Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৮ (২)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৮ (২)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৮ (২)
সাঞ্জেনা শাজ

রাজশাহী টু ঢাকা আসতে আসতে শুভ্রতার বেশ খানিকটা অসুবিধে হয়েছে। আগামীকাল পরিক্ষা। মেয়ের জন্য দুশ্চিন্তায় অস্থির শায়ান তালুকদার মেয়েকে নিয়ে সকাল হতেই হাসপাতালে ছুটে এসেছেন ডক্টর দেখাতে। পা’টা দেখিয়ে যাবেন। সেই সাথে কলেজ থেকে যে সকল কাগজ পত্র আছে সব নিয়ে যাবেন।
শুভ্রতা বসে আছে করিডরে। ঢাকা আসার পর থেকে হৃদযন্ত্রটা বেমালুম ধকধক করছে। পুরনো সব স্মৃতি কাল বৈশাখি ঝড়ের ন্যায় অগ্রাসি দাপটে বার বার চোখ দুটো ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কঙ্কালসার দেহটায় নতুন উদ্যোগে ভেঙে পরছে বার বার। ভবিষ্যতে কি হবে সেই চিন্তারা যেন শরৎ এর ঘন মেঘের মতো মন কোনে আস্তানা গেড়ে বসেছে। কি করে আগামীকাল সোহানা সামান্তাদের মুখোমুখি হবে তা ভাবতেই মনটা হু হু করে উঠে।

মেহরাদ সোহানাকে একটা হুইল চেয়ারে বসিয়ে করিডর পেরিয়ে ডক্টরের চেম্বারে নিয়ে যাচ্ছে। দুশ্চিন্তায় তার কপাল গোছানো। চারদিকে ততটা খেয়াল নেই। হুইল চেয়ার ঠেলে সামনে এগুচ্ছে আর মোবাইলে কার কাছ থেকে যেন ডক্টর সম্পর্কে সকল ইনফরমেশন নিচ্ছে।
শুভ্রতা বিষাদের গহীন ভুবনে ডুবেও মেহরাদের পুরুষালী ভরাট কন্ঠ শ্রবণেন্দ্রিয় পৌছাতেই তা ঝংকার তুললো যেন। হৃদযন্ত্র খামচে উঠলো অনিশ্চিত আশংকায়। হসপিটালে আসার সময় মাস্ক পড়ে এসেছিলো। চোখ দুটো ছাড়া সম্পূর্ণ মুখশ্রী আবৃত। পুরুষালী গম্ভীর কন্ঠটাকে যেন শ্রবণেন্দ্রিয় সম্পূর্ণটা দিয়ে গ্রাস করে নিচ্ছে। অবাধ্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠছে, কন্ঠের মালিকের দর্শনের জন্য। কন্ঠটা গম্ভীর দাপুটে ভঙ্গিতে তার দিকেই যেন এগিয়ে আসছে।
অস্থির হয়ে উঠলো মেয়েটা। মুখ লুকিয়ে শুধু ভসা ভাসা হরিণের মতো চোখ দুটো দিয়ে চারদিক সামনের অবলোকন করলো খুব সাহস নিয়ে। নাহ, সামনে নেই। ছোট্ট নারীদেহ আপনা-আপনিই সংকুচিত হয়ে আসছে। লম্বা করিডরের রাউন্ড করা বেঞ্চিতে আছে সে। পিছন থেকে কন্ঠটা স্পষ্টতরো হলো। মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো মেয়েটার। থরথর করে কাপছে হাত দুটো। তীব্র যাতনার প্রলয়াচ্ছ্বাসে থুতনি কাপছে তিরতির করে। চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত। অনুভূতিরা সব অশ্রু হয়ে ঝাড়ছে যেন।
সোহানাকে নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে মেহরাদ রাউন্ড করা পাশাপাশি বেঞ্চিতা বসা মানুষ গুলোর দিকে একবারও তাকালো না। এপাশ থেকে ওপাশ ঘুরে গিয়ে ডক্টর চেম্বারে ঢুকতে যাবে সেই মূহুর্তেই চোখ উচিয়ে দেখলো শুভ্রতা সামনের মানবকে।

দুচোখ স্থীর হলো আবেশে। একটুকরো প্রশান্তি যেন ছেয়ে গেলো মন বাগানে। সামনের মানব পাইচারি করছে। চেম্বারে রোগি আছে একজন। কাকে যেন গম্ভীর স্বরে হুকুম জারি করছে, “কান্ট ওয়েট এনিমোর। ফাস্ট….. ”
শুভ্রতার দৃষ্টি তখনও মানবের উপর স্থীর। ঠিক কতো দিন পর দেখলো? তৎক্ষনাৎ মস্তিষ্ক জবাব ছুড়লো, তিন মাস আঠারো দিন পর। খুব করে জানে সে। একেকটা দিন বছরের মতো কাটে তো তাই। চোখ দুটোই কি ব্যাকুলতা! সব বিধিনিষেধ ভুলে, আদেশ নিষেধ ছেড়ে ছুড়ে, ছুটে গিয়ে ওই সুডৌল বুকটায় আছরে পরতে মন চাচ্ছে৷ বুকটা হু হু করে উঠছে ভালোবাসার মানুষটাকে এতদিন পর দেখেও একটু ছুঁতে না পারায়। জানাতে ইচ্ছে করছে, সে কি অতল বিষাদ সিন্দুতে ডুবে আছে। তাকে একটু আগলে ধরে সান্ত্বনা দিতে অনুরোধ করতে মন চাচ্ছে। খুব করে বলতে ইচ্ছে করছে, আপনি বিরহে আমি একটু একটু করে মুছে যাচ্ছি মেহরাদ ভাই। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছি। একটু ছুয়ে দিন আমায়। আপনার বুকটায় একটু আগলে দরুন। মাথায় হাত ভুলিয়ে একটু আশ্বাস দিন। আমি এতিম, আপনি ছাড়া যে কেউ নেই আমার! আমার দুনিয়া আপনি। আপনি ছাড়া আমি শূন্য। একদম শূন্য। আমার শূন্যতা পূরণ করে দিবেন তো, মেহরাদ ভাই? না-কি আপনিও আমায় দূরে ঠেলে দিবেন? দয়া দেখাবেন? হ্যাঁ, দয়াই তো দেখাবেন। ভালোবাসায় দয়া। না-হয় আপনার সাথে তো আমি নামক ভঙ্গুর রমনীকে কিছুতেই মানায় না। আপনি যেন নিভৃত আকাশের এক চাঁদ, আর আমি যেন এক দরিদ্র কবি, যে আপনাতে মুগ্ধ হয়ে রূপকথা সাজাতে পারি, কাব্য লিখতে পারি কিন্তু তাকে ছোয়ার অধিকার রাখি না। ।

কি সৌন্দর্য বেড়েছে পুরুষটার! আগের চেয়ে আরও আটসাট হয়েছে দেহ। চুলগুলো আন্ডার কাট। ঘারের পাশে কি যেনো একটা সরু কালো দাগ। কইসের দাগ এটা? প্রশ্ন জাগলো মনে। সুক্ষ এক চিনচিন ব্যাথা নাড়া দিলো সেই কালো অতীতের এক্সিডেন্টের কথা মনে পরে
মানবের গা’য়ের কালো টি-শার্ট খানা আটো সাটো ভঙ্গিতে চওড়া বুকে লেপ্টে। খরখরে চোয়াল খানায় সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ছাপ।
এই মানুষটা একটা সময় তার নারীদেহে লেপ্টে ছিলো, অথচ এখন কি দুস্পাপ্য সে! নিঃস্ব সে। হু হু করে দুঃখের জ্বলোচ্ছাসে প্লাবিত হলো মন। আদ্র চোখে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলো লোকটাকে। বেরি বাদা হাত পা নিয়েই সিক্ত চোখজোড়ায় কাতরতা নিয়ে বলিষ্ঠ পুরুষের সবটুকু মায়া মন কুঠোরিতে বাক্স বন্দী করে নিলো।
কথা বলার এক ফাঁকে হুইল চেয়ারের সামনে থেকে মেহরাদ সরলে, সোহানার দিকে নজর যায় শুভ্রতার। চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে! বুক্টা ধ্বক করে উঠে। তার মানে মেয়েটাকে নিয়েই এসেছে মেহরাদ ভাই হাসপাতালে? কি হয়েছে সোহানার?

প্রশ্নটা মনের মাঝে উল্থিত হতেই সোহানার নিস্প্রভ দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে। দু’জোরা চোখের দৃষ্টি স্থায়িত্ব পেলো মিনিটেরও কম। সোহানা জ্বরের ঘোরে থেকেও যেন মনটা কেমন করে উঠলো। চোখ দুটো খুব চেনা পরিচিত মনে হয়েও গুরত্বের কাতারে ফেললো না। যার কথা সে ভাবছে তার এখানে কিছুতেই থাকা সম্ভব নয়।
শুভ্রতা মেহরাদের দৃষ্টিতে পড়ার আগেই ব্যাথিত ভাঙা পা টেনে সরে আসলো সেখান থেকে। মেহরাদ অদেখায়ও একবার ঘার ঘুরিয়ে এক পা টেনে চলে যাওয়া মেয়েটার দিকে তাকালো। কিসের টানে যেন দৃষ্টি গাঢ় করলো কিছুটা অস্থির চিত্তে। আবারও ঘার ঘুরিয়ে নিলো নার্স এর ডাকে। চেম্বারে যেতে ডাকছে। ব্যাস্ততায় উড়ে গেলো মনের চিনচিন সুক্ষ্ম টানটা।
শুভ্রতা করিডরের মাঝ বরাবর পৌছাতেই শায়ান তালুকদারের সাথে দেখা। আসার সময় পুরনো ফাইলগুলো ফেলে এসেছিলেন। তাই শুভ্রতাকে রেখেই আবার ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন রিপোর্ট গুলো আনতে।। শুভ্রতাকে এভাবে ছুটে আসতে দেখেই তিনি ব্যাতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি ব্যাপার, এদিকে চলে এসেছিস কেন? পুরনো ফাইল গুলো নিয়ে এসেছি। ডক্টরের এবার তোর প্রবলেম গুলো বুঝতে সুবিধা হবে। চল….”

“নাহ্…নাহ্।বাবা আজ ডক্টর দেখাতে হবে না। আরেক দিন দেখাবো। এখন চলো চলে চাই। ”
“আগামীকাল পরিক্ষা। এখন না দেখালে পরিক্ষার মাঝখানে আর আসা হবে না। আজকেই দেখিয়ে গেলি কলেজে একটু সুস্থ মতো যেতে পারবি। ডাক্তার না দেখানোর জিন্য বাহানা করিস না।”
শুভ্রতা অনুরোধ করলো।আদ্র কোমল কন্ঠে বলল,
“বাবা, প্লিজ। আজ না যাই? ওখানে যাওয়া আমার পক্ষে আর সম্ভব না। ”
শায়ান তালুকদার মেয়ের কান্নাভেজা কন্ঠে হকচকিয়ে গেলেন। মেয়েটা এমন করছে কেন? আগলে ধরে জিজ্ঞেস করলেন,

” কিছু হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে? ভিজিট দেওয়া আছে তো? টাকা টা অন্তত ফেরত নিয়ে আসি?”
শুভ্রতা আশ্রু বিসর্জন দিলো। তার চিকিৎসা নিয়ে কত টাকা খরচো হচ্ছে। উন্নতির কিছুই হচ্ছে না। তার বাবা চাকরিস মাসিক বেতন সবটুকুই তার পিছনে ঢালছে। তাই অযথা টাকা ব্যয় করা বিষয়টা নিয়ে সে মনস্থির করে আটকাতে পারলো না। বলল,
“তুমি তাহলে গিয়ে নিয়ে আসো। আমি নিচে যাই। ওখানে আমি যাবো না।”
“তুই যেতে পাড়বি তো? অসুবিধে হবে না?”
“উঁহু, কোন অসুবিধে হবে না। তুমি যাও। আমি নিচে যাচ্ছি।”
শুভ্রতা এক পা টেনে টেনে নিচে নেমে গেলো। ভাগ্যের নিদারুণ খেলায়, কখনো গাড়ি ছাড়া চলাফেরা না করা মানুষ গুলো আজ অটো সি এন জি দিয়ে চলাফেরা করে। কোন রকম ফ্ল্যাটে থাকে। সামান্য থেকে সামান্যতম সমস্যায় দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানো মানুষ গুলো হাতে গুনা কয়েকবার ডাক্তার দেখাতে হিমশিম খায়৷

মেহরাদ সোহানাকে দেখিয়ে ক্যাবিন থেকে বের হতেই একজন নার্স পরবর্তী রোগীর নাম এনাউন্স করলো শুভ্রতা বলে। শুভ্রতা নামটা কর্নকোহুরে পৌছাতেই মেহরাদের চলন্ত পা জোড়া ফকফকা টাইলসে ঝড় বস্তুর ন্যায় আটকে গিয়েছে। পরপর কয়েক বার এনাউন্স করা নামটা হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম স্থীর করে দিয়েছে। আশেপাশ চারদিক নিগূঢ় দৃষ্টিতে অবলোকন করছে, খুব সন্তপর্ণে শুভ্রতা শুভ্রতা নামটা জীহ্বার ডগায় আওড়াতে আওড়াতে। সোহানাও পা’য়ের ব্যাথা ভুলে চঞ্চল দৃষ্টিতে ওই আগের চোখ গুলো খুজে বেরালো। অশ্রুসিক্ত ভেজা ওই চোখ গুলো কি ওই মানুষমটারই ছিলো?
প্রশ্নটা মস্তিষ্ক বারি খেতেই শ্বাস প্রশ্বাস অস্বাভাবিক হলো মেয়েটার। ভাইয়া ভাইয়া ডাকতে ডাকতে বলল,
“ভাইয়া ভাইয়া…আমি বোধহয় ওঁকে দেখেছিলাম। দেখেছিলাম ওই চোখ দুটো। আমি…আমি….”
মেহরাদ পরবর্তী একটা শব্দও আর শুনলো না। নার্স এর কাছে ছুটে গিয়ে ডিটেইলস জানতে চাইলে, তিনি নাম ব্যাতিত কিছুই বলতে পারলেন না। এ-ও সম্পূর্ণ নাম নয়। শুধু শুভ্রতা।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৮

মেহরাদ তবুও পাগলপারা হয়ে গেলো। ঘারের চওড়া আ
হয়ে উঠলো মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র গুলো হট্টগোল করছে মস্তিষ্ক জুড়ে। সোহানাকে রেখেই পুরো হসপিটাল চষা শুরু করে দিলো। কিন্তু কোথাও মিললো না কাঙ্খিত রমনীর টিকিটাও। হয়তো অন্য কেউ ভেবে হৃদস্পন্দনের টান উচাটন স্থীর হলো হিমশীতল বরফখণ্ডের ন্যায়।
এদিকে ভিজিটের টাকা নিতে আসার কথা বললেও টাকা ফেরত নিতে আসেন নি শুভ্রতার বাবা। মেয়ের পিছু পিছুই নেমে গিয়েছে। মেয়েটা একা একা কতটুকু কিভাবে যাবে কে জানে! মেয়েকে একা ছাড়তে বড্ড দুশ্চিন্তা হয় ওনার এখন।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৯