Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৬

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৬

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৬
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

সাতসকালে ঘুম থেকে উঠেই হিয়া তৈরি হলো। অতঃপর বের হয়েই দীপ্রর মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত বের হলো ও বাসা থেকে। বাসাটায় তার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। শুধু কান্নাই আসছিল। দীপ্রকে আর ও মেয়েকে যতবার দেখছিল ততবারই বুকের মধ্যে কি যেন হৃৎপিন্ডটাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করেছে। হিয়া চোখ বুঝে। নিজেকে শান্ত করর রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে থাকার মাঝেই দীপ্র এল দৌড়াতে দৌড়াতে। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,
“ হিয়ার বাচ্চা হিয়া, তোকে বলেছি না আজকে থাকতে। নিশু আমাদের ট্রিট দিবে।”
নিশু? শুনেছিল মেয়েটার নাম নিশিতা। হয়তো ছোট করে ভালোবেসে নিশু ডাকে। হিয়া হাসে। বলল,

“ ভালো তো, কিন্তু আমার সুযোগ হবে না যে। অন্য একদিন ট্রিট নিব। ”
দীপ্র ফের আবারও বলল,
“ আজই নিবি। ”
“ কাজ আছে আমার। ”
” হুট করেই কাজ বেড়ে গেছে তোর? কি এত কাজ? বল আমায়। ”
হিয়া কিছুই বলল না। তবে দু পা সরে দাঁড়াল। একটা রিক্সা পেয়ে উঠে বসতেই সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল দীপ্রও। হিয়া প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“ কি সমস্যা দীপ্র? আমি ভার্সিটিতে যাব। তুই কেন উঠে বসলি? ”
“ নিশুর জন্য শাড়ি কিনব। তুই চয়েজ করে দিবি মার্কেটে গিয়ে তাই। ”
হিয়া এবারে ছোটশ্বাস ফেলল। জানাল,

“ আচ্ছা। ”
এরপর রিক্সা চলল আপন গতিতে। দীপ্র খেয়াল করেছে, হিয়া আজকাল তার সাথে খুব একটা প্রয়োজন ব্যাতীত কথা বলে না৷ এই যেমন আগে হলে রিক্সায় যেতে যেতে দুইজনই বকবক করত। আর এখন চুপ। এতসব ভেবেই দীপ্র জানতে চাইল,
“ তোর কি নিশুকে পছন্দ নয় হিয়া? তুই তো নিশুর সাথে খুব মিশিশ না। ও খুবই ভালো। ”
হিয়া হেসে ফেলল।বাহ! দীপ্র তার প্রিয় মানুষের প্রশংসা করছে? নিজের কষ্টটা লুকিয়ে নিয়ে বলল,
“ কেন পছন্দ হবে না পাগল? খুব পছন্দ হয়েছে। আমার বন্ধুরই বউ হব ও অথচ পছন্দ হবে না? এটা কোন কথা বললি?”
“ তাহলে? ”
হিয়া উত্তর না দিয়ে আচমকা প্রশ্ন করল,
“তোদের প্রেম হলো কবে দীপ্র? দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরপরই? ”
“নাহ তো। এর একটু পর।”
হিয়ার মন খারাপ হলো। বন্ধু হিসেবেও কি হিয়া ব্যর্থ? বন্ধু হিসেবে তো হিয়াকে জানানো যেত বিষয়টা। যেত না? আরো আগে জানলে আরো আগেই হয়তো অনুভূতিকে সামাল দেওয়া শিখত। বলল

” জানাসনি আগে।”
“ ভুলে গিয়েছিলাম। ”
হিয়া হাসল। বিদ্রুপের হাসি হেসে বলে,
“ ভুলে গিয়েছিলি? রিয়েলি? ”
“ এমনভাবে হাসিস কেন? সত্যিই বলতে মনে নেই। ”
“ হু। ”
এরপর আবারও চুপ হলো দুইজনে। তারপর আবার দীপ্রই কথা বলল যখন পথের ধারে ফুসকাওয়ালার দেখা মিলল। হিয়াকে দ্রুত বলল,
“ ফুসকা খাবি হিয়া? ”
“ না। ”
“ কেন? ”
“ ভালো লাগছে না।”
“ আগে তো পছন্দ করতি। ভালোও লাগত।
হিয়া হাসে। বলে,

“ পছন্দ বদলায় দীপ্র। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, মানুষের পছন্দগুলোও বদলায়। তুইও তো বদলেছিস তাই না? আমিও বদলেছি। ”
“আমি একচুলও বদলাইনি। ”
হিয়া হেসে জানাল,
“ এইতো বেশ সুন্দর হয়েছিস, নায়ক নায়ক লাগছে। বদলই তো বল? ”
“কিন্তু আমার পছন্দ তোর মতো বদলায় না। ”
হিয়া এবারে ভ্রু বাঁকায়। কাকিয়ে বলে,
“ শিওর?”
“ খুব শিওর। ”
হিয়া মাথা নাড়ায়। মৃদু হেসে অন্যদিক ফিরে বিড়বিড় করল,
“ তাহলে হয়তো আমার ধারণাটাই পুরোপুরি ভুল ছিল। পুরোপুরিই!”

একটা নিরব নিস্তব্ধ বাড়ির ধুলোজমা এক জানালার ধারে হুইল চেয়ারে বসে আছেন আমজাদ সাহেব।তার প্রথম স্ত্রী আরুনিমা মারা গিয়েছেন এইতো দেড় বছরেরও অধিক সময় । এই সময়গুলোতে আমজাদ সাহেব ক্ষণেই ক্ষণেই টের পেয়েছেন যে পুরুষ মানুষ সত্যিই তার প্রথম ভালোবাসাকে ভুলে উঠতে পারে না। যে নারীকে প্রথম ভালোবেসেছেন, ভালোবেসে উম্মাদ হয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন সে নারীটিকে হারানোর এক অসহ্য যন্ত্রনা আজও বুকের ভেতর পুষে রাখেন। প্রথম সংসার, প্রথম অনুভূতি, প্রথম ভালোবাসা সবই ছিলেন আরুণিমা। মাঝে এক মোহ এল। আর সে মোহতেই আটকা পড়ে গেলেন আমজাদ সাহেব। যার দরুণ হারাল নিজের প্রথম ভালোবাসার মানুষটিকে, হারাল নিজের সন্তানটিকেও যাকে এতোটা কষ্ট করে বড় করেছে। এতোটা আদরের ছিল তার ছেলেটা! আমজাদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এইতো একবছরের মতো সময় হলো তার এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রীর শরীরে এইডস শনাক্ত হয়েছে। তার দ্বিতীয় স্ত্রী চিকিৎসা করালেও আমজাদ সাহেবের দিকটা সে খু্ব একটা গুরুত্বই দেয়নি।বরং উল্টো রেগেছে।আমজাদ সাহেবের উপর যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে নিজেকে এখন সে এই সবকিছুরই মালিক দাবি করে।আমজাদ সাহেব এখন নামমাত্রই আছে। নামমাত্রই তার উপস্থিতি। শুধু নিশ্চুপ চেয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ নেই। দেড়বছরের মতো হলো আমজাদ সাহেব হাঁটতে পারেন না, ঘরবন্দি। হুইলচেয়ারই এখন তার নিত্যসঙ্গী। এই হুইলচেয়ারের সাথে অবশ্য কয়েকটা কাগজের টুকরো ও সঙ্গী হয়েছে আমজাদ সাহেবের। সাথে আধছেড়া এক ডায়েরী। আমজাদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে আজও উল্টালেন সে আধছেড়া ডায়েরীটা। যার শেষের কয়েকটা পাতাই আছে। বাকি প্রায় অর্ধেক পৃষ্ঠায় ছেড়া হয়েছে। আমজাদ সাহেব চোখ বুলালেন। গুঁটি গুঁটি অক্ষরে পাতাটায় লিখা আছে,

“ যে তোমাকে ভালোবেসে আমি ঘর ছাড়লাম, পরিবার ছাড়লাম, স্বজন ছাড়লাম সে তুমিই আজ অন্য কারোতে মত্ত আমজাদ। যে তোমাকে আমি এই বয়সে এসেও কিশোরীদের মতো ভালোবাসি, অনুভূতিতে নুইয়ে পড়ি, লজ্জায় ডুবে যাই সে তুমিই কি করে পারলে আমায় ভুলে যেতে? কি করে পারলে নতুন কারোর মধ্যে সুখ খুঁজতে? যে তোমার জন্য আমি আমার সারাজীবন উৎসর্গ করলাম সে তুমি আমায় ছিটকে সরিয়ে দিলে? কেন? কি অপরাধ ছিল আমার আমজাদ? ”

এটা বোধহয় তখনকার লেখা যখন আরুনিমার চোখে প্রথমবারের মতো আমজাদ সাহেবের পাপের কথা প্রকাশ পাচ্ছিল। যখন একটু একটু করে জানতে পারছিল যে তার স্বামী আর তার স্বামী নেই। তার ভালোবাসার মানুষটি তার নেই, বরং অন্য কারোর হচ্ছে। আমজাদ সাহেবের বুক ভারী হয়। আরুণিমা সত্যিই অভিমানে মুখ সরাত, আমাজাদের উপর তুচ্ছ অভিমান পুষে কেঁদেছিলও প্রথমবার। সে আমজাদ কি করল? মোহের প্রতি এতোটাই মগ্ন ছিল যে নিজের স্ত্রী গায়ে হাত তুলতেও দুবার ভাবেনি। আমজাদের সবটা স্পষ্টই মনে পড়ে। স্পষ্টই। তার প্রিয়তমারই জন্মদিন আজ। ভালোবাসার শুরুর দিকে আমজাদ এই দিনটির অপেক্ষায় থাকত। কবে দিনটা আসবে? কবে নিত্যনতুন সারপ্রাইজ দিয়ে মানুষটাকে খুশি করবে? এর পরের বছর গুলোও কাঁটল একইভাবে। আমজাদ কোনকিছুতেই কমতি রাখে নি। কোনকিছুতেই না। কিন্তু শেষদিকটায়? জীবনের শেষদিকটায় আমজাদ এমন এক ভুল করল যে আরুণিমার কাছে সে সারাজীবনের জন্য অপরাধী হয়ে গেল। আমজাদ সাহেবের চোখ ভিজে আসে। আরেকটা পাতা উল্টে চোখ বুলাতেই চোখে এল,

“ একটা দীর্ঘ সংসারের পর তুমি আমায় এতোটাই আঘাত করলে যে আমি মরে গেলেও তুমি বোধহয় একটুও বিচলিত হবে না আমজাদ। অথচ তোমার বর্তমান প্রিয়তমার আঘাতে তুমি আকুল হয়ে ছুটছো। কত যত্ন, কত চিন্তা, কত অস্থিরতা বলো? এতোটা ভালোবাসা কবে জন্মাল আমজাদ? সংসারের বয়স ত্রিশ পার হলো অথচ আমি বোকাই থেকে গেলাম আমজাদ। তোমার এই পরিবর্তন বুঝেই উঠতে পারিনি? আমি তো সহ্য করতে পারি না আমজাদ। বুকের ভেতর কষ্ট হয়, যন্ত্রনা হয়। মনে হয় আমি মরে যাচ্ছি। কি এমন দেখলে আমজাদ তার মধ্যে? কি কমতি ছিল আমার যে তোমায় আটকাতে পারলাম না আমজাদ?”
এটা, এটা বোধহয় সেদিনের লেখা যেদিন তার আর তার দ্বিতীয় স্ত্রী ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল। আদ্রর বাবা ফের পাতা উল্টাল।

” আমজাদ তুমি কোন এক সময়ে বলেছিলে আমায়, ভালোবাসা হলো এক মরনব্যাধী রোগ। যা আমৃত্যু মানুষের মধ্যে বিরাজ থাকে। অথচ তোমার কথাটা ভুল হলো সাহেব। ভালোবাসা আমৃত্যুই থাকে তবে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জন্য। মানুষ নতুনের প্রেমে পড়ে৷ নতুনের ভালোবাসায় ডুবে মরে পুরাতনকে ভুলে যায় এক নিমিষেই। ঠিক যেমন তুমি আমাকে ভালোবাসার সংজ্ঞা থেকে সরিয়ে দিলে। আমি মানুষটা সয়ে যাই কি করে এই কষ্ট আমজাদ? বলো তো! ত্রিশ বছরেরও বেশি যে মানুষটার সাথে থাকলাম তাকে এত সহজেই ছেড়ে দিব? উহু না! আমি বরং মরণব্যাধী রোগের স্মৃতি হয়েই তোমার সাথে থাকলাম আমৃত্যু। একটা সামান্য রোগের বাহানাতেই নাহয় আমায় মনে করলে আমজাদ। যে অবহেলা, বিশ্বাসঘাতকতা, যন্ত্রনা তুমি আমায় উপহার দিয়েছো আমজাদ তার বিনিময়ে না হয় আমি তোমায় একটা সামান্য সুঁই এর ছোঁয়া, একটা সাধারণ এইডস আক্রান্ত রোগীর শরীরের লাল তরল আর ভালোবাসার মতো এক মরনব্যাধী রোগই উপহার দিলাম। ক্ষতি হবে কি? হলেও আমি আপসোস করব না। যে উপহার তুমি আমায় দিয়েছো তার তুলনায় এটা খুবই সামান্য। ”
এর পরের পাতাটা খালি। ঠিক তারপরের পাতাটাতেই লেখা,

“ তুমি ভেবে নিও এটা চক্রান্ত কিংবা ষড়যন্ত্র।যে ষড়যন্ত্র তুমি আমার বিরুদ্ধে করলে তার চেয়ে কম ষড়যন্ত্র বলো? শুধু এক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষ খুঁজলাম। তারপর তার শরীরের লাল তরল তোমায় দিলাম। তোমার মতো নারী খুঁজিনি বলো আমজাদ? জীবন্ত মেরে দেওয়ার জন্য নতুন করে কাউকে ভালোওবাসিনি। তোমাকেই বেসেছি, তোমাকেই বাসলাম, মৃত্যুর আগ অব্দিও তোমাকেই ভালোবাসব। না, ঘৃণা করব না তোমাকে। ভালোবাসার মানুষকে চাইলেও যে ঘৃণাটা করতে পারি না। তবে ক্ষমাও করব না। যে কষ্টটা তুমি আমায় দিয়ে সে কষ্টটা খোদা তোমায় দিক। তুমিও বুঝো প্রিয় মানুষ কাকে বলে, প্রিয় মানুষ হারানোর যন্ত্রনা কি৷রোগে হয়তো তুমি ভুগবে না তবুও এই হীন কাজটি করে আমি শান্তি পেয়েছি। শান্তিই তো আসল বলো? চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখন কতশত রোগের চিকিৎসা সম্ভব হয়ে উঠেছে। তবুও আমায় ঠকানোর শাস্তিস্বরূপ রোগটা তোমার আজন্ম থাকুক। আজন্ম! মরণের আগ অব্দি যেমন তোমার পাশে আমার থাকার কথা ছিল? ঠিক তেমনই আমার হয়ে এই মরনব্যাধী অসুখটায় তোমার সঙ্গী হোক। তোমার শরীরের প্রতিটা কণায় আমার হয়ে উপস্থিত থাকুক।”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৫

আমজাদ সাহেব পড়লেন। বিড়বিড় করে পড়েই চোখ বুঝতেই পেছন থেকে তার মা বলে উঠলেন,
“ কি দরকার ছিল বাপ খারাপ মাইয়াগো সাথে মেশার? কি দরকার ছিল? এখন যে এই অপবিত্র অসুখটা তোর হলো মানুষরে আমি বলতে পারি না। মানুষ শুনলেই কেমন নাক সিঁটকায়।
আমজাদ সাহেব চাইলেন। তার বৃদ্ধা মাই তার সেবাযত্ন করার একমাত্র মানুষ এখন। আর কেউই পাশে নেই কেউই না। নিজে নিজে একা একা চলতে না পারাটাও যে কতোটা ব্যর্থ জীবন তা আমজাদ সাহেব বুঝে। এবং দুঃখজনক হলে তাকে এই জীবনটা উপহার দিয়েছে তার নিজের ছেলে আদ্রই। দু দুটো পাকে ধারালো কুঠোর দিয়ে কুফিয়ে ছিল ইচ্ছেমতো। নিজের যত রাগ, যত ক্ষোভ সব মিটিয়েছিল।

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৭