Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫০

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫০

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫০
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

মিথি স্মিত হেসে চা নিয়ে আসল। হিমেলের ভাবীর দিকে কাপ চা এগিয়ে ধরে শান্ত ভাবে বলল,
“ আমার মেয়ের বাবা তাকে মানে নি এটা যেমন সত্য ঠিক তেমনই আমার মেয়ের জন্য তার মা একাই যথেষ্ট ভাবী। জন্মের পর থেকে তার মা তাকে বাবা নেই বলে ছেড়ে দেয়নি। কিংবা বাবার শূণ্যতাও অনুভব করতে দিইনি। তাহলে? বিয়েটা আমি আমার মেয়ের জন্যই করেছি কে বলল আপনাকে ভাবী? ”
হিমেলের ভাবী ভ্রু কুঁচকালেন। মিথির মুখে তখনও অল্প হাসি। যেটা সহ্য হলো না। সত্যি বলতে মিথিকেই সহ্য হয় না। প্রথম দিকে এই মেয়েটাকে উনি যতোটা পছন্দ করতেন এখন তার বিন্দুমাত্রও অনুভব হয় না। মনে হয় এই তো তার বোনের সুখটুকু নষ্ট করল। এই মেয়েটাই তো তার বোন দিনদিন এমন নুইয়ে গেল। মেনে নিল সবটা। হিমেলের ভাবি মুহুর্তেই শুধাল,

“তো ওর জন্য নয় তো কার জন্য মিথি? তুমি তো হিমেলকে ঐ চোখে দেখোইনি বলেছিলে। তাহলে? ”
মিথি ফের মৃদু হাসে। জবাব দেয়,
“ দেখিনি তো। বিয়েটাও করতে চাইনি আমি ভাবি। কিন্তু যে পুরুষটা আমায় এত যত্ন উপহার দিয়েছে, এতোটা সম্মান, শ্রদ্ধা দিয়েছে তাকে অপমান করতেও আমার মন মানে নি। ”
হিমেলের ভাবী যেন বিদ্রুপ করে হাসল। বলল,
“ অপমান করতে মন মানে নি বলেই বিয়ে করে সংসার করছো? হাসাচ্ছো মিথি? ”
“ না তো।হাসাচ্ছি না। যার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে , আস্থা আছে তার সাথে একটা সংসার তো অনায়াসেই কাঁটানো যায়। তাই না? ”
“ শুধু শ্রদ্ধা আর আস্থার জোরে সংসার করছো? ”
মিথি তাকায়। চোখে হাসি রেখে সোজাসুজিই উত্তর করল,
“ একটা সংসারে শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসটাই তো সবচাইতে বেশি জরুরী ভাবী।”

হিমেল ফিরল সন্ধ্যার একটু পরই। এসেই ফ্রেশ হয়ে মিষ্টিকে কোলে তুলল। এইসেই করতে করতে দুইজনে বসেই সময় কাঁটাল অনেকটা। মিথি শুধু দেখছিল। অতঃপর হিমেল মিষ্টিকর নিয়ে নিজের ঘরে যাওয়ার পর মিষ্টির খাবারটা গরম করল সে। খাওয়ানোর জন্য বাটিতে করে নিয়েই পা এগোল। তারপর হিমেলের ঘরের সামনে গিয়েই বলল,
” আসব? ”
হিমেল চাইল। হিমেল মিষ্টিকে নিয়ে খাটের এককোণেই বসে ছিল। হাতে একটা খেলনা ধরানো৷ মিথিকে দেখেই উত্তর দিল,
“ এইটুকু পথ অসতে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন দেখছি না৷ ”
মিথি তারপরই পা বাড়াল। খাবারের বাটিটা একপাশে রেখে দুইহাত বাড়াল মিষ্টির দিকে। বলল,
” কোলে আয় প্রাণ। ”
মিষ্টি কোলেও গেল। মিথি এরপর মিষ্টিকে নিয়ে পা বাড়াতে যেতেই হিমেল গমগমে স্বরে শোনাল,

“ ওকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস? ”
“ সন্ধ্যায় খায়নি তো। খাওয়াতে হবে।”
হিমেল উঠল। মিথিকে আর একটা কথাও না বলে উঠে গিয়ে খাবারের বাটিটা হাতে করে আনল। অতঃপর আবারও একই জায়গায় বসে গম্ভীর ভাবে বলল,
“ আমি খাইয়ে দিব। ওকে দে। ”
মিথি শুনল। তারপর আবারও মিষ্টিকে বসিয়ে দিল। বলল,
“ আপনি মাত্রই ফিরেছেন হিমেল ভাই। ক্লান্ত না? ”
“ তুই আবার আমার কথা কবে থেকে ভাবছিস মিথি ? ”
মিথি আর উত্তর করল না। দাঁড়িয়ে থাকল ওভাবেই তবে হাতে পানির গ্লাস নিয়ে। হিমেল ততোটা সময়ে চামচে তুলে মিষ্টিকে খাওয়াচ্ছে এইসেই বলে বলে। মিষ্টিও না জ্বালিয়ে টুপটাপ খেয়ে নিচ্ছে। কাছ থেকে দৃশ্যটা সত্যিই সুন্দর মনে হলো মিথির। এই যে হিমেলের ভাবী বলল সংসারের কথাটা? সংসার নামক শব্দটার অযুহাতে মিথি এই জীবনে দুই দুটো পুরুষের সাথে পরিচিত হয়েছে। আদ্র এবং হিমেল। এবং দুইজন সম্পূর্ণ বিপরীত। একজন যেমন তার মন থেকে সংসার করার স্বপ্ন উঠিয়ে দিয়েছিল অপরজন একটু একটু করে তা ফিরিয়ে আনছে। একজন যেমন বিয়ের পরও নিজের স্ত্রীর প্রতি ছিল উদাসীন, অপরজন ততোটাই যত্নবান। মিথির ভাবনার মাঝেই ফোন বাঁজল। হিমেলের ফোনে। হিমেল যেহেতু মিষ্টিকে খাওয়াচ্ছিল তাই নিজ থেকেই বলল,

” মিথি দেখ তো কে কল করল। ”
মিথি পা বাড়িয়ে টেবিলের উপর থাকা ফোনটা নিল। সাবিহার নামটা স্পষ্টই ভেসে উঠেছে। মিথির মুহুর্তেই মনে হলো ওর আবারও একই রকম অনুভূতিটা হচ্ছে যেমনটা কাল রাতে হয়েছিল যখন হিমেল জানাল সাবিহার জন্মদিনে গিয়েছিল। কেন হচ্ছে? কষ্ট? নাকি খারাপ লাগা? মেয়েদের এই এক সমস্যা বোধহয়৷ কারোর প্রতি অনুভূতি থাকলে সে পুরুষটিই যখন অন্য কাউকে সময় দেয়, কথা বলে তা মেনে নেওয়া যায় না। মিথির ক্ষেত্রেও বোধহয় তাই হলো। তবুও সে খারাপ লাগাকে ছাপিয়ে রেখে ফোনটা এগিয়ে ধরে বলল,
“ হিমেল ভাই, সাবিহা আপু কল দিয়েছে। ”
“ ওহ, এদিকে দে। ”
হিমেল কল তুলল। কানে ফোন চেপে ধরতেই মিথি পা বাড়াতে নিল। হিমেল এবার নিজেই বলল,
“ তুই কোথায় যাচ্ছিস? ”
“ আপনারা কথা বলে নিন। আমি বাইরে আছি। ”
হিমেল শুনল। মিথি কি ইঙ্গিত করল? কোন ভাবে এটা ভেবে নিচ্ছে কি যে সে সাবিহার প্রতি দুর্বল? হিমেল মুখ গম্ভীর করেই চাইল। শক্ত কন্ঠে বলল,
“ এখানেই দাঁড়া। ”

কন্ঠটা দৃঢ় ছিল। মিথি আর সে দৃঢ় কন্ঠের বিনিময়ে সরতে পারল না। দাঁড়িয়ে থাকল। হিমেল তার টুকটাক কথা শেষ করল দুই সেকেন্ডেই। তারপর মিষ্টিকে খাওয়ানো শেষ করেই বলল,
“ আমি সাবিহার সাথে ফোনে প্রেমালাপ করব না নিশ্চয় যে তোকে ঘর ছেড়ে বাইরে দাঁড়াতে হবে মিথি। ”
এইটুকু বলেই মিষ্টি মুখ মুঁছিয়ে দিল।পানির গ্লাসটা মিষ্টির হাতে দিয়ে পানি খেতে বলল। তারপর পকেটে দুই হাত গুঁজে বলল,
“ ওকে দেখ, আমি আসছি৷ ”
মিথি অন্যমনস্ক ছিল। হিমেল পা বাড়িয়ে খাবারের বাটি টা রাখতে যাওয়ার পরই মিষ্টি গ্লাসে রাখা পানিটা হিমেলের বিছানায় ঢেলে ফেলল। মিথি তা টের পেয়েই হতাশ হয়ে চাইল। বলল
“কি করলে এটা আম্মু? কেন করলে এমনটা? ইশশ! বসো, বসো এখানে..”
এইটুকু বলতে বলতে পানি ফেলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু মিষ্টি আবারও নড়চড় করতে নিতেই ধমকে বলল,
“বসতে বলেছি না আমি চুপ করে? এমন করছো কেন তুমি? বসো একদম চুপ করে। ”
হিমেল ঠিক তখনই এল। বকা শুনে মিষ্টি ঠোঁট উল্টে নিয়েছে। যেন এক্ষুনিই কেঁদে ফেলবে। হিমেল তা দেখেই বলল,

“ ওকে বকা দিলি কেন? কেঁদে দিচ্ছে তো। বকা দিলি কেন? ”
মিথি চাইল। ভেজা বিছানা ছাদরটা তুলতে তুলতে বলল,
“ আপনার খাটে ও পানি দিয়ে দিল হিমেল ভাই।সরি, ওর হয়ে আমি সরি হিমেল ভাই। এমনটা করবে বুঝেই উঠিনি। ওর জন্য তো খুব সাফার করতে হচ্ছে আপনাকে। এইজন্যই বলছিলাম আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দিতেন। ”
হিমেল পাত্তা দিল না। মিষ্টিকে দুই হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিয়ে গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। একটা চুমু দিয়ে আদর দিয়ে বলল,
“ মিষ্টি? আসো হিমের কোলে? আম্মু বকেছে?হিম বকবে না।তোমার আম্মু খারাপ। ”
মিথি হাসল। নিজের ঘরে গিয়ে একটা নতুন বিছানা চাদর নিয়ে এসে মেলতে মেলতে বলল,
“ ওর আম্মুই সব ওর। ”
“ আমি? আমি কি? ”
“ ওর হিম। ”
হিমেল ভ্রু বাঁকাল। বলল,
“ আর কিছু হতে পারি না? ”

মিথির বোধহয় কষ্ট হলো না বুঝতে এই কথার অর্থ। মুখটা স্থির রেখে উত্তর করল,
“ আপনার আর মিষ্টির বন্ধুত্বটাই সুন্দর হিমেল ভাই। আমি আপনাকে আমার মেয়ের বাবা বানানোর উদ্দেশ্যে বিয়ে করিনি অবশ্যই। আর না তো আপনাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। তবে সত্যিই আপনার সাথে মিষ্টির সম্পর্কটা সুন্দর তা আমিও মানি। এবং আমার ভালোই লাগে। কিন্তু ওর বাবা মা দুইজনই আমি। শুরু থেকেই। মনে রাখবেন। ”
“ মনে রাখলাম। ”
“ আপনার সাথে মিষ্টির হুট করেই এত সুন্দর বন্ডিং তৈরি হওয়ার কৌশল কি? শুধু আদর ভালোবাসা? আমিও তো কম দেই না ওকে আদর ভালোবাসা। ”
এর আগে যে এতগুলো দিন মিথির গোপণেই মিষ্টিকে নিয়ে ঘুরেছে, ভালোবেসেছে তা তে মিথি জানেই না।হিমেল শুনল। বলল,
“ মিষ্টি নামটা আমি দিয়েছিলাম ওকে, তুই ডাকতে পারিস না। ”
“ কেন? ”
হিমেল পা বাড়াল। মিষ্টিকে কোলে তুলে রুমের বাইরে যেতে যেতে বলল,
“ যেমন ও তোর সন্তান বলে তুই-ই ওর একমাত্র মালিক তেমনই আমার দেওয়া নামে ডাকার অধিকারও আমার।”

এর ঠিক দুদিন পরই হিমেলের বেশ জ্বর নামল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।অথচ হিমেল প্রকাশ করে নি।অফিস থেকে ফিরলও খুব তাড়াতাড়ি। অতঃপর ফিরেই মিষ্টির সাথে অল্প একটু সময় কাটিয়ে আয়েশা খালাকে বলে নিজের ঘরে গিয়ে ঘুম দেওয়ার চেষ্টা করল। মিথি ফিরল তার একটু পরই। সন্ধ্যার জন্য চা করতে নিতেই কথায় কথায় আয়েশা খালা বলে উঠল,
“ হিমেল বাপটার মনে হয় অসুখ করছে আম্মা। আইসাই ঘুম দিল। চোখমুখ ও ভালো দেখাইল না। ”
মিথি ঘাড় ঘুরাল। জানতে চাইল,
” ফিরেছে হিমেল ভাই? ”
“ হ, আইজ আগেই ফিরছে। ”
মিথি শুনল। অতঃপর চুপচাপ চা করল। তারপর আয়েশা খালা যাওয়ার পর মিষ্টিকে কোলে নিয়েই হিমেলের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘুমোচ্ছে এখনো? এখন তো রাত আটটা বাজে। গলা ঝেড়ে আওয়াজ করল,

“ হিমেল ভাই? ”
ভেতর থেকে উত্তর এল না। মিথি আরো দুবার ডাক দিল। যখন উত্তর এল না তখন নিজেই দরজা ঠেলে পা বাড়াল। আলো জ্বালাল। তারপর দেখা গেল বিছানায় কম্বল চাপা দিয়ে চোখ বুঝে পড়ে আছে হিমেল। একদম বাচ্চাদের মতো।বোধহয় ঘুমোচ্ছে। মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। আবারও ডাক দিল। অথচ হিমেল উত্তর করল না। উপায় না পেয়ে মিথি যখন হিমেলকে হাত দিয়ে ঠেলে ডাকতে নিল ঠিক তখনই হাত ছুঁয়ে বুঝতে পারল যে হিমেলের গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে৷ এতোটাই জ্বর যে হিমেলের বোধহয় হুশ এ নেই। মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। বোধহয় এই কারণেই তাড়াতাড়ি ফেরা।
অতঃপর মিষ্টিকে বুঝিয়ে শান্ত বাচ্চার মতো পাশে বসিয়ে একটা বাটিতে জল এনে জলপট্টি দিল। তার একটু সময় পর মনে হলো হিমেলের জ্বর কমল। উত্তপ্ত মুখ, কপাল, গলা কিছুটা শীতল যেন। মিথি স্বস্থির শ্বাস ফেলে। তারপর আবারও একই ভাবে কম্বল দিয়ে ডেকে দিয়ে বের হয়ে এল মিষ্টিকে নিয়ে। তারপর অল্প একটু সময় নিয়ে মিষ্টিকেও খাইয়ে ঘুম পাড়াল।

তখন রাত বারোটা। বেশি রাত নয়। হিমেলের জ্বর কমেছে কিনা তা দেখতেই এই নিয়ে দুই তিনবার হিমেলের ঘরে এসেছে মিথি। খাবার খাওয়ার জন্য ডেকেছিলএ অথচ হিমেলের হেলদোল নেই। মিথি তাই কপালে হাত রেখে শুধ জ্বরটুকু চ্যাক করে আবার চলেও গিয়েছিল প্রতিবার। এখনও এল। প্রতিবারের মতো এবারেও হাত রাখল হিমেলের কপালে। আগে কমে এলেও এখন আবার উত্তপ্ততা বেড়েছে। জ্বরটাও। এইটুকু টের পেয়ে যখন আবারও বাটি ভর্তি পানি নিয়ে হিমেলের রুমে এল তখন হিমেলের চোখজোড়া মিনমিনে করে খোলা। মিথিকে দেখামাত্রই গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“ মাঝরাতে আমার ঘরে এলি? চরিত্রে দোষ হবে না তোর মিথি? ”
মিথি চাইল। কখাটা যে খোঁচা দিয়ে বলল তা বুঝতে কষ্ট হলো না তার। বলল,
“মনে তো হচ্ছে না। ”

এইটুকু বলেই এগিয়ে এল মিথি। কপালে জলপট্টি দিল পাশে বসেই। হিমেলের তীব্র জ্বর। গা ভর্তি জ্বর নিয়েই ও মিথিকে দেখল ছোট ছোট চোখে। কপালে জলপট্টি দিচ্ছে। হিমেল হেসে শুধাল,
“ তোর মনে হচ্ছে না আমরা সত্যি সত্যিই সংসার করছি মিথি? ”
সংসার তো সত্যিই করছে। সংসার না করলে কি করছে?মিথি জানে, তবুও বলল,
“ না।মনে হচ্ছে না। আপনি অসুস্থ বলে এসেছি। ”
“ শুনে খুশি হলাম যে অসুস্থ দেখে একটু হলেও মায়াদয়া হচ্ছে তোর। অথচ তোর সামনেই রোজ এক ক্ষতবিক্ষত পুরুষ চলাফেরা করে। তোর তখন একটুও মায়া হয় না। ”
মিথি শুনল। তবে উত্তর করল না। চুপচাপ খাবার গরম করে আনল। হিমেলের সামনে বসেই বলল,
“আমার অসুস্থতায় আপনব খাইয়ে দিয়েছিলেন হিমেল ভাই, এখন আমি খাইয়ে দিলে কিছি মনে করবেন না।”
এইটুকু বলেই খাবার মাখিয়ে মুখের সামনে ধরল। হিমেল তাকাল। মুখ এগিয়ে খেতে খেতে বলল,

“ শোধবোধ করছিস এসব করে?”
“ না।”
“ তাহলে? ”
মিথি এর উত্তরটা দিল না। শুধু খাইয়ে দিল নিশ্চুপে। তারপর এক হাতে ঔষধ আর অন্য হাতে পানির গ্লাসটা বাড়িয়েই বলল,
“ ঔষুধটা খেয়ে ঘুম দিয়েন। ভালো লাগবে। ”
জ্বরে চোখ জ্বলছে হিমেলের। মাথা ব্যাথায় টনটন করছে। উত্তরে বলল,
” জ্বরে চোখমুখ জ্বলছে আমার। মাথা ব্যাথা করছে,ঘুম হবে না আর।”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। হিমেল ঔষধটা খেতেই গ্লাসটা অপর পাশে রেখে হিমেলের চুলে হাত দিল। স্বাভাবিক ভাবেই চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ চোখ বুঝুন, আমি আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। ”
হিমেল অবিশ্বাস নিয়ে চাইল। মিথি নিজে থেকে ওকে ছুঁয়েছে? কি সাংঘাতিক! ভ্রু বাঁকিয়ে অবিশ্বাসের সহিত বলে উঠল,
“ কি আশ্চর্য! তুই ভালো হয়ে গেলি কবে থেকে মিথি? নাকি এটা তোর ভূত? নাকি তোর আত্মা? ”

তখন শেষ রাত। একটা নোংরা ময়লা খসখসে ফ্লোরে একটা পাতলা ময়লা মতো কাপড় বিছানো। আরাম আয়েশে নরম তুলতুলে বিছানায় ঘুমানো আদ্র আজ এই খসখসে ফ্লোরটাতেই নিজের অবস্থান গেড়েছে। চিৎ হয়ে পা দুটো সোজা করে বাম হাতটা রেখেছে দুই চোখের উপরেই। ডান হাত আলগোছে একপাশে রাখা। সে অবস্থাতেই যখন গভীর ঘুমে পাড়ি জমাল আদ্র ঠিক তখনই স্বপ্নের মধ্যে ভেসে উঠল ছোট ছোট আদুরে দুটো হাত। আদুরে ছোঁয়া। একটা নরম তুলতুলে আদুরে পুতুলের মুখ তার চোখের সামনেই। আদ্র হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখল পুতুলটাকে। গালে হাত দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে পুতুলটার দিকে তাকাতেই পুতুলটা হাসল। সুন্দর, মিষ্টি আধো আধো কন্ঠস্বরে আদ্রর চুলগুলো মুঠো করে বলে উঠল,
“ আব্ আব্ বু!”
আদ্র মুহুর্তেই হকচকিয়ে উঠল। শরীর ঘামছে তার।গলা শুকিয়ে আসছে কেমন। অথচ পরিবেশটা শীতল। বাইরে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। তবুও আদ্র ঘামছে। তীব্র অস্থিরতায় অস্থির হয়ে ও বিড়বিড় করে আওড়াল,

” আবারও, আবারও লিটল বাটারফ্লাই আমার স্বপ্নে এল মিথি! আবারও আমায় আব্বু ডাকল। আবারও। মিথি…বাটারফ্লাইকে আমায় একবার যদি দেখতে দিতি মিথি? আমি যদি সারাজীবনও চার দেওয়ালে বন্দি থাকতাম আপসোস হতো না মিথি। একটুও আপসোস হতো না। আমার ছোট্ট বাটারফ্লাইকে যদি একবার চোখ ভরে দেখতাম মিথি, একবার কোলে নিতাম, একবার ওকে জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদতাম মিথি? একটু তো মায়া করতে পারতিস এই অধমের প্রতি। একটু তো পারতিস মিথি…”
এইটুকু বলেই আদ্রর গলা জড়িয়ে এল। বুক ভার হয়ে এল। ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলে সে আবারও বলতে লাগল,
“ মিথি? আমার বাটারফ্লাইকে তুই দেখতে না দিলেও আমার বাটারফ্লাই বারবার আমার স্বপ্নে আসে৷ বারবার আমায় দেখা দেয়। তুই নিষ্ঠুর! তুই নিষ্ঠুর! কিন্তু আমার বাটারফ্লাই একটুও নিষ্ঠুর নয় । সে ঠিকই তার আব্বুকে দেখা দেয় বুঝলি? ”
আদ্র বিড়বিড়ই করছিল। পাশ থেকে কয়েদীর জামা পরা চিকনমতো ছেলেটা তখন ঘুমঘুম চোখে ভ্রু কুঁচকে চাইল। বলল,

“ কি হলো ভাই? কি বিড়বিড় করছো এমন?”
আদ্র চকচকে চোখে তাকায়। এই নিয়ে কত শতবার যে সে এমন স্বপ্ন দেখেছে। কতশতবার যে সে বাটারফ্লাই এর কথা বলেছে। আজও বলল,
“ আমার বাটারফ্লাই এসেছিল আজও ভাই। আজও আমায় আব্বু বলেছে। আমার পুতুলের মতো বাচ্চাটা! ”
ছেলেটা শুনল। অপরাধীদের দয়া মায়া থাকতে নেই। তবুও এই ছেলেটার জন্য মাঝেমধ্যে তার দয়ামায়া হয়। নিজের ছোট্ট বাচ্চার জন্য কত আহাজারি, অথচ বাচ্চাটাকে দেখেইনি সে একবারও। সান্ত্বনা স্বরূপ বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৯

“ ইশশ রে! ঐ ঐটুকু মেয়ের জন্য কত মায়া করো তুমি ভাই। এত মায়া করো, যদি শুরুতে ভুলগুলা না করতা ভাই! তাহলে তো বাচ্চাটা আজ তোমার কাছেই থাকত। তোমারই হইত। ”
আসলেই তো! যদি ভুলগুলো না করত? কি হতো? কি এমন হতো? কেন আদ্র এমন পাগলামে করল তখন? কেন সন্তানের মায়া বুঝল না?কেন মিথিকে এতোটা কষ্ট দিল? না দিলে তো আজ তারও একটা সুন্দর সংসার থাকত, বাচ্চা থাকত, সুখ থাকত।

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫১