Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৩

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৩

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৩
সুরভী আক্তার

ভোরের শান্ত পরিবেশ আজ অশান্ত । ফজরের আগে থেকেই চেঁচামেচি বাইরে । এখনো অন্ধকারে আচ্ছন্ন আশপাশ । আলো ফোটেনি । আজান ও পড়েনি এখনো । এর আগেই, পুরুষালি কন্ঠের ঘ্যাসঘ্যাসে কান্নার শব্দ কর্নপাত হচ্ছে মাঝে মাঝে । কেউ কেঁদে উঠছে থেমে থেমে । কান্নার সাথে সাথে অনেকের একাধিক চাপা স্বর ।
আফতাবের বাবা বাইরে বেরোলেন । মানিক ওর বাড়ির বাইরে চার হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে বসে আছে । চেহারার অবস্থা নোংরা, ভেজা কর্দমাক্ত । রাতে আবছা শীত পড়ে এখনো । মধ্যরাতের আগে ওকে কেউ বাড়ির সামনে ফেলে গেছে । অর্ধ জ্ঞানহীন হয়ে সারা রাত বাড়ির বাইরে মাতাল হয়ে পড়ে ছিলো মানিক । সারারাত ভেজা ঝিরিঝিরি শীত পড়েছে গায়ের উপর । ধুলো বালি লেগে এখন শরীরের অবস্থা কর্দমাক্ত প্রায় । ভোরের আগে যখন হুশ ফিরল , নেশা কাটলো একটু , তখন থেকেই এভাবে হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে উঠছে মানিক । আশেপাশের সবাই জড়ো হয়ে গেছে ওর কারবারে । মানিক কিছু বলছে না , নেশা পুরোপুরি কাটেনি । কাল ও নেশাগ্রস্ত থাকলেও আবছা আবছা সবকিছুই মনে আছে কালকের ঘটনা ।

কেউ ওকে তুলে নিয়ে গেছিলো । মুখ, মাথা বেঁধে রেখেছিলো । নেশার ঘোরে যা মনে পড়লো , তাতে কেউ ওর সব সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়েছে জোর করে । টিপ সই নিয়েছে কোনো দলিল নামায় ‌। মানিকের সম্প্রতি বলতে এই ভিটে মাটি টুকু । আর কিছু নেই । আফতাব দের জমির পাশে একটা জমি ছিলো , সেটাও বিদেশ থেকে ফিরে বেঁচে খেয়েছে মানিক ।
মানিক আহাজারি করে বিড়বিড় করছে টলতে টলতে…
” গেলো রে , গেলো ।
আমার বাড়ি, ঘর, ভিটে ,মাটি সব গেলো । ডাকাইত শশুর সব নিয়া নিলো আমার । ডাকাইত শশুর শেষে কিনা নিজের মাইয়ার সংসারে ডাকাতি করলো । ওরে, আমি এহন কই যামু ?
কেউ শুনেও পাত্তা দিচ্ছে না ওর কথায় ।

হারামজাদা নেশায় টাল হয়ে ভুংভাং বকছে । এটাই সবার ধারণা । একে একে ওর নেশাগ্রস্ত আহাজারি শুনে মুখ ফিরিয়ে বিদায় হচ্ছে সকলে । মানিকের মা ছেলে কে বেশ কবার টেনে টুনে তোলার চেষ্টা করলেন । এতো বড় দামড়া ছেলে কে এভাবে ভার ছেড়ে দিলে সামলানো যায় নাকি ? বিরক্ত হয়ে বুড়িও ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিলেন মাতাল টাকে । মদ গেলা নিয়ে কটাক্ষ করে বকবক করতে করতে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন মানিকের মা ।
মালেকা দেউড়ির কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাটক দেখছিলো । সকলে বিদায় নিতেই সেও মুখ বাঁকালো । আফতাবের বাবা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে তিনিও বাড়িতে ঢুকলেন । দেউড়ির কাছে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুটিয়ে এই বিরল মজার দৃশ্য দেখতে আফতাব ও বাদ পড়লো না । এতো সকালে ঘুম ছুটিয়ে এই দৃশ্য দেখতে এসেছে ও ।
আফতাবের বাবা ছেলে কে পাশ কাটিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন । মানিক চোখ বুজে মাটিতে পড়ে আহাজারি করছে মহিলাদের মতো । দাপিয়ে কাঁদছে সে । আফতাব ঠোঁট কামড়ে ফিক করে হাসলো । মাটিতে থুথু ছুড়ে বাড়িতে ঢুকলো ও ।
হাই তুলে গা মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলো । খালেদা সবে উঠলেন । আফতাব খিড়কি লাগিয়ে এসেছে ‌। খালেদা বাইরে যেতে নিলে কড়া ভাবে নিষেধ করলো আফতাব । অতঃপর ঘরে ঢুকলো সে । দরজা লাগিয়ে পিছু ফিরলো । খাটের উপর শুয়ে আছে ময়না । প্রথমেই নজর পড়লো ওর দিকে । ওখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে কিছুটা সময় ঘুমন্ত ময়না কে নীরব থেকে পরখ করলো আফতাব । ময়নার ছোট্ট মস্তিষ্কের সুখকর চিন্তা গুলো ধ্যানে আসতেই চোখে পলক পড়লো । দৃষ্টি সরালো আফতাব ।

ময়না ছোট , নাদান সে । সে বুঝলো না আফতাব সব বুঝেছে । ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর আফতাব যে সবটা জেনে গেছে , সেটা কল্পনাও করলো না ময়না । আফতাব সবার মতোই একই বুঝ বোঝালো ময়না কেও । শরীরের দূর্বলতার জন্য অজ্ঞান হয়েছিলো ময়না । এটাই জানলো সকলে । ময়না ও এটাই জানলো ।
আফতাবের কেমন অদ্ভুত লাগছে । অপরাধ বোধ হচ্ছে । অনুতপ্ত লাগছে । ও কি পারতো না এসব আটকাতে ? ময়না যা করেছে , তা থেকে উদ্ধার করতে । ময়নার যদি বেশি কিছু হয়ে যেতো ? অবুঝ পনায় যদি নিজের ক্ষতি করে ফেলতো ময়না , তাহলে কি হতো ?
ওর তো ছোট্ট প্রাণটা সংশয়েও থাকতে পারতো ‌। কোন বুঝে এতো বড় ঘটনাটা একলা ঘটিয়েছে ময়না ? কাউকে বুঝতে দিলো না কিছু ।
সবে একটা ছোট্ট ভ্রুণ গঠন হতে শুরু করেছিল ওর গর্ভে । আর ও ? সেই ভ্রুণটা ধ্বংস করে দিলো ? কিসের আশায় ? কেনো ? আফতাব ওকে এড়িয়ে যাচ্ছে দেখে , এই বাচ্চার জন্য ওদের সম্পর্কে অবনতি ঘটবে , এই ভেবে ?
ময়না এতো বুঝদার ?
আচ্ছা, আফতাব ওকে এড়িয়ে চললো কেনো ? ওর একটু পরিবর্তনের জন্য ময়না এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে । এতো বড় কান্ড ঘটিয়েছে । আফতাবের কি অনুতপ্ত হওয়ার কথা নয় ?
অনুতপ্ত আফতাব , ভীষণ অনুতপ্ত । নিজের উপর চরম ক্ষুব্ধ হচ্ছে ও । কাল থেকে সংযত করছে নিজেকে ।
ও তো মনকে বুজিয়েছিলো , কিন্তু মানাতে পারে নি । মানাটা সহজ হলে হয়তো মানাতে পারতো । মেনে নেওয়া টা খুব কঠিন ছিলো কি ? হয়তো ছিল ।
কিন্তু এখন ? এখন কি হলো ? এখন এটাও মানতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেনো ?
মাথা ঝাঁকায় আফতাব । খানিক ক্ষণ চেপে ধরে রাখে মাথাটা । ঘুম হয় নি । ঘুমোতে হবে । ও আর একবারও ময়নার দিকে চোখ তুললো না । মেঝেতে পেতে রাখা নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লো । কপালের উপর আড়াআড়ি হাত রেখে মুখ আড়াল করলো‌ । ঢোক গিলে চোখ বুজলো অতঃপর ।

আজ সকাল সকাল শ্যামা কে নিয়ে বেরিয়েছে সংগ্রাম । শ্যামা বেজায় খুশি । সংগ্রাম গাড়ি চালানোর মাঝে মাঝে মিটিমিটি হাসছে ওকে দেখে । ওরা রওনা দিয়েছে সুখের নীড়ের উদ্দেশ্যে । বাড়িতে এ কথা জানায় নি সংগ্রাম । বেরিয়ে এসেছে শ্যামা কে নিয়ে । গাড়ি চলছে মুকুন্দপুরের দিকে । জমিদার গ্রামের পর একটা গ্রাম পেরোলে মুকুন্দপুর গ্রাম । এঁকেবেঁকে রাস্তায় গাড়ি চলছে ।
অবশেষে রাস্তা ফুরোলো । গাড়ি গিয়ে থামলো একটা বিরাট পুরোনো শ্যাওলা জমা বাড়ির সামনে । অমনি মুখ থেকে হাসি গায়েব হলো শ্যামার । চোখ উঁচিয়ে বড় বড় নেত্রে অবাক লোচনে চাইলো ও । গাড়ি থেকে নেমে ঘুরে এসে শ্যামা কে নামার জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিলো সংগ্রাম । মরচে ধরা বিশাল লোহার গেট ক্যারক্যারে শব্দ তুলে খুলে দিলো কেউ । অমনি ঝটপট করে শ্যামার মাথার ঘোমটা টেনে নাক অবধি ঢেকে দিলো সংগ্রাম । একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে আসলেন গেট পেরিয়ে । শ্যামা দেখার চেষ্টা করলো ঘোমটার আড়ালে থেকে । লোকটার মুখে চওড়া হাসি । হেলে পড়েছে বয়সের ভারে । চোয়াল ঝুলে গেছে ।
লোকটা গদগদ হয়ে আসলেন । সংগ্রাম কে দেখে বললেন হাসি সমেত….

” জমিদার বাবা , আইছো তুমি ?
আমি ঠিক ধরছিলাম , তোমার গাড়ির শব্দ শুইনাই বুইঝা গেছি তুমি আইছো । এই লাইগাই তো ছুইটা আইলাম বিছানা ফেলাইয়া ।
তড়তড়ে স্বর বৃদ্ধর । বৃদ্ধ বলতে প্রৌঢ়া বলা চলে ।
শ্যামা চেষ্টায় সফল হয়ে তাকে এক নজর দেখতে পেলো । সংগ্রাম স্বাভাবিক কন্ঠে বলল….
” ভালো করেছেন ।
” এইটা কে জমিদার বাবা , তোমার বউ ?
” হুম !
” ও মা , কও কি ?
বউমারে লইয়া আইছো ! দেহি দেহি , বউমারে দেহি একটু । ঘোমটা এতদূর টাইনা রাখছো ক্যান বউমা ? উঠাও একটু , দেহি তোমার মুখখানা !
অমনি দৃঢ় কন্ঠে বাঁধ সাধলো সংগ্রাম….
” উঁহু , ও ঘোমটা সরাবে না ।
ওকে দেখতে হবে না আপনার । জীবনে পাপের ভার কম নয় আপনার , অন্যের বউ কে দেখে জেনে শুনে আর পাপ বাড়ানোর প্রয়োজন নেই । ওকে দেখার অধিকার শুধু আমার ।
চড়া গলায় চুপসে যায় বৃদ্ধ ।
হেলে রাখা কোমর সোজা করে খানিক । ইনি দিলশাদ গাজি । দৌলত গাজির বড় ভাই । সংগ্রাম এনাকে অতটা পছন্দ করেন না ।
সংগ্রামের কাঠ স্বরে এই নিয়ে আর কথা বাড়ানোর সাহস পান না তিনি । হাসার চেষ্টা করেন , বলেন…..

” তা বউমারে লইয়া আইছো , আগে কইবা না ? এমনে হঠাৎ আইলা যে ?
” কোনো দিন জানিয়ে এসেছিলাম ? যে আজ জানিয়ে আসবো ? এই আশা করেন কি করে ?
বৃদ্ধ চুপসে যায় আরো ।
শ্যামা কপাল গুটায় । এই বুড়ো লোকটার সাথে সংগ্রাম এভাবে চটচটে গলায় কথা বলছে কেনো ? দৃষ্টিকটু লাগছে এটা !
সংগ্রাম আর পাত্তা দিলো না । শ্যামার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো শক্ত কন্ঠে নমনীয়তা টেনে….
” এসো বেগম ।
নামলো শ্যামা । সংগ্রাম ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো । বৃদ্ধ কে উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে নীড়ের ফটকের দিকে পা বাড়ালো । সম্মুখ থেকে সরতেই রগরগে হয়ে ভাঙ্গা দাঁত পিষলেন বৃদ্ধ ।
শ্যামা কে নিয়ে নীড়ের ভেতরে ঢুকলো সংগ্রাম । শ্যামা ঘোমটা খানিক সরিয়ে এদিক ওদিক পরখ করতেই আঁতকে উঠলো । কি অদ্ভুত আশপাশ । নীড়টা ঠিক জমিদার বাড়ির মতোই বিশাল । তবে ঝকঝকে নয় মোটেও । একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকারের ন্যায় শ্যাওলা জমতে জমতে কালচে হয়ে গেছে দালান কোঠা । গেট পেরিয়ে ভেতরটা পুরোটাই ধুঁ ধুঁ ময়দানের ন্যায় ফাঁকা । যেখানে জমিদার বাড়ি নানান গাছের সবুজে আবৃত । ফুল গাছে ঘেরা । সেখানে এই সুখের নীড়ের বাগানের এড়িয়া সম্পুর্ন নিরবিচ্ছিন্ন পাথারের ন্যায় । মাটি খড়খড়ে ।
ফেটে চৌচির । এক বিন্দু জল কনার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে মুখিয়ে আছে যেন ।
শ্যামা অবাক হলো । নীড়ের উঁচু প্রাচিরের বাইরেটা চারদিক থেকেই গাছে গাছে ভরপুর । বাইরে থেকে সবুজ শিতল পরিবেশ। আর ভেতরটা ? ভেতরটা সম্পুর্ন ভিন্ন । ধকধকে পরিবেশ । সূর্য পুরোদমে তেজ ফেলছে এই নীড়ে । যেন সব ক্ষুব্ধতা নিংড়ে দিচ্ছে । বাড়ির উপর গাছ নেই বিধায় এমনটা লাগছে ।
শ্যামা বিষ্ময়ে হা বনলো । চঞ্চল হয়ে এদিক ওদিক তাকালো । কি অদ্ভুত । ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো শ্যামা….

” ছোট জমিদার সাহেব ?
” জ্বি , ডালিয়া !
” এই নীড়ের পরিবেশ এমন , এমন কেনো ?
” কেমন ?
” এমন অদ্ভুত !
” বাড়ির বাইরে কোনো গাছপালা নেই তো , তাই এমনটা লাগছে ! আমাদের জমিদার বাড়ি দেখে দেখে অভ্যস্ত তুমি । তাই অদ্ভুত লাগছে । এই নীড় এমনই । তৃষ্ণার্ত…..
শেষের কথাটা হিসহিসিয়ে বললো ।
সংগ্রাম শ্যামা কে টেনে ভেতরে ঢুকেছে । আরো অবাক হয়েছে শ্যামা । ভেতরটা পরিষ্কার ঝকঝকে । তবে অন্ধকার অনেকটা । প্রত্যেকটা দেয়ালে দেয়ালে লন্ঠন ঝুলছে । লন্ঠনের হলদে আলোয় আলোকিত অন্দর ।
শ্যামার কপালে ভাঁজ পড়লো । থমকে দাঁড়ালো ও ‌। এমন মুহূর্তে এক ভদ্র মহিলা চঞ্চল হয়ে দৌড়ে আসলেন । অতিরিক্ত চঞ্চলা উৎসুক হয়ে গদগদ হয়ে আসলেন তিনি ।

” জমিদার বাবা , তুমি ?
তুমি আইছো ? এই মুহূর্তে !
সংগ্রাম মুচকি হাসলো । বললো….
” হুম । একটু ঘুরতে আসলাম ….
চলে যাবো খানিক পর । ভালো আছেন আপনি ?
” হ হ , খুব ভালো আছি । এইটা তোমার বউ ? জমিদার গিন্নি ? কই দেখি ! মেলা দিন থাইকা দেখোনের ইচ্ছা আছে !
তিনি ঘোমটা সরালেন শ্যামার । শ্যামা অবাক হয়ে চেয়ে রইলো । বুঝতে বাকি রইলো না এই মহিলা দৌলত গাজির স্ত্রী । হাসার চেষ্টা করলো শ্যামা । ভদ্রমহিলা শ্যামা কে মুগ্ধ নয়নে পরখ করলেন । প্রফুল্ল চিত্তে বললেন…..
” মেলা সুন্দর আমাগো জমিদারের গিন্নি । আইজ প্রত্থম দেখলাম ‌। জমিদার বাবা , তুমি হাছা কইছিলা ।
আও মা , বও । অনেক দিন থাইকা তোমারে দেখার ইচ্ছা আছিলো আমার । আও , আও….
শ্যামা কে টেনে একটা বেতের চেয়ারে বসালেন তিনি । গা ছমছম করছে শ্যামার । নিভু হলদে আলোয় গা শিউরে উঠছে মাঝে মাঝে । ভয় জাগছে । ঢোক গিললো শ্যামা । ভয়ার্ত চোখে সংগ্রামের দিকে তাকালো । সংগ্রাম পেছনে হাত গুটিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে । শ্যামা তাকাতেই ভ্রু নাচালো সংগ্রাম ।
হেঁশেলে ভালো মন্দ রান্না হয়েছে বোধহয় । বেশ ভালো খাবারের গন্ধ আসছে । দৌলত গাজি ঘর হতে বেরোতে পারেন না । সিঁড়ি বেয়ে নামতে পারেন না নিচে ।‌ কদিন ধরে বাম পা অবস হয়ে গেছে তার । সংগ্রাম দেখতে আসতে পারে নি ।
সংগ্রাম শ্যামা কে ডাকলো….

” উঠে এসো বেগম ‌। উপর থেকে ঘুরে আসি একবার….
শ্যামা উঠে দাঁড়ানোর আগে বাঁধা দিলেন দৌলত গাজির স্ত্রী । বললেন তিনি…
” বউ মা এইহানে থাক জমিদার বাবা । তুমি যাও ‌, গিয়া আগে দেইখা আহো একবার । পরে যাওয়ার আগে বউমারে লইয়া পুরা বাড়ি ঘুরাইয়া দেখাইয়া লইয়া আইয়ো ।
সংগ্রাম চক্ষু সূক্ষ্ম করলো । মুচকি হাসলেন দৌলত গাজির স্ত্রী । চোখে চোখে কিছু বোঝালেন তিনি । সংগ্রাম দ্বিরুক্তি করলো না । শ্যামা কে আশ্বাস দিয়ে রেখে উপরে উঠলো সে ‌‌। সংগ্রাম যেতেই শ্যামা ভদ্রমহিলার দিকে তাকালো । সংগ্রামের দিকে মহিলার চতুর দৃষ্টি লক্ষ্য করলো শ্যামা । ধারনা সত্ত্বেও আচমকা মুখ খুললো….
” আপনি কে ?
তড়িতে চাইলো ভদ্রমহিলা । হেসে উত্তর করলো….
” আমি ? আমি সুলেখা ! মাতব্বর দৌলত গাজির স্ত্রী ।
শ্যামা এদিক ওদিক চায় । শুধোয়….
” বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই ?
” না ।
কপাল গুটায় শ্যামা । যেখানে গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে । সেখানে জমিদারের অপর বাড়ি , সুখের নীড়ে বিদ্যুৎ নেই ! এটা কেমন অবিশ্বাস্য নয় কি ?
সুলেখা হাসলেন । অদ্ভুত হাসি । মহিলা টাকে বেশ অদ্ভুত লাগছে শ্যামার । সংগ্রামের সামনে শ্যামার আলগা প্রশংসা করলেন তিনি । হয়তো খাতির দেখিয়ে ।
শ্যামা ভারী গলায় প্রশ্ন করলো…

” বাড়িতে কে কে থাকেন ?
” আমি , মাতব্বর মশাই , আর হের বড় ভাই ,মানে আমার ভাসুর ।
” আর কেউ নেই ?
” না ..
” আপনাদের সন্তান ?
মহিলা সতর্ক হলেন । বসে ছিলেন , উঠে দাঁড়ালেন । থমথমে গলায় বললেন কঠিন স্বরে…
” আর কেউ নাই । তুমি একটু বও , আমি হেঁশেল থাইকা আইতাছি ! খাওন চড়াইয়া আইছি…
বলেই চটজলদি মুখ চুরিয়ে জায়গা ত্যাগ করলেন তিনি । যেনো পালালেন এক প্রকার । শ্যামা কে এখানে একা রেখে চলে গেলেন । চোখ সরু করে ওনার যাওয়ার পথে চেয়ে রইলো শ্যামা ।
আর কেউ নেই মানে ? শ্যামার জানা মতে , এ বাড়িতে আরো কারোর থাকার কথা । তাকে দেখতেই তো এতো তেল সিঁদুর লাগিয়ে কাঠ খড় পুড়িয়ে এ বাড়িতে আসা শ্যামার । তাহলে মহিলা মিথ্যা বললেন কেনো ? সত্যিই কি আর কেউ নেই ? নাকি মহিলা কিছু লুকালেন ?
উঠে দাঁড়ালো শ্যামা । মুখো ভঙ্গিমা অদ্ভুত ওর ।
শ্যামা ঘুরে ঘুরে বসার ঘরটা দেখতে লাগলো । বাড়িটা তিন তলা । দোতলার দিকে তাকালে অন্ধকার ব্যতীত চোখে কিছু পড়লো না আর । সংগ্রাম তখন সেই অন্ধকারেই উঠে গেছে । উপরের দেয়ালেও লন্ঠন ঝুলছে । তবে নিচ থেকে বোঝা যাচ্ছে না । অন্ধকার লাগছে উপরটা ।

সারি সারি ঘর অনেক গুলো । মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে সুক্ষ্ম নেত্রে পরখ করলো শ্যামা । অন্দরের এদিকটায় যতগুলো ঘর আছে , সব তালাবদ্ধ । বাড়িতে তো মানুষ নেই , তালাবদ্ধ হওয়ারই কথা । ঘর গুলোর থেকে চোখ সরিয়ে উপরের দিকে তাকালো শ্যামা । সংগ্রাম ওকে একা ফেলে কোথায় গেলো ? কিছুই তো ঠাহর করতে পারছে না শ্যামা । উপর থেকে দৃষ্টি নামতেই সিঁড়ির নিচে দৃষ্টি পড়লো আকস্মিক । অমনি ধক্ করে উঠলো শ্যামা । মিটমিটে অন্ধকারে একটা মানব ছায়ামূর্তি মতো কিছু একটা সিঁড়ির পাশ সরে গেলো তৎক্ষণাৎ । চমকে আঁতকে উঠলো শ্যামা । ছ্যাঁত করে উঠলো বক্ষস্থল । ভীত শ্যামার সর্বাঙ্গ আচমকা কেঁপে উঠলো । অস্ফুটে ভয়ার্ত মৃদু শব্দ উচ্চারণ হলো মুখে । পিছন থেকে শ্যামার কাঁধে কেউ হাত রাখতেই আরো বেশি ভড়কালো শ্যামা । ঝাড়া মেরে কন্ঠ চিরে মৃদু আর্তনাদ করলো । দ্রুত সরে এসে পিছু ফিরলো এক ঝটকায় ।
সুলেখা হাসলেন তৎক্ষণাৎ । বললেন….

” কি হইলো জমিদার গিন্নি । ভয় পাইলা এমনেই ?
হাঁসফাঁস করে শ্যামা । দ্রুত শ্বাস টানে বুকে হাত রেখে ।
” আপনি ?
” হ , আমি ! আমি ছাড়া আর কে হইবো ? বাড়িত তো আর কেউ নাই !
ঢোক গেলে শ্যামা । ঠোঁট ভিজিয়ে ফের সিঁড়ির দিকে তাকায় । ঝিনঝিন শব্দ কানে পড়তেই চোখ বড় বড় করে তাকায় শ্যামা । সুলেখার দিকে ফের ঝটকা মেরে দৃষ্টি পাত করে । সুলেখার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি দেখে গা ছমছম করে ওঠে শ্যামার । গলা শুকিয়ে আসে । সেই ভয়ের প্রবনতা বেড়ে যায় । ঘামতে শুরু করে শ্যামা । ঝিনঝিন শব্দ , নুপুরের শব্দ , কমে আসছে ধীরে ধীরে । হাঁসফাঁস শুরু হয়ে যায় শ্যামার । ঘোলাটে হয়ে আসে চারদিক । মনে হয় চার দিকের দেয়াল ঠেসে ধরছে ওকে । অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করে । চোখের সামনে সুলেখার অবয়ব ঝাঁপসা হয়ে আসে ।
দুহাতে কান চেপে ধরে শ্যামা । চোখ খিচে বন্ধ করে , গলা চিরে চিৎকার দেয়…
” ছোট জমিদার সাহেব …
সংগ্রাম উপরে ছিলো দৌলত গাজির ঘরে । নিজের বেগমের চিৎকারে ছলকে ওঠে ও । সব ফেলে হুড়মুড়িয়ে ছুটে আসে । এলোমেলো পায়ে নিচে নামে । শ্যামা কুঁকড়ে বিড়বিড় করছে কান মাথা চেপে ধরে । সুলেখা সামনে দাঁড়িয়ে ওকে ধরার চেষ্টা করে শান্তনা দিচ্ছে । কোনো কথাই কানে যাচ্ছে না শ্যামার । সংগ্রাম সিঁড়ি বেয়ে নেমেই ভয়ার্ত বিচলিত কন্ঠ উঁচালো….

” বেগম !
সময় পার হলো না । তেড়ে এসে শ্যামা কে আগলে ধরলো সংগ্রাম । সংগ্রামের পরশ পেতেই আর আপন পুরুষের সেই চিরচেনা সুগন্ধির সংস্পর্শে আসতেই দুহাতে শক্ত করে সংগ্রাম কে জাপটে ধরলো শ্যামা । চোখ মুখ খিচে যথাসম্ভব হাতের বাঁধন দৃঢ় করার চেষ্টা করলো । বুকের মাঝে নিজেকে লুকালো শ্যামা । কাঁপছে ওর শরীর । উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো সংগ্রাম । শ্যামার অবস্থা বুঝে ধড়ফড়িয়ে উঠলো । শ্যামা কে জড়িয়ে নিলো শক্ত করে । বললো ধীরে…
” বেগম , কি হয়েছে ? এইতো আমি ? এইযে তোমার ছোট জমিদার সাহেব । আমি আছি , কি হলো তোমার ?
শ্যামা উত্তেজিত । শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বেগতিক । বুক ওঠা নামা করছে তীব্র গতিতে । ওর ভয় বুঝতে বাকি রইলো না সংগ্রামের । এটারই ভয় ছিলো ওর । এ বাড়িতে এসে যদি ভয় পায় শ্যামা , তাইতো এ বাড়িতে আনতে চায় নি ওকে । শ্যামা কে এখানে রেখে উপরে যাওয়া টা ভুল হয়েছে সংগ্রামের । মুহুর্তেই চোখ মুখ ক্ষুব্ধ করলো সংগ্রাম । ক্ষেপাটে স্বরে বজ্র ধমক দিলো সুলেখার উদ্দেশ্যে…..

” কি হয়েছে আমার বেগমের ? ভয় পেয়েছে কেনো ও ? কোথায় ছিলেন আপনি ?
চমকালেন সুলেখা । সংগ্রামের উগ্র ব্যবহারে ঢোক গিললেন । পিছিয়ে মিনমিন করলেন….
” আমি তো হেঁশেলে গেছিলাম জমিদার বাবা । আইসা দেখি হেয় এমন কাঁপতাছে ! ভয় পাইছে , কিন্তু….
” কিন্তু কিসের ? আগে থেকেই সবটা বলেছিলাম কিনা আপনাকে ? মনে নেই আমার কথা ….
সাবধান করে দিচ্ছি । যদি এর পেছনে….
দাঁত পিষে কিছু বলতে গিয়ে থামলো সংগ্রাম । চোখ বুজে সংযত করলো নিজেকে । শ্যামার পিঠে হাত বুলিয়ে ধীরে বললো…
” যান এখান থেকে….
নিমিষেই ধড়ফড়িয়ে জায়গা ত্যাগ করলেন সুলেখা । সংগ্রাম শ্যামা কে খানিক সময় দিলো নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য । ধীরে ধীরে কম্পন কমলো শ্যামার । নিঃশ্বাসের তাল কমে আসলো । শান্ত, স্থির হলো মেয়েটা । সংগ্রাম ততক্ষণ জড়িয়ে রাখলো, যতক্ষণ না তার বেগম পুরোপুরি শান্ত হয় । এরমধ্যে টু শব্দও করলো না সংগ্রাম । শ্যামা স্থির হতেই সংগ্রাম ডাকলো হীম শীতল কন্ঠে….

” ডালিয়া ?
” হুঁ !
” কি হয়েছে ?
মাথা তোলে শ্যামা । খেই হারায় । কপাল গুটিয়ে আসে আপনা আপনি । নিজের দিকে তাকায় এক পলক , অন্য পলক সংগ্রামের দিকে । অতঃপর ধীরে বলে..
” কি হয়েছে ছোট জমিদার সাহেব ?
শ্যামার‌ শ্যামলা মুখশ্রীতে চিকচিকে ঘামের কণা । শ্বাস ফেলে শ্যামা কে আলগা করলো সংগ্রাম । বুকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে শ্যামার ঘামে ভেজা মুখটা দুহাতের তালুর সাহায্যে মুছিয়ে দিলো । বললো….
” কিছু না । বাড়ি যাই এখন ?
মাথা ঝিমঝিম করছে শ্যামার । তালগোল পাকিয়ে গেছে সব । কিচ্ছু খেয়ালে নেই । শ্যামা সংগ্রামের বুকে মাথা এলিয়ে দিলো , চোখ বুজে কোনো রকমে ক্লান্ত স্বরে বুলি ফুটালো…..

” কোথায় আমরা ?
” তুমি আমার কাছে , আমার সাথে আছো । চোখ বুজে থাকো , ঠিক হয়ে যাবে সব ।
শ্যামা কে ওভাবে বুকের সাথে হেলান দিয়ে জড়িয়ে কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলো সংগ্রাম হিসেব নেই তার । সুলেখার দ্বিতীয় বার সাহস হয় নি এখানে আশেপাশে পা রাখার ।
সংগ্রামের পায়ে টান ধরেছে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে । শ্যামার হেলদোল নেই । সাঁড়া শব্দ নেই কোনো । অনেকটা মুহূর্ত পর সংগ্রাম নিজে থেকে ডাকলো….
” বেগম ।
চলো ফিরে যাই ।
টনক নড়ে শ্যামার । ধ্যান কাটে এতক্ষণে । ঝট করে চোখ মেলে ও । স্বাভাবিক ভাবেই মাথা তুলে তাকায় ।
সংগ্রাম আবার বলে…..

” বাড়ি যাবে না ?
দুপুর গড়াতে চললো ।
শ্যামা তাজ্জব বনে । কি হলো এতক্ষণ ! কিচ্ছুটি মনে নেই । সংগ্রাম কে ছাড়ে শ্যামা । কন্ঠ নুইয়ে প্রশ্ন করে..
” উনি কোথায় ? ঐ ভদ্রমহিলা ?
” আছেন উনি ।
চলো, একবার মাতব্বর মশাইয়ের সাথে দেখা করিয়ে নিয়ে আসি । তার পর বাড়ি ফিরে যাবো ।
শ্যামা সম্পুর্ন স্বাভাবিক । যেনো কিচ্ছুটি ঘটে নি একটু আগে । ও যে ভয় পেলো , স্বাভাবিক হতে হতেই এটা ভুলে গেলো বেমালুম । হাঁফ ছাড়ল সংগ্রাম ।
শ্যামা কে নিয়ে উপরে উঠলো অতি সাবধানে পা বাড়িয়ে ।
সিঁড়ির পিছনে একটা ঘর । দরজা বন্ধ ভেতর থেকে । সুলেখার চাপা স্বরের ধমক ভেসে আসছে সে ঘর হতে । কাউকে ধমকাচ্ছে সে । দরজার নিচ থেকে মোমবাতির ঝলকানি বেরোচ্ছে খানিক ।

সেই তখনই সংগ্রাম সুখের নীড় ছাড়তে চাইলেও ছাড়তে পারে নি । দৌলত গাজি ছাড়তে দেয় নি ।
তিনি অসুস্থ । সংগ্রাম তাকে মান্য করে অনেক । তার কথা আজও অমান্য করতে পারে নি সংগ্রাম । দুপুরের খাওয়া দাওয়া এ বাড়িতেই হবে । দোতলা টা এদিক ওদিক হেঁটে বেরিয়েছে শ্যামা । সংগ্রাম সাথে ছিলো অবশ্যই । এ বাড়িতে নাকি ওনারা তিন জন ব্যাতিত আর কেউ নেই । কোনো কাজের লোক ও না । ওনারাই থাকেন শুধু । শ্যামা বেকার বেকার কতো কি ভেবেছিলো ।
এখন ভাবনা ভুল বেরোতেই নিজেকে ফুরফুরে লাগছে শ্যামার ।
শ্যামা কে নিয়ে নিচে নেমেছে সংগ্রাম । লন্ঠনের সংখ্যা বেড়েছে । আরো কয়েকটা লন্ঠন জ্বালানো হয়েছে । ছিপছিপে অন্ধকার ঘুচেছে একটু । ওরা সিঁড়ি বেয়ে নেমেই খাবারের টেবিলের দিকে তাকালো । সুলেখা খাবার বেড়ে সাজিয়ে রাখছেন প্লেটে । দিলশাদ গাজি ও পাশে, ডোবানো চোখে সুলেখার কর্মকাণ্ড পরখ করছেন তিনি । সংগ্রাম গলা ঝেড়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিলো । অমনি সুরসুর করে জায়গা ত্যাগ করলেন দিলশাদ গাজি । সুলেখা ভরাট মুখে হাসলেন ।

” আও বাবা , খাওন বাড়ছি । খাইয়া লও ।
তোমরা আইবা দেইখা ভাইজান কাইল রাইতেই সব খরচ পাতি কইরা আনছে । বড় ইলিশ আনছে হাঁট থাইকা । সকাল থাইকা মেলা রান্না করছি আমি ।
শ্যামার কপালে তিন ভাঁজ পড়লো তৎক্ষণাৎ । সুলেখা বোধহয় আরও কিছু বলতে চেয়েছিলেন । কথার মাঝে আচানক চুপ করে গেলেন । শ্যামা পুছালো সহসা….
” আমরা যে আসবো , এটা আপনারা জানতেন ?
উনি যে তখন বললেন, আমাদের আসার কথা জানতেন না । আপনিও তো না জানার ভান ধরেই ছিলেন ।
থতমত খেলেন মহিলা । আমতা আমতা করতে লাগলেন । কথা ঘোরালেন..
” জানতাম না তো । কাইল ইলিশ আনছে , আর আইজ জমিদার বাবা আইছে , এই লাইগা মনে হইলো হয়তো ভাইজান আগে থাইকা জানতো । তাই কইলাম আরকি । তোমরা আও তো,জলদি খাইয়া লও । খাওন ঠান্ডা হইয়া যাইতাছে ।
সংগ্রাম একটা কথাও বললো না । শ্যামা কে নিয়ে বসলো চেয়ার টেনে । দুটো প্লেটে আগে থেকেই ভাত বেড়ে রেখেছেন সুলেখা । সংগ্রাম শ্যামার সম্মুখের প্লেট টা সরিয়ে দিলো । অন্য একটা প্লেটে নিজে ভাত বাড়লো । সেটা এগিয়ে দিলো শ্যামার দিকে । নিজে তরকারি তুলে নিলো আপন প্লেটে । শ্যামা নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলো শুধু । চুপচাপ দুই লোকমা খেলো সংগ্রাম । স্বাদ বুঝে অতঃপর মাথা ঝাঁকিয়ে শ্যামার প্লেটে তরকারি তুলে দিলো । বললো শ্যামার নির্বোধ চোখের দিকে তাকিয়ে…..

” খেয়ে নাও বেগম ।
দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের ।
অল্প স্বল্প খেয়েছে দু’জনে । বেশ অনেক প্রকার পদ রান্না হয়েছে । এটুকু সময়ের মধ্যে শ্যামা সংগ্রামের জন্য এতো পদ রান্না হলো ? নাকি এনারা রোজই এতো প্রকারের খাবার খেয়ে থাকেন ?
শ্যামার কাছে সবটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে । এতো দিনে লতিফার বলা অনেক কথা কানে এসেছে শ্যামার । সুখের নীড় নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই । তবে এখানে এসে সবটা কেমন ঘেঁটে গেলো । তবে সংগ্রামের বলা একটা কথা মিলেছে । বাড়িটা ভুতুড়ে বাড়ির থেকে কম কিছু নয় ।

কাল রাত থেকে সুরবালা ফুলে ফেঁপে আছে । গজগজ করছে শুধু । বকবক করছে নিজের মাঝে ।
রাতে অংকুর খাবার রেখে রংয়ের ঘরে গেছিলো । সুরবালা খায় নি । ফিরে এসে শুধু তপ্ত শ্বাস ফেলেছে অংকুর । ততক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে সুরবালা । ওকে আর ডাকে নি অংকুর । এটাই আরো বেশি কাল্ হয়েছে ।
সকাল থেকে সুরবালার মুখ পানে তাকানো যাচ্ছে না । বেজায় চটে আছে বাউড়ি । মুখ কালো করে রেখেছে । যেচে পড়ে কথা বলে নি অংকুর । দুপুরে বেরিয়েছিল সে । ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা । এতক্ষণ সুরবালা ঠিক ছিলো । অংকুর ফিরতেই আবারো মুখ কালো করে ফেলেছে ।
অংকুর ফিরে হাত মুখ ধুয়ে কাপড় বদলে নিচে নামলো । শায়লা বিকেলে ঘুমিয়েছিলেন । উঠলেন সবে । তিনিও নিচে নেমে সোফায় বসেছেন । সুরবালা কে কুশিকাটা দিয়ে উলের কাজ শিখিয়েছেন এই কদিনে ।
সুরবালাও শিখেছে বেশ ভালোই । ও নিজ মনে সম্পুর্ন ধ্যানে উল দিয়ে বুনছে কিছু একটা । পাশে বসে দেখছেন শায়লা । অংকুর নিচে নেমেই সোফায় গা এলিয়ে শায়লার কোলে মাথা রাখলো । বললো বরাবরের মতো…
” চুল গুলো একটু টেনে দাও মা ।
না তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কাটলো সুরবালা । শায়লা মৃদু হেসে হাত চালালেন ছেলের ঝাঁকড়া চুলের ভাঁজে । চোখ সুরবালার হাতের কাজের দিকে রেখে বললেন….

” কি বানাচ্ছিস ওটা ?
” কুশন ।
” কুশন আছে অনেক ।
তুই বরং ছোট ছোট বাচ্চাদের কয়েকটা সোয়েটার,জামা বানিয়ে রাখ ,পরে কাজে আসবে !
সুরবালা না বুঝে সহসা বলে উঠলো….
” বাচ্চাদের জামা কি করবে ?
” ও মা , তোদের বাচ্চা-কাচ্চা হবে না ভবিষ্যতে ?
এখন থেকে বানিয়ে রাখ । আমার আলমারিতে আছে কয়েকটা । আমি বানিয়ে রেখেছি । পরে সময় পাবো না হয়তো ! আমার নাতি হোক বা নাতনি , ওদের জন্য সব হাতের নাগালে থাকবে । বুঝলি ?
থামলো সুরবালা । থমকে গেলো হাতের কাজ । বাঁকা চোখে অংকুরের দিকে তাকালো । সে চোখ বুজে প্রতিক্রিয়া হীন মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে । বালা বললো না কিছু । শায়লা আবার বললেন….

” বিয়ে তো হলো ।
এবার ভবিষ্যতের কথা ভাবো দু’জনে । ছোট্ট পরিবারটা আর কতদিন এমন থাকবে ! তিনজন মিলে কাটাবো আর কতদিন ? পরিবার টা বাড়ানোর পরিকল্পনা করো এবার…
” মা , এক কাপ চা দেবে ?
মাথা টা ধরেছে ….
শায়লা কে থামালো অংকুর । উঠে বসলো ও ।
শায়লা আর কিছু বলতে পারলেন না । সুরবালা এখান থেকে কেটে পড়তে চাইলো চা বানানোর বাহানায় । শায়লা ওকে থামিয়ে বললেন….

” তুই বস , নিজের কাজ কর । আমি যাচ্ছি …..
উঠে রান্নাঘরের দিকে এগোলেন শায়লা । কাজ থামিয়ে থম মেরে বসে রইলো সুরবালা । হঠাৎ চোখ মুখ খিচে হাতের কুশি কাটা সুচটা ছুড়ে মারলো কোন এক দিকে । দাঁত খিচে বললো….
” যত্তসব , অকাজের জিনিস । কোনো কাজের না ।
বারবার সুতোয় আটকাচ্ছে । কেউ যেনো আর একটা কাঁটা কিনে এনে দেয় আমায়…..
বলেই উঠে দাঁড়ালো । রাগটা যে অংকুর কে দেখালো , এটা বুঝলো বাবড়ি ওয়ালা । মৃদু হাসলো ও । মজার ছলে বিড়বিড় করলো ঠোঁট চেপে…..
” তুমিও তো বউ হিসেবে কোনো কাজের না । এভাবেই আরেকটা বিয়ে করে নেই আমি ?
ঝট করে চাইলো সুরবালা । কাঁপলো দৃষ্টি যুগল । অংকুরের কথাটা মোটেও ঠাট্টা হিসেবে নিলো না ও । বক্ষ স্থল কেমন মুচড়ে উঠলো ।
সুরবালার চাহনি বুঝতে বাকি রইলো না অংকুরের । নিজের কথাটার গহীনে লুকায়িত অর্থ ঘুরিয়ে বুঝেছে সুরবালা । অংকুর সেভাবে বলতে চায় নি । ভুল অর্থ বুঝলো সুরবালা । অংকুর স্বাভাবিক হলো । দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলতে উদ্যত হলো…..

” সুরবালা …..
পারলো না বলতে । হাতের অর্ধেক বোনা কুশনটা ফেলে মুখ ফিরিয়ে দ্রুত কদমে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠলো বালা । শুনলো না আর কিছু ।
অংকুর ও উঠে দাঁড়ালো তড়িতে । ঘাড় ডলে নিজের উপর বিরক্তি সূচক শব্দ উচ্চারণ করলো । সুরবালার পিছু নিলো তড়িঘড়ি করে ।
ঘরে গিয়ে সোজা বারান্দায় দাঁড়িয়েছে সুরবালা । অংকুর আকারে ইঙ্গিতে ওকে কি বোঝাতে চাইলো — সুরবালাকেও ওভাবে ছুড়ে ফেলতে চায় অংকুর ? যেভাবে ঐ কাঁটা টাকে ছুড়ে ফেললো সুরবালা ?
বিয়ে করার কথা বললো কেনো ? চোখে পানি ভরাট হচ্ছে সুরবালার । ও নিজেকে সামলে নিতে পারে খুব কম সময় ‌। এখন পারছে না । চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসতেই চোখ মুছলো সুরবালা ।
পেছন থেকে অংকুরের ডাক একই সময়ে….
” সুরবালা ?
ফিরলো না বালা । কাল থেকে একে এই লোকের উপর রেগে আছে ও । এই লোক একবারও ওর রাগ বুঝলো না । কথাই বললো না , রাগ ভাঙানো তো অনেক দূরের কথা । সুরবালার অভিমানের কোনো গুরুত্ব নেই এই বাবড়ি ওয়ালার কাছে ।
অংকুর কদম বাড়িয়ে আবার ডাকলো….

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫২

” সুরবালা ! শোনো…
আমি শুধু মজা করলাম । ভুল বুঝো না আমায় । আমি সেভাবে বলতে চাই নি…
বালার প্রতিক্রিয়া নেই ।
অংকুর আজ ওকে স্পর্শ করলো । সুরবালার হাত টেনে নিজের দিকে ফেরাতেই ঝাড়া মারলো সুরবালা । ভেজা কন্ঠে তেজ দেখিয়ে উচ্চারণ করলো….
” ছোঁবেন না আমায় ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৪