Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৮
নওরিন কবির তিশা

অপরাহ্ণের বিদায় লগ্ন ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। ম্লান রক্তিম আলোকাবৃত সূর্য্যমনি পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে। গোধূলির কমলাপ রশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছে নীলিমার বক্ষ জুড়ে, দূরবর্তী বনস্পতির শাখা হতে ভেসে আসা পাখপাখালির নীড়ে ফেরার কিচিরমিচির ধ্বনিগুলো সুরেলা লহরীর ন্যায় শ্রবণগোচর হচ্ছে।
কোথাও ঢালু, কোথাও বা সমান্তরাল বড্ড অমসৃণ আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তার ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে এক জোড়া কপোত-কপোতী। নির্জন স্থানটা নিবিড় প্রকৃতিতে নিমগ্ন। কেনাকাটা শেষ করে ওদের ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে যাবে সেটা পূর্ববিদিত হওয়া সঙ্গে টুইংকেল গভীর নিদ্রাচ্ছন্নতা দরুন জাহানারা বেগম ওকে নিয়ে আগেই অন্য গাড়িতে রওনা হয়েছেন।

ফলে এই গোধূলি বেলায় আর্য-তৃষা ফিরছিলো সম্পূর্ণ একান্তে তবে ফেরতি পথে ভাগ্যের বিড়ম্বনায় আর্যর গাড়ির ইঞ্জিনটা মাঝপথেই বিকল হয়ে পড়ায় দুর্ভাগ্যক্রমে দুজনকেই হেঁটে হেঁটে দীর্ঘ সে পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।ওরা অবশ্য গাড়ির খোঁজ কম করে নি তবে ঐ যে নিয়তি। যে কখনওই ওদের সহায় নেই।সেই প্রচেষ্টায়ও ব্যর্থ হয়েছে ‌তাই।
যানবাহন আর লোকালয়ের কোলাহল ছাপিয়ে ‌পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নির্জন প্রায় জনশূন্য পথটা ধরে এগিয়ে চলেছে ওরা। বয়ে যাওয়া শীতল হাওয়া তৃষার চুলে বিলি কেটে যাচ্ছে। আর্যর বলিষ্ঠ পদচারণার পাশে তৃষার শান্ত হেঁটে চলা যেন এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা করেছে। চলতি পথের নিস্তব্ধতাটুকু প্রথমে আর্যই ভাঙল। হেলদলহীনভাবে নিজের মনের হেঁটে আসা তৃষার দিকে তাঁকিয়ে বলল,,
-‘ মিস তৃষা, আপনার এই কচ্ছপ-গতিতে এগোলে তো মনে হচ্ছে আজ রাতে এই পাহাড়ের ঢালেই ডিনার সেরে কাল ভোরে সূর্যোদয় দেখে বাড়িতে পৌঁছাতে হবে। একটু ফাস্ট করা যায় না গতিটা?
তৃষা কপালে জমে থাকা ঘামটুকু ওড়নার আঁচলে মুছে নিয়ে মুখটা ইঞ্চিখানেক বাকিয়ে বলল,

-‘ দেখুন মিস্টার, আপনার তো অভ্যাস আছে ডেক-এ মার্চ করার। কিন্তু হিল পরে পাহাড়ি রাস্তায় চলা যে কী পরিমাণ অ্যাডভেঞ্চার, আর পেইনফুল সেটা আপনি বুঝবেন না। আর তাছাড়া আমি জোরে হাটতে পারিনা।
-‘ তো কি পারেন? শুধু উল্টাপাল্টা বকবক করতে?
-‘ দেখুন একদম বাজে কথা বলবেন না। আপনার ওই দামড়া মার্কা গাড়িটা রাস্তার মাঝখানে এসে খারাপ হবে সেটা কি আমি জানতাম?
আর্য এক পা এগিয়ে এসে তৃষার একদম কাছে দাঁড়াল। ওর পারফিউমের সেই কড়া সুগন্ধটা তৃষার নাসারন্ধ্রে পৌঁছে তীব্র বেগে আঘাত করল। আর্য নিচু স্বরে বলল,
-‘ মেকানিক্যাল এরর তো আর বলে-কয়ে আসে না। আর এই হিল জুতো পরে পাহাড়ে আসার আইডিয়াটা কার ছিল? ড্রেসআপের ওপর যতটা কনসেন্ট্রেশন দেন, সিচুয়েশনের ওপর তার অর্ধেক দিলেও এখন আমরা ড্রয়িং রুমে থাকতাম।
তৃষা নাক মুখ শিঁটকে, মনে মনে খানিক বিড়বিড় করল। আর্য কথা না বাড়িয়ে তৃষার সম গতিতে চলতে আরম্ভ করল। তবে খানিক দুর অতিক্রান্ত হতেই তৃষা আর্যর একদম সমান্তরালে এসে ওর সঙ্গে পা মিলাতে মিলাতে বলল,,

-‘ আচ্ছা শুনুন?
আর্য ওর দিকে না তাকিয়েই বলল,,,
-‘ হুম?
-‘ আপনি আমার কত ইয়ারের জুনিয়র? মানে কত বছরের ছোট?
তৃষার এমন আজগুবি প্রশ্নে পদচারণা স্থির হলো আর্যর। বিস্ময়াবিভূত দৃষ্টিতে চোখমুখ বিশ্রীভাবে কুঁচকে বলল,,
-‘ মানে?
তৃষা গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,,
-‘ না মানে অলটাইম এমন আপনি আপনি করেন। তাই মনে হয় আমি মেবি আপনার সিনিয়র।
আর্যর কুঁচকানো ভ্রু যুগল আরও সংকুচিত হলো। সে স্থির দৃষ্টিতে তৃষার দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘ আর ইউ্য কিডিং উইথ ম্যি?
তৃষা কাঁধ নাচিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

-‘ এ মা ছিঃ ছিঃ ইয়ার্কি করতে যাবো কেন? ট্রাস্ট মি মাঝে মাঝে আমার সিরিয়াসলি ডাউট হয়। মনে হয় আমি বোধহয় অনেক সিনিয়র বা ওই টাইপ কিছু।
আর্য এবার সত্যিই অবাক হলো। তার বয়স ত্রিশের কোঠায়, আর এই সতেরো-আঠারো বছরের মেয়েটা তাকেই নিজের জুনিয়র বলছে। আচ্ছা তৃষা কি কৌশলে তাকে বয়সের খোঁচা দিচ্ছে! সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তপ্ত গলায় বলতে যাবে কিছু, ঠিক তখনই পাহাড়ের নিস্তব্ধতা চিরে তৃষার আর্তচিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো,
-‘আহ্!
চমকে উঠে আর্য তৎক্ষণাৎ পেছনে ফিরল। দাঁতে দাঁত চেপে চোখমুখ কুঁচকে যন্ত্রণায় নীলাভ রং ধারণকৃত মুর্তির ন্যায় দন্ডায়মান তৃষাকে দেখে বিচলিত হয়ে দু-পা এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
-‘ হোয়্যাট হ্যাপেন? কী হলো আপনার?
তৃষা কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু মুখটা বিকৃত করে এক জায়গায় স্থির হয়ে রইল। আর্যর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিচে নামতেই বুকটা ধক করে উঠল। ও দেখল, তৃষার ডান পায়ের হিলটা একদিকে কাত হয়ে আছে আর সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে পিচঢালা কালো রাস্তায়। সম্ভবত কোনো তীক্ষ্ণ লোহার টুকরো বা সুচালো পাথর হিল ভেদ করে সরাসরি তৃষার কোমল গোড়ালিতে বিঁধে গেছে।
মুহূর্তের মধ্যে আর্যর সব কাঠিন্য উবে গেল। ও কোনোরূপ দ্বিধা না করে রাস্তার ধুলোবালি উপেক্ষা করেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তৃষার সামনে। পরম মমতায় তার পা-টা আলতো করে নিজের হাতের তালুতে তুলে নিল। র’ক্তের লাল আভা দেখে আর্যর চোয়াল শক্ত হয়ে এল উদ্বেগে। নিচু স্বরে সে বলল,

-‘ একটু সহ্য করুন, নড়বেন না একদম।
আর্যর ঘর্মাক্ত ললাটে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা;ও বিভ্রান্তির ন্যায় নিজের কম্পিত অস্থির আঙুলের ছোঁয়ালো তৃষার আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে। আর ওর আঙুলের স্পর্শ তৃষার ক্ষতের ওপর পড়তেই সে তীব্র যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল,
-‘ উফ্… লাগছে, খুব লাগছে!
আর্যর কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হলো। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
-‘ রিল্যাক্স ম্যাম, জিনিসটা ভেতরে আটকে আছে। আমি স্রেফ এক টানে বের করে আনব, জাস্ট ট্রাস্ট মি অ্যান্ড শাট ইয়োর আইজ। আমি আছি তো, কিচ্ছু হবে না।
আর্যর ভরসা পূর্ণ বাক্যে তৃষার ভয়টা যেন কর্পূরের মত উবে গেল। তৃষা আর্যর কাঁধটা খামচে ধরল। মুহূর্তের ব্যবধানে আর্য বিঁধে থাকা পাথরের টুকরোটা বের করে আনতেই তৃষার গলার কাছ থেকে অবরুদ্ধ এক চিৎকার বেরিয়ে এল। যন্ত্রণায় ভিঁজে উঠলো আঁখি পল্লব । আর্য কোনো কথা না বলে নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে তৃষার র’ক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ক্ষ’তস্থানটা শক্ত করে বেঁধে দিল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক পলক তৃষার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল।
পরক্ষণেই তৃষাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আর্য নিচু হয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে নিজের বলিষ্ঠ দুই বাহুর ওপর তুলে নিল। অতর্কিত এই ঘটনায় তৃষা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আর্যর গলা জড়িয়ে ধরল। বিস্ময় আর জড়তায় আমতা-আমতা করে সে বলে উঠল,

-‘ একি! কি করছেন আপনি? নামান আমাকে!
আর্যর দৃষ্টি তখন সামনের ধূ ধূ পাহাড়ি পথের দিকে নিবদ্ধ। সে গম্ভীর কিন্তু শান্ত স্বরে বলল,
-‘ চুপচাপ থাকুন। আপনার ইনজুরিটা বেশ ডিপ, এই অবস্থায় হেঁটে যাওয়া একদম সেফ নয়। তাই বেশি কথা না বলে শান্ত থাকুন আর আমায় আমার কাজ করতে দিন।
তৃষা আর্যর বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।দুপাশে গহীন অরণ্য আর ধূ ধূ পাহাড়ের মৌন সাক্ষী আর্য ওকে বাহু বন্দি করেই এগিয়ে চলল।শীতল বাতাসের ঝাপটায় তৃষার অবিন্যস্ত অলকগুচ্ছ বারংবার আর্যর চিবুক ছুঁয়ে যাচ্ছে। নির্জন অরণ্যপথে নুড়ি পাথরের ঘর্ষণ আর ঝিঁঝিঁ পোকার গুঞ্জনের মাঝে কেবল শ্রুত হচ্ছিল এক জোড়া কপতো-কপতির নিবিড় নিঃশ্বাসের শব্দ।

ঘড়ির কাঁটা রাত আটটার ঘরে। সকলে ফেরার পর নিঃসন্দেহে অতিক্রান্ত হয়েছে ঘন্টাখানেক। তবে এখনও আর্য-তৃষা না ফেরায় বেশ উদ্বিগ্ন সবাই। সমগ্র ড্রয়িং রুম সকলের অস্থির পদচলনা মুখর। প্রত্যেকে নিজে কর্ম সম্পাদন করছে আর বারংবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করছে প্রধান দরজায়।
আঞ্জুমান বিবি তসবিহ হাতে সোফায় বসে আছেন,গুলশানারা বেগম এক গ্লাস পানি নিয়ে জাহানারা বেগমের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ধীর স্বরে বললেন,
-‘ আপা, শান্ত হস তো। ওরা এক্ষুনি চলে আসবে।পাহাড়ি রাস্তা, হয়তো নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না।
জাহানারা বেগম উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে দাঁড়ালেন,
-‘ এইটুকু পথ আসতে এক ঘন্টা লাগে? তার ওপর ফোনটাও বন্ধ দেখাচ্ছে। আজকে শুধু বাড়ি ফিরুক ওরা।
পাশ থেকে সায়রা বেগম বললেন,-‘ আরে টেনশন করিস কেন? নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে একটু একান্ত সময় তো লাগে ওদের।

-‘ বুঝলাম একান্ত সময় লাগে তাই বলে ফোনটাও বন্ধ করে রাখবে।
অহনা সবে এই সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে নামছিল। ফুফুর এমন কথায় ও খানিক হেসে বলল,
-‘ আরে আরে ফুফুআম্মু শান্ত হও। স্টার জলসায় একটা নাটক দেখতাম নিম ফুলের মধু ওখানে নায়িকার শাশুড়ি সারাদিন বাবু বাবু করতো। বউয়ের কাছেই ঘেঁষতে দিত না নায়ককে। তুমি যদি এখন এরকম করো তাহলে তো সবাই সেরকমই ভাববে তাই না?
রাইসাও সঙ্গ দিলো অহনার,-‘ একদম রাইট আপু। ফুফুআম্মু শান্ত হও তো।
ওদের এমন কথোপকথনে জাহানারা বেগম চোখ কুঁচকালেও হেসে উঠল উপস্থিত সকলে। ঠিক তখনই পিছন থেকে রায়া বলে উঠলো,

-‘ আরে ওই তো ভাইয়া।
ওর কণ্ঠস্বরে সকলে একযোগে তাকালেও প্রধান দরজায়। সঙ্গে সঙ্গে চক্ষু চড়ক গাছ সকলের। প্রবেশ করছে আর্য ওর বাহুডোরে বন্দিনী তৃষা। এই ভঙ্গি দেখে মুহূর্তের জন্য কলকাকলি থেমে গেল; এক অদ্ভুত স্তব্ধতা গ্রাস করল পুরো তালুকদার মঞ্জিলকে। সকলের বিস্ময়বিস্ফোরিত চোখের সামনে দিয়ে আর্য তৃষাকে নিয়ে প্রবেশ করল,
জাহানারা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন। তৃষার ফ্যাকাশে মুখ আর আর্যর ঘর্মাক্ত ললাট দেখে তাঁর মাতৃহৃদয় আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। তিনি তৃষার ঝুলে থাকা পায়ের দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলেন সাদা রুমাল ভেদ করে তখনও র’ক্তের হালকা আভা উঁকি দিচ্ছে,

-‘ একি! আর্য, কী হয়েছে রে তৃষার? পা দিয়ে তো রক্ত পড়ছে! তোরা এভাবে…
জাহানারা বেগমের কণ্ঠের উদ্বেগ ছাপিয়ে আর্য গতি বাড়িয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল,
-‘ এখন এক্সপ্লেইন করার মতো টাইম নেই মা। ওর ইনজুরিটা বেশ ডিপ, ইনফেকশন হওয়ার ভয় আছে। রাইসা, ফার্স্ট এইড বক্স আর অ্যান্টিসেপটিক নিয়ে জলদি আমার রুমে আয়। বি কুইক!
সকলে যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আর্য দ্রুত পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। তৃষা লজ্জায় আর্যর শার্টের কলারটা খামচে ধরে মুখ লুকিয়ে রেখেছে ওর বুকের ভাঁজে। রাইসা আর অহনা এক পলক একে অপরের দিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে আর্যর নির্দেশ পালনে ছুটল।
এদিকে আর্য যখন ওকে নিয়ে রুমে যাচ্ছিল ঠিক তখনই নিজের রুম থেকে বের হচ্ছিল মায়া। ওদের দুজনকে এমন অবস্থায় দেখে অনুভূতি শূন্য হয়ে গেল। তৃষার পায়ের ক্ষ’তটা দৃশ্যমান হলো না ওর সম্মুখে ওর মস্তিষ্ক শুধু এতোটুকুই নির্দেশনা নিল আবারো আর্য তৃষাকে কোলে তুলেছে। অক্ষীপল্লবের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু ফোটা নোনা জল। ও আর দাঁড়ালো না পাশ ঘুরে গন্তব্য বদলালো ফের প্রবেশ করল নিজের কক্ষে।

-‘ আহ,ওটা লাগাবেন না প্লিজ। য’ন্ত্রণা করে। আম্মুউউউ।
আর্যর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার জোগাড়। সে হাতে অ্যান্টিসেপটিক তুলা নিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে, অথচ তৃষা তুলাটা ক্ষতের ধারেকাছে ছোঁয়ানোর আগেই এমন ভাবে চিৎকার করে পুরো ঘর মাথায় তুলছে। রাইসা,রায়া অহনা আর ফুফু জাহানারা বেগম উপস্থিত সেখানে। তবে আর্য নির্দেশে প্রত্যেকে নিশ্চুপ। রায়া আর রাইসা তৃষার এই অতি-নাটকীয় আর্তনাদ দেখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে।
আর্যর কপালে বিরক্তির ভাঁজ স্পষ্ট। সে তুলাটা পাশে রেখে দিয়ে সোজা হয়ে বসে ধমকের স্বরে বলল,,
-‘ শাট আপ তৃষা! জাস্ট শাট আপ। আমি এখনো লিকুইডটা টাচও করিনি, আর আপনি এমনভাবে চিল্লাচ্ছেন যেন আমি আপনার পা অ্যাম্পুটেশন করছি! ড্রামা কুইন হওয়ার জন্য অস্কার নমিনেশন পরে নিয়েন, এখন চুপচাপ বসুন।
আর্যর এই হঠাৎ ধমকে তৃষা একদম থতমত খেয়ে গেল। সে ভেজা চোখে বড় বড় করে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে কান্না গিলে ফেলল।আর্য এবার রাইসার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,

-‘ রাইসা, এগুলো ধর। আর মামনি, ওকে একটু শক্ত করে ধরুন তো, নড়াচড়া করলে ড্রেসিংটা পারফেক্ট হবে না।
আর্য অত্যন্ত নিপুণ হাতে তৃষার পা-টা নিজের হাঁটুর ওপর টেনে নিল। অতি সাবধানে ক্ষতের ওপর অ্যান্টিসেপটিক লাগাতে লাগাতে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
-‘ ইটস ওকে ম্যাম, জাস্ট আ লিটল বিট স্টিং। একটু সহ্য করুন, ইনফেকশন হয়ে গেলে কিন্তু সিচুয়েশন আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যাবে। আপনি তো স্ট্রং গার্ল, রাইট?
আর্যর এই আচমকা কোমল কন্ঠে তৃষা শান্ত হলো। জ্বালাপোড়াটা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আর্যর মনোযোগ আর হাতের ছোঁয়া সেই যন্ত্রণাকে হালকা করে দিচ্ছে। আর্য মলমটা লাগিয়ে খুব কৌশলে করে ব্যান্ডেজটা বেঁধে দিল। কাজ শেষ করে সে মুখ তুলে তৃষার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
-‘ ডান! এবার আপনার ভলিউমটা একটু লো করতে পারেন। থ্যাঙ্ক গড, আমার কানের পর্দাগুলো এখনো ইনট্যাক্ট আছে।
রাইসা আর থাকতে না পেরে ফিক করে হেসে দিল। তৃষা লজ্জায় আর্যর বুকের বোতামের দিকে তাকিয়ে রইল, আর আর্য নির্বিকার ভঙ্গিতে ফার্স্ট এইড বক্সটা বন্ধ করতে করতে বলল,

-‘ এখন একদম নড়াচড়া করবেন না। আমি পেইন কিলার আর একটা অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে আসছি, ওটা খেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ুন।
তৃষা কিছু একটা বলতে গিয়েও দমে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে চোখ কচলাতে কচলাতে এগিয়ে এলো ছোট্ট টুইংকেল। সবার উপস্থিতিতে ও একটু হকচকিয়ে গেল। কিন্তু যেই ওর নজর পড়ল তৃষার ব্যান্ডেজ করা পায়ের ওপর, ওর ঘুমের ঘোর এক লহমায় কেটে গেল। টুইংকেল হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় উঠে দ্রুত তৃষার কোল ঘেঁষে এসে বসল। ওর মায়াবী নীলাভ আঁখিজোড়া পানিতে টইটুম্বুর হলো মুহূর্তেই। ও তৃষার মুখটা নিজের ছোট্ট দু-হাতে আগলে ধরে ভাঙা গলায় বলল,

-‘ বানি! ও বানি! তোমার পায়ে কি হয়েছে? অনেক ব্লিডিং হয়েছে বুঝি? তুমি কাঁদছিলে?
তৃষা চট করে নিজের চোখের কোণে লেগে থাকা অশ্রু কণা মুছে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল ঠোঁটের কোণে। ও টুইংকেলকে জাপ্টে ধরে কপালে চুমু এঁকে আদুরে স্বরে বলল,
-‘ আরে না সোনা! কিচ্ছু হয়নি তো। জাস্ট একটা দুষ্টু পাথর এসে পায়ে একটু কামড় দিয়েছে, তাই তোমার পাপা ওটাকে বকে দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল।
টুইংকেল এবার আর্যর দিকে ফিরে রাগী চোখে তাকাল,
-‘ পাপা! তুমি বানিকে পাহাড়ে কেন নিয়ে গিয়েছিলে? তুমি জানো না ওখানে দুষ্টু পাথর থাকে? তুমি বানিকে একদম প্রটেক্ট করোনি!
আর্য মেয়ের এমন অদ্ভূত অভিযোগে আকাশ থেকে পড়ল। ও এক হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হেসে বলল,

-‘ আরে মাম্মাম! আমি তো তোমার বানিকেই প্রটেক্ট করছিলাম। তোমার বানিই…!
ওকে কথা করতে দিলোনা টুইংকেল। কিঞ্চিৎ বাচ্চামিসূলভ রাগ দেখিয়ে বলল -‘তুমি চুপ।
মেয়ের এহেন ধমকে তৎক্ষণাৎ মুখে হাত দিলো আর্য। এদিকে আর্য আর মেয়ের এমন কাণ্ডে উপস্থিত সকলের ঠোঁট চেপে হাসলো। মুরুব্বিরা কক্ষ ত্যাগ করতে করতে বললেন,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৭

-‘ তোমরা থাকো আমরা বরং যাই।
ওদের পিছু পিছু বেরিয়ে গেল অহনারাও। কক্ষে এখন সম্পূর্ণ ওদের তিনজনের রাজত্ব। টুইংকেল তৃষার ব্যান্ডেজের ওপর আলতো করে ফুঁ দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বলল,
-‘ কষ্ট পেও না বানি। আমি ওই পাথরটাকে খুব করে বকে দেব। এখন আমি তোমাকে শক্ত করে ধরে থাকব, যাতে আর কোনো ব্যা’থা তোমাকে টাচ করতে না পারে। আই অ্যাম ইওর লিটল সোলজার!
তৃষা মুচকি হেসে চুমু আঁকলো টুইংকেলের ছোট্ট ললাটে। আর্য মুগ্ধ দৃষ্টিতে অবলোকন করছিল এই স্নিগ্ধ দৃশ্য।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৯