তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৫
ঐশী আফরিন
শোঁ শোঁ করে বাতাস বইছে গাছ গাছালি জুড়ে। ঠান্ডা শীতল বাতাসে দাঁতে দাঁত লাগার জোগাড়। অপূর্ব দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ানদের বাড়ির সামনে। গরমের সিজনেও এমন ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাওয়ার কারণ সেই ঠান্ঠা বাতাস , যা বয়ে চলতো মাধবীর গা জুড়ে। আরিয়ান তাকে বিকালের দিকেই গ্রামে আসতে বলেছিলো। কিন্ত মন কে মানিয়ে আসতে আসতে রাত হলো। সে এখন ভীষণ ভাবে এড়িয়ে চলে আরিয়ান কে। কেননা তার সাধ্যি হয় না মাধবী আর আরিয়ান কে একসাথে দেখার। তাই চোখের আড়ালে থাকতে চায় সর্বক্ষণ। কেন ডেকেছে তাকে এখানে তা-ও তার অজানা। আরিয়ান আয়াজ দুজনেরই অনুপস্থিতিতে আরিয়ানের রাজনৈতিক দিক সহ সব কিছু তার আর অভিকেই সামলাতে হয়। সে চেয়েছিলো অভিকে পাঠাতে কিন্ত আরিয়ান বলেছে অভিকে ওদিকটা সামলাতে আর অপূর্ব কে এখানে চলে আসতে। আয়াজ এখন একেবারেই ভবঘুরে হয়ে গেছে।
সর্বক্ষণই বট তলায় বসে সিগারেট ফুঁকতে দেখা যায় তাকে। ইচ্ছেও নিজের মত চলছে। এত দিনেও তার আয়াজের প্রতি বিন্দু পরিমাণ মায়া দেখা যায় নি। এখনও তার চোখে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করে আরিয়ান। রুহিকে বিয়েও দিতে চেয়েছিলো মাঝে। কিন্ত বাঁধা হয়েছে স্বয়ং ইচ্ছে। এতদিনে ইচ্ছে আর রুহির মাঝে বেশ ভাব জমেছে। যেটা আগে ছিলো আরশি আর ইচ্ছের মাঝে। আরশি এখন পড়াশোনায় ব্যস্ত। সে বাড়ির সকলের অগোচরে চিঠি পাঠিয়েছিলো আয়াজের নানার বাড়ির ঠিকানায়। বলেছিলো তার একা বাড়িতে ভালো লাগে না ইচ্ছে আর রুহি যেন এসে দেখা করে যায়। কিন্ত ফখরুল ইশান এবং নমিতা ইশান কেউই রাজী হয়নি। তাই আরশির দিন একা একাই কেটে যাচ্ছে। অপূর্ব বলতে গেলে আরিয়ান দের বাড়ির সদস্যদের মতই সব সময় থেকেছে।
এখনও পাশে আছে। কিন্ত আরিয়ানের সাথে যোগাযোগ সীমিত করেছে। আরিয়ান টেলিফোন করলেও এটা ওটার অযুহাতে এড়িয়ে গেছে। কিন্ত এখন না এসে পারলোই না। নিজের আবেগ কে সংবরন করে বিবেক কে বুঝিয়েছে বন্ধুর বিপদে যদি পাশেই না থাকতে পারে তবে কীসের বন্ধুত্ব! এরকম আরো নানান অবান্তর ভাবনা ভাবতে ভাবতেই অপূর্ব ফটকে টোকা দেয়। দিতেই তা আপনা আপনিই খুলে যায়। অপূর্ব বেশ অবাক হয় এত রাতে মূল ফটক খোলা থাকতে দেখে। পরক্ষণেই ভাবে গ্রামের অবস্থা ভালো না। প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে তা দেখতেই হয়তো আরিয়ান বেরিয়েছে। সে মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে। দ্বিধা নিয়ে কয়েকবার অজয় কে ডাকার পরেও কোন সারাশব্দ পায় না। আরো কয়েকবার ডেকে আরিয়ানের দরজার দিকে পা বারায়।
বাড়িটা এতই নিস্তব্ধ হয়ে আছে যে মনে হচ্ছে কেউই নেই বাড়িতে। নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে। আরিয়ানের দরজার সামনে দাঁড়িয়েও কিয়ৎক্ষন দ্বিধায় ভোগে সে। দরজাটা হালকা ফাঁক করা। যদি ভেতরে মাধবী থেকে থাকে? সেই চিন্তায় আর পা বাড়ালো না। বাহিরে দাঁড়িয়েই আরো কয়েকবার ডাকলো। এবার চিন্তিত হলো সে। যদি ভেতরে কেউ থেকেই থাকে তাহলে এতক্ষনে সারা দিতো। কিন্ত মন মানতে নারাজ। যদি কোন অযাচিত দৃশ্যের সম্মুখীন হতে হয় সেই ভাবনায়। তাই এবার সাহস করে আরিয়ান কে না ডেকে মাধবীকে ডাকার চিন্তা করে। কিন্ত কী বলে ডাকবে? যাকে বউ করতে চেয়েছিলো তাকে ভাবী ডাকবে? দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। কয়েকবার দম নিয়ে দরজার হাতলে ধরে জোড়ে জোড়ে টোকা দেয়। এবারেও কারো সারা শব্দ না পেয়ে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে ফেলে। বিছানায় শুধু আরিয়ান কে সুয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে যায়। আশে পাশে কয়েক পল চোখ বুলিয়ে ধীরে ধীরে ডাকে ” রাণী কী ভেতরেই আছেন?”
নাহ কোন উত্তর নেই। সে বুঝলো মাধবী ঘরে নেই। তাহলে কী দুজন আলাদা থাকে? মনে মনে কিছুটা স্বস্তি পেল সে। পরক্ষণেই আবার নিজের ভাবনায় নিজেকেই ধিক্কার জানালো। বন্ধুর কথা না চিন্তা করে নিজের চিন্তা করায়। সে ধীরে আরিয়ানের শিয়রে গিয়ে বসলো। কাঁধের ব্যাগটা বিছানায় রেখে হাত টানা দিয়ে আরিয়ান কে ধাক্কা দিলো বার কয়েক। উঠতে না দেখে হাত টেনে মৃদু চেঁচিয়ে উঠলো “শালা মাল খেয়ে ঘুমিয়েছিস নাকি? এত ডাকার পরেও হুশ নেই? আরু? আবে এই আরিয়ানের বাচ্চা?”
তবুও আরিয়ানের কোন সারা না পেয়ে সে নিজ আসল সত্ত্বায় ফিরে এলো। আর যাই হোক গাম্ভীর্যতা সবার সামনে ধরে রাখা গেলেও যেই নারীর জন্য গম্ভীর হলো সেই নারীর স্বামীর সামনে ধরে রাখতে পারে না সে। আজ অনেকগুলো দিন পর বন্ধুর ঘুম ভাঙাতে আসলো। স্কুল, কলেজ এমনকি ভার্সিটিও দুজনে একই সাথে পড়েছে। এবং প্রতিটা দিন তাকেই আরিয়ান কে এসে ডেকে তুলতে হয়েছে। নয়তো মাসের মধ্যে আল্লাহর ত্রিশটা দিনই বান্দার সকালে উঠার খবর থাকে না। খুব ছোট্ট বেলার বন্ধু হিসেবে দুজনের অজস্র স্মৃতি পরে আছে অমুক স্কুল, অমুক কলেজ এবং অমুক ভার্সিটিতে। সম্পূর্ণ স্কুল জুড়ে তাদের বন্ধুত্বের গুন গান আজও গাওয়া হয় অফিস রুমে। টং দোকানের সেই বিরক্ত হওয়া বুড়ো লোকটা আজ বিরক্ত হচ্ছে তাদের অনুপস্থিতিতে। সেদিন রাস্তায় তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলো “কি ভায়ারা তোমাগো ছাড়া তো দোকানে বইবার মন চায় না। কই থাহো তোমরা? আহো না ক্যান আড্ডা দিতে?”
সেদিনের সেই কথা আঘাত হেনেছিলো তার সমস্ত হৃদয় জুড়ে। সত্যিই তো টং দোকানের বেঞ্চ গুলো এখন খালি পরে থাকে। কেউ তো আর যায় না সেখানে? সেদিন সে কোনভাবে উত্তর দিয়েছিলো “কাক্কু সবাই এখন যে যার মত ব্যস্ত আছে। যেদিন সবাই সময় পাবে সেদিন না হয় তোমার দোকান আবার জমজমাট হবে”
কথাগুলো হেসে বললেও হৃদয়ে এক ফালি আঘাত ছিলো সেদিন। আহ! কোথায় গেল সেই দিনগুলো? পুরনো কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অপূর্ব। কেননা এছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। পাশের টেবিল থেকে পানি নিয়ে আরিয়ানের চোখে ছিটিয়ে দেয়। তবুও কোন নাড়াচাড়া না দেখে গ্লাসে সব পানি ছেড়ে দেয় গায়ে। কিছুক্ষন পর ঘুমের ঘোড়েই আরিয়ান বিরবির করে উঠে “বালের যন্ত্রণায় ঘুমাইয়াও শান্তি নাই। বালের জীন্দেগী। হালার ফালার জীন্দেগী তোর মায়েরে বাপ। যেই পানি শইল্লে ঢালছোস ঐ পানিতে তোর চুবামু চা** মারানির ঘরের মারানি”
এত গুলো গালি শুনে অপূর্ব কিছুক্ষন কিংকর্তব্যবিমূঢ় নেত্রে তাকিয়ে থেকে খেকিয়ে উঠে “ঘুম ছাড়া তোর শ্যা* টার জীন্দেগীতে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। এবার উঠ আল্লাহর বান্দা”
অনেক গুলো দিন পর অপূর্বের কন্ঠ শুনে আরিয়ানের এতগুলো ঔষধী ডোজের ঘুমও উঁড়ে যায়। তৎক্ষনাত উঠে বসে। শুভ্র পাঞ্জাবি ভিজে বুকের সাথে লেপ্টে আছে। চুল ভিজে কপাল সহ চোখের উপর লেপ্টে। তা এক হাতে ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে মৃদু উৎকন্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করে “কখন এলি?”
অপূর্ব গ্লাস টেবিলে রাখতে রাখতে বলে “মাল টাল খাস নাকি? কতক্ষণ যাবৎ ডাকছি উঠার নাম নেই”
“তোর না বিকেলে আসার কথা ছিলো?”
অপূর্ব অনায়াসেই মিথ্যে বলে দেয় “পার্টি অফিসে কাজ ছিলো তাই দেঁড়ি হয়েছে”
আরিয়ান আশেপাশে চোখ বুলিয়ে ভ্রু কুঞ্চিত করে নেয়। সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করে “পরীর বাচ্চাটা কোথায় গেলো?”
অপূর্ব আবারও কিংকর্তব্যবিমূঢ়! বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে “পরীর বাচ্চা পেলি কোথায়! রাত বিরাতে কি পরী টরীর সাথে থাকিস নাকি?”
আরিয়ান গাঁ থেকে কাথা সরিয়ে উঠতে নিলে শরীর কেমন অসাঢ় মনে হয়। মাথা ঝিম ঝিম করে উঠে। আশপাশ চোখ বুলিয়ে ডাকে “মধু? মধু? কীরে মধুর ঘরের চিনি?”
ঘরের কোথাও মাধবীর চিহ্ন না দেখে বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে নিয়ে বিরবির করে “খাটাসনী চলে গেছে”
অপূর্ব চোখ ছোট ছোট করে বলে “আমি নিশ্চিত তুই কিছু খেয়েছিস”
আরিয়ান ঘাট থেকে নামতে নামতে বলে “বাল খেয়েছি। দেখছিস না খাটাস বউ ঘরে নেই। রাত বিরাতে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে বাল ফালাতে গেছে”
অপূর্ব এতক্ষনে বোঝে আরিয়ান কার কথা বলছে। মনে মনে স্মিথ হাসে। আরিয়ান ছোট থেকেই বলতো মধুকে সে বিয়ে করে ভিষন জ্বালাতন করবে। কিন্ত কখনোই নাম ভেঙে বলতো না যে কে এই মধু! যদি বলতো তাহলে তো সে জেনে বুঝে আর ঐ মধুর প্রেমে পরতো না। আর জানলেই বা কি হতো? ঐ মধুর রূপ একবার যে নিজের চোখে দর্শন করেছে আর যাই হোক সে প্রেমে না পরে থাকতে পারবে না। জেনে বুঝেও গ্রামের কত ছেলেরা শুধু মধুর বর্ননা শুনেই তার প্রেমে পরেছে। আর কখনো কোন মেয়ের দিকে তাকানোর সাধ্যি হয়নি কোন ছেলের শুধু রূপের বর্ননা শুনেই। সেই জায়গায় সে এমন এক ছেলে যে নিজ আখিঁতে ঐ সৌন্দর্য ,ঐ রূপ দর্শন করেছে। হৃদয়ের মনি কোঠাকে সাক্ষী করে রেখেছে ঐ সৌন্দর্যের। মাঝে মাঝে সে ভাবে যদি কোনদিন আরিয়ান জানতে পারে সে তার মধুমতীকে নিজের চোখে দেখেছে। কী হবে সেদিন? ভাবতেই অপূর্বের সম্পূর্ণ শিড়া উপশিড়ার রক্ত সঞ্চালন তীব্র হয়। কারন তার চোখ যেমন সেই সৌন্দর্যের সাক্ষী, তেমনই ঐ রূপের প্রেমে পড়ার দোষে আরিয়ানের করা নিকৃষ্টতারও সাক্ষী।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অপূর্ব “কোথায় গেছে তোর চিনি?”
আরিয়ান পাঞ্জাবি পাল্টে বলে “সেটাই দেখতে যাবো এখন। কোথায় আর যাবে ঐ পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়া। চল খুঁজে নিয়ে আসি”
অপূর্ব বলে “তুই যা। আমি অপেক্ষা করছি”
আরিয়ান সাথে সাথে বাধা দেয় “না তুইও যাবি। অনেক দিন পর পাশাপাশি ঢেং ঢেং করতে করতে যেতে পারবো। বড় হয়ে এসব সেনাপতি এমপি হয়ে মহা জ্বালায় পরেছি। স্বাধীনভাবে কিছুই করা যায় না বাল”
অপূর্বের বিন্দু পরিমাণ ইচ্ছা নেই মাধবীর সামনে পরার। কেন যেন তার মনে হয় মাধবী তার অনুভূতি বুঝে ফেলেছে। তার ভয় হয় ভীষণ, যদি এই বিষয়টা জানাজানি হলে আরিয়ান তার সাথে বন্ধুত্ব নষ্ট করে দেয়! তাকেও অন্য সবার মত শাস্তি দেয়! প্রানের চেয়েও প্রিয় বন্ধুর এমন আচরণ কীভাবে সহ্য করবে সে! আরিয়ান কী সত্যিই তার সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে দেবে! সে তো জোড় করে চেয়ে নেয়নি মাধবীকে। সে দূর থেকে ভালোবেসেছে আর দূরে দূরেই থাকছে। তবুও আরিয়ানের সাথে বন্ধুত্ব নষ্ট হওয়ার ভয় তাকে আষ্টে পিষ্টে ধরে।
আরিয়ান দরজার কাছে গিয়ে ডেকে উঠে “তাড়াতাড়ি আয় বাল”
অপূর্ব মনের বিরুদ্ধে গিয়ে পা বারায় আরিয়ানের সাথে। বাড়ির মূল ফটক লাগিয়ে আরিয়ান হাক ছোড়ে “বুলবুল…?”
সাথে সাথেই বুলবুল উঁড়ে এসে আরিয়ানের বা কাধে বসে। আরিয়ান ভ্রু কুচকে বলে “বাল ফালতে তোকে পুসছি আমি? চুন্নি যাওয়ার সময় দেখেও আমাকে ডাকিস নি কেন? যেমন মাইয়া তেমন তার পেঁচা”
অপূর্ব বলে “এটাকে কবে থেকে পালিস?”
আরিয়ান সামনে পা বারিয়ে বলে “অনেকদিন হয়ে গেছে। পোষ মেনেছেও অনেক তাড়াতাড়ি”
“লোকে শখের বসে কবুতর,পায়ড়া,ময়না,টিয়াকে পোষ মানায় আর তোরা কীনা এই বিদঘুটে পেঁচাটাকে পোষ মানাচ্ছিস?”
“এসব কোন সাধারণ শখ নয়। অদ্ভুত মেয়ের অদ্ভুত শখ”
বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর আরিয়ান বলে “চেহারার এ কী অবস্থা করেছিস?
অপূর্ব একদমই অল্প কিছু খোঁচা খোঁচা ছাপ দাঁড়ি রাখে সবসময়। আর চিকন ঠোঁটের উপর ঘন গোফ এবং নিচে ছোট ছোট দাড়ি। ধনুকের ন্যায় বাকানো ভ্রু জোড়া কুচকে থাকে সবসময়ই। কপালে পরে বিস্তর ভাজ। চকচকে গায়ের রঙ রোদে পুড়ে সৌন্দর্য হাড়িয়ে ফেলছে। দাড়ি গোফ গুলো অযত্নে বেরে উঠছে। চুলগুলো উষ্ক খুষ্ক হয়ে কপালে পরে আছে। অপূর্ব নিজের দাঁড়ি গোফ যুক্ত চেহারায় হাত বুলিয়ে বলে “থাক। কী হবে আর চেহারা দিয়ে। বয়সই তো হয়ে যাচ্ছে”
অপূর্বের কথায় আরিয়ান চোখ মুখ কুচকে নিয়ে বলে “আরে আমার বুইড়া বেডারে। বিয়া না কইরা পুরুষ মানুষ বুড়া হয় না। কালই দাড়ি গোফ ছেটে আসবি”
রাজবাড়ির মূল ফটকে দাঁড়িয়ে আছে মাধবী। সেদিনের সেই ভৌতিক জিনিস গুলো আজ নেই। শুধু একটা কালো বিড়াল বসে আছে ফটকের বাঁ পাশে। মাধবী তলোয়ার টা খাপে ঢুকিয়ে লন্ঠন শক্ত করে ধরে ফটকে ধাক্কা দেয়। ক্যাট ক্যাট শব্দ তুলে খুলে যায় তা। এই পরিত্যক্ত ধ্বংস স্তুপটাকেও মাধবীর চোখে অসম্ভব সুন্দর লাগে। বড় বড় গাছ গুলোর পাতা পরে সম্পূর্ণ বাড়ি এক হাত সম উঁচু হয়ে আছে। পদ্ম পুকুরটা এখন পচা ডোবায় পরিনত হয়েছে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়া সত্তেও আবছা দেখা যাচ্ছে। এই ব্যাপারটাই মাধবীর কাছে খুব আকর্ষণীয় আর সুন্দর লাগছে। অন্দরমহল পুরোটা বট গাছের শেকড়ে ছেয়ে আছে। আর বাকি মহলগুলো ভেঙে ভেঙে পরে যাচ্ছে। মাধবী সোজা নূরমহলের দিকে পা বারায়। আবারও অনুভব করে তার পেছনে কেউ আসছে। অত্যাধিক পরিমাণে বিরক্ত হয় সে। কালো বিড়ালটা তার সাথে সাথেই অদ্ভুত আওয়াজ তুলে হাটছে।
মাধবী একেবারে সব এড়িয়ে নূরমহলের ফটকে পৌছায়। ফটকে বিরাট এক তালা ঝুলছে। মাধবী লন্ঠন পাশে রেখে একটা ইটের সাহায্যে তালাটা ভেঙে ফেলে। অনেক দিন ধরে না খোলায় জং ধরে গেছে। যার ফলে বিকট আওয়াজ তোলে দু পাশে খুলে যায় লোহার ফটকটা। ভেতরে সমস্ত টা আধারে তলিয়ে। মাধবী লন্ঠনের মৃদু আলোয় এগিয়ে যায় সামনে। এতদিন পর বাপ ভাইয়ের স্মৃতির ডেরায় পৌছে এক অজানা সুখ অনুভব হয় বক্ষস্থলে। পুরোনো সব জিনিস পত্রগুলো ধুলোয় ভরে গেছে। মাধবীর ইচ্ছে হলো ধুলো ঝেড়ে দিতে। কিন্ত এখন এসবের সময় নয়। সে একটি নির্দিষ্ট কক্ষে প্রবেশ করে। এই কক্ষটা তাদের পারিবারিক গ্রন্থাগার। চারপাশের বুক শেলফে সারি সারি বইয়ের তাক। মাধবীর শখের বসে মাহফুজ চৌধুরী অজস্র বই শহর থেকে আনিয়ে গ্রন্থাগার টাকে সাজিয়েছে। মাধবী বইগুলোকে ছুঁয়ে দেখলো। চোখের পাতায় ভর করলো নানান সুমধুর স্মৃতি। সে একদম কক্ষের শেষ মাথায় গিয়ে থামে। বিড়ালটাকে এখনও তার সাথে সাথে আসতে দেখে বিরক্তির মাত্রা তিরতির করে বারতে থাকে। ভ্রু কুঞ্চিত করে বিরক্ত ভঙ্গিতে খেঁকিয়ে উঠে,
” যেভাবে পেছন পেছন আসছিস মনে হচ্ছে তোর শালার চল্লিশা খেতে যাচ্ছি তোকে রেখে? বালের কুত্তা বিলাই তোরা। আমার পেছনে না লাগলে তোদের পেছন দিয়ে গু পরতে চায় না শালা খান্ডাশ। এখান থেকে আর এক পা আমার পেছন পেছন বারালে পা ভেঙে পেছনে ঢুকাবো শালা রামছাগল। এখনই বের হো এই ঘর থেকে”
কুচকুচে কালো বিড়ালটা কী বুঝলো কে জানে। তার জ্বলন্ত চোখ জোরা দিয়ে একবার মাধবীর শানিত চোখ জোরা দেখে লেজ নারিয়ে চলে যায়। বিড়ালটা চলে গেলে সে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে একটা টুলের উপর উঠে দাঁড়ায়। ছাদের এক কোণে একটা ছোট্ট ছিদ্র করা। সে একটা লাঠির সাহায্যে সেই ছিদ্রে আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গেই সেটা খুলে যায়। মাধবী সেটা টেনে নিচে নামিয়ে আনে। একটা সিরি তৈরি হলে তা দ্বারা উপরে উঠে যায়। এটা একটা গোপন কক্ষ। যা সম্বন্ধে শুধু তৃশান,মাধবী আর মাহফুজ চৌধুরী ছাড়া সবাই অজ্ঞাত। এখানে শুধু বই আর বই। তবে এগুলো কোন সাধারণ বই বা সাহিত্য না। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আনা আধ্যাত্মিক জগতের সমস্ত বিদ্যা রয়েছে এই কক্ষে। এটাই সেই স্থান যেখান থেকে মাধবীর কালো যাদুর শিক্ষা।
তবে মাধবী যে এই স্থান সম্বন্ধে জানে তা মাহফুজ চৌধুরী কিংবা তৃশান কেউই জানতো না। মাধবীর ছোট থেকেই পুরোনো জিনিস পত্র ঘেটে দেখার শখ রয়েছে। সবাই ঘুমিয়ে গেলে সে কাজের মেয়ে রুমার জামা কাপড় পরে পুরো বাড়ি টই টই করে ঘুরে দেখতো। সেভাবেই একদিন ঘুরতে ঘুরতে সন্দেহের বশে এই কক্ষে এসে পৌছেছিলো। এত মোটা মোটা বই এর আগে কখনো দেখেনি সে। প্রথম প্রথম অনেক ঘটকা লাগতো তার কাছে। বইয়ের লেখাগুলো ছিলো অন্যান্য দেশের ভাষায়। সে চার বছর নাগাদ গোপনে ঘেটে ঘেটে জানতে পেরেছে এগুলো যাদু বিদ্যা। প্রথম প্রথম সে এতটাই অবাক হয়েছিলো যে চেয়েছিলো তার বাবাকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। পরক্ষণেই ভাবনা পাল্টে নিজের মত খোঁজ চালালো। গোপনে এক তান্ত্রিকের সাথে সাক্ষাত করেছিলো। সে পুরো বই নেয়নি। কারন তার মাথায় ছিলো যে , যেহেতু তার বাপ ভাই বইগুলো এতটা গোপনে লুকিয়ে রেখেছিলো যে তাকে পর্যন্ত বলেনি; তাহলে নিশ্চয়ই এই বইগুলো পাওয়া বিরল।
তাই সে বইয়ের একটা পৃষ্ঠা ছিরে নিয়ে গিয়েছিলো তান্ত্রিকের কাছে। তারপর যেই ভাষায় বইগুলো লেখা সেই ভাষা শিখতে শুরু করে। প্রায় ৬ মাস টানা তান্ত্রিকের কাছে আশা যাওয়া করে সেই ভাষা শিখে বইয়ের অনুবাদ করে। বইয়ের যত তন্ত্র মন্ত্র ছিলো তা দিনের পর দিন আয়ত্ব করতে থাকে; কিন্ত কখনো ব্যবহার করেনি। পরে যখন তৃশান নিখোঁজ হয় তখন সে প্রথম ভাইকে খোঁজার উদ্দেশ্যে কালো যাদু ব্যাবহার করে। কিন্ত যখন ফলাফল শূণ্য দেখে তখন হাল ছেড়ে দেয়। ভাবে এসব বেহুদা বই। কালো যাদু বলতে আসলে কিছু হয় না। দিন যেতে থাকলে আস্তে আস্তে মাধবী কালো যাদুর ব্যাপারটা নিয়ে আর ঘাটে না। এ ব্যাপারে কাউকে জানায়ওনি এবং তার বাপ ভাইয়ের কাছে জানতেও চায়নি যে, এই বইগুলো আসলো কোত্থেকে তাদের কাছে! আর কেনই বা তারা এগুলো নিজেদের কাছে রেখেছে! কিন্ত যখন সম্পূর্ণ চৌধুরীদের হত্যা করা হয় তখন তার টনক নড়ে। আবারও কালো যাদু চর্চা করে। আরিয়ানের সাথে সেদিন শহরে চলে যাওয়ার পর অনেকদিন মানসিক ভাবে অসুস্থ থাকায় আর রাজবাড়িতে আসা হয়নি। যখন কিছুটা সুস্থ হয় তখন শোনে রাজবাড়ি ধ্বংস স্তুপে পরিনত হয়েছে। কোন বাড়িতে মানুষ না থাকলে তা পরিত্যক্ত হতে প্রায় বছরের পর বছর সময় লাগে। কিন্ত রাজবাড়ি এত তাড়াতাড়িই কীভাবে এতটা ভুতুরে হয়ে গেল তা মাধবীর নিজেরও অজ্ঞাত। পরে অনেক চেষ্টা করেও আরিয়ানের চোখ ফাকি দিয়ে রাজবাড়ি আসতে পারেনি আর সেই তান্ত্রিকের কাছেও যেতে পারেনি।
পুরোনো ভাবনা থেকে বেরিয়ে মাধবী একটি সেলফের দিকে এগিয়ে যায়। সেখান থেকে খুঁজে খুঁজে একটা ভারি মোটা বই বের করে। কম হলেও বইটার ওজন আধ কেজির মত মনে হয় মাধবীর কাছে। সে একটা পুরোনো রেশমি কাপড় দ্বারা বইটা জরিয়ে ফেলে। তারপর আরো কিছুক্ষণ বই নিয়ে ঘাটাঘাটি করে নেমে আসে সেখান থেকে। যেভাবে সব কিছু ছিলো সেভাবেই রেখে বেরিয়ে আসে নূরমহল থেকে। আশপাশ ভালো ভাবে অবলোকন করে অন্দরমহলের দিকে পা বারায়। তখনই কয়েকজন পুরুষের সমস্বরে চিৎকারের শব্দে থমকে দাঁড়ায়। আশেপাশে ভালো ভাবে দেখে। সাদার মধ্যে কালো পেড়ের শাড়িটার লম্বা আচল ধুলোয় ভরে গেছে। মাটিতে গরাগরি খাচ্ছে। মাধবী লন্ঠন আর বইটা এক হাতে শক্ত করে ধরে আরেক হাতে তরবারি খাপ থেকে বের করে। এই রাত করে কে থাকতে পারে এখানে? ভাবতে ভাবতে মাধবী মূল ফটকে এগিয়ে যায়। বাড়ির পেছনের ডান পাশটা থেকে আওয়াজ আসছে। মাধবী এগিয়ে যায় সামনে। তার পেছন পেছন কালো বিড়াল টা আবারও পিছু নেয়। কিছুদূর আসতেই মাধবী দেখতে পায় একটা বড় মাঁচায় কিছু মাতাল বসে মদ খাচ্ছে। মুহুর্তেই মাধবীর মেজাজ তুঙ্গে উঠে। চোয়াল শক্ত হয়। মদ খেয়ে এতটাই মাতাল হয়ে আছে যে কোথায় এসে মদ গিলছে তাই ভুলে গেছে। মাধবীর প্রচন্ড রাগ উঠে। এখানে ভয়ে কোন লোকজন না আসায় ওরা নিজেদের ডেরা বানিয়ে নিয়েছে এখানে। সবচেয়ে বড় কথা এই গ্রামে মদ পান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো সে। তবুও এরা অবাধ্য হয়েছে আর তারই বাড়ির পেছনে বসে কিনা নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়েছে! মাধবী বইটা লুকিয়ে নির্বিঘ্নে এগিয়ে যায় সামনে।
ছয়-সাত জন লোক বসে আছে। কেউ তামাক টানছে আর কেউ বাংলা মদ গলায় ঢালছে। নেশায় বুদ হয়ে একজন আরেকজনের উপর ঢলে পরে। হঠাৎই একজনের চোখ যায় সামনের দিকে। দেখতে পায় একটা মেয়ে তলোয়ার হাতে এগিয়ে আসছে। শাড়ির আচঁল ও নেকাবের এক পাশ বাতাসে দুলছে। লন্ঠনের আলোয় তলোয়ারের ধারালো অংশ চিকচিক করছে। আশেপাশের ডালপালাগুলোও মৃদু উঁড়ছে। কী অপূর্ব ভয়ংকর দৃশ্য! লোকটা ভ্রম ভেবে চোখ মুখ ঘষে আবারও তাকায়। নাহ এটা সত্য। অজানা কারণেই লোকটা ভয় পায় কিছুটা। পাশের জনকে খোঁচা দিয়ে সামনে ইশারা করে। দ্বিতীয় জন প্রথমে অবহেলায় তাকিয়ে আবার তামাকে টান দিতে যাবে পরক্ষণেই কারো অস্তিত্ব দেখতে পেয়ে আবারও তাকায়। জিজ্ঞেস করে “কে বে এটা? মানুষ নাকি জ্বীন?”
ওর কথায় সকলের দৃষ্টি পরে সেদিকে। প্রথমে ভয়ে সকলের কলিজা সুকিয়ে গেলেও যখন দেখতে পায় এটা একটা মেয়ে তখন তাদের মস্তিষ্ক অন্য কিছুর ইঙ্গিত পায়। নেশাগ্রস্থ থাকায় আগ পাছ না ভেবেই একজন বলে উঠে “কী হে রাত বিরাতে কুরকুরানি উঠছে নাকি যে এত রাইতে বেডাগো আড্ডায় আইছোছ কুরকুরানি কমাইতে”
ততক্ষনে মাধবী তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। নির্ভয়ে সাধারণ ভাবে বলে “মাঁচা থেকে নেমে দাঁড়া সবাই”
কথাটা মাধবী সাধারণ ভাবে বললেও কেন যেন সবাই নামতে বাধ্য হয়। মাঁচা খালি হলে মাধবী সেখানে বই আর লন্ঠন টা রেখে নিজস্ব কায়দায় তলোয়ার বা হাত থেকে ডান হাতে নেয়। এই মাতালদের স্থানে যদি সুস্থ কোন লোক থাকতো তাহলে এতক্ষনে অবশ্যই বুঝে ফেলতো যে এটা রাণী মা। কেননা এরকম ভাবে তলোয়ার চালানো একমাত্র মাহফুজ চৌধুরী,তৃশান এবং রাণী মা ছাড়া কেউ পারে না। মাধবী সাত পাল্লা দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখলেও তার হাটা চলা এবং তলোয়ার চালানোর ধরনেই লোকে তাকে চিনতে পারে। মাধবী মাঁচায় উঠে তলোয়ার মাটিতে ঢেকিয়ে তার উপর হাত রেখে রাজকীয় ভঙ্গিমায় বসে জিজ্ঞেস করে “কোন গ্রাম?”
মাধবীর কথায় একজন বিশ্রী ভঙ্গিতে হেসে উঠে বলে “মাগীর তেজ দেখছোছ? মনে হইতাছে রাজ্যের রাণী হেয়। এই তোর সাহস তো কম না। ক্যান আইছোছ বেডাগো মধ্যে?”
মাধবী শান্ত ভাবেই উত্তর দেয় ” প্রথমত আমার তেজ সম্পর্কে তোদের ধারনা শূন্যের কোঠায়। দ্বিতীয়ত মনে হওয়ার কিছু নাই। আমিই রাণী। তৃতীয়ত আমার সাহস যে কতক্ষানি তা মাপতে গেলে তোদের এই ছোট্ট জীবন শেষ হয়ে যাবে। সব শেষে এখানে আসছি তোদের রক্ত নিতে। আর কিছু জানতে চাস?”
একটা মেয়ের মুখে গুন্ডাদের মত এরকম চটপটে উত্তর শুনে ওদের ভিষন হাসি পায়। বিশ্রী হাসি দিয়ে একজন বলে “মরার পাখনা গজাইছে মাইয়ার। মরবি যখন এমনে না মইরা আমাগো কতক্ষণ সময় দিয়া মর। আয় তোর তেজ মাইপ্পা দেহি”
বলে মাধবীর কাছে এগোতে নিলে মাধবী বাঁকা হেসে বলে “আমাকে ছোঁয়ার পর হাত সরানোর আগে যদি নিজের হাত জায়গায় দেখতে পাস তবে তোর কলিজাটা আমার হাতে পাবি”
মাধবীর এমন কথাতেও লোকটার কোন হোলদোল হলো না। এগিয়ে এসে মাধবীর নেকাব ধরে টান দিতে যাবে এমন সময় কাচ ভাঙার বিকট শব্দে থমকে যায়। পরক্ষণেই নিজের চোখে মুখে রক্ত পরতে দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। মাথায় হাত দিয়ে দেখে মাথা ফেটে কাচ ভেতরে ঢুকে গেছে। হতবিহম্বিত চোখে মাধবীর দিকে তাকিয়ে দেখে মাধবীর হাতে একটা ভাঙা কাচের বোতল। আকস্মিক মাধবীর এমন কাজে বাকিরা প্রথমে পিছিয়ে গেলেও ক্ষোভের বসে একসাথে ঝাপিয়ে পরে মাধবীর উপর। নেশার বসে বিন্দু পরিমাণ হুশ নেই একটারোও। কোন কথা বার্তা ছাড়াই যেভাবে পারলো একেকজন ঝাপিয়ে পরে গায়ের উপর। এতগুলো পুরুষের সাথে একা একটা নারী শুধু মাত্র একটা তলোয়ার দিয়ে কীভাবে কী? তলোয়ার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেই তো শেষ!
এতটুকু পরার পর আদিত্য খেয়াল করে দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। হাতের খাতাটা বন্ধ করে দরজার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে “আপনি জাননি আপনার স্বামীর সাথে দেখা করতে?”
মাধবী একটা বিষাদ মাখা হাসি দিয়ে বলে “মন সায় দেয়নি”
আদিত্য উঠে দাঁড়ায় “দেখুন আপনি যদি নিজেরটা নিজে বুঝে না নেন তাহলে আমি কিছুই করতে পারবো না। আপনার স্বামীর কাছে যান। হয়তো তিনি একটা সুযোগ দিতেও পারে”
মাধবী ক্লান্ত ভঙ্গিতে ভেতরে এসে ধপ করে চেয়ারে বসে পরে। টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে বলে “ওনাকে বলুন না চলে যেতে। আমার সাহস হয় না উনার সামনে যেতে। আমি ভয় পাই। প্রচন্ড ভয়!”
রাণীর ভয়! ময়মনসিংহের রাণী মা! এটাই কী সেই মাধবীলতা! ভয় পাচ্ছে! আদিত্য বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে
“আপনি ভয় পেতে জানেন?”
মাধবী এক পেশে ঠোঁট বাকিয়ে বলে “ভয়? কী মনে হয় আপনার? অবাক লাগছে হয়তো। লাগারই কথা”
কিছুটা থেমে বলে “কতটুকু পড়লেন?”
আদিত্য জিজ্ঞেস করে “সেদিনই কী নিজের সম্ভ্রম হাড়িয়েছিলেন?”
“হাড়ানোর ছিলো কী?”
“এতগুলো লোকের সাথে আপনি যদি পেরে উঠতে পারেন তবে আপনি নারী না আপনি দেবী”
“বাজে কথা বলবেন না। মানুষ কে দেবীর সাথে তুলনা করছেন কেন?”
“আচ্ছা করবো না। যান এমপির সাথে দেখা করে আসুন”
“পারবো না”
“আপনি এমন কেন বলুন তো? কেমন যেন! একদম আলাদা এক সত্ত্বা আপনি”
মাধবী এক বিষাদ মাখা হাসি হেসে বললো,
” সবাই শুধু দেখলো কেমন আছি
কিন্ত কেউ তো দেখলো না
কেনো এমন আছি? ”
এই প্রথম আদিত্য দেখলো মাধবীকে হাসতে। কি ভয়ংকর সেই হাসি! কতটা কষ্ট বুকে পুষে রেখেই না বললো কথাটা। উত্তরে বলার মত কিছু পেলো না আদিত্য। মাধবী আবার বলে,
“লোকে বলে ভাঙা জিনিস নাকি জোড়া লাগে না
অথচ স্বর্ণ চিনেন? স্বর্ণ? ভেঙে চুরে আরো শক্ত করে গড়ে তোলে নিজেকে। আর সেই স্বর্ণই হচ্ছি আমি”
“তাহলে এখন ভেঙে পরছেন কেন?”
” সবারই তো সব হলো
আমার হলো কী…?
সব দেওয়ার মালিক খোদা
আমায় দিলো কী? ”
এত ভারী ভারী কথা কী করে বলতে পারে এই মেয়েটা! কী ধরন একেকটা কথার! কতটা দুঃখ নিয়েই না কথাগুলো বলে মেয়েটা! আদিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে “আপনার সব হবে দেখবেন। এখন যদি এমপি সাহেবকে মানিয়ে নিতে পারেন, তাহলে আপনি একটা সুন্দর জীবন পেতে পারেন। দয়া করে গিয়ে দেখা করে আসুন”
মাধবী বিরক্ত বদনে বলে “বললাম তো যাবো না। আপনি আপনার কাজ করুন। আমি একটু ঘুমাবো”
আদিত্য শক্ত কন্ঠে কিছু বলতে যাবে তার আগেই একজন এসে বলে “স্যার আসবো?”
আদিত্য বলে “আসো”
লোকটা ভেতরে ঢুকে বলে “এমপির স্ত্রীকে জরুরী তলব করা হয়েছে বড় বাবুর চেম্বারে”
আদিত্য ভ্রু কুচকে মাধবীর দিকে তাকায় “কী? এখনও বসে থাকবেন?”
মাধবী বিরক্ত কন্ঠে লোকটাকে বলে “কেন ডেকেছে?”
“আমি তো জানি না”
আদিত্য বলে “তুমি যাও। আমি উনাকে নিয়ে আসছি”
লোকটা চলে গেলে আদিত্য তাড়া দিয়ে বলে “জলদি চলুন। ঐ ভুরি ওয়ালা দারগার মেজাজ সর্বদাই তুঙ্গে থাকে। দেঁড়ি হলে সাবান ছাড়া ধুয়ে দেবে”
আদিত্যর অল্প খুনসুটিতে মাধবী আবারও অল্প হাসে। আদিত্য আবারও মুগ্ধ চোখে দেখে। নিজেও মুচকি হেসে দুজনে বড় দারগার কক্ষে পৌছায়। দুজনে দুটো চেয়ারে বসলে দারগা নাকের উপরে পরে থাকা চশমার উপর দিয়ে উঁকি দিয়ে দুজনকে পর্যবেক্ষণ করে গলা খাঁকারি দেয় “সব তথ্য নেয়া হয়েছে?”
আদিত্য বলে “অর্ধেক পেয়েছি। বাকি অর্ধেক নিয়ে আমি তাড়াতাড়ি জানাচ্ছি”
দারগা পানের পিক ফেলে দু হাত টেবিলে রেখে বলে “আর জানতে হবে না”
আদিত্য ভয় পেয়ে যায়। মামলার রায় হয়ে গেল নাকি? কিন্ত কোন তথ্য না নিয়েই কীভাবে সম্ভব? সে শশব্যাস্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে “কিন্ত কেন?”
দারগা হাতের সাহায্যে থামতে ইশারা করে বলে “আহা! এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? মামলা খালাস করে দিয়েছে এমপি”
কথাটা শোনামাত্রই কোন এক অজানা কারণে আদিত্যের বুকের ভেতর শূণ্যতা অনুভব করে। সে তো চেয়ে ছিলোই মাধবী মুক্ত হোক। আবারও সাজিয়ে নিক সবটা। সব কিছু জানার পর জামিন হয়ে যাবে এটাতো জানা কথাই। তবে কীসের এই শূণ্যতা? মাধবী চলে যাচ্ছে এজন্য? নাকি ঘটনা সম্পূর্ণ জানতে পারেনি সে জন্য? বুঝে পায় না আদিত্য। তবে কেমন যেন শূণ্য শূণ্য লাগে। মাধবীর দিকে তাকালে মাধবী বললো “চিন্তা করবেন না। খাতাটা আপনাকে উপহার দিলাম। সম্পূর্ণ গল্প শেষ করে আপনি সবার কৌতুহল দূর করে দিয়েন”
আদিত্য কেমন যেন চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করে হৃদয়ে। তবুও হাসি মুখে বলে “এবার ফিরে গিয়ে সবটা সাজিয়ে নিয়েন। চলুন”
বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে দারগা আদিত্য কে বলে “আপনি বসুন। কথা আছে আপনার সাথে”
না চাইতেও বসতে হয় আদিত্যকে। মাধবীকে একজন মহিলা পুলিশ নিয়ে যায় বহিরে। আদিত্য খুব করে চাইলো একবার যেন মাধবী পেছনে ফিরে নিজের চাঁদ মুখটা দেখার সুযোগ করে দেয় শেষ বারের মত। কিন্ত ফেরেনি মাধবী। কে জানে আর কখনো দেখা হবে কিনা। কিছুক্ষন পর বাহির থেকে শোনা যায় আরিয়ানের উদ্দেশ্যে বলা মাধবীর ভাঙা কন্ঠ “মধুমতী পাঞ্জাবিওয়ালার কথা রাখতে পারেনি আরিয়ান ভাই। রাখতে পারেনি। পাঞ্জাবিওয়ালা চেয়েছিলো তার মৃত্যুর পরেও যেন মধুমতী ইশানদের ব্যাটার বউ নামেই পরিচিত থাকে। মধুমতী সে কথা রাখতে পারেনি। পাঞ্জাবিওয়ালা বেঁচে থাকতেই মধুমতী আজ হায়দারদের ব্যাটার বউ নামে পরিচিত। সবাই এখন তাকে হায়দারের বউ হিসেবেই চিনে”
কথাগুলো শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদিত্য। দারগা কিছুটা সন্দেহের বসে জিজ্ঞেস করে “মায়ায় পরলেন নাকি?”
আদিত্য হেসে উত্তর দেয় “পরাই যায়”
“কার বউ জানেন তো? জানতে পারলে সারে তিনহাত মাটির ঘরেও ঠাই পাবেন না”
আদিত্য হাসে “সে জানি। এখন কাজের কথা বলুন”
“কাজের কথা কিছুই নয়। আপনাকে উনার সাথে দেখলে এমপি ঝামেলা করবে। তাই যেতে দেইনি”
আদিত্য দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। গিয়ে আবার খাতাটা খুলে বসে। পড়া শুরু করার আগে কিছুক্ষন আগে বসা মাধবীর চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
” দু দিনের সাক্ষাতেই বক্ষে এমন এক শূন্যতার আচঁর কেটে দিয়ে গেলেন মিসেস মাধবীলতা চৌধুরী ইরাবতী। আদেও এই শূণ্যতাকে কখনো পূর্ণ করতে পারবো কিনা কে জানে… ”
ময়মনসিংহের উত্তর দিকে ঘন জঙ্গলে এক তান্ত্রিকের বসবাস। লোকে তান্ত্রিক বাবা হিসেবেই চেনে। আরশি গোপনে খোঁজখবর নিয়ে বহু কষ্টে এই তান্ত্রিক বাবার আস্তানা খুঁজে বের করে। তার বান্ধবী মনার সাহায্যে জঙ্গলে পৌছায় সে। দুজনে পুরো জঙ্গল হন্যে হয়ে খুঁজে বের করে তান্ত্রিক বাবাকে। আপাতত দুজনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে তান্ত্রিক বাবার সামনে। লোকটা বেশ বয়ষ্ক। বিশাল বড় বড় দাড়ি ও চুলের জন্য চেহারা দেখা যাচ্ছে না। সামনে আগুন জ্বালিয়ে আসন গেরে বসে আছে বট বৃক্ষের গোড়ায়। কিছুক্ষন পর চোখ খুলে দুজনকে সামনের আসনে বসতে ইশারা করে। এই প্রথম দুজনে এরকম তান্ত্রিক ফান্ত্রিকের নিকট এসেছে। তাই ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে দুজনের। কাঁপা পায়ে গিয়ে বসে দুজন। লোকটা নিজের ধ্যান ভেঙে জিজ্ঞেস করে “কেনো এসেছিস?”
আরশি ভয়ে একটা ঢোক গেলে। সে আজ একটা ভয়াবহ নিকৃষ্ট কাজ করতে এসেছে। নিজে একটা মেয়ে হওয়া সত্তেও আরেকটা মেয়ের জীবন ধ্বংস করতে এসেছে। আর সেই মেয়েটা আর কেউ না, মাধবীই। আরশি ছোট থেকেই ভীষণ জেদি। যা চাইতো তা নিজের করেই ছাঁড়তো। এই প্রথমই তার সাথে এমন হয়েছে যে, সে কিছু চাইলো আর পেলো না। আরিয়ান তার ছোট বেলার ভালোবাসা। কাছে না পেলেও দূর থেকেই ভালোবেসেছে। সে ভেবেছিলো আরিয়ান না চাইলেও সে জোর করে বিয়ে করে নেবে। কিন্ত আরিয়ান তো হঠাৎ করেই কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলে। যার ফলে সে চাইলেও কিছু করতে পারেনি। কিন্ত তার জেদ তাকে ঘুমাতে দেয় না। খুন করে দিতে ইচ্ছে করে মাধবীকে। কিন্ত তা সে কখনোই পারবে না। তাই বাঁচিয়ে রেখেই মৃত্যুর স্বাদ দিবে বলে ঠিক করে। একটা নারীর কাছে বিয়ের পর একটা সন্তানই জীবন মরন হয়। স্বামী না থাকলেও একটা সন্তান সাথে নিয়ে জীবন পার করে দেওয়া যায়। কিন্ত যদি সেই সন্তানই না হয়!
এর চেয়ে হতভাগা আর কোন নারী হতে পারে না দুনিয়ায়! একটা সন্তানের চাহিদা একটা নারীকে ধুকে ধুকে খায়। আর সাথে তো সমাজের কটু কথা আছেই। সন্তান না হলে পরিবার এবং সমাজের চাপে স্বামীকেও ভাগ করে নিতে হয় আরেকজনের সাথে। এর থেকে কষ্ট কোন নারীর জীবনে হতে পারে না। আর সেই কষ্টটাই দিবে আরশি মাধবীকে। যখন মাধবীর বাচ্চা হবে না তখন সমাজ তাকে আটকুঢ় আক্ষা দিবে। তখন এমনিতেই সমাজের চাপে আরিয়ান কে আরেকটা বিয়ে করতেই হবে। তখন না হয় আরিয়ানের দ্বিতীয় বউয়ের স্থানটা আরশিই পেল। এরকম সমস্ত পরিকল্পনা করেই আরশি এখানে এসেছে। সে তান্ত্রিক দিয়ে মাধবীকে কালো যাদু করবে, যেন কখনো মাধবী সন্তান জন্ম দিতে না পারে। সারাজীবন যেন আটকুঢ় থাকতে হয়। এসব ভেবে সে তান্ত্রিক বাবাকে বলে “একটা মেয়েকে বন্ধ্যা রাখতে হবে আজীবন”
তান্ত্রিক ভ্রু কুচকে বলে “তোর সাথে সেই মেয়ের কীসের ঝামেলা”
আরশি একে একে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে তান্ত্রিক বাবাকে। সাথে তার পরিকল্পনার কথাও জানায়। সব শুনে তান্ত্রিক বলে “সেই মেয়ের সমস্ত পরিচয় এবং ব্যাবহারের একটা বস্তু লাগবে”
আরশি বাড়ি থেকে মাধবীর একটা শাড়ি এবং কিছু চুল নিয়ে এসেছে। তা তান্ত্রিকের কাছে দিয়ে বলে “সেই মেয়েটা হলো ময়মনসিংহের রাণী মা”
কথাটা শোনামাত্রই তান্ত্রিক হতবিহম্বিত চোখে তাকিয়ে সুধায় “তোর সাহস তো কম না মেয়ে। তুই রাণী কে কালো যাদু করতে বলছিস। তুই জানিস ঐ রাণীর ব্যাপারে কিছু? রাণী যদি কখনো জানতে পারে তাহলে কী হবে তোর অবস্থা?”
আরশি কাঁপা স্বরে বলে “যাই হোক। প্রয়োজনে আমি জীবন দিয়ে দেব। তবুও আরিয়ান ভাইকে আপুর সাথে সংসার করতে দেব না। আপনি দয়া করে কাজটা করে দিন। আপনি যা চাইবেন আমি তাই দেব আপনাকে”
তান্ত্রিক বাবা এবার কিছুক্ষন ভেবে বলে “যা চাইবো তাই দিবি বলছিস?”
আরশি ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে বলে “হ্যা হ্যা আপনি যা চাইবেন আমার সাধ্যি থাকলে আমি তাই দেবো”
তান্ত্রিক একটা বিদঘুটে হাসি দেয়। যা আরশি এবং মনা দুজনেরই আড়ালে রয়। তান্ত্রিক একটা খাতা বের করে বলে “এখানে একটা সাক্ষর কর”
আরশি খাতায় কী লেখা আছে তা না দেখেই কবুতরের পাখার সাহায্যে সাক্ষর করে দেয়। খাতাটা পাশে রেখে তান্ত্রিক মাধবীর শাড়ি এবং কিছু চুল হাতে নেয়। আরশি এবং মনাকে চোখ বন্ধ রাখতে বলে। মনা দ্বিধান্বিত স্বরে ফিসফিস করে আরশিকে বলে “আরেক বার ভেবে দেখ আরশি। তুইও তো একটা মেয়ে। তুই ঐ ছেলেকে ভুলে যা। মানুষ দ্বিতীয় বারও ভালোবাসে। তুইও পারবি। দয়া করে আরেকটা বার ভেবে দেখ”
মনার এত আকুতিও আরশির মন ছুঁতে পারে না। সে ক্রোধ এবং জেদের বশে হিতাহিত জ্ঞান হাড়িয়ে বলে “আমার আরিয়ান ভাইকেই লাগবে। ঐ মেয়েকে আমি কিছুতেই ভালোভাবে সংসার করতে দেবো না। ধ্বংস করে দেব ওকে”
আরশির একরোখা কথায় মনা আর কিছু বলার সাহস পায় না। দুজনে আধঘন্টার মত চোখ বন্ধ করে বসে থাকার পর তান্ত্রিক তাদের চোখে খুলতে বলে। শাড়িটা ওদের ফিরিয়ে দিয়ে বলে “শাড়িটা যেভাবে ছিলো সেভাবেই জায়গায় রেখে দিস। তোর আর কিছু করতে হবে না। যা করার আমি করে দিয়েছি। রাণী চাইলেও আর শত চেষ্টার পরেও মা হতে পারবে না। তোর ব্যাপারটা জরুরী বলে আমি এমনভাবে কাজটা করেছি যে কাজের প্রভাব আজ এবং এক্ষুনি শুরু হয়ে গেছে। এটা খুব শক্তিশালী যাদু। একবার করে ফেললে আর তোলা যায় না। এমনকি তুইও যদি কখনো যাদু তুলে ফেলতে চাস তা-ও সম্ভব না। শেষ রাণীর মা হওয়ার স্বপ্ন। আর দু বছরের মধ্যে তুই তোর প্রেমিককে পেয়ে যাবি। এবার আমি যা চাই তা দিতে হবে”
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩৪
আরশি খুশিতে পৈশাচিক হাসি হেসে উঠে “বলুন আপনার কী চাই?”
তান্ত্রিক কিছুক্ষন চুপ থেকে এমন কিছু বলে উঠে যা আরশি স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। সে হতবিহম্বিত চোখে তাকায়। মনা ভয়ে তাকে শক্ত করে ধরে। আরশি কুক্ষনেও ভাবেনি মাধবীর এমন ক্ষতি করতে গিয়ে যে নিজেই এমন বিপদের সম্মুখীন হবে। এবার সে নিজের ভূল বুঝতে পারছে। কিন্ত ততক্ষনে অনেক দেড়ি হয়ে গেছে। সব শেষ হয়ে গেছে। মাধবী আর কখনও মা হতে পারবে না। আর নিজেও নিজের সামনে আর মুখ দেখাতে পারবে না। আরশির ঠোঁট ভেঙে কান্না পায়। সে খাতাতে সাক্ষর করে দিয়েছে। এখন কথা না রাখলেও এই তান্ত্রিক যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। সব হাত ছাড়া হয়ে গেছে। শেষ!
