শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩১
রুহানিয়া ইমরোজ
আলােক উদ্ভাসিত জ্যোৎস্নাশােভিত পূর্ণিমার রাত। সময়টা প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি। বিরক্ত মুখে বিছানায় বসে আছে প্রিমা। সন্ধ্যা বেলায় বাহিরে ঘুরতে গিয়েছিল তারা। প্রায় রাত দশটার পরে কটেজে ফিরেছে। ভেতরে আসতেই আরশিয়ান আকস্মিক শুধায়,
–” অল্প কিছুক্ষণের জন্য শাড়ি পরতে পারবেন? ”
প্রিমা তেমন একটা ক্লান্ত ছিলো না। আচমকা শানের আবদার শুনে প্রত্যুত্তরে বলে,
–” পারবো। ”
আরশিয়ানর গম্ভীর মুখটায় স্মিত হাসি ফুটে ওঠে। প্রিমার চোখে বিষয়টা ধরা পড়তেই তার অন্তঃকরণ ভালোলাগার আবেশে পরিপূর্ণ হয়। আরশিয়ান লাগেজ থেকে মেরুন রঙের একটা বেনারসি টিস্যু শাড়ি বের করে তার হাতে দিয়ে বলে,
–” খুব সম্ভবত শাড়ির কালার কিংবা ডিজাইন আপনাকে হতাশ করবে না আর..
গম্ভীর মানুষটা বরাবরই নিজের অনুভূতি প্রকাশে ব্যর্থ। বেচারা ভালোই চেষ্টা করছে তবে চাইলেই কী ব্যক্তিত্বের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা যায়? প্রিমা তার বিভ্রান্ত চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করে ধীর গলায় বলল,
–“আপনি যেমন তেমনভাবেই আপনাকে মেনে নিতে চাই আমি। মাঝখানে হুট করে কী ধরনের পাগলামি মাথায় চেপেছিল কে জানে তবে আপনারজোরপূর্বক পরিবর্তিত সত্তাটা বড্ড বেখাপ্পা ঠেকছে। প্রয়োজন নেই এসব মেকি এক্সট্রোভার্ট সাজার। আপনার প্রকৃত সত্তাটাই মুগ্ধ করে আমাকে । ”
আরশিয়ান চমকে উঠে। প্রিমা কী ধরে ফেলেছে তার অপরিপক্ক প্রচেষ্টার ব্যর্থতা? প্রিমা কী পড়ে ফেলেছে তার চোখমুখ লেপ্টে থাকা অস্বস্তি? খানিকক্ষণ কিছু একটা ভেবে গম্ভীর স্বরে আরশিয়ান বলে,
–” আপনি বুঝলেন কীভাবে? ”
প্রিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–” বিকালে বুবু কে কল করার জন্য যখন আপনার ফোন দিয়েছিলেন তখন কিছু কারণ বশত আমি গুগলে ঢুকেছিলাম। ওখানে গিয়ে দেখি সার্চ বারে লেখা, হাউ টু বি অ্যান এক্সট্রোভার্ট, হাউ টু বি এ গুড হাসবেন্ড, হাউ শ্যুড উই এক্সপ্রেস আওয়ার ফিলিংস৷ পুরো বিষয়টা দেখে আমি খুব বেশি অবাক হয়ে যায়। প্রথমে রিয়ালাইজ না করলেও পরবর্তীতে আপনার আপনার একচুয়াল ব্যক্তিত্বের সাথে আপনার পুরোনো দিনগুলোর আচরণ গুলো মিলিয়ে দেখতে গিয়ে নিজের ভুল বুঝতে পারি।
সবটা শুনে আরশিয়ান খানিকটা অপ্রস্তুত হয় তবে কিছুটা সময় নিয়ে বলে উঠে,
–” নিজেকে বোঝাতে না পারার ব্যর্থতা সকল অসহায়ত্বকে ছাপিয়ে যায়। আমি হয়তো অন্যদের মতো স্বীকারোক্তি দিতে অক্ষম কিন্তু আমার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজকর্ম ঠিকই আপনাকে আসল সত্যটা অনুভব করতে বাধ্য করতো। পরিস্থিতির চাপে পড়ে আপনি হয়েছিলেন অধৈর্য আর আপনার পাগলামিতে সায় জানাতে গিয়ে…
আরশিয়ানের বুক চিরে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস৷ প্রিমার মনে জাগ্রত হয় অপরাধবোধ। মানুষটা তার জন্য কী পরিমাণ সাফার করেছে ভাবতেই খারাপ লাগা কাজ করে। আর পাঁচটা বউয়ের মতো তারও মনে হয়েছিল স্বীকারোক্তি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ তবে সময়ের ফেরে প্রিমা অনুভব করে মানুষটার মুখের বুলি তাকে প্রশান্তি দিচ্ছে না। নিজের অনুভূতি প্রকাশে ব্যর্থ মানুষটার থেকে জোরপূর্বক অনুভূতির স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারলেও সেটা ছিলো নির্জীব৷ তার চোখেমুখে ভালোবাসার ছাপের বদলে লেপ্টে ছিলো একরাশ অস্বস্তি। বিষয়টা অনুধাবন করতেই প্রিমার বুক কেঁপে উঠে। নিজের বলদামি ধরতে পেরে শ’খানেক গালি দেয় নিজেকে।
কথা শেষ হতেই আরশিয়ান রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়।প্রিমা অলসতা ঝেড়ে ফেলে মনের মাধুরি মিশিয়ে শাড়িটা পরে অল্প একটু সেজে নেয়। হরিণীর ন্যায় টানা টানা চোখ জোড়ায় কাজলের সূক্ষ্ম কালিমা লেপন করে। কোমল ওষ্ঠ জোড়ায় শাড়ির সাথে মিল রেখে একটা গাঢ় শেডের ন্যুড লিপস্টিক দেয়।গলায় একটা সোনালি রঙের পুরু চেইন পরে। ফর্সাটে কাঁধে সেটা চকচক করে নিজের সৌন্দর্য জানান দেয়। পরিশেষে শূন্য হাতদুটোতে নিখুঁত ভাবে কারুকার্য করা স্বর্ণের দু’টো বালা পরে। এগুলো বিয়ের পর আফিয়া চৌধুরী তাকে দিয়েছিলেন তবে আজ অব্দিই পরা হয়নি।
সাজগোজ করে প্রিমা চুপচাপ পটের বিবি সেজে বসে থাকে অথচ আরশিয়ানের দেখা মিলে না । ক্ষুধার তাড়না অনুভব করতেই প্রিমা ভাবনা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। শেষমেশ আর সইতে না পেরে বিরক্ত হয়ে কটেজের দরজার দিকে এগোতে নিলে দরজায় টোকা পড়ে। প্রিমার পদযুগল থমকে যায়।
আকস্মিক তার মনটা অজানা অনুভূতিতে শিউরে উঠে। মুখে ফুটে উঠে লজ্জারুণ হাসি। ধীর পায়ে এগিয়ে দরজা খুলে সামনে তাকাতেই প্রিমা যেনো হতভম্ব হয়ে যায়। হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। শখের পুরুষের অতি মাত্রায় সুদর্শন অবয়ব তাকে বাধ্য করে অপলক চাহুনি নিক্ষেপ করতে। আরশিয়ানের অবস্থাও একই। একান্ত ব্যক্তিগত নারীর মোহনীয় রুপ দেখে বেচারা অবাক হয়ে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে ছিলো। কিছুক্ষণ পর আরশিয়ান চোখ নামিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে একটা ছোট্ট ফুলের বুকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
–” বিকেলে বাহিরে ঘুরতে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করেছিলাম আপনি ঘুরেফিরে ফুলগুলোর দিকে তাকাচ্ছেন। ভাবলাম এগুলোর সংমিশ্রণে একটা বুকে বানালে আপনি খুশি হবেন। হয়তোবা পার্ফেক্ট হয়নি তবে আশা রাখছি আপনার ভালো লাগবে।”
প্রিমা মুগ্ধ চোখে তাকায় বুকেটার দিকে। চারটা গোলাপ এবং কিছু জিপসির সমন্বয়ে ছোট্ট একটা ফুলের তোড়া বানিয়েছে আরশিয়ান। বেচারার ইফোর্ট এবং ফুল গুলোর সৌন্দর্যে প্রিমা বিমোহিত হয়। আলতো করে ফুলের বুকেটা হাতে নিয়ে অস্ফুটস্বরে বলে,
–” কী চমৎকার! ”
আরশিয়ান প্রিমার দিকে অনিমেষনেত্রে চেয়ে আনমনে বলে,
–” মা শা আল্লাহ। ”
আরশিয়ানের কথাটা কর্ণগোচর হতেই প্রিমার দৃষ্টি লজ্জায় নীমিলিত হয়। আরশিয়ান মুগ্ধ চোখে চেয়ে রয় তার প্রিয়তমার দিকে। প্রিমা জুবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল। আচমকা ইলেক্ট্রিসিটি যাওয়ায় শানের হুঁশ ফিরে। প্রিমা চমকে উঠে বলে,
–” কী হলো…
আরশিয়ান তৎক্ষনাৎ হাত বাড়িয়ে প্রিমাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলে,
–” কিছু হয়নি। ভয় পাচ্ছেন? ”
প্রিমা শুকনো ঢোক গিলে বলে,
–” অন্ধকারে ভয় পায় না তবে শাড়ি পরলে শুকনো মেঝেতেও আছড়ে পড়ার রেকর্ড আছে আমার। আর এখন তো বিদ্যুৎ নেই যদি কিছুর সাথে বেঁধে কিংবা..
মাঝপথে আরশিয়ান তাকে চুপ করিয়ে দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
–” রিল্যাক্স। আমি আছি না? আমার সাথে পায়ে পা মিলিয়ে পিছু হাঁটবেন কেমন? ”
কথাটুকু বলেই প্রিমাকে বাহুবন্ধে আবদ্ধ করে নিলো আরশিয়ান। পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে অতি সাবধানে প্রিমাকে নিয়ে ওয়ারড্রবের কাছে গেলো। সেখান থেকে একটা মোমবাতি নিয়ে সেটা জ্বালাতেই মুহূর্তের মধ্যে মোমবাতির মোহনীয় আলোয় চারিদিকে কিঞ্চিত আলোকিত হয়।আরশিয়ান পরপর তিনটা মোমবাতি জ্বালিয়ে সেগুলো কাঠের টেবিলের উপর স্টিক করে দিলো অতঃপর প্রিমার কৌতূহলী মুখের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে ধীর গলায় বলে,
–” একটা সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছি। আপনার অতি মূল্যবান সময়ের মধ্যে অল্প একটুখানি সময় এই অধমের জন্য ব্যায় করবেন? ”
প্রিমা চোখ তুলে তাকায় শানের নিরেট মুখপানে। স্মিত হেসে বলে,
–” অবশ্যই মহাশয়। ”
প্রিমার উত্তর শুনে আরশিয়ানের চোখজোড়ায় মৃদু উচ্ছ্বাস দেখা যায়। প্রিমা আগ্রহ নিয়ে দেখে সেই চকচকে চোখজোড়া। অনুভূতির বিশ্লেষণ খুঁজতে গিয়ে এত চমৎকার অনুভূতির মুখোমুখি হবে সেটা কস্মিনকালেও ভাবেনি প্রিমা। আরশিয়ান তাকে রেখে কয়েকপা এগিয়ে গিয়ে বেলকনির দরজা খুলে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে শরতের শীতল হাওয়া বদ্ধ ঘরটায় হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করে।
প্রিমার চোখ আঁটকে যায় এক অপরুপ চিত্রের পানে। বারান্দায় ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজন করেছে আরশিয়ান। ছোট্ট একটা টেবিলের দু প্রান্তে দু’টো চেয়ার এবং সল্প সজ্জিত আয়োজনের দৃশ্যটা প্রিমাকে মুগ্ধ করে। আরশিয়ান এগিয়ে এসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
–” ওয়েলকাম ওয়াইফি। ”
প্রিমা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজের উচ্ছ্বাস দমিয়ে রাখে।আনন্দে পুলকিত হয়ে উঠে তার চিত্ত। চোখজোড়ায় প্রস্ফুটিত হয় খুশির আভাস। আরশিয়ান নিরবে দৃশ্য টুকু অবলোকন করে স্মিত হাসে। চেয়ার টেনে প্রিমাকে বসিয়ে দিয়ে অপর প্রান্তে নিজেও বসে অতঃপর বলে,
–” বিকেলে আপনি যখন ঘুমিয়ে ছিলেন তখন এই আইডিয়াটা মস্তিষ্কে কড়া নাড়ে। আহামরি খুব বেশি একটা ভালো রাঁধতে পারিনা আমি তবে খুব একটা খারাপ হবে বলে মনে হয় না। ”
প্রিমা বিস্মিত হয়ে শুধায়,
–” আপনি রান্না করেছেন? ”
আরশিয়ান তার গোল গোল চোখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে,
–” ইয়েস ওয়াইফি। ”
প্রিমা বিস্মিত হতেও ভুলে যায়। অবাক দৃষ্টিতে শানের পানে তাকিয়ে ভাবে,
–” এতটা কেয়ার আমি আদৌ ডিজার্ভ করি? এই মানুষটার এত এত ইফোর্টের বিনিময়ে তার প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিতে পারবো তো? একসময় অভিযুক্ত করেছি মানুষটাকে অথচ আজ নূন্যতম একটা অভিযোগ করারও সুযোগ মিলছে না। ধৈর্যের ফল এতটা সুমিষ্ট হয়? ”
প্রিমার ভাবনার ছেদ ঘটে আরশিয়ানের ডাকে। ডিশ এর উপর থেকে ঢাকনা সরিয়ে আরশিয়ান তাড়া দিয়ে বলল,
–” খাবার ঠান্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবে না। খেয়ে দেখুন কেমন হয়েছে। ”
আরশিয়ান নিজেই সার্ভ করে দিলো দু’জনের প্লেটে। প্রিমা এক চামচ মুখে পুরে থ হয়ে গেলো। অবাক চোখে আরশিয়ানের দিকে তাকালে বিনিময়ে শান বললো পুরো খাবারটা ফিনিস করতে। প্রিমা কথা না বাড়িয়ে নিজের অতি পছন্দের বিরিয়ানি তৃপ্তি নিয়ে সাবাড় করলো। খাবার শেষ হতেই বিশ্ব জয়ের হাসি দিয়ে বাচ্চাদের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রিমা বলল,
–” আপনার হাতে তো জাদু আছে। এত পার্ফেক্টলি মানুষ কেমনে রাঁধতে পারে? জাস্ট আউটস্ট্যান্ডিং। আমি বোধহয় খুশির চোটে একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছি। ”
আরশিয়ান হালকা হেসে তার দিকে পমগ্রেনেড জুস এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
–” এবার অপছন্দের পানীয়টাও ফিনিস করুন।কোনোপ্রকার টালবাহানা চলবে না প্রেম। ”
প্রিমার মুখটা চুপসে যায়। দুপুরের দিকে তার সকল টেস্টের রিপোর্ট এসেছে। জানা গেছে প্রিমার ব্লাডে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম আছে। তিনটা বাচ্চার মধ্যে দু’জন সুস্থ থাকলেও একজন একটু বেশি উইক। রিপোর্টের সাথে সাথে লম্বা একটা ডায়েট চার্টও এসেছে। দুপুর থেকেই সেটা স্ট্রিক্টলি ফলো করছে আরশিয়ান। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাকমুখ কুঁচকে পুরোটা এক নিঃশ্বাসে শেষ করে।
জুসটা পান করতেই এক উটকো গন্ধে গা গুলিয়ে আসে প্রিমার। নিজেকে সামলাতে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখবুঁজে বসে রইল কিছুক্ষণ অতঃপর চোখ মেলতেই দেখলো আরশিয়ান অপলক চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। প্রিমা কিছু বলার পূর্বে আরশিয়ান এসে তার সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসলো।
প্রিমা একটু হকচকিয়ে উঠলো তাতে। আরশিয়ানের দিকে দৃষ্টি তাক করতেই তার বেহায়া নজর আঁটকে গেলো শানের প্রশস্ত বক্ষে। শার্টের দু’টো বাটন খোলা থাকায় সৌম্য বর্ণের বুকটা দৃশ্যমান হয়ে রয়েছে। গলায় থাকা সিলভারের চেইনটা চাঁদের রুপালি আলোয় চকচক করছে। প্রিমার ঘোর আছন্ন মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে আরশিয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে নরম সুরে ডাকে,
–” ওয়াইফি? ”
প্রিমার যেনো ধ্যান ফিরে। হকচকিয়ে উঠে বলে,
–” জ্বী। ”
আরশিয়ান আলতো হেসে গম্ভীর স্বরে বলে,
–” আপনার পা জোড়া দেখি । ”
প্রিমা অবুঝের মতো পা এগিয়ে দিতেই শান ভীষণ যত্ন সহকারে তার পায়ে থাকা স্লিপার খুলে সাইডে রেখে তার পা টা বুকের উপর রাখে। প্রিমা চমকে উঠে পা সরিয়ে নিতে গেলে আরশিয়ান আলতো চাপ প্রয়োগ করে বলে,
–” বিন্দু পরিমাণ ডিস্টার্বেন্স চাইছি না প্রেম। প্লিজ কোঅপারেট..।
প্রিমা রীতিমতো শিউরে উঠে আরশিয়ানের কান্ডে। সেসবে তোয়াক্কা না করে পকেট থেকে একজোড়া নুপুর বের করে সযত্নে সেটা প্রিমার পায়ে পরিয়ে দিয়ে বলে,
–” হ্যাপি বার্থডে ওয়াইফি। ”
আজকে বোধহয় অবাক হওয়া দিবস। একের পর এক ঝটকা খেয়ে প্রিমা আর অবাক হতে পারছে না। কেবল অস্ফুটস্বরে বলে,
–” আজকে আমার বার্থডে? ”
আরশিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে প্রিমাকে ঘরের ভেতর নিয়ে যেতে যেতে বলে,
–” ইয়েস ওয়াইফি। তবে আপনার জন্য আরেকটা উপহার আছে। ”
আরশিয়ান প্রিমাকে হেডবোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে রেখে নিজেও তার পাশে বসে। প্রিমা কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে বলে,
–” কী উপহার? ”
আরশিয়ান তার চোখের দিকে চেয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,
–” স্টে স্ট্রং। ”
কথাটুকু বলার পর নিজের ব্যক্তিগত মোবাইলটা এগিয়ে দেয় প্রিমার দিকে। পজ হয়ে থাকা ভিডিওটা ওপেন করতেই প্রিমার চোখমুখ কুঁচকে ফেলে প্রিমা। ঘেন্নায় গা গুলিয়ে উঠে তার। আরশিয়ান তার অবস্থা দেখে বলে,
–” একটু কষ্ট করে ভিডিওটা দেখুন প্রেম। আমার বিশ্বাস আপনি রিলিফ পাবেন। ”
আরশিয়ানের কথায় ভিডিওটা ওপেন করে প্রিমা। প্রথমেই দেখা যায় নাহার ওয়াসীত্বের কলুষিত চেহারা ব্যাকগ্রাউন্ডে ভাসছে এক নারী সাংবাদিকের কন্ঠ এবং তিনি বলছেন, রাত দশটা চৌত্রিশ মিনিটে লাইভে এসে নিজের করা সমস্ত অপকর্ম স্বীকার করেছেন নাহার ওয়াসীত্ব। রাজনৈতিক দলে নিযুক্ত হওয়ার পর তার করা সমস্ত অপরাধের প্রমাণসহ স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পুলিশ তার বাড়ি গিয়ে তাকে গ্রেফতার করার আগেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
নাহার ওয়াসীত্বের সাথে সঙ্গে জড়িত ছিলেন তার স্বামী রওশান ওয়াসীত্ব। তদন্ত কর্মীরা প্রাথমিক অবস্থায় তাকে খুঁজে না পেলেও পরবর্তীতে বাড়ির বেজমেন্ট হতে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেন৷ নাহার ওয়াসীত্বের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, যৌবনকালে কেবল দৈহিক চাহিদা মেটাতে এক নারীর সংসার ভেঙে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছিলেন তারা। একপর্যায়ে তারা বিয়েও করেন তবে বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া রওশান ওয়াসীত্ব তার অপ্রকৃতস্থ চাহিদা পালনে ব্যর্থ হলে রাগের বশে প্রাথমিকভাবে নানান ধরণের অত্যাচার এবং পরবর্তীতে গোপনাঙ্গ কেটে হত্যা করা হয় উনাকে।..
পুরো নিউজটা দেখে ভাবলেশহীন ভাবে হাতের ফোনটা আরশিয়ানের দিকে এগিয়ে দেয় প্রিমা। শান কিছুটা অবাক হয়ে শুধায়,
–” আপনি ঠিকাছেন? ”
প্রিমা নির্বিকার স্বরে বলে,
–” একদম ফার্স্ট ক্লাস আছি তবে আফসোস হচ্ছে। এই কীটগুলো পৃথিবীতে বিন্দু পরিমাণ শাস্তি পাক সেটা আমি চাইনি। বড্ড আশা নিয়ে আর্জি পেশ করেছিলাম খোদাতায়ালার দরবারে। বিচারদিনের মালিকের কাছে সমর্পণ করেছিলাম সমস্ত প্রমাণ। পৃথিবী হলো প্রতারণার খেলাঘর। তাইতো সুবিচারের দায়ভারটা সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারকের হাতে ছেড়ে দিয়েছি।”
প্রিমার শক্তপোক্ত কথায় আরশিয়ানের বুক কেঁপে উঠে। একটা মেয়ে ঠিক কতটা যন্ত্রণা সহ্য করলে এরকম কঠিন হৃদয়ের অধিকারিণী হয়ে যায় সেটা জানা নেই আরশিয়ানের তবে প্রিমার তীব্র ঘৃণা তার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। খানিকক্ষণ সময় পার হতেই আরশিয়ান গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করে,
–” আমি আপনাকে অবিশ্বাস করেছিলাম। এই বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই আপনার? ”
প্রিমা তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
–” যেখানে আমার জন্মদায়িনী মা আমায় বিশ্বাস করেনি সেখানে আপনি তো পরের সন্তান। নিজের মা যেখানে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল সেখানে আপনার ক্ষণস্থায়ী রাগের উপর অভিযোগ করলে সেটা অন্যায় হয়ে যেতো। ভুল বোঝার যথেষ্ট কারণ ছিলো বিধায় ভুল বুঝেছেন তবে সত্যটা খুঁজে আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করায় অভিমানটা নিমিষেই হারিয়ে গিয়েছিল। ”
আরশিয়ান অবাক চোখে তাকায় প্রিমার পানে অতঃপর বলে,
–” আপনাকে সুযোগসন্ধানী বলার অপরাধটা ক্ষমার অযোগ্য তবে এই বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাইছি। ”
প্রিমা লম্বা একটা শ্বাস টেনে বলে,
–” শব্দটা দগদগে ঘা সৃষ্টি করেছিল অন্তঃকরণে। ব্যথার রেশ বিদ্যমান না থাকলেও ক্ষত শুকোয়নি পুরোপুরি। শুকালেও হয়তো দাগ থেকে যাবে আমৃত্যু। তবে এটা একান্তই আমার অভ্যন্তরীণ ক্ষত। ইহার রেশ কখনো আমাদের সম্পর্ক কিংবা সংসারে পড়বে না। ”
আরশিয়ান বুদ্ধিমান পুরুষ। প্রিমার কথার আড়ালে লুকানো বার্তাটুকু ধরতে তার বেগ পেতে হয়নি। স্পষ্ট ভাবে মেয়েটি বুঝিয়ে দিয়েছে ক্ষমা করলেও ক্ষত ভুলে যাওয়া প্রিমার পক্ষে অসম্ভব। আরশিয়ান কথা না বাড়িয়ে বলল,
–” আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। চেঞ্জ করে শুয়ে পড়া উচিত আমাদের। ”
প্রিমা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে অতঃপর বলল,
–” কিছু ব্যাক্তিগত প্রশ্ন ছিলো। উত্তর দিবেন? ”
আরশিয়ান এক পলক প্রিমার নিরেট মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বলে,
–” নির্দ্বিধায় বলুন। ”
প্রিমা সাহস পেয়ে সহজ গলায় প্রশ্ন করলো,
–” আপনি কী কোনোভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ড কিংবা প্রশাসনের কোনো সেক্টরের সাথে জড়িত? ”
আরশিয়ান কিঞ্চিৎ অবাক হয় প্রিমার প্রশ্নে। দ্বিধা ভেঙে ধীর কন্ঠে বলে,
–” আমি কোনো সেক্টরের সাথে সরাসরি জড়িত নই তবে এসব সেক্টরের সাথে যারা জড়িত তাদের সঙ্গে খুব ভালো একটা সমীকরণ আছে। যেকোনো আপদ বিপদ তারাই সমাধান করে দেয় বিনিময়ে তাদের পেমেন্ট দেওয়া হয়। ”
প্রিমা পুনরায় স্বাভাবিক গলায় শুধায়,
–” আমি যদি খুব ভুল না হই তবে সেই বিখ্যাত ব্যক্তি গুলো হলো তাজ এবং রাজ ভাই। অ্যাম আই রাইট? ”
আরশিয়ান স্মিত হেসে বলল,
–” ইয়েস ওয়াইফি৷ তাজ একজন হ্যাকার এবং সাইবারনেটিক্স কোম্পানির মালিক হওয়ায় বিভিন্ন পেশার লেকের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে। রাজের ভালো সম্পর্ক রয়েছে প্রশাসনের সাথে। ভাগ্যক্রমে তারা দু’জনেই আমার নেওটা। ব্যাস রাব নে বানা দি জোড়ি। ”
প্রিমা ভীষণ শান্ত স্বরে বলল,
–” নাহার ওয়াসীত্বের এসব স্বীকারোক্তির পেছনে আপনাদের ভূমিকা অপরিসীম তাইনা?
আরশিয়ান ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। প্রিমা পরক্ষণে বলে উঠে,
–” ক্ষমতার অপব্যবহার করা কী উচিত? ”
আরশিয়ান মৃদুস্বরে বলল,
–” বর্তমানে আমি যে অবস্থানে আছি সেটার দিকে হাজারো শকুনের দৃষ্টি রয়েছে। আমি শুদ্ধ পুরুষ বিধায় হাত নোংরা করিনা কিন্তু ওদের বাঁচিয়ে রাখলে মরণ ছোবলের হাত থেকে রক্ষে পাওয়া অসম্ভব। এমতবস্থায় নিজেকে বাঁচাতে বিপদকে নিশ্চিহ্ন করাটা অন্যায়? ক্ষমতার সুব্যবহার যদি অন্যায়কারীকে প্রটেকশন দিতে করা হয় তবে কারোর অপকর্মের শাস্তি দিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করা অনুচিত বলে মনে হয় না আমার। ”
প্রিমা নিশ্চুপ হয়ে যায়। কথাটা আসলেই সত্য। ঝিম মেরে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আচমকা বিদ্যুৎ আসে। প্রিমা তৎক্ষনাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
–” একটু বেলকনিতে যান আপনি। আমি ড্রেস চেঞ্জ করে নিই। ”
[ এই যে স্যার/ম্যাডাম! জ্বী আপনাকেই বলছি। পড়া শেষে টুকুস করে চলে না গিয়ে এক কিংবা দুই শব্দের হলেও মন্তব্য করবেন। আপনাদের মন্তব্য আমাকে লেখার অনুপ্রেরণা দেয়। ধন্যবাদ ]
আরশিয়ান একপলক মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকে অবলোকন করে ধীর পায়ে বেলকনিতে গেলো। শরীরের গয়না গুলো খুলে রেখে শাড়ি খুলতে গিয়ে প্রিমা পড়ে বিপাকে । কুঁচি গুলো সেট করার জন্য বেশ কয়েকটা পিন এটাচড্ করেছিল কিন্তু পিন গুলো এখন খোলা যাচ্ছে না। নাজেহাল অবস্থায় পড়ে যায় বেচারি। আরও দশমিনিট ট্রাই করার পরও খুলতে না পেরে মাথা ঘুরিয়ে উঠে তার। দেওয়ালে হাত ঠেকিয়ে ব্যালেন্স রেখে দুর্বল কন্ঠে বলে,
–” শুনছেন? একটু রুমে আসবেন? ”
প্রিমার শাড়ির হাল একেবারেই বেহাল। আঁচল গড়াগড়ি খাচ্ছে ফ্লোরে। শরীরে কেবল আনুষাঙ্গিক বস্ত্র রয়েছে। আঁচলটা কাঁধে তুলতে গিয়েও ব্যর্থ হয় প্রিমা। চারপাশ অন্ধকার ঠেকছে তার নিকট। শান ভদ্র পুরুষ হলেও অতিমাত্রায় প্রটেকটিভ। সে বেলকনিতে থাকলেও চেয়ারে বসে এক ধ্যানে আয়নায় ফুটে ওঠা প্রিমার প্রতিবিম্বের দিকে চেয়েছিল। ক্লান্ত হয়ে মেয়েটা যখন দেওয়াল ঠেস দিয়ে দাঁড়ায় সঙ্গে সঙ্গে লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘরে উপস্থিত হয় আরশিয়ান। প্রিমার পালকের ন্যায় হালকা শরীরটা নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,
–” শরীর খারাপ লাগছে? ”
আরশিয়ানের শরীরের ম্যানলি পারফিউম প্রিমাকে আবেশিত করে তোলে। আলতো করে আরশিয়ান কে জড়িয়ে ধরে তার উন্মুক্ত বক্ষে মুখ গুঁজে লম্বা একটা শ্বাস টেনে মিনমিনে স্বরে বলে,
–” নাহ্। হুট করে একটু মাথা ঘুরিয়ে উঠেছিল জাস্ট। ”
প্রিমার কান্ডে আরশিয়ানের সমগ্র সত্তা কেঁপে উঠে। একেই রুপের মোহে ঘায়েল করেছে এখন ছলনায় আঙ্গার করছে তার পৌরুষ চিত্তকে। নারী জাত আসলেই ছলনাময়ী। ধরা তো দেয় না উল্টো তীব্র বেগে কেবল নিজের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য করে।
আরশিয়ান চোখ বুঁজে লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলায়। কন্ঠে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বলে,
–” কী হেল্প লাগবে আপনার? ”
প্রিমা লজ্জায় আরশিয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,
–” শাড়ির সাথে এটাচড্ পিনগুলো খুলতে পারছিনা। ”
আরশিয়ান কয়েকটা ফাঁকা ঢোক গিলে তাকে দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে বলে,
–” আমি দেখছি। ”
প্রিমা লজ্জায় অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে রাখে। চেয়ে থাকলে হয়তো দেখতে পেতো তার সভ্য বরের করুণ দশা। মিনিট বিশেক ধরে চেষ্টা করার পর পরিশেষে সমস্ত পিন গুলো সরাতে সক্ষম হয় আরশিয়ান। উঠে দাঁড়িয়ে প্রিমার বন্ধ চোখজোড়ার দিকে দৃষ্টিপাত করে বলে,
–” হয়ে গেছে। ”
প্রিমা চোখ মেলে তাকাতেই দেখে তার পরিধেয় শাড়িটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরশিয়ান। মুহূর্তের মধ্যে দ্বিগুণ লজ্জা এসে ভীড় করে তার মুখশ্রীতে। দৃষ্টি লুকিয়ে কোনোমতে বলে,
–” আমি চেঞ্জ করে আস….
আরশিয়ান রুদ্ধশ্বাসে বলে,
–” ইয়্যু কান্ট। ইয়্যু নিড মাই হেল্প…এক্ একচুয়েলি আই নিড ইয়্যু। ”
আরশিয়ানের এলোমেলো কথায় চমকে তাকায় প্রিমা। তার মুখপানে দৃষ্টি পড়তেই দেখে বেচারা ঘোর আছন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অস্বাভাবিক। শানের চোখের ভাষা বুঝতে পেরে কেঁপে উঠে প্রিমা। গলার স্বর আঁটকে আসে। কিছু বলার পূর্বে আরশিয়ান ব্যকুল কন্ঠে বলে,
–” নিষেধাজ্ঞা মানার মতো অবস্থায় আপনি আমায় রাখেননি। আপনার সান্নিধ্য আমার চাই প্রেম। যদি অসম্মতি থাকে তাহলে আমি থেমে যাবো। আপনার মনের বিরুদ্ধে কিছুই হবে না। ”
প্রিমা বাঁধা দিতে পারলোনা তার একান্ত ব্যক্তিগত মানুষের আবদারে। তার বক্ষে মুখ লুকিয়ে নিরবে সম্মতি জানালো। অপরপক্ষ নিরপেক্ষ থাকলো না। নিজের অধিকার বুঝে নিলো অতি সন্তপর্ণে। ছোট্ট শরীরটার আনাচেকানাচে দখলদারিত্বের প্রতিচ্ছবি এঁকে দিলো। মানুষটা অধৈর্য হলেও তার স্পর্শে ছিলো কোমলতা। প্রিমার একমুহূর্তের জন্য মনে হয়নি আরশিয়ান কেবল মনের বাসনা পূরণ করতে তার সান্নিধ্যেে এসেছে। উল্টো রাতের গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে খুব ভালোমতো উপলব্ধি করেছে তার একান্ত মানুষটার সীমাহীন ভালোবাসা।
রজনীর অন্তিম প্রহর। অকারণে ঘুমটা ভেঙে গেলো ফারজানার। চোখ মেলে নিজের ডান পাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই দেখলো জায়গাটা সম্পূর্ণ খালি। ইশতিরাজ এইসময়ে কোথায় গেলো ভাবতেই মস্তিষ্কে অযাচিত চিন্তা ভর করলো তার। তড়িঘড়ি করে উঠে ওয়াশরুম চেক করলো। ওটা ফাঁকা দেখে ফারজানার বুকটা কেঁপে উঠলো। রাজের নম্বরে কল করতেই দেখলো বিছানার একপাশে অবহেলায় পড়ে আছে তার ফোনটা।
ফারজানা হতভম্ব হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। কটেজে আসার পর সারাটাদিন ঘরেই কাটিয়েছে সে। রাজ কী রাগ করেছে এটা নিয়ে নাকি তাদের অভ্যন্তরীণ দূরত্ব এই অবজ্ঞার কারণ? ফারজানার ভীষণ অস্থির লাগতে শুরু করে। খোলা হাওয়ার সংস্পর্শ পেতে তড়িঘড়ি করে বারান্দায় আসতেই দেখতে পায় রাজ সোফায় ঘুমিয়ে আছে। মনটা নিমিষেই খারাপ হয়ে যায় তার । বিপরীত পাশের সোফায় বসে চিন্তা করতে থাকে নিজের ভুলগুলো নিয়ে। বিয়ের দু’দিন পরেই তাদের মধ্যে এত দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণ অজানা তার। লোকে ঠিকই বলে.. সে একটা অপয়া।
নিজ ভাবনায় বুঁদ হয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ফারজানা।দুনিয়াদারী অসহ্য লাগছে তার। ঘুমের ঘোরে কারও কান্নার শব্দ শুনে পিটপিটিয়ে তাকায় রাজ। বরাবরই তার ঘুমটা ভীষণ পাতলা। একটু শব্দেই ভেঙে যায়। চোখ কচলে উঠে বসতেই দেখলো তার নববধূ অঝোর নয়নে কাঁদছে। হতভম্ব হয়ে এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে তার সামনে গিয়ে বলে,
–” কী হয়েছে সুরঞ্জনা? কাঁদছেন কেনো আপনি? ”
ফারজানা নিজেকে সামলাতে পারলোনা। মাথা চেপে ধরে ক্রন্দনরত সুরে এলোমেলো ভাবে বলে ফেললো মনের অযাচিত সকল ভাবনা। ইশতিরাজ স্থিরভাবে শুনলো সবটা অতঃপর আকস্মিক ঘটিয়ে ফেললো এক কান্ড।
রাজের বলিষ্ঠ হাতের আকস্মিক টানে ফারজানা ছিটকে পড়ে রাজের সুঠাম বুকে। পেশিবহুল হাতের সামান্য শক্তি ক্ষয় করে এক ঝটকায় ফারজানাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে এক হাত তার কোমরে রাখে এবং অন্য হাত রাখে তার গালে। কিছুটা সময় ওভবেই পার হয়। ফারজানার কান্না কমে আসে খানিকক্ষণ পর। মেয়েটা শান্ত হয়ে আসলে নিজেদের মধ্যবর্তী দূরত্ব কমিয়ে খানিকটা সন্নিকটে এগিয়ে জানার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখজোড়া বন্ধ করে রাজ। অবস্থানের দূরত্ব শূন্য হওয়ায় দু’জনের নিশ্বাস খুব সন্তপর্ণে ছুঁয়ে যায় একে ওপরকে। কিছু সময় পার হতেই প্রগাঢ় কন্ঠে ধীর গলায় ইশতিরাজ ব’লে,
— ” নিকৃষ্ট পরিস্থিতির সাথে লড়াই করতে করতে আপনার অতিশয় কোমল এবং পবিত্র হৃদয়টা ক্ষতবিক্ষত হ’য়ে গেছে জানা। একজন হৃদগত ডক্টর হিসেবে বলছি রোগ প্রশমনের জন্য আপনাকে এক মহামূল্যবান ঔষধি নিয়মমাফিক সেবন করতে হবে। ঔষধি টা’র নাম জানেন?
রাজের আচম্বিত কান্ডে জ্ঞানলব্ধ ফারজানা হতভম্ব মুখে অস্পষ্ট স্বরে বলে,
–” উঁহু!
রাজের আধ্যত্মিক কথায় যতোটা হতভম্ব হয়েছে ফারজানা তার থেকে-ও শতগুণ বেশি অবাক হয়েছে তার সম্মুখে উপস্থিত বেহায়া পুরুষের ধৈর্যশীলতা দেখে। তার কারণ গুলো স্বাভাবিক।বউয়ের অস্পষ্ট জবাব এবং বেখেয়ালিতে স্মিত হেসে হাস্কি স্বরে ফিসফিসিয়ে রাজ ব’লে,
— ” হৃদগত রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি হিসেবে ইশতিরাজ চৌধুরীর প্রণয়পূর্ণ এবং তীব্র প্রেমমাখা ভালোবাসার অধিক প্রয়োজন আপনার । অত্যাধিক জরুরী এই ঔষধির সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ না করা অব্দি আপনার প্রাণঘাতী অসুখ কখনোই নিরাময় হবে না উপরন্তু দিনকে দিন বাড়তে থাকবে।”
রাজের বেলেহাজ কথায় ছটফটিয়ে উঠা ফারজানাকে আরও নিবিড় বন্ধনে বন্দিনী করে আগের স্বর বজায় রেখে প্রগাঢ় কন্ঠে ধীর গলায় রাজ ব’লে,
— ” সময় যতো বাড়বে ডোজের পরিমাণ ও সুদসমেত ততটাই চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে। সময়মতো সঠিক সিধান্ত নিলে হয়তো-বা এ-ই মারাত্মক ডোজের ভয়াবহ টর্চার থেকে মুক্তি মিলবে। তা-নাহলে একজন দায়িত্ববান ডক্টর হিসেবে রুগীর সুস্থতার দিকে লক্ষ্য রেখে আমাকে কিছুটা অমানবিক হতে হবে। ”
লজ্জায় মিইয়ে যাওয়া ফারজানা শরীরের সমস্ত জোর খাটিয়ে রাজকে সরিয়ে উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে হড়বড়িয়ে ব’লে উঠে,
— ” চুপ করুন বেহায়া পুরুষ। সমস্ত লাজলজ্জা হসপিটালের ফার্মেসি তে বিক্রি করে এসেছেন নাকি? স্ব-উদ্ভাবিত ডাক্তারি ভাষায় নিজের বেহয়া আবদারের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে এতটুকুও শরম করলো না?”
“বেহায়া পুরুষ ” কথাটা দু-এক বার আনমনে আওড়াল রাজ। দু-পা এগিয়ে পেছন থেকে জানার কাঁধে আলতোভাবে মুখ গুঁজে পেশীবহুল হাতে ফারজানার কোমল হাতদুটো বজ্রমুষ্ঠিতে বন্দি করে দুষ্টুমি ভরা কন্ঠে রাজ বলে,
—” ডাক্তার’রা সভ্য হলে তাদের ব্যক্তিগত রোগীদে’র অসভ্য রোগে’র উপযুক্ত চিকিৎসা কে করবে ম্যাডাম? তবে আপনার দুশ্চিন্তা করতে হবে না। আপনার রোগের ঔষধি সম্পূর্ণ নিরাপদ। সেই স্পেশাল ঔষধি কেবলমাত্র আপনার রোগ নিরাময়ের গুরুতর কাজটা নিরবে পালন করবে। বিশেষ ঔষধি হওয়ায় সেটা সম্পূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন। ”
লজ্জারুণ ফারজানা রাজকে দমাতে ফট করে ব’লে উঠে,
শিরোনামহীন অনুভূতি পর্ব ৩০
— ” সবকিছুর সুফল এবং কুফল উভয় থাকে! ”
জানার প্রতিবাদী স্টেটমেন্টের বিরুদ্ধে বাঁকা হেসে রাজ ব’লে,
— ” আপনার বুদ্ধিমত্তায় আমি ইম্প্রেস্’ড। বহুল প্রচলিত সেই ঔষধির একটা বিশেষ কুফল আছে। সেটা হলো.. ইহার কোর্স লাইফটাইম বিনা ব্রেকে কন্টিনিউ করতে হবে নাহলে রোগী পুনরায় তার আগের অবস্থানে ফিরে যাবে ”
