প্রিয় মোনালিসা পর্ব ২
নীতি জাহিদ
পরিকল্পনা মোতাবেক চেয়ারম্যান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টরদের মিটিং আলাদা, অফিস স্টাফ ও অন্যান্য অফিসারদের আলাদা। সেই পরিকল্পনা বানচাল করে সকলকে কনফারেন্স রুমে আসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সবাই উপস্থিত কনফারেন্স রুমে। ফিসফিস আলাপ চলছে চেয়ারম্যান স্যারকে ঘিরে। সকলের দৃষ্টি রুমের স্বয়ংক্রিয় দরজার দিকে। দেয়ালে আটকানো ডিজিটাল ঘড়ির লাল সংখ্যা গুলো নির্দেশ দিচ্ছে সঠিক সময়ের। ঠিক দশটায় খুলে গেলো রুমের দরজা। তিনজন কে ঢুকতে দেখে একসাথে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা হচ্ছে। এদের মধ্যে পুরোনো অফিসার এবং স্টাফদের কাছে তিনজনই পরিচিত। গত চার বছর যারা জয়েন করেছে তারা চেয়ারম্যান স্যারের ছবি দেখেছে কিন্তু বাস্তবে দেখেনি। সবাইকে বসার আহবান জানিয়ে নিজেরাও বসে পড়লেন। উৎকন্ঠা সকলের মধ্যে কাজ করছে। পিনপতন নীরবতা কনফারেন্স কামরা জুড়ে। এসির টেম্পারেচারে কামরা যতটা হিমশীতল তার চেয়েও অধিক শীতল বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট। ফাইলের পাতা উল্টানোর খচ খচ আওয়াজ। প্রতিটি এগ্রিমেন্ট সুক্ষ্ম ভাবে পড়ছে সকালে আগত চেয়ারম্যান স্যার । তাকে সহায়তা করছেন বাকি দুজন ডিরেক্টর।
প্রথম দেখাতেই সকলের নজর কেড়ে নিলো। আকাশ রঙা শার্টে ভারী মানিয়েছে। দেহের কালো রঙটা ছাপিয়ে গিয়েছে। ফরসা নয়নকে ফিকে লাগছে। মুখের অভিব্যক্তি গম্ভীর। চোখে ব্রাউন রোদচশমা। রোদ নেই তবুও রোদ চশমা। এত অদরকারী ভাবের কি আদৌ প্রয়োজন আছে! চোখ দুটো হালকা বুঝা যাচ্ছে। তীক্ষ্ণ চোখ। তবে ধারনা করা যাচ্ছে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষটা। বয়স আন্দাজ করা দুষ্কর। হাত দুটো টেবিলের উপর রেখে জড়ো করে মুঠ করলো। পাশ থেকে একজন স্টাফকে ডেকে কিছু একটা নির্দেশ দিতেই হলরুমের চক চক করা হলুদ বাতিগুলো বন্ধ হয়ে গেলো। রোদ চশমা খুলে সাধারণ রিমলেস চশমা চোখে দিলো। এতক্ষনে সকলের ধারণা বদলালো হলুদ আলোতে হয়তো এই মহাশয়ের সমস্যা হয়। সাধারণত এসব আলোর জন্য মাথা ব্যাথা বেড়ে যায়। গম্ভীর, দাম্ভিক, অহংকারী মানুষের প্রতিচ্ছবি লক্ষ্যণীয়। ফাইল থেকে মুখ তুলে সামনে তাকালো।
নয়ন দুজনের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সকলকে সালাম দিয়ে বক্তব্য শুরু করলো,
– আসসালামু আলাইকুম। আশা করছি সকলে ভালো আছেন। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ও আপনারা আমাদের পাশে আছেন আমরা কৃতজ্ঞ। তবে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে আদৌ কাম্য ছিলোনা। ওয়ার্কাররা যেসব ঝামেলা করছে, তার জন্য কোনো না কোনো ভাবে আপনারাও দায়ী। আমরা জানার আগে এসব গুঞ্জন আপনাদের কানে এসেছিলো অথচ আমাদের কোনো ভাবেই অবগত করেন নি। বিশেষ করে জোবাইদা ম্যাডাম, মানছি আপনি সবাইকে আগলে রাখেন এখন যে ব্যাপারটা ঘোলাটে হলো তার দায় ভার কে নিবে?
মাথা নত জোবায়দার। নয়নের খুব অপমানে লেগেছে আজ। বন্ধু এসেছে অবধি ভালো কথাও বলেনি একটি বার। নিশ্চিত রেগে আছে। যেভাবে শান্ত হয়ে নিজেকে সামলে চুপচাপ সব দেখছে হয়তো ঝড় আসার আগের পূর্বাভাস। কিছুটা থেমে মিনহাজের দিকে তাকাতেই ইশারায় বুঝালো নয়নকে চালিয়ে যেতে,
– প্রথমত, তিনমাস নয়, ছ’মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রতিটি নারীর প্রাপ্য। মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত। প্রতিটি মা ই সম্মানিতা। তাই ন্যায্য ছুটি দেয়া হবে। কিন্তু,তিন মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি কোম্পানি কেনো দিবে? তার চেয়ে বড় কথা আমরা প্রতিষ্ঠান চালাই, সাহায্যকেন্দ্র নয়। এর মধ্যে তাদের নতুন দাবী পুরো বেতন দিতে হবে। পুরো বেতন তো দূরের কথা বেতনই বা কেনো দেব? তহবিল খুলে রেখেছি আমরা?
চেঁচিয়ে উঠলো নয়ন। অফিসের সকলে এমনিতেই নয়নকে যমের মতো ভয় পায়। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভুল পেলেই নয়ন যেভাবে রিয়েক্ট করে অন্য কেউ এর উপর কথা বলার সাহস টুকু পায় না। আজ তো হিটলারের মতো আচরণ করছে। মিনহাজ স্যার যে বাকিদের কাজেকর্মে বিরক্ত সকলের উপলব্ধি হয়ে গিয়েছে। নতুবা স্যার সবসময় ব্যাপারগুলো বুদ্ধিমত্তার সাথে সামলে নিতেন।
নয়ন থামতেই মিনহাজ নয়নকে বসিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সালাম দিয়ে বললো,
– আপনাদের সমস্যায় আজ পর্যন্ত কোম্পানি কম্প্রোমাইজ করেনি এমনটা কি হয়েছে কখনো?
সকলে মাথা নাড়লো না সম্মতিতে।
– তবে কেনো আজ ঝামেলায় আপনারা নিষ্ক্রিয়। ফ্যাক্টরিতে যখন ঝামেলা হলো তরিক সাহেব, মাসুম সাহেব আপনারা পালিয়ে এলেন। আই রিপিট পালিয়ে এলেন, এত সিনিয়র কর্মকর্তা হয়ে পালিয়ে আসা ভীষণ লজ্জা জনক। মাথা হেট করে দিলেন আমাদের। ভরসা করা কি অন্যায় হয়েছে?
এতক্ষনে চেয়ারম্যান স্যার মুখ খুললেন, একেতো স্বর ভারী এর মাঝে নেই কোনো রস-কস। এসেই সরাসরি মোদ্দাকথা,
– আমার পরিচয় পর্ব দিয়ে বক্তব্য দীর্ঘ করার প্রয়োজন মনে করছি না, অন্য সময় গেট টুগেদার পার্টি রাখা হবে। আসল কথায় আসি, শুধুমাত্র একমাস পিতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া হবে। ক্লিয়ার! ‘ডট মাই পয়েন্ট’ ওনলি ওয়ান মান্থ। তবে সেটা সেই স্বামীর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে, আসলে সে কি বউয়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করে কিনা! বউ কি খুশি তার উপর এবং কতটা যত্নে রেখেছিলো বউয়ের গর্ভকালীন সময়ে! সব কিছু যাচাই-বাছাই হবে। যদি স্বামী যত্নবান হয় তবে সেই মাসের পুরো বেতন, গর্ভবতী মায়ের এক মাসের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ ও বাচ্চার জন্য উপহার সামগ্রী এই প্রতিষ্ঠান বহন করবে। এর বাইরে কিছু কেউ চাইলে তাকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করা হবে। এই প্রতিষ্ঠানে ক্ষ*তিকারক ব্যক্তির প্রয়োজন নেই। ইট’স ক্লিয়ার এন্ড ফাইনাল। যতটা বলেছি এতটা সুযোগ আশা করি কেউ দিবেনা। যতদূর ধারনা বাইরের মহলের উসকানিতে এসব অপ্রত্যাশিত ঘটনার সৃষ্টি। কিছুক্ষনের মাঝে নয়ন সাহেব এবং মিনহাজ সাহেব সহ ফ্যাক্টরির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিচ্ছি। আপনারা টিউলিপ পরিবারের সদস্য তাই আপনাদের সাথে কতৃপক্ষের সিদ্ধান্ত শেয়ার করলাম। কিছু জানার এবং কোনো কার্যোপযোগী অভিমত থাকলে জানাতে পারেন।
সকলের কথার মাঝে ভারী মোটা স্বরটা সোজা গিয়ে কানে লেগেছে। প্রতিটি কথাই যেন ঝংকার তোলা ধমক ছিলো। অথচ না চিৎকার, না বকা না ধমক। কোনোটিরই বহিঃপ্রকাশ ছিলোনা বাক্যে। ছিলো শুধু মোহ। মানুষটা কি এভাবে সকলকে কাবু করে! অপ্রয়োজনীয় একটি কথাও বললেন না। সময়ের কাঁটায় গুরুত্ব দেয়া মানুষ গুলো খুব খিটমিট করে, কিন্তু এই মানুষটা সম্পূর্ণ বিপরীত। ঠান্ডা মাথায় কিস্তিমাত।
কথা শেষ করে চেয়ারে বসে মিনারেল ওয়াটারের বোতল খুলে পানি ঢালছে। অফিসাররা উশখুশ করছে৷ গ্লাসে একচুমুক দিয়ে সামনে তাকালো। সিনিয়র এক্সিউটিভ তামান্না ইসলাম হাত তুললো। ইশারায় অনুমতি দিলো। তামান্না দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন,
– স্যার এই প্রস্তাবনা কি শুধু আমাদের ফ্যাক্টরির কর্মীদের জন্য নাকি অফিসারদের জন্য ও প্রযোজ্য?
মানুষটা একপেশে হাসি দিলো। থুতনিতে বৃদ্ধাঙ্গুল রেখে নিম্ন ওষ্ঠে তর্জনি রাখলো। তর্জনি ধনুকের মতো বাঁকা। এতক্ষন গম্ভীর হয়ে কথা বললেও তার অদ্ভুত হাসিতে অফিসের সকলে হতবাক। কালচে শ্যাম বর্ণের পুরুষের হাসিতে ডান পাশের গালে খাদ সৃষ্টি হয়েছে। এই হাসি কি মনোরম দেখতে কিন্তু হাসির মাঝেই মনে হয় যেন আতঙ্ক লুকিয়ে আছে। ঘায়েল করা সেই হাসি। ঠোঁট চেপে হেসে তামান্নার প্রশ্নের জবাবে বললো,
– অভিনন্দন।
তামান্নাসহ সকলে থতমত খেয়ে চেয়ারম্যানের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোনে এখনো সেই ঘায়েল করা হাসি। নিজেকে সামলে বললো,
– আমি মিষ্টি খুব কম খাই। আপনি যদি ছানার মিষ্টি খাওয়ান তাহলে খেতে পারি।
শুকনো ঢোক গিলে তামান্না। আর একটি কথাও বাড়ায় নি। একেবারে নির্বাক। চেয়ারম্যান স্যার পুনরায় উত্তর দিলো,
– যেহেতু অফিসে সবাই আশরাফুল মাখলুকাত সেই সুবাদে এই নিয়ম টিউলিপ ইন্টারন্যাশনাল থেকে শুরু করে তার প্রতিটি সিস্টার কন্সার্ন এর জন্য প্রযোজ্য। আমি কি বুঝাতে পেরেছি?
তামান্না মাথা নেড়ে বুঝালো বুঝতে পেরেছে। পুনরায় প্রশ্ন আসলো,
– আর কারো কোনো প্রশ্ন?
সকলে না জানালো। সবার পছন্দ হয়েছে এই সিদ্ধান্ত। শ্রমিকদের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক লেগেছিলো সবার। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়েছিলো যে সামলাতে যেয়ে হিমশিম খাচ্ছিলো সকলে।
কৌতুহলী ভঙ্গিতে আরেকজন এক্সিকিউটিভ তিহান পাশের কলিগকে ফিসফিস করে বললো,
– তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে হবে। একমাসের ছুটি কি বিশাল ব্যাপার।
এই কথা চেয়ারম্যান ইমরান শরীফের কানে আসেনি তবে মিনহাজ এবং নয়নের কানে ঠিকই এসেছে। কি কান্ড! একমাস ছুটি দিবে বলায় সবার এই অবস্থা আর যদি ছয়মাস বলতো কি অবস্থা হতো! ভাগ্যিস ইমরানের কানে আসেনি। ওর কথা নিয়ে এই ছেলে মজা করছে এ কথা যদি জানতে পারে এখনই তিহানের ভবিষ্যৎ ছুটি বাতিল হয়ে যেত।
ম্যানেজার মনোয়ার সাহেব একটা ফাইল বাড়িয়ে দিলে ইমরান তা সাইন করা শেষ করে দুজনের দিকে তাকিয়ে দেখে দুজনই মিটমিট করে হাসছে, নয়ন কি যেন মিনহাজকে বলছে। শেষ কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় টিউলিপের চেয়ারম্যান ,
– ঠিক আছে, দ্যাটস অল ঠুডে। অফিস এনভায়রনমেন্ট যেন ম্যানেজেবল থাকে। অফিশিয়াল ডেকোরাম বজায় রাখার অনুরোধ সকলকে। ধন্যবাদ।
হনহন করে বেরিয়ে গেলো চোখে কালো চশমা দিয়ে। পিছু নিলো নয়ন এবং মিনহাজ। করিডরে হাঁটতে হাঁটতে ফিসফিস করছে নয়ন মিনহাজের কানের কাছে। তখনই খানিকটা ঘাড় ঘুরিয়ে নয়নের দিকে ফিরে বললো,
– যেভাবে একটু আগে মিটিং কন্ডাক্ট করেছিস সেটা কি আমি আসার আগে করা যেতো না? মিটিং টা আমাকে কেনো এরেঞ্জ করতে হলো?
নয়ন গাল ফুলিয়ে বলে,
– তোকে দেখলে শরীরে যে তেজ আসে ওটা কি আর আসে খালি মাঠে?
ইমরান মিনহাজের দিকে তাকাতেই মিনহাজ কাচুমাচু করে নয়নের দিকে ফিরে বললো,
– ফরফর করে মুখ দিয়ে যা তা বের করিস, কথার মিনিং চিন্তা করে কথা ছাড়লে কি অন্যায়? বেয়াদপ।
– সবসময় শুধু বকা আমাকেই দাও তুমি। ওকেও তো মাঝে মাঝে দিতে পারো।
ইমরানের কেবিনে ঢুকতেই বসলো তিনজন। মিনহাজের দিকে তাকিয়ে রূঢ় স্বরে বললো,
– ভাই তুমি নিজেই তো সামলে নিতে পারতে ব্যাপারটা। আমাকে কেনো ডাকলে? তোমাকে সবাই যথেষ্ট রেসপেক্ট করে।
– তোর বুঝতে হবে বয়স হচ্ছে আমার। ফ্যাক্টরিতে ঝামেলা প্রকট আকারে ধরা দিবে তুই না গেলে। আমি পারবোনা সামলাতে।
মিনহাজের কথায় বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা প্রকৃতপক্ষেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। এবার কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
নয়ন মুখ গোমড়া করে বসে আছে। ইমরান এবং মিনহাজ ফাইল নিয়ে আলোচনা করছিলো। এই পরিবেশ তার ভালো লাগছে না। একটু আনন্দ না করলে হয়! ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কি আনছিস আমার জন্য ইতালী থেকে?
মিনহাজ এবং ইমরান দুজনই নয়নের কথায় মুখ তুলে তাকালো। ওদের সিরিয়াস আলোচনার মাঝে এমন একটা প্রশ্ন মানায়! ইমরান মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
– ভাই, ও কি ইদানীং এমন পাগল হয়েছে নাকি আরো আগে থেকে?
নয়ন ক্ষেপে বললো,
– আমি পাগল?
মিনহাজ আবার মাঝে ফেসেছে। কপালে হাত দিয়ে,
– শুরু করলি আবার তোরা? আর নয়ন, এমন একটা আলোচনার মাঝে তুই আর কথা পেলিনা?
– আমি কি করলাম ও এমন বোবার ভাব ধরছে ক্যা? বললেই তো পারে কি আনছে। জানি সবার জন্য আনছে। আমার মন চাইছে তাই জিগাইলাম, আমার টার কথা।
ইমরান হাতের কলমটা রেখে নাক মুখ কুচকে বিরক্ত মুখে উত্তর করলো,
– আপাতত মিনহাজ ভাইয়ের জন্য ডানহিল আইকনের একটা সেট, কিছু শার্ট, জ্যাকেট আর স্যুট এনেছি।
নয়ন উত্তেজিত হয়ে বললো,
– আমার জন্য?
– চুষনি চিনোস, যাকে ইংলিশে প্যাসিফায়ার বলে। বাচ্চারা কাঁদলে মুখে ঢুকায় দেয় না ওইটা নিয়ে আসছি। বের করে দিবো? এখন আমাদের কাজে লাগবে। ভ্যা ভ্যা করছিস না। কিছুক্ষন চুপ থাকবি।
মিনহাজ হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাওয়ার মতো অবস্থা। নয়নের মুখটা দেখার মত। নাক মুখ ফুলিয়ে চেয়ার থেকে উঠে গেলো। দূরে গিয়ে বসে জোরে ভলিউমে টিভি ছাড়লো। বাচ্চাদের মতো জেদ ধরছে। ইমরানের রাগ বেড়েই চলেছে। মিনহাজ বাঁধা দিলো। যত রকমের বিরক্ত করার পন্থা আছে সব বের করছে, ইচ্ছে করে নয়ন ডিস্টার্ব করছে কাজে। ইমরান বিরক্ত হয়ে অফিসের কর্ণারে থাকা ট্রলি থেকে দুটো কফি প্যাকেট বের করলো ফোলজার্স ক্লাসিক রোস্ট এবং ক্যাফে বুস্টেলোর। হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজের চেয়ারে বসে পুনরায় মিনহাজের সাথে আলোচনায় মন দিলো। কফি পেয়ে নাচ লাগিয়ে দিয়েছে। সাথে বেসুরে গলায় গাইছে,
হাতটা ধরেন না, ভাব নিয়েন না
কেনো চোখের ভাষা বুঝেন না?
জ্বালা দিয়েন না, দূরে যাইয়েন না
মইরা গেলে আমায় খুইজা পাইবেন না
ওরে কালাচাঁন
তোমার লাগি মন করে আনচান
ওরে কালাচাঁন
একখান বাটার পান খাইয়া যান।
ইমরান থতমত খেয়ে মিনহাজের দিকে তাকিয়ে আছে। মিনহাজ মুখে হাত দিয়ে যথাসম্ভব হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। ইমরান তব্দা খেয়ে বলে,
– কালা চাঁন কাকে বললো ও?
মিনহাজ সেই যে মুখে হাত দিয়েছে আর মুখ খুলছেনা। ইশারায় নয়নকে বার কয়েক মানা করার পর ও টিভি বন্ধ করে দিয়ে নাচ থামালো। ইমরানের কাছে এসে গালে চুম্মা দিয়ে বলে,
– ধন্যবাদ কালাচাঁন।
ইমরান টিস্যু দিয়ে গাল মুছে বলে,
– মিনহাজ ভাই, ওরে যেতে বলো চোখের সামনে থেকে।
নয়ন বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে। মিনহাজ মজা পেয়ে বললো,
– বাদ দে ও তো এমনই। তুই আসলেই ও একটু এমন করে নতুবা অফিসে চিল্লাপাল্লা রাগারাগি এসব চলে। অনেকদিন পর তোকে পেয়ে খুশিতে পাগলামী করছে।
ইমরান খানিকটা হেসে কাজে মনোযোগ দিলো। সে নিজেও জানে নয়নটা একটু বেফাঁস প্রকৃতির। আছেই কে তার এরা ছাড়া।
ঝলমলে আকাশটা বার্তাবিহীন বিবর্ন হলো। তেরো তলার অফিসের এই রুম থেকে আকাশটা খুব সন্নিকটে মনে হয়৷ হাত বাড়ালেই মেঘ ছুঁয়ে দেয়া যাবে। কোথাও এক ফোঁটা মেঘের আলাপন নেই। অথচ আকাশ রঙ পরিবর্তন করেছে। মানুষ ঠিক এমন করেই পরিচিত রূপ বদলে ফেলে। সফল মানুষের সঙ্গী হতে সবার আকাঙ্খা, অথচ। এতটুকু ভাবতেই আপনা আপনি দু চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
ল্যাপটপটা টেবিলের উপর রাখা। আসার পর থেকে অফিসের সকল ধরনের কর্মকান্ড মনিটর করা কেবল শেষ হলো । দুজন সৎ, নিষ্ঠাবান মানুষের কাঁধে সকল দায়িত্ব অর্পন করে নিশ্চিত ছিলো এতদিন। সততা, সচ্চরিত্রবান হওয়া এবং ভালো থাকাই ছিলো তাদের ধর্ম। সৎ মানুষের উচ্চ বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন গুনাবলি গুলো, নিচুস্তরের মানসিকতা সম্পন্ন অধমের মস্তিষ্কে সাড়া জাগায় না ; মিনহাজকে কেউ ঠকাতে পারে ব্যাপারটা ভাবতেই ইমরানের মনে হলো ভালো মানুষের প্রয়োজন নেই দুনিয়াতে। সহজে কারো সাথে বিবাদে না যাওয়া মানুষ মিনহাজ। সবকিছু সহজ মস্তিষ্কে সমাধান করে এই লোকটা। অথচ গত ছয়মাস তাকে ঠকিয়ে যাচ্ছে অফিসের বিশ্বস্ত কয়েকজন এমপ্লয়ি। মানুষটা জানতে পারলে কতটা কষ্ট পাবে তা ভাবনাতীত।
মিনহাজের সাথে পরিচয়টা নতুন নয়। একই পাড়ায় ছিলো সবাই। পাড়ার সিনিয়র ভাই মিনহাজ। এর মাঝে প্রিয় বন্ধু নয়নের একমাত্র ভগ্নিপতি। মাইশা ভাবি মারা যাওয়ার পর থেকে অনেক চড়াই উতরায় সয়ে মেয়েটাকে কোলে পিঠে বড় করেছে। মিনহাজের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের কথা মনে পড়লো। প্রচন্ড হাসি পেলো। দুজন দু রকম সিচুয়েশনের শিকার। অথচ গল্প এক। সিংগেল ফাদার। মিনহাজ ভাই শক্ত হতে পারেনি কারণ আজো মাইশা ভাবীর ভালোবাসা বুকে বেঁধে বেঁচে আছে। অথচ তার বেলায়, সে প্রতারণার শিকার সাথে সবচেয়ে কষ্টকর তকমা ‘ ইমরান ইজ আ ডিভোর্সড পারসন’। ঠোঁটের কোনে বিষাদময় হাসি ফুটে উঠেছে। জোরে ব্রিদ ইন, ব্রিদ আউট করে চোখ মেললো। ফোনটা হাতে নিয়ে অপ্রয়োজনীয় নাম্বারটা ব্লক লিস্ট থেকে আনব্লক করে গোটা অক্ষরে টাইপ করলো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১
– Checkmate.
অনেক বছর পর তিন আসনের এমপির ছেলের নাম্বারটা আনব্লক করা হয়েছে। শেষ বার যখন কথা হয়েছিলো তখন করজোড়ে বলেছিলো,
– জারিফ এত বড় ক্ষতি করো না। ছেলেটা ছোট আমার।
