Home নেশাক্ত প্রহর (মিহি সিজন ২) নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩
রূপন্তী সরকার

মেয়েটা খাবার টেবিলে রেখে মিহির পাশে এসে বসলো। মিহি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো
“নাম কি তোমার?”
মেয়েটা মৃদুস্বরে বললো
“আমার নাম রাহা”
মিহি হালকা হেসে বললো
“বাহ খুব সুন্দর নাম”
এরপর মিহি রাজের দিকে তাকিয়ে বললো
“ভাবি কই ভাইয়া?”
রাজ মুখ টা কালো বললো
“তোর ভাবি আজকে সকালেই ওর বাপের বাড়ি গেলো। ওর মা হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে গেছে। ওর বাপের বাড়ি বেশিদূর না চল তোদের নিয়ে যায়”
মিহি বললো

“না আজ না আবার অন্য দিন”
তিথি রাহার দিকে তাকিয়ে বললো
“চলো মা তোমাকে আমাদের সাথে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যায়?”
মেয়েটা তিথির কথা শুনে মুচকি হেসে মাথা নিচু করে রইলো। মুগ্ধ তখনো রাহার দিকে চেয়ে আছে। বেশ অনেকক্ষণ কথাবার্তা বলার পর মিহি রা রাজ কে বললো
“থাকো ভাইয়া আজকে আমরা উঠি। আমাদের বাসায় যেও ভাবি আর রাহা কে নিয়ে”
রাজ বললো
“এই একদম না আজকে তোদের বাড়ি যাওয়া হবে না। আজকে থেকে কালকে যাবি। এতোদিন পর এসেছিস এভাবে কি যেতে দেওয়া যায়?”
মিহি হালকা হেসে বললো
“না ভাইয়া আজ না। তোমরা বেড়াতে যেও”
রাজ মিহি কে বললো
“আচ্ছা তোর নাম্বার টা দে। আর আমার টাও নিয়ে রাখ”
মিহি রাজের কথা মতো নাম্বার নিয়ে রাখলো। এরপর ওরা রাজের থেকে বিদায় নিয়ে অভ্রর দাদু বাড়িতে গেলো। সেখানে কিছুক্ষণ থেকে আবার শহরে ব্যাক করলো।

মুগ্ধ রুমে শুয়ে আছে। গ্রাম থেকে আসার পর আর কিছুই ভালো লাগছে না। ভালো লাগবে কি করে মেয়েটা কে যে মন দিয়ে ফেলেছে। মুগ্ধ বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি করার পর সোজা মিহির কাছে চলে গেলো। মিহি রান্না করে খাবার বানাচ্ছে। মুগ্ধ মিনমিন করে গিয়ে মিহির শাড়ির আঁচল ধরে দাড়ালো। মিহি আড়চোখে মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বললো।
“কি হয়েছে রে এমন ঘামছিস কেনো? কোনো অকাম টকাম করিস নি তো?”
মুগ্ধ দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বললো
“না না ছোটমা কোনো অকাম করি নি। তোমার সাথে একটা কথা ছিলো বকা দিবে না তো?”
মিহি গম্ভীর গলায় বললো
“যদি বকা খাওয়ার মতো কথা হয় তাহলে তো বকা দিবোই”
মুগ্ধ আমতা আমতা করে বললো
“আসলে ছোটমা তোমার ভাইয়ের মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে আমি ওকে বিয়ে করতে চাই”
মিহি মুগ্ধর দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর রাগি চোখে বললো

“তোর বাবা কে বলেছিস?”
মুগ্ধ মাথা নাড়িয়ে বললো
“না বলি নি। তোমাকেই আগে বললাম তুমি এখন বাবা কে রাজি করাও প্লিজ?”
মিহি কিছু বললো না। মুগ্ধ মিহির আঁচল ধরে ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো। একটু পর কিচেনে তিথি আসলো। মুগ্ধ কে মিহির আঁচল ধরে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বললো
“কিরে বাবু কি হয়েছে রে? এভাবে দাড়িয়ে আছিস কেনো? খিদে পেয়েছে তোর? আচ্ছা সোফায় গিয়ে বস খাবার দিচ্ছি”
তিথির কথা শুনে মিহি শান্ত কন্ঠে বললো
“তোমার বাবুর খিদে পেয়েছে তবে সেটা বিয়ের খিদে। সে আমার ভাইয়ের মেয়েকে মন দিয়ে এসেছে। এখন তার আবদার তাকে আমার ভাইয়ের মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে হবে”
মিহির কথা শুনে তিথি কাশি দিয়ে উঠলো। এরপর মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বললো

“কি নাক টিপলে দুধ বের হবে আর ও এখন বিয়ে করবে?”
মুগ্ধ রেগে গিয়ে বললো
“মা আমার বয়স ২৪ বছর। আমি এখন ছোট নেই। তাছাড়া কাকাই ছোটমা কে ১৯ বছরে বিয়ে করেছে। সেই তুলনায় আমি অনেক টাই বড়”
মিহি বললো
“তোর মতো বেকারের হাতে আমি কেনো আমার ভাইয়ের মেয়েকে দিবো বল তো? তুই কোনো কথা শুনিস? তের কাকাই কবে থেকে তোদের তিন ভাই কে বলছে কোম্পানির হাল ধরতে কিন্তু তোরা তো কথা গায়ে মাখাচ্ছিস না।”
তিথি মিহি কে সম্মতি জানিয়ে বললো
“একদম ঠিক বলেছো। ওমন বেকার ছেলেকে কোন বাপ মেয়ে দিবে? ও যদি আজকে থেকে অফিস না যায় তাহলে ওর বিয়ে কোনোদিন দিবো না”
মুগ্ধ মুখ ফুলিয়ে বললো
“আমি ৫ টা টিউশনি পড়াই মা। এটা কি তোমার চোখে পড়ে না? আমি বেকার হলাম কি করে? আচ্ছা যাও আজকে থেকে কাকাই এর কোম্পানি তে জয়েন হবো”
মিহি মনে মনে মুচকি হাসলো। ও তো এতোদিন এটাই চেয়েছিলো। রিদ মিহি অভ্র সব সময় চাইতো মুগ্ধ, শুভ্র,ঋশ যেনো ওদের কোম্পানি টা দেখাশোনা করে। কিন্তু এই তিনজনের মধ্যে কেউ রাজি না। ওদের কথা হলো ওরা নিজেরাই সময় হলে বিজনেস শুরু করবে। যদিও রিদের জোরাজুরি তে ঋষভ রিদের কোম্পানি মাঝে মধ্যে দেখাশোনা করে তবে সেভাবে না। ওর মুডের উপর ডিপেন্ড করে। এটা নিয়ে রিদের কোনো সমস্যা নেই তাও যে ঋশ কোম্পানি দেখছে এটাই অনেক। ওকে বেশি ঘাঁটাতে গেলে সেটাও দেখবে না।
মিহি মুগ্ধ কে বললো

“সত্যি তো? আজকে থেকে জয়েন হলে আমি ভাইয়া কে কল দিয়ে বলবো”
মুগ্ধ সাথে সাথে লাফিয়ে উঠে বলে
“একদম ছোট মা আমি রাজি আমি আজকে থেকেই যাবো তুমি এখনি তোমার ভাই কে বলো”
মিহি চোখ গরম করে বললো
“ওই পাঠা একটু আগেই ওদের বাড়ি থেকে ফিরলাম আমরা। আর এখনি কল দিয়ে বলবো?একটু ধৈর্য ধর সময় হলে বলবো”
মুগ্ধ মিনমিন করে বললো
“আমি জানি না তুৃমি আজকেই উনাকে কল করবা। আমি খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো”
তিথি ছেলের কথা শুনে অবাক হচ্ছে। ওর ছেলেটা তো এতো বিয়ে পাগলা ছিলো না। তাহলে হুট করে এমন করছে কেনো। তিথি মুগ্ধর কান মলে দিয়ে বললো
“ওই তোর বড় ভাই কে অবিবাহিত রেখে তুই বিয়ে করে নিবি?”
মুগ্ধ মা কে জড়িয়ে ধরে বললো
“আমি জানি না মা। ওদের আশা করতে গেলে আমার এই জন্মে বিয়ে হবে না। ঋষভ ভাইয়া বিয়ে করবে কিনা সন্দেহ আর তোমার ছেলেও ওর দেখাদেখি হয়ত বিয়ে করবে না। তার থেকে ভালো আমি ওদের আগে করে ফেলি। তারপর ওরা যখন খুশু করুক। আই ডোন্ট কেয়ার।”

তিথি মুগ্ধর কথা শুনে খুন্তি নিয়ে ওকে তারা করলো। মুগ্ধ ও মায়ের ভয়ে মিহির পেছনে এসে লুকালো। ওদের মা ছেলের খুনসুটি দেখতে ভালোই লাগে
মিহি দুই মা ছেলের খুনসুটি দেখছে। ওর ও খুব ইচ্ছে করে ঋষভের সাথে এভাবে খুনসুটি করার। কিন্তু তার ছেলেটা যে একদম গুরুগম্ভীর। ছোট থেকেই চুপচাপ। তবে রাগের বেলায় ষোল আনা।ঋষভ কখনো মিহি কে কখনো নিজের মনের কথা গুলো বলে না। ছোটবেলায় যদি পড়ে গিয়ে অনেক ব্যাথা পেতো সেটাও মিহি কে বলতো না। জ্বরে হাত পা পুড়ে যেতো তাও মুখ ফুটে বলতো না। হাত কেটে গেলেও টু শব্দ করতো না। শুধু মিহি কে না ছেলেটা কাউকেই নিজের ফিলিংস গুলো বোঝাতে পরে না। ঋষভ কে কেউ বুঝতে পারে না। ছেলেটা ঠিক মতো কারো সাথে কথাও বলে না আবার হাসেও না। ঋশ বড় হওয়ার পর মিহি কখনো ওকে হাসতেই দেখে নি। তবে শুভ্র এবং মুগ্ধ মিহি কে সব কথা এসে বলে। মিহি কে অনেক মানে। ওরা মিহি কে খুব ভালোবাসে। কোনো কিছু করার আগে তিথির থেকে পারমিশন নেওয়ার আগে মিহির পারমিশন নেয়। রুহি আবার সব কথা তিথি কে গিয়ে বলে। তিথি হলো রুহির বান্ধবীর মতো। রুহি সব কথা তিথি কেই বলে আর তিথি ও রুহি কে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসে।
মিহির খুব ইচ্ছে ছেলের সাথে বসে দুটো সুখ দুঃখের গল্প করতে। কিন্তু ঋষভ কখনো মায়ের কাছে আসে না। এসব কথা ভেবে চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। কেউ দেখার আগে চোখের জল মুছে নিলো।

মিহি অভ্র কে মুগ্ধর বিয়ের কথা জানালে অভ্র সাথে সাথে রাজি হয়ে যায়।
মিহি বিকেলের দিকে রাজ কে কল দিয়ে বিষয় টা বলে। রাজ একপায়ে রাজি হয়ে যায়।মিহি রাজ কে ওদের বাসায় আসতে বলে। রাজ বলে তারা পরেরদিন বিকেলে আসবে…
পরেরদিন বিকেল বেলা…
রাজ ওর মেয়ে এবং বউ কে নিয়ে মিহিদের বাড়িতে আসে। বাড়ি টা দেখেই রাজের চোখ কপালে উঠে যায়। এতো বড় বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হবে ভাবতেই খুশিতে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এতো বড় বাড়ি তো কখনো চোখেই দেখে নি। টিভি সিরিয়াল গুলো তে দেখেছে। রাজ ওর বউ কে চোখ মেরে বললো
“কি গো দেখেছো আমাদের মেয়ে এই বাড়ির বউ হবে”
মহিলাটা শয়তানি হাসি দিয়ে বললো
“হুমম ঠিক বলেছো একবার রাহা কে এই বাড়িতে ডুকিয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে”
রাজ রা ভেতরে গেলো। মিহি ওদের দেখে বসতে দিলো। রুহি বিভিন্ন নাস্তা এনে টেবিলে রাখলো। অভ্র রিদ তিথি মুগ্ধ সবাই উপস্থিত। একটু পর ই শুভ্র আর ঋষভ আসলো। ঋষভ সোজা উপরে চলে যেতে নেই এমন সময় মিহি ঋষভ কে ডেকে বলে
“ঋশ এইদিকে এসো। তোমার মামা এসেছে।”

ঋষভ গিয়ে মুগ্ধর পাশে বসলো। ঋষভ কে বসতে দেখে শুভ্র ও গিয়ে ঋষভের পাশে বসে পড়লো। মিহি সবার সাথে রাজের পরিচয় করিয়ে দিলো। রাজের মেয়ে রাহা একভাবে ঋষভের দিকে তাকিয়ে আছে। এতো সুন্দর ছেলে ও কখনো দেখেনি। রাহার কাছে ঋষভ কে অনেক পছন্দ হয়। একদম টিভির নায়কদের মতো। ওদের থেকেও সুন্দর। রাহা ভাবে মিহি হয়তো ওর ছেলে অথাৎ ঋষভের সাথে ওর বিয়ে ঠিক করেছে। কথাটা ভেবেই রাহার খুশিতে নাচতে মন চাইলো। ঋষভের সাথে যদি ওর বিয়ে হয় তাহলে গ্রামের সবাই অবাক হয়ে যাবে। এতো সুন্দর ছেলে গ্রামের কোথাও নেই।
মিহি রাজ কে বললো
“ভাইয়া আমি আমার ছেলের সাথে তোমার মেয়ের বিয়ে দিতে চাই”
কথাটা শুনে রাহা মনে মনে নেচে উঠলো। এতো সুন্দর ছেলে ওর বর হবে? ভাবতেই ভালো লাগছে। এরমধ্যেই রুহি এসে রাহা ডেকে নিয়ে গেলো। কিন্তু কেনো নিয়ে গেলো কেউ বুঝতে পারলো না। রাহা চলে যাওয়ার মিহি আবারো রাজের দিকে তাকিয়ে বললো

“শুনো ভাইয়া আমার ছেলে বলতে আমার অভর ছেলের কথা বলেছি। ওরা দুইজন হয়তো আমার পেটের সন্তান না তবে সন্তান তো সন্তানই হয়। আমি মুগ্ধর সাথে রাহার বিয়ে দিতে চাই। তুৃমি কি রাজি?”
রাজ সাথে সাথে রাজি হয়ে যায়। কারণ মুগ্ধ দেখতেও অনেক সুন্দর। তবে হাইট টা একটু কম। সেটা ব্যাপার না। ছেলে বড়লোক হলেই হবে। একটু পর রাহা এসে সোফায় বসে। মিহি রুহি কে জিজ্ঞেস করে
“রাহা কে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলি রে?”
রুহি দাঁত কেলিয়ে বলে
“রাহা ভবিষ্যতে আমার ভাবি হবে তাই ভাবি কে পুড়ো বাড়ি ঘুড়িয়ে দেখালাম”
রুহির কথা শুনে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
রিদ এতোক্ষণ চুপ করেই ছিলো কিন্তু এবার বললো
“আমার মনে হয় ছেলে মেয়ে একটু আলাদা ভাবে কথা বলা উচিত। কি বলিস অভ্র?”
অভ্র রিদের কথায় সম্মতি জানিয়ে বললো
“হ্যাঁ ঠিক বলেছিস”

মিহি রাহা আর মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বললো
“যাও তোমরা উপরে গিয়ে একটু কথা বলে আসো। রুহি ওদের নিয়ে যা”
রুহি রাহা কে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো। পেছন পেছন মুগ্ধ গেলো। অথচ রাহা ভাবছে ওর পেছন পেছন হয়তো ঋষভ আসছে। কথাটা ভেবেই ওর বুক কাপছে অন্য রকম ফিল হচ্ছে। রাহা রুমে ডুকেই অন্য মুখ হয়ে দাড়িয়ে আছে ওর লজ্জা লাগছে খুব। রুহি মুগ্ধ কে ফিসফিস করে বললো
“কিরে ছোটু তোর বউতে লজ্জা পাচ্ছে”
মুগ্ধ রুহির মাথায় বারি দিয়ে বললো
“তুই যা তে পাঠি”

রুহি চলে গেলো। রাহা একবারের জন্য ও পেছন ঘুরে তাকালো না। মুগ্ধ রাহা কে বললো
“তোমাকে প্রথম দেখাতেই আমার পছন্দ হয়েছে তুমি কি আমার বউপাখি হবে?”
কথাটা শুনে রাহার বুকের ভেতর ঝড় উঠে গেল ও মনে মনে ভাবলো ছেলেটা ও ওকে এতো পছন্দ করেছে? ভাবতেই ওর লোম দাড়িয়ে যাচ্ছে। রাহা ওই মুখ হয়ে বললো
“আমারো আপনাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়েছে”
মুগ্ধ কথাটা শুনে একদম বিশ্বজয়ের হাসি দিল। ও তো ভাবেই নি রাহা ও ওকে পছন্দ করবে।
মুগ্ধ বললো

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২

“তুমি বিয়েতে রাজি তো”
রাহা ছোট করে উত্তর দিলো
“হুম”

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪