ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১২
নওরিন কবির তিশা
সকাল হতে না হতেই পুরো বাড়ি জুড়ে হলুস্থুল কান্ড বেঁধেছে। হামিদা বেগমরা পারলে তো ভোররাতেই চলে আসে। সূর্য্যমনি ধরিত্রীতে এসেছে কে আসেনি তবে সুখনীড়ে হাজির হয়েছে প্রত্যেকটা চিন্তিত মানব-মানবী। হামিদা বেগম আর্যর উদ্দেশ্য শাসনের স্বরে বললেন,
—‘তোমার থেকে এটা আমি এক্সপেক্ট করিনি আর্য। তুমি এতটা ইররেস্পন্সিবল কিভাবে হলে? হ্যাঁ আমি জানি তৃষা একটু চঞ্চলা তাই বলে তুমি ওকে খেয়াল করবা না?
সাবরিনা মৃত্তিকা টুইংকেল আর আদ্রিয়ানের সঙ্গে পাশে দাঁড়িয়ে তৃষা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখছিল ছোট চাচীর বকার বিপরীতে অবনত মস্তকে দন্ডায়মান আর্যকে। তৃষা শুকনো ঢোক গিলে ভীত স্বরে বলল,,
—‘চাচিমা আসলে….
তাকে কথা শেষ করার আগেই কিছুটা ধুমকে চুপ করিয়ে দিলেন হামিদা বেগম,,
—‘তোমাকে কিছু বলেছি আমি?
তৃষা মাথা নিচু করে না সূচক মাথা নাড়তেই হামিদা বেগম বললেন,,
—‘তাহলে চুপ থাকো।
তিনি ফের আর্য দিকে ফিরে বললেন,,—‘কি হলো আর্য? তুমি নিজেই বল এতটা কেয়ারলেস হওয়া তোমার উচিত ছিল বাবা? যদি বড় কিছু হয়ে যেত তখন কি হতো বলোতো?
নিশ্চুপ আর্য এতক্ষণে উত্তর দিল,,—‘আমি বুঝতে পেরেছি আমি কেয়ারলেস হয়ে পড়েছিলাম কিন্তু উনি তো বাচ্চা নন। ওনাকে আমার টুইংকেলের মত ট্রিট করার প্রয়োজন নেই, কেননা উনি যথেষ্ট ম্যাচিওর। মনের মত মানুষের থেকে এমন ইম’ম্যাচিউর আচরণ পাওয়াটা কি যথাযথ? আপনিই বলুন।
হামিদা বেগম আর্যর এমন অকাট্য যুক্তির কাছে থমকে দাঁড়ালো। কিছু বলার ভাষা না খুঁজে পেয়ে এক ঝলক তৃষার দিকে তাকালেন বেচারি তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে হামিদা বেগমের মায়া হল বড়। তিনি আর কিছু না বলে কিচেনের দিকে যেতে যেতে বললেন,
—‘এসব বাচ্চাগুলোও হয়েছে! কথায় কথায় জবাব প্রস্তুত করে রাখে সবসময়। বড়রা কথা বলেছে কিছু কিছু কথা মেনে নিতে হয় তার কোনো বলাই নেই ভিতরে।
তিনি এভাবেই একা একা কথা বলতে বলতে কিচেনের দিকে রওনা দিলেন। আছে মৃত্তিকা সাবরিনা আদ্রিয়ান সকলে মুখ চেপে হাসতে লাগলো। সাবরিনা তৃষার উদ্দেশ্যে বলল,,
—‘দেখছেন তো ভাবি, এটাই আমাদের আম্মু। বুঝবে কম চিল্লাবে বেশি যখন উত্তর পাবে তখন আবার বেশি বলবে…!
তৃষা না চাইতেও হেসে উঠলো।
রৌদ্রের প্রখরতা বেড়েছে বেশ বেলা চড়াও হয়েছে খানিক। একটা রিকশা ধরে সুখনীরের উদ্দেশ্যে ছুটছে মেহসানা কিছুক্ষণ আগেই সাবরিনার কাছ থেকে এসে খবর পেয়েছে তৃষার ব্যাপারে। তৎক্ষণাৎ হন্তদন্ত হয়ে সে বেরিয়ে পড়েছে সুখনীড়ের উদ্দেশ্যে। সুব্রত লৌহ গেটের সামনে রিকশা থামতেই মেহেসানা তড়িঘড়ি নেমে পড়ল। এমনকি রীতিমত ভুলেই গেল ভাড়া পরিশোধ করতে।
রিকশাচালক পেছনে হাহাকার করে উঠলেন,,
—‘ও আপা! ভাড়াটা তো দিয়া যান! মাইনষের জান নিয়া টানাহেঁচড়া করেন কেন?
কিন্তু মেহসানা তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে ততক্ষণে বাগান পেরিয়ে ড্রয়িং রুমের দরজায় করাঘাত করছে। রিকশাচালক বেচারা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন আর কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
ঠিক তখনই সদর গেটের সামনে একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল আদ্রিয়ান, আর তার কোল থেকে লাফিয়ে নামল ছোট্ট টুইংকেল। টুইংকেলের এক হাতে একটা বড় রঙিন আইসক্রিম, অন্য হাতে একটা খেলনা বেলুন। আদ্রিয়ান পকেট থেকে গাড়ির চাবিটা ঘোরাতে ঘোরাতে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। দেখল একজন রিকশাচালক বেশ বিরক্তি আর অসহায়ত্ব নিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে আছেন।
আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—‘কি ব্যাপার চাচা? এখানে দাঁড়িয়ে কেন? কার কাছে এসেছেন?
রিকশাচালক বিরস মুখে বললেন,
—‘বাবা, একখান মাইয়া জিনের লাহান দৌড়াইয়া ভিতরে গেল। আমার রিকশা ভাড়াটাও দিল না, কথাও শুনল না। ডাইকা ডাইকা গলা ফাইটা গেল আমার।
আদ্রিয়ান মুহূর্তেই বুঝে নিল দস্যি মেয়েটা আর কেউ নয়, নির্ঘাত মেহসানা। সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে ভাড়ার দ্বিগুণ টাকা চাচার হাতে গুঁজে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—‘চাচা, আপনি যান। ওই মেয়েটা আসলে একটু বেশিই ইমোশনাল। আপনি মনে কিছু করবেন না।
টুইংকেল আইসক্রিম চাটতে চাটতে বলল,
—“চাচ্চু, নিশ্চয়ই মিমি এসেছে! ও এসেই এখন বানিকে বকা দেবে। চলো চলো, আমরা বানিকে বাঁচাই!
ভেতরে তখন রীতিমতো জেরা চলছে। মেহসানা তৃষার রুমের দরজা ঠেলে ঢুকেই তৃষাকে জড়িয়ে ধরল, তারপর আবার পরক্ষণেই ছেড়ে দিয়ে দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে লাগল। তৃষার ব্যান্ডেজ করা হাতটা নড়ে উঠতেই সে যন্ত্রণায় একটু কুঁকড়ে গেল।মেহসানা চিল চিৎকার করে উঠল,
—‘তৃষা! তুই কি চাস আমার হার্ট অ্যাটাক হোক? ফোন করে একবার জানাতে পারলি না? আমি ভাবলাম তোর বুঝি আজ ক্লাসে প্রেজেন্টেশন আছে, আর তুই এখানে হাত ভেঙে শুয়ে আছিস? ওই বাচ্চাটাকে বাঁচাতে গিয়ে তুই যদি আজ হসপিটালের মর্গে থাকতিস, তবে আমার কী হতো একবার ভেবেছিস?
তৃষা আমতা আমতা করে বলল,,
—“মেহু… শোন… আমি তো বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু…!
—‘কিন্তু? কিন্তু কি হ্যাঁ? তোরে কেয়ারলেস কেন তুই? আর এই যে হাতটা, এটা কি তুই মাটির পুতুলের হাত ভাবিস? শখ কত তোর সুপারওম্যান হওয়ার!
মেহসানা যেন একাই একশটা প্রশ্নের তোপ দাগছে। তৃষা জবাব দিতে গিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। সে অসহায়ের মতো বলল,
—‘আরে বাবা, আমি তো ঠিক আছি। জাস্ট সামান্য একটু ব্যান্ডেজ—
—‘সামান্য ব্যান্ডেজ?তোর মাথাটা কি গোবর দিয়ে ভরা? সামান্য ইনজুরি থেকে যে ইনফেকশন হতে পারে, সেটা জানিস? আজ থেকে তুই আমার নজরবন্দি থাকবি! আমি তোর জন্য স্যুপ বানিয়ে আনব, আর তুই সেটা গিলবি। কোনো বাহানা চলবে না!
মেহেসানার শাসনের যখন তৃষার নাজেহাল দশা ঠিক সেই মুহূর্তেই আদ্রিয়ান দরজায় মৃদু করাঘাত করে ভেতরে প্রবেশ করল। টুইংকেল কোল থেকে নেমে তৃষার বেডে গিয়ে বসল। আদ্রিয়ান মেহসানার দিকে তাকিয়ে কৌতুকের স্বরে বলল,,
—‘মিস মেহসানা, ভলান্টিয়ারি সার্ভিসটা কি একটু কমানো যায়? আপনার ওই ভলান্টিয়ারি দৌড়ের চক্করে গেটের রিকশাচালক তো বেচারা কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিলেন। ভাবলেন আধুনিক যুগের কোনো ডাকাত তার রিকশায় চড়েছে।
মেহসানা হঠাৎ থেমে গেল। তার মনে পড়ল সে সত্যিই ভাড়া দেয়নি। সে লজ্জায় আর আরষ্টতায় লাল হয়ে গেল। আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে একটু থতমত খেয়ে বলল,
—‘ওহ! আমি… আমি আসলে খেয়াল করিনি। স্যরি। আপনি কত টাকা দিয়েছেন?
আদ্রিয়ান পকেটে হাত গুঁজে তৃষার দিকে আড়চোখে চাইল এবং মেহসানাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—“টাকার চিন্তা পরে হবে। আপাতত আপনার এই হাই ভলিউমের রেডিওটা একটু অফ করুন।ভাবি এমনিতেই পেশেন্ট, তার ওপর আপনার এই শব্দের দূষণ সইবার মতো ক্ষমতা বোধহয় ওনার আপাতত নেই। আমার মাদার ইন্ডিয়া অলরেডি আর্য ভাইকে একপ্রস্থ ধুয়ে দিয়েছেন, এখন আপনি কি ভাবিকে ধোয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন?
মেহসানা মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে চুপ করে গেল। টুইংকেল মাঝখানে ফোড়ন কাটল,
—‘মিমি, তুমি বানিকে বকো না তো! পাপা বলেছে বানি অনেক ব্রেভ। পাপা আজ বানিকে কোলে করে… ওহ না, পাপা তো সিটবেল্ট বেঁধে দিয়েছিল!
আদ্রিয়ান তৃষার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,
—‘ভাবি, সাবরিনা নিচ থেকে খাবার আনছে। আর্য একটু বাইরে গেছে বিশেষ প্রয়োজনে, কিন্তু যাওয়ার আগে দশবার আমাকে ইনস্ট্রাকশন দিয়ে গেছে তোমার খবরাখবর রাখতে। মেহসানা যখন এসেছেই, তখন ওকে একটু কন্ট্রোল করো। নইলে সুখনীড়ের শান্ত পরিবেশটা আজ বৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে।
তৃষা আদ্রিয়ানের কথার আড়ালে আর্যর সেই গোপন উদ্বেগের আভাস পেয়ে দৃষ্টি সংকুচিত করলো। মেহসানা তখনো গাল ফুলিয়ে বসে আছে। আদ্রিয়ান আবার বলল,
—‘মিস মিমি, আপনার ভাড়াটা কিন্তু আমি ডায়েরিতে লিখে রাখছি। সুদসহ উশুল করা হবে। এখন চলুন নিচে, আমার মাদার ইন্ডিয়া স্পেশাল লাঞ্চ বানাচ্ছেন, আপনার ওই স্যুপের চেয়ে সেটা অনেক বেশি মুখরোচক হবে।
মেহসানা বিরক্ত হয়ে বলল,,
—‘ মিস্টার সার্জেন্ট, আপনি কি সবসময় আমাকে খোঁচা দিতে না পারলে পেটের ভাত হজম করতে পারেন না?
আদ্রিয়ান হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
—‘সেটা তো একটা আর্ট, মিস মিমি। আর আপনি তো জানেন, আর্ট সবসময় ফ্রিতে পরিবেশন করা হয় না!
তৃষা মেহসানার হাতটা চেপে ধরে বলল,,,
—‘চলেন ম্যাডাম অনেক বকে ফেলেছেন এখন একটু কিছু খাওয়া উচিত।
—‘হ্যাঁ চল।
সুখনীড়ের ডাইনিং টেবিল আজ যেন এক মিলনমেলার কেন্দ্রবিন্দু। হামিদা বেগমের হাতের রান্নার সুবাসে ম ম করছে চারপাশ। সাদা ধবধবে ভাতের সাথে ইলিশ মাছের দোপেয়াজু, বেগুন ভাজি আর পাতলা ডাল বাঙালি রসনার সবটুকু আয়োজনই সেখানে বিদ্যমান। মেহসানা তৃষার পাশে বসে তার সেবা করার চেয়ে বেশি ব্যস্ত হামিদা বেগমের সাথে গল্প জমিয়ে তুলতে।
হামিদা বেগম মেহসানার প্লেটে এক টুকরো বড় ইলিশ তুলে দিয়ে বললেন,,
—‘খাও মা মেহু, কতদিন পর এলে। তৃষার সাথে তোমার বন্ধুত্ব তো সেই ছোটবেলা থেকে, তাই না?
মেহসানা একগাল হেসে জবাব দিল,,
—‘জ্বি চাচিমা! এই বাঁদরটাকে সামলাতে সামলাতেই তো আমার অর্ধেক জীবন শেষ। দেখেন তো, নিজের হাতটা ব্যান্ডেজ করে কী এক অবস্থা করে রেখেছে! আমি তো ওকে বলেছি, এরপর যদি এমন কিছু করিস তবে তোকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখব।
মৃত্তিকা আর সাবরিনা মুখ টিপে হাসল। সাবরিনা বলল,,
—‘মা, দেখছো মেহু আপুও ঠিক তোমার মতো করেই তৃষা ভাবিকে বকেছে। তোমরা দুজনে মিলে একটা টিম বানালে মন্দ হতো না।
আদ্রিয়ান তখন টেবিলের অন্য প্রান্তে বসে আয়েশ করে ইলিশের কাঁটা বাছছিল। সে বাঁকা চোখে মেহসানার দিকে তাকিয়ে বলল,,
—‘মাদার ইন্ডিয়া, তুমি মিস মিমিকে একটু সাবধানে খেতে বলো। উনি যেভাবে কথা বলছেন আর খাচ্ছেন, তাতে যে কোনো সময় মাছের কাঁটা ওর গলায় সার্জারির প্রয়োজন ঘটাতে পারে। আর উনার হাই-পিচ ভয়েস শুনলে তো এমনিতে ইলিশ মাছও ভয় পেয়ে প্লেট থেকে লাফ দেবে!
মেহসানা আদ্রিয়ানের দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে বলল,,
—‘মিস্টার সার্জেন্ট, আপনি নিজের প্লেটে মনোযোগ দিন। আমার গলার কাঁটা বা ভলিউম নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।
হামিদা বেগম আদ্রিয়ানকে ধমক দিয়ে বললেন,,
—‘আদ্রিয়ান! মেহমান মেয়েটার সাথে এভাবে কথা বলিস না। ও কত কষ্ট করে তৃষাকে দেখতে এসেছে।
আদ্রিয়ান কাঁধ নাচিয়ে বলল,
—‘কষ্ট তো আমি করলাম মা! রিকশা ভাড়ার স্পনসরশিপ থেকে শুরু করে এই শব্দদূষণ সহ্য করা সবই তো আমার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।
খাওয়ার মাঝপথে মেহসানা হঠাৎ সজোরে এক লোকমা মুখে দিল। হামিদা বেগম আজ তরকারিতে একটু ঝাল বেশিই দিয়েছিলেন। ভুলবশত কাশ্মীরি মরিচের গুঁড়া একটু বেশি পড়েছে।মেহসানা প্রথম কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল, তারপর তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। সে ‘শশশ…’ শব্দ করে জিভ বের করে বাতাস টানতে লাগল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।
আদ্রিয়ান এক গ্লাস জল তার দিকে এগিয়ে দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলল,
—‘কী হলো মিস মিমি? হঠাৎ করে সাপের মতো শিস দিচ্ছেন কেন? আমাদের মাদার ইন্ডিয়া কি তবে অজান্তেই নাগা মরিচ এর বদলে কোনো অগ্নিগোলক তরকারিতে মিশিয়ে দিয়েছেন?
মেহসানা জলের গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ,
–‘ঝাল।
আদ্রিয়ান খিলখিল করে হেসে উঠল। সে টিস্যু পেপার এগিয়ে দিয়ে বিদ্রূপের স্বরে বলল,,
—‘আরে না! এটা তো সাধারণ ঝাল। আপনার মতো সুপার গার্ল যে সামান্য মরিচের ঝালেই এভাবে কুপোকাত হবে, তা তো বুঝিনি। আপনি তো কিছুক্ষণ আগে ভাবিকে হিরোইজম নিয়ে লেকচার দিচ্ছিলেন, এখন নিজের বীরত্ব কোথায় গেল? এই ঝালটা স্রেফ আপনার ওই উচ্চস্বরের রেডিওটাকে একটু মিউট করার জন্য ন্যাচারাল মেডিসিন!
মেহসানা রাগে আর ঝালে লাল হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,,
—‘আপনি একটা আস্ত অসভ্য লোক! কেউ এভাবে বিপদে পড়লে হাসে? চাচিমা, দেখেন আপনার ছেলে কী বলছে!
হামিদা বেগম এবার আদ্রিয়ানের পিঠে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিলেন। আদ্রিয়ান বিষম খেয়ে প্রায় কাশতে শুরু করল। হামিদা বেগম কড়া সুরে বললেন,,
—‘আদ্রিয়ান! একদম চুপ কর বলছি। মেয়েটা ঝালে কষ্ট পাচ্ছে আর তুই ওকে খোঁচা দিচ্ছিস? তোর লজ্জা করে না? যা, ফ্রিজ থেকে দই বের করে নিয়ে আয় ওর জন্য। আর একটা কথা বললে আজ তোকে ডাইনিং থেকে বের করে দেব!
মৃত্তিকা আর সাবরিনা হোহো করে হেসে উঠল। সাবরিনা তৃষার কানে কানে বলল,,
—‘ভাবি দেখেন, আমাদের বাড়িতে বিনোদনের অভাব নেই। আদ্রিয়ান ভাইয়াকে ধমক দেওয়ার জন্য আম্মুই সেরা।
তৃষা তার সুস্থ বাম হাত দিয়ে মেহসানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল,,
—‘আদ্রিয়ান ভাইয়া, আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন, মেহু কিন্তু লড়াকু মেয়ে। ঝাল কমলে ও কিন্তু আপনার সুদে-আসলে সব শোধ করে দেবে!
আদ্রিয়ান দইয়ের বাটিটা মেহসানার সামনে ধপাস করে রেখে গজগজ করতে করতে বলল,,
—‘শোধ তো অলরেডি হয়ে গেছে। মাদার ইন্ডিয়ার হাতের ওই প্রকাণ্ড চড়টার দাম অনেক। মিস মিমি, আপনার এই ঝাল খাওয়া নাটক দেখার জন্য আমাকে আজ অনেক বড় মাসুল দিতে হলো।
মেহসানা দইয়ের এক চামচ মুখে দিয়ে শান্তি পেল। সে বিজয়ী হাসি হেসে আদ্রিয়ানকে বলল,
—‘শাস্তি তো কেবল শুরু মিস্টার সার্জেন্ট। আপনি রিকশা ভাড়া দিয়েছেন বলে কি ভেবেছেন আমি আপনার সব কথা মুখ বুজে সইবো? নেভার!
হামিদা বেগম স্নেহভরে মেহসানার দিকে তাকিয়ে বললেন,,
—‘আদ্রিয়ানের কথা ছাড়ো মা। ও একটু ওরকমই। তোমরা দুই বন্ধু মিলে আড্ডা দাও, আমি ফল কেটে আনছি।
ডাইনিং টেবিলের এই খুনসুটি আর হাসাহাসিতে তৃষার ইনজুরির ব্যথাটা যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে অনুভব করল, সুখনীড়ের এই প্রাণবন্ত মানুষগুলোর মাঝেই তার আসল সুখ লুকিয়ে আছে।
সন্ধ্যা নেমেছে সুখনীড়ে। পশ্চিম আকাশে গোধূলির শেষ রক্তিম আভা তখনো বিলীন হয়নি,তবে ডাইনিং হলের আড্ডাটা এখন ড্রয়িং রুমে এসে জমেছে। জানলার পর্দার আড়াল দিয়ে ফুরফুরে বাতাস লহর তুলছে। মৃত্তিকা, সাবরিনা, আদ্রিয়ান আর মেহসানা মিলে তখনো আগের ডিনারের সেই হাসাহাসি আর খুনসুটির রেশ টেনে চলেছে। তৃষা সোফার এক কোণে আধশোয়া হয়ে বসে আছে, তার ল্যাভেন্ডার কামিজের ওপর ব্যান্ডেজ করা হাতটা এক বিষণ্ণ শুভ্রতা ছড়িয়ে রেখেছে।
ঠিক তখনই সদর দরজার ভারি পাল্লাটা খুলে গেল। এক রাশ শীতল হাওয়া আর চিরচেনা সেই কাষ্ঠল পারফিউমের সুবাস নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল আর্য। সারাটা দিন বাইরে ধকল গেছে তার, শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো, ঘাড়ের কাছে দু-একটা বোতাম খোলা। তার এক হাতে ল্যাপটপের ব্যাগ, আর অন্য হাতে ধরা বেশ বড়সড় একটা পলিথিন ব্যাগ, যার ভেতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে হরেক রকমের ফলের ঝুড়ি আর কিছু ওষুধের কৌটা।
আর্যর উপস্থিতি মাত্রই ড্রয়িং রুমের সেই উচ্চকিত হাসাহাসি যেন এক পলকে স্তিমিত হয়ে এল। সে কারও দিকে না তাকিয়ে, একদম সরাসরি তৃষার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার দীর্ঘকায় ছায়াটা তৃষার ওপর পড়তেই মেয়েটা একটু নড়েচড়ে বসল। আর্য পকেট থেকে চাবির রিংটা টিপয়ের ওপর রেখে বেশ গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—‘এখন কেমন ফিল করছেন? ব্যথাটা কি সন্ধ্যার পর বেড়েছে নাকি আগের মতোই আছে?
তৃষা হঠাৎ এমন সরাসরি প্রশ্নে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল সবার চোখেমুখে তখন কৌতূহলী হাসি। সে আমতা আমতা করে বলল,,
—‘না… মানে, এখন আগের চেয়ে অনেক বেটার। চাচিমার হাতের ঝাল তরকারি খাওয়ার পর তো মনে হচ্ছে সব ইনজুরি ভ্যানিশ হয়ে গেছে।
আর্যর চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে রইল তৃষার ফ্যাকাসে মুখে। সে হাতের ব্যাগটা তৃষার কোলের পাশে রেখে বলল,,
—‘ঝাল খাওয়াটা আপনার জন্য আপাতত বিলাসিতা। পেইনকিলার খাওয়ার পর আপনার স্টমাক সেনসিটিভ হয়ে আছে। সো, নো মোর স্পাইসি ফুড।
আদ্রিয়ান পাশ থেকে একটু ফোড়ন কাটার লোভ সামলাতে পারল না। সে কপালে হাত দিয়ে ড্রামাটিক স্টাইলে বলল,,
—‘আরে আর্য ভাই! আমরা এখানে বৈশাখী মেলা বসালাম আর তুমি এসে সরাসরি পেশেন্ট চেক-আপ শুরু করলে? একবার তো জিগ্যেস করবে ছোট ভাইটা বেঁচে আছে কি না!
আর্য আদ্রিয়ানের দিকে একপলক কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার তৃষার দিকে ফিরল। সে পলিথিন ব্যাগ থেকে একটা ছোট কৌটা বের করল। সেটা ছিল আদার মোরব্বা আর কিছু টক লজেন্স। সে অত্যন্ত নিঁখুতভাবে ওষুধের স্ট্রিপগুলো গুনে গুনে তৃষার হাতের কাছে এগিয়ে দিয়ে বলল,,
—‘এই নিন আপনার প্রেসক্রিপশন। রাতে ডিনারের পর এই দুটো ওষুধ মাস্ট। আর হ্যাঁ, পেইনকিলারের সাইড ইফেক্ট হিসেবে আপনার বমি বমি ভাব বা মাথা ঘোরানো হতে পারে। সেজন্য আমি এই আদার মোরব্বা আর লজেন্সগুলো এনেছি। যদি বমি আসে বা মুখটা তিতকুটে লাগে, তবে সাথে সাথে এগুলো একটা মুখে দেবেন। দ্যিস ইজ ম্যান্ডেটরি।
তৃষা লজেন্সের প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে রইল।মেহসানা তৃষার কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
—‘তোর ক্যাপ্টেন তো দেখি হোম-সার্ভিস ক্লিনিকে কনভার্ট হয়ে গেছে! লজেন্স পর্যন্ত গুনে এনেছে!
তৃষা মেহসানাকে কনুই দিয়ে একটা গুঁতো মারল। আর্যর কানে কথাগুলো পৌঁছাল কি না বোঝা গেল না, তবে সে ব্যাগ থেকে একটা ডালিম আর কিছু কিউই ফল বের করে টেবিলের ওপর রাখল।আদ্রিয়ান এবার আর্যর গম্ভীর ভাবটা ভাঙার জন্য সজোরে হেসে উঠল। সে সোফায় হেলান দিয়ে বলল,
—‘ও মাই ফাদার! আর্য ভাই তো দেখি আজ ফলের আড়তদার হয়ে গেছে। ভাবি, আপনার তো কপাল দারুণ! আমরা যখন জ্বরে মরি, তখন আর্য ভাই শুধু দূর থেকে বলে ‘বেশি করে জল খাও আর ঘুমাও’। আর আজ আপনার জন্য লজেন্স, মোরব্বা, কিউই… মিরাকল! পিওর মিরাকল!
আর্যর চোয়ালটা মুহূর্তের জন্য একটু শক্ত হলো, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। সে ডালিমটা হাতে নিয়ে আদ্রিয়ানের দিকে ছুড়ে দিল। আদ্রিয়ান সেটা লুফে নিতেই আর্য রুক্ষ স্বরে বলল,,
—‘খুব যখন কথা বলতে পারছিস, তখন এই ফলগুলো কেটে নিয়ে আয়। আর সাবরিনা, ওকে একটু সাহায্য করিস। তৃষার যেন নিজ হাতে কিছু কাটাকাটি করতে না হয়। ওনার ব্রেইন আর হাতের গ্র্যাভিটি কানেকশনটা এমনিতেই ডিসকানেক্টেড, নতুন করে কোনো ঝামেলা আমি চাচ্ছি না।
আদ্রিয়ান ডালিমটা হাতে নিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,,
—‘বুঝলাম। মানে আমি এখন আপনার ফ্রেশ ফ্রুট সার্ভেন্ট! ঠিক আছে ভাইয়া, ভাবির সেবা বলে কথা। চল সাবরিনা, মিস্টার ক্যাপ্টেনের অর্ডার বলে কথা!
আদ্রিয়ান আর সাবরিনা রান্নাঘরের দিকে চলে যেতেই আর্য তৃষার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে বলল,
—‘আমি ফ্রেশ হতে যাচ্ছি। ডিনারের পর আমি যেন দেখি আপনি ঠিক সময়ে ওষুধগুলো নিয়েছেন। যদি না নেন, তবে কাল সকালে আপনাকে পুনরায় হাসপাতালে নিয়ে ইনজেকশন দেওয়ার ব্যবস্থা করব। চয়েস ইজ ইওরস।
আর্য সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করতেই মেহসানা আর মৃত্তিকা তৃষাকে ঘিরে ধরল। মেহসানা চোখ বড় বড় করে বলল,,
—‘বাব্বা তৃষু!তোর জামাই দেখি সেই কেয়ারিং।
মৃত্তিকা তৃষার সুস্থ হাতটা চেপে ধরে বলল,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১১
—‘ভাবি, ভাইয়া তো এমনিতে খুব রাশভারী। কিন্তু আজ উনার চোখে এক অদ্ভুত ভয় দেখছিলাম। উনি আপনাকে বকছেন ঠিকই, কিন্তু আসলে উনি প্রচণ্ড প্যানিকড। লজেন্স আনাটা তো কেবল বাহানা, উনি আসলে চাচ্ছেন আপনি যেন সুস্থ থাকেন।
উপর থেকে আরেকটিবার ভেসে আসলো আর্যর কণ্ঠস্বর,,—‘ও হ্যাঁ।সন্ধ্যা টাইমে আপনার একটা মেডিসিন আছে, দেখুন ব্যাগের লেফট কর্নারে।
তৃষা কিছুটা চড়া কণ্ঠে উত্তর দিল,,—‘আচ্ছা।
ঠিক তৎক্ষণাৎ পাশ থেকে মেহেসানা চাপা কন্ঠে বলল,,—’উনি কি সারাদিন বাইরে কেবল তোর ওষুধের লিস্টই মুখস্থ করেছেন?
