ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৩
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
স্বচ্ছ কাঁচের ওপাশ থেকে প্রিয়তার সকল উন্মাদনা পর্যবেক্ষণ করছে প্রিতম ও প্রেম।
যতই হোক মানুষের রক্ত কথা বলে, রক্তের টান কেউই উপেক্ষা করতে পারেনা, তারাও পারেনি।
তারা দুজনেই খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এদের ভবিষ্যৎ।
তবুও মনকে বুঝানোর চেষ্টা করে বার বার ব্যর্থ হয়, যতই হোক রক্তের নাড়ির টান।
অস্বীকার করবে কী করে, আবার সহ্যই বা করবে কী করে।
তাদের দুজনের চোখেই অশ্রু। দুঃখ পেতে পেতে নরম মনগুলো পাথর হয়ে গেছে কবেই, তবুও সেই পাথুরে মনে ব্যথা লাগে, রক্তক্ষরণ হয়। পাগল পাগল লাগে। আল্লাহর অসীম রহমতে একবার বেঁচে গেছে বলেই যে বারবার বেঁচে যাবে, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। যা হওয়ার কথা তাই তো হচ্ছে, ভবিতব্যকে ঠেকায় এমন সাধ্য কার?
কিন্তু ভাগ্যকে ও ভবিতব্যের উপর ছেড়ে দিলে তো চরম সর্বনাশ হবে।
ওই মানুষটার যদি একবার কিছু হয়ে যায়, তাহলে কেউ কিছুই হারাবে না, কারো কিছুই যাবে আসবে না। অথচ তার ফুলের মতো বোনটা ঝড়ে যাবে এক মুহূর্তেই! এসব নিয়ে বেশি ভাবতে পারে না প্রিতম, অস্থির লাগে, বুকটা অসহ্য যন্ত্রণায় নীল হয়ে যায়। নিজের কলিজার টুকরোর এমন অবস্থা সহ্য হয় না।
পাশ থেকে প্রেম বলে ওঠে,
“তাহলে কি বলো মেজদা, পাশাপাশি দুটো কবর খুঁড়ে রেডি থাকতে হবে আমাদের? যতই হোক লাশগুলো খাটিয়ায় তোলার দায়িত্ব তো আমাদেরই।”
প্রিতমের বুক পুড়ে নিঃশব্দে, দুচোখে অশ্রু বিসর্জন দেয়। নিজের বোনকে এই মরণ থেকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছে প্রিতম। অনেক সময় অনেক নিষ্ঠুর আচরণ করেছে নিজের বোনের সাথে। নিজের পেটের বোন তাকে ঘৃণা করত, দু’চক্ষু দিয়ে দেখতে পারত না, মুখ ফিরিয়ে রাখত বছরের পর বছর। প্রিতম মুখ বুজে সব সয়ে নিয়েছে। কোন প্রতিবাদ করেনি, নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টাও করেনি, চাওয়া শুধু এতটুকুই ছিল—
“বোন, তুই আমায় দেখতে পারিস না, তোকে আমার মুখটাও দেখতে হবে না। তবুও তুই ভালো থাক, তোর নিজস্ব একটা দুনিয়া হোক। অন্যের ছায়াতল থেকে বেরিয়ে তুই নিজের জন্য বাঁচতে শেখ, নিজের অনুভূতির ওপর লাগাম টানতে শেখ।”
কিন্তু দেখ, দিনশেষে সেই লক্ষ্যে কত বাজেভাবে হেরেগেছে তোর ভাই। এখন প্রেমের কথাটাই সত্যি লাগে প্রীতমের। একটা শরীরে দুটো আত্মা থাকলে একটা তাড়িয়ে একটা রাখা যায়। কিন্তু দুটো শরীরে একটা আত্মা থাকলে, দুটো শরীরকেই সমান তালে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। নাহলে একটা শরীরের কিছু হওয়ার আগেই অন্যটা নিজে থেকেই শেষ হয়ে যায়।
প্রিতমের অসহায়ত্ব অনুধাবন করতে পারল প্রেম। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল,
“হারালে আমরা কেবল আমাদের বড় ভাইকে হারাবো না মেজদা, আমাদের কলিজার টুকরো বোনটাকেও হারাবো। মনটাকে ইস্পাতের মতো করে ফেলো মেজদা, এদেরকে আমরা হারাবোই। যতই চেষ্টা করি, ধরে রাখতে পারব না।”
“আমি আমার কলিজাকে হারিয়ে এক দণ্ডও বাঁচতে পারব না প্রেম। ও আমার আত্মার একটা অংশ, আমার একটামাত্র বোন। আমি আমার বোনটাকে অনেক ভালোবাসিরে ভাই। আমার খুব ভয় হচ্ছে। আমার যত বোনই আসুক আর যত যাই হোক, ও আমার কাছে সবার উপরে।”
“আমরা খুবই নগণ্য মানুষ মেজদা, আমাদের হাতে আর কিছুই নেই। শাক দিয়ে বেশিদিন মাছ ঢাকা যায় না। তবে যাদের জন্য আমাদের ভাই-বোনের এই অবস্থা, তাদের কোনোদিনই ক্ষমা করব না। তারা কোনোদিনও সুখী হবে না।”
আল্লাহর বিচার কঠিন। প্রহেলিকা শিকদার প্রতি সেকেন্ডে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। সাদমান শিকদার ছেলে হারানোর ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে। খালিদ শিকদারও স্বস্তিতে নেই। দেখে নিও, আরও দুর্দিন আসবে এদের। এদের লোভ এদেরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। আজ কেবল এদের জন্য—
প্রেমের গলা ভারী হয়ে আসে। পুরুষ মানুষদের কাঁদতে নেই। লম্বা লম্বা দম ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল দুই ভাই।
প্রিতম দরজায় টোকা দিয়ে ডাকল প্রিয়তাকে,
“বোন, একটু এদিকে আয়।”
প্রিয়তা প্রণয়ের হাতের উল্টো পিঠে গাল ঠেকিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল শুভ্র রাঙা মুখটার দিকে। ভাইয়ের ডাকে হকচকিয়ে গেল প্রিয়তা। পেছনে তাকিয়ে দেখল প্রিতম ডাকছে চোখের ইশারায়। প্রিয়তা ঘাড় ঘুরিয়ে ফের তাকাল প্রণয়ের মুখের দিকে। কত স্থির আর শান্ত! প্রিয়তার মন চাইল না উঠে যেতে। তবুও প্রণয়ের হাতটা আস্তে করে রাখল বেডে। প্রণয়ের চকচকে কপালে আলতো চুমু এঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ভালো ছেলের মতো শুয়ে থাকুন, আমি এক্ষুনি আসছি।”
বলে দু’গালে দুটো চুমু খেয়ে বেরিয়ে গেল প্রিয়তা।
প্রিতমের সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে বলল,
“জি ভাইয়া।”
প্রিতম কিছু বলার আগেই ধমকে উঠল প্রেম। কঠিন গলায় বলল,
“তুই লাস্ট কবে খেয়েছিস?”
প্রিয়তার মুখটা নিরীহ হয়ে এল। সে সত্যি মনে করার চেষ্টা করল কবে খেয়েছে। প্রিয়তাকে ইতিউতি তাকাতে দেখে ওর মাথায় চাটি মারল প্রেম। দাঁত খিঁচিয়ে বলল,
“মনে করতে পারছিস না তো, আর পারবিও না। মনে করবি কীভাবে? খেয়েছিস তো চারদিন আগে, তাও দুধ-মুড়ি। হ্যারে, তোর কি খিদে-তেষ্টা পায় না?”
প্রিয়তা অসহায় চোখে তাকাল। তার প্রণয় ভাই নেই, আর সে বসে বসে গিলবে? গলা দিয়ে নামবে ওই খাবার?
“ভ্যাবলার মতো কী তাকিয়ে আছিস? চল নিচে থেকে খেয়ে আসবি।”
প্রেম যেতে ধরল, তৎক্ষণাৎ বিরুধ জানাল প্রিয়তা। মাথা নিচু করে ধীরে বলল,
“তুমি খাও ভাইয়া, আমি খেতে পারব না। খাবার আমার গলা দিয়ে নামবে না।”
কথা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল প্রেম। ভ্রু কুঁচকে পেছন ফিরে তাকাল। মেয়েটার কত বড় সাহস, মুখে মুখে তর্ক করে! প্রেম কিছু বলার আগে এবার ধমকে উঠল প্রিতম। কঠিন গলায় বলল,
“তুই কি দিন দিন ভদ্রতা-সভ্যতা গিলে খাচ্ছিস? বড় ভাইয়ের মুখে মুখে তর্ক করছিস?”
ধমকের সাথে ঈষৎ কেঁপে উঠল প্রিয়তা। মাথা আরও খানিক নিচু করে বলল,
“আ-আমি সরি ভাইয়া, কিন্তু সত্যি আমি খেতে পারব না। আমার প্রণয় ভাইও তো কিছু খেতে পারছেন না, তাহলে আমার গলা দিয়ে কীভাবে নামবে বলো?”
একত্রে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল দুই ভাই। প্রেম বোনের মাথায় হাত রাখল। খুব আস্তে করে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“তুই এত বোকা কেনরে বোন? তোর মনে হয় দাদান কিছু না খেয়ে আছে?”
প্রিয়তা তৎক্ষণাৎ উপর নিচ মাথা ঝাকালো ধরা গলায় বললো,
“হ্যাঁ, না খেয়েই তো আছেন। উনি কি খাওয়ার অবস্থায় আছেন নাকি?”
প্রেম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“শুধু শুধু কি আর তোকে গাধী বলি? ওই যে দেখ স্যালাইন চলছে, ওটা এক প্রকার খাবারই। যা দাদানকে ২৪ ঘণ্টা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে তার শরীর ডিহাইড্রেট হবে না, ক্লান্তি আসবে না, ক্ষুধাও পাবে না। কিন্তু তুই? তোকে তো আর স্যালাইন খাওয়ানো যাবে না। নাকি খাবি? ডাক্তারকে বলে ২-৩ ব্যাগ নিয়ে আসতে বলব? এরপর হাতে ক্যানুলা গেঁথে দাদনের পাশে শুইয়ে দেবো, আমার কোনো আপত্তি নেই, তুই যেটা খেতে চাস। কিন্তু একটা তো তোকে খেতেই হবে।”
হাতের রগে সুঁই গাঁথতে হবে কল্পনা করতেই গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল প্রিয়তার। ভয়ে ভয়ে তাকাল প্রেমের দিকে। প্রেম ভ্রু নাচাল।
“বল বল, কোনটা খাবি? দ্রুত বল।”
প্রিয়তা পড়ে গেল মাইংকার চিপায়। প্রিতমের ভীষণ জোরে হাসি পেলেও একদম সিরিয়াস মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রিয়তা একবার তাকাল প্রণয়ের দিকে। প্রণয় ভাই ক্ষুধার্ত নয় ভাবতেই স্বস্তি লাগল মনে। অতঃপর মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আমি স্যালাইন খাব না, খাবার খাব।”
হাসল প্রেম। গাল টেনে দিয়ে বলল,
“গুড গার্ল। মেজদা, এই নাচুনি বুড়িকে নিয়ে যাও। আমি একটু পরেই আসছি।”
সম্মতি জানাল প্রিতম। আগে আগে বেরিয়ে গেল গাড়ি বের করতে।
প্রিতমরা হসপিটালে আসার পরপরই তদন্ত করতে এসে হাজির স্পেশাল ইউনিট এবং তাদের স্পেশাল দুজন অফিসার।
এসআই ইব্রাহিম এবং সাব-ইন্সপেক্টর তুরান।
এস আই ইব্রাহিম এবং তাদের স্পেশাল ইউনিট পরিচয় গোপন করে সাদা পুশাকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সাব ইন্সপেক্টর তুরান নিজের পরিচয় সরাসরি এসে দাঁড়িয়েছে রিসেপশনে।
সে সরাসরি রিসেপশনে আবরার শিকদার প্রণয় সম্বন্ধে জানতে চাইলে তথ্য দিতে অস্বীকার করেন হসপিটাল কর্তৃপক্ষ। কারণ আবরার শিকদার প্রণয় তাদের ভিআইপি পেশেন্ট।
অফিসার তুরানের সাথে বাকবিতন্ডা বেঁধে যায়। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হঠাৎ নিচে চলে আসে প্রিয়তা। সে কোনো ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট, পুলিশ-মিলিটারি কিছুতেই মনোনিবেশ করে না। চার দিন কিচ্ছু পেটে পড়েনি, বিধায় ক্ষুধাতে নাড়িভুঁড়ি দলা পাকিয়ে মুখ দিয়ে উঠে আসতে চাচ্ছে।
এই চার দিন অন্নজল বর্জন করে কিসের ওপর টিকে ছিল প্রিয়তা, ভাবতে গেলে নিজেরই মাথা ফাঁকা হয়ে আসে। হ্যাঁ, এটাই হয়তো অতিমাত্রার নেশার ফল। তার মরণ আসক্তি তাকে জিয়ে রেখেছে, অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়তে দেয়নি। তার উন্মাদনা তাকে টিকে থাকার রসদ জুগিয়েছে। শরীরটাও হয়তো বুঝে গেছে ওই একটা মাত্র মানুষের উপস্থিতি তার সব থেকে প্রয়োজন। ওই মানুষটা একটু দূরে সরলেই তার নিজস্ব মেকানিজম আউলিয়ে যায়।
প্রিয়তা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। রিসেপশনিস্ট তাকে দেখেই আচমকা বলে উঠলেন,
“এই যে, উনি আবরার শিকদার প্রণয়ের বাড়ির লোক। উনার সাথে কথা বলুন, সব জানতে পারবেন।”
যেতে যেতে প্রণয়ের নামটা শুনতেই পদযুগল থেমে গেল প্রিয়তার। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তুরান রিসেপশনিস্টের কথা মতো পেছনে তাকাতেই দ্রুতগামী কিছু একটা ছুটে এসে খেঁচ করে বুকের গভীরে বিঁধে গেল।
প্রিয়তা প্রশ্ন চোখে তাকাল রিসেপশনিস্টের দিকে। রিসেপশনিস্ট নম্র কণ্ঠে বললেন,
“ম্যাম, সাব-ইন্সপেক্টর আপনাদের সাথে কথা বলতে চান।”
হাতের ইশারায় তুরানের দিকে দেখিয়ে দিলেন রিসেপশনিস্ট।
প্রিয়তা ভ্রু কুঁচকে তাকাল তুরানের দিকে। সর্বপ্রথম মাথায় এল সাব-ইন্সপেক্টর মানে পুলিশ। প্রিয়তা বেশি ভাবল না, স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“জি বলুন।”
দ্বিতীয় দফায় পুনরায় ধাক্কা লাগল তুরানের বুকে। কিছু বলতে চেয়েও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের করতে পারলো না তুরান। জীবনে প্রথমবারের মতো বক্ষপিঞ্জরে অদ্ভুত হালচাল অনুভূত হচ্ছে। তার ২৯ বছরের শুষ্ক হৃদয়টা হঠাৎ আসা সুনামিতে আকস্মিক ভিজে গেল। সে নিজ অস্তিত্ব খুইয়ে তাকিয়ে রইল সামনের রমণীর দিকে। সে কী রূপের জালে জড়িয়ে গেলো।
টানা টানা চোখ দুটো অগাধ কৌতূহল নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ভাষা ভাষা দুই চোখ যেন নীল সাগরের অনুরূপ।
লোকটার নিজের দিকে এমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিব্রত হলো প্রিয়তা। চোখ নামিয়ে নিল সহসা। সামনের ছোট ছোট চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে বলল,
“জি, কিছু বলবেন?”
পুনরায় সেই রিনরিনে নারী কণ্ঠে ভ্রম ছুটে গেল তুরানের। সে কী করতে এসেছে আর কী করছে, এটা ভাবতেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। হালকা কেশে গলা ঝেড়ে নিল তুরান। স্বাভাবিক গমগমে কণ্ঠে বলল,
“সাব-ইন্সপেক্টর তুরান জাওয়াদ। আমি আবরার শিকদার প্রণয় সম্বন্ধে জানতে এসেছি।”
লোকটার কথায় ভ্রুদ্বয়ের ভাঁজ আরও দৃঢ় হলো প্রিয়তার। অবাক কণ্ঠে বলল,
“উনার সম্বন্ধে আপনি জেনে কী করবেন?”
মেয়েটার ভ্রু বাঁকানোর কায়দাটাও কী অমায়িক লাগল তুরানের। নিজেকে সামলে বলল,
“উপর মহল থেকে অর্ডার আছে। উনি কীভাবে আঘাত পেয়েছেন সব বৃত্তান্ত তদন্ত করে উপর মহলে পাঠাতে হবে।”
প্রিয়তা কিঞ্চিত বিস্মিত হয়ে বললো,
“আশ্চর্য! আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে উপর মহলের কী কাজ? এটা তো আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাদের পরিবারে কেউ কি পুলিশ কমপ্লেন করেছে?”
তুরান একটু থামল। মনোযোগের সহিত গভীর চোখে তাকাল প্রিয়তার দিকে। সে তো সরাসরি এএসআর-এর টপিক তুলতে পারবে না, কারণ প্রণয় শিকদার যে এএসআর সেটা তো আর প্রমাণিত নয়। বেশি কিছু বললে তাদের নিজেদেরকেই বিরাট চাপে পড়তে হবে।
তুরান কিছু বলতেই যাচ্ছিল, তার পূর্বেই এসে হাজির হলো প্রেম। প্রথমেই বোনকে এক ধমক দিলো,
“এই তুই এখনো এখানে কী করছিস? তোর না খিদে পেয়েছে? মেজদা তোর জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে না?”
প্রেমের কথা শুনে পুনরায় খাবারের কথা মনে পড়ে গেল প্রিয়তার। পেট পুনরায় গুড়গুড় করে জানান দিল তার অসহ্য ক্ষুধার ব্যাপারে। প্রিয়তা আর তুরানের দিকে তাকালও না। মনে পড়ার ভঙ্গিতে পেছন ঘুরে দৌড় দিল। ছুটার তালে তালে হাঁটুর নিচে দুলছে লম্বা বেণীটা। সেদিকে মুগ্ধ চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তুরান।
প্রেম ওর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“আপনি কী যেন জানতে এসেছেন? যা বলার আমাকে বলুন। দেখলাম আপনাদের ফোর্স হসপিটাল চত্বরে টহল দিচ্ছে, বিশেষ কোনো ব্যাপার?”
তুরান গভীর চোখে তাকাল সামনে দাঁড়ানো তার সমবয়সী ছেলেটার দিকে। ফরমাল ড্রেসআপ, চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। ব্যক্তিত্বে একটা ভারী ভাব। যদিও শিকদার বাড়ির প্রত্যেকটা পুরুষ সদস্যই ভীষণ স্ট্রং। সাথে ভীষণ ধূর্ত আর চালাক প্রকৃতির। এই যে না বলতেই বুঝে নিয়েছে যে তাদের স্পেশাল ইউনিট হসপিটালেই আছে। এদের বিষয়ে ইনভেস্টিগেশন হয়েছে গত দুই মাস।
তুরান সাবধানে কথা পেঁচিয়ে বলল,
“আমরা মিস্টার আবরার শিকদার প্রণয় সম্বন্ধে ইনভেস্টিগেশন করতে এসেছি। আমাদের কাছে রিপোর্ট আছে উনার ওপর নাকি হামলা হয়েছিল। পরপর শুট করা হয়েছে। কারা করেছে বলে আপনার ধারণা?”
প্রেম সন্দিহান চোখে তাকাল। এই লোকটা যে কী মিন করছে তা বুঝতে এক পারসেন্টও অসুবিধা হলো না প্রেমের। সে ধূর্ত হাসল। হাতঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বলল,
“আমাদের বড় ভাই সাধারণ কোনো পারসন নন অফিসার। সো এরকম ছোটখাটো অ্যাটাক তো হতেই থাকবে। আফটার অল, ওয়ার্ল্ড টপ ১৫ কোম্পানির মধ্যে একটার অনার। বিজনেস ওয়ার্ল্ডে কি শত্রুর অভাব? তাদের মধ্যেই কেউ হয়তো সুযোগের সৎ ব্যবহার করেছে।”
“ওকে। শুনলাম আপনি নাকি আবরার শিকদার প্রণয়ের আপন ভাই।”
“হুম। সঠিক জেনেছেন। কিন্তু আমাদের ফ্যামিলি ম্যাটারে পুলিশের এত কৌতূহল তো ভালো ঠেকছে না। ব্যাপারটা কী?”
লোকটার চতুরতা আর কথা পেঁচানোর ট্যালেন্ট দেখে হাসল তুরান। মানতেই হবে এরা জাত ক্রিমিনাল। অপরাধ করা আর তা চাপা দেওয়ার ক্ষমতা এদের শিরায় শিরায়। কেমনে কথা পেঁচিয়ে তিল থেকে তাল বানিয়ে দিল!
প্রেমকে একটু নাড়িয়ে দিতে তুরান বলল,
“অ্যাকচুয়ালি কী হয়েছে মিস্টার শিকদার। গত সাত দিন আগে আমাদের স্পেশাল ফোর্স একটা মিশনে গিয়েছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তারা সবাই নিখোঁজ। কারো কোনো অস্তিত্বই মিলল না। তবে আমাদের কাছে থাকা ডাটা থেকে জানতে পেরেছি ওই রাতে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে। একটা দুটো লাশ গায়েব হতে পারে, কিন্তু শত শত লাশ?”
তুরানের কথা শুনে চোখ-মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে তুলল প্রেম। কপাল চুলকে দায়সারা হয়ে বলল,
“আশ্চর্য! আপনারা কী মিশন করেছেন না করেছেন সেসব জেনে আমার কী লাভ? আমরা বিজনেসম্যান, পুলিশ-মিলিটারি নই। এসব জেনে আমাদের কোনো ফায়দাও নেই।”
প্রেমের অভিব্যক্তিতে বিরক্তি দেখে ভ্রু কুঁচকাল তুরান। সে এক্সপেক্ট করেছিল প্রেম হয়তো ঘাবড়ে যাবে।
প্রেমের ফোন বেজে উঠল তৎক্ষণাৎ। প্রিতমের ফোন। প্রেম তুরানের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল,
“ওকে অফিসার, আর নিশ্চয়ই কিছু জানার নেই। আর হ্যা আমাদের ফ্যামিলি ম্যাটার নিয়ে আপনাদের ইনভেস্টিগেশন করে শুধু শুধু হয়রান হতে হবে না। থ্যাংকস অফিসার।”
বলে গট গট করে চলে গেল প্রেম।
তুরানের কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গেল। এরা খুব গভীর, প্রত্যেকেই এক একটা দাগি আসামি। ইংলিশে একটা প্রবাদ আছে, “Too much beauty can be dangerous.” সৌন্দর্য এদের মুখোশ।
তুরান ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সাথে সাথেই অক্ষিনিবাসে ভেসে উঠল নীল এক জোড়া চোখ। ধড়ফড়িয়ে চোখ খুলে ফেলল তুরান। চোখ দিয়ে কী মেয়েটা তাকে খুন করে দিল? তবে সেও তো ওই অপরাধীদের একজন। তবুও কেন জানি মেয়েটাকে অপরাধী ভাবতে মন চাইল না তুরানের।
মস্তিষ্কের শতভাগ সম্পূর্ণভাবে সচল হতে আরও ৭২ ঘণ্টা সময় লাগলো প্রণয়-এর। অবশেষে প্রিয়তার প্রিয় পুরুষটা সম্পূর্ণরূপে চেতনা ফিরে পেল।
জীবনের একপারে ছিলো মৃত্যু আর অন্যপারে ভালোবাসা। শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাকেই বেছে নিল আবরার শিকদার প্রণয়। আবারো প্রমাণিত হলো প্রেম যদি খাঁটি হয় আর চাওয়ায় যদি জুর থাকে তাহলে জাগতিক কোন কিছুই তোমার ভালোবাসাকে কেড়ে নিতে পারবে না। প্রেম চিরঞ্জয়ী, প্রেম মৃত্যুঞ্জয়ী, প্রেম চির অমর। মানুষ মরে যায়, মাটির সাথে মিশে যায়, তবুও রয়ে যায় ভালোবাসা।
পালস রেট দ্রুত বাড়ছে, হৃদপিণ্ড ধুকপুক করছে অস্বাভাবিক হারে। বন্ধ চোখের পাতা দুটো কেঁপে উঠছে বারবার। হাত দুটো শূন্য ও অন্ধকারে হাতরায়, কী খুঁজে কে জানে।
তার শরীর কিছুটা উন্নতির দিকে যাওয়ায় গত দুইদিন আগে আইসিইউ থেকে তাকে নরমাল কেবিনের শিফট করা হয়েছে। খুব আস্তে ধীরে ধীরে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুলো সচল হচ্ছে। মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ সচল হওয়ায় কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের নার্ভ সিস্টেমের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে সামর্থ হলো প্রণয়।
চোখ বন্ধ অবস্থাতেই মুখের ওপর থাকা অক্সিজেন মাস্কটা আস্তে করে খুলে ফেললো প্রণয়। ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল। যদিও প্রথম দুই মিনিট মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস টানতে বুকে কষ্ট হলো তবু ও তার আপ্রাণ চেষ্টায় স্নায়ু শীতল হয়ে আসে ধীরে ধীরে, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি স্বাভাবিক হয়। বার কয়েক মুক্ত বাতাসে বড় বড় নিশ্বাস ফেলে প্রণয়।
তবে বাহিরটা শান্ত হলেও ভেতরটা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে, অন্তরে স্বস্তি মিলে না কিছুতেই। অশান্তিতে ভরে উঠে হৃদয়।
প্রতিবারই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ভাসতে থাকা একটা সুন্দর মিষ্টি মেয়েলি ঘ্রাণে হৃদপিন্ডের প্রকোষ্ঠ পরিপূর্ণ হয়ে যায়। গন্ধটা মস্তিষ্কের নিউরনে নাড়া দিতেই বুকের ভেতরের খরস্রোতা নদী শুকিয়ে যায় তৃষ্ণায়।
ছটফট করতে থাকে প্রণয়। পুরুষালী দেহের শিরায় শিরায় পৌঁছে যায় হাহাকার। রক্তের প্রতিটি অণুতে প্রবাহমান এখনো কড়া ঘুমের ওষুধ। বারবার চোখ মেলার চেষ্টা করে ও ব্যর্থ হচ্ছে প্রণয়। অথচ সুপরিচিত ঘ্রাণটা তাকে পাগল বানিয়ে দিচ্ছে।
এটা যে তার নিজের শরীর থেকেই ছুটে আসছে সে সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই প্রণয়ের। ঘ্রাণটা যতবেশি মস্তিষ্কে পৌঁছাচ্ছে তত বেশি অগ্রেসিভ হয়ে উঠছে প্রণয়।
প্রিয়তমার অস্তিত্বের অনুভূতি তার মৃত্যু পূর্বভর্তি তৃষ্ণাটাকে এক লাফে আকাশ ছুঁইয়েছে। নিজের প্রাণপাখিকে দুই চোখ ভরে দেখার তৃষ্ণায় বেঁচে থাকাটা হয়ে উঠেছে দুর সহ।
বন্ধ চোখের কোনা বেয়ে অবিরাম ধারায় গড়িয়ে পড়তে লাগলো তপ্ত অশ্রু। শুষ্ক ঠোট দুটোতে নামলো চৈত্রের খরা। নিজের ময়না পাখিটাকে বুকে নেওয়ার ব্যাকুলতায় মরিয়া হয়ে উঠলো প্রণয়। তার প্রাণটা তার কাছে আছে অথচ বুকে নেই — এই ব্যাপারটা মস্তিষ্কের নাড়া দিতেই খুব রাগ হলো প্রিয়তার উপর। এই মেয়েটা সবসময় চই চই আর টই টই করে, একটা মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকতে চায় না তার বুকে।
আরো মিনিট কুড়ি লেগে গেলো প্রণয়ের পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে। পঁচিশ থেকে ত্রিশ মিনিট পর দৃষ্টি শক্তি, নিঃশ্বাসের গতি, হাত-পায়ের মুভমেন্ট সব কিছুই নিয়ন্ত্রণে আসলো।
প্রথমবার চোখ মেলে এক সমুদ্র পিপাসা নিয়ে তাকালো প্রণয় আশেপাশে। তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি মেলে ব্যাকুল চোখে খুঁজলো তার কাঙ্ক্ষিত রমনীকে। ডাগর ডাগর চোখের সেই ভীত হরিণীকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো তার নেত্র যুগল।
কিন্তু অনেক খুঁজে ওই নিষ্ঠুরতম রমণীটির দেখা পেল না প্রণয়, অথচ সেই রমণীর নেশালো গন্ধে ম-ম করছে তার সারাটা শরীর।
ধৈর্য হারা হয়ে দাঁতে দাঁত পিষলো প্রণয়। কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল ওভাবেই। তার সারাটা শরীর টনটন করছে, ভেতরের মাংসপেশিগুলো যেন ছিড়ছে স্পর্শের আকুলতায়।
কিছুক্ষণ যেতেই আশেপাশে হঠাৎ ধরাম করে শব্দ হলো। তড়িৎ বেগে চোখ খুলে তাকালো প্রণয়। দরজার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই সম্পূর্ণরূপে স্তব্ধ হয়ে গেলো প্রণয়, তার সমগ্র সত্তায় ছুয়ে গেল এক হিমেল হাওয়া।
তাড়াহুড়ো করে ঢুকতে নিয়ে কেবিনের ছোট্ট টুলটায় উষ্ঠা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লো প্রিয়তা। নিজের প্রাণ পুরুষের জ্ঞান ফেরার খবরটা শুনতেই মেয়েটা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছিল। প্রণয় ভাইয়ের কাছে দ্রুত ছুটে আসার তাড়নায় বেঁধেছে এই বিপত্তি।
প্রণয় কাতর চোখ দুটো এক সমুদ্র তৃষ্ণা বুকে নিয়ে অপলক তাকিয়ে আছে ছোট্টখাট্টো গড়নের ননী মাখন এর পুতুলটার দিকে। নিষ্পাপ মুখটার দিকে অনেকটা সময় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রণয়, প্রাণ ভরে দেখল তার হৃদয় হরণীকে।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এতক্ষণ দেখার পরেও মন ভরলো নাহ্, প্রাণে শান্তি মিলল না।
খটখটে মরুভূমির ন্যায় হৃদয়ের সর্বগ্রাসী তৃষ্ণার এক ফোঁটাও মিটলো না এতটুকুতে, বরং আরো আরো বেশি রুক্ষতা দেখা দিল। বুকটা চৈত্রর তপ্ত দুপুরের ন্যায় খাঁ খাঁ করে উঠল যেনো। এতক্ষণ দেখার তৃষ্ণা থাকলে এখন বুকে পিষে ফেলার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ছিড়ে গেল শরীর।
মেয়েটাকে নড়তে চড়তে না দেখে ধৈর্য হারিয়ে ফেলল প্রণয়। তপ্ত গনগনে কণ্ঠে হুংকার দিয়ে বলল—
“ওভাবে স্ট্যাচু হয়ে পড়ে থাকবি? আসবি নাহ্ আমার বুকে? দেখ শুধু তোর ওভাবে কিভাবে পুড়ছে জায়গাটা? আমার সব যন্ত্রণা সহ্য হয় কিন্তু তুই না থাকার যন্ত্রণাটা।”
“জান”
কথা বলতে বলতে কন্ঠটা নরম হয়ে এলো প্রণয়ের।
পুরুষালি কর্কশ কণ্ঠে ঘোর কাটল প্রিয়তার। উপচে পড়া পানিতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে গেল। এতক্ষণ তার মনে হচ্ছিল সে বুঝি কোনো স্বপ্ন দেখছে। প্রিয়তা লাফ দিয়ে বসা থেকে উঠে পড়ল। প্রণয় দুর্বল হাতটা বাড়িয়ে দিতেই চোখের পলকে বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রিয়তা।
সাথেই সাথেই উগ্র ব্যথায় চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল প্রণয়। বুকের বাঁ পাশটা টাটকা রক্তে ভিজে উঠল মুহূর্তেই। শরীরের ভারে কিছুটা পেছন দিকে হেলে পড়ল প্রণয়, পিঠ ঠেকলো বেডের সাথে, তবে এসব তুচ্ছ ব্যথাকে গুণায় ধরলো না প্রণয়। তার জানটা যখন তার বুকে আঁচড়ে পড়ে, ব্যথা বেদনা তখন নিজে থেকেই বিলীন হয়ে যায়। বুকটা বার কয়েক কেঁপে উঠলো প্রণয়ের, দুর্বল শরীরের সব টুকু শক্তি উজার করে ক্ষত বুকে জাপ্টে ধরল তার প্রাণপাখিকে।
নরম শরীরটা বুকের উপর গলে যেতেই চরম প্রশান্তিতে চোখ বুজে ফেলল প্রণয়। নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এলো। পুরুষালি শরীরের কোষে কোষে ছুটে গেল হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক কারেন্ট।
আহত বক্ষের তৃষ্ণা বাড়ল হলহল করে। বলিষ্ঠ দুই হাতের বেষ্টনীতে আরও শক্ত করে চেপে ধরলো নরম শরীরটা। ওই স্বর্গীয় প্রশান্তিটুকু আত্মার গভীরে উপলব্ধি করতে চায় প্রণয়। তবে আশ্চর্যজনক ব্যাপার— কখনোই এই পুঁচকে মেয়েকে বুকে নিলে তৃষ্ণা মেটে না প্রণয়ের, আরো আরো আরো বেশি করে কাছে পেতে মন চায়। ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতে মনচায়, তৃষ্ণা মেটে না কখনোই মেটে না।
বরং সেই উষ্ণ আলিঙ্গন আরো পাগল করে তোলে প্রণয়কে। আরো বেশি উন্মাদ বানিয়ে দেয় মেয়েটার প্রতি। নিজের শরীরের মাংস কেটে খাওয়াতে ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝে।
এই ছোট্ট মেয়েটা যতক্ষণ বুকে থাকে ততক্ষণ মনে হয় সে স্বর্গ রাজ্যের কোনো নন্দন কাননে আছে। অথচ যখনই একটু চোখের আড়াল হয় তখন লাগে— কেউ নির্দয়ভাবে তাকে স্বর্গপুরী থেকে মৃত্যুপুরীতে আছড়ে ফেলেছে। সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে আসে, ঝলসে যায় অনিল যন্ত্রণায়। আচ্ছা লোকে কী এসব বিশ্বাস করবে, নাকি এসব শুনলে পাগল বলে আখ্যায়িত করবে প্রণয়কে। সে যে যাই বলুক আর যাই করুক, প্রণয় তো জানে সে সত্যি লাগল শুধু পাগল নয়, বদ্ধ উন্মাদ।
প্রণয়ের গলায় উচুঁ হাড়টায় মুখ গুঁজে ডুকরে উঠল প্রিয়তা। এখনো ভয়ে তার তনুর শরীরটা কাঁপছে তিরতির করে। এতটা কাছে পাওয়ার পর যেখানে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে চিৎকার দিয়ে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে মন চাচ্ছে প্রিয়তার। ঠোঁট ভেঙে কান্না আসছে একসময়।
শব্দ প্রতিরোধে ব্যর্থ হলো প্রিয়তা। গলার কাছের পোশাকটা খামচে ধরে উচ্চ শব্দে কেঁদে উঠল। উষ্ণ গরম পানিতে ভিজিয়ে দিতে লাগলো প্রণয়ের বুক।
চোখ বন্ধ করে ফেলল প্রণয়। ডান হাতটা রাখল মাথায়, বড় বড় আঙুলগুলো গলিয়ে দিল রেশমি চুলের গভীরে। ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নরম আদুরে গলায় বলল—
“আমার প্রাণপাখিটা আমার জন্য অনেক কেঁদেছিস তাইনা, অনেক পাগলামি করেছিস? অনেক বকা ও দিয়েছিস নিশ্চয়ই মনে মনে, আই অ্যাম সরি বাচ্চা।”
প্রিয়তা জবাব দিল না, প্রণয়ের আদুরে কণ্ঠের নরম বাক্যগুলো তার কান্নার তীব্রতা বাড়িয়ে দিলো কয়েক গুন। বুকে মাথা রেখে ধুকতে ধুকতে কাঁদতে লাগলো প্রিয়তা। প্রিয়তার করুন কান্নাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো প্রণয়। প্রিয়তাকে বুক তুলে আলতো করে দুই গালে হাত রাখলো। বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা আলতো করে মুছে দিল চোখের পানি। প্রিয়তার কান্না জরজড়িত রক্তিম মুখটা একদম বুকের গভীরে আঘাত করলো প্রণয়ের।
প্রিয়তার গলার খাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে করুণ কণ্ঠে বলল—
“আমার জান চুপ কর পাখি, আমার লক্ষ্মী সোনা একটু চুপ কর। তোর অসুস্থ মানুষটার ওপর একটু দয়া কর। প্রয়োজনে তুই আরও দুইবার শুট কর দে আমার বুকে, তবুও এভাবে আমার বুকে মাথা রেখে চোখের পানি ফেলিস না, দম বন্ধ লাগে আমার।”
প্রিয়তা কান্না ঠেকাতে পারছে না কিছুতেই। আঁকড়ে ধরার তীব্রতায় নখ দেবে যাচ্ছে প্রণয়ের পিঠে। প্রণয়ের মাথাটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরল প্রিয়তা। হেঁচকি তুলে বলল—
“আপনি ঠিক কতটা খারাপ মানুষ আপনি জানেন প্রণয় শিকদার? জানেন না ভাবতেও পারবেন না।”
প্রণয় আরেকটু গুটিয়ে গিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তার, মুখ গুঁজে দিলো নরম বুকের খাঁজে। পরম সুখে বিশাল শরীরটা নিজের ভার ছেড়ে দিচ্ছে ছোট্ট একটা বুকে, প্রিয়তা ও সবটুকু দিয়ে আগলে নিচ্ছে, হয়তো চেষ্টা করছে ওত বড় শরীরটা নিজের বুকের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলার। ঘ্রাণের তীব্রতায় নেশা লেগে যাচ্ছে প্রণয়ের। সে আধো আধো কন্ঠে বলল—
“আচ্ছা তাহলে তুই বলে দে আমি কতটা খারাপ মানুষ, আর হ্যাঁ খারাপ হলে যদি এমন সুখ আর ভালোবাসা পাই তাহলে পৃথিবী শ্রেষ্ঠ নিকৃষ্ট মানুষটা হতে ও দ্বিধা নেই আমার, যদিও আমার নিকৃষ্টতার তুলনা নাই।”
কথা বলতে বলতে প্রিয়তার নরম বুকে নাক-মুখ ঘষছে প্রণয়। প্রিয়তমার শরীরের মিষ্টি গন্ধটা তাকে সব যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে, অন্তরে ঢেলে দিচ্ছে অঢেল প্রশান্তির সাগর।
এতগুলি গুলি খাওয়ার পরেও সে বেঁচে আছে, এটা ভাবলেই তো আশ্চর্য লাগে। এই বেঁচে থাকাটা কিসের জন্য, কার জন্য।
এই নিশ্চিত মৃত্যু থেকে ফিরে আসার গোপন মন্ত্রটা কী, সত্যি সে মরতে চায়নি এটা, নাকি তার লোভ তাকে মরতে দেয়নি এটা?
“লোভ”।
হ্যাঁ, লোভই তো। আবরার সিকদার প্রণয় যে বড় লোভী। এই রমণীকে বুকে আঁকড়ে ধরে হাজার বছর বাঁচার অদম্য লোভ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যমের দুয়ারে থাকাকালীন তার পা টেনে ধরেছে। তার লোভ তাকে মরতে দেয়নি। তাকে বার বার বুঝিয়েছে একবার মরে গেলেই সব শেষ হয়ে যাবে, তোর আর কোনদিন ফিরতে পারবি না তুই বুকে। এই নরম হাতে স্পর্শ, এই মাতাল করা শরীরের গন্ধ, এ পাগল করা সবকিছু থেকে বঞ্চিত হবে চিরতরে।
এই রমনীকে হারানোর ভয়, ওই রমণীকে আবারও পাওয়ার তাড়না— এসবই তাকে মরতে দেয়নি, যমের দুয়ার থেকে টেনে এনেছে।
প্রিয়তা প্রণয় কে বুকে একের পর এক নিজের অবুঝ মনের সমস্ত অভিযোগ করে দিচ্ছে। প্রিয়তার বুকে ঘাপটি মেরে সে সব চুপচাপ শুনছে প্রণয়। তার ময়না অনেক রেগে আছে। বেশি রাখলে আবার গাল দুটো ফুলে নাকটা লাল হয়, বড্ড লাগে তখন।
তবে রাগের চোটে চিৎকার করা প্রিয়তার স্বভাবে নেই। রাগ ধৈর্য সীমানার উপরে উঠে গেল বাচ্চাদের হাত-পা ছড়িয়ে কান্না করে দেয় প্রিয়তা, এই যে এখন যেমন আবার কান্না পেয়ে গেলো। প্রিয়তা নাক টানতে টানতে বলল—
“প্রিয়তাকে ধোঁকা দিয়ে তার প্রণয় ভাইকে কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন, ভেবেছিলেন তার প্রণয় ভাইকে নিয়ে অনেক দূরে পালিয়ে যাবেন? কত বড় খারাপ লোক আপনি! আমার প্রণয় ভাইয়ের যদি কিছু হতো আপনাকে ছাড়তাম না আমি। ঠিক পিছু নিতাম।”
ছোট্ট জবাব প্রণয়ের—
“হুমম, তারপর?”
প্রিয়তা নীরবে গাল মুছে বললো—
“তারপর আবার কী? আপনার সাথে আর কোনোদিন কথা বলতাম না। আচ্ছা আমি কী ঠিক দেখছি প্রণয় ভাই, আপনি কি সত্যিই আছেন? নাকি এটা আমার ভ্রম, পাগল হয়ে গেছি আমি? আপনি সত্যি আছেন।”
“আমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারতি জান? কষ্ট হতো না একটু ও? আমি ছাড়া রাতে বুকে নিয়ে তোকে কে ঘুম পাড়াত, কে তোকে আদর করে খাওয়াতো, কে তোর এতো এতো বায়না শুনত। আর আমি আমার জান যদি আমার সাথে কথা না বলতো তাহলে এই জীবন দিয়ে আর কী করতাম আমি।”
আবারও চোখের কোণে পানি জমতে শুরু করল প্রিয়তার। আহ্লাদি গাল দুটো ফুলে উঠল অভিমানে। ব্যাপারটা টের পেয়ে ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেললো প্রণয়। আহত গলায় বলল—
“উফ আবার কাঁদে! তোর এই কান্নাকাটির চোখ করে কবে জানি আমি হার্ট অ্যাটাক করবো জান। ওকে লিসেন তোর প্রণয় ভাইকে নিয়ে আমি কোথাও পালিয়ে যাইনি যাচ্ছি ও না, দেখ আমি তোর কাছেই আছি, তোর বুকে আছি। ফিল কর আমায়।”
বলে প্রিয়তার বাঁ হাতটা টেনে নিজের গালে রাখল প্রণয়। কপালে কপাল ঠেকিয়ে ডান হাতের তালুতে গভীর চুমু খেলো। তিরতির করে কাঁপছে প্রিয়তার নরম কোমল ঠোট দুটো। দুজনেরই চোখ বেয়েই গড়িয়ে নামছে পানি। প্রণয় কণ্ঠে অজস্র ব্যাকুলতা মিশিয়ে বলল—
“তুই শুধু শুধু ভয় পাস, শুধু শুধু চিন্তা করিস। আমার অভিমানী রাজকন্যাটাকে ফেলে আমি কি মরে শান্তি পাব? বল, এই সামান্য চারটা গুলির কী সাধ্য আমার থেকে আমার প্রাণ কেড়ে নেবে, আমাদের দুজনের মধ্যে মৃত্যু নামক দেয়াল তুলে দেবে, বললেই হলো নাকি?
ভালোমতো চেয়ে দেখ আমায়, ছুঁয়েও দেখ, আদর কর, ভালোবাস আমায় মার কাট তবু ও বিশ্বাস কর আমি আছি, তোর কাছেই আছি। ট্রমাটাইজড হয়ে থাকিস না জান। গুলি খেয়েছি, মরে তো যাইনি। আমার বার্বি ডলের কাছে ফিরে তো এসেছি। আরেকবার কাঁদলে থাপ্পড়ে গাল লাল করে দেব কিন্তু।”
প্রিয়তা বুকে ঝাপিয়ে পড়ে আরো দুই মিনিট কাঁদলো ইচ্ছামত। প্রণয়ের দুই গালে হাত রেখে ঠোঁটে, কপালে, নাকে, গালে, গলায় চোখে অজস্র চুমু আঁকল। প্রণয়ের সারা শরীর ছুঁয়ে দেখতে দেখতে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলল—
“খুব ব্যথা লেগেছে তাই না প্রণয় ভাই? খুব কি ব্যথা করছে?”
নিজের নরম পুতুলটাকে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে বুকে টেনে নিল প্রণয়। প্রিয়তার তুলতুলে ঠোঁট দুটোর ওপর আলতো ঠোঁট চেপে বলল—
“উঁহু একটুও না। তোর ছোঁয়াতে আমি একদম সুস্থ হয়ে গেছি। একদম ফিট, ইউ আর মাইন, ইউ আর মাই ড্রাগ জান, আই অ্যাম ডেডলি অবসেশড উইথ ইউ। আই কান্ট লিভ উইদাউট ইউ।”
প্রিয়তার কান্না পায় তবুও সে কাঁদে না। নিজের প্রেমিক পুরুষের বুকের ওমে লেপ্টে থাকে, শুনতে থাকে তার আদুরে আলাপ।
প্রিয়তাকে আদর করতে করতে গলা জড়িয়ে আসে প্রণয়ের। নরম অস্তিত্বে ঠোঁট বুলিয়ে বলতে থাকে—
“আমার অস্তিত্বটা আমার দেহের অংশ না হয়ে কেন দেহের বাইরে জন্ম নিল বলতে পারিস জান? কেন সৃষ্টিকর্তা আমার অংশটা কেটে আলাদা করলেন? কেন আমার প্রাণের সাথে জুড়ে দিলেন না? তুই আর আমি মিলে কেন ‘আমরা’ হলাম? তোর তোর আলাদা শরীরের প্রয়োজন ছিল না। দেখ তুই আমার শরীরের অংশ কোথাও একটা থেকে হয়তো কেটে আলাদা করা হয়েছে। তুই আর আমি তো একই তাইনা, আমাদের তো আলাদা আলাদা শরীরের প্রয়োজন নেই, তাহলে কেন তিনি আমাদের আলাদা আলাদা শরীর দিলেন? আমার জানটাকে তো আমার মধ্যেও দিতে পারতেন, বল। দেখ আমার লম্বা চওড়া এত বড় শরীরের কোথাও কি তোর একটুখানি জায়গা হতো না? তুই আর আমি যদি মিলেমিশে এক হতাম তাহলে কেউ তো আর আমাদের আলাদা করতে পারত না, এমনি মৃত্যু নামক চির বাস্তব ও তোর আর আমার মধ্যে দেওয়াল উঠাতে পারত না। আমার বুকের ঘামে সর্বক্ষণ লেপ্টে থাকতি তুই। যখন খুশি তখন তোকে বুকের মাঝে লুকিয়ে নিতাম, আদর করতাম, জন্ম জন্মান্তর বুকে পুষে রাখতাম, আমার করে রাখতাম।”
প্রণয় অবুঝপনায় অসহায় আহাজারীতে নিঃশব্দে হাসে প্রিয়তা। অবাক হয় এই মানুষটা তাকে ভালবাসতে বাসতে কোন পর্যায়ে চলে গেছে, এত বড় আর জ্ঞানীগুণী মানুষ হয়ে ও বাচ্চাদের মতো অসম্ভব আবদার করছে।
প্রিয়তা মাথা উঁচিয়ে প্রণয়ের কালচে লাল ঠোঁটে চুমু খায়। প্রণয় আধা-শুয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে ছিল। প্রিয়তা উঠে আসে প্রণয়ের শরীরের উপর, দুই পা দুই দিকে দিয়ে বসে পড়ে কোমর আর পেটের সন্ধিক্ষনে। গলা জড়িয়ে ধরে আবারও চুমু খায়, আহ্লাদি কণ্ঠে বলে—
“হুমমম, প্রকৃতির বিরুদ্ধে আপনার এই আন্দোলনে প্রিয়তা সবসময় পাশে আছি। আপনি বরং এবার ভোটে দাঁড়িয়ে যান। তবে মার্কা যদি হয় প্রণয় ভাইয়ের ঠোঁট, তাহলে আমি তনয়া সিকদার প্রিয়তা একাই দেব ১৬ কোটি ভোট।”
বলেই আবারও নিবিড় ভাবে ঠোঁটের ভাঁজে ঠোঁট মিলিয়ে দিল প্রিয়তা। চোখে হাসলো প্রণয়, জামার নিচে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে কোমর আঁকড়ে ধরল।
কন্ট্রোল রুমের অনেকগুলো বিশাল আকৃতির প্রজেক্টর এর মধ্যে একটি সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর ইব্রাহিম ও শুদ্ধ।
শুদ্ধর চোখ দুটো স্থির এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে প্রজেক্টর স্ক্রিনের দিকে, তবে ডক্টরের মনোযোগ সেদিকে নয়, উনার গভীর পর্যবেক্ষনি চোখ দুটো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে একটু পর পর শুদ্ধের মুখের বদলানো অভিব্যক্তি।
সাইকোলজিক্যালি ব্যাপারটা খুবই ডিপ। ডক্টর অযথা প্রশ্ন করে বিভ্রান্ত করলেন না, সামনে তাকিয়ে সাবলীল গলায় বললেন,
“এভাবে পেশেন্টের প্রাইভেট মোমেন্টের ফুটেজ চেক করার নিয়ম নেই ডক্টর চৌধুরী, ইট ইজ আ ক্রাইম।”
দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরল শুদ্ধ। এতটাই শক্ত করে চেপে ধরল যেন এখনই ঠোঁট কেটে রক্ত বেরিয়ে আসবে।
সে আজ হাড়ে হাড়ে টের পায় তার কলিজাটা আসলে কত বড়। এমন কলিজা কি কখনো হতো প্রণয়ের? হুহ কবেই মরে যেত। এই দিক থেকে সে প্রণয়ের চেয়ে বহু গুণ এগিয়ে আছে? তার অমায়িক ধৈর্যশক্তির কোন তুলনা নেই।
“ডক্টর চৌধুরী,”
প্রত্যুত্তর করল শুদ্ধ। তাচ্ছিল্যের হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলল,
“আই নো ডক্টর ইট ইজ আ ক্রাইম, বাট আই অ্যাম হেল্পলেস। আমাকে যে ২৪ আওয়ারস ওপর নজর রাখতেই হবে।
নাহলে কি আমারও শখ জেগেছে নিজের কলিজাটা কেটে ফালি ফালি করার?”
শুদ্ধের চোখের গভীরতা পর্যবেক্ষণ করে ডক্টর বললেন,
“ইউ লাভ হার ডক্টর চৌধুরী অ্যাম আই রাইট?”
শুদ্ধ মলিন হাসলো, ঘোর বিরোধিতা জানিয়ে বলল,
“নো নো ডক্টর, আই ডোন্ট লাভ হার। আই অ্যাম অ্যাডিক্টেড টু হার।”
“ওকে, বাট ইউ কুড নট লাভ হার মোর দ্যান হিম।”
ডক্টরের স্পষ্ট কথার খোঁচাটা বুকের খুব গভীরে লাগলো শুদ্ধের, পুরুষালী ইগো হার্ট হলো। এতে চট করে রাগ ধরে গেল শুদ্ধর। মেজাজ হারিয়ে বলল,
“হোয়াট ননসেন্স!”
ডক্টর উত্তেজিত হলেন না, আগের ন্যায় স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
“ইয়েস ডক্টর চৌধুরী, দেখেন কেমন করে ভালোবাসে ওই মেয়েটিকে, কেমন করে আগলে রাখে। ওভাবে কী আর কেউ কোনোদিন পারবে ওই মেয়েটিকে ভালোবাসতে, ওভাবে আগলে রাখতে? কোনদিন পারবেনা নট ইভেন ইউ।”
“সিরিয়াসলি?”
“প্রশ্নটা নিজেকে করুন ডক্টর চৌধুরী।”
ডক্টরের ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নে নিভে গেল শুদ্ধ। অনিমেষ চোখে তাকালো স্ক্রিনে, যেখানে জ্বলজ্বল করছে একটি দৃশ্য। প্রিয়তা উন্মত্ততায় লক্ষ না করলে ও শুদ্ধ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে প্রণয়ের পোশাকের ওপরের তাজা রক্ত, যা কিনা ক্ষতস্থান থেকেই চুইয়ে চুইয়ে ক্রমাগত বের হচ্ছে।
হয়তো এখনো বুকে চাপ লাগছে।
কী পরিমাণ ব্যথা পাচ্ছে তার আন্দাজ করতে গেলে ও গা কাটা দেয় শুদ্ধর।
তবুও প্রণয়ের ঠোঁটে প্রাপ্তির হাসি, চোখ-মুখ উজ্জ্বল। ব্যথা-বেদনার লেশটুকুও নেই কোথাও। সামনে তাকিয়ে আচানক প্রশ্ন করে বসল শুদ্ধ। আনমনেই বললো,
“যে বুক মাত্র সাত দিন আগেই চারটে গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, ব্যথা-বেদনায় জর্জরিত হয়ে আছে, ওই বুকে বারবার কীভাবে কাউকে চেপে ধরা সম্ভব ডক্টর? কোনো স্বাভাবিক মানুষ কি পারবে এই অমানবিক কাজটা করতে? মাত্র সাত দিন আগেই তো এত কিছু হলো, জায়গাটা তো এখনো তাজা, একটুও শুকায়নি, হালকা স্পর্শ লাগলেই তো ব্যথায় চিৎকার দিয়ে ওঠার কথা। দেখুন চাপ লাগাতে কিভাবে ব্লিডিং হচ্ছে। ও কি মানুষ? ওর নিজের ওপর কি মায়া নেই? ওর কী একটুও ব্যথা লাগে না? একটু ও কষ্ট হয় নাহ্?”
শুদ্ধর প্রশ্নে হাসলেন ডক্টর। তিনি একজন অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্ট, মুখ দেখেই বুঝতে পারেন কার মনের ব্যামো ঠিক কতটা গভীর। তিনি প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“না, স্বাভাবিক কোনো মানুষের পক্ষে তো সম্ভব না। আপনার প্রশ্নের উত্তরটা কিছুটা জটিল ডক্টর চৌধুরী।”
“দেখুন আবরার শিকদার প্রণয়ের মতো গ্রে শেডের চরিত্রদের বিশ্লেষণ করা দুঃসাধ্য। তবুও যতটা আন্দাজ করা যায়— আপনি নিজেই তো বলেছেন, সে ‘অন্ধকারের রাজা’। আর এই ধরনের চরিত্ররা সাধারণ মানুষের শরীরবৃত্তীয় নিয়মের ঊর্ধ্বে থাকে। তাদের চালিকাশক্তি মস্তিষ্ক বা হৃদপিণ্ড নয়, বরং তাদের ‘অবসেশন’। এক বাক্যে সারভাইভাল প্রসেস যাকে বলে, টিকে থাকার জন্য এদের মস্তিষ্ক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোগ্রাম করে নেয়। আপনার প্রশ্নের উত্তরগুলো যদি একটু বিশ্লেষণ করি তাহলে—
১. মায়া কি নেই?
নাহ্, নিজের ওপর তার কোনো মায়া নেই। এমনকি এক বিন্দুও না। প্রণয়ের মতো মানুষের কাছে নিজের শরীরটা কেবল একটা মাধ্যম, যার একমাত্র উদ্দেশ্য প্রিয়তাকে আগলে রাখা, তাকে কাছে পাওয়া, তাকে ভালোবাসা, চোখের তৃষ্ণা মেটানো। এর জন্য তারা তাদের শরীরের সাথে যা কিছু করে ফেলতে পারে এতে তাদের কিছুই যায় আসে না।
নাহলে দেখুন, সাত দিন আগে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট হওয়ার পর যেখানে একজন মানুষের নড়াচড়া করার কথা নয়, সজ্ঞানে থাকলে ব্যথা চিৎকার করার কথা, সেখানে সে একটা জীবন্ত মেয়েকে বুকের মধ্যে পিষে ফেলতে চায়— কারণ তার কাছে শারীরিক ক্ষতের চেয়ে ‘প্রিয়তাহীনতা’র ক্ষতটা অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। তার থেকে এই দগদগে ঘায়ের টনটনে ব্যথাটা বেশি আরামের।
২. ব্যথা কি লাগে না?
ব্যথা অবশ্যই লাগে, আর সেই ব্যথার তীব্রতা সহ্য করার ক্ষমতা সাধারণ কোনো মানুষের নেই। এমন অমানবিক ব্যথার ডেসিবল অনেক উপরে আমরা নিজের চোখেই দেখেছি— ‘সে উগ্র ব্যথায় চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছে’ তবে মুখ দিয়ে সামান্য উফ পর্যন্ত বের করেনি। মানে সে ব্যথাটা অনুভব করছে ঠিকই, কিন্তু সেই ব্যথার তীব্রতার চেয়ে প্রিয়তার গায়ের গন্ধ আর তার অস্তিত্বের সান্নিধ্য তার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ‘পেইনকিলার’। এটা এক ধরনের ‘Masochistic’ প্রেম, যেখানে প্রিয়তমার জন্য পাওয়া কষ্টটাও ব্যক্তির কাছে পরম সুখের মনে হয়।
৩. সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে কি সম্ভব?
একদমই না। কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এটা কখনোই সম্ভব নয়। কিন্তু এখানে সবথেকে বড় উত্তর প্রণয় তো সুস্থ নয়, সে উন্মাদ, সে অসুস্থ। তার ভালোবাসাটা একটা রোগ, একটা চরম পর্যায়ের আসক্তি যেখানে মানুষ আর মানুষ থাকে না। সাত দিন আগে হার্ট পাল্টানোর পর যে প্রচণ্ড ‘ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট’ ওষুধ আর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সে যাচ্ছে, সেখানে এই পাগলামি কেবল তখনই সম্ভব, যখন কারো ইচ্ছাশক্তি পাহাড়ের মতো দৃঢ় হয়।
সে নিজের ক্ষত, নিজের নতুন হৃদপিণ্ড— সবকিছুর তোয়াক্কা না করে সর্ব শক্তি দিয়ে প্রিয়তাকে জাপ্টে ধরল, এটাই তো প্রমাণ করে যে প্রণয় শিকদারের কাছে প্রিয়তাই তার একমাত্র হৃদপিণ্ড। শরীরের ভেতরে যেটা ধুকপুক করছে, ওটা কেবল একটা যন্ত্র, কিন্তু তার আসলে প্রাণ তো স্পন্দিত হয় দেহের বাইরে ওই একরত্তি মেয়েটার মধ্যে। সে যে নিজের ওপর মায়া করে না, এটাই তাকে ‘অন্ধকারের রাজা’ বানিয়েছে। সে ব্যথার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে হাসতে জানে, যদি সেই হাসির কারণ হয় প্রিয়তা। এই অমানবিক সহ্যশক্তি আসলে মানুষকে বাঁচায় না, এক পা এক পা করে ধ্বংসের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করায়।”
“সহজ ভাষায় বলতে গেলে ওদের ভালোবাসা—
মিষ্টি? — না।
সুন্দর? — না।
শক্তিশালী? — হ্যাঁ।
বিপজ্জনক? — খুব।”
“ও তো ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে ডক্টর, ধ্বংসের দোরগোড়ায়,” মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল শুদ্ধ।
ডক্টর এবার শুদ্ধের দিকে তাকিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে বললেন,
“এখন বলুন আপনি কী এমন করে ভালোবাসতে পারতেন?”
প্রশ্ন শুনে শুদ্ধ কেবল হাসলো, কোনো জবাব দিল না। মানুষও কত অদ্ভুত কিসিমের আজব প্রাণী! আপনি শান্ত থাকলে বলবে আপনি তো ভালোইবাসেন না, আবার আপনি উন্মাদনা দেখলে বলবে আপনি তো পাগল সুস্থ মানসিকরোগী যেমনটা একটু আগে শুনতে হলো প্রণয় কে।
“উহুম উহুম ভাবি আসব?”
কারো দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দে প্রণয়ের থেকে ছিটকে দূরে সরে গেল প্রিয়তা। সাথে সাথেই “আহ” করে ব্যথাতুর করে উঠল প্রণয়। চোখ-মুখ খিঁচে ধরল সহসা। প্রণয়কে আর্তনাদ করতে দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিল প্রিয়তার। আবারো ঝড়ের বেগে কাছে চলে এল। পাগলের মতো চোখ-মুখ হাতড়ে শুধাল,
“কোথায় ব্যথা লেগেছে আপনার?”
হাত দুটো বুকের ওপর যেতেই থমকে গেল প্রিয়তা। মস্তিষ্কের নিউরনে ত্বরিৎ ছুটে গেল যেন মুহূর্তেই। বাঁ হাতটা চোখের মেলে ধরতেই শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠল প্রিয়তার। রঞ্জিত হাতের টকটকে লাল রঙটা দেখতেই তার রক্তের প্রতি ভীতি সক্রিয় হতে শুরু করল তবে সেই মাথা ঘুরানো মোটে ও পাত্তা দিল না প্রিয়তা চোখ ভর্তি পানি নিয়ে তাকালো প্রণয়ের শান্ত মুখোশ্রীর দিকে।
লাল রঙের রক্তটা দেখে মনে হলো এটা বুঝি তার বুক থেকেই বেরিয়েছে। দু চোখের পানি উপচে গড়িয়ে পড়লো প্রিয়তার। নিজের দিকে চোখ পড়তেই পুনরায় থমকে গেল সে তার সাদা থ্রি পিসটার যত্রতত্র লেগে আছে তাজা রক্ত, অথচ এতক্ষণ সে খেয়ালই করেনি। বাহির থেকে এখনো শোনা যাচ্ছে জাভেদের হাক, “ভাবি?”
মেয়েটার চোখে পানি দেখে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল প্রণয়। আবারো টেনে বুকে নিতে চাইল কিন্তু এবার আর গেল না প্রিয়তা। মনের পরতে পরতে জমল অভিমানের মোটা আস্তরণ। লোকটা মানুষ নাকি অন্য কিছু বুঝতে পারে না প্রিয়তা। দৃষ্টি নামাতেই ফুঁপিয়ে উঠল। প্রণয় জোর করল আবারো, কোমর টেনে কাছে আনল নিজের। বুকের সাথে মিশিয়ে তৃপ্ত কণ্ঠে বলল,
“কাঁদিস কেনো আমার একক জীবনের একমাত্র পূজনীয় দেবী তো তুই। যার আরাধনায় তৎপর থাকি আমি সর্বক্ষণ। শুধু এটুকু রক্ত কেন, প্রয়োজনে আমার শরীরের সবটুকু রক্ত দিয়ে স্নান করাব তোকে। তবুও আমার বিন্দুমাত্র কষ্ট হবে না, কারণ আমার সবটুকু ব্যথার একমাত্র ওষুধ তো তুই জান। তুই কোনোদিন আমার ব্যথার কারণ হতেই পারিস না। আর এটা হালকা ব্লিডিং হচ্ছে, যা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে আমাকে ড্রেসিং করিয়ে দে।”
প্রিয়তা নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল। সে বুঝতে পারে না, একটা মানুষ তাকে কীভাবে এত ভালোবাসতে পারে! এই মানুষটার এক সমুদ্র ভালোবাসার নিকট আজকাল নিজের ভালোবাসাটা বড্ড ফ্যাকাশে লাগে প্রিয়তার।
“ভাবি?”
আবারো জাভেদের কণ্ঠে সরে গেল প্রিয়তা। বেড থেকে নেমে বলল, “জি ভাইয়া আসুন,” বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল প্রিয়তা।
গুটি গুটি পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল জাভেদ। চেহারাটা বিষণ্ণ নয় বেশ হাসিখুশি তবু ও চোখের কোণে চিকচিক করছে পানি। সে মায়া ভরা চোখে তাকাল বড় ভাইয়ের মতো মানুষটার দিকে।
তার এমন মায়া মায়া মুখটা দেখে ও মায়া লাগলো না প্রণয় এর ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে। জাভেদ এর দাঁত কেলানো দেখে গা জ্বলে গেলো প্রণয়ের মনে মনে আহম্মক বলে গালি দিতে ভুল করলো নাহ্।
এই আহাম্মকটা রং টাইমে রং জায়গায় এন্ট্রি নিয়ে তার রোমান্টিক মুডের বারোটা বেজেছে। এতদিনের উপোসী সে এতদিন পর বউকে একটু কাছে পেল অথচ এই মদনের জন্য একটু মন ভরে আদর ও করতে পারল না। বিরক্তিতে “ছ” সূচক উচ্চারণ করল প্রণয়। এই ব্যাটাকে শাস্তি তো দিতেই হবে।
জাভেদ ধাপে ধাপে পা ফেলে এসে বসল প্রণয়ের পাশে। নরম গলায় শুধাল,
“এখন কেমন লাগছে স্যার?”
প্রণয় চুয়াল খিটমিট করলো দাঁত খিঁচিয়ে বলল, “এতক্ষণ ভালোই ছিলাম কিন্তু তুমি মাঝখানে বা হাত ঢুকিয়ে পানি ঢেলে দিয়েছো।”
প্রণয়ের আগা মাথা ছাড়া কথা শুনে মহা আশ্চর্য হলো জাভেদ মুখ হা করে বললো “অ্যাঁ?”
রেগে গেলো প্রণয় জাভেদের দিকে মুখ এগিয়ে এনে সাশিয়ে বললো “তুমি কঠিন শাস্তি পাবে জাভেদ। এখান থেকে দেশে ফেরার পর টানা ছয় মাস তুমি আমার ফার্মহাউসে থাকবে। আমাকে ডিস্টার্ব করার এটাই তোমার শাস্তি।”
আচমকা এমন অর্ডার শুনে মাথায় নারকেল পড়ার মতো অনুভূতি হলো জাভেদের। বুক ফাটা আর্তনাদ করে উঠল বেচারা। মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “কেন স্যার?”
“এত বলতে পারব না। তবে আমার কথার নড়চড় যেন না হয়, নাহলে এরপর এক বছর বউয়ের মুখটাও দেখতে দেব না, নামটা ও ভুলিয়ে দেবো প্রয়োজনে নিজ দায়িত্বে ছেলে খুঁজে বিয়ে ও দিয়ে দেবো।”
প্রণয়ের সাশানীতে আতকে উঠল জাভেদ বউ তার জানের টুকরো। তার মতো বাচ্চা একটা ছেলের সাথে এমন নির্দয় আচরণ দেখে মনে মনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল জাভেদ। সে কিছুতেই বউ ছাড়া এতদিন থাকতে পারবে না। এই কয়দিনেই জানটা তার বেরিয়ে যাচ্ছে। বউ ছাড়া থাকতে হবে ভাবতেই ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কেঁদে দিল জাভেদ।
আরো অধিক বিরক্ত হলো প্রণয়, নিচু কণ্ঠে ধমকে বলল, “তুমি না পুরুষ? মেয়ে মানুষের মতো এমন ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদছো কেন?”
“স্যার আমি কিছুতেই এতদিন বউকে ছাড়া—”
বাকিটুকু বলার আগেই জামা পরিবর্তন করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল প্রিয়তা। জাভেদের বিষন্ন মুখটা লক্ষ করল। হাত স্যানিটাইজ করে ধীরে ধীরে প্রণয়ের ব্যান্ডেজ খুলতে খুলতে বলল, “মুখটা ওমন বাংলার পাঁচ করে আছেন কেন ভাইয়া?”
জাভেদের এবার হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে মন চাইলো। চিৎকার দিয়ে বলতে মন চাইলো, “ভাবী গো আমার কপাল পুড়েছে।” তবে মুখে বললো আমি ছয় মাসের জন্য এতিম হয়ে গেলাম ভাবী।
প্রিয়তা চোখ পিটপিট করে তাকালো বুঝতে না পেরে বললো “অ্যাঁ? কীভাবে?”
প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেল জাভেদ। ভয় ভয় তাকাল প্রণয়ের দিকে। চোখ দেখেই ঢোক গিলল। গাল অবধি উঠে আসা কথাগুলো আবার গিলে পেটে পাচার করে দিলো। হাসার চেষ্টা করে বলল, “হে হে মজা করছিলাম ভাবি।”
“ও।”
আর কিছু না বলে কেটে পড়তে চাইলো জাভেদ। মনে মনে মনস্থির করল পরে এক সময় স্যারের হাতে-পায়ে ধরে এই শাস্তির হাত থেকে বাঁচতেই হবে। তাকে যেতে দেখে প্রণয় বললো
“আমি যতদিন আছি ততদিনের জন্য হসপিটালের কন্ট্রোল রুমে তালা ঝুলানোর ব্যবস্থা করো।”
জাভেদ কোনো প্রশ্ন করলো না কেবল মাথা ঝাকিয়ে চলে গেলো।
প্রিয়তা পুনরায় ড্রেসিং পরিবর্তন করে দিল। বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে নিতেই হাত টেনে ধরল প্রণয়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল প্রিয়তা। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী?”
“আমাকে ছেড়ে কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
“একটু বাইরে।”
“একদম না। এক মুহূর্তও আমার চোখের আড়াল হবি না তুই।”
“ভাইয়া বলেছিল তো—”
“গুষ্টি কিলাই তোর ভাইয়ার! তুই আমার, আমার কাছেই থাকবি।”
প্রণয়ের বাচ্চামো দেখে ফিক করে হেসে দিল প্রিয়তা। এত বড় মানুষটা কীভাবে গাল উঁচু করে কথা বলে! ভীষণ আদুরে লাগে প্রিয়তার। প্রণয়ের গাল দুটো টেনে দিলো প্রিয়তার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললো,
“ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, ওই গুষ্টিটা আপনারও।”
প্রিয়তমার প্রাণজুড়ানো হাসিটা দেখে বুক ভরে উঠল প্রণয়ের। পলক ফেলতে ভুলে গেল কিছুক্ষণ। প্রিয়তা মুখ লটকে বলল, “প্লিজ হাতটা ছাড়ুন না, ভাইয়া নিচে অপেক্ষা করছে তো। আমি যাব আর আসব।”
প্রণয় ওর মিনতি কানেই নিল না। নরম হাতের কবজি টেনে ধরে একদম কাছে নিয়ে এল নিজের। বলিষ্ঠ হাতে পেট পেঁচিয়ে ধরে চেপে বসাল নিজের কোলে। ঘাড়ের ওপর থুতনি রেখে গাঢ় কণ্ঠে বলল,
“আই অ্যাম হাংরি জান, আই উইল ইট সামথিং।”
প্রণয়ের ক্ষুধা পেয়েছে শুনতেই তৎপর হলো প্রিয়তা। উঠে যেতে নিলে আবার চেপে বসালো প্রণয়।
কিছু বলার জন্য। মুখ হাঁ করতেই ফুলকো গালে টুকুস করে কামড় বসালো।
প্রিয়তা, “উফ” শব্দে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো।
ঘাড়ের মখমলে চামড়ায় নাক ঘষে গভীর শ্বাস টানল প্রণয়, সাথে সাথেই প্রমত্ত নেশায় বুঁদ হয়ে গেল পুরুষালি শরীর।
তার অনিয়ন্ত্রিত হাত দুটো লাগাম ছাড়া স্পর্শ করতে করতে পৌঁছে গেলো জামার নিচে।
তার হাত দুটো পেট ছাড়িয়ে উপরে উঠে আসতে নিলেই খপ করে ধরে ফেললো প্রিয়তা।
চোখ বন্ধ করে হাঁসফাঁস করে উঠল, দমটা যেনো আটকা পড়লো গলায়। ঠোঁট কামড়ে বিছানার চাদর শক্ত করে খামচে ধরল প্রিয়তা। হাত দুটো কে বাধা দিতে পারলে ও নির্লজ্জ পুরুষের ঠোঁটে দুটোর অবাধ্য স্পর্শে নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে প্রিয়তার।
প্রণয় আবেশিত গলায় মুখ ডুবলো নরম সুবাসিত ত্বক।
তার খুচা দাড়িয়ে স্পর্শ অনবরত লাগছে প্রিয়তার গালে গলায়।
এই লোকের অবস্থা বেগতিক দেখে ঢোক গিলল প্রিয়তা। আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করল,
“আ-আমি যাচ্ছি খাবার আনতে, আপনি—”
ঠোঁট দুটো আপনাআপনি ফাঁক হয়ে গেলো প্রিয়তার, আর কিছু গলা দিয়ে বেরোলো না। তার সাজানো শব্দগুচ্ছগুলো ঠোঁটের ডগায় এসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আদিম অনুভূতিরা ভয়ঙ্করভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে যেন।
অনুভূতির তোরে বুকের উপর থাকা হাতের বাধনটা আলগা হতেই হাত দুটো আবার দুষ্টুমি শুরু করে দিলো।
নরম মসৃণ উদর চেপে ধরে পেছন থেকে হেঁচকা টান দিল, সাথে সাথেই প্রিয়তার পিঠ ঠেকল প্রণয়ের বুকে।
প্রণয় ওর বড় বড় আঙুল চালিয়ে দিল প্রিয়তার উন্মুক্ত চুলে। মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে চোখে চোখ রাখল। গভীর বাদামি দুটোতে চোখে চোখ পড়তেই ছ্যাত করে শরীর জ্বলে উঠল প্রিয়তার। ওই ভাষা বুঝতে এতটুকু ও কষ্ট হলো না। লজ্জায় কুঁকড়ে গেলো প্রিয়তা আর এক মুহূর্ত ওই নেশা ডুবানো মরণ চোখে তাকিয়ে থাকতে পারল না, আপনাআপনি দৃষ্টি নিচু হলো।
উদ্গ্রীব হলো প্রণয়। টকটকে নরম গালে নাক ঘষতে ঘষতে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,
“আই ডোন্ট ওয়ান্ট নরমাল ফুড জান। আই ওয়ান্ট মাই প্রোটিন। অ্যান্ড ইউ আর মাই প্রোটিন।”
এমন অঙ্গ ঝললানো আবদার শুনে কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল প্রিয়তার। অকৃত্রিম লজ্জায় গাল দুটোর আভা বেড়ে গেল কয়েক গুণ। প্রণয়ের শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে নিজের বাড়ন্ত অনুভূতি মাটি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করল প্রিয়তা। কাঁপা কাঁপা অস্থির কণ্ঠে বলার চেষ্টা করল,
“আপনি অসুস্থ প্রণয় ভাই, আপনার অসুস্থ শরীরে এত ধকল সহ্য হবে না।”
কথাটি বলে তীব্র লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিল প্রিয়তা।
থির থির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটোর দিকে নেশাতুর চোখে তাকাল প্রণয়। লোভে তার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। গোলাপের পাপড়ির ন্যায় কোমল দুটো ঠোঁটে আলতো বৃদ্ধাঙ্গুলি চালিয়ে বলল,
“আমার দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য তোমাকে চাই জান। মাই বডি নিডস ইউ টু রিকভার। এভরি সেল অফ মাই হার্ট ইজ স্টারভিং ফর ইউ। ডোন্ট গো অ্যাওয়ে। স্টে হিয়ার। ফিড মাই সোল।”
শরীরটা অবশ হয়ে এল প্রিয়তার। চরম উন্মাদনায় প্রিয়তার গলদেশে মুখ ডুবাল প্রণয়। গলা থেকে ওড়নাটা খুলে ছুড়ে মারল ফ্লোরে। সর্বগ্রাসী অনুভূতি যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করছে দুজনকেই। ক্রমে ক্রমে হাত দুটো অবাধ্য হয়ে উঠছে প্রণয়ের। কামিজটা টেনে তুলে খুলে ফেলল প্রণয়। সাথে সাথেই লজ্জায় কুঁকড়ে গেল প্রিয়তা। পেছন ফিরে বালিশে মুখ গুঁজে দিল।
প্রিয়তমার লজ্জা দেখে হেসে ফেলল প্রণয়। এত এতবার নিজের করার পরও লজ্জা বুঝি ভাঙেনি একটুও! এত লজ্জা কোথা থেকে কুড়ায় মেয়েটা? প্রিয়তা দুই হাতে মুখ ঢেকে পড়ে রইল। তার মাখনের মতো ফর্সা উন্মুক্ত শরীরটা প্রণয়ের চোখের সামনে দৃশ্যমান— যেমন ভয়াবহ শিকারির সামনে ছোট্ট হরিণী।
ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত আলতো করে বার কয়েক স্লাইড করল প্রণয়। দম আটকে চোখ বুঝে পড়ে রইলো। তার ছটফটানি দেখে বাঁকা হাসলো প্রণয়। কানের কাছে মুখ নামিয়ে গাভীর নেশা জড়ানো কণ্ঠে বললো,
“তোমার এই কাপাকাপি আমাকে কিন্তু আরো বেশি উস্কে দিচ্ছে জান। দেখতে পাচ্ছো তোমার শরীরটা আমায় কী কী বলছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো জান নাহলে আমি ও পারবো নাহ্, খুব ব্যাথা দিয়ে ফেলবো তোমায়।”
প্রিয়তা লজ্জায় আড়ষ্ঠ হয়ে বললো,
“চুপ করুম অসভ্য লোক।”
গা দুলিয়ে শব্দ করে হাসলো প্রণয়। হাত বাড়িয়ে কালো ব্রার স্টিচটা খুলে দিল আচমকাই। বুকের ভেতর ঝড় উঠে গেলো প্রিয়তার, প্রাণপাখি যেন উড়াল দিলো মুহূর্তেই। প্রিয়তার নিঃশ্বাস আটকে গেল গলায়। উন্মুক্ত পিঠের প্রতিটা কোণে যত্ন নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল প্রণয়। হাত রাখল সুগঠিত কোমরের ভাঁজে।
হেঁচকা টানে তাকে নিজের দিকে ফেরাল প্রণয়। পুরুষালি শরীরের সবটুকু ভার ছেড়ে দিল নরম তুলতুলে শরীরে। প্রিয়তা চোখ মেলতে পারল না, শুধু অনুভব করছে তার প্রিয় পুরুষকে। তার এক্সপ্রেশন দেখে ঠোঁট কামড়ে ধরলো প্রণয়। কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে আলতো চুমু খেল। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ফিড মি জান, আই নিড মাই প্রোটিন।”
জবাব দেওয়ার সুযোগটুকু ও পেল না প্রিয়তা। স্পর্শকাতর অঙ্গে গরম জিভ পড়তেই সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠলো। আবেশে মৃদু স্বরে চিৎকার দিয়ে উঠল প্রিয়তা। দুই হাতের মুঠোয় খামচে ধরল প্রণয়ের চুল। মাথাটা চেপে ধরে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলতে চাইল। প্রিয়তা ছটফট করতে করতে আর সহ্য না করতে পেরে বলল,
“প্লিজ আমাকে… আহ্ প্রণয় ভাই Don’t Suck!”
বাকি কথাটুকু আর সম্পন্ন করতে পারল না প্রিয়তা, কণ্ঠস্বর জড়িয়ে গেল। চোখ উল্টে এলো প্রিয়তার, জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো।
প্রণয় মাতাল করা চোখ দুটো তুলে একবার তাকাল প্রিয়তার দিকে। অতঃপর পুনরায় ওপর পাশে মুখ ডুবাল। প্রিয়তার ছটফটানি বাড়িয়ে দিতেই তার হাত দুটো একত্র করে মাথার ওপর চেপে ধরল প্রণয়। নেশায় বুঁদ হয়ে ধমকে বলল,
“টানা নয় দিন অনাহারে ছিলাম, দেখেছি কিন্তু খেতে পারিনি। এখন খাওয়ার সময় জ্বালাবি ত থাম্প্রে মুখের মানচিত্র বদলে দেবো।”
আলতো প্রেস করতে করতে বলল প্রণয়।
প্রিয়তা জবাব দিতে পারলো না। ধারালো নখ দ্বারা খামচে ধরলো প্রণয়ের পিঠ। আবারো বুক থেকে রক্ত উঠতে দেখে মেজাজ হারালো প্রণয়। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“Fucking blood! Die later!”
প্রিয়তা দেখার আগেই প্রিয়তার উড়না দিয়ে মুছে নিলো প্রণয়। প্রিয়তার বক্ষ যুগলে নাক ঘষতে ঘষতে বেশ পুলকিত কন্ঠে বললো,
“এরা তো দেখছি আরেকটু বড় হয়েছে জান। আমার জান দুটো তো আমায় পাগল করে দেবে। দেখ কী সুন্দর লাগছে, এত সফট! ধরলেই তো হাতের মাঝে সুখ সুখ অনুভূত হচ্ছে।”
লজ্জায় প্রণয়ের বুকে মুখ লুকাল প্রিয়তা। অতিষ্ঠ হয়ে বলল,
“আপনার মুখে কি কিছু আটকাবে না?”
ঠোঁটে ঠোঁট চাপল প্রণয়। আদর দিতে দিতে বলল,
“আটকাবে কেন? এরা আমার মাথার ঘাম পায়ে ফেলার ফসল। এদের বৃদ্ধি বলছে আমার হাতে উর্বরতা আছে।”
“ইশশ!”
প্রিয়তার নিখুঁত বুকটা ভালোবাসার তীব্রতায় রক্তবর্ণ ধারণ করেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই। কামড়ের দাগগুলো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। আদর দিতে দিতে নাভিতে নেমে এল প্রণয়। প্রিয়তার নিখুঁত শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিতে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে লাগলো সে। শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিতে ঠোট ছুঁয়ালো।
ভালোবাসার তীব্রতায় একসময় কেঁদে উঠল প্রিয়তা। শব্দ করে আর্তনাদ করতে নিলেই তৎক্ষণাৎ মুখ চেপে ধরল প্রণয়। অসহায় চোখে তাকিয়ে কাতর কণ্ঠে বলল,
“শব্দ করো না জান। রুমটা সাউন্ডপ্রুফ নয়। তোমার চিৎকার শুনলে এক্ষুনি সবাই ছুটে আসবে।”
প্রিয়তার চোখ দিয়ে গলগল করে নোনা পানির স্রোত বইছে। প্রিয়তমার চোখে পানি দেখে প্রণয়ের বুকে ব্যথা হলো, তবুও সে নিরুপায়। তার যে কিছুই করার নেই। পাগল বানিয়েছ আর পাগলামি সহ্য করবে না, তা কী করে হয়! আমাকে জ্বালানোর শাস্তি তো তোমায় ভোগ করতেই হবে।
প্রিয়তার কপালে শব্দ করে গাঢ় চুমু আকলো প্রণয়। দুই চোখের পাতায় ছোট ছোট করে চুমু একে অসহায় কন্ঠে বললো,
“কষ্ট হচ্ছে জান। এই আমিটাকে তুই ছাড়া আর কে সামলাবে বল, এই তুই ছাড়া আর কে আগলাবে। আমার সমস্ত সত্ত্বা উজাড় করে কাকে ভালোবাসবো আমি। একটু সহ্য করে নে না জান। আমি তো যথাসম্ভব নিজেকে কন্ট্রোল করে তোকে আদর করার চেষ্টা করি, তারপর ও এতো ব্যাথা পাস। আমার এই অমানবিক ধৈর্য শক্তি না থাকলে তুই কী করতি।”
প্রিয়তা কিছু বললো নাহ। প্রণয় এর বুকে মুখ গুঁজে পড়ে রইলো। এই পুরুষের দেওয়া ব্যাথা বেদনা ভালোবাসা সব অমৃত।
সময়ের সাথে সাথে উন্মাদনা বাড়ে দুজনের। প্রিয়তাও একসময় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। দুজনের মিলনের মৃদু গুঞ্জনে মুখরিত হয় কক্ষ। ভালোবাসা আদান-প্রদানের সাক্ষী হয়ে থাকে নীরব প্রকৃতি। দুজন প্রেমিক যুগল যখন পাশাপশি থাকে যেকোনো স্থানি হতে পারে তাদের মিলন ক্ষেত্র।
সোহাগে, আদরে, ভালোবাসায় মিশে যায় দুটি দেহের একটি প্রাণ। ভালোবাসা ভয়ঙ্কর, ভালোবাসা সুন্দর। ভালোবাসা নীরব প্রকৃতি, ভালোবাসা খরস্রোতা নদী। ভালোবাসার বহুরূপ বহু রং। তবে কে কোন রঙে নিজেকে রাঙাবে তা তো ভাগ্যলিপি বলবে।
দেখতে কেটেছে আরও ২৫টা দিন। এই দিনগুলোর প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি সেকেন্ডে, প্রতিটা মিনিটে প্রণয়কে বুকে আগলে রেখেছে প্রিয়তা। হুট করেই যেন মেয়েটা অনেকটা বড় হয়ে গেছে। সে এখন প্রণয়ের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে অকপটে। কড়া শাসনে রেখেছে এই কয়দিন। প্রণয় “টু” শব্দ না করে মুখ বুজে সকল হুকুম মাথা পেতে নিয়েছে। ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করেছে প্রণয়। চিন্তা-চেতনা দূরে ঠেলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে প্রিয়তমার বুকে। তার ছোট্ট হরিণ শাবকটি যখন তার অভিভাবক হতে চাচ্ছে, সেখানে নিজেকে অবুজ বালক সাজিয়ে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আজ ২৫ দিন পর দীর্ঘ চড়াই-উতরাই শেষে শিকদার বাড়ির দুয়ারে দাঁড়িয়েছে প্রণয়—ঠিক যেমনটা গিয়েছিল, তেমনটাই। হাতের মুঠোয় তার প্রিয়তমা স্ত্রী। পাশে শুদ্ধ, প্রিতম আর প্রেম।
কলিং বেল চাপল প্রিয়তা। থিরা এসে দরজা খুলে দিল। দাদানদের দেখে খুশিতে আত্মহারা হলো থিরা। প্রণয়কে আলতো জড়িয়ে ধরে অভিমান করে বলল,
“আই মিস ইউ সো মাচ দাদান।”
বোনকে আগলে নিয়ে মিষ্টি করে হাসল প্রণয়। থিরা অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“সাত দিনের কথা বলে ৩৭ দিন পরে ফিরলে দাদান!”
প্রণয় মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আদুরে কণ্ঠে বলল,
“কাজ তো অনেক বেশি জমে গিয়েছিল বোনু। বাট আই অলসো মিস ইউ। এখন কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব?”
থিরা হাসিমুখে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল।
প্রণয়ের গুলি লাগার ব্যাপারটা শিকদার বাড়ির গুটিকয়েক লোক ব্যতীত অন্যরা অবগত নয়। চেনা-পরিচিত কণ্ঠগুলো শুনে নিজেদের ঘর থেকে বেরিয়ে এল রাজ, অরণ্য, সমুদ্র, প্রিয়স্মিতা, ইনায়া, ঊষা। সকলে শোরগোল বাধিয়ে দিল। ড্রয়িং রুমের কোলাহল শুনে বাড়ির বড়রাও চলে এলেন।
অনুশ্রী বেগম এতগুলো দিন পর নিজের ছেলেকে দেখেছেন। তিনি হাসিমুখে ছেলের দিকে এগোতেই—
“ঠাস!”
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮২
চপেটাঘাতের তীব্র শব্দে থমকে গেল সবাই। চোখ বড় করে একযোগে তাকাল শুদ্ধ ও প্রিয়স্মিতার দিকে। প্রিয়স্মিতা গালে হাত দিয়ে টলমলে চোখে তাকিয়ে আছে শুদ্ধর ক্রোধান্বিত মুখশ্রীর পানে। তার দু’চোখে জমাট বেঁধেছে অবিশ্বাস। তার ভালোবাসার মানুষটা তাকে মারল! রাগে ফোঁস ফোঁস করছে শুদ্ধর দু’চোখে যেন অগ্নি বর্ষিত হচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে রাগ কন্ট্রোল করতে অক্ষম সে। প্রিয়স্মিতাকে এক্ষুনি কাঁচা চিবিয়ে খাবে।
