হৃৎস্পন্দন পর্ব ২১
সাঞ্জেনা শাজ
ধপ ধপ পা ফেলে সিড়ি ভেঙে উপরে উঠছে শুভ্রতা। হাতে মিষ্টির প্রিচ। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ তাদের সকলের। যার জন্য এগুলো নিয়ে যাচ্ছে তারও শেষ, সকলে মিষ্টি মুখ করেছে শুধু এ ভদ্রলোক করেনি। এর আগেই উপরে চলে গিয়েছে, তাই-ই তাকে দিয়ে পাঠাচ্ছে মেঝো মা। তার মেঝো মা আর বড় মা কে দেখলে তার মা’য়ের জন্য মনটা চিনচিন করে ব্যাথা করে উঠে তার।
সে মনে মনে একটা কথা ঠিক করেছে, কাউকে বলেনি এখনো। বলবে, তার বাবা আসুক তারপর। সবার প্রথম মেহরাদ ভাই থেকে অনুমতি নিতে হবে। এখন আপাতত তা নিজের মধ্যেই রাখুক,আগে বাবা আসুক।
শুভ্রতা সিড়ি থেকেই আবার পিছু ফিরে তাকালো, মুখটা কাদু কাদু তার। সুরাইয়া বেগম চোখ পাকালেন মিছিমিছি। এরা নাকি ভালোবেসে বিয়ে করেছে? মেয়েটা এখনো ভয় পায় মেহরাদ কে, ভালোবাসা কই এদের? তাকালেই দেখি একজন চোখ রাঙাচ্ছে আরেক জন পালাই পালাই করছে!
রাত বাজে দশটার উপরে, সকল খাবার দাবার গোছগাছ করে রেখে দিচ্ছে তারা। মেহরাদটা মিষ্টি খেলো না তখন তাই পাঠাবে ঠিক করেছে। তার এক মেয়ে সোহানা, এই রাতে ইহ জিন্দেগীতে বলেও কুটিটা নাড়ানো যাবে না। এই যে সোফায়ই বসে, আছে কোন খবর! শান্তাটা রুমে চলে গিয়েছে। সে আর ভাবি ব্যাস্ত। উপায় না পেয়ে মেয়েটাকে বলেছে –তুই যা, দিয়ে আয় এগুলো। যাবি আর আসবি শুধু। এই মেয়ে গো ধরেছে, যাবেনা। আরেহ বাবা, স্বামী হয় তোর। যাবি না কেন? তোর তো আরও ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে যাওয়া উচিৎ। আর এ মেয়ে কি ভংচং করছে যাবে না বলে। এদের ভালোবাসার বিয়ের রহস্য মাথায় আসেনা তার এদের কান্ডকারখানা দেখলে।
তিনি চোখ রাঙিয়েই কিচেনে চলে গেলেন। বড় জা’য়ের সাথে কাজে হাতে হাত লাগানোর ফাকে বললেন,
“শুভ্রতা আর মেহরাদ দুটোই ভালোবেসে বিয়ে করেছে দেখে মনে হয় না ভাবি। মেয়েটা এখনো মেহরাদকে দেখলে পালাই পালাই করে। ভয় পায়। ভয় পেলে ভালোবাসলো কখন?”
জাহানারা বেগম ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসলেন। তার ছেলেটা হয়েছে গম্ভীর,পুরো বাবার মতো । ও সকলের সামনে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে না। রাগ দেখালেও সকলের সামনে আদিখ্যেতা ওর দ্বারা হবে না এটাই স্বাভাবিক। তিনি কিছু বলবেন তার আগেই স্বপ্না বললো,
“আরেহ, আম্মা আমনে কি কন! এই ভয় রেই তো জয় করছে ভালোবাসা দিয়া। এই যে শুভ্রতা আম্মা পালাই পালাই করে এই তহনিই তো মেহরাদ আব্বায় আদ’র সোহাগ দিয়া আটকায় দেয়। এডি আমনে বুঝেন না? রাগী বেডাগো ভালোবাসা বেশি। ”
স্বপ্নার কথায় জাহানারা বেগম খুক খুক করে কাশতে কাশতে কিচেন থেকে বের হয়ে এলেন। নিজের ছেলেকে নিয়ে এমন কথায় হাসবে না লজ্জা পাবে সে বুঝতে পারছে না। পিছু ঘুরে ছোট জা’য়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সুরাইয়া বেগম তার দিকেই তাকিয়ে আছে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে। মূলত হাসি আটকে। একটু পর দু জা’ই হেসে উঠলো। স্বপ্না ভেবাচেকা খেয়ে গেলো।
শুভ্রতা এসেছে মেহরাদের রুমের সামনে, দরজা ভেজানো। নক করলো সে। তবে অনুমতির অপেক্ষা টপেক্ষা সে করলো না। তার এতো সময় কই,এ লোকের অনুমতির অপেক্ষা করবে সে?
মেহরাদ ফাইল ঘাটছিলো সেল্ফ থেকে। দরজা খুলার শব্দে পিছু ঘুরে তাকিয়ে দেখলো শুভ্রতা দাঁড়িয়ে হাতে মিষ্টির প্লেট, চাহারায় তেতো ভাব। সে ফাইল হাতেই সেল্ফে হেলান দিয়ে দাড়ালো বুকে হাত ভাজ করে। মেয়েটা এমন মুড নিয়ে আছে কেন? তার সামনে এ মুড মানায়? সে এমন মুড টুডের ধার ধারবে?
শুভ্রতা এগিয়ে টি টেবিলের উপর রাখলো প্লেটটা। মেহরাদের দিকে না তাকিয়েই বললো,
“মেঝো মা পাঠালো খেয়ে নিন। ”
মেহরাদ কিছু বললো না। শুভ্রতা চোখ উঁচিয়ে দেখলো মেহরাদকে তার দিকে জোহরি চোখে তাকিয়ে আছে। সে থতমত খেয়ে গেলো। আস্তে করে বললো,
“আসি।”
“দাড়া।” এগিয়ে এসে বললো মেহরাদ।
শুভ্রতা দাঁড়িয়ে গেল। মেহরাদের কথা শুনার অপেক্ষায় রইলো। তখন তো চলে গিয়েছিলো কিন্তু সেই ইয়ারিংস গুলো নিয়ে মনে খচখচানিটা তাঁর রয়েই গিয়েছে। তখন থেকেই মুখ ভোতা হয়ে রয়েছে তার। এগুলো কার? কার জন্য এনেছে?
“কি হয়েছে মুখ লটকিয়ে রেখেছিস কেন?”
শুভ্রতার মুখের ভোতা ভাব আরও বাড়ল। মাথা নিচের দিকেই নুয়িয়ে রাখলো।
“কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি।”
শুভ্রতা ওড়নার কোনা পেচাতে থাকলো আঙুলের ডগায়। সে দ্বিধায়। ওগুলোর কথা জিজ্ঞেস করবে কি করবে না তা নিয়ে।। তার জিজ্ঞেসও করতে হলো না এর আগেই মেহরাদ বলে উঠলো,
“যেগুলো ফেলে দিয়ে গিয়েছিলি সেগুলো রোজার জন্য গিফ্ট ছিলো। মামা হতে যাওয়ার খুশিতে।”
শুভ্রতা তাড়াক করে তাকালো মেহরাদের দিকে। কিভাবে বুঝলো? আর সেগুলো রোজা আপুর ছিলো? ওহ, তাহলে তো ভালোই। তার স্বস্তি লাগছে এতক্ষণে। এতক্ষণ কেমন যেন লাগছিলো!
“ওহহ,সুন্দর হয়েছে ইয়ারিংস গুলো। ”
সেকেন্ডের মধ্যে শুভ্রতার হাবভাব চেঞ্জ দেখে মেহরাদ শিউর হলো মেয়েটা এগুলো নিয়েই দোনোমোনো ছিলো।
“আপুকে দিয়েছেন? আপুর নিশ্চয়ই পছন্দ হবে। আপনার পছন্দ বরাবরই ভালো। ওগুলো খুব সুন্দর হয়েছে। ” খুশি মনে বললো শুভ্রতা।
“হুম,দিয়েছি। ” শুভ্রতার দিকে আরেকটু এগিয়ে বললো মেহরাদ।
“আচ্ছা মিষ্টি খেয়ে নিয়েন। আমি আসি হে? ”
“কি মিষ্টি খাবো?”
“কেন, এই। এগুলো। ” হাতের ইশারায় টেবিলের প্লেটটা দেখালো শুভ্রতা। মেহরাদ সেদিকে তাকালো না। শুভ্রতার মিশে দাঁড়িয়ে বললো,
“এগুলো মিষ্টির মতো লাগছে না। ”
“হ্যাঁ? মিষ্টিকে মিষ্টির মতো লাগছে না? আরেহ আমি, আমরা সকলে খেয়েছি। বেশ সুস্বাদু খেতে। খেয়ে দেখেন। ”
“তুই খেয়েছিস?”
“হুম, খেয়েছি তো।”
শুভ্রতার দেহ ছুই ছুই হয়ে দাঁড়িয়েছে মেহরাদ। শুভ্রতা একটু পিছিয়ে যেতে চাইলো কিন্তু তার আগেই এক হাতে শুভ্রতার চিবুকটা তুলে ঠোঁটে বৃদ্ধা আঙুল ছোঁয়ালো মেহরাদ। তারপর ঘোর লাগা কন্ঠে বললো,
“তাহলে আর ওগুলো খেতে হবে কেন? এখান থেকেই তো টেস্ট নেওয়া যায়!” বলেই শুভ্রতার ঠোঁট জোড়া দখল করে নিলো।
শুভ্রতা হতভম্ব। দু হাতে আকড়ে ধরলো মেহরাদের কাধ। মেহরাদের আশ্লেষী ছোঁয়ায় স্বায় দিতে বাধ্য হলো তার নারী সত্তা। চোখ বুঝে নিলো সহসা। সংকুচিত হয়ে এলো ছোট্ট দেহ খানা। বেশ খানিক পর ছাড়া না পেয়ে মেহরাদের কাধে নখ জোড়া খিচে দাবিয়ে দিলো।
এরও কিছুক্ষণ পর ছাড়লো মেহরাদ। ভেজা রক্তিম উষ্ঠ জোড়া কামড়ে বললো,
“উমমম,টেস্ট গুড। সোওওও গুড। সবকিছু এইভাবে টেস্ট করতে পারলে আরও ভালো হতো।”
শুভ্রতা হাতের উল্টো পিঠে নিজের ওষ্ঠ জোড়া মুচছে। পুরো মুখশ্রী লাল হয়ে আছে।
“আপনি… আপনি…” আঙুল উঁচিয়ে কিছু বলতে চাইলো শুভ্রতা। কিন্তু ব্যার্থ।
“হুম,কি আমি?”
শুভ্রতা ওষ্ঠ জোড়া মুখের ভিতর পুরে নিলো, এই বদ লোক কে কিছু বলেও লাভ নেই। শুভ্রতার অবস্থা দেখে মেহরাদ ঠোঁট কামড়েই হেসে ফেললো। গম্ভীর মুখে নির্লজ্জ লুচু মার্কা হাসি। লোকটাকে এই হাসিতেও মারাত্মক লাগে!
মেহরাদ আবারও এগুয়ে গেলো শুভ্রতার দিকে। শুভ্রতা চোখ জোড়া বড়ো বড়ো করে পিছিয়ে গেল কয়েক কদম। এযাত্রায় হাত দ্বারা ঠোঁট দুটো ঢেকে নিয়েছে। মেহরাদ বাকা হেসে শুভ্রতাকে ডিঙ্গিয়ে কাউচের উপর থেকে অফিস ব্যাগ থেকে একটা জুয়েলারি বাক্স বের করলো।
বেশ স্বাভাবিক ভাবেই শুভ্রতার সামনে ধরলো। শুভ্রতা লাফিয়ে মুখ থেকে হাত সড়িয়ে ধরে নিলো এটা। তার জন্য এনেছে টেনেছে নাকি? সে সেকেন্ড ব্যয় করলো না। সাথে সাথেই খুলে ফেললো বক্সটা।
মেহরাদ ভাবলেশহীন ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। শুভ্রতা বক্স থেকে ভিতরের অলংকারটা বের করলো। ভ্রু কুচকালো সে। হাতের মধ্যে একখানা হাড়ের মতো চেইন। তার মধ্যে আবার ছোট্ট ছোট্ট তারায় খচিত চেইন যুক্ত করা। বেশ সুন্দর। মুগ্ধকর।
শুভ্রতা মেহরাদের দিকে তাকালো, ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কার? ”
মেহরাদ চোখের ইশারায় ওকে দেখালো। শুভ্রতার খুশি কে দেখে! অবশ্য সে আগেই বুঝতে পেড়েছিল। আবার শুধালো,
“নেকলেস এটা? কিন্তু অন্যরকম লাগছে যে!”
মেহরাদ এবার ওর উচ্ছ্বসিত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। চোখের ইশারায় শুভ্রতার কোমড়ের দিকে ভ্রু উচিয়ে দেখালো।
শুভ্রতা বিষম খেল। হাতে থাকা স্বর্নের অলংকারটা ভালো ভাবে পরখ করে দেখলো, হ্যাঁ এটা তো স্বর্নের কোমর চেইন। স্বর্নের!
সে অবাক করা দৃষ্টিতে তাকালো মেহরাদের দিকে। মেহরাদ এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে একটা মিষ্টি মুখে পুরে নিলো। শুভ্রতার দিকে তাকিয়ে বললো,
“এটাতে তোকে কেমন লাগবে সেটা ভেবে এখনই আমার সুগার ফল করছে মেইবি। এই মিষ্টিও কাজে দিবে না। অন্যকিছু দরকার। লাইক,তখন কার টেস্টটা! ”
হৃৎস্পন্দন পর্ব ২০
শুভ্রতার লজ্জায় বাক হারা হয়ে গেল। কোপল দুটো চেরির মতো লাল হয়ে গিয়েছে। সে কোমর চেইনটা হাতের মধ্যে শক্ত করে চেপে বললো,
“এটা…এটা.. কখন পড়বো? আমি তো শাড়ি পড়িনা। ”
“তোর পড়তে হবে না। আমিই পড়িয়ে দিবো। উইদাউট ক্লোথস?”
