Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৮

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৮

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৮
কায়নাত খান কবিতা

জোর—এই শব্দটা শুধু একটি কাজের নাম নয়, বরং আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজের এক অন্ধকার রূপ। যখন মানুষ বোঝাতে পারে না, যখন সম্মান দিয়ে কিছু আদায় করতে পারে না, তখন সে বেছে নেয় জোরের পথ। যেন শক্তিশালী প্রাণী দুর্বল প্রাণীর ওপর নিজের ক্ষমতা দেখানোর সহজ উপায়ই হলো জোর করা। অনেক সময় এটাকে অধিকার বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু আসলে এটি ক্ষমতার নির্মম অপব্যবহার।
এই জোরের শিকার হয়ে এসেছে অরিন দীর্ঘদিন ধরে। কিংশুক কখনোই ভাবেনি অরিন কী চায়, তার মনের কথা কী। তার কাছে সবসময় বড় ছিল নিজের ইচ্ছা, নিজের চাহিদা। অরিনের অনুভূতি, তার ভয়, তার অপছন্দ—এসব যেন কোনো গুরুত্বই পায়নি কখনো।

গাড়িতে করে বিয়ে করার পর কিংশুক অরিনকে নিয়ে সোজা চলে আসে নিজের ভিলাতে। সেই বাড়িটাই এখন তাদের ঠিকানা। এই বিলাসবহুল বাড়িটি এখন অরিনের অদৃশ্য কারাগারের মতো। প্রতিটি রাত তার কাছে আতঙ্কে ভরা। কারণ সে জানে, রাত নামলেই আবার শুরু হবে সেই পুরোনো দুঃস্বপ্ন—কিংশুকের অধিকার ফলানোর নির্মমতা। অরিন নিষেধ করলেও কোনো লাভ হবে না, এটাই তো হয়ে এসেছে এতদিন ধরে।
গাড়ি এসে থামে কিংশুকের ভিলার সামনে। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে কিংশুক অরিনকে কোলে তুলে নেয়। যেন সে কোনো মানুষ নয়, কেবল কিংশুকের সম্পত্তি। অরিনকে নিয়ে সোজা হেঁটে চলে যায় নিজের রুমে। দরজা ভেতর থেকে লক করে দেয়।
রুমের ভেতর নীরবতা নেমে আসে। তারপর ধীরে ধীরে এক পা এক পা করে অরিনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে কিংশুক। তার হাঁটার ভঙ্গিতেই অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা। আর অরিন—সে এক পা এক পা করে পিছিয়ে যেতে থাকে। ভয়ে তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে ওঠে।

“কি?”
“ইয়েস জান।”
“দেখুন!”
“দেখবো তো… কাছো আসো।”
কিংশুকের এই অদ্ভুত, খামখেয়ালি কথাবার্তা আর অস্বাভাবিক ধীর গতি অরিনের ভয় আরও বাড়িয়ে দেয়। তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে।
কিন্তু ভয়ের মাঝেও একটা সত্য সে কখনো ভুলতে পারে না— আর সেটা হলো কিংশুক তার মায়ের খুনি। যে মানুষ নিজের মাকে হত্যা করতে পারে, সে আর যাই হোক মানুষ হতে পারে না—এটা অরিনের দৃঢ় বিশ্বাস। তার চোখে কিংশুক একটা জা’নোয়ার ছাড়া আর কিছুই নয়।
কিংশুক এসে দাঁড়ায় অরিনের একেবারে সামনে। হঠাৎ করে তার কোমর জাপটে ধরে বলে,

“আই মিস ইউ সো মাচ, জান।”
খানিকটা কর্কশ গলায় অরিন বলে,
“বাট আই অ্যাম নট।”
দুই হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে নিজের থেকে সরিয়ে দেয় সে কিংশুককে। মুহূর্তের জন্য থমকে যায় কিংশুক। নিজের রাগকে যেন জোর করে চেপে ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
অরিন কঠিন চোখে তাকিয়ে বলে,
“আপনি মানুষ না, কিং।”
কিংশুক ভ্রু কুঁচকে তাকায়। যেন সে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণের শেষ সীমানায় রয়েছে।
“তাহলে কী?”
অরিনের ঠোঁট থেকে বেরিয়ে আসে একটাই শব্দ….
“খুনি।”
মুহূর্তেই কিংশুকের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। চোখে নেমে আসে অদ্ভুত এক অন্ধকার। সে হঠাৎ করে অরিনের গাল চেপে ধরে।

“তোর অনেক কিছু সহ্য করেছি আমি—বেইমানি, ধোঁকা, সব। কিন্তু আর না।”
অরিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় কিংশুকের দিকে।
“এখন কী জোর করবেন, কিং?”
কিংশুকের ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি।
“দরকার হলে তাই।”
অরিন তীব্র ঘৃণা মাখা কন্ঠে বলে…
“নিজের মায়ের খুনির থেকে আর কী-ই বা আশা করা যায়?”
কথাটি শেষ হতে না হতেই সজোরে একটা চড় পড়ে অরিনের গালে। শব্দটা যেন পুরো রুমে প্রতিধ্বনিত হয়। আঘাতে দুলে ওঠে অরিন।কিন্তু কিংশুক এখানেই থামে না। সে অরিনের বাহু শক্ত করে ধরে টানতে টানতে রুমের বাইরে নিয়ে যেতে থাকে ।
তারপর হঠাৎ করে গর্জে ওঠে—
“টাইগার! ওমার!”

কিংশুকের সেই হুঙ্কারে যেন পুরো বাড়িটাই কেঁপে ওঠে। আজ তার ভেতরের আগুন আর নিয়ন্ত্রণে নেই। এতদিন অরিনের বেইমানি, তার শিশুসুলভ জেদ, পাগলামি—সব সহ্য করেছে সে। এমনকি তার চড়-থাপ্পড়ও মেনে নিয়েছে। কিন্তু আজকের এই একটি কথা কিছুতেই সে আর নিতে পারে না।
কিংশুক অরিনকে টেনে নিয়ে গিয়ে সোজা বাড়ির বাইরে দাঁড় করায়।তার চোখে তখন কঠিন সিদ্ধান্ত।
“ওকে আমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে যাও। কখনো যেন আমার সামনে না আসে।”
কিংশুকের এই আচরণে পুরোপুরি অবাক হয়ে যায় অরিন। এই মানুষটা তো তাকে ছাড়ার মতো লোক নয়। যে মানুষ তাকে নিজের সম্পত্তির মতো ধরে রেখেছে এতদিন, সে আজ হঠাৎ তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে? তাই এতো কাছে পেলে?
তবু বিস্ময়ের মাঝেও এক ধরনের স্বস্তি ছুঁয়ে যায় অরিনকে। যদি সত্যিই সে মুক্তি পায়, সে কথা ভেবে।
কিংশুক আর একবারও তাকায় না। দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে যায়।
আর টাইগার নীরবে অরিনকে নিয়ে গাড়িতে ওঠে। গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় খান বাড়ির দিকে।
পেছনে রয়ে যায় সেই বিশাল ভিলাটি—আর তার ভেতরে রয়ে যায় এক অদ্ভুত নীরবতা, যেন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।

“খান_ম্যানশন”
—খান বাড়িতে এসেছে অরিন আজ দুদিন হলো। তবুও বাড়ির ভেতরের অস্বস্তিকর নীরবতা এখনো কাটেনি। সবাই যেন অদ্ভুত এক ধাক্কার মধ্যে আছে। কারণ ঘটনাটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। কিংশুক অরিনকে এত সহজে ছেড়ে দিলো?
এই মানুষটা তো এমন নয়। যে মানুষ এতদিন ধরে অরিনকে নিজের ছায়ার মতো বেঁধে রেখেছিল, যে মানুষ অরিনকে নিজের কাছ থেকে দূরে যেতে দেয় না—সে হঠাৎ করে তাকে ছেড়ে দিলো? ব্যাপারটা যেন কারও কাছেই ঠিক বিশ্বাসযোগ্য লাগে না।
খান বাড়ির সবাই তাই অবাক, হতবাক হয়ে বারবার একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভাবছে।
কিংশুক কি সত্যিই অরিনকে ছেড়ে দিয়েছে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে?
তবে আপাতত একটা বিষয় স্পষ্ট—অরিন এখন এখানে, খান বাড়িতে। আপাতত সে কিংশুকের হাত থেকে মুক্ত। আর এই মুক্তিটাই তার কাছে অনেক বড় বিষয়। কেন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেটা পরে ভাবা যাবে।
“ব্রো, তোমাকে কীভাবে ছাড়লো বাচ্চা?”

বাইকারের কথা শুনে অরিন একটু বিস্মিত হয়ে তাকায় তার দিকে। যেন প্রশ্নটা সে আগে থেকেই আশা করেছিল, তবুও হঠাৎ শুনে একটু থমকে যায়।
মুখের কোণে লেগে থাকা আইসক্রিম হাত দিয়ে মুছতে মুছতে শান্ত গলায় বলে,
“একজন খুনি নিজের পাপের কথা শুনলে আর কীভাবে আটবে রাখবে, বাইকার?”
বাইকার ভ্রু কুঁচকে তাকায় অরিনের দিকে।
“খুনি মানে?”
অরিন একদম সোজা চোখে তাকিয়ে বলে,
“তোমার ভাই।”
বাইকার এবার পুরোপুরি অবাক হয়ে যায়। তার ভাই আবার কাকে খু’ন করলো?
“কাকে খুন করেছে কিং ব্রো? ”
“কেন, তোমার মাকে।”
এই একটা কথায় ছিলো ক্যাটরিনার পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে দেওয়ার জন্য। তার মা খু’ন হয়েছিলো এটা তো কেবল সে, কিংশুক এবং আতিয়া বেগম জানেন। আর কেউ তো জানে না। তাহলে অরিন কীভাবে জানলো?

“মা’কে?”
অরিন ধীরভাবে মাথা নাড়ে।
“হুম।”
“কে বলেছে তোমাকে?”
অরিন এক মুহূর্ত থামে। তারপর ঠান্ডা স্বরে বলে—
“মনি।”
কথাটি বলেই আবার ও আইসক্রিমে মন দেয় অরিন। কিন্তু চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে যায়। বাইকার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।তার মাথার ভেতর তখন ঘুরপাক। এক কঠিন ধাঁধার ঘুরপাক।
” বাচ্চা, আমি একটু আসছি।”

অরিনের প্রতি উত্তরের অপেক্ষা না করে সোজা হাঁটতে থাকে ক্যাটরিনা।তার প্রতিটি কদমে যেন ক্ষোভে ভরপুর।
অরিন শুধু বাইকারের চলে যাওয়া দেখতে থাকে। সে তো কখনো এমন আচরণ করে না। বেশ সংশয়ে পড়ে যায় অরিন। হয়তো তার মায়ের কথাটি তোলা উচিত হয়নি। হাজার হলে ও মা। এতোদিন তো সে জানতো কিংশুকের মায়ের পরকীয়ার কারণে তার বাবা সুইসাইড করেছে। তারপর থেকে কিংশুক প্যারনয়েড পারসোনাল ডিসওর্ডারে ভুগছে। কিন্তু এখন জানলো অন্য কোথা। কিংশুকের বাবা পলায়নি। সে মারা গেছে কিংশুকের হাতে। সব মিলিয়ে বেশ তাল গোল পাকিয়ে যায় অরিনের মনে। পুরো ঘটনা গুলো সে আবার মনে করতে থাকে। প্রথমে মনি তাকে বলেছিলো তার কিংশুকের মা পরকীয়া করে অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে যায়। যার ফলে লোক লজ্জায় পড়ে কিংশুকের বাবা সুইসাইড করে। তারপর থেকে কিংশুক মানুষিক সম্যায় ভোগে। যার চিকিৎসা তাকে দিয়ে করানো যায়নি। সে নিজের রোগকে কখনো গ্রহণই করেনি। তাহলে এখন যা শুনলো তা কী? কিংশুকের মা মারা গেছেন? তাও কিংশুকের হাতে?
ব্রেনে প্রচন্ড চাপ পড়তে থাকে অরিনের। সে সিদ্ধান্ত নেয় আগে বাইকারের সাথে কথা বলে মন হালকা করবে। তারপর সব কিছু।

যেই ভাবা সেই কাজ, অরিন উঠে সোজা বাইকারের রুমে চলে যেতে থাকে। এখন তার সাথে কথা বলা জরুরি।
বাড়ির ভিতরে এসে অরিন জানতে পারে ক্যাটরিনা তার মনির কক্ষে। যাক ভালোই হয়েছে। দু-জন একসাথে। অরিন তড়িঘড়ি করে চলে যায় তার মনির রুমে।কিন্তু দরজা নক করার আগেই থমকে যায় তার কদম।
_এটা কোনো পাপ নয় ক্যাট!”
__তাহলে কী মনি?”
__আমি তো শুধু! ”
__তুমি তো শুধু কীহহহ মনি? একটা ছেলেকে নিজের মায়ের খু’নি বানালে? আমার ভাইয়ের পুরো শৈশব নষ্ট হয়েছে মনি। এখন তার বর্তমান ও তুমি কেন নষ্ট করতে চাচ্ছো?”
নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে পারে না ক্যাটরিনা। তার গলার আওয়াজ পুরো বাড়িকে কাঁপিয়ে তোলে। অরিন ও আধখোলা দরজার বাইরে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে। তার পা দুটো যেন অবশ হয়ে গেছে । তাহলে এমন আরো অনেক সত্যি রয়েছে যেগুলো তার অজানা।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৭

__তুমি অরিনকে সত্যিটা বলবে মনি। এবং এখনই বলবে।”
__আমি এটা পারবো না।”
__কেন পারবে না?”
__কারণ আমি মা।কিংশুক যদি স্বাভাবিক হতো আমি বলে দিতাম সব। কিন্তু এতো কিছুর পর আর নয়। আমি নিজের মেয়ের ক্ষতি করতে পারবো না।”
___অথচ ছেলের ক্ষতি করতে পারবে? আমার ভাইয়ের কী দোষ ছিলো মনি? কেন আমাদের দু-জনের শৈশব নষ্ট হলো বলো? আমরা ও তো কারো সন্তান ছিলাম। তাহলে আমাদের সাথে কেন এমন হলো? কেন আমাদের নিজের বাবা, কিং ভাইয়ের চোখের সামনে আমাদের মা-কে খু’ন করেছিলো মনি? কেন করেছিলো সে????

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৯