Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৯

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৯

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৯
Sadiya Jahan Simi

আন চলে যাওয়ার পর রাতটা হঠাৎই ভারী হয়ে নামে ফিহাজ ম্যান্ডেলার ওপর। অদৃশ্য কোনো সংকেত পেয়ে যেন ফরাজী বাড়ির সেই রহস্যময় মানবটির আগমন ঘটে। সে আসে শব্দহীন পায়ে।চোখে শীতল দৃষ্টি, ঠোঁটে ধোঁয়া-ওঠা ড্রিংকের গন্ধ।
নারী কম পড়েছে!এই অভিযোগে তার কণ্ঠে হুমকি, ধামকি; প্রতিটি শব্দ যেন দেয়ালের ভেতর ঢুকে দাগ কেটে যায়। আনের ভয়ে কপালে মৃদু ঘামের রেখা। তারপর সে ঢুকে পড়ে ফিহাজ মেহেল্ডে।
ফিহাজ মেহেল্ডে:
মেহেল্ডে ঢুকতেই প্রথম যে অনুভূতিটা আসে,এটা কোনো সাধারণ বাড়ি নয়। এখানে বাতাসও ইতিহাস জানে। ছাদের ঝাড়বাতি ঝুলে আছে ভারী নীরবতায়; আলো পড়ে মেঝের মোজাইকে, যেন ছায়ার মানচিত্র আঁকে।
ফিহাজ মেহেল্ডের রয়েছে বিশেষ সাতাশটি কক্ষ।প্রতিরাতে ভেসে আসে অবলা নারীর আত্মচিৎকার। সাতাশটি কক্ষের বিস্তার।

১–৫ নম্বর কক্ষ: প্রবেশ ও স্মৃতির ঘর
প্রথম পাঁচটি কক্ষ জুড়ে প্রবেশদ্বার ও স্মৃতির গ্যালারি। দেয়ালে পুরনো ফ্রেম,অপরিচিত মুখ, চোখে একই রকম নীরব দম্ভ। কাঠের আলমারিতে চামড়া বাঁধানো নথি; পাতায় পাতায় গোপন লেনদেনের ছাপ। এখানে পা ফেললে মেঝে কেঁপে ওঠে, যেন সাবধান করে দেয়।
৬–১০ নম্বর কক্ষ: ড্রইং ও ড্রিংকের অঞ্চল
এই অংশে বড় ড্রইং রুম। মখমলি সোফা, ভারী পর্দা। এক কোণে বার,কাচে কাচে আলো ভাঙে। রহস্যময় মানবটি এখানেই থামে; ড্রিংক ঢালে, বরফে শব্দ তোলে। দেয়ালের প্যানেলে লুকোনো খোপ—হুমকির নোট, অর্ধেক পোড়া কাগজ।
১১–১৫ নম্বর কক্ষ: ব্যক্তিগত কামরা
এখানে নীরবতা গাঢ়। বিছানার হেডবোর্ডে খোদাই করা চিহ্ন, জানালায় লোহার গ্রিল। আয়নায় আলো পড়লে প্রতিফলন বিকৃত—নিজেকেই অচেনা লাগে। প্রতিটি কক্ষের আলাদা চাবি; তালা খুললে যেন অতীতের ফিসফিসানি বেরিয়ে আসে।

১৬–২০ নম্বর কক্ষ: ক্ষমতার করিডোর
লম্বা করিডোর, দেয়ালে মানচিত্র। টেবিলে ছড়ানো সিল, রিং, সিগনেট। এখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে—কে থাকবে, কে যাবে। কণ্ঠ নিচু, দরজা বন্ধ। বাতাসে সিগারের পুরনো গন্ধ।
২১–২৫ নম্বর কক্ষ: গোপন আর্কাইভ
এই পাঁচটি কক্ষই আসল রহস্য। বুকশেলফের পেছনে স্লাইডিং দেয়াল, নিচে নেমে যাওয়া সিঁড়ি। ধুলো-ঢাকা ফাইল, নাম্বারিং—সবকিছু নিখুঁত। একটিতে নারী-সংক্রান্ত হিসাব; এখানেই হুমকির কারণের সূত্র।
২৬ নম্বর কক্ষ: নজরদারি
ছোট কিন্তু শক্তিশালী। কাঁচের পর্দা, কালো মনিটর। চোখ সবখানে। কেউ হাঁটলে, কাঁচে তার ছায়া আগে পৌঁছে যায়।
২৭ নম্বর কক্ষ: কেন্দ্র
সবশেষের কক্ষটি সবচেয়ে বড়। গোল টেবিল, একটিমাত্র ঝাড়বাতি। আলো ঠিক মাঝখানে পড়ে বাকি অংশ অন্ধকার। এখানেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। রহস্যময় মানবটি দাঁড়ায়, গ্লাস নামায়। তার কণ্ঠে শেষ হুমকি—শান্ত, কিন্তু ধারালো।
ফিহাজ মেহেল্ডে তখন নিঃশ্বাস আটকে থাকে। সাতাশটি কক্ষের প্রতিটা যেন সাক্ষী—ড্রিংকের শেষ ফোঁটা পড়তেই বোঝা যায়, ভেতরের কাহিনী এখানেই থামবে না। অন্ধকারের গভীরে আরও কিছু অপেক্ষা করছে।

সন্ধ্যার আসর জমে উঠেছে মির্জা বাড়িতে। ড্রয়িং রুমে হইচই পড়ে আছে। আগামীকাল বাড়িতে মেহমান আসবে। কে বা কারা আসবে তা নিয়ে এখনো জানানো হয়নি ছোটদের। মাইশা অনেকক্ষণ যাবৎ মায়ের পেছনে ঘুরঘুর করেছে। মায়ের কাছ থেকে কিছু জানতে না পেরে মিম এর কাছে জিজ্ঞেস করেছিল। কিন্তু ফলাফল শূন্য; জিজ্ঞেস করতে গেলে মিম মুচকি মুচকি হাসছে। মাথা নিচু করে যেন লজ্জা পাচ্ছে। মাইশা ঊষা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখলো। ওদের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। একপ্রকার বিরক্ত হয়েই মাইশা হাল ছেড়ে দিল। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরেই উদ্যান রাফসা মির্জা বাড়িতে হাজির হয়। ভাইজিকে দেখে জোহরা মির্জা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ল । বহু বছর পর আজ মির্জা বাড়িতে রাফসার পা পরল। উদ্যান চলে যাওয়ার পর থেকে নিজেকে বন্দী করে ফেলেছিল রাখসা।

সারাক্ষণ পড়াশোনা আর নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল। ভালবাসার মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান পেলে যে কেউই ভেঙে পড়ে। তা যদি হয় আবার কিশোরী মনের প্রথম প্রেম। একতরফা ভালোবেসে নিজের সাথে নিজেই যুদ্ধ করেছে প্রতিনিয়ত। ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে সে পাষাণ পুরুষকে। প্রত্যাখ্যান পেয়ে তার কাছে ফিরে যাওয়া কি উচিত? মেয়েদের আত্মসম্মানবোধ বলতে ও কিছু আছে। যে ভালোবাসার মানে বুঝে না তাকে ভালোবাসার কোন মানেই হয় না। ভালো না বাসুক; অন্তত একটু সম্মান করুক। অপমান কেন করে ওরা। একতরফা ভালোবেসে হেরে যায় হাজারো নারী। কেউ কেউ তো বলতেই পারেনা মুখ ফুটে। বছর কি বছর তা কে নিয়ে একাই বয়ে যায়।শত কষ্ট হলেও শত কান্না করলেও তাকে মনের কথা বলা যায় না। প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ হয়, যদি প্রত্যাখ্যান করে দেয় সেই ব্যক্তি। ভালোবেসে বলে দেওয়াই উত্তম; মনে চেপে তা বয়ে বেড়ানোর মত কষ্ট পৃথিবীতে আর নেই। ভালোবাসা এমন একটা শব্দ যার প্রতি জন্মায় সে বুঝেনা, পায়ে পিষে মেরে ফেলে ভালবাসা শব্দটাকে।নিঃশেষ করে দেয় বাঁচার ইচ্ছে তাকে। সহজে পেয়ে গেলে তার কদর করতে পারে না।

“ভালোবাসা সুখ দেয় কম, কাঁদায় বেশি।”
“হুঁ? কি বললি? ভ্রু কুঁচকে বলে মিম।
রাফসা মেকি হাসলো।সন্ধ্যার নাস্তা ওরা একসাথেই করেছে। তারপর আসর জমেছে ড্রয়িং রুমে। কাজিনদের মাঝে এসব নিয়ে কথা হতে আনমনে রাফসা কথাটা বলে উঠলো। খানিকটা জোরেই বলেছে যার কারণে উপস্থিত সকলে শুনতে পায়। উদ্যান ওদের থেকে কিছুটা দূরেই বসে ছিল। ফোনের মাঝে সারাক্ষণ ডুবে থাকে এই লোক। বাক্যটা উদ্যানের কান ভেদ করতেই তড়িৎ গতিতে চোখ তুলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল রাফসার পানে। বাকিরা ও চেয়ে রইল। ঊষা মুখ চেপে একবার উদ্যানের পানে তো আরেকবার রাফসার পানে তাকাচ্ছে।রাফসার কথার মানে কেউ বুঝুক আর না বুঝুক ঊষা ঠিকই বুঝেছে। রাফসা শুকনো ঢোক গিলে ।কি বলেছে বুঝতে পেরে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। চোরা চোখে উদ্যানের পানে তাকাতেই চোখে চোখ পরল। উদ্যান ওর পানে শান্ত চাউনিতে চেয়ে আছে। দৃষ্টি ধারালো ছুরির ন্যায় ধারালো। উদ্যানের গভীর চোখের চাউনিতে চোখ মেলাতে হিমশিম খায় রাফসা। যতই নিজেকে চেঞ্জ করুক; অতীতের সব ভুলে সামনে এগিয়ে যাক না কেন,দিনশেষে এটাই সত্য কথা, উদ্যান ওর কিশোরী জীবনের প্রথম প্রেম প্রথম ভালোবাসা । যা কখনো হাজার চেষ্টা করেও ভোলা সম্ভব নয়। হয়তো অনুভূতি আগের মত থাকে না। আগের মত টান অনুভব হয় না। কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে তা সযত্নে বিলোন করে।

রাফসার অস্বস্তি বুঝতে পেরে ঊষা পরিস্থিতি সামাল দিতে বলে উঠলো, “সাইন্স নিয়ে পড়তে পড়তে মাথা গিয়েছে বোধহয় ওর। কখনো তো প্রেম ভালোবাসা জড়াইনি বুঝবে কি করে ও?”
রোহান ঊষার মাথায় মৃদু চাপড় মেরে বললো, “ও তার মানে তুই করেছিস তাই না! তুই কি করে বুঝলি প্রেম ভালোবাসা, আমায় একটু বোঝা।”

“ভালো লাগেনা মেজ ভাইয়া। তুমি শুধু আমায় মারো। শ্বশুর বাড়ি গেলে তখন বুঝবে, আর মারতে পারবে না হুঁ।”
রোহান হাসলো। ঊষা রাফসাকে কখনো আলাদা চোখে দেখেনি। ওর ছোট বোন জারা কে যেভাবে আদর করে, বাকিদেরও ঠিক তেমন করে আদর করে। কখনো আলাদা চোখে দেখেনি। বোনেরাও রোহানের পাগল। ভাইদের মধ্যে রোহান একটু প্রশ্রয় দেয়,হাসি-ঠাট্টা করে।যা অন্য ভাইদের মধ্যে দেখা যায় না। রিশান ব্যবসার কাজে ডুবে থাকে। কখন বাড়ি আসে কখন যায় তার টিকিটি অবধি জানা যায় না। আর উদ্যান, ওর কথা বলেই লাভ নেই। ছোট থেকেই উদ্যানকে স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেয়ে এসেছে ওরা।গম্ভীর মানুষ দেখলে যে কেউই ভয় পাবে। যদি আবার হয় একটু রুড। কিন্তু উদ্যান এর কাছে ছোটবেলায় রাফসা অনেক আদর পেয়েছে যা অন্য ভাই-বোনেরা পায়নি। রাফসা একটু একটু করে বড় হতে উদ্যান কেমন যেন পাল্টে গেল। রাফসার ধারে কাছেও যেত না।রাফসা উদ্যানের কাছে বায়না ধরলে ধমকে উঠতো উদ্যান।

ছোট রাফসা অভিমানে আস্তে আস্তে উদ্যানের সঙ্গ ছেড়ে দিল। বয়স চৌদ্দর কোটায় রাফসার। তখন একটু একটু পরিবর্তন এলো। উদ্যানের পার্সোনালিটি, গাম্ভীর্য ভাব, কথা বলার স্টাইল, খাওয়ার স্টাইল, সব কিছু দেখে রাফসার ছোট্ট মনে এক অজানা আবেগ জন্মালো। উদ্যান তখন মেডিকেল স্টুডেন্ট পুরো দমে পড়াশোনায় ডুবে থাকত সারাদিন।রাফসার ছোট্ট মনে সদ্য জন্মানো অনুভূতির কারণে উদ্যানের আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। উদ্যানের চোখে পড়লে তা,রাফসাকে বকে রুমে পাঠাতো।ওর আশেপাশেও যেন না দেখে বলে চোখ রাঙিয়ে ছিল। তখন থেকে রাফসাকে খুব একটা বেশি দেখা যেত না উদ্যানের আশেপাশে। চতুর উদ্যান যেদিন কিশোরী রাফসার মনের ভাব বুঝতে পেরেছিল সেইদিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারপর থেকে রাফসাকে পুরো দমে ইগনোর করা শুরু হয় উদ্যানের ।বাড়ির ছোট মেয়ে এমন একটা ভুল কাজে জড়িয়ে যাক তা কখনো চায়নি উদ্যান। এভাবেই দেখতে দেখতে বছর পেরেলো। কিশোরী রাফসার হঠাৎ মনে হল তার উদ্যান ভাই তার ফুফাতো বোন মিমের সাথে সম্পর্কে আছে। হয়তো উদ্যান মীমকে পছন্দ করে। ষোড়শী কন্যা এ কথা ভেবেও সেদিন কেঁপে উঠেছিল। আর সময় নষ্ট করেনি;সেই পড়ন্ত বিকেলেই উদ্যান কে জানিয়েছিল নিজের মনের কথা। উদ্যানের করা অপমান, প্রত্যাখ্যান ভেঙে গুড়িয়ে ফেলেছিল কিশোরীর রাফসার মন।বিষে ডুবিয়ে দিয়েছিল, উদ্যানের কথাগুলো কাটার মত হৃদয়ে বেধেছিল।

“চলো না,সবাই মিলে ট্রুথ ডেয়ার খেলি।” বায়না ধরল জারা।জায়িনের শুনতে দেরি দৌড় দিতে দেরি হলো না। সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। জায়িনের দৌড়ে চলে যাওয়ার পানে।জায়িন ডাইনিং টেবিলের উপর থেকে হালকা ভারী একটা বোতল নিয়ে হাজির হলো।
“ট্রুথ ডেয়ার খেলবো,সে কখন থেকে ভাবছি। জারা যেহেতু বলে দিল তাহলে শুরু করা যাক।”
রোহান ভ্রু কুঁচকালো। “তাই বলে তুই এভাবে দৌড়ে যাবি! ব্যাপার কি বলতো কোন গোলমাল আছে নিশ্চয়ই।”
যাইয়েন বএিশ পাটি দাঁত বের করে হাসলো।নিচে বসল আড়মরা হয়ে। “ট্রুথ ডেয়ার খেলে লাভ আছে ভাইয়া। দেখ উদ্যান ভাই চলে যাওয়ার পর থেকে কিন্তু আর খেলা হয়নি। তোর মনে আছে উদ্যান ভাই বিদেশ যাওয়ার আগে আমরা খেলেছিলাম?সেদিন কিন্তু পার্সোনাল কথা জানতে পেরেছি।”
এ দফায়ও সবাই অবাক হল। বিভ্রান্ত হলো না শুধু রাফসা। ওর ভালো করেই সে রাতের কথা মনে আছে। উদ্যানের মুখ থেকে সেদিন প্রথমবারের মতো জানতে পেরেছিল,কাউকে ভালোবাসার কথা।

“পছন্দ করি না। ভালোবাসি। আমার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ। আমার ভালোবাসা।”
এত বছর পেরিয়ে গেল রাফসা কথাটা ভুলতে পারেনি। অক্ষরে অক্ষরে মনের ঘরে বেঁধে রেখেছিল উদ্যানের মুখ হতে নিঃসৃত বাক্যটা।
সবাই গোল হয়ে বসলো। আজ আর উদ্যানকে ডাকতে হয়নি।নিজ তাগিতেই উঠে দাঁড়ালো। রাফসা কে জড় বস্তুর ন্যায় বসে থাকতে দেখে মিম ডেকে উঠলো, “কি হলো, তুই এখনো বসে আছিস কেন? জলদি আয়।”
রাফসা চোখ তুলে তাকালো। ঠোঁট চেপে নিজেকে ধাতস্থ করল।এই খেলা ও আর খেলতে চায় না।

” আমি খেলব না আপু। তোমরা খেলো না, আমি দেখছি।”
“দেখছি মানে কি! আয় বলছি,আমরা সবাই খেলবো তুই খেলবি না? তা কি করে হয়, উঠে আয়।”
উদ্যান হাতের মুঠো ফোনটা পকেটে ভরে রাখলো। সাদা শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে রাফসার পানে চেয়ে ধপ করে বসে পড়ল। সবার জোড়াজুড়িতে বাধ্য হয়েই একপ্রকার রাফসাকে উঠতে হলো। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো বসতে গিয়ে, সবাই বসে গিয়েছে। একমাত্র উদ্যানের পাশের জায়গাটায় ফাঁকা পড়ে আছে। রাফসা ঢোক গিলে।উদ্যানের পাশে বসার মত মন ওর নেই।আগে সারাক্ষণ ছুতো খুঁজতো উদ্যানের আশেপাশে থাকার, উদ্যানের পাশে চেয়ারে বসার। কিন্তু এখন সে ইচ্ছে পুরো দমে চাপা পড়ে গিয়েছে। উদ্যান নির্বিঘ্ন ভাবে নিচের দিকে চেয়ে হাত দেখছে। ফর্সা হাতে কালো লোম আনাড়ি ভাবে শুয়ে আছে। ডান হাত দিয়ে বাম হাতের নখ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। ক্ষনে ক্ষনে আবার দুই হাত একসাথে করে সংঘর্ষ করছে। দুহাতের আঙ্গুল একে অপরের ফাঁক গলিয়ে ঢুকিয়ে মটকা ফুটাচ্ছে। যেন আশেপাশে কোন খবর নেই। উদ্যানের হাতের মুভমেন্ট দেখে রাফসার বুক বুক কেঁপে উঠল।জিভের অগ্রভাগ দ্বারা গালের অভ্যন্তরীণ ত্বক স্পর্শ করল। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে উঠলো, “যা করার তাড়াতাড়ি কর। মুড চেঞ্জ হয়ে যাবে।তখন আর চেঁচালেও বসব না।”

উদ্যানের কথা মুখ বাঁকালো রাফসা। কোথাকার প্রেসিডেন্ট এসেছে। এই খচ্চরের তো ক্ষনে ক্ষনেই মুড চেঞ্জ হয়। গিরগিটির চেয়েও দ্রুত রঙ বদলাতে সক্ষম। ডাক্তার হয়েছে কিভাবে? রাফসা এই কথা কয়েক বছর ধরে ভেবে আসছে। তবে উওর মেলেনি। উদ্যানের পাশের জায়গা ফাঁকা, তারপরই জারা বসে আছে। জারা রাফসার ডান হাত ধরে মৃদু টান দিয়ে বসিয়ে দিল। অন্যমনস্ক থাকায় রাফসা বুঝে উঠতে পারেনি।জায়গা অল্প হওয়াতে বসার সময় উদ্যানের ডান কাঁধের সাথে রাফসার বাম কাঁধের সংঘর্ষ ঘটে। কেঁপে উঠলো রাফসা। উদ্যান নির্বিঘ্ন, নড়চড় নেই।রাফসা বিরক্তি , অস্বস্তিতে জারার পানে খানিক চেপে বসলো।রাফসার নড়াচড়ায় উদ্যান ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো।রাফসা বিরক্তি দৃষ্টি নিয়েই তাকিয়ে ছিল উদ্যানের দিকে। উদ্যান তাকাতেই তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল। উদ্যান রাফসার চোখে স্পষ্ট বিরক্ত দেখতে পেয়েছে। ঠোঁট বাঁকিয়ে সামান্য হাসলো।রাফসার এতো পরিবর্তনে হুটহাট হাসি পায় উদ্যানের।যে মেয়ে কিনা এককালে পেছনে ঘুরঘুর করতো; সে এখন তাকে দেখে বিরক্তিতে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। কি দিন কাল এলো।

বোতল ঘুরাতেই প্রথমে তা গিয়ে পড়ে মিমের কাছে। মিম জিভ কাটলো।বলা যায় না এ হারামি গুলো কি দেয়,বুঝেশুনে নিতে হবে।
“আমি ডেয়ার নিব। ট্রুথ নিলে উল্টো পাল্টা প্রশ্ন করিস তোরা। আজ ডেয়ারই নিলাম।”
সবাই শব্দ করে হেসে উঠলো। মাইশা ই দিল ডেয়ার।
“আপু, তুমি ডেয়ার নিয়েছো।যা বলব ,তাই করতে হবে।”
মিম ভয় পেল এ যাবৎ।বোনকে বিশ্বাস নেই।কি দিয়ে বসে।মিমের চিন্তার মাঝেই মাইশা বলে উঠলো, “আপু আমার রুমে চলে যাও। গোসল শেষে কাপড় গুলো ধোঁয়া হয়নি। সুন্দর করে ডিটারজেন্ট দিয়ে কেঁচে দাও।”
মিম কটমট করে তাকালো।এই রাতের বেলা কেউ এমন ডেয়ার দেয়।দিল তো ,ওর বোন নামক শএু।
“মাইশার বাচ্চা।তোকে আমি পরে দেখে নিব।”

“ছিঃ আপু। আমার বাচ্চা পেলে কোথায়? আচ্ছা,যাও যাও।”
মিম মুখ কুঁচকে উঠে গেল।সবাই হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দশ মিনিট পর মিম এলো। এসেই মাইশার পানে কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।বুঝালো পরে দেখে নিবো তোকে।মাইশা হেসে উড়িয়ে দিল।বোতল এসে এবার রাফসার সামনে পড়ে।ও ডেয়ার নিবে না। লাইফে এমন কোন সত্য নেই যে, ভয়ে থাকতে হবে।তাই ভেবে চিন্তে ট্রুথ নিল। রাফসাকে এবার রোহান প্রশ্ন করল, “কাউকে ভালোবাসিস?”
রাফসা থমকালো এহেন প্রশ্নে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো বছর খানেক এর আগের কথা। রাফসা মুখ কুঁচকে শক্ত কন্ঠে জবাব দিলো, “ভালোবাসা বলতে কিছুই নেই।বাসিনা ভালো কাউকে।”
“আগে বেসেছিলি?” পাল্টা প্রশ্ন রোহানের।
রাফসা এবারও থমকালো।কি করে বলবে? জড় পদার্থের মত পুনরায় শক্ত কন্ঠে আওড়ালো, “কখনোই না। ভালোবাসা আমার কাছে কেবল এক অপার্থিব শব্দ।”

তবে রাফসার কন্ঠে আগের ন্যায় জোরালো ছিল না। কন্ঠে ছিল আকুলতা না পাওয়ার বেদনা। উদ্যান চোখ ঘুরিয়ে তাকালো। মৃদ হেসে সামনের দিকে তাকিয়ে, রাফসা শোনার মত করে বলল, “আগেই বলেছিলাম এসব কেবল মোহ। যা কেটে গেলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়, মিললো তো আমার কথা?”
রাফসা শুনলো উদ্যানের।কথা বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।খানিক হাসলো রাফসা।আজও বুঝতে পারল না এই পুরুষ রাফসার ভালোবাসাটা।আর বুঝেও বা লাভ নেই। এখন আর সেই টান ভালোবাসা নেই।রাফসা ভাবল আসলেই নেই নাকি অভিমানেতা চাপা পড়ে গেছে ভালোবাসা? ভুলে যাওয়া কি এতই সম্ভব!রাফসা পাত্তা দিল না নিজের প্রশ্নের।
বোতল আবার ঘুরতেই তা গিয়ে ঠেকলো রোহানের সামনে। রোহান ডেয়ার নিল।

“ভাইয়া তুই নেচে দেখা।”
রোহান বড় বড় চোখ করে তাকাল জায়িনের পানে।
“বেওমিজ বেশরম পোয়া।শরম নাই তরওুন?”
“চাঁটগাইয়া হতা ন হইস।”
ঊষা থামিয়ে বলল, “ছেলে মানুষ আর কি নাচবে? ভাইয়া তুমি বরং কবিতা আবৃত্তি কর।”
রোহান নড়েচড়ে বসল। গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করল।
সম্মানিত রোজাদার অল
উডি যা গই
বউ উডিলে জামাইরে ডাকি দ
জামাই উডিলে বউঅরে তুলি দ
দুনোজনে মিলিয়েরে সেহেরীর হানা
ফুয়াইওার হানা তৈয়র করি ল
এবং যারা বিয়া ন গরে
ইতারারে হনো ডাকি দিবো
আই হইন্নফারিইইইই

( সম্মানিত রোজাদার গন। উঠে যাও।বউ উঠলে জামাইকে ডেকে দাও,জামাই উঠলে বউকে তুলে দাও।দুজনে মিলে সেহেরীর খাবার তৈরি করে নাও। এবং যারা বিয়ে করেনি,ওদের কে ডেকে দিবে আমি জানিনা।)
সুর দিয়ে টেনে বলল রোহান।সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। চট্টগ্রামের হলেও ওরা সাধু ভাষায় আয়ত্ত হয়েছে ছোট থেকেই। মাঝে মধ্যে রোহানের মুখ থেকে চাটগাঁইয়া ভাষা শোনা যায়।ঊষা নাক মুখ কুঁচকে বলে, “ধুর ভাই, বললাম কবিতা আবৃত্তি করতে। একেবারে খেয়ে দিল।”
“ভাইয়া আমাকে এ ভাষা শিখিয়ে দিবে?” আকুল কন্ঠে শুধায় রাফসা।সবাই টুকটাক এ ভাষা পারলেও রাফসা পারে না।ওর ভালোই লাগে শুনতে। উদ্যান রাফসা পানে তাকিয়ে উঠে গেল। সোফায় বসে বলল, “আর মুড নেই।তোরা চালিয়ে যা।”
ওদের মতো করে ওরা খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্যান না থাকাতে রাফসার খেলতে সুবিধা হচ্ছে। এতোক্ষণ উদ্যান থাকাতে জড়সড় হয়ে বসে ছিল।

“ভাই, আপনার না সুইজারল্যান্ড যাওয়ার কথা। যাবেন না?”
আভিয়ান ফোন থেকে দৃষ্টি সরালো।হাতে কফির মগ। চুলগুলো উস্কো খুস্কো হয়ে পড়ে আছে কপালে। ঘুম থেকে উঠেছে কিছুক্ষণ পূর্বে।উঠেই আস্তানায় বসেছে।কফির কাপ হাত থেকে নামিয়ে পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা ডাভিডফ সিগারেট এর প্যাকেট তুলে তার থেকে একটা সিগারেট নিল।
আভিয়ান ধীরে ডাভিডফটা ঠোঁটে তোলে। আগুন ছোঁয়ামাত্রই সিগারেটের মাথায় লালচে আলো জ্বলে উঠলো।আভিয়ান গভীর টান দেয় তাতে।ধোঁয়াটা বের হয় আস্তে আস্তে। সোজা উঠে আবার পাক খেতে খেতে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।হালকা নীলচে ধূসর, বাতাসে নাচতে নাচতে মিলিয়ে যায়।
তার মুভমেন্ট শান্ত, অপ্রয়োজনীয় কোনো তাড়া নেই।
চোখের চাহনি গভীর। তাকিয়ে আছে সামনে, কিন্তু মনে হয় অনেক দূরে—যেন ভাবনার ভেতর দিয়ে কাউকে দেখছে। পলক পড়ে কম, দৃষ্টি স্থির।

এই চোখে আছে সংযম, অভিজ্ঞতা আর অল্প নীরব দম্ভ। আভিয়ান পুনরায় একটা লম্বা টান নিল। ধোঁয়া উড়িয়ে সিলিংয়ে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল, “বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। যদি তোর ভাবী হারিয়ে যায় আমার থেকে।কি ভরসা নিয়ে আমি সুদূরে পা দেব?”
“ভাই আপনি টেনশন করবেন না।আমরা তো আছি।ভাবীকে দেখে রাখবো। আপনি নিশ্চিন্তে যেতে পারেন।”
আভিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার মায়াবীকে পাওয়ার যুদ্ধ বোধহয় এতো সহজ হবে না। একে তো বিরোধী দলের নেতার মেয়ে রাফসা। বিরোধী দলের কম ক্ষতি হয়নি আভিয়ানের দ্বারা। রাজীব ফরাজী কখনোই রাফসাকে স্ব ইচ্ছে আভিয়ানের হাতে তুলে দিবে না।আভিয়ান চোখ বুজে শব্দ করে শ্বাস টানে। সিগারেট শেষ করে দাঁড়িয়ে তা পায়ের নিচে পিষ্ট করল।

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৮

“এখন মন চাইছে না যেতে।ওর মেডিকেল পরীক্ষার পর যাবো। বেশি দিন নেই আর।”
রনি সম্মতি দিল।আভিয়ান যেতে নিয়েও থামল। ভ্রু কুঁচকে বলে, “আজ তোর ভাবী কোচিংয়ে আসেনি? কিছুই তো খবর দিলি না।”
রনি চটপটে স্বরে বলল, “না ভাই।প্রায় আধ ঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু ভাবীকে দেখিনি।আজ আসেনি।তবে ওনার ফ্রেন্ডরা এসেছিল।”
আভিয়ান অবাক হলো।রাফসা কখনোই গ্যাপ দেয় না। বিড়বিড় করে শুধায়,
“আসেনি, কিন্তু কেন? অসুস্থ নাকি অন্য কিছু?”

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২০