Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪ 

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪ 

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪ 
তেজরিন উম্মীদ

–পরদিন —
আজ ফারাজের আগে শেরের ঘুম ভেঙেছে । ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শান এসে হাজির। শেরকে টেনেহিঁচড়ে বিছানা থেকে তুলল সে। এত সকালে ঘুম থেকে ওঠার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে না থাকলেও, শানের বিশাল বড় সারপ্রাইজ এর কথার দাপটে শেষমেশ হার মানতে হলো শেরকে। অগত্যা আড়মোড়া ভেঙে সে শানের সঙ্গেই ঘর ছাড়ল।
খানিক বাদে ফারাজ যখন চোখ মেলল, দেখল পাশের জায়গাটা শূন্য। প্রতিদিন যেখানে শেরের অঘোর ঘুম দেখা যায়, আজ সেখানে কেবল তার বালিশ টা আছে। বালিশের মালিক নেই। ফারাজ মনে মনে কিছুটা অবাকই হলো।ছেলেটা তবে আজ নিজেই উঠে পড়েছে! আড়ষ্টতা কাটাতে গলা ছেড়ে কাজের মেয়ে মিনাকে ডাকল সে।

“মিনা! এই মিনা!”
কয়েকবার ডাকার পর মিনা ব্যস্ত পায়ে দরজায় এসে দাঁড়াল, “জ্বি ভাইজান?”
“শের কোথায়?”
“আজ্ঞে, ও তো শান ভাইজানের সাথে নিচে আছে।”
ফারাজ মাথা নাড়িয়ে ইশারায় মিনাকে বিদায় দিল। বিছানায় বসে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইল সে। এলোমেলো চুলগুলো মাথার ওপর পাখির বাসার মতো জট পাকিয়ে আছে। আধবোজা চোখের কোণে এখনো লালাভ ভাব, ঘুমের ঘোরটা ঠিক কাটতে চাইছে না। একটা দীর্ঘ হাই তুলে অবশেষে বিছানা ছাড়ল সে। ওয়াশরুম থেকে ব্রাশ মুখে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে এলো।

ওদিকে নিচে ড্রয়িং রুমের দৃশ্যটা বেশ অদ্ভুত। সোফায় বসে আয়েশ করে কফিতে চুমুক দিচ্ছেন রাইমা খান। আর তার সামনেই চলছে তুঘলকি কাণ্ড! শান আর শের যেন কোনো এক আনন্দে আত্মহারা। কোমড় দুলিয়ে ‘ঢিংকাচিকা’ স্টাইলে তারা ডিস্কো ডান্স দিচ্ছে। রাইমা খান ছেলের আর নাতির সেই অদ্ভুত নাচ দেখে মিটিমিটি হাসছেন।এরা এভাবে কোমর দুলিয়ে নাচছে কেন? তাদের মনে এত রং লাগায় কারণটা কি? এমনিতে এই দুই মানিকজোড় এক হলে দিলে রংঙ লেগেই থাকে, কিন্তু আজ যেন একটু বেশিই রঙ লেগেছে মনে হচ্ছে।
ফারাজ ব্রাশ মুখে নিয়ে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ লক্ষ্য করার পর মুখভর্তি ফেনা নিয়েই অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল, “বানরের মতো লাফাচ্ছিস কেন তোরা?”

ওর কথায় ভ্রূক্ষেপ নেই কারও। তারা নাচ আর হাসিতেই মত্ত। শের লাফাতে লাফাতে হি হি করে হেসে বলল, “কংগ্রেস পাপা! হি হি হি… কংগ্রেস!”
ফারাজ হা হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল,এমন কোন মহাযুদ্ধ সে জয় করেছে যে তাকে এভাবে উগান্ডা স্টাইলে নাচের মাধ্যমে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে? ব্রাশটা মুখ থেকে বের করে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করল,
“কিসের জন্য অভিনন্দন দিচ্ছ?”
শের এর কাছ থেকে উত্তর আসার আগেই শান ফোড়ন কাটল,
“কংগ্রাচুলেশনস ভাইয়া! তোমার তো একদম কপাল খুলে গেছে। মিষ্টি খাওয়াও দেখি, মিষ্টি!”
ফারাজ এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
“আগে এটা বল যে আমি ঠিক কোন দেশ জয় করেছি যে তোদের এই আয়োজন? অন্তত আমারও জানা উচিত কেন আমি কংগ্রেস পাচ্ছি। তবে তোদের এই ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়! নিশ্চয়ই কোনো ঝামেলা পাকিয়েছিস যার জন্য তোরা এত খুশি।”
শানের নাচ থামিয়ে দিল। গান বন্ধ করে সে স্পিকার অফ করে দাঁড়াল।চেহারায় সেই উপচে পড়া আনন্দটুকু এখনো রয়ে গিয়েছে। সে বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল,

“ভাইয়া, তোমার জন্য একটা লাভ বাজ খবর আছে!”
“লাভ বাজ?”
ভ্রু কুঁচকে তাকালো ফারাজ। শব্দটা তার কানে ঠিক জুতসই ঠেকল না।
শান দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বলল “হ্যাঁ ভাইয়া, লাভ বাজ! তোমার তো আইবুড়ো জীবনের টিকিট কাটা শেষ। ড্যাড ফিরলেই তোমার এনগেজমেন্টের ডেট ফাইনাল করা হবে। তোমাকে যে ভাবি রিজেক্ট করেছিল, সে-ই তোমাকে আবার একসেপ্ট করে নিয়েছে। তুমি তো আর সিঙ্গেল থাকছ না ভাইয়া!”
ফারাজ যেন আকাশ থেকে পড়ল। ওই বেয়াদব মেয়েটা বিয়েতে রাজি হয়েছে?বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে সে চিৎকার করে উঠল, “কীহ!”
সে এবার সোফায় বসা মায়ের দিকে ফিরে বলল, “পাগলটা এসব কী আবোল-তাবোল বকছে, আম্মি?”
রাইমা খান কফির মগটা নামিয়ে রেখে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,

“মিছে কিছু বলছে না ও। রুশদী বিয়েতে মত দিয়েছে। তোমার ড্যাড ফিরলে আমরা এনগেজমেন্টের কথা পাকাপাকি করব।”
ফারাজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।এই মেয়েকে তো ফারাজ বিয়ে করছে না। তীব্র জেদ আর ঘৃণা নিয়ে সে ফেটে পড়ল,
“ওই মেয়েকে আমি কোনোভাবেই বিয়ে করব না, আম্মি!”
রাইমা খান এবার তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন
“কেন করবে না?”
“ওই মেয়ে আমাকে অপমান করেছে! সে বলেছিল রাস্তার পচা মুলাকে বিয়ে করবে, তবুও আমাকে করবে না। আমি এই মেয়েকে বিয়ে করব না মানে করব না! একটা ঘাউড়া, বেয়াদব মেয়ে।ওকে আমার একদম পছন্দ না।আই জাস্ট হেট হার।”
রাইমা খান শক্ত গলায় বললেন,
“জেদ দেখিয়ে লাভ নেই ফারাজ। এবার তোমার জেদের তোয়াক্কা আমরা কেউ করব না। তোমাকে রুশদীকেই বিয়ে করতে হবে।”
ফারাজ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলল, “বললাম তো ওই মেয়ে আমার পছন্দ না! আই জাস্ট হেট হার! ও একটা ইডিয়ট!”
ছেলের একরোখা স্বভাব রাইমা খানের নখদর্পণে। তিনি জানেন, ফারাজকে কাবু করতে হলে তার মতোই কথা বলতে হবে। তিনি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। চোখের মনিতে কাঠিন্য নিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।
ঘর কাঁপিয়ে এবার গর্জে উঠলেন রাইমা খান,

“পছন্দ-অপছন্দের কথা বলছ? জুনিয়াকে তো অনেক পছন্দ করে বিয়ে করেছিলে, লাভটা কী হলো? তোমার লাইফটা হেল করে দিয়ে চলে গেল সে। আর এই যে শের, সে কি নিজের মায়ের ভালোবাসা পেল?পেলনা। তাই বাদ দাও তোমার পছন্দের কথা। নিজের পছন্দ সম্বন্ধে আর কিছু বলার আছে তোমার?”
মুহূর্তেই ফারাজ যেন পাথর হয়ে গেল। মায়ের ছুড়ে দেওয়া শব্দগুলো তার বুকে তীরের মতো বিঁধল।মাও তার অতীত নিয়ে কথা শোনাল?তার সমস্ত জেদ আর বাক্যবাণ এক লহমায় হারিয়ে গেল। বলার মতো আর কোনো ভাষা খুঁজে পেল না সে।তার এই অতীতের কাছে সে হার মানতে বাধ্য। চোখ জোড়া বন্ধ করে এক দীর্ঘ, তপ্ত নিঃশ্বাস নিল। কয়েক মুহূর্ত পর নিজেকে কিছুটা শান্ত করে ধরা গলায় বলল,

“আম্মি, তোমাকে বলেছিলাম না শেরের সামনে ওই মেয়ের নাম না নিতে? আমি চাই না শের কোনোদিনও তার নাম জানুক।”
চুপি সুরে বলল ফারাজ, শেন শের শুনতে না পায়।
রাইমা খানও মুহূর্তে উপলব্ধি করলেন,জুনিয়ার নামটা নেওয়া ঠিক হয়নি। পুরনো ক্ষতকে এভাবে খোঁচানো উচিত হয়নি তার। তবে নিজের কঠোরতা তিনি হারালেন না। ফারাজকে দমানোর জন্য তিনি নিজের রাগটুকু ধরে রেখেই বললেন,
“শেরের এত ভালো যদি চাও, তবে ওকে আর এভাবে কষ্টে রেখ না ফারাজ।”
মায়ের কথায় ফারাজ থমকে গেল। আহত গলায় বলল,

“আম্মি! আপনি বলতে চাচ্ছেন আমি শেরকে ভালোবাসি না? আমি আমার ছেলেকে কষ্টে রাখি?”
“কথার উল্টো মানে বুঝ না ফারাজ। আমি তেমন কিছু বুঝাইনি।” রাইমা খান কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, “শেরের একজন মা প্রয়োজন। বাবা হিসেবে তোমার একার ভালোবাসা ওর জন্য যথেষ্ট নয়।”
ফারাজ একগুঁয়ে স্বরে উত্তর দিল, “আমিই ওর মা, আমিই ওর বাবা। আমি একাই ওর জন্য সব।”
“আবেগী কথা বল না ফারাজ, আবেগ দিয়ে দুনিয়া চলে না।মা আর বাবা কখনো একজন হতে পারে না। বাবার চেয়েও এখন ওর মায়ের মমতা বেশি প্রয়োজন। তুই ওর অভাব কী করে বুঝবে? তোমার তো মা-বাবা দুজনেই আছে। তুমি শৈশব থেকে দুজনের ভালোবাসাতেই বড় হয়েছ। কিন্তু ওর জীবনে মায়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। তুই যদি মা-বাবা দুজনের ভালোবাসা পেতে পার , তবে ও কেন পাবে না? ওর দোষটা কী? ও কী এমন পাপ করেছে যে সারাজীবন এই অভাবের ফল ভোগ করবে? বল তুমি!”
ফারাজ বুঝতে পারল সে যুক্তিতে হেরে যাচ্ছে। অসহায়ভাবে বলল, “আম্মি, আপনি আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করছেন।”

“এটা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল নয় ফারাজ, এটাই বাস্তবতা। আমি শুধু তোকে বাস্তবতা দেখাচ্ছি।”
ফারাজ পাল্টা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই খান বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে উঠল শেহজাদ খানের গম্ভীর কণ্ঠস্বরে,
“শান? তুমি দেশে এসেছ কার অনুমতি নিয়ে?”
শেহজাদ খানের বজ্রকণ্ঠ উপস্থিত সকলের কানে পৌঁছাতেই সবাই সদর দরজার দিকে তাকাল। শুভ্র সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত শেহজাদ খান দুই হাত পেছনে রেখে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করছেন। তার চোখেমুখে গাম্ভীর্যের সঙ্গে চাপা রাগের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
তাঁকে দেখেই শানের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ড্যাডের এই ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে যেন জ্যান্ত বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। না বলে দেশ চলে আসার শাস্তি হিসেবে ড্যাড তাকে আজ আস্ত রাখবে না। শান শুকনো মুখে অসহায়ভাবে মা আর বড় ভাইয়ের দিকে তাকাল।

রাইমা খান দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এলেন। তিনি শক্ত গলায় বললেন, “দেশে কেন এসেছে মানে? ওর একমাত্র বড় ভাইয়ের বিয়ে, আর ও আসবে না? এ কেমন কথা বলছেন আপনি!”
শেহজাদ খান স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন। তারপর বললেন, “ঠিক আছে, বুঝতে পেরেছি।”
শেহজাদ খান ধীরপদে এগিয়ে এসে সোফায় বসলেন। ফারাজ, শান আর শের তিনজনই একসাথে তাঁকে সালাম দিল। গত চারদিন ধরে কাজের প্রয়োজনে শহরের বাইরে ছিলেন তিনি, আজ ফিরলেন। পায়ের ওপর পা তুলে বেশ গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে বসলেন শেহজাদ খান। তারপর সরাসরি ফারাজের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“বিয়ের শপিং শুরু করে দিয়েছ?”
ফারাজ শান্ত গলায় উত্তর দিল, “না।”
“কেন?”
শেহজাদ খানের সামনে নিজের অমত গোপন রাখল। বলল, “ভাবলাম আগে এনগেজমেন্টের তারিখটা ঠিক হোক, তারপর সবকিছু একবারে শুরু করব।”
শেহজাদ খান মুহূর্তকাল স্থির থেকে বললপন, “পরশু তোমাদের এনগেজমেন্ট। আর ১০ তারিখ থেকে বিয়ের যাবতীয় প্রোগ্রাম শুরু হবে। ডেট একদম ফিক্সড, ওকে?”
ফারাজের মনে হাজারো আপত্তি থাকলেও বাবার মুখের ওপর কথা বলল মা। সে মাথা নাড়িয়ে সায় দিল, “হুম।”

পড়ন্ত বিকেল। জানলার বাইরে রোদের তেজ তখন ম্লান হয়ে এসেছে। রুশদী নিজের পড়ার টেবিলে ঝুঁকে অংক কষছে। কপালের ফাটা জায়গাটা এখনো বেশ টনটন করছে, ব্যান্ডেজটা খোলা হয়নি। ক্ষতের সেই টিসটিসে ব্যথা নিয়ে অংকের জটিল হিসাবে মনোযোগ দেওয়াটা রুশদীর জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
বাড়ির পরিবেশটা আজ অদ্ভুত। বিয়েতে রাজি হওয়ার পর থেকে রুশদী যেন নাহিদার চোখের মণি হয়ে উঠেছে। কথায় কথায় মা ডাক আর আদরের কমতি নেই। আজ সকাল থেকে তাকে একটি কাজও ছুঁতে দেননি নাহিদা।এমনকি রান্নাঘরের চৌকাঠও মাড়াতে দেননি। নাহিদার এই আচমকা বদল দেখে রুশদী অবাক না হয়ে পারল না। মানুষ এক রাতের ব্যবধানে এতখানি বদলে যেতে পারে?
“আপু, আসব?”

নাহিদের কণ্ঠস্বরে রুশদীর ভাবনায় ছেদ পড়ল। অংকের খাতা থেকে সে মুখ তুলে তাকাল দরজার দিকে। সেখানে দাঁড়ানো নাহিদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “আয়।”
নাহিদ মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকল। একটা চেয়ার টেনে সে রুশদীর একদম গা ঘেঁষে বসল। রুশদী ছেলেটার দিকে তাকাল। পনেরো-ষোলো বছরের কিশোর নাহিদ সম্পর্কে তার সৎ ভাই।নাহিদার প্রথম ঘরের সন্তান। সেই সূত্রে রুশদীর সাথে তার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, অথচ তাদের আত্মার সম্পর্কটা বেশ গভীর। নাহিদা রুশদীকে দুচোখে দেখতে না পারলেও, নাহিদ তাকে বড় বোনের মানে। রুশদীও তাকে নিজের ছোট ভাইয়ের আসনেই বসিয়ে রেখেছে।
রুশদী পড়ার চেয়ারে পা গুটিয়ে আরাম করে বসল। ছোট ভাইয়ের বিষন্ন মুখটা দেখে নরম স্বরে প্রশ্ন করল,

“কিছু বলবি নাহিদ?”
নাহিদ কোনো উত্তর দিল না। সে মাথা নিচু করে নিজের আঙুলের নখ খামচাচ্ছে। ওর বসার ভঙ্গি আর নিরবতা বলে দিচ্ছে,ওর মনটা মোটেও ভালো নেই। রুশদী একটু ঝুঁকে ওর মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে দুষ্টুমি করে বলল,
“কী হয়েছে রে তোর? মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন?”
খানিকটা সময় নিস্তব্ধতায় কাটল। এরপর নাহিদ মাথা না তুলেই খুব নিচু স্বরে বলল,
“মন্ত্রীর বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল আপু। পরশু তোমার এনগেজমেন্ট, তারপরই বিয়ে…”
রুশদী ওর কণ্ঠের বিষণ্ণতা ধরতে পারল। সে জিজ্ঞেস করল, “কেন রে? আমার বিয়ে হচ্ছে তাতে তুই খুশি না?”
নাহিদ এবার মাথা তুলল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার নুইয়ে ফেলল। ধরা গলায় বলল, “খুশি হব না কেন? তুমি মন্ত্রীর বাড়ির বউ হবে, রাজসুখে থাকবে। আম্মার অত্যাচার আর তোমাকে মুখ বুজে সহ্য করতে হবে না,এই কথা ভাবলে আমি অনেক খুশি। কিন্তু…”

নাহিদ একটু থামল, তারপর কিছুক্ষণ নিরব থেকে বলল, “কিন্তু তুমি চলে গেলে আমি যে বড্ড একা হয়ে যাব আপু। এ বাড়িতে আমার কথা বোঝার মতো তো আর কেউ থাকবে না।”
ভাইয়ের কন্ঠের এই হাহাকার রুশদীর বুকেও গিয়ে লাগল। সে নাহিদের মাথায় হাত রেখে সস্নেহে বিলি কেটে দিয়ে মৃদু হেসে বলল, “পাগল ছেলে! আমি যেখানেই থাকি না কেন, তোকে অনেক মিস করব।”
“আমিও আপু, খুব মিস করব তোমায়।”
ছেলেটার চোখের কোণে জল জমতে শুরু করেছে দেখে রুশদী পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করল। সে ওর মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল।

“আহা! এত মিস করতে হবে না। তুইও বরং জলদি বিয়ে করে ঘরে কাউকে নিয়ে আয়। তখন দেখবি আর এই আপুর কথা মনেই পড়ছে না, বুঝেছেন জনাব নাহিদ শেখ?”
বড় বোনের এমন রসিকতায় নাহিদ বেশ লজ্জা পেল। সে মাথা চুলকাতে চুলকাতে আমতা আমতা করে বলল, “কী যে বলো না আপু!”
রুশদী হাসি থামাল না। সে হাসতে হাসতেই আরও বলল, “হয়েছে,কী যে বলো আপু! যত সব ঢং। ঘরে যখন নতুন বউ আসবে, তখন দেখবি আপুর কথা মনেই থাকবে না! কথাটা মিলিয়ে নিস তখন।”
রুশদীর সশব্দ হাসিতে নাহিদের ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। দুই ভাই-বোনের হাসাহাসিতে বিকেলের সেই বিষণ্ণ ঘরটা মুহূর্তেই আনন্দময় হয়ে উঠল।

রাত নয়টা। রাতোর হাওয়ায় ফারাজের বাইকটি পূর্বাচল এক্সপ্রেস দিয়ে আপন গতিতে ছুটে চলেছে। আজ রাস্তাটা রোজকার তুলনায় অনেকটা নির্জন। বাইকের ট্যাংকের ওপর ফারাজের সামনে বসে আছে ছোট্ট শের। শের সঙ্গে থাকায় ফারাজ গতি একদম কমিয়ে রেখেছে।তুই বাপ ছেলে মাঝে মাঝে এমন রাত্রি ভ্রমণে বের হয়। শের এর ভীষণ পছন্দ বাইকে ঘুরাঘুরি, এবং সেটা যদি হয় রাতের শহরে তবে তো কথায় নেই।
শেরের মাথায় তার মাপের একটা ছোট্ট হেলমেট। সে দু-হাত দুই পাশে ডানার মতো ছড়িয়ে দিয়ে হু হু করে বয়ে যাওয়া বাতাসকে অনুভব করছে। হঠাৎ সে বলে উঠল,

“থ্যাংক ইউ বাবা! থ্যাংক ইউ সো মাচ। আই লাভ ইউ সো মাচ, ভেরি মাচ, মোর মাচ, অনেক মাচ!”
ছেলের অদ্ভুত ও মিষ্টি কথা শুনে ফারাজ হেলমেটের ভেতরেই হেসে ফেলল। রুশদীর সাথে বিয়ের কথা পাকাপাকি হওয়া,এবং ফারাজের রাজি হওয়রা পর থেকে শেরের খুশির ঢল নেমেছে। সে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার বার বাবাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।আজ হয়ত, পৃথিবীর কোনো প্রান্তে শেরের চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ নেই। ফারাজের কাছেও জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিস হলো ছেলের এই অমলিন হাসি।

ফারাজ বিয়েটা সে করতে রাজি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রুশদীকে সে সহজভাবে ছেড়ে দেবে না। বিয়ের পর ওই মেয়েকে নিজের আঙুলের ইশারায় নাচিয়ে ছাড়বে। ও এই ফারাজকে এখনো চেনে না।
পাশে বাইকের ইঞ্জিনের গর্জনে ফারাজ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, সমান্তরাল গতিতে পাল্লা দিয়ে ধেয়ে আসছে শান। হেলমেটের কাঁচের ওপাশ থেকে তার পরিচিত কণ্ঠস্বরের চিৎকার ভেসে এলো, “হ্যালো!”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৩

শানকে দেখে ফারাজের কপালে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠল। এই ছেলেটার কি কোনো রাডার আছে? সে যে শেরকে নিয়ে আজ ৩০০ ফিটে আসবে, এই খবর শান পেল কোত্থেকে? নির্ঘাত পিছু নিয়েছে অথবা ট্র্যাকিং করছে। শানকে উপেক্ষা করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল ফারাজ, কিন্তু ততক্ষণে তার ঘোরাঘুরির ফুরফুরে মেজাজটা উড়ে গেছে।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪ (২)