Tell me who I am 2 part 7
আয়সা ইসলাম মনি
নিশীথ পেরিয়ে প্রথম আলোয় ঢেকে ছিল পূর্ব দিগন্ত। ফজরের নামাজ শেষে প্রতিদিনের মতো আজও তারান্নুম একঘণ্টা ধরে কুরআন তেলাওয়াতে মনোনিবেশ করেছিল। কিন্তু তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস রয়েছে তার। তবে আগের রাতে সময়ের আগেই ঘুমিয়েছিল বলে তেলাওয়াত শেষেও আর ঘুম আসেনি আজ। কুরআন শরীফটা যত্ন করে কাপড়ে মুড়িয়ে নির্ধারিত তাকের ওপর রেখে দিল। তারপর উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরাতেই সকালের নরম রোদ এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল। গাছের পাতাগুলো হেলে পড়েছে। চড়ুই, শ্যামা, আর বউ কথা কও পাখি ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। এমন মুহূর্তে হৃদয়ে অনাবিল শান্তির সুর নেমে আসল।
তারান্নুম দাঁড়িয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে বলল, “সকালটা যে এত সুন্দর হয়, আগে বুঝবার পারলে চিত্তারাইরা ঘুমাইয়া থাকতাম না। আহ, কি শান্তি যে লাগছে!”
বুক ভরে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিল; ফুসফুসে ঢুকে গেল প্রকৃতির নির্মলতা। আবার চোখ খুলে হেসে ফেলে বলল, “কবে যে ফয়সাইল্লার পোলায় আইসা বিয়াটা কইরা নিবে—উফফ! আর যে তর সয় না।”
তার মুখে লজ্জালু হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সেই হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল, যখন সে দেখতে পেল, বনের ভেতর থেকে আকবর ধীরপায়ে বেরিয়ে আসছে।
তবে খুব একটা চমকায়নি সে, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল, “কাকায় আবার ওইদিকে কই গেছিল?”
এবার সে গলা খাঁকারি দিয়ে ‘ও কাকা…’ বলে ডাক দিতে যাবে, ঠিক তখনই একই দিক থেকে ফাতিমা বেরিয়ে এলো। এবার তারান্নুমের মুখ থেকে প্রশান্তির আবরণ সরে গিয়ে ভ্রূ কুঁচকে উঠল একঝটকায়। সন্দিহান কণ্ঠে বলল, “মা-ও ওইদিকে কই গেছিল?”
দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। চৌকাঠ পেরিয়ে আসার আগেই ফাতিমাকে চোখে পড়ল। আর যেই না চোখে পড়েছে, কেমন যেন ফাতিমা থমকে গেলেন। এত ভোরে দরজার সামনে কঠিন চোখে মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুক কেঁপে উঠল তার। ঠোঁটও শুকিয়ে এলো। গলার কাঁপন লুকিয়ে রেখে মুচকি হাসতে চেষ্টা করে বললেন, “ওমা! তুই ঘুমাইস নাই?”
তারান্নুম কর্কশ গলায় বলল, “কই গেছিলা?”
ফাতিমার মুখে হাসি থাকলেও ভেতরে আতঙ্ক কাজ করল। গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললেন, “সর তো। কামের অভাব নাই। আয়, শাক কয়টা বাইছা দিবি।”
এই বলে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন ফাতিমা। চোখে-মুখে হঠাৎ ধরা পড়া অস্বস্তির ছাপ বেড়ে ওঠার আগে অনাকাঙ্ক্ষিত উন্মোচনের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চান তিনি। ঠিক তখনই তারান্নুম দাঁত চেপে, ঠোঁট শক্ত করে উচ্চারণ করল, “আকবর কাকার লগে তোমার কীসের সম্পর্ক?”
ফাতিমা থমকে দাঁড়ালেন। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। তার চেহারা দেখে মনে হবে, ভিতরের গোপন কোনো দরজায় ঢিল মেরেছে কেউ। কিন্তু গলা শক্ত করে দাঁত কষে বললেন, “মুখ সামলাইয়া কথা কইস, মাইয়া! কারে কি কইতাছোস, খেয়াল আছে তোর?”
“তোমারে আমি আরো একবার দেখছি, আকবর কাকা আসার পর তুমিও চুপিচুপি বনের ভিতর দিয়া বাইর হও। কীসের সম্পর্ক তোমার লগে তার? সত্য কও।”
ফাতিমার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মুখ খুলতে পারছেন না, শুধু অভিযুক্তের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। ঢোক গিলে গলা পরিষ্কার করে কেবল বললেন, “তোরে… তোরে আমি বুঝাইয়া কইতাছি, মা। আয়, একটু নিড়ায় কই।”
কিন্তু তারান্নুম দম নিতে নিতে এবার আর সহ্য করল না। চোখ লাল হয়ে উঠেছে রাগে। গলার স্নায়ু টান টান করে চেঁচিয়ে উঠল, “আমি জানতে চাই—তোমার আর ওই ব্যাটার মধ্যে ইটিসপিটিস চলে কিনা!”
কথাটা মুখে আসতেই যেন বোমা ফাটল ঘরের আঙিনায়। ফাতিমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তার হাত পড়ল মেয়ের গালে। চড়টা এতই অপ্রত্যাশিত, এতই জোরালো ছিল যে তারান্নুমের গালের ফর্সা রঙে ফাতিমার পাঁচ আঙুলের দাগ তীব্রভাবে স্পষ্ট হলো। মাথা ঘুরে উঠল তারান্নুমের। চোখ থেকে জলের ধারা ছুটল। অসহায়ের মতো মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
ফাতিমার বুকের ভেতরটা দপদপ করে কাঁপছিল। মুখ শক্ত করে, গলা ভার করে বলে উঠলেন, “ওইটা তোর বাপ হয়, ছেমড়ি।”
অবশেষে নির্মম সত্য উদ্ঘাটিত করতেই হলো মেয়ের সামনে। জীবনে প্রথমবার কন্যার প্রতি শারীরিক আঘাত হানার তীব্র অনুশোচনায় তার অন্তঃকরণে নিঃশব্দ ক্ষরণ বয়ে গেল। তবুও নিশ্চুপ নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের পানে।
তারান্নুম বিস্ময়ে স্তব্ধ। এমন কিছু কল্পনার পরিধিতেও ছিল না তার। সে যেন বুঝতেই পারছিল না—কী শুনল এইমাত্র!
কণ্ঠে একগুচ্ছ প্রশ্ন জমে থাকলেও মুখ দিয়ে বের হলো মাত্র একটা বাক্য, “কি কইলা তুমি?”
ফাতিমা এবার চোখ নামিয়ে ফেললেন। ভাঙা স্বরে বললেন, “আকবরের লগে অনেক আগেই আমার নিকা হইছে। তোগো কইবার সুযোগ মিলে নাই। এহন থেইকা ওনারে বাপ ডাকবি। ঐদিকটায় চল, লক্ষ্মীটা। আমি তোরে সব বুঝাইয়া কইতাছি।”
তিনি আলতো করে হাত তুলে মেয়ের গালে যে দাগ বসিয়ে দিয়েছিলেন, সেখানে মমতা ছোঁয়াতে চাইলেন। কিন্তু তারান্নুম সেই হাত এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল, “আমি মানি না। আমি মানি না তারে বাপ হিসেবে। বুঝবার পারছো? আমি মানি না।”
মেয়ের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান শুনে মুহূর্তে ভেঙে পড়লেন ফাতিমা। চোখে বোবা অনুশোচনা নিয়ে তিনি ধীরে বললেন, “আমি তোরে বুঝামু, মা। উনি আমার স্বামী হয়, তাই এমন কইরা কইতে হয়…”
কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই তারান্নুম দাঁত চেপে বলে উঠল, “উনি তোমার স্বামী হইতে পারে, কিন্তু আমার বাপ না। আমার বাপ মরছে। আর বছরের পর বছর আমিন ধইরা যার জন্য কান্না করছি আমি, তারে কেউ রিপ্লেস করতে পারবো না। তুমি আমার সেই মরা বাপের প্রতি এতটা বেঈমানি কেমনে করলা, মা?”
তার গলার ধ্বনি রাগে, যন্ত্রণায়, ঘৃণায়, বঞ্চনায় কাঁপছিল। তবুও সে কান্না থামায়নি, কিন্তু মাথাও নীচু করেনি। অথচ ফাতিমা মুখ নামিয়ে ফেললেন। তার ভেতরে যা ছিল, আজ তা প্রকাশ পেয়েছে—সেই নগ্নতা ঢাকার মতো কোনো শব্দ আর তার মুখে রইল না।
মায়ের মুখে কোনো জবাব না পেয়ে, ভিতরে জমে ওঠা চাপা অভিমান নিয়ে ওড়নাটা গায়ের এক পাশে জড়িয়ে নিল তারান্নুম। তারপর তাড়াহুড়ো করে দরজার দিকে পা বাড়াতেই চোখে পড়ল আম্বিয়া অনড় ভঙ্গিতে তসবি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
তিনি যে সব শুনেছেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ রইল না। তার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তারান্নুমের চোখ থেকে কান্নার ফোঁটাগুলো ঢাল হয়ে ঝরতে লাগল। ওড়নার প্রান্ত দিয়ে তা মুছতে মুছতে নিজের ঘরের দিকে ছুটে গেল। দরজা আটকে নিজেকে সেই কক্ষে আবদ্ধ করল। তারান্নুম বিছানার এক কোণে বসে, দু’হাত মুঠো করে কটমট করে বলে উঠল, “যারে আমি কাকা মনে কইরা মাথার ওপর জায়গা দিছি, তারে কোনোদিনও বাপ মানুম না। না, মানুম না আমি! তার মানে জীবনের কতগুলা বছর মিথ্যারে বিশ্বাস করছি আমি! ঠকাইলা তুমি আমগো, মা…”
তার কণ্ঠ ক্রমশ কর্কশ হয়ে উঠলো, কিন্তু চোখের পানি এক বিন্দুও কমল না। বুকের ভেতরে শুধু হাহাকার বইছে।
ঘরের চৌকাঠে কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন আম্বিয়া৷ তিনি গভীর কণ্ঠে বললেন, “এত্ত বড় সোমত্ত মাইয়ার গায়ে হাত তুললি?”
ফাতিমা তখনো মাটির দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে চৌকাঠে বসে ছিলেন। কথাটা কানে যেতেই তার কাঁধটা এক ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন মায়ের দিকে। আম্বিয়ার চোখের দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায়—এই চেহারায় ক্ষমা নেই, করুণা নেই, আছে শুধুই বিচার। তসবির পুঁতির মতো তার চোখে গুনে গুনে জমা হচ্ছে প্রশ্ন।
ফাতিমা দাঁড়িয়ে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে আম্বিয়ার কাঁধে হাত রাখলেন। গলায় ব্যাকুলতা এনে বললেন, “আম্মা… আম্মা গো, আমারে তুমি ভুল বুইঝো না। আমি… আমি তোমারে সব কইতাছি…”
আম্বিয়া পেছনে এক পা সরে কাঁধটা ঝেড়ে নিলেন, যেন অপবিত্র কিছু লেগেছে শরীরে। তারপর গলা গাঢ় করে বললেন, “কবে করছস এই কাম?”
একটা প্রশ্ন, অথচ এর ভার ছিল পাহাড়সম। ফাতিমা মুখ নামিয়ে, প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “রমজান মারা যাওনের পরদিনই।”
কথাটা এমন সহজ, এমন নির্লজ্জ স্বাভাবিকতায় উচ্চারিত হলো যে, আম্বিয়ার চোখে তৎক্ষণাৎ প্রবল সন্দেহের ঢেউ খেলে গেল। চোখ কুঁচকে উঠল। স্বামী মরার পরের দিনই যদি স্ত্রী কারও সঙ্গে নিকাহ পড়ে, তার মানে তো সম্পর্ক আগে থেকেই গড়ে উঠেছিল! এই কথার ভেতরে যে পচা গন্ধ লুকানো রয়েছে, সেটা ঢেকে রাখা যায় না; আম্বিয়া তা বুঝলেন।
হাত বাড়িয়ে ফাতিমার কবজি চেপে ধরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, “এদিকে আয়।”
আর একটাও শব্দ না বলে তাকে নিয়ে বাগানের দিকে যেতে শুরু করলেন। এতটা প্রবলভাবে হাঁটছেন যে পায়ের নিচে খসখস আওয়াজে পাতা ভাঙছিল।
অন্যদিকে তারান্নুম বিছানায় হাঁটু মুড়ে বসে ছিল। তার নাক, গাল ফুলে উঠেছিল, চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল কান্নায়। ওড়নার প্রান্ত ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছিল। বুকের ভেতরটা এমন ভারী লাগছিল যে নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। ঠিক এমন সময়ই হঠাৎ ফোন থেকে একটানা মেসেজের শব্দ কানে আসল। অকস্মাৎ চমকে উঠল সে। চোখ বড় হয়ে গেল। সজাগ চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল ফারহানের মেসেজ এসেছে।
এত সকালে! তারান্নুম ঘড়ির দিকে তাকালো। বাংলাদেশে সকাল ছয়টা বাজে। দুবাইতে তাহলে এখন হয়ত মাত্র চারটা বাজে। এই অসময়ে ফারহান কেন?
সে হাতে ফোন তুলল। স্ক্রিনের আলোয় তার ফুলে থাকা চোখ দুটো একদম উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। মেসেজ খুলে দেখল সেখানে লেখা, “কি জানি, কখন আমার কুইনের ঘুম ভাঙবে! অথচ তার চিন্তায় আমার ঘুম ভেঙে গেছে।”
অবিচল দৃষ্টিতে বার্তার দিকে তাকিয়ে রইল তারান্নুম। কিছুক্ষণ আগেই নেমে আসা এক অপার আঘাত এখনো তার ভেতরে ধ্বনিত হয়ে চলেছে, আর ঠিক এই সময়েই এমন কোমল শব্দের আদর—এটা তার কাছে বেমানান ঠেকল। তাই বার্তাটায় থাকা রোমান্টিকতার মায়াজাল তাকে স্পর্শ করল না একটুও। সে নিস্পৃহ হাতে ফোনটি আগের জায়গায় রেখে নিঃশব্দে বসে রইল।
তবে ফারহান লক্ষ করল, সে বার্তা ‘সিন’ করেছে। ল্যাপটপ বন্ধ করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল, “আশ্চর্য! আমার ঘুমকাতুরে গোবরচারিনী এখন জেগে আছে?”
তারপর কপালের ভাঁজ গভীর করে একটু থেমে সংযোজন করল, “তবে সিন করে রিপ্লাই না দেওয়াটা দণ্ডনীয় অপরাধ। কুইন, এখন তোমাকে আমার জেলে বন্দী করা থেকে কে আটকাবে?”
এ কথা ভাবতে ভাবতে আরেকটা মেসেজ পাঠাল সে, “হেই মাই গ্লিমার, চুপ আছো কেন? রিপ্লাই দিচ্ছ না যে…”
আবারও টুন শব্দে কেঁপে উঠল তারান্নুমের ফোন। কান্না কিছুটা থেমে এল, কিন্তু এবার আর আবেগে নয়, রাগে। চোখে আগুন জ্বলতে লাগল যেন। ঠোঁট কামড়ে ফোনটা হাতে নিল। টুকরো টুকরো ক্ষোভ জমে গিয়ে একটা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় রয়েছে।
ফোন খুলে দেখল, আগের মতোই নরম, বেহায়া শব্দে মেসেজ সাজানো। তারান্নুমের ধৈর্যচূড়ান্তে গিয়ে পৌঁছাল। এবার আর না, এবার সে উত্তর দেবে। এমন এক উত্তর, যাতে ওর হৃদয়ের মায়াজাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। কিড়মিড় করে ফোনটা শক্ত করে ধরে টাইপ করতে শুরু করল। কিন্তু ঠিক তখনই স্ক্রিনটা কেঁপে উঠল।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল—‘বজ্জাত ব্যাটা কলিং…’
কলটা রিসিভ করেই সে গরম ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠল, “মাথায় কি ছিট আছে আপনার? সিন কইরা রিপ্লাই না দেওয়ার মানে বুঝেন না? তাও কল দিতাছেন ক্যান? আপনার প্রেম-পিরিতি রাখেন নিজের জন্য। আমার মোটেও আপনার সাথে কথা কওয়ার ইচ্ছা নাই। আর আমারে কল দিবেন না।”
ফারহান অনুধাবন করল, আজ হয়ত তারান্নুম প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত অথবা চরমভাবে বিমর্ষ। তাই প্রতিক্রিয়ায় রাগ না দেখিয়ে সে যুক্তিসঙ্গতভাবে বোঝানোর প্রস্তুতি নিল। এদিকে কল কেটে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারান্নুম আঙুলটা তুলতেই ফারহান তড়িৎ গতিতে বলে উঠল, “কুইন… কুইন প্লিজ, ওয়ান সেকেন্ড…”
তারান্নুমের আঙুল থেমে গেল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিজের রাগকে ভিতরে পুরে রাখতে চেষ্টা করল। অবশেষে দম নিয়ে ফোনটা আবার কানে লাগাল। গলার ধরণ এবারও বদলায়নি, “ফাজলামো লাগাইছেন? আবার কুইন? শোনেন, আপনি আমার জীবন থেইকা সইরা যান। আমি আপনারে বিয়া করতে পারুম না। আমি আপনার জন্য না, আপনি আমার জন্য না। আমি আপনার স্ত্রী হওয়ার যোগ্য নই—এ কথা আপনারেই নয়, নিজেরেও বহুবার বলছি। আপনি একটা মর্যাদাসম্পন্ন, উৎকৃষ্ট নারীকে বিয়ে করুন। আমার জীবন থেকে আপনার প্রস্থান চূড়ান্ত। আমারে আর কখনো কল করবেন না, কথাটা মনেপ্রাণে গাঁইথা নেন। আর যদি দেন, আমি নম্বর ব্লক কইরা দিব।”
ফারহানের বিমর্ষ মুখচ্ছবিই বলে দিচ্ছিল, কথাগুলো তার মর্মে কতটা আঘাত করেছে। তবুও সে নিজেকে সংবরণ করে গম্ভীর স্বরে বলল, “আমাকে কি একটুও বলার সুযোগ দেবে না তুমি?”
“যা বলার জলদি বলেন। সময় নেই আমার।”
ফারহান ঠান্ডা গলায় বলল, “ভিডিও কল দিচ্ছি, রিসিভ করো।”
তারান্নুম চোখ কুঁচকে তাকাল। গলায় ঝাঁজ নিয়ে বলল, “আপনি তো দেখি এক্কেবারে পাগল। আপনার কি ধারণা আমি এহন প্রেম-ভালবাসার মুডে আছি?”
“আমি প্রেম করার জন্য বলিনি।”
“তাইলে?”
“আগে ধরো কলটা। তারপর দেখাচ্ছি।”
তারান্নুমের অন্তর্গত রাগ যেন হাতের তালু জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল ফোনটা ছুঁড়ে মারতে দেয়ালে। তবু না চেয়ে থাকতে পারল না। মনের ভেতর একটা কৌতূহল তাকে রিসিভ বাটনে হাত রাখতে বাধ্য করল।
ভিডিও চালু হতেই ফারহানের চোখে পড়ল তারান্নুমের লাল হয়ে ওঠা চোখ, আর গালের ঠিক বাঁদিকে উজ্জ্বল আঙুলের চিহ্ন। যেটা অবিন্যস্ত চুলের আড়ালে লুকানোর গোপন চেষ্টা চলছে। ফারহানের চোখেমুখ এক মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠল, সে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “কি হয়েছে, কুইন? কে মেরেছে তোমাকে? বলো, কে সাহস করল তোমাকে ছোঁয়ার?”
“শুনে কি করবেন আপনি?” তারান্নুমের ঠোঁট কাঁপল।
“এখনই গিয়ে কবরে শুইয়ে দিয়ে আসব তাকে।”
তারান্নুম না চাইতেও একটা ক্লান্ত, বিদ্রুপ মেশানো হাসি দিয়ে বলল, “মুখ সামলাইয়া কথা বলেন। মারছে আমার মা।”
ফারহান অনুশোচনায় জিভ কেটে চোখ মুদে নিল। এই প্রতিক্রিয়ার নেপথ্যে পারিবারিক কোনো গহিন ক্ষতই হয়ত রয়েছে। যেহেতু সে এখনো এই পরিবারে আত্মীকভাবে স্বীকৃত নয়, তাই মা-মেয়ের মধ্যকার স্পর্শকাতর বিষয়ে মতপ্রকাশ করা তার অনুচিত। তাই প্রসঙ্গ এড়িয়ে একটু থেমে হেসে বলল, “ওপস! সরি, কুইন। শ্বাশুড়িমাকে সালাম জানাবে। কিন্তু আমি তোমার গালের ওই লালচে দাগটা একদম সহ্য করতে পারছি না। ইচ্ছে করছে এখুনি বাংলাদেশে উড়ে গিয়ে ওই দাগটা চুমু খেয়ে মুছে দেই।”
তারান্নুম চোখ গরম করে বলে উঠল, “বদের বাচ্চা বদ! কি দেখাইবেন বলেন জলদি।”
ফারহান নিঃশব্দে হাসল। ক্যামেরার ফ্রেমটা সামান্য কাঁপতে কাঁপতে একটা ঘরের দরজার সামনে থেমে গেল। হ্যান্ডেল চেপে দরজাটা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যামেরার উলটো বাটনে চাপ দিল সে।
তারান্নুমের চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল। দৃষ্টিপথে ধরা দিল এক স্বপ্নের রাজ্য। পুরো ওয়াক-ইন ক্লোজেট সাজানো শাড়ির ঢিবি দিয়ে। বেনারসি, জামদানি, কটন, তসর, গরদ—এত এত শাড়ি যে তারান্নুম হয়ত গুনেও শেষ করতে পারবে না৷ পাশে স্তরে স্তরে সাজানো লেডিস ব্যাগ, চোখ ধাঁধানো দামি হিল, জুতো আর পারফিউমের সারি। এক মুহূর্ত যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল তারান্নুম।
ফিসফিস করে বলে উঠল, “হায় আল্লাহ! এত্ত শাড়ি… এত্ত ব্যাগ কার লাইগা?”
ফারহান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল, “আমার বউয়ের লাইগা…”
তারান্নুম মুহূর্তেই শিরদাঁড়া সোজা করে চোখ কুঁচকে তাকাল, “কিহ! মানে? আপনি ম্যারিড?”
ফারহান ভ্রূ একটুখানি নাচিয়ে বলল, “হুম। এই যে কথা কইতাছি, এইটাই আমার ফিউচার ওয়াইফ।”
তারান্নুম থতোমতো খেয়ে গেল। সংকোচে লাল হয়ে উঠল গাল। মুহূর্তের মধ্যে চোখের পানি, রাগ, অভিমান—সব গলে গিয়ে ঠোঁটের কিনারা নরম হাসিতে পরিণত হলো। সে মুখ নামিয়ে রাখল।
ফারহান ক্যামেরা ঘুরিয়ে নিজের মুখের দিকে নিল। দুষ্টুমি চোখে হাসিমুখে বলল, “এই যে লাজুক মুখখানা দেখছি, এটুকুই তো আমার বাঁচার জ্বালানি। গোবরচারিনী, তুমি জানো না কীভাবে তুমি আমাকে দিনে দিনে নিঃশেষ করে দিচ্ছো। কারান এমনিতেই প্রতিনিয়ত আমার বিয়ের তৃষ্ণা দ্বিগুণ করে তুলছে। দেখবে একদিন কোনো নোটিশ না দিয়েই তোমার দুয়ারে এসে উপস্থিত হব! এরপর সোজা বাসর…”
তারান্নুম চোখ উল্টিয়ে বলল, “বাসর মানে? আগে বিয়া করবেন না নাকি?”
ফারহান ভ্রূক্ষেপে হেসে বলল, “উল্লাহ বাবা! বিয়ে করার জন্য আমার বউ দেখি উত্তেজিত হয়ে আছে।”
এ কথায় তারান্নুম আরও রাঙা হয়ে গেল। ঠোঁটে একরাশ চাপা হাসি ফুটে উঠল। দৃশ্যটা দেখে ফারহানের হাসিও চেপে রাখা কঠিন হয়ে পড়ল।
একটু থেমে তারান্নুম কৌতুকে বলল, “আপনি কি আমারে ব্যঙ্গ করছেন, না কি আমার ভাষার অনুকরণে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন?”
“তোমার কাছ থেকেই তোমার ভাষা শিখে নিয়েছি, মাই গ্লিমার!”
তারান্নুম এক ফালি হাসি নিয়ে বিছানার হেডবোর্ডের কাছে গিয়ে মাথা ঠেকিয়ে বসল। ফারহান আবারও রসিকতা করে বলল, “এই যে বেবি, ‘মাই গ্লিমার’ নামটা কেমন লাগল?”
“বলতাম না।”
ফারহান চোখ কুঁচকে বলল, “ঘাড়ত্যাড়া কুইন আমার।”
তারান্নুম ঠোঁটে হাসি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করল। ফারহান বলল, “তোমার হ্যাকার বফ কিন্তু বাইক রেসারও। ভাবছি বাংলাদেশ গিয়ে তোমাকে পিছনে বসিয়ে পুরো পৃথিবীটাকে ঘুরিয়ে দেখাব।”
“হাহ্! এই কথা তো সব প্রেমিকই বলে, পৃথিবী দেখাবে! পৃথিবী বুঝি আপনার পিতৃদত্ত সম্পত্তি!”
ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আহ্! দিলে তো আমার রোমান্টিক মুডে পানি ঢেলে!”
তারান্নুম মুখ টিপে হাসল। ফারহান তখন নরম স্বরে বলল, “তুমি জানো না, তোমাকে ঘিরে আমি কত স্বপ্ন বুনেছি! যেটার একটিরও বাস্তবায়ন এখনো হয়নি, অথচ তুমি প্রতিদিনই আমার স্বপ্নের ঠিকানায় নতুন প্রদীপ জ্বেলে দাও।”
তারান্নুম ভেংচি কেটে চোখ সরু করে বলল, “হয়েছে, এবার দয়া করে কল কেটে দিন।”
ফারহান ভ্রূ উঁচিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “উঁহুঁ, আরও একটা সারপ্রাইজ বাকি আছে।”
তারান্নুম কপাল কুঁচকে বলল, “আবার কি?”
হঠাৎই ফারহানের চোখের ভাষা পাল্টে গেল। মুখে নেশালো ঘোর, ঠোঁটের কোনে সম্মোহনী হাসি ফুটে উঠল। ক্যামেরার এ-পার থেকে ওভাবে চেয়ে থাকায় তারান্নুমের বুকের গভীরে কোথাও কেমন একটা অস্বস্তি দোলা দিল। সে কাঁধ সোজা করে, ঠোঁট শক্ত করে কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই ফারহান ঠোঁট গোল করে আচমকা একটা উড়ন্ত চুমু ছুঁড়ে দিল ক্যামেরায়।
তারান্নুমের চোখ দুটো চড়কগাছ। সে হতভম্বভাবে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনে। ফারহান আড় হাসল। ক্যামেরার কাছে মুখ এনে নরম কণ্ঠে বলল, “তোমাকে আজকে কেমন যেন বউ বউ লাগছে, কুইন।”
তারান্নুম এবার রাগে ফুঁসতে লাগল। দাঁত কামড়ে বলল, “হ্যাকাইরা হালা! তোর ঠোঁট যদি না ছিঁড়ছি, আমার নাম তারান্নুম না!”
ফারহান হেসে দুই হাত মাথার ওপরে তুলে আলসে আড়মোড়া ভাঙল।
“অনেক দিন চুমু খাই না, মাই গ্লিমার। ঠোঁট দুটো কেমন কেমন করছিল…”
তারান্নুম চট করে বলল, “অনেক দিন চুমু খান না মানে? আগে খাইছেন নাকি?”
ফারহান জিভ কেটে মাথা চুলকাতে চুলকাতে গলায় একটু খাঁকর দিল। চোখের দৃষ্টি এদিক ওদিক ছুঁড়ে দিয়ে আনমনে বলল, “খাইছে রে! একে এখন কেমনে বুঝাই যে শুধু চুমু না, আরো অনেক কিছুই খাওয়া হয়ে গেছে।”
তারান্নুম চোখ সরু করে বলল, “কি হলো? বলছেন না কেন?”
ফারহান কাশির শব্দ করে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, “মা-বাবাকে ছোটবেলা অনেক চুমু খেয়েছি, আর এখন তো বউকে খাওয়ার পালা।”
এই কথায় তারান্নুমের চোখে বিদ্যুৎ চমকালো যেন। সে একপাশে মুখ ফিরিয়ে মুচকি মুচকি হেসে নিজের লাল গাল দুটো ঢাকতে চাইল। কিন্তু ততক্ষণে গালের রং টকটকে গোলাপের পাপড়ির ন্যায় হয়ে উঠেছে। ফারহান কথার মোড় পালটে বলল, “তোমার ভাই ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে না?”
“তারা এখন কিছুদিনের জন্য ঢাকাতে আছে। থাকুক কিছুদিন, তারপর করাইয়া দিব ভাই ভাবির প্যাকেজ প্রেজেন্টেশন।”
ঠিক তখনই তারান্নুমের গালে একটা মশা বসে গেল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারহান চিৎকার দিয়ে উঠল, “এই কুইন! মারো মশাটাকে! মেরে ফেলো জলদি, ও আমার খাবারে ভাগ বসাচ্ছে।”
তারান্নুম চোখ বড় করে তাকাল।
“কীসের খাবার?”
ফারহান ঠোঁট কামড়ে হাসল, “তোমার গাল… ওটা তো আমার মেন্যুতে বুকিং করা। মশাটা কীভাবে ঢুকলো ওখানে!”
তারান্নুম খিলখিল করে হেসে উঠল। অথচ ফারহানের মুখে তখন রীতিমতো এক বিদ্রোহের ছাপ। সে চোখ কুঁচকে বলল, “জা’নোয়ার মশা! তোর কলিজা ছিঁড়ে মাছির বাচ্চাদের ডিনারের আয়োজন করব আমি। বেয়াদব কোথাকার! মা-বাপ শিক্ষা দেয়নি তোকে? অন্যের বউকে চুমু খাস? তোর নিজের বউ নাই?”
তারান্নুম হাসির ঢেউয়ের আঘাতে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল, আর ফারহানের তীক্ষ্ণ উপহাস অব্যাহত থাকল, “তুমি এসব মূর্খ, অর্ধ-সভ্য মশাদের সঙ্গে বাস করো? ঘরের শত্রু বিভীষণ! তুমি সহ্য করো কি করে এদের? মালকিনের গালে কামড় দিয়েছে, দাঁতগুলো এক এক করে ভেঙে গুঁড়ো করে দাও, বেবি!”
তারান্নুমের হাসির তোড় এবার এমন তীব্র হলো যেন হাসতে হাসতেই দমবন্ধ হয়ে যাবে তার। তার হাসির উচ্ছ্বাস দেখে অবশেষে ফারহান নিজেও হেসে উঠল।
Tell me who I am 2 part 6
আসলে তারান্নুম আজ বিষণ্ন ছিল, ভেতরে জমে ছিল অভিমান; তাই ফারহান সেই বিষণ্নতাকে হাসির রোদের নিচে শুকিয়ে তুলল। এভাবেই দুষ্টু-মিষ্টি কথোপকথনের মাধ্যমে তাদের সময়টা কেটে যেতে লাগল…
অন্যদিকে বাড়ির পেছনের বাগানে ছিল এক আতঙ্কভরা পরিবেশ। আম্বিয়া ফাতিমার হাত ধরে টেনে সিমেন্টের পুরোনো বেঞ্চে বসালেন। তারপর চোখে-মুখে কঠোরতা জড়ানো ভঙ্গিতে বললেন, “আর রমজানরে কি করছস?”
ফাতিমা চোখ না সরিয়েই নির্ভীক গলায় জবাব দিলেন, “তুমি যেমন তোমার স্বামীরে খু*ন করছো, তেমন আমিও করছি।”
