অস্তরাগের রঙ পর্ব ২০
তেজরিন উম্মীদ
খান বাড়ির ড্রয়িংরুমটা তখন এক ব্যস্ততার চাদরে ঢাকা। ব্যাগ গোছানোর ধুম পড়েছে—রুশদী, শের আর ফারাজ যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ওদিকে গেস্টরুমে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে উজান। রাইমা খানের কাছে আগেভাগেই বিদায়ের অনুমতি নিয়ে রেখেছে ওরা, ঘড়ির কাঁটা বলছে এখনই রওনা দেওয়ার সময়।
ঠিক সেই মুহূর্তে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সদর দরজায় হাজির শান আর সিফাত। বসুন্ধরা কিংসের হয়ে ক্লাবে একটা টুর্নামেন্ট শেষ হলো গতকালই। সামনে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের কড়া শিডিউল, তাই মাঝে এই ক’দিনের এক চিলতে ছুটি। সিফাতের ইচ্ছে ছিল নিজের বাড়ি যাওয়ার, কিন্তু শানের জেদের কাছে হার মেনে সে-ও পা বাড়াল এই খান বাড়ির দিকে।
ড্রয়িংরুমের সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিতেই যেন একটা জীবন্ত ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ল তাদের ওপর। কোত্থেকে এক দৌড়ে এসে শানের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল শের। পুঁচকে হাত দুটো দিয়ে শানের গলা জড়িয়ে ধরে চিল চিৎকার করে উঠল সে— “আ… চাচু! তুমি কখন আসলে?”
শান আলতো করে জড়িয়ে ধরল শেরকে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করে গেল তার। পেশাদার ফুটবলের মাঠ, ঘাম আর লড়াইয়ের মাঝে এই ছোট্ট মানুষটার নিষ্পাপ ভালোবাসা যেন এক পশলা বৃষ্টির মতো। কতদিন এই ‘পুংটা’টার সঙ্গে দেখা নেই! শানের মনে হলো, পৃথিবীর সব ক্লান্তি যেন ওই এক আলিঙ্গনেই ধুয়ে মুছে গেছে।
আবেগ সামলে নিয়ে শান বলল, “এই তো এলাম। তোর কী খবর রে?”
শেরের উচ্ছ্বাস থামার নাম নেই। শানকে ছাড়িয়ে পাশের সোফায় বসা সিফাতকে দেখেই বলে উঠল, “ই… অনেক ভালো! সিফু, তুমি এসেছ?”
সিফাত অমনি চোখ রাঙাল, “এই শেরের বাচ্চা, ‘সিফু’ কিরে? আমার নাম সিফাত, সিফাত সিকদার। বুঝেছিস?”
শের দমবার পাত্র নয়। বুক ফুলিয়ে বলল, “নো! তোমার নাম সিফু!”
“নামের খিস্তি ওড়ালে কিন্তু খবর আছে! ভুলেও আমাকে আর সিফু ডাকবি না,” সিফাতের কৃত্রিম ধমক।
শের আরও পেয়ে বসল, “সিফু সিফু সিফু… বলো এখন কী করবা?”
“তোকে কিন্তু আমি জ্যান্ত চিবিয়ে খাব!” সিফাত এবার পাকড়াও করল তাকে।
শের হেসেই কুটিপাটি, “উফ… সিফু ডিলার, তুমি কি রাক্ষস? যে আমাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে? আমি কি তোমাকে ভয় পাই? শের কাউকে ভয় পায় না।”
সিফাত এবার শেরকে নিজের কোলে টেনে নিল। ওর ছোট্ট দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় বন্দি করে বলল, “এবার বল, কী বলছিলি? আমাকে ভয় পাস না? দেব নাকি একটা আছাড়?”
শের বিপদে পড়ে শানের দিকে তাকাল, “চাচু, সিফুকে কিছু বলো! নাহলে আমি সিফুকে কামড় দেব কিন্তু!”
এমন সময় সেখানে ফারাজের প্রবেশ। ওদের দেখে অবাক হয়ে সে প্রশ্ন করল, “আরে তোরা কোত্থেকে আসলি?”
শান উঠে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল, “এলাম তোদের সারপ্রাইজ দিতে। কিন্তু তুই এই রাতের বেলা লটবহর নিয়ে কোথায় যাওয়ার জন্য তৈরি?”
তন্মধ্যে রুশদীও সেখানে এসে হাজির হলো। শানের বিস্ময়ভরা প্রশ্নের জবাবে সে স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমরা তো চট্টগ্রাম যাচ্ছি!”
শানের চোখ কপালে উঠল, “চট্টগ্রাম! হুট করে চট্টগ্রাম কেন?”
“এমনিই, একটু ঘুরতে যাচ্ছি আমার নানু বাড়ী,” রুশদী মুচকি হেসে জানাল।
শানের মুখটা মুহূর্তেই আষাঢ়ের মেঘের মতো কালো হয়ে গেল। সে অনুযোগের সুরে বলল, “কী বলো তোমরা! সবাই মিলে চলে যাচ্ছো আর আমরা কি এখানে একা একা বসে আঙুল চুষব?”
ফারাজ বরাবরই একটু গম্ভীর। নির্লিপ্ত গলায় বলল, “তোদের ইচ্ছা তোরা কী করবি। আমরা তো যাচ্ছিই।”
শানের আবদার এবার জেদে রূপ নিল, “ই… আমরাও যাব ভাইয়া! তোমরা গেলে আমরা কোনোভাবেই একা থাকতে পারব না।”
ফারাজ এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কেন? আমরা কি অক্সিজেন? যে আমাদের ছাড়া তোরা থাকতক পারবি না?”
শান নাছোড়বান্দা। সে প্রায় কাকুতি-মিনতি করে বলল, “হ্যাঁ ভাইয়া, তুমিই আমাদের অক্সিজেন! তোমরা চট্টগ্রাম চলে গেলে আমরা এই খাঁ খাঁ ঢাকা শহরে দম আটকে মরে যাব। প্লিজ ভাইয়া, আমাদের সাথে নিয়ে চলো! প্লিজ, প্লিজ!”
ফারাজ শক্ত গলায় জবাব দিল, “না, যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।”
“প্লিজ ভাইয়া, একটা বার বলো শুধু!” শান এবার করুণ দৃষ্টিতে তাকাল।
রুশদী পাশ থেকে একটু নরম সুরে সায় দিল, “আহা, নিয়ে চলেন না। গেলে সমস্যা কী? দলটা বড় হলে মজাই হবে।”
ফারাজ এবারও অনড়, “আমি একবার বলেছি তো, যেতে হবে না।”
“চট্টগ্রামে আমার নানুবাড়ি যাচ্ছি! সো আমার কথাই শেষ কথা। আমার ভাইয়ারা যাচ্ছে, ব্যস!”
ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে রূপালি রঙের মাইক্রোবাসটা আপন গতিতে ছুটে চলেছে। ভোরের আলো ফুটতে তখনও কিছুটা বাকি। গাড়ির ভেতরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, শুধু ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন আর চাকার ঘর্ষণের শব্দ। সামনের সিটে গম্ভীর মুখে বসে আছে ফারাজ। মাঝের সিটে শান, সিফাত আর উজান ঘুমের ঘোরে ঢুলছে। পেছনের সিটে রুশদী আর শের। গাড়ির পেছনে পাহারায় আসছে কয়েকটা মোটরসাইকেল, যাতে বডিগার্ডরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।
আকাশের কোণে যখন সূর্যের প্রথম আভা দেখা দিল, ততক্ষণে গাড়ি সীতাকুণ্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই এলাকাতেই রুশদীর নানাবাড়ি—বিখ্যাত ‘শেখ নিবাস’। রুশদীর দাদাবাড়িও এই চট্টগ্রামে, কিন্তু ছোটবেলার পর সেখানে আর থাকা হয়নি। তার বাবা আনাস হক এখন থিতু হয়েছেন ঢাকায়। সেই সূত্রে ফারাজ এখন চট্টগ্রামের জামাই,।
রুশদীর নানা ছিলেন এই অঞ্চলের নামকরা বিত্তবান মানুষ। বিশাল জমিদারী ধাঁচের বাড়ি, যেখানে এখনো সব মামা-মামি আর কাজিনরা মিলেমিশে একান্নবর্তী পরিবারে থাকে।
গাড়িটা যখন শেখ নিবাসের কারুকাজ করা ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকল, পুরো পরিবার যেন উৎসবে মেতে উঠল। বড় মামা এগিয়ে এসে ফারাজের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “আরে আমাদের চট্টগ্রামের জামাই যে!কেমন আছো? আগে চিনতে পারছো?হা হা! না চেনারই কথা আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ, সম্পর্কে আমি তোমার মামা। রাস্তাঘাটে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”
মামি পাশ থেকে রুশদীকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমার লক্ষ্মী মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে!শয়তান কল দিলে কল ধরিস না কেন? কথা বলিস না কেন আমাদের সাথে? বেশি পেকে গেছিস?”
রুশদী হাসিমুখে সবাইকে সালাম করল এবং একে একে ফারাজ, ও বাকিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। নানা-নানি তো নাতনি আর নাত-জামাইকে কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত। বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়েই এক পশলা কুশল বিনিময় চলল।
সকালের রাজকীয় নাস্তা সেরে সবাই যার যার ঘরে বিশ্রাম নিতে গেল। শান আর সিফাতকে আলাদা একটা বড় ঘর দেওয়া হয়েছে, ওরা ঢুকেই সটান ঘুম। রুশদী নিজে গিয়ে ফারাজ আর শেরকে ওদের ঘরে রেখে এল। দীর্ঘ জার্নি শেষে ফারাজও বোধহয় একটু চোখ বুজেছে।
সকাল দশটা। রোদের তেজ বাড়তে শুরু করেছে। রুশদী একা পায়ে হেঁটে বাড়ির পেছনের বড় পুকুরঘাটে গিয়ে বসল। চারদিকে স্নিগ্ধ হাওয়া আর ঝিরঝিরে পাতার শব্দ। পুকুরের শান্ত জলে সূর্যের প্রতিফলন চিকচিক করছে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
“কিরে, একা বসে কেন?”
রুশদী চমকে পেছনে তাকিয়ে দেখল উজান দাঁড়িয়ে। তার চোখেমুখেও হালকা ঘুমের রেশ, কিন্তু ঠোঁটে সেই চিরচেনা সরু হাসি।
“এমনিই, চারপাশটা দেখছিলাম। কত বদলে গেছে সব!” রুশদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
পুকুরঘাটে শ্যাওলা ধরা পুরনো পৈঠায় পাশাপাশি বসেছে ওরা দুজন। বাতাসের ঝাপটায় রুশদীর অবাধ্য চুলগুলো বারবার চোখেমুখে এসে পড়ছে। উজান একটু দূরত্ব বজায় রেখেই বসলো, যেন মাঝখানের এই শূন্যস্থানটুকুই এখন ওদের সামাজিক অবস্থানের ধ্রুব সত্য। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর উজানই প্রথম স্তব্ধতা ভাঙলো।
“জানু, সত্যি করে একটা কথা বলবি?” উজানের গলায় এক অদ্ভুত আকুতি।
রুশদীদের কাজিনদের বড়সড় এক বাহিনী থাকলেও উজানের সাথে তার বন্ধুত্বটা শৈশব থেকেই একটু গাঢ়। ওদের পারিবারিক আবহে এই ‘জান’ বা ‘জানু’ সম্বোধনটা খুব স্বাভাবিক, রক্তের সম্পর্কের উর্ধ্বে এক নির্মল মায়া।
রুশদী পুকুরের টলটলে জলে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে শান্ত স্বরে জবাব দিলো, “হুম, বল।”
“তুই হ্যাপি তো? মানে… তোর ম্যারিড লাইফে কোনো প্রবলেম হচ্ছে না তো?” উজান থামলো না, বরং আরও একটু সাহস নিয়ে বললো, “যেকোনো সমস্যা থাকলে নির্দ্বিধায় বলিস। আমরা তো আছি, আমি তো আছি না?”
রুশদী এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ওর ঠোঁটে উপচে পড়া সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী হাসিটা খেলিয়ে গেল।
“তোর কেন মনে হলো আমি বিবাহিত জীবনে কষ্টে আছি? আরে বাবা, আমি তো একদম চিল আছি! আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো একটা পরিবার পেয়েছি আমি।”
উজান যেন রুশদীর চোখের মণি ভেদ করে ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো মেঘ খুঁজতে চাইলো। “একদম সত্যি?”
“যখন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, তখন মিথ্যে বলার প্রয়োজনটা কী বল তো?” রুশদী এবার একটু শাসনের সুরে বললো, “চিল জান! আমি একদম ঠিক আছি, আমাকে নিয়ে তোকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। নিজের ভালোটা আমি নিজে খুব ভালো বুঝি। কখনো খারাপ থাকলে তোদেরই তো আগে জানাবো।”
উজান কিছুক্ষণ ঘাসের ডগা দিয়ে মাটির ওপর কী যেন আঁকিবুঁকি করলো। তারপর অবদমিত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হঠাৎ বলে বসলো, “রুশদী, আমাকে বিয়ে করলি না কেন? আমিও তো তোকে…”
কথাটা শেষ করতে পারলো না উজান। রুশদী এবার রাগে ফুঁসে ওঠার ভান করলো। “কারণ তুই আমার ভাই! আর মনে রাখবি, ভাই ভাই-ই থাকে। এখন যদি এই পুরনো কাসুন্দি আবার ঘাঁটতে আসিস, তবে নির্ঘাত একটা থাপ্পড় মেরে পুকুরের পানিতে ফেলে দেব তোকে, বেয়াদব! আমি এখন এক বাচ্চার মা, এই বোধটা যেন মাথায় থাকে!”
”
রুশদী খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো জড়তা নেই, আছে এক বুক সহজ সারল্য। উজানও ম্লান হেসে তাল মেলালো, “আর আমি এখন মামা!”
উজানের এই মৃদু হাসির আড়ালে চাপা পড়ে রইল বছরের পর বছর ধরে লালন করা একরাশ অব্যক্ত অনুভূতি। একটা সময় সে ভেবেছিল রুশদী তার ঘর আলো করে থাকবে, কিন্তু নিয়তি তাকে বসিয়েছে ফাকা আসনে। রুশদীর চোখেমুখের এই তৃপ্তি দেখে উজান নিজের কষ্টটুকু বিষণ্ণতার চাদরে ঢেকে ফেলল। সে চায় না তার কোনো আচরণে রুশদীর সাজানো জীবনে এক ফোঁটা কালির দাগ পড়ুক। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রাণবন্ত মেয়েটার দিকে—যাকে হারানোর হাহাকার আছে, কিন্তু আফসোস নেই।
এদিকে, দোতলার বিশাল বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল ফারাজ। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ স্নিগ্ধতায় ঘেরা রুশদীর নানাবাড়ির চারপাশটা একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া। কিন্তু মুগ্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পুকুরঘাটে পাশাপাশি বসা রুশদী আর উজানকে দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। রুশদীর হাসির শব্দটা দূর থেকে তীরের মতো তার কানে বিঁধছে। ফারাজের বুকের ভেতর হিংসে আর সন্দেহের এক তীব্র জ্বালা মোচড় দিয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার, চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে বিঁধল সেই যুগলের ওপর।
ফারাজ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। গায়ের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটছে। সে দ্রুত নিচে নেমে এল। কিন্তু এখানেই শুরু হলো আসল বিপত্তি। জমিদার ধাঁচের এই বিশাল বাড়ির অন্দরমহল আর বাগান যেন এক গোলকধাঁধা। ওপর থেকে পুকুরঘাট যেদিকে দেখেছিল, নিচে এসে তার দিকভ্রান্ত হওয়ার দশা। একবার ডাইনে যায়, একবার বামে—কিন্তু গোলকধাঁধার মতো সে একই জায়গায় বারবার ফিরে আসছে। রুশদী আর উজান কী নিয়ে কথা বলছে, সেই চিন্তা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
রোবটিক যন্ত্রের মতো ফারাজ যখন হন্যে হয়ে পথ খুঁজছে, ঠিক তখনই আপদ হয়ে হাজির হলো রুশদীর ভাই-বোনের পল্টন। রুশদীর নানার দুই পক্ষের সংসার মিলিয়ে পাঁচ ছেলে আর চার মেয়ে। আর তাদের ঘরের ‘ল্যাদা-প্যাদা’ বাচ্চার সংখ্যা গুনে শেষ করা দায়—প্রায় ১৫-১৬ জনের এক ছোটখাটো ফুটবল টিম!
ফারাজকে দেখতেই তারা পঙ্গপালের মতো ছেঁকে ধরল। কেউ তার হাত টানছে, কেউ পাঞ্জাবি ধরে ঝুলছে।”দুলাভাই, আমাদের চকলেট দেননি কেন?””ও দুলাভাই, আমাদের সাথে ক্রিকেট খেলবেন?””দুলাভাই, আপনি কি আসলেই ঢাকার বড় ফুটবলার?”
একঝাঁক শালা-শালীর এই অনবরত কিচিরমিচিরে ফারাজের মেজাজ তখন তুঙ্গে। একদিকে মনের ভেতর ঈর্ষার আগুন, আর অন্যদিকে এই খুদে বাহিনীর অতর্কিত হামলা—ফারাজ যেন এক মহাসমুদ্রে পড়ে কুল খুঁজে পাচ্ছে না।শালিকা বাহিনীর এই অতর্কিত হামলায় ফারাজের অবস্থা তখন নাজেহাল। এই ডজনখানেক বাচ্চার ভিড়ে আবার তিন বিশেষ ‘নমুনা’ আছে—১৪ বছরের লীনা, ১৮ বছরের মিতু আর ১৫ বছরের মিতা। এই তিন শালী যেন আবদারের কয়েক ডিগ্রি উপরে!ফারাজকে ঘিরে ধরে তারা বায়না জুড়ল, “ও দুলাভাই! আমাদের নিয়ে ঘুরতে যাবেন না? আমাদের এলাকার মাঠে মেলা বসেছে, বিকেলে কিন্তু আমাদের নিয়ে যেতেই হবে। আমাদের কী কী দেবেন শুনি?”
মিতা তো এক কাঠি এগিয়ে, চোখেমুখে দুষ্টুমি মাখিয়ে বলল, “আমি কিন্তু নাগরদোলায় চড়ব। আর ফুচকা-চটপটি যা আছে সব খাওয়াতে হবে। শুধু তাই না, মেলা থেকে আমাকে গয়নাও কিনে দিতে হবে কিন্তু!”
মিতুও পাশ থেকে সুর মেলাল, “আর আমাকেও কিন্তু দিতে হবে দুলাভাই!”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৯
শালীদের এমন রসালো আবদার বা মিষ্টি হাসি—কোনোটাই ফারাজের মনে ধরল না। তার ভেতরে তখন ঈর্ষার আগুন জ্বলছে। নিজের সম্পত্তি অর্থাৎ রুশদীকে সে পুকুরঘাটে অন্য কারো সঙ্গে হাসাহাসি করতে দেখেছে, আর সেটাই তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, তার বউ যেন এখন বিপদসীমার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। এই অবস্থায় শালীদের বায়না তার কাছে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো লাগছে।মনটা তার ডুকরে কাঁদলেও চেহারায় একরাশ বিরক্তি বজায় রেখে ফারাজ বিড়বিড় করে বলল,
“এ বাড়িতে শালা-শালীর প্রোডাকশন এত বেশি কেন? এই জন্যই বোধহয় সরকার বলে—দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়। আমার অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে, একটাও না হলেই সবচেয়ে ভালো হতো!”
