হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৯
সাঞ্জেনা শাজ
মেহরাদের গাড়ি চলছে রাস্তা দিয়ে সমান তালে। জ্যাম কিছুটা কম’ই। আর বেশি দূরও না কলেজ। তাই তেমন জ্যামে পড়া লাগেনা বলা যায়।
একমনে সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে মেহরাদ। আর এদিকে এক মনে মেহরাদের দিকে তাকিয়ে আছে শুভ্রতা। প্রায় মিনিট পনেরো হবে সে একি রকম ভাবে তাকিয়ে আছে মেহরাদের দিকে। কিন্তু লোকটা যেন তাকে দেখেও দেখছে না। যেন সে অদৃশ্য!
“মেহরাদ ভাই….” আলতো স্বরে ডাকলো শুভ্রতা। তবে মেহরাদের কোন ভাবান্তর নেই। সে সামনে দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে। স্টেয়ারিং ঘুরাচ্ছে দক্ষ হাতে।
শুভ্রতা আবার ডাকলো। এবারও একি অবস্থা। কোন রেসপন্স নেই মেহরাদের। এবার শুভ্রতা আনেকটা আকুতিভরা টলটলে চোখেই তাকিয়ে ডাকলো,
“এমন করছেন কেন? কথা বলেন! ভুলটা কি করেছি বলবেন তো?”
আচমকা গাড়ির ব্রেক কষলো মেহরাদ। শক্ত চোয়ালে তাকালো শুভ্রতার দিকে। ঢোক গিললো শুভ্রতা। তবে টলটলে ভাসা ভাসা চোখ দুটো নিয়ে এখনো তাকিয়ে রইলো।
“তুই জানিস না, ভুলটা কি করেছিস তুই?”
এদিক সেদিক মাথা নাড়াল শুভ্রতা। সে জানে না। আসলেই বুঝতে পারছে না। কি নিয়ে রাগ মেহরাদ ভাই?
রাগে হিসহিসিয়ে উঠলো মেহরাদ। মেয়েটা নাকি জানেনা? এতবড় কান্ড ঘটিয়েছে, এখন বলছে জানে না? জানবে কি করে? তাকে পুড়িয়েই তো শান্তি পায়!
“তোর জানতে হবে না। জেনে কি করবি!”
“এমন করছেন কেন? নিজের মা’য়ের বিরুদ্ধে গিয়ে আপনার কাছে ছুটেছি। তারপরও রাগ করে আছেন!” টলমলে চোখে চেয়ে শুভ্রতা বলে উঠলো।
মেহরাদ চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে নিলো। শুভ্রতা আবারও বলে উঠলো,
“গত দুই দিন যাবৎ এরকম করছেন। কথা বলছেন না। জানেন, আমার কেমন লাগছে? বলবেন তো কি করেছি…..” আর বলতে পাড়লো না শুভ্রতা।
শুভ্রতার দু গাল চেপে ধরেছে মেহরাদ। মুখটা একবারে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে শুভ্রতার মুখের কাছাকাছি। ঠোঁট দুটো ছুই ছুই। হিসহিসিয়ে উঠলো মেহরাদ,
“জানিস না কি করেছিস? কেমন লাগছে তোর? আমার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে? বুঝিস তুই আমার ঠিক কতটা কষ্ট হয়েছিলো সেদিন?”
শুভ্রতার চোখ গড়িয়ে জল পড়লো। ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলতে অক্ষম সে। মেহরাদিই আবার বললো,
“সেদিন ঔষধ গুলো খাওয়ার আগে ভেবেছিলি আমার কেমন লাগবে? ভেবেছিলি? কেন করেছিলি এটা? তুই বল,আমি কি করেছিলাম তোর সাথে যার কারণে তুই এরকমটা করলি?”
শুভ্রতার মনে কষ্টের পাহাড় জমলো। ফুপিয়ে উঠলো সে। গালে চেপে রাখা হাতটা ছুটাতে চাইলো, কিন্তু মেহরাদ দিলো না ; বরং আরও হিসহিসিয়ে উঠলো,
“আমার জবাব চাই শুভ্রতা, আন্সার মি! ”
“ব্যাথা পাচ্ছি।” অস্ফুট স্বরে বললো শুভ্রতা।
সাথে সাথেই হাতের চাপ সহজ হলো মেহরাদের। কিন্তু রাগে হিসহিসানো বন্ধ হলো না। মেয়েটা জানে,এই এক ঘটনা , ওর পেয়ারি মা সকলের সামনে উন্মোচন করার পর ঠিক কি কি অভিযোগ আসছে তার উপর! তার ছোট চাচ্চু ওরফে শশুড় মশাই কি বলেছে তাকে?
উফফফ্! মেহরাদের এগুলো ভাবলেই রাগ সপ্তমে পৌছে যাচ্ছে। সে শুভ্রতাকে মুক্তি দিয়ে আবারও ছিটে অধৈর্য ভঙ্গিতে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো।
এদিকে মুক্তি পেয়ে শুভ্রতা চোখের জল ফেলে নিজের হয়ে বলতে লাগলো,
“আমি সেদিন ইচ্ছে করে কিচ্ছু করেনি। আমার মাথা কাজ করছিলো না। নিজেকে পাগল পাগল লাগছিলো। আমি জানতাম না এগুলো খেলে এরকম হবে। সেদিন…সেদিন আপনি….আপনি আমায় বেঈমান বলেছি…… ”
শুভ্রতার চলন্ত ওষ্ঠ জোড়া আকরে ধরলো মেহরাদ। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখেছে। ঠোঁটের স্পর্শতে রুক্ষতা। মানুষটা খুব রেগে আছে। কিন্তু তার দোষ কোথায়?
ফুপিয়ে উঠলো শুভ্রতা। চোখের কোল ঘেষে নোনা জল পড়লো। মেহরাদ হাত বাড়িয়ে শুভ্রতাকে আরেকটু চেপে নিয়ে আসলো নিজের সাথে। মিশিয়ে নিতে চাইলো ওকে ওর সাথে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ওষ্ঠ জোড়া মুখ করে বিড়বিড় করে বললো,
“স্যরিহ। খুব করে স্যারিহ হেহ! আমার জানটা লক্ষি। খুউব লক্ষি। আ’ম স্যারিহ জান।”
এই বাক্য দুটো নিজের ভিতর থেকে গুছিয়ে বলার জন্য মেহরাদের ভিতরে কি যে ভারী এক পাহাড় জমে ছিলো! অবশেষে প্রেয়সীর কোমলতায় তা উগ্রে দিতে সক্ষম হলো। তার ভিতরে ভয়েরা জেকে বসেছিলো, সকলের মতো শুভ্রাও যদি তাকে দোষারোপ করে! দূরে সড়ে যায়!
শুভ্রতার মনের ভিতর প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেলো। চোখে জল নিয়েও চেহারায় প্রফুল্লতার আভাস। সে চোখ জোড়া বন্ধ করে রেখে মেহরাদের নিশ্বাসের গতি অনুভব করতে রইলো।
মেহরাদ আবারও বললো,
“নিজেকে দোষী হিসেবে মানতে পাড়ছিনা। তোকে আবারও আগলে নিতে পাড়ছিনা। আমার ভিতরের দহন কাউকে দেখাতে পাড়ছি না। তুই এই কাজটা না করলে এতো সব ঝামেলা নতুন করে সৃষ্টি হতো না শুভ্রা। আমি জানি তোর কোন দোষ নেই। থাকতেই পাড়ে না। আমার জান, এ পৃথিবীর সেরা আদর্শ বউ। ”
চোখ জোড়া বন্ধ রাখা অবস্থায়ও শুভ্রতার ভ্রুদ্বয়ে ভাজ পড়লো। মনে মনে ভাবলো, তাকে টন্ট করছে? সে চোখ জোড়া ছোট ছোট করে মেহরাদের দিকে তাকালো। ফর্সা মুখশ্রী রক্ত লাল হয়ে আছে। চিকন সরু নাকটা বেশ আদূরে লাগছে।
মেহরাদ কিছুটা দূরে সড়ে প্রগাঢ় চোখে তাকিয়ে রইলো শুভ্রতার দিকে। মেয়েটা তাদের পরিবারের সকলের চেয়ে বেশি সৌন্দর্য নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে। আর একটু কান্না করে কি না করে! এর সৌন্দর্য চুয়িয়ে চুয়িয়ে পড়ে।
মেহরাদ কি বুঝেনা? সব বুঝে! এগুলো সব তাকে পাগল করার ধান্দা। এই মেয়ে তাকে পাগল টাগল করে দিয়েছে সেই কবেই। এখন শুধু মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বাকি। তা না হলে কেউ তার শশুড় অর্থাৎ, ছোট চাচার সাথে এভাবে কথা বলে?
শুভ্রতার দিকে তাকিয়েই মেহরাদের মনে পড়ে গেল দুই দিন আগের কথা। সেদিন রাতে তার চাচ্চু শায়ন তালুকদার কল করেছিলো তার মোবাইলে। কল দেখে সে অবশ্য আশ্চর্য হয় নি। না হওয়ারই কথা! বউ চলে গিয়েছে বাড়ি ছেড়ে। আর স্বামী কল দিয়ে শাসাবে না? এটা না হলে হয়!
সে স্বাভাবিক ভাবেই কল ধরে সালাম দিলো। দিয়ে অপর পাশের উত্তরের অপেক্ষায় রইলো। তার অপেক্ষা বেশি হলো না। ভদ্রলোক ব্যাস্ত মানুষ। চাইলেই ছুটে আসা যায় না। ছুটি নিতে হয়। তাই এমন বিপদেও ছুটে আসতে পাড়েনি। তবে সব কিছু জানার পর ভাতিজার উপর কিছুটা ক্ষীপ্তও হয়েছেন তিনি। তাকে কি একটু আলাদা করে জানানো যেতো না? সে না হয় একটু সামলানোর চেষ্টা করতো?
শায়ন তালুকদার সালামের জবাব নিয়ে গম্ভীর স্বরেই শুধালেন,
“তা ভাতিজা, সালাম কি চাচ্চু হিসেবে দিলে না শশুর হিসেবে? কোনটা ধরবো?”
মেহরাদ ফুস করে শ্বাস ছাড়লো। মাথার চুল ভিজা। উন্মুক্ত বডি। টাওয়াল দ্বারা মাথা মুছতে মুছতে বিছানায় বসে প্রতিউত্তর করলো,
“তুমি যেটাতে খুশি হও সেটাই ধরে নাও। সম্পর্ক তো দুটোই আছে। ”
“মা’র খাবে বেয়াদব ছেলে। সম্পর্ক দুটো মানে কি? ওটা কোন সম্পর্ক হলো? আমরা ছিলাম না? এরকম টা কেন করলে?”
“হ্যাঁ, ছিলে তো। এই যে সব ক’টা ভিলেন হয়ে দাঁড়িয়েছো! আরেক জন তো বাপের বাড়িই পারি দিয়েছে। ”
“তোমার চাচী হয়!”
“হোক!”
“তোমার রুম থেকেই যাওয়ার পরিই আমার মেয়েটা এরকম করেছে তাই না? কি করেছো তুমি?” এযাত্রায় গম্ভীর শুনালো তার কন্ঠ৷
তবে মেহরাদের ভাবান্তর দেখা গেলো না। সে নির্লজ্জের চূরান্তে গিয়ে বললো,
“এতেও তোমাদেরই দোষ। আমি কিছুই করিনি। যদি আদর করে কিছু করে কাছে রেখে দিতাম তাহলে আর কিছুই হতো না। তোমাদের জন্যই তো পারলাম না। ”
অপরপাশে শায়ন তালুকদার থতমত খেয়ে গেলেন। ছেলেটা তো বেশ নির্লজ্জ হয়েছে। তিনি তা-ও নিজের গম্ভীর্যতা বজায় রেখে বললেন,
“চুপ করো পাজি ছেলে। আমি আসার আগ পর্যন্ত আমার মেয়ের ধারে কাছেও ঘেঁষবে না বলে দিলাম। আমি এসে এসব বিষয় গুলো দেখছি। ওর থেকে দূরে থাকবে তুমি।”
মেহরাদ হ্যাঁ না কিছুই বলেনি তখন। তার চাচ্চু নিজেই কল কেটে দিয়েছে নিজের বক্তব্য রেখে। কিন্তু মেহরাদ তখন কিছু না বললেও মনের মধ্যে এক অজানা অপরাধ বোধ জেগে উঠেছে তখন থেকে। আসলেই কি তার জন্য শুভ্রা এমন করেছে? কিন্তু সে তো তেমন কিছুই বলেনি! বরং এ পর্যন্ত সে যতটা কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোলে রেখেছে সব কিছু থেকে এরকম অন্য কেউ করে দেখাক!
প্রতিটি পদক্ষেপে শুভ্রার সকল ভুল ঝুক, বোকামি, অন্যায়, অপারধ সব মেনে নিয়েছে নির্দিধায়। আরও নিবে! কারণ এগুলো নিয়েই সে তার শুভ্রা কে ভালোবাসে। তার ছোট্ট শুভ্রাকে এগুলোতেই মানায়।
সেদিনের পর থেকেই মেহরাদের ভিতরে এক চাপা রাগ অভিমান জেকে বসেছে। আর দায় কার উপর দিবে সে নিজেও জানে না! নিজের দোষ সেটাও মেনে নিতে পারছে না। শুভ্রতাকেও কিছু বলতে পারছে না। মূলত, ভিতরের অস্থিরতা, অনুভূতিটা কিছুতেই প্রকাশ করতে পারছে না সে। এ নিয়ে দু দিন এগুলো নিয়ে সে নিজেই নিজের সাথে যুদ্ধ করছে। দুরত্ব তৈরি করেছে প্রিয়তমার কাছে। কিন্তু মেয়েটার চোখের জল সব ধূলিসাৎ করে দিতে সক্ষম। এই যে এখন দিলো!
শুভ্রতা নিজের হাতটা এগিয়ে নিয়ে মেহরাদের ভল পূর্ণ হাতটার উপরে রাখলো। রেখে মিনমিনিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কেউ কি আপনায় কিছু বলেছে? আমার জন্য আপনার অনেক কথা শুনতে হয়েছে তাই না?”
মেহরাদ নিজেত হাতের উপর থাকা ছোট্ট হাতখানা দেখলো। মেয়েটা এত্তো বোকা! শুভ্রতার চোখে চোখ রেখলো মেহরাদ। মেয়েটা এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে! সবসময় বুক পিঞ্জিরায় লুকিয়ে রাখা যেতো!
মেহরাদ শুভ্রতার ঘাড় গলিয়ে নিজের বলিষ্ঠ একটা হাত ঘার কাধ সহ আকরে ধরে বললো,
“উঁহু, কেউ কিচ্ছু বলেনি। কিচ্ছু শুনতে হয়নি আমায়। তুই শুধু আজকের পর থেকে এরকম ভুল ভুলেও করার কথা মাথায় আনবি না। ব্যাস, এতেই চলবে। হু?” মৃদু মাথা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো।
শুভ্রতাও মেহরাদের মতো ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মাথা নাড়াল। তারপর ঘাড়ে রাখা হাতটা ছুয়ে বললো,
“আপনি আর রাগ করে নেই তো?”
“উঁহু। ”
“তাহলে এবার যাই? ক্লাস শুরু হয়ে যাবে তো!”
“যাহ…” ঘার থেকে হাত নামিয়ে শুভ্রতার দিকে তাকিয়ে বললো মেহরাদ।
শুভ্রতা মেহরাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে পিছু ঘুরে গাড়ির দরজা খুলার চেষ্টা করে দেখলো তা খুলছে না। তারপর মেহরাদের দিকে তাকালে মেহরাদ শুভ্রতার উপর দিয়ে গিয়ে লক খুলার বাহানায় আবারও ঠোঁট দুটো দাবিয়ে দিলো নরম কোমল রাঙা উষ্ণ কোপলে।
হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৮
শুভ্রতা চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো। বড় বড় নিঃশ্বাস টেনে নিজেকে সামলে নিলো। একটু পর যখন বুঝলো মেহরাদ ভাই সড়ে গিয়েছে সে আদুরে স্পর্শের সেই গালে এক হাত চেপে গাড়ি থেকে হুরমুড়িয়ে বেরিয়ে গেল। এদিক সেদিক না তাকিয়ে সোজা কলেজের ভিতর চলে গেল।
ভবনের ভিতরে যেতে যতক্ষন সময় লাগলো শুভ্রার ঠিক ততক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলো মেহরাদ। শুভ্রতাকে ভিতরে ঢুকে যেতে দেখে তারপর সে-ও গাড়ি স্টার্ট দিল।
