শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৬
সুরভী আক্তার
আচমকা উঠে দাঁড়ালো সংগ্রাম । শিরদাঁড়া টানটান করে পেছনে হাত গুটিয়ে নিলো কঠোর ভঙ্গিতে । মাথা খানিক কাত করতেই ইশারা বুঝে ওর পিছন থেকে সরে গেলো তিনজন লাঠিয়াল । করিম আর রহিম আসার সময় ফুলিকে নিয়ে এসেছে । শ্যামা কে দেখেই ওর কাছে ছুটলো ফুলি । ফুলি যেতেই ওরা দুই ভাই সংগ্রামের দিকে এগোলো । সংগ্রামের পরবর্তী পদক্ষেপ মূহুর্তেই আন্দাজ করলো ওরা । এখানে পুরো জমিদার রাজ্যের মানুষ উপস্থিত । করিম অতর্কিতে চাপা স্বরে বললো….
” জমিদার সাহেব , এইহানে পুরা জমিদার রাজ্যের মানুষ….
” ঘোড়া দৌড়ের ব্যাবস্থা করো ।
করিম কে থামিয়ে বললো সংগ্রাম । মাঠের একপাশে সাতটা তেজি ঘোড়া বাঁধা । ঘোড়া দৌড়ের খেলা হওয়ার ছিলো । সংগ্রামের কথা মতো হবে এখনই ।
তবে খেলাটা হবে ভিন্ন । অংশগ্রহণ কারীর চোখ বাঁধা হবে কালো পট্টি দিয়ে । অতঃপর তেজি ঘোড়ার পিঠে উঠে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সেই ঘোড়াকে । যে জিতবে , তার উপহার হিসেবে অর্থের পরিমাণ থাকবে অনেক । মাইকে একজন ঘোষণা দিলেন এই নিয়ে । উপহার হিসেবে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা । এটাই সর্বোচ্চ মূল্য । আর এই মূল্য প্রদান করবেন হয় স্বয়ং সংগ্রাম জোয়ার্দার । গ্রামের বাইরের যে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারবে খেলায় । তবে তাদের বাছাই করবে সংগ্রাম জোয়ার্দার নিজে । টাকার পরিমাণ শুনে সকলের চোখ চিকচিক করে উঠলো ।
হই হট্টগোলে বাড়লো বই কমলো না । যুবকেরা লাইন দিয়ে দাঁড়ালো । সেই বখাটে ছেলে গুলোও, যারা এতক্ষণ লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে গিলে খাচ্ছিল শবনম সহ মেলায় আসা বাকি মেয়েদের শরীর । ওরাও ভিড়ের মাঝে লোভে পড়ে দাঁড়িয়েছে প্ররোচনা পেয়ে ।
সংগ্রাম হেঁটে হেঁটে প্রথমত তিন জনকে বাছাই করলো নিজ গ্রাম থেকে । অতঃপর তীক্ষ্ণ চক্ষু দিয়ে বাকি চারজন হিসেবে বাছাই করলো সেই চারজন বদনজর দেওয়া ছেলেকে ।
পৈশাচিক হাসলো সংগ্রাম । দীর্ঘ হাঁফ ছেড়ে নিজের আসনে গিয়ে বসলো পায়ে পা তুলে । ঘাড় ঘুরিয়ে শ্যামার দিকে তাকালো একপলক । ফুলির সাথে গল্পে মজেছে শ্যামা । এদিকে আর ধ্যান জ্ঞান নেই নিজের সইয়ের সাক্ষাৎ পেয়ে । মৃদু হাসলো সংগ্রাম ।
ঘোড়া দৌড়ের জন্য সাতটা ঘোড়া সারি সারি দাঁড় করানো হলো । সাত জন অশ্বারোহী ধরে আছেন ঘোড়ার গলার রশি ।
জকি হিসেবে সাত যুবকের চোখ বাঁধা হলো কালো পট্টি দিয়ে । সেভাবেই তাদের তুলে দেওয়া হলো ঘোড়ার পিঠে । মাঠের সবার মাঝে উদগ্রীবতা টানটান । বাঁশি পড়লো একটা । অমনি সাতটা ঘোড়ার মধ্যে চারটা ঘোড়ার পিঠে সজোরে আঘাত করা হলো সিপটি দিয়ে । আঘাতের চোটে বেপরোয়া গতিতে উন্মাদ হয়ে উঠলো ঘোড়ার দল । বাকি তিনটে স্বাভাবিক ভাবেই ছুটতে আড়ম্ভ করেছে । বিপত্তি বাঁধিয়েছে এই চারটে ঘোড়া । টগবগিয়ে উঠলো সামনের পদ যুগল উপরে তুলে । চোখ বাঁধা অবস্থায় ভড়কালো যুবকের দল । ঘোড়া ছুটতে আড়ম্ভ করেছে তীব্র গতিতে । বাঁশ দিয়ে সীমানা টেনে ঘেরাও করা হয়েছে ঘোড়া দৌড়ের জন্য । ঘোড়ার দল পাগলাটে হয়ে লাফিয়ে ছুটতে শুরু করলো দিকবিদিক । যুবকেরা নিজেদের ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে । লাগাম ধরে রাখতে পারছে না আর ।
সবার উদ্বিগ্নতা আতংকে রুপ নিলো । হইহই পড়লো সবার মাঝে । ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে । সামলানো দায় । যুবকদের বিপদ এখন । চেঁচামেচি শুরু হলো পুরো খেলার মাঠে । শ্যামা মন সরিয়ে ছিলো এদিক থেকে , সকলের চেঁচামেচিতে ভড়কালো সে নিজেও । ঘোড়া গুলোর দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলো ।
টগবগিয়ে উঠছে চারটে ঘোড়া । বাকি তিনটে কে থামানো হয়েছে অবস্থা বেগতিক দেখে । এ চারটে নাগালের বাইরে । চার যুবক ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেছে মাটিতে । ঘোড়ার গলার রশির সাথে পা বাঁধা চারজনের । পাগলা ঘোড়া টালমাটাল ছুটছে তীব্র বেগে । আর যুবক দ্বয় ঘোড়ার পিছু পিছু ছেঁড়ছে যাচ্ছে ।
খড়খড়ে মাঠ । ঘোড়ার পিছু পিছু ছেচড়ে যেতে যেতে রক্তাক্ত প্রায় চার যুবক । হাহাকার পড়লো সবার মাঝে । স্বাভাবিক পরিস্থিতি রূপ নিলো ভয়ংকর দৃশ্যে । ঘোড়া গুলো উন্মাদ হয়ে ছুটছে । বাঁশ পেরিয়ে সীমানা পেরোতে পারছে না এই যা ।
মাঠের সবাই ভয়ানক দৃশ্যের সম্মুখে আতঙ্কে ছুটতে লাগলো এদিক ওদিক । ধু ধু মাঠ তলিয়ে গেলো ধুলো ওড়া ধোঁয়ায় । লতিফ জোয়ার্দার সহ জমিদার বাড়ির সবাই দাঁড়িয়ে গেছেন । অশ্ব গুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে মালিকেরা তৎপর হয়ে উঠলো ।
শ্যামা ছলকে ওঠে রক্তাক্ত পরিস্থিতি দেখে । ফুলির হাত জাপটে ধরে দ্রুত কয়েক কদম পিছিয়ে যায় । চোখ সরিয়ে নেয় এই ভয়ংকর দৃশ্য থেকে । কোলাহলের মাঝে চার যুবকের গলা ফাঁটা আর্তনাদ ভেসে আসছে ।
সংগ্রাম নির্বিকার তবুও । সেই স্থির হয়ে বসে আছে ও । শান্ত চোখে দেখছে এই ভয়ানক দৃশ্য । একটুও আতঙ্কের লেশমাত্র নেই ওর চোখ মুখে । যেখানে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে ত্রাস । সেখানে সংগ্রাম নিরাতঙ্ক । লতিফ জোয়ার্দার বেগতিক পরিস্থিতি দেখে ভয়ার্ত চোখে সংগ্রামের দিকে তাকালেন । বিচক্ষণ ছেলেকে নিস্পৃহ দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি । দ্রুত ছুটে আসলেন ছেলের কাছে ।
” সংগ্রাম, কি হচ্ছে এসব ? পরিস্থিতি হাতের নাগালে গেলো কিভাবে ? তুমি এভাবে অবিচলিত হয়ে আছো এসব দেখেও ?
” পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য অশ্বারোহীরা অশ্বকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ছুটেছে আব্বা । চিন্তা করবেন না । খুব তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসবে ।
ঠান্ডা স্বর ছেলের ।
শ্যামা দড়দড় করে কাঁপছে । চোখ ফেরালেও চোখের সামনে ভাসছে ভয়ানক দৃশ্যের খন্ডাংশ । কানে বাজছে ছেলে গুলোর আর্তনাদ । সর্বাঙ্গে কম্পন ধরেছে শ্যামার । ঘামতে শুরু করেছে । শিরদাঁড়া বেয়ে উষ্ণ গরম পানি গড়িয়ে পড়ছে ওর । মাথা টলছে । ঝিঁঝিঁ ধরেছে মস্তিষ্কে । শবনম লতিফার সাথে সৈকত কে বুকের মাঝে জাপটে ধরে স্থান ত্যাগ করেছে দ্রুত । সালেহাও ছুটতে উদ্যত হলেন লতিফ জোয়ার্দারের ইশারা পেয়ে । শ্যামা কে দেখে থামলেন তিনি । ফুলি শ্যামা কে জড়িয়ে রেখেছে । দুহাতে কান চেপে ধরে চোখ মুখ খিচে ফেলেছে শ্যামা । সালেহা পিছু হটলেন । শ্যামার কাছে আসলেন তিনি । দ্রুত শ্যামার মুখের নিকাব সরালেন । বললেন…
” এই মেয়ে , এমন করছিস কেনো ?
চল এখান থেকে !
” আম্মাহহহ….
শ্যামা অস্ফুটে উচ্চারণ করে শুধু । চোখ ঘুরিয়ে ভেজা কাতর অক্ষি যুগল আধো আধো করে তাক করে সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম বিকারহীন । নিজের বেগমের দিকেও খেয়াল নেই তার । শ্যামা কাতর দৃষ্টিতে ওর পানে তাকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে । ফুলি আর সালেহা কত ডাকছে ওকে , ওর কানে যাচ্ছে না সেই ডাক । শ্যামা তো অপেক্ষায় আছে তার ছোট জমিদার সাহেবের ।
করিম সংগ্রাম কে খানিক ঝাঁকালো । দৃষ্টির মাধ্যমে শ্যামার দিকে ইশারা করতেই ছলকে উঠলো সংগ্রাম । দ্রুত উঠে দাঁড়ালো । তৎপর পায়ে ছুটে গেলো বেগমের দিকে । শ্যামার মুখ খোলা । ঘামে তেলতেলে শ্যামলা মুখশ্রী । সংগ্রাম ওকে আগলে ধরলো । মুখ মুছিয়ে দিলো । নিকাব নামিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো….
” বেগম ,, কি হয়েছে ?
” ছোট জমিদার সাহেব ।
ও…..ওখানে…
শ্যামা পিছনের দিকে আঙুল তুলে ইশারা করে । সংগ্রাম হাসে মৃদু । সালেহা কে নরম চোখে সংকেত দিতেই ফুলি কে নিয়ে পিছনে স্কুলের ঘর গুলোর দিকে চলে গেলেন সালেহা । ওরা যেতেই শ্যামা কে বুকের মধ্যিখানে জড়িয়ে নিলো সংগ্রাম । মাথায় চুমু খেলো । মোলায়েম কন্ঠে বলল….
” ওখানে কি হয়েছে ? কিচ্ছু হয় নি । আমি আছি তো , চোখ বন্ধ করো তুমি । তুমি হেফাজতে আছো , এটাই বুঝে নাও শুধু ।
শ্যামা চোখ বুজে নেয় । লুকিয়ে পড়ে সংগ্রামের বুকের মাঝে । আশপাশ চঞ্চল । হুটোপাটিতেও কয়েক জোড়া চোখ তাদের জমিদার সাহেবের সাথে জমিদার গিন্নির এই মুহুর্ত টুকুর সাক্ষী হতে বাদ পড়লো না ।
রাত নামলো । থমথমে আতঙ্কিত পরিবেশ । বছরের প্রথম দিন টাই শুরু হলো বিশ্রী ভাবে । আতঙ্কের দ্বারা ।
ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় ঘটলো ভয়াবহ এক দূর্ঘটনা । মুহুর্তেই মাটি হলো পুরো মেলার আয়োজন । স্কুলের মাঠে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ বসলো । ছেলে গুলো কে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । অবস্থা সংকটাপন্ন । শরীর ছিলে একাকার । খসে গেছে গায়ের চামড়া ।
এখানে কারোর হাত নেই । অশ্ব অবলা প্রাণী । তাদের উপর দোষারোপ করে লাভটা কোথায় । প্রত্যেক বছর এই ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা হয় , কই এমনটা তো একবারো ঘটে নি । এটা একটা দূর্ঘটনা হিসেবেই চালিয়ে দেওয়া হলো । ছেলে গুলোর সুস্থতার সব ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলো সংগ্রাম জোয়ার্দার । যদিও তারা গ্রামের বাইরের মানুষ , তবুও । তবে সংগ্রাম ওদের থোরিই না মানুষ গন্য করলো ।
মানবতার খাতিরে হাসপাতালে গেছিলো সংগ্রাম । সবশেষ করে ফিরলো এই রাতে । লতিফ জোয়ার্দার ছেলের অপেক্ষায় ভার মুখে অন্দরে বসে আছেন । সংগ্রাম ফিরতেই রাশভারী কন্ঠে আদেশ করলেন …
” সংগ্রাম , তোমার সাথে আমার কথা আছে । বসো…
স্বাভাবিকের ন্যায় বসলো সংগ্রাম । লতিফ জোয়ার্দার সুক্ষ্ম নেত্রে পরখ করলেন ছেলেকে ।
” আজ যা ঘটলো , তা কি কেবলই অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ?
” আপনাদের কাছে অঘটন । তবে আমার কাছে নয়..
স্পষ্ট জবাব ছেলের মুখে ।
লতিফ জোয়ার্দার দৃষ্টি সরান । বলেন গুরুতর ভঙ্গিতে….
” কেনো ঘটলো এই ঘটনা ?
শ্যামা ব্যাতীত এখানে উপস্থিত সকলে । শবনম ও আছে । সংগ্রাম শবনমের দিকে তাকায় সোজাসোজি ।
বলে দৃঢ় কন্ঠে …..
” বলতে বাধ্য নই আপাতত ।
” ওরা আমাদের সীমান্তের বাইরে ।
” শহরের বাইরে হলেও আমার কোনো যায় আসে না । আমার হাত যতদূর , আমার শক্তি ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে ।
বলেই উঠে দাঁড়ায় সংগ্রাম । উপস্থিত সবাইকে উপেক্ষা করে চলে যায় নিজের ঘরে । ওকে আটকায় না কেউ । লতিফ জোয়ার্দার মুখ বুজে মেনে নেন সবটা ।
শ্যামা এশার নামাজে বসেছে । ঘরে ঢুকে ওকে নামাজরত অবস্থায় দেখলো সংগ্রাম । মৃদু হাসলো ক্লান্ত মুখে । গোসল খানা থেকে হাত মুখ ধুয়ে কাপড় বদলালো । বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো সে , শ্যামার নামাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় । নামাজ শেষ করে সংগ্রামের পিছে দাঁড়ালো শ্যামা । তখনকার ঘটনা ভোলে নি সে । দিব্যি মনে আছে আজ । চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই আর্তনাদি দৃশ্য । মনে পড়তেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে বারংবার ।
শ্যামা মৃদু স্বরে ডাকলো….
” ছোট জমিদার সাহেব ?
চকিতে ফিরলো সংগ্রাম । পেছনে গুটিয়ে রাখা হাত জোড়া ছেড়ে দিলো । উত্তর করলো….
” জ্বি সাহেবান !
এগিয়ে প্রশ্ন করে শ্যামা….
” ঐ ছেলে গুলো এখন কেমন আছে ?
” মরে নি !
” এ কেমন কথা ?
” কেমন আবার !
বেঁচে আছে , সেটাকেই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বললাম – মরে নি । তুমি এসব নিয়ে ভাবছো কেনো ? ওসব বিষাক্ত স্মৃতি মনে রাখতে নেই । মন থেকে উপড়ে ফেলো ওসব । আর আমাকে মনে গেঁথে নাও ।
” আপনি তো মনে গেঁথেই আছেন । আর কতটা গাঁথবো ?
” যতটা গাঁথলে আমি ছাড়া আর অন্য কোনো কিছু মনের কোণেও উঁকি দেবে না , ঠিক ততটা । তোমার পুরো হৃদয় জুড়ে শুধু আর শুধুই আমার বিচরন হওয়া চাই ।
বৈশাখের তৃতীয় দিন আজ ।
গরম পড়েছে চরম । দুপুরে বাড়িতে খেতে এসেছে আফতাব । জমিতে ওর বাবা আছেন এখনো । আফতাব কে পাঠিয়েছেন আগে খেয়ে যেতে । আফতাব এসেছে তাই । ও ফিরলে ওর বাবা এসে খেয়ে যাবেন ।
কিন্তু খালেদা স্বামীর জন্য ভাত সাজিয়ে নিয়ে বেরোলেন ছেলে আসার পর পরই । বেলা গড়িয়েছে অনেকটা । এতো বেলা অবধি না খেয়ে আছেন , ক্ষিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই ? স্বামীর চিন্তায় নাজেহাল হয়ে খাবার নিয়ে বেরিয়ে গেছেন তিনি । আফতাব ধুলো মাখা শরীর ঝেড়ে হাত মুখ ধুয়ে আসলো ।
বারান্দায় পাঁকা গিন্নির মতো খাবার বেড়ে বসে আছে ময়না । হাতে একটা তাল পাতার হাত পাখা । আফতাব হাত মুখ মুছে খেতে বসলো হাঁটু ছাড়িয়ে । ময়না অমনি বাতাস করতে লাগলো ওকে ।
আফতাবের বাবা যখন খেতে বসেন , তখন খালেদা এভাবে হাত নাড়িয়ে বাতাস করেন স্বামীকে । ময়না দেখে দেখে অভ্যস্ত । তবে আফতাব কে এভাবে বাতাস করার সুযোগ আসে নি কখনো । খালেদাই বরাবর ছেলেকে খাবার বেড়ে দেন দুপুরে ।
আর রাতেও সেভাবে ধ্যান দেয় নি ময়না ।
আফতাব এক লোকমা ভাত মেখে মুখে তুললো । কি বড় বড় লোকমা ! পুরোটা মুখে পুরছে আফতাব । ময়না হা বনে চেয়ে আছে । আফতাব তাকাচ্ছে না সোজাসুজি দৃষ্টি ফেলে । আড়চোখে তাকিয়ে ময়নার হাবভাব দেখে বললো গুরুভার গলায়….
” খাও নি তুমি ? এভাবে আমার খাওয়ায় কি দেখছো ?
ময়না ঘোরের বশে বললো….
” এতো বড় বড় নলা খাইতে পারেন আপনি ? হাতের থাইকা মুখ বড় … ! আর মুখের থাইকা বড় ভাতের লোকমা ।
আফতাব খাওয়া থামায় । কপাল গুটিয়ে সরু চোখে চায় । ভ্যাবাচ্যাকা খায় ময়না । হাসে বোকার মতো । বলে বোকা বোকা স্বরে….
” কিছু কই নাই ! আপনি খান….
আমি বাতাস করতাছি ।
” হঠাৎ আজ বাতাস করার প্রয়োজন বোধ করলে কেনো ?
” যা গরম , আর আইজ তো আম্মাও নাই । এই লাইগা…
খাচ্ছে আফতাব । ময়না অতিরিক্ত ভাত বেড়েছে । এতোটা শেষ করা মুশকিল ওর পক্ষে । আর গলা দিয়ে নামবে না । আফতাব পানি খেলো । বাকি ভাত টুকুতে হাত ধোয়ার জন্য উদ্যত হতেই বাঁধা দিলো ময়না….
” এ কি ?
কি করতাছেন ? ভাতের মধ্যে হাত ধুইতাছেন ক্যান ?
” এতো ভাত খাই আমি ? এতো দিয়েছো কেনো ?
” এই লাইগা নষ্ট করবেন ?
আমারে দেন , আমি খাইতাছি !
” আমার ছাড়া এঁটো খাবে ?
” হ । দাদি কইতো স্বামীর ছাড়া এঁটো খাইলে নাকি ভালোবাসা বাড়ে !
বেশ ভাব নিয়ে বললো ময়না ।
বলেই চিকচিক করে হাসলো । আফতাব খানিক ঠোঁট প্রসারিত করে পূর্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে মৃদু স্বরে..
” আমাদের মাঝে ভালোবাসা আছে আদৌও ?
নিভে যায় ময়নার হাসি টুকু ।
চুপসে যায় মেয়েটা । আফতাব এক মুহুর্ত তাকিয়ে রইলো । হাত না ধুয়ে খাবারের প্লেট টা হাতে তুললো আবার । ভাত মাখাতে মাখাতে বললো…..
” ভালোবাসা এখনও শুরু হয়নি । চলো শুরু করে দেই । এঁটো খাবারের সাথে সাথে স্বামীর হাতের বিশাল বড় একটা লোকমা খেয়ে দেখো , একদিনে তড়তড়িয়ে ভালোবাসা বেড়ে যাবে ।
বলতে বলতে ময়নার মুখ সম্মুখে খাবার ধরলো । বড় একটা লোকমা । বিষ্ময়ে আর অবিশ্বাসে চোয়াল ঝুলে আসলো ময়নার । আফতাব হাত নাড়িয়ে বলল…
” কি হলো ? হাঁ করো…
ময়না হা করতেই পুরো লোকমা টা ওর মুখে পুড়ে দিলো আফতাব । দু গাল ফুলে উঠলো ময়নার । চিবানো দায় । ছোট্ট মুখে এতো গুলো ভাত ধরে কিভাবে ? আফতাবের হাতের এক লোকমা , ময়নার ছোট্ট হাতের দশ লোকমার সমান । ময়না মুখ নাড়াতে পারছে না । আর না গিলতে পারছে , না উগলাতে । মিটমিটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শুধু ।
আফতাব কড়া গলায় বলল ওর অবস্থা দেখে হাসি আটকে….
” যদি মুখের সবটুকু ভাত না খেতে পেরেছো , তাহলে এক থাপ্পড়ে গাল লাল করে দেবো , বলে রাখলাম । এঁটো ভাত খাইয়ে ভালোবাসা শেখাচ্ছি , অংকের মতো চুপচাপ শিখে নাও ।
ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে রয় ময়না ।
আফতাবের হাসি পায় ভীষণ ।
সেই পঁচিশ চৈত্রের রাতের পর ফের দুরত্ব বেড়েছে অংকুর আর সুরবালার । অংকুর সোফায় শোয় আবার । আর সুরবালা খাটে । তবে দুটোর ঝগড়া , খুনসুটি লেগে থাকে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত । এই যেমন এখন লেগে পড়েছে দু’জনে ।
অংকুর রংয়ের ঘরে ছিলো । আর সুরবালা নিজের কামরায় । একা একা বসে ছিলো ও । সময় কাটাতে একটা সুন্দর বই নিয়ে বসেছে । অংকুর ওকে কয়েকটা বই বেছে দিয়েছে পড়ার জন্য ।
সুরবালা বারান্দায় বসে বসে রাতের মিষ্টি বাতাসে গা এলিয়ে বইয়ে মনযোগ দিয়ে পড়ছিলো । অমনি হাজির অংকুর । রাত এগারোটা হতে চললো । আর এই লোক সবে ঘরে ফিরলেন । সুরবালা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে ওর থেকে । অংকুর ওকে না ডেকেই শুয়ে পড়লো । খানিক পরেও ঘর নীরব দেখে ঘরে আসতেই ক্ষিপ্ত হলো সুরবালা । এই লোক ওকে না ডেকেই শুয়ে শুয়ে ঘুমের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে প্রায় । অমনি চেঁচালো সুরবালা….
” আমি যে ঘরে নেই , সেটা কি কারোর খেয়ালে আছে ? আমাকে কেউ একবারও ডাকার প্রয়োজন বোধ করলো না ? এতো ঘুম পেয়েছে তার ?
অংকুর পিটপিট করে চায় । ফের চোখ বুজে নেয় । বলে গা ছাড়া….
” ডেকে কি করবো ? তুমি তোমার মতো , আর আমি আমার মতো । পড়ছিলে পড়ো , একটু প্রেম যদি শিখতে পারো , তাহলে আমারই উপকারে আসবে ।
সুরবালা চোখ মুখ খিচে চায় । হাই তুলে গা মুড়িয়ে আবার বললো অংকুর….
” এখন না ডাকতেই যেহেতু এসে পড়েছো , তাহলে ঘুমাও । আমার ও ঘুম পাচ্ছে ।
” আপনার ঘুম তো ছোটাচ্ছি আমি ।
” এইই বাউড়ি । খবরদার জ্বালাবে না এই রাতে । ঘুমোতে দাও । মাথা ধরেছে আমার….
” এখন আমার কাছে আসতে না আসতেই মাথা ধরে গেলো ? এতক্ষণ মিস্ত্রী গিরি করে মাথা ধরে নি ?
” তোমার কাছে আসলাম কই ? তুমি আমায় তোমার কাছে আসতে দাও ?
সুরবালা নাক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে ।
মুখ চুলকাচ্ছে ওর । কিন্তু ঝগড়া বাঁধানোর মতো কোনো প্রসঙ্গ পাচ্ছে না । এই বাবড়ি ওয়ালাকে ও কিছুতেই শান্তিতে ঘুমাতে দেবে না । ওর তো ঘুম পাচ্ছে না । দুপুরে ঘুমিয়েছে অনেকটা সময় । এখন আর ঘুমের দেখা নেই । কিন্তু অংকুরের নিশ্চয়ই খুব ঘুম পেয়েছে । রাত ও গড়িয়েছে অনেকটা । একটু মায়াও হলো অংকুরের মুখখানা দেখে । এখন বোধহয় অংকুর কে জ্বালানো ঠিক হবে না ।
সুরবালা স্বাভাবিক হয়ে মিনমিনিয়ে ডাকলো..
” শুনছেন ?
অংকুর একটু নড়েচড়ে উত্তর করলো কাতর কন্ঠে….
” শুনছি !
” খুব ঘুম পাচ্ছে ?
” হুম , মাথা ধরেছে !
” আচ্ছা ঘুমান ।
সুরবালা ওকে ছাড় দিয়ে জায়গা ত্যাগ করলো । ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে বেতের সোফাটায় পা তুলে বসলো আবার । হাতে বইটা আছে এখনো । পিছনের দিকে মাথা এলিয়ে অদূরের ঘন অন্ধকারে দৃষ্টি পাত করলো । শহরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা দুষ্কর ।
সুরবালা শান্ত মনে নরম চোখে চেয়ে আছে তিমিরে ঘেরা অদূরে । মৃদু হাওয়ায় শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে ।
অংকুর ক্ষিয় কাল চোখ বুজে রইলো । ঘরে মেয়েটার সাঁড়া শব্দ না পেয়ে টেনে টুনে মেললো নিভু চোখ জোড়া । চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে । আপনা আপনি বুজে আসছে ঘুমের ভারে ।
জোর পূর্বক চোখ মেলে এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে সুরবালা কে দেখতে পেলো না অংকুর । উঠে বসলো ও । মাথাটাও ভার হয়ে আছে আজ । অংকুর ঘাড় ডলে মাথা ঝাঁকালো । পা বাড়ালো বারান্দার দিকে ।
দরজার কাছে থমকালো । চোখ বুজে অতি মৃদু স্বরে গুনগুন করছে সুরবালা…
” ভালোবেসে সখী , নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো
তোমার মনেরো মন্দিরে ।
ভালোবেসে সখী , নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো
তোমার মনেরো মন্দিরে ।
আমার পরানে যে গান বাজিছে , তাহার তালটি লিখো , তোমার চরণমঞ্জীরে….
অংকুর চুপ থেকে শুনলো । মেয়েটা যতটা মিষ্টি , গানের গলাও ঠিক ততটাই । এর আগেও ওর কন্ঠে এমন গুনগুন শুনেছিল অংকুর , যেদিন সুরবালা কে প্রথম দেখেছিলো জমিদার বাগানে , সেদিন ।
সুরবালা থামার পর অংকুর এগিয়ে আলতো কন্ঠে ডাকলো….
” সুরবালা !
চকিতে চায় সুরবালা ।
” আপনি ? আপনার না ঘুম পেয়েছে ?
” তোমার তো পায় নি । একা একা বসে আছো , তাই আসলাম সঙ্গ দিতে ।
” মাথা ধরেছে তো । ঘুমানো প্রয়োজন ! যান ঘুমান ।
” প্রয়োজন পরে মিটিয়ে নেবো ।
সুরবালা মুচকি হাসে ।
অংকুর এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ে মেঝেতে । এখানে আর বসার কিছু নেই । ও সুরবালার পাশে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসলো । সুরবালা পরখ করলো ওকে । উঠে দাঁড়িয়ে সোফাটা টেনে অংকুরের কাছাকাছি নিলো আরো ।
সেখানে বসে হাতের বইটা পাশে রাখলো । হুট করে হাতটা বাড়িয়ে দিলো অংকুরের মাথার দিকে । ঝাঁকড়া চুলের ভাঁজে হাত ডোবাতেই তড়িতে ঘাড় ফিরিয়ে চাইলো অংকুর । সুরবালা নরম কন্ঠে বলল অকস্মাৎ….
” মাথা ব্যথা করছে তো । পিছিয়ে আসুন , একটু মালিশ করে দিচ্ছি ।
অবাক হয় অংকুর । নিজেকে সামলে পিছিয়ে বসে । সামনাসামনি হয়ে আকস্মিক সুরবালার কোলে মাথা রাখে । শাড়ির ভাঁজে মুখ গুজে চোখ বুজে নেয় । তৃপ্ত শ্বাস ফেলে বলে…..
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৫
” স্পর্শ করা বারন , তাই স্পর্শ করি না । কিন্তু স্পর্শের সম্পুর্ন অধিকার আছে আমার । এই মুহূর্তে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করো না । ভালো লাগছে না । যা করছিলে তাই করো !
সুরবালা থমকে রয় । অংকুরের গরম শ্বাস উদরের কাছে পড়তেই শরীর শিউরে উঠে । কম্পিত হাত কপালের কাছটায় ছোঁয়ায় সুরবালা । অংকুরের গা গরম । সুরবালা ঢোক গিলে বলতে নিলো ধরা গলায়….
” বাবড়ি ওয়ালা…
” কথা বলো না ।
চুপ হয়ে যায় মেয়েটা ।
ধীরে ধীরে হাত চালাতে আড়ম্ভ করে বাবড়ি চুলের ভাঁজে । অংকুর চোখ বুজে মৃদু হাসে ।
