবিড় ফটাফট টাইপ করে মক্কুকে সব জানাই।পরিস্থিতি কি হতে পারে আনুমান করে আকাশকে রেডি থাকতে বলে।
জিয়ানারা যখন হাজির হয় মিমদের বাসায় তখন হৈহল্লা শুরু হয়ে গেছে।গাড়িতে থাকা কালিন মিমের মেজোবোন ফোন দিয়ে জানিয়েছে ‘ঘটনা ভালো না। তারাতাড়ি বাড়ি ফিরতে।’
কলোনির ঘর যেমন হয় এদিকটাও ঠিক তেমনই।রংচটা দেয়ালে ইট গুলা দাঁত কেলিয়ে বের হয়ে আছে।যেনো বহুবছর তাদের ব্রাশ করানো হয় না।ময়লা জমতে জমতে কালো হয়ে গেছে।ঘরের চাল গুলা জং ধরা খয়ে যাওয়া টিনের।কেউ কেউ আবার ফাউন্ডেশন করার চেষ্টা করেছে।তবে দোতলা পর্যন্ত করে হাওয়া ফুস হওয়াই সেটার ছাদ টিন দিয়ে গুজামিল দেয়া।
মিমদের ঘরের সামনে অনেক গুলা ভাঙা ড্রাম দাঁড় করানো।প্রায় মরা দুইটা মানিপ্ল্যান্ট ঝুলছে আধাভঙা জানালার গ্রিলে।ঘর থেকে থেকে থেকে আল্লাহ গো আল্লাহ গো বলে কেউ গোঙিয়ে কাঁদিছে অনবরত। ঘরের বারান্দা টাইপের ফাঁকা জায়গায় আরও অনেক গুলা মহিলা দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখছে ভেতরে দৃশ্য।
মিম সবাইকে সরিয়ে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে।জিয়ানা পেছন পেছন যায়।পরমুহূর্তেই কান্নার শব্দ উধাও। একজন বৃদ্ধা খসখসে চটানো ফ্লোরে বসে একাধারে আহাজারি করে যাচ্ছে।মিম গিয়ে উনার কাছে বসায় উনার আহাজারি বাড়ে বৈ কমে না।মিম বারবার বুঝাচ্ছে’চুপ করো দাদি।আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।’
কিন্তু দাদির এক কথা ,
‘আহারে বুবুরে আমার তোর এহন কি হইবো গো?’
জিয়ানার পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে।নিচের ঠোঁট কামড়ে হাসি থামিয়ে বলে,
‘আহারে দাদি এভাবে কেঁদে নিজের হায়াত কমাচ্ছেন কেন?যে পরিমান কেঁদেছেন এতে আপনার কমছে কম ছয় মাসের আয়ু কমেছে।’
বৃদ্ধার কান্না বন্ধ করে কুচকানো চোখে জিয়ানার দিকে তাকায়।পাশ থেকে মিমের মতোই একটা মেয়ে জিজ্ঞেস করে,
‘কাদলে হায়াত কমে এই হাদিস পাইছেন কই?’
‘না মানে হাঁসলে যেহেতু হায়াত বাড়ে তারমানে কাঁদলে নিশ্চয়ই কমে।আর বয়স্কদের তো হুড়হুড় করে কমে।’
বলে জিয়ানা দাঁত বের করে।তারপর মিমের দিকে তাকিয়ে বলে,’ওরা বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে।তোর আব্বাকে বের হতে বল।’
মিম পাশের রুমে ঢুকে যাওয়ার পর সেখান থেকে একজন ছিপছিপে হ্যাংলা পাতলা চুপসানো গালের ময়লা লুঙ্গি আর সাদা সেন্টু গেঞ্জি পড়া বয়স্ক লোক বের হয়ে এলেন।যদিও সাদা গেঞ্জিটা বহুদিনের ব্যবহারের পর সেটা দুধ চা কালারের হয়ে গেছে।
জিয়ানাও বেড়িয়ে আসে ঘর থেকে।এবং খেয়াল করে দেখে লোকটার মুখে ব্যার্থতার ছাপ।দরিদ্রতা উনাকে মহান করতে পারেনি।করেছে কুন্ঠিত আর বানিয়েছে একজন ব্যার্থপিতা।
নিবিড়কে দেখেই লোকটা যেনো আরও ঝুকে গেলো।উনি কাঁদছেন।নিশব্দের কান্না। জিয়ানার এবার নিজের কর্মের জন্য খারাপ লাগে।তখনই হুড়মুড় করে আকাশ,মক্কু সহ বেশ অনেকজন হাজির হয় সেখানে।
নিবিড় এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধার কাধে হাত রেখে বলে,
‘চাচা ভেঙে পইড়েন না।বরং শুকরিয়া আদায় করেন।একজন লোভী লোকের হাত থেকে বেঁচে গেছেন। আমরা দেখছি কি করা যায়?’
তারপর আকাশের দিকে ঘুরে একটু সাইডে নিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
‘কি বলতে চাচ্ছি বুঝতে পারছিস?’
আকাশ মাথা উপর নিচ করে।নিবিড় আবার জিজ্ঞেস করে ,
‘ভালোবাসিস?’
‘বুঝি না ভাই।তবে এই মেয়েকে দেখলে শান্তি শান্তি লাগে।’
‘ব্যাস তাতেই হবে।তোর গার্ডিয়ানদের ফোন দিয়ে অনুমতি নে।’
আকাশ পকেট হাতরে ফোন বের করে তার পিতার নাম্বারে ফোন দেয়।কানে ধরেই আগেপিছে কিছু না বলে সরাসরি বলে,
‘পাপা আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। দোয়া করো।’
‘জাহান্নামের চৌরাস্তায় যাও।নো প্রব্লেম।’
লাউডে থাকায় স্পষ্ট শোনা গেলো আকাশের পিতার কথা।
নিবিড় মাথায় ঘাট্টা মেরে ফোন হাত থেকে কেড়ে নেই।তারপর সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বলে,
‘আংকেল আপনার ছেলে একটা গরীব মেয়েকে বিয়ে করতে আগ্রহী। মেয়ের বাবার বিশেষ পরিচয় নেই।পিয়ন পোস্টে জব করে।তবে মেয়ে জার্নালিজমে থার্ড ইয়ারে পড়াশোনা করে।দেখতে শুনতে ভালো।একেবারেই সহজ সরল।বাসা পুরাতন কলোনির চার নাম্বার গলির প্রথম বাড়ি।’
‘কলনী? পিওন? হোয়াট রাবিশ? আকাশ কোথায় ?’
বলে গর্জে উঠেন ভদ্রলোক।নিবিড়ের চোয়াল টানটান হয়ে উঠে।আকাশ এগিয়ে এসে বলে,
‘পাপা তোমাদের সব কন্ডিশন মেনে নিবো।বিদেশ যাবো।পড়ালেখা ঠিক করে করবো।ও শীট পড়ালেখা তো শেষ। সমস্যা নাই আবার পড়াশোনা শুরু করবো।তবুও এই মেয়েটাকে মেনে নাও।না নিলেও সমস্যা নাই কিছু টাকা পয়সা দিলেও চলবে।’
কট করে ডিস্কানেক্ট হয়ে গেলো ফোন।কালক্ষেপ না করে আকাশ তার মাকে ফোন দেয়।
‘আম্মু আমি তোমার লক্ষ্মী ছেলে হয়ে যাবো তবে যদি একটা অনুরোধ রাখো?’
‘কি ভণ্ডামি করেছিস কুইক বল।আমি মাত্রই সার্জারী থেকে বের হলাম।রেষ্ট নিতে হবে।’
‘আম্মু আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি।’
‘অভিনন্দন বেটা।’
‘আমি এই মুহূর্তে পাত্রীর বাড়ির সামনে। তোমাকে আমার হবু বউয়ের ফটো আর আর এড্রেস পাঠাচ্ছি। তার বিশেষ কোন গুন নেই আর একেবারেই সাদামাটা।তবে তোমার মতো হার্ড ওয়ার্কিং ওমেন।আর আমার বিপরীত মেরুর বাসিন্দা।’
‘যেহেতু তোর বিপরীত সব ,তবে আমি রাজি।’
‘তবে বিয়ের শপিং করে এনো।ও হ্যাঁ ক্লাস বা স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে সমস্যা নেই তো?’
‘থাকলেই কি?’
‘ওও তাই তো?’
‘ফাজলামি না করে বাসায় ফিরো।’
‘আ’ম সিরিয়াস আম্মু।আরিফা মিম নাম মেয়েটার।বাবা পিওন।থাকে পুরাতন বড় কলোনির গলিতে।আমার ভার্সিটিতেই পড়ে। জার্নালিজমের থার্ড ইয়ার চলে।আজ ওর বিয়ে ভেঙে গেছে।কাল বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো।’
‘ভালোবাসিস?’
‘মনে হয়?’
‘ঠিক আছে আমি আসছি।’
‘লাভ ইউ আম্মু….”
শেষ করার আগেই কেটে গেলো ফোন।আকাশ চিল্লিয়ে নিবিড়ে জড়িয়ে ধরতে গেলে নিবিড় তর্জনী আঙুল দিয়ে কপাল বরাবর চেপে ধরে দূরে সরিয়ে দেয়।
আকাশ ঘাড় চুলকে বলে,
‘ভাই আপনে কি ভাবিকেও ধরতে দেন না?’
‘ফালতু কথা বলবি তো পাত্র হিসেবে তোকে কেটে আরেকজনকে বসিয়ে দিবো?’
‘না থাক ভাই।তবে আপনে বের হয়ে যান।সামান্য বিয়েই তো? আমি করেই চলে আসবো।’
‘মনে হচ্ছে আরও অনেকবার করেছিস?’
‘মশা মারতে কামান দাগা লাগে নাকি? বিয়ে বাচ্চা পয়দা একা একাই করা যায়।’
মক্কু পেছন থেকে এসেই পিঠে চাপর দিয়ে বলে,
‘দেখ এটা ফাজলামির জিনিস না।দায়িত্ব যদি ভালো মতো নিতে পারিস তবেই আগা।তানাহলে অহেতুক একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার মানে নেই।’
তালহা এগিয়ে এসে বলে,’ভাই ওই একেবারে ডুবছে। আজ প্রায় ছয়মাস থেকেই সিঙ্গেল ঘুরতাছে কি এমনে এমনেই? তার নাকি প্রেম টেমে আর মন বসে না।সব নাকি সিচুয়েশনশীপ ছিলো?’
জিয়ানা নিবিড়দের দিকে এসে বলে,’এখানে আর কোন সমস্যা নেই । যা ভেবেছিলাম সেরকম কিছুই না।ঘরোয়া আয়োজন হতো বলে খুব একটা পয়সা কড়ি খরচ হয়নি।আপনারা এবার যেতে পারেন। আমি আর কিছুক্ষন থেকে চলে যাবো।’
‘আরেহ যাবো কোথায় বিয়ে না খেয়ে আজ আর যাওয়া যাওয়ি নাই জিয়ানা।’
বলে মক্কু আকাশের কাধে হাত রাখে।মিমের আব্বা এগিয়ে এলে নিবিড় উনাকে আকাশের পরিবার সম্পর্কে বলে।মিমকে বিয়ে দিতে আপত্তি আছে কিনা?উনার বিস্মিত চোখ দেখে আকাশ এগিয়ে এসে আস্বস্ত করে।
এরপর ব্যাপারটা অতি দ্রুত ঘটে।ঘন্টাখানেকের মাঝে পার্টির ছেলেরা বিয়ের সকল আয়োজন করে হুলুস্থুল কান্ড ঘটিয়ে ফেলে।বিয়ের বাজার পর্যন্ত করা হয়েছে।মিমের বোন মিমকে শাড়ি পড়িয়ে সাজিয়ে দিচ্ছে।জিয়ানা গালে হাত দিয়ে মিমকে দেখে যাচ্ছে।মেয়েটার মুখের ভয় সরেনি।সাজ হয়ে গেলে জিয়ানা আড়ালে মিমকে জিজ্ঞেস করে ,
‘কোন সমস্যা?মুখচোখের এমন করুন অবস্থা কেন?বুড়ার বিরহে পড়েছিস?’
‘শোন আকাশ ভাইয়াকে আমার খুব ভয় লাগে।চোখ গুলা কেমন গুন্ডাদের মতো না? আর উনার চরিত্রও ঠিকঠাক নেই।অনেকদিন আমার পিছু নিয়েছে।আর অনেক মেয়ের সাথেও দেখেছি।তাছাড়া হাবভাব দেখেই বুঝা যায় উনাদের অবস্থা ভালো।নেহাৎ করুনা করে বিয়ে করে নিচ্ছে রে।’
‘চুপ কর ছেড়ি।তুই তো গাধি আর বেকুপ তানাহলে একটা ছেলে কেনো পেছন পেছন আসে এইটা এমনিতেই বুঝতিস।আকাশ তোকে পছন্দ করে অনেকদিন থেকে।তাই রাতে প্রাইভেট পড়িয়ে যখন ফিরতি বেশিরভাগ সময় পাহারা দিয়ে তোকে বাসায় পৌঁছে দিতো।আজকেই জানলাম সব।ছেলেরা এইসব নিয়ে হাসিঠাট্টা করছে।’
মিম অবাক হয়ে হা হয়ে যায়।জিয়ানা মিমের থুতনি ধরে মুখ বন্ধ করে বলে,’হা বন্ধ কর।তোকে কি মিষ্টি লাগছে মিম দোগুনে ডিম।’
সত্যি ঘরোয়া বউ সাজে মিমকে আরও স্নিগ্ধ সতেজ লাগছে।
আকাশের মাকে দেখে জিয়ানা অভিভূত হয়ে যায়।ছোটখাটো আদলের একজম স্মার্ট মহিলা।চুল গুলো ঘাড় পর্যন্ত। চোখে উপনেত্র।ঠোঁটে চমৎকার হাঁসি ফুটে উঠে মিমকে দেখেই।উনি এসেই মিমের চুল নিজের হাতে নিয়ে খুব প্রশংসা করেন।উনার নাকি লম্বা চুলের খুব শখ ছিলো কিন্তু কোনদিনই চুলের বাড় হয়নি।
বারবার বলছেন,’আকাশের লম্বা চুল খুব পছন্দ।ছোটবেলায় আমাকে প্রায় বলতো আম্মু আমাকে লম্বাচুলের বউ এনে দিবে কিন্তু?’
বলার পর নিজের গলার চেইন খুলে পড়িয়ে দেয় মিমকে।
মিমের মা আর বোনেরা খুশি মুখে দাঁড়িয়ে কিন্তু চোখ ভেজা।দুইজন বিসিএস ডাক্তারের ঘরে তাদের মেয়ে বউ হয়ে যাচ্ছে এই যে অলীক কল্পনার মতো।
মিমকে নিয়ে বসার রুমে আনা হলো।আকাশকে দেখেই জিয়ানা খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে।আকাশ পলো শার্ট আর গ্যাবার্ডিন প্যান্টের সাথে বর টোপর পড়ে আছে।মক্কু বলে,
‘আরেহ হেঁসো না।ট্রায়াল ছাড়া শেরওয়ানি কিনা যায়নি।তাই শুধু টোপর দিয়েই কাজ চলবে।’
আকাশ জিয়ানার হাসি দেখে টোপর খুলে ফেলে।
বিয়ে পড়ানোর আগে আকাশের আব্বুকে আবার ফোন দেয় আকাশের আম্মু।উনি রাগে ফোন বন্ধ করে রেখেছেন।ধর্মীয় ভাবে বিয়ে পড়ানোর পর রেজিষ্ট্রি করার সময় মিমের হাতের কাপন দেখে আকাশ বলে উঠে,
‘আরেহ তাড়াতাড়ি সাইন করো।এত নার্ভাসনেসের কিছু নাই আমরা আমরাই তো?’
আকাশের মা পিঠে ধুম করে একটা কিল দেয়। অন্যদিকে সারা ঘরে হাঁসির বোম ফাটে।
বিয়ে পড়ানো শেষে জিয়ানা কোবনভাবেই মিমের মুখ দেখতে দিবে না।আকাশ উঁকিঝঁকি মারছে তখন থেকে।জিয়ানার একদাবি টাকা না দিলে কোন দেখাদেখি নাই।নিবিড় বেশ কয়েকবার ধমক দিয়েছে ‘জিয়ানা ‘বলে।জিয়ানা উল্টো বলেছে,
‘এখানে একটাই পরিচয় কনেপক্ষ আর বরপক্ষ। ‘
আকশ আবার নিচ থেকে বলে,
‘ভাই যা চায় দিয়ে দেন।আপনার ঘরেই তো যাবে?’
নিবিড় জিয়ানার কানে কানে বলে,
‘আজ তোমার খবর আছে মেয়ে?’
‘কয়টার খবর বলে দেন সময় মতো টিভির সামনে বসে যাবো।’
‘শতবছরের পুরাতন বেডের এন্টারটেইনিং খবর। যেটা মিড নাইটে শুরু হয়।’
জিয়ানা রাগী চোখে তাকায়।
‘ভাই আপনারা কানাকানি বাসায় যাইয়া কইরেন আমার বউরে দেখার ব্যাবস্থা করেন?’
আকাশ নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে।নিবিড় পকেটে যা ক্যাশ ছিলো সব জিয়ানার হাতে দিয়ে বলে,
“সবাই টাউন হলের সামনে অপেক্ষা করছে ঘন্টাখানেক থেকে।আমরা বের হচ্ছি।’
আকাশ সবার আগে উঠে দরজায় এসে বলে,
‘চলেন ভাই।’
‘তুই থাক।তোকে তিনদিন ছুটি দেয়া হলো।’
বলে জিয়ানাকে বলে চলো।জিয়ানা গাইগুই করলেও কাজ হয় না। নিবিড় তাকে নিয়েই বের হয়ে আসে।
পেছন থেকে এসে মক্কু বলে,
‘এতক্ষন বউয়ের মুখ দেখার জন্য ছটফট করলি এখন আবার না দেখেই উঠছিস যে? ‘
আকাশ মাথা চুলকিয়ে বলে,’ভাই এইবার হালকা লজ্জা লাগতাছে।’
‘তাহলে চল বউ এখানে থাক আমরা চলে যাই?’
‘বাসর করেই যাই ভাই।কি আর আছে জীবনে? মাত্র একটা বিয়েই করলাম।’
মক্কু অট্টহাসি দিয়ে বলে,
“‘সর্দি লাগাইস না আবার? আল্লাহ হাফেজ। ‘
মক্কু যে তার কথা তাকেই ফিরিয়ে দিলো আকাশ খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে।
আকাশ ঘুরে মিমের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় তার মা মুখের ঘোমটা উঠিয়ে মিমের হাত ধরে কথা বলছে।
হালকা পাউডার পড়ায় শ্যামা থেকে উজ্জ্বল শ্যামা লাগছে।গাঢ় কাজলে চোখের আয়তন বড় লাগছে বেশ।সাথে লাল টকটকে ফুলো ঠোঁটে বেশ মোহনীয় বধূ লাগছে মিমকে।
আকাশকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মিম দ্রুত মাথা নিচু করে ফেলে।এটা তার বর ভাবতেই তো ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।কিছুদিন আগে ক্যাম্পাসের মাঠে এক ছেলেকে এমন ভাবে পিটাচ্ছিলো যেটা দেখেই মিমের জান বের হয়ে যাওয়ার জোগার এর সাথে সে সংসার করবে কিভাবে আল্লাহ মালুম।
আকাশের মা মিসেস রত্না এগিয়ে বলে,
‘প্রিপারেশ ছাড়া যেহেতু বিয়ে হলো তাই মিমকে আমরা নিয়ে আর যাচ্ছি না।তোর আব্বুকে বুঝিয়ে পরে ভালো ভাবে উঠিয়ে নেয়া যাবে।আর আত্মীয় স্বজনের ব্যাপার আছে না?
‘আম্মু এইসব বাকতাল্লা পরে হবে।আমার বউকে রেখে যাবো না।প্লিজ? আর আংসাং কথা বলার কি দরকার।যত বেশি কোটেশন তত বেশি কনফিউশান। নিয়ে চলো।তোমার হাজবেন্ড পরে আরও বেশি ঝামেলা করবে।তারচেয়ে ভালো একদিনেই সব ঝামেলা মিটে যাক?’
‘চুপ আস্তে কথা বল।আমি দেখছি।বউকে যে নিবি রুমের হাল তো চিরিয়াখানা করে রেখে এসেছিস।লজ্জা করবে না?’
‘এইজন্যই তো দ্রুত বউ লাগবে। ঘরটাকে মানুষ বানাবে।’
‘আর তোকেও।’
আকাশ বোকা হাঁসে।
মিমকে নিয়ে যখন আকাশ তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রউনা হলো তার মনের উঠানে হাজার প্রজাপতির উড়াউড়ি চলছে।কিন্তু সে কোন কিছুই প্রকাশ করতে পাচ্ছে না।আসলেই প্রাপ্তির আনন্দো যখন তীব্র তখন সেটার প্রকাশ মানুষ বিস্ফোরণের মাধ্যমে করতে পারে না।বরং চুপচাপ থেকেই ব্যাপারটা মনে মনে অনুভব করার চেষ্টা করে। আর নিশ্চিত হয় ,আদৌতে যা ঘটেছে সব সত্যি কিনা।
ঝিনুক মিশ্রিত বালুর বিচ ,পাশে গাঢ় নীল সমুদ্রের উত্থাল ঢেউ।ঝিরিঝিরি শালবনের বাতাসে চুল উড়ে মুখে এসে আছড়ে পড়ছে বারবার।সামনেই বিশাল বড় লাভ শেপ বানানো।যেটা টকটকে লাল গোলাপ দিয়ে তৈরি। মাঝখানে প্রিন্টের ফিরোজা কালারের পাতলা শার্ট আর সাদা শর্ট পড়া নিবিড় দাঁড়িয়ে।বুকের কাছে শার্টের তিনটা বোতাম হা করে খোলার কারণে পেশিবহুল শরীর উঁকি মারছে।
ফিরোজা কালারের সেমি গাউন পড়ে উন্মুক্ত পায়ে জিয়ানা দৌঁড়ে নিবিড়ের কাছে লাভ শেপের বাহিরে দাঁড়ায়।জিয়ানার শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত উঠা নামা করছে।নিবিড় কি তাকে তবে শেষমেশ সেই ম্যাজিক ওয়ার্ডটা বলবে?এরমাঝেই নিবিড় দুই হাত মেলে চিল্লিয়ে বলে উঠে ,
‘আমার জিয়নকাঠি আমি তোমাকে ভালো…..’
বলার আগেই পেছন থেকে কেউ করুন সুরে ডাক দেয়। জিয়ানা দ্রুত ঘুরে দেখে ,শুভ্র কাপড়ে খোলা চুলে নীলুফা ইয়াসমিন হাত মেলে দাঁড়িয়ে আছে।হাতের ইশারায় নিজের দিকে ডাকছে।জিয়ানা খুশিতে কেঁদে উঠে।আম্মু বলে ফুপিয়ে তীব্র ঝাকুনি দেয় শরীর।
পেছনে আবার নিবিড় ডাকে,’চাঁদ?’
জিয়ানা নিবিড়ের দিকে ঘুরে যায়।
নীলুফা ইয়াসমিনের পেছনে এবার সাগর হক আর নীলয় এসে দাঁড়ায়।তারা সমসুরে ডাকে তাকে।জিয়ানা মন্ত্রপুতের ন্যায় তাদের দিকে পা বাড়ায়।
কি মনে করে আবার নিবিড়ের দিকে ফিরে।দূরে নিবিড় প্রবল ভাটায় ভেসে তলিয়ে যাচ্ছে গভীরে সমুদ্রে।জিয়ানা নিবিড়ের দিকে ছুটে যায়।কি ভেবে আবার নীলুফার দিকে তাকিয়ে দেখে তারাও বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।সামনে পেছনে তাকাতে তাকাতে জিয়ানা একসময় দেখে আর কেউ নেই।ধূ ধূ প্রান্তরে সে একা।নিঃস্বঙ্গ। মাথার উপরে শকুন উড়ছে দলে দলে।বড় একটা শকুনের থাবা তার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে।জিয়ানা দুইহাতে চোখ ঢেকে চিল্লিয়ে উঠে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষেও জিয়ানা কুলকুল করে ঘামছে।জিয়ানার চিৎকারে নিবিড় ধুরমুর করে উঠে বসে পাশ ফিরেই জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। জিয়ানা কাপছে রীতিমতো। এখনো তার ঘোর কাটেনি।নিবিড়কে ধরেও চিল্লাচ্ছে সুখ সুখ বলে।”যাবেন না যাবেন না। আমাকে একা রেখে আপনারা যাবেন না।”
নিবিড় রিমোট হাতরে লাইট অন করে দেয় রুমের।বেডসাইড টেবিলে থেকে পানি নিয়ে জিয়ানার মুখে পানির প্রলেপ দেয় আলতো করে। মাথায় চুমু দিয়ে হালকা শেইক করে ডাকে বার কয়েকবার।জিয়ানা থিতু হতে সময় নেয় মিনিট পাঁচেক।
মেয়েদের সেনসিটিভনেস সর্বোচ্চ হয়।কথায় আছে নারীর অনুমান পুরুষের নিশ্চিত হওয়ার চেয়েও বেশি সত্যি।তবুও স্বপ্ন তো স্বপ্নই।নিবিড় জিয়ানাকে পাজা কোলে করে নিয়ে বারান্দায় দোলনায় বসে।আস্তে করে দোল দিয়ে বলে,
‘এইজন্যই বলেছিলাম ওযু করে ঘুমাও।খারাপ স্বপ্ন দেখেছো তাই না?’
জিয়ানা মাথা নাড়ে।চোখ মুদে নিবিড়ের প্রসস্থ বুকে চুপটি করে পড়ে থাকে।সেই বুকে নাক ডুবিয়ে টেনে নেই নিজের সবচেয়ে পছন্দের ফ্রেগেন্স।স্বপ্নই ছিলো সেটা।এইতো সুখ তার কাছে।সে সুখের বুকে।
নিবিড় জিয়ানার মাথায় ওষ্ঠাধর ছোঁয়ে বলে,
‘জীবনের কিছু কিছু হিসেবে আমি মার খেয়ে গেছি জিয়ানা।আজকে আবার নতুন করে আরেকটা খেলাম।’
জিয়ানা মুখ তুলে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে দেখে নিবিড় জিয়ানার ভরাট চোখে চুমু এঁকে বলে,
‘দুনিয়াতে সবচেয়ে খতরনাক পেশা হচ্ছে পলিটিক্স। এই পেশায় কারো জীবনের পাঁচ মিনিটের গ্যারান্টি নেই।’
‘সেটা তাবদ দুনিয়ার কারোরই নেই সুখ।’
‘হুম তবুও একটা সেফটি মেইনটেইন করে মানুষ চলতে পারে।কিন্তু আমাদের কোন সেফটি নেই।ঘাটেঘাটে শত্রুর জন্ম দিয়ে রেখেছি।ঘরে বাহিরে,নিজ পার্টিতে ,শত্রুর পার্টিতে। আমাদের কোন সোলমেট হয় না।কিন্তু আমার কাছের ছেলে গুলা কিভাবে যেনো আমার ভেতরে ঢুকে গেছে।’
‘আপনি কি মক্কু ভাই ,আকাশ আর তালহার কথা বলছেন?’
‘হ্যাঁ।সবচেয়ে পাগলাটে হচ্ছে আকাশ। ‘
‘কি নিয়ে আপনি ভয় পাচ্ছেন বলুন তো?’
‘আমাদের সাথে কাকতালীয় ভাবে তোমরা তিনজন মেয়ে জড়িয়ে গেছো।এইজন্য ভয় হচ্ছে।আজকে হঠ্যাৎ আমার একজন প্রিয় ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে।সৌভিক ভাই।উনি আমার পলিটিকাল ক্যারিয়ারের আইডল ছিলেন।’
‘ছিলেন?’
‘হুম। উনাকে খু*ন করা হয়।’
জিয়ানা নিবিড়ের কাছ থেকে উঠে সোজা হয়ে বসে।নিবিড় আবার টেনে এনে কাছে নিয়ে বলে,
‘সৌভিক ভাইকে জ্যান্ত টুকরা টুকরা করা হয়েছিলো।তারপর সেই টুকরা জলন্ত ইটের ভাটার আগুনে ফেলা হয়।তার চিহ্ন নিশ্চিহ্ন করার জন্য।আমি তখন মাত্রই ক্লাবে জয়েন্ট করেছি।সেই কি তেজ আর ব্যাক্তিত্ব ছিলো উনার।উনি মার্কসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।যাকে কমিউনিস্ট বলে।ডেমোক্রেসি উনি পছন্দ করতেন না।’
‘মার্কসবাদ মানে কার্ল মার্কসের পুঁজিবাদীর বিরুদ্ধে তত্ত্বটা?’
‘হুম তবে সৌভিক ভাই টোটালি মার্কিসবাদের উপর চলতেন না।উনার এক্টিভিটি ছিলো সমাজতন্ত্রের উপর বেশি।সমাজের নিপিড়ীত মানুষের উন্নয়ন করা।এখানে পুঁজিবাদীর তত্ত্বটার তেমন জায়গা পেতো না।’
‘ওয়েট মার্কসবাদের মূলমন্ত্রই তো পুঁজিবাদীর বিরুদ্ধে ছিলো।মালিক আর শ্রমিক শ্রেনীর বৈষম্য নিয়ে। রাইট?’
‘হ্যাঁ কিন্তু জাতিগত আর দেশগত পার্থক্যের কারণে এর ধারারও পার্থক্য আছে।আমাদের দেশের বামদের উদ্দেশ্য ছিলো সামাজিক সমতা।’
‘বুঝতে পেরেছি।কিন্তু সৌভিক ভাইকে এইভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করার কারণ কি শুধুই বামপন্থী করার জন্য?
‘না উনি অনেক ধার্মিক আর সৎ ব্যাক্তি ছিলেন।উনারা যে আন্দোলন জাগিয়ে তুলেছিলেন সেটা তখনকার ক্যাম্পাসের পরিবেশই বদলিয়ে দিয়েছিলো।কিন্তু পদ আর ক্ষমতার লোভে সৌভিক ভাইয়ের দলের লোকেরাই বেইমানি করে।সৌভিক ভাই বিরোধীদলের সাথে আঁতাতবদ্ধ হননি।সাথে তার দলের লোকদের আসলে চেহারাও চিনে ফেলেছিলেন।আর এইজন্য ফজররের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরার পথে উনাকে কিডন্যাপ করে হত্যা করা হয়।এর দুই দিন আগে আমাকে বলেছিলেন
“নিবিড় তুই অর্জিনালি যা সেটা কাউকে কখনোই বুঝতে দিবি না।যতই সোলম্যাট হোক। তোর ব্যাক্তিগত সম্পদ যেমন একমাত্র তোর কাছেই নিরাপদ তেমনই তোর গোপন উদ্দেশ্য আর চিন্তাধারা একমাত্র তোর কাছে সিকিউর।মানুষ অনেক কৌতুহলী প্রাণী। তাদের কৌতুহল যতক্ষণ না মিটবে ততক্ষণ তারা তোকে যুগিয়ে চলবে। কৌতুহল মিটে গেলেই তোকে ছুড়ে ফেলবে ভাগাড়ে।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিবিড় আবার বলে,
“সৌভিক ভাইয়ের প্ল্যান ,বিবেচনা আর বিচক্ষণতা চমৎকার হলেও উনি ছিলেন একেবারেই সহজলভ্য। প্রচন্ড মিশুক।যে কেউ যখন তখন চাইলেই উনাকে পাশে পেতো।’
‘আমাকে হঠাৎ এত কথা বলার কারণ? ‘
‘তোমাকে বাহির থেকে এ টু জেট পড়া যায় জিয়ানা।এত মিশুক কেনো তুমি?’
জিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।জিয়াউলও তাকে এই কথা বলতো।
রাতের শেষভাগ চলছে। নিগুঢ় অন্ধকারের সাথে থৈথৈ নিস্তব্ধতায় ঘেরা নূর ম্যানসন।সংগোপনে দরজা খোলে বেড়িয়ে যায় নিবিড়।
জিয়ানাকে বহু কষ্টে ঘুম পাড়িয়েছে একটু আগে।পলিটিক্স নিয়ে হাজার খানেক প্রশ্ন করেছে নিবিড়কে।মেয়েটার কৌতুহল আকাশচুম্বী। প্রশ্নের উত্তর না দিলেন নিবিড়ের বুকে কাতুকুতু দেয়া শুরু করে। এতদিনে সে নিবিড়ের উইক পয়েন্ট খুঁজে পেয়েছে।সারাশরীরের নানাভাবে সুড়সুড়ি দিয়েও নিবিড়কে টলাতে পারেনি।কিন্তু পরশু হঠাৎ নিবিড়ের নিপলে হাত লাগায় গায়ে কাটা দিয়ে উঠায় জিয়ানার সে কি সেলিব্রেট।এখন ব্ল্যাকমেইল করার একটাই রাস্তা।
স্টাফদের স্টোর রুমের একটা পুরাতন টেবিলের সামনে সেফটি গগলস ,আর হ্যান্ড গ্লাভস পড়ে মেহেদী দাঁড়িয়ে আছে। টেবিলের উপর কিছু আয়না ,স্ট্যান্ড ,সাদা খাদি কাপড় আর প্রিজন রাখা।নিবিড় দরজায় ট্যাপ করে প্রথমে জোরে টোকা,এরপর দ্রুত দুইবার টোকা শেষে তিনবার আস্তে করে টোকা দেয়ার পর দরজা খুলে দেয় মেহেদী।
নিবিড়কে গগলস দেয় একটা। নিবিড় সেটা হাতে নিয়ে পড়তে পড়তে বলে রাফিন কই?
‘তার বাপের এগেইনষ্টে যুদ্ধে নামছি তাকে কি এসব জানানো ঠিক হবে?’
‘যুদ্ধের মাঠে নিজ দলের লোককেই শত্রু ভাবিস তবে শত্রুর দিক থেকে নজর দূর্বল হয়ে যায়।ফোন দে কুইক।’
মেহেদী রাফিনকে ফোন দেয়ার মিনিট পাঁচেক পর রাফিন হাজির হয়।তিনজনই গগলস পড়ে নেয়।মেহেদী বলে,
‘সামিকে দিয়ে যেহেতু কোন কাজ হলো না তাই আমি এই জিনিসটা এপ্লাই করবো।কাজ হওয়ার সম্ভাবনা ফিফিটি পার্সেন্ট। যদি ফায়ার ধরে যায় তোরা দ্রুত জানালা দিয়ে বেড়িয়ে যাবি।’
‘গো এহেড ‘বলে নিবিড় মেহেদীর কাছে এসে দাঁড়ায়।
‘আমি আলোর বিচ্ছুরণের মাধ্যমে এই কাপড় থেকে কালার আলাদা করে সেটার প্রতিফল ওই সাদা কাপড়ে ফেলবো।এটা হচ্ছে কচির সূত্রের বাস্তব প্রয়োগ।সাদা আলোকরশ্মির প্রতিসরাঙ্কও ভিন্ন ভিন্ন হয়….
‘ভাই আমরা পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র না।তুই তত্ত্বের জ্ঞান দিলেও মাথায় ঢুকবে না।রেজাল্ট দেখা।’
বলে উঠে রাফিন। নিবিড় ও মাথা নাড়ায়।
মেহেদী স্যাটানিজমের সেই খাদি কাপড়টা বিছিয়ে দেয় টেবিলের মাঝ বরাবর। তারপর দ্রুত স্ট্যান্ডের মিরর আর প্রিজন সেটার উপর সেট করে অল্প বাকিয়ে দেয়। সেই মিরর থেকে পয়তাল্লিশ ডিগ্রী এংগেলে আরেকটা মিরর সেট করে। সেটাও পয়তাল্লিশ ডিগ্রী এংগেলে এমনভাবে রাখে যেটা টেবিলের শেষ প্রান্তে রাখা খালি কাপড়ের উপর পড়ছে।মেহেদী সব সেট করে রুমের লাইট সব বন্ধ করে দেয়।
কাপড় থেকে আস্তেধীরে আলো বের হচ্ছে।মিনিট খানেক পর পুরো রুম আলোকিত হয়ে উঠে সেই আলোয়।প্রথম মিরর থেকে আলোর রেখা দ্বিতীয় মিররে পড়ছে তীর্যক ভাবে।সেখান থেকে প্রতিফলিত হয়ে আলো ছড়িয়ে বিভিন্ন রংয়ের আলো গিয়ে পড়ছে সাদা কাপড়ের উপর। মেহেদী জটপট সেই কাপড়ের ফটোগ্রাফি শুরু করে। কয়েকসেকেন্ড পরেই প্রথম মিরর চৌচিড় হয়ে শব্দ করে ফেটে যায়।এরপর দ্বিতীয় মিররের একই হাল হয়।আর সবশেষে খালি কাপড়ে দাউদাউ করে আগুন লেগে যায়।পাশ থেকে কার্বন গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে নিবিড় সেটা নিভিয়ে দেয়।পুরো ঘটনাটা ঘটে দুই মিনিটেরও কম সময়ের মাঝে।
রাফিন বলে ‘কি হলো এটা? এগুলা তো আমরা ছোট বেলায় খেলতাম।মিরর সূর্যের আলোতে ধরে আগুন জ্বালাতাম।’
নিবিড় রাফিনে কাধে হাত রেখে বলে,
নীতিহীন রাজ পর্ব ৭০
‘রিল্যাক্স এখানে অন্য একটা ব্যাপার আছে।ফটো গুলা দেখা?’
মেহেদী মুচকি হেঁসে বলে,
‘আগে আমাকে সম্পত্তি সব লিখে দে।’
নিবিড় এসে গলা টিপে ধরে বলে,
‘সম্পত্তি তোর ওইদিক দিয়ে দিবো নিমোখারাম। ফটাফট দেখা।’
মেহেদী কাকিয়ে উঠে বলে,
‘যেদিক দিয়েই দিবি দে।তবুও দে প্লিজ?’
রাফিন এসে মাথায় গাট্টা মেরে বলে,
‘যে কেউ উঠে পড়তে পারে তাড়াতাড়ি শেষ কর।’
মেহেদী ক্যামেরার ছবি বের করার সাথে সাথেই তিনিজনের মুখ হা হয়ে যায়।ছবিতে বিভিন্ন রংঙের ইংরেজি লেটার হাই লাইট করা একটা মেসেজ।
