Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৩

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৩

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

হিমেল দ্রুতই পৌঁছাতে চাইল। অথচ পৌঁছানো গেল না। রাস্তায় ঝামেলা চলমান থাকায় এদিকেও বিস্তর জ্যাম বেঁধেছে। হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে। রিক্সাওয়ালা মামা নেমে সামনে গিয়েছিলেন খোঁজ নেওয়ার জন্য। অতঃপর এসে শুধাল,
“ মামা, সামনে তো শোরগোল শোনা যাচ্ছে। গাড়ি আর যাইব না মামা। ”
হিমেল তাকাল সামনে। দূর থেকে কিছুটা আওয়াজ ভাসছে।খুব দূরেও নয়। বলল,
“ আর অল্পই তো। যেতে পারবেন না? ”
“ না মামা। দেখেন না জ্যাম বাঁইধা গেছে। সবাই বলাবলি করতেছে শুনতেছেন না? রাজনীতির ব্যাপার স্যাপার। আমরা সাধারণ মানুষ মাঝখানে মরব। ”
হিমেল নেমে গেল এবারে। টাকা এগিয়ে দ্রুত শুধাল,

“ আচ্ছা, নেন ভাড়া। ”
অতঃপর ভাড়াটা দিয়েই হিমেল পা বাড়াল দ্রুত সামনের দিকে। রিক্সাওয়ালা মামা পেছন থেকে হাঁক দিয়ে শুধাল,
“ যাইয়েন না ভাই। ”
হিমেল শুনল না। পা এগোতে থাকল কেবল দ্রুত। অতঃপর কাছাকাছি আসতেই এক পরিচিত লোক শুধাল,
“ আরেহ হিমেল ভাই, কোথায় যাচ্ছেন? ওদিকে না গেলেই ভালো। গাড়ি টাড়িও ভাংচুর হইতাছে নাকি। সাথে মারামারি তো আছেই।”
হিমেলের চিন্তায় অস্থির লাগে। গলা কেমন যেন শুকিয়ে আসে তার। যদি মিথি বের হয় এই ঝামেলায়? যদি এই ঝামেলায় আটকে পড়ে? কিছু হয়ে যায় যদি? যদি মিথির উপর কোনভাবে আক্রমন হয়?হিমেল চিন্তিত থাকলেও স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করল। ব্যস্তভাবে শুধাল,
” আমায় একটু যেতে হবে ভাই। দরকার আছে। ”
“ আরেহ ভাই জানেন না? ভেজাল যেখানে ঐখান থেকে দশ হাত দূরে থাকতে হয়?কখন কার বিপদ কার উপ্রে দিয়া যায় বলা নাকি? ”
হিমেল স্থির ওখানে দাঁড়াতে পারল না আর। পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,

“ কার বিপদ কার উপর দিয়ে যায় তো জানি না। তবে আমি যার জন্য ছুটছি তার উপর কোন বিপদ না এলেই হয়। যদি বিপদ হওয়ার ও থাকে তা যেন আমার উপর দিয়ে যায়। ”
অতঃপর দ্রুত পা বাড়ায়। এক পর্যায়ে ওখানে পৌঁছালেও এত এত মানুষ দেখে হিমেল চোখ স্থির থাকল না।মারামারি, ঝামেলা, অশান্তি এতকিছুর পরোয়া না করে ও এসবের মধ্যেই ছুটে চলল আর মিথিকে খুঁজতে লাগল। অথচ দেখা মিলল না। হিমেল বড়বড় শ্বাস ফেলে। এদিক সেদিক বড় বড় পা বাড়িয়ে মিথিকর খুঁজতে খুঁজতেই রোধ হয়ে আসা স্বরে বিড়বিড় করল,
“ মিথি, মিথি কোথায় তুই? সেইফ আছিস তো? ”
ফের আবারও বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“ মিথি, আগেই তো ভালো ছিল। অনুভূতিদের আমি যেভাবেই হোক সামলে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন? আমার দুর্বলতা কমার বদলে যে উল্টো আরো বাড়ছে। তোর প্রতি এত দুর্বল হওয় উচিত হচ্ছে না আমার। এখন আমি চাইলেও তোর প্রতি চিন্তা, উদ্বেগ এসব সামলাতে পারছি না। প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে।আমার এমন করুণ পরিণতিতে আমি নিজেই হতাশ মিথি।”

এক পর্যায়ে মিথিকে দেখা গেল। একটক দোকানের সামনে কিছু মানুষের ভীড়ে গুঁটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখমুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। চোখ জোড়াও কেমন যেন টলমলে হয়ে আছে। অনেক দূর থেকে দেখলেই বুঝা যায় কোথাও একটা ছোট্ট বাচ্চা ভয় পেয়ে যেভাবে লুকিয়ে পড়ে ঠিক তেমনই। বোধহয় সবাই ছুটছে দেখে ও নিজেও ছুটে গিয়ে ওখানে সবার সাথে দাঁড়িয়েছে।আর কোথাও তেমন নিরাপদ ভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই বলেই হয়তো ওভাবে দাঁড়িয়ে আছে। হিমেল বড়বড় পা ফেলে ওদিকে গেল। প্রায় সব দোকানই বন্ধ ভেতর থেকে। দ্রুত মিথির সামনে ওর হাত টেনে বাইরে আনল। একপাশে টেনে এনে নিরাপদ নিরব জায়গাটায় দাঁড় করিয়ে ও টানটান স্বরে প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,
” ঠিক আছিস? ঠিক আছিস তুই মিথি? ”
হিমেলের কন্ঠে স্পষ্ট অস্থিরতা। স্পষ্ট উদ্বেগ। মুখভঙ্গিতেও একই ছাপ। মিথি তখনও অল্প কাঁপছে ভয়ে। চোখমুখে ভয় ভয় রেশ। ওর হৃদস্পন্দন দ্রুত চলছে তখনও। হিমেলের কথার উত্তর করতে পারল না ও৷ হিমেল নিজেই আবারও বলল,

“ এসব ঝামেলায় বের হতে নেই। তুই জানিস না? এসব ঝামেলা দেখেও এসবের ভেতর হসপিটাল থেকে বের হতে কে বলেছিল তোকে?কেন বের হয়েছিলি? এখন যদি কিছু হতো তোর? কিছু হলে কি করতি তুই?”
মিথির গলা আটকে গেছে যেন। শরীর কাঁপছে তখনও। এইরকম পরিস্থিতিতে ও প্রথম পড়েছে। এই প্রথম। দ্রুত শ্বাস ফেলতে ফেলতে ও কোনভাবে বলল,
“হি্ হিমেল ভাই, পানি হবে আপনার কাছে? একটু পানি দেন আমাকে। ”
হিমেল ছোটশ্বাস ফেলল। পানি তো ও আনে নি। দিবে কি করে? মিথির দিকে স্থির শান্ত নজর ফেলে পাশের দোকানের সামনে থেকে একটা ট্যুল নিল। মিথিকে ওটা ইশারা করে বলল,
“ এখানে বস মিথি। এখানে বসে থাকবি। আমি পানি আনছি হুহ?”
এটুকু বলে পা বাড়াতে গিয়েই ফের ফিরে মিথিকে আশ্বাস দিয়ে বলল,
“ চিন্তা নেই। এদিকটায় কেউ আসবে না আশা করি। ”
অতঃপর হিমেল আবারও পা বাড়ায়। মোটামুটি ঝামেলার জায়গাটা এড়িয়ে গিয়ে এর পাশে অন্যদিকে হাঁটে। কোথাও কোন দোকান খোলা নেই। তবে পথের দ্বারে চা দোকানটা তেমন কিছু দিয়ে বাঁধা হয়নি। শুধু প্লাস্টিক দিয়ে ঘিরেছে। হিমেল ওটাতেই গেল। প্লাস্টিকের একাংশ তুলে উঁকি দিতেই দেখা গেল ভেতরে লোক আছে। ভয়ে তৎক্ষনাৎই বলে উঠল চা ওয়ালা লোক,

“ ভাই কিছু করবেন না, কিছু করবেন না। আমরা গরিব মানুষ। কিছু করবেন না ভাই। ”
হিমেল বুঝল সাধারণ মানুষের আতংক কতোটা। মাঝখানে দিনরাত চিন্তায় থাকতে হয় এই জনসাধারণকেই। ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ একটা পানির বোতল দেন মামা। ”
লোকটা খুব দ্রুতই দিল। হিমেল নিয়ে প্রাপ্য টাকাটা এগিয়ে ধরে বলল,
“ নিন। ”
লোকটা নিতে চাইল না ভয়েই। হিমেল এবারে হেসেই বলল,
“ আমি মারামারির লোক নই। নিন। ”
লোকটা নিল। হিমেল আবারও বড়বড় পা ফেলে মিথির দিকে গেল। মেয়েটা বসেছে। বড় বড় শ্বাস ফেলছে। হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে পানির বোতল এগিয়ে ধরে বলে,
“ পানি মিথি।”
মিথি দ্রুতই নিল। তবে ওর হাত তখনও কাঁপছে। শরীর কাঁপছে।কোনভাবে বোতলের ডাকনা খুলেই ডগডগ করে পানি গিলে নিল। চোখে মুখে পানি ছিটাল। হিমেল তা পরখ করতে করতে বলল,

“ তোর হাত কাঁপছে। ভয় পেয়েছিস মিথি?”
মিথি উত্তর করে না। হিমেল আবারও বলে,
” এতোটা ভয় পেলে কি করে হবে মিথি? মেয়েদের এবং মায়েদের আরো সাহসী হতে হয় মিথি। ”
মিথি তাকাল ফ্যালফ্যাল করে। অনেকটা ভীত স্বরেই জানাল,
“ হিম হিমেল ভাই, আমি এমন পরিস্থিতিতে এর আগে কখনো পড়িই নি। ”
‘ আজ পড়েছিস। অভিজ্ঞতা হলো। এই শহরে এমন অহরহ হয় মিথি।বলা চলে প্রতিদিনই হয়। এই শহরে চলতে ফিরতে এসব সম্পর্কেও ধারণা থাকতে হবে তোর। এসবের সম্মুখীন হলে নিজেকে সেইফ করে নিতে হবে মিথি। তোর মতো ওভাবে ঝামেলা দেখেও ঝামেলার মধ্য দিয়ে বের হয়ে যেতে হবে না। ”
“ আমি ঝামেলার মধ্যে বের হইনি। হুট করেই ঝামেলা হলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিকই ছিল এর আগ মুহুর্ত অব্দিও। তারপর হুট করেই একটা লোককে ধাওয়া করতে করতে এমনটা হলো। আমি, আমি দুই পা বাড়ানোর সাহসটাও পেলাম না এই আকস্মিকতাই। ”
হিমেল তাকাল। ভরসা দিয়ে জানাল,

”সমস্যা নেই, আজ পাসনি, কাল পাবি। শান্ত হো। ”
অতঃপর অনেকটা সময় ওভাবেই গেল। মিথি হিমেল ওভাবেই ঐ জায়গাটায় কিছু সময় পড়ে থাকল। তারপর পরিস্থিতি শান্ত হলো। দোকান সব খুলল। হিমেল ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“ ভয় কেটেছে তোর? ’
মিথি মাথা নাড়াল। হিমেল তাকিয়ে বলল,
“ তাহলে উঠ, যত তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবি ততই ভালো। ”
মিথি উঠতে নিল। হিমেল তাকাতেই দেখল মিথির কপালের দিকটায় অল্প কেঁটেছে।সাথে হাতেও অল্প কেঁটেছে। এতটা সময় খেয়াল না হলেও এখন হলো। বলল,
” মিথি, সোজা হয়ে দাঁড়া। ”
অতঃপর পা ফেলে কোথাও গেল৷ আবার ফিরেও এল। মিথিকর একইভাবে বসে থাকতে দেখে বলল
“ দাঁড়া সোজা হয়ে। ”
মিথি দাঁড়াল। হিমেল পকেট থেকে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ গুলো বের করে একটা কপালে লাগাল। অপরটা হাতে লাগানোর জন্য বলল,

“ হাত উঠা সোজা কর।”
হাতে লাগানোর পর আবার জানতে চাইল,
“ আর কোথাও ব্যাথা পেয়েছিস? বেশি ব্যাথা পেয়েছিস?”
ফের বলল,
” কোনভাবে পড়ে যাসনি তো? ব্যাথা কিভাবে লাগল তোর। ”
“ দৌড়াদৌড়িতে কিসের সাথে যেন লেগেছিলি। পড়িনি আমি। ”
হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে। অতঃপর পা এগিয়ে বাসায় ফেরার জন্য রিক্সা খোঁজে। পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল একটা অটো। তাও ডাবল ভাড়ায়। কারণ এই এরিয়ায় একটু আগেই ঝামেলা হয়েছে। এটাও ভাড়া বাড়ানোর একটা কারণ! হিমেল মিথির কাছে এসে শুধাল,

“ এদিকে রিক্সা খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। অটোই পাওয়া গেছে। আমার রেফার করা অটোতে গেলে নিশ্চয় তোর সমস্যা হবে না? ”
ছোটস্বরে উত্তর আসে,
” না, হবে না। ”
হিমেল ফের জিজ্ঞেস করে,
“ অটোতে যথেষ্ট জায়গা আছে। একই অটোতে গেলে কি তোর সমস্যা হবে?”
“ না,সমস্যা হবে না। হিমেল ভাই,সেদিনের বিষয়টাকে আপনি এত বড় করে না দেখলেও হয়। ”
“ উঠ তাহলে অটোতে। ”
মিথি উঠল। হিমেলও উঠে সামনে বসল। অতঃপর গন্তব্যে পৌঁছাতে হিমেল ভাড়া দিতে গিয়ে আবারও বিপত্তি বাঁধল। মিথি টাকা বের করর বলে,
“ ভাড়াটা আমি দিচ্ছি হিমেল ভাই। ”
“ কেন? ভাড়া আমার কাছে নেই? নাকি আমি ফকির?”
“ তা বলিনি। ”
হিমেল ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
“ তো? টাকার গরম দেখাচ্ছিস তুই আমায়? ”
” হিমেল ভাই, আপনি সবকিছুকে এমন ভাবে নেন কেন?আমি মোটেই ওভাবে কিছু বলিনি। ”
“ বলেছিস তুই। ”
মিথি ক্লান্ত হয়ে শুধাল,

“ আচ্ছা, অর্ধেক অর্ধেক ভাড়া তো নেওয়া যায়? আপনি অর্ধেক, আমি অর্ধেক।এটা নিশ্চয় টাকার গরম দেখানো নয়?”
“ এটাও টাকার গরম দেখানো। তোর কথাবার্তা আমার সহ্য হচ্ছে না মিথি। মুখ বন্ধ রাখ। ”
মিথি এবার আর কোন কথাই বলল না। চুপ করে থাকল। ভাড়া দেওয়া হলেও ও পা বাড়িয়ে নিজের বাসার দিকে এগোতে নিতেই হিমেল পেছন থেকে বলল,
“ সাবধানে উঠবি। আবার তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে পড়ে হাত পা ভেঙ্গে বসে থাকবি। তুই তো এমনিতেই বেশি বুঝিস, তাই বলে রাখলাম। ”
মিথি ক্লান্ত চাহনিতে তাকাল। বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২২

” হিমেল ভাই, আপনি সবসময় আমাকে বাঁকা কথা শোনান। ”
এইটুকু বলেই ও পা বাড়াল। ধীরস্থিরভাবে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিল। উঠতে উঠতে ওর মনে প্রশ্ন জাগল, আচ্ছা হিমেল ভাই ওখানে এই অসময়ে কি করছিলেন? আগে থেকেই ছিলেন ওখানে? উনিও কি ঝামেলায় আটকে পড়েছিলেন মিথির মতো? কিন্তু মিথিকে? মিথিকে কি করে দেখল? দেখেও এড়িয়ে যেতে পারত তো। কেন এগিয়ে ওভাবে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল ও ঠিক আছে কিনা?

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৪