Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৮
নওরিন কবির তিশা

কালচক্রের আবর্তনে অতিক্রান্ত হয়েছে ‌মাস দুয়েক। প্রবাহিত সময়ের ব্যবধানে তৃষার জীবন থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের গুরুভার অপসৃত হয়েছে। তবে থেমে নেই টুইংকেলের জীবনযাত্রা। তুখোড় মেধার অধিকারিনী ছোট্ট মেয়েটির পড়াশোনা বর্তমানে বেশ গতিশীল। আজ দ্বিপ্রহরের তপ্ত রৌদ্রে আফজাল আহমেদের সকল বাধা অমান্য করে তৃষা নিজেই টুইংকেলকে নিতে এসেছে। ছুটির ঘণ্টা বাজতে বিলম্ব থাকায়;নিকটস্থ এক নিভৃত ক্যাফেতে আশ্রয় নিয়েছে ও।

অবসর কাটাতে কোন কারণ ওর ছাড়াই ব্যস্ত আঙ্গুলি তৎপর ফেসবুক স্ক্রলিংয়ে;নীল দুনিয়ায় বিচরণরত তৃষার চঞ্চল আঙুলগুলো আচনক স্থবির হলো। অলস দৃষ্টির সম্মুখে সহসা উদিত হলো এক অসম বৈচিত্র্যের যুগল। শ্বেতশুভ্র আভিজাত্যে মোড়ানো এক পৌঢ়ের বাহুলগ্না হয়ে ক্যাফেতে প্রবেশ করল নবযৌবনা এক রূপসী;যার লাবণ্য ছটায় মুহূর্তকাল থমকালো চারপাশ। পুরুষটির ললাটে বয়সের রেখাপাত স্পষ্ট হলেও চলনে বিদ্যমান দাম্ভিক প্রতিপত্তি।
তৃষা বিস্ফারিত নেত্রে চাইলো। পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক সংজ্ঞা অনুসারে এনাকে বোধ হয় সুগার ড্যাডি বলা হয়। বর্তমান বাংলাদেশে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এই ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়লেও সচরাচর দেখা মেলে না। তৃষাও আজ প্রথমবারের মতো চোখের সামনে এমন দম্পতি দেখছে। ও কিঞ্চিত বিস্মিত; হুট করে ধনাঢ্য পৌঢ় ব্যক্তিটি হঠাৎ পকেটে হাত দিয়ে বিড়বিড়িয়ে কী যেন বললেন। সম্ভবত তাঁর মানিব্যাগটি তিনি গাড়িতেই ফেলে এসেছেন।

উনি পাশে থাকা রূপসী মেয়েটির কানে ঝুঁকে কিছু একটা বলতেই মেয়েটি বিরক্তিমাখা দৃষ্টিতে একবার তাঁর দিকে চাইল। পৌঢ় ব্যক্তিটি তড়িঘড়ি করে বাইরে বেরিয়ে গেলেন, সম্ভবত গাড়ি থেকে ওয়ালেট উদ্ধার করতে।মেয়েটি এবার একা। ওর পরনের দামি পোশাক আর উগ্র মেকআপে আভিজাত্যের চেয়ে দাম্ভিকতাই বেশি প্রকাশ পাচ্ছে।
ও চারদিকে একবার সন্ধানী দৃষ্টি বুলাল, তারপর ধীর পায়ে তৃষার টেবিলের দিকেই এগিয়ে এল। তৃষা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিল।মেয়েটি তৃষার একদম সামনে এসে দাঁড়িয়ে পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে তৃষার দিকে তাকিয়ে খুব শীতল কণ্ঠে শুধাল,
-‘ এক্সকিউজ মি! আমি কি এখানে বসতে পারি? অন্য সব টেবিলই প্রায় অকুপাইড।
তৃষা স্বভাবজাত সরলতায় এক চিলতে মিষ্টি হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে বলল,

-‘ হ্যাঁ, অবশ্যই! বসুন না।
মেয়েটি ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। ও শব্দ করে চেয়ার টেনে বসে নিজের ডিজাইনার হ্যান্ডব্যাগটা টেবিলের ওপর দর্পের সাথে রাখল। তৃষা কৌতূহলী হয়ে আবারও শুধালো,
-‘ আপনি কি এই এলাকাতেই থাকেন? আসলে আপনাকে এর আগে কখনও এদিকে দেখিনি তো।
মেয়েটি তৃষার আপাদমস্তক একবার পরখ করে;একটা বাঁকা হাসি দিয়ে খুব অবজ্ঞার সুরে বলল,
-‘ এলাকা? আমি সচরাচর এমন লোকাল ক্যাফেতে আসি না। ডার্লিংয়ের খুব ইচ্ছে হলো একটা চেঞ্জ দরকার, তাই আসা।

-‘ ওহ আচ্ছা।
-‘ বাই দ্যা ওয়ে তুমি এখানে কি করছ? ডোন্ট মাইন্ড বাট তোমাকে বেশ ছোট লাগছে আর একা এসেছো তাই।
-‘ আমার মেয়ের কিন্ডারগার্টেন পাশেই। ছুটি হতে এখনো দেরি আছে তাই ওয়েট করছি।
মেয়েটি এবার বিস্মিত হলো,-‘ হ্যোয়্যাট! তোমার বাচ্চাও আছে?
-‘ হুম। কেন আপনার নাই?
-‘ নো ওয়ে! আই ডোন্ট লাইক বেবি। সারাক্ষণ ক্যাচোর ক্যাচর ঠু মাচ ইরিটেটিং!
তৃষা ভ্রু কুঞ্জনপূর্বক চাইলো; বাচ্চাদের সম্বন্ধে এমন মন্তব্য ওর পছন্দ হলো না একটুও। বাচ্চারা ক্যাচোর ক্যাচোর করে? বড্ড অদ্ভুত তো এই মহিলা! ও কিছু বলতে উদ্ভূত হতে যাচ্ছিল কিন্তু তার পূর্বেই ওর কর্ণগোচর হলো এক মিষ্টি মায়াবী কন্ঠস্বর,
-‘ ও বানি?
তৃষা দরজার দিকে তাকাতেই দেখল টুইংকেল তার ছোট ছোট পায়ে প্রায় দৌড়ে ক্যাফের ভেতরে ঢুকছে। ওর পিঠে ঝোলানো গোলাপি রঙের কার্টুন ব্যাগটা প্রতি কদমে দুলছে। তৃষার সাথে সাথে ওই মেয়েটিও ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালো। টুইংকেলকে দেখা মাত্রই মেয়েটি বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে নাক কুঁচকে অস্ফুট স্বরে বলল,
-‘ উফ! এগেইন আনাদার চাইল্ড! কুইট ইরিটেটিং।
তৃষা হয়তো মেয়েটির কথা শুনতে পায়নি। নতুবা নিশ্চিত কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিত। ও তৎক্ষণাৎ চেয়ার ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে টুইংকেলকে জাপটে ধরে কোলে তুলে নিল। ওর ঈষৎ ঘর্মাক্ত কপালে একটা গভীর চুমু খেয়ে বলল,

-‘ তুমি একাই চলে এলে কেন সোনা? বানি তো এখনই যাচ্ছিল তোমাকে আনতে।
টুইংকেল ওর ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে তৃষার গলা জড়িয়ে আদুরে ভঙ্গিতে বলল,
-‘ মিস বলল তুমি পাশের ওই কফিশপে আছো, তাই আমি একাই চলে এলাম। পাপা বলেছে না আমি এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছি?
তৃষা হেসে ফেলল। ওকে নিয়ে আবার নিজের টেবিলে ফিরে এসে ওর পাশের খালি চেয়ারটায় বসিয়ে দিল। মেয়েটি তখনও ভ্রু কুঁচকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে টুইংকেলকে পরখ করছিল। তৃষা টুইংকেলের ব্যাগটা খুলে পানির বোতল বের করে দিতে দিতে বলল,
-‘ মাম্মাম, স্কুল থেকে এসেছ, হাত দুটো অনেক ডার্টি হয়ে আছে। চলো, ওয়াশরুম থেকে বানি তোমাকে হ্যান্ডওয়াশ করিয়ে আনি। তারপর আমরা খেয়ে বাসায় ফিরব,ওকে?
টুইংকেল চট করে চেয়ার থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল। বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা নেড়ে বলল,

-‘ নো বানি! আমি নিজেই পারব। পাপা বলেছে নিজের কাজ নিজে শিখতে হয়। তুমি বসো, আমি এখনই আসছি।
তৃষার কোনো বাধা না শুনেই টুইংকেল সাবলীল ভঙ্গিতে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। তৃষা মুগ্ধ নয়নে ওর প্রস্থানপথের দিকে চেয়ে রইল। ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে সেই মেয়েটির বিদ্রুপাত্মক কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হলো ওর,
-‘ সিরিয়াসলি? ও কি সত্যিই তোমার মেয়ে? আই মিন, ও তোমাকে বানি বলে ডাকছিল কেন? মা হিসেবে তো রেস্পেক্টটা পাচ্ছ না মনে হচ্ছে!
তৃষা মেয়েটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওষ্ঠাধরে এক চিলতে মৃদু হাসির স্ফুরণ বেশ শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল,
-‘ সম্পর্ক তো শুধু সম্বোধনে থাকে না, থাকে অন্তরের টানে। ও আমাকে ভালোবেসে যা খুশি ডাকতে পারে, তাতে ওর মা হিসেবে আমার অস্তিত্ব বিন্দুমাত্র ম্লান হয় না। ও একদম ওর পাপার মতো স্বাধীনচেতা। তাই ওকে কিছুতে বাধা দেই না আমরা।

-‘ ওর পাপা? মানে তোমার হাজব্যান্ড? কি করেন তিনি? আই মিন এই ভর দুপুরে তুমি কেন মেয়েকে নিতে এসেছ? সে আসেনি কেন?
-‘ অ্যাকচুয়ালি উনি এখন আমাদের সাথে নেই। কজ উনি ‌নেভি অফিসার ক্যাপ্টেন আর্য এহসান।
আর্য এহসান নামটা কর্ণগোচর হতেই মেয়েটি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে চাইলো। অস্ফুট স্বরে বেশ চেঁচিয়ে বলল,,
-‘ হোয়্যাট!
‘আর্য এহসান’ নামটা শোনার পর ওর চোখেমুখে ফুটে ওঠা তীব্র আতঙ্ক-অবিশ্বাসের মিশ্র অনুভূতিতে তৃষার বুকের ভেতরটা অকারণে ধক করে উঠল। ও ভ্রু কুঁচকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে চেয়ে শুধাল,
-‘ আপনি কি উনাকে চেনেন? ওনার নাম শুনে এমন রিয়্যাক্ট করলেন কেন?
মেয়েটি এবার কাঁপাকাঁপা হাতে গ্লাস থেকে পানি খেল, ওর আত্মম্ভরী ভাবটা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে। ও বিড়বিড়িয়ে নিজের মনেই বলতে লাগল,
-‘ ইম্পসিবল! এটা কীভাবে সম্ভব? আর্য বিয়ে করেছে? তাও আবার তোমার মতো একটা বাচ্চা মেয়েকে?
তৃষা এবার সোজা হয়ে বসল। ওর কণ্ঠস্বর কিঞ্চিৎ কঠোর হলো,
-‘ আমি বাচ্চা কি না সেটা বড় কথা নয়। আপনি কে, আর আমার স্বামীর ব্যাপারে আপনার এতো মাথা ব্যথা কেন সেটা বলুন।
মেয়েটি এবার যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ও শ্লেষাত্মক গলায় বলে উঠল,

-‘ স্বামী? যে আর্য এহসান আমাকে ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো মেয়েকে সহ্য করতে পারত না, যে আর্যর প্রতিটি ধমনীতে শুধু আমার নাম ছিল সে কি না শেষে তোমাকে বিয়ে করল? আমি মাহেরিন! আমিই ওর সেই একমাত্র নারী ছিলাম যাকে ও হৃদয়ের সিংহাসনে বসিয়েছিল। হ্যাঁ, আমি ওকে চিট করেছি, টাকার জন্য ওকে ছেড়েছি, কিন্তু আমি জানি ও আজও আমাকে ভুলতে পারেনি। ও অন্য কাউকে ভালোবাসতেই পারে না!
মাহেরিনের প্রতিটি শব্দ যেন বি’ষাক্ত তীরের মতো তৃষার কানে বিঁধতে লাগল। তৃষা স্থানুর মতো স্থবির হয়ে বসে রইল। ওর মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ওর সম্মুখেই আর্যর প্রথম ভালোবাসা দাঁড়িয়ে আছে ভাবতেই গোটা দুনিয়া ওলট-পালট হয়ে গেল ওর। ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ ধনাঢ্য পৌঢ় ব্যক্তিটি ফিরে এলেন। মাহেরিনের অস্থিরতা দেখে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে ওর কাঁধে হাত রাখলেন,
-‘ কী হয়েছে ডার্লিং? তুমি এতো উত্তেজিত কেন?
মাহেরিন তখনও বিধ্বস্ত অবস্থায় দন্ডায়মান। ও চাইলো না প্রৌঢ়ের সম্মুখে নিজের অতীত তুলতে তবুও প্রস্থান পূর্ববর্তী সময়ে ও তৃষার উদ্দেশ্যে অবজ্ঞার স্বরে বলল,

-‘ লিসেন স্টুপিড গার্ল ‌রিয়ালিটি চেক নাও। আর্য তোমাকে কখনোই ভালোবাসবে না, দ্যাটস আ ফ্যাক্ট। ওর লাইফ থেকে জাস্ট লিভ করো। আ’ম প্রিটি শিউর, ও এখনো আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে;যেই লেভেলের প্যাশন ও তোমার জন্য কখনো ফিল করবে না। সো, এখনো সময় আছে নিজের ফিউচার নিয়ে ভাবো আর এখান থেকে মুভ অন করো।
মাহেরিনের বি’ষাক্ত শব্দগুলো তীরের মতো তৃষার মগজে বিঁধছে;ক্যাফের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থানে ও তৃষার হৃদয় অবতারণা করছে এক অসহ্য দহনের। ধনাঢ্য প্রৌঢ়ের হাত ধরে মাহেরিন দর্পভরে বেরিয়ে যেতেই, তৃষা এক নিষ্প্রাণ পাথরের মূর্তির মতো টেবিলে স্থির হলো। ওর বাদামি চোখের মণিদ্বয় একরাশ শূন্যতায় আচ্ছন্ন।
বুকের ভেতরটা ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। আর্যর নির্লিপ্ততা, ওর গম্ভীর চাউনি, প্রথম প্রথম তৃষাকে মেনে নিতে না পারা সবকিছুর পেছনে কি তবে মাহেরিনের প্রতি এই অবদমিত অনুরাগ কাজ করছিল? আচ্ছা মাহেরিনের কথা কি সত্যি? আর্য কি সত্যিই কোনদিনই তৃষাকে ভালবাসতে পারবেনা! ওর মস্তিষ্ক হৃদয়ের সঙ্গে এক তুমুল বিদ্রোহের আহবান করলো।
ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে ফুরফুরে মেজাজে ফিরে এল টুইংকেল; তৃষার কাছে এসে ওর ওড়না ধরে টান দিয়ে বলল,

-‘ বানি! দেখো আমার হাত কত্তো ক্লিন হয়ে গিয়েছে। এবার ঝটপট খাবারগুলো দাও, আমার না খুব ক্ষুধা লেগেছে।
তৃষার কানে যেন কোনো আওয়াজই পৌঁছাচ্ছে না। ও নিষ্পলক চোখে সামনের সাদা দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে আছে। টুইংকেল অবাক হয়ে ওর মুখটা দু-হাতে ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরাল।
-‘ কী হয়েছে বানি? তুমি কাঁদছো কেন? ওই আন্টি কি তোমাকে কিছু বলেছে?
টুইংকেলের ছোঁয়ায় সংবিৎ ফিরল তৃষার। ও এক ঝটকায় নিজের চোখের কোণের অকাল অশ্রু মুছে ফেলল। সামনে পড়ে থাকা ধোঁয়া ওঠা কফি আর স্যান্ডউইচগুলোর দিকে ওর বিন্দুমাত্র রুচি নেই। ও অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে টুইংকেলের ব্যাগটা কাঁধে ঝোলালো। ওর স্বর আজ বড্ড ধরা-ধরা, বড্ড অচেনা।
-‘ চলো টুইংকেল, এখান থেকে যাই।
টুইংকেল অবাক হয়ে থালায় সাজানো স্যান্ডউইচগুলোর দিকে ইশারা করে বলল,
-‘ কিন্তু বানি, খাবারগুলো? আমি তো একটাও খাইনি!
-‘ বাসায় গিয়ে খেয়ো সোনা। আজ আমার বড্ড শরীর খারাপ লাগছে। চলো, এক্ষুণি চলো!
তৃষা কোনো উত্তরের অপেক্ষা করল না। টুইংকেলের নরম হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে ও দ্রুত পায়ে ক্যাফের বাইরে বেরিয়ে এল। ওর প্রতিটি পদক্ষেপে আজ একরাশ দ্বিধা আর রাজ্যের অভিমান।

১৫ মিনিটের ব্যবধানে তৃষারা সুখ নীড়ে পৌঁছালো। বিপর্যস্ত পদক্ষেপে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই তৃষার পায়ের গতি মন্থর হয়ে এল। সোফায় বসে থাকা পরিচিত মুখটিকে দেখে ও নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারল না। শায়লা বেগম; দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আজ হঠাৎ ভাবির এই আকস্মিক উপস্থিতিতে বড্ড বিস্মিত হল তৃষা।
এদিকে তৃষাকে দেখা মাত্রই সোফা থেকে লাফিয়ে উঠল দুটি কিশোর-কিশোরী। পিপি, পিপি! বলে দৌড়ে এসে ওরা তৃষাকে জড়িয়ে ধরল;তৃষার বড় ভাইয়ের ছেলে আরিয়ান আর মেয়ে আরিশা। আরিশা এখন বেশ বড় হয়েছে, কিশোরীসুলভ লাবণ্য ওর চোখেমুখে।আরিয়ানও তাগড়া কিশোর ওদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসার স্পর্শে তৃষার বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নার পাহাড়টা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু মাহেরিনের স্মৃতি ওকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, ও ঠিকঠাক আদরটুকুও করতে পারল না।

শায়লা বেগম সোফা ছেড়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। তৃষার ফ্যাকাসে মুখ আর চোখের কোণে জমে থাকা কালচে আভা দেখে তার বুকটা অজানা কারণে কেঁপে উঠল। অতি সাবধানে তৃষার কাঁধে হাত রেখে স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন,
-‘ কেমন আছিস রে তৃষা? অনেকদিন পর দেখলাম তোকে। মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন? শরীর ঠিক আছে তো?
তৃষা অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে ভাবির হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ওর কণ্ঠস্বর আজ ভীষণ অচেনা, বড্ড নিস্তেজ,
-‘ ভালো আছি ভাবি। তোমরা হঠাৎ? খবর না দিয়ে চলে এলে যে?
তৃষার এই শীতল ব্যবহারে শায়লা বেগম কিঞ্চিৎ ব্যথিত হলেন ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
-‘ এখনো আমার ওপর রেগে আছিস, না রে? জানি তোর সাথে যা করেছি তার জন্য মাফ চাওয়ার মুখ আমার নেই। কিন্তু বিশ্বাস কর তৃষা, আমার হাতে তখন আর কিছুই করার ছিল না। তোর ভাই…তোর ভাই খুব অসুস্থ। সারাদিন শুধু তোকে খুঁজে বেড়ায়। তোর নাম ধরে বিড়বিড়িয়ে কী যেন বলে। আমরা আসলে তোকে নিতে এসেছি রে তৃষা। তোর ভাই চাচ্ছে তুই অন্তত একবার গিয়ে ওর সামনে দাঁড়া।
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে জাহানারা বেগম বেরিয়ে এলেন। আর দোতলা থেকে নামলেন আফজাল সাহেব। তাঁদের চোখেমুখেও একরাশ দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ।আফজাল আহমেদ গম্ভীর স্বরে বললেন,

-‘ তৃষা মা, তোমার ভাবি সব খুলে বলেছেন। তোমার ভাইয়ের অবস্থা নাকি খুব একটা ভালো নয়। রক্ত তো রক্তের টানই, মা। আমরা ভাবছিলাম তুমি যদি কয়েকদিনের জন্য ওদিকে ঘুরে আসতে…।
তৃষা কি যেন ভাবল পরক্ষণেই বিস্তর যান্ত্রিক স্বরে বলল,
-‘ যাব কি যাব না সেটা পরে ভাবব। আগে ফ্রেশ হয়ে নিই।
বলেই তৃষা কারো দিকে না তাকিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। ওর প্রতিটি পদক্ষেপে আজ একরাশ ক্লান্তি। ঘরের দরজাটা সজোরে বন্ধ করে ও পিঠ দিয়ে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার ঘরে ওর কানে শুধু বাজছে— ‘আর্যর প্রতিটি ধমনীতে শুধু আমার নাম ছিল…’।
তৃষা বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। ওর বুকের ভেতরটা অজানা কারণে হাহাকার করে উঠলো। যদি মাহেরিনের কথাই সত্যি হয়? যদি আর্য সত্যিই কোনোদিন ওকে ভালোবাসতে না পারে? তাহলে? তাহলে তৃষার কি হবে? অশ্রুর লোনা স্রোত বাধা মানল না আজ; দু-চোখের কোণ বেয়ে অবিরল পতিত অবাধ্য নোনাজল তৃষার গাল ভিজিয়ে দিলো।

বুকের ভেতরটা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হতেই ও কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিল। ব্যাকুল হৃদয়ে আর্যর নাম্বারে ডায়াল করল ও। একবার, দু-বার, তিনবার— না, ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। মাঝ সাগরে ডিউটির ব্যস্ততায় আর্য হয়তো ফোনটা স্পর্শ করার সুযোগও পাচ্ছে না। তৃষা উন্মাদের মতো আরও কয়েকবার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরের নিস্তব্ধতা ওর বিরহকে আরও গাঢ় করল।
অভিমানে বুক ফুলিয়ে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিল ও। নিজের বিদীর্ণ প্রতিচ্ছবি আড়াল করতে আর মনের দহন শীতল করতে ও দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে ঝরনার শীতল ধারার নিচে নিজেকে সঁপে দিল।

ঘড়ির কাঁটা নিরন্তর ঘুরে চলেছে, কিন্তু তৃষার জন্য সময় যেন স্থবির হয়ে জমে আছে ঝরনার সেই শীতল জলধারার নিচে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ও ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এল;ওর অবয়বে এক বিষণ্ণ শুচিতার প্রলেপ। পরনের সিক্ত বসন বদলে একখানা শুভ্র সুতি শাড়ি গায়ে জড়ালেও মনের দহন যেন প্রশমিত হয়নি। ওর ডাগর বাদামি চোখ দুটো অতিরিক্ত কান্নায় জবা ফুলের ন্যায় টকটকে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে, যা ওর ফর্সা মুখশ্রীতে এক করুণ সৌন্দর্যের অবতারণা করেছে।

পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা অবিন্যস্ত কেশরাজ হতে তপ্ত অশ্রুর ন্যায় টুপটাপ জল গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। তৃষা দর্পণের সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজের বিধ্বস্ত প্রতিচ্ছবিটা একবার দেখল।ঠিক তখনই বিছানায় উপুড় হয়ে থাকা ফোনটা তীব্র আর্তনাদ করে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে সেই কাঙ্ক্ষিত নামটা।
তৃষার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে পরক্ষণেই উন্মাদ অশ্বের বেগে ছুটতে আরম্ভ করল। ও কাঁপাকাঁপা আঙুলে ফোনটা হাতে নিল। একরাশ অভিমান আর অভিযোগের পাহাড় গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে আছে। ও ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আর্যর সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
-‘ তৃষা? অনেকবার কল করেছিলে। আমি তখন একটা ইম্পর্ট্যান্ট ব্রিফিংয়ে ছিলাম, তাই রিসিভ করতে পারিনি। আর ইউ্য ওকে?
আর্যর কণ্ঠের সেই স্বাভাবিকতা শুনে তৃষার কান্না যেন আরও দ্বিগুণ বেগে বাঁধ ভাঙতে চাইল। ও কোনোমতে নিজের কণ্ঠস্বর স্থির রাখার বৃথা চেষ্টা করে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে বলল,

-‘ হুম… আছি।
তৃষার গলার সেই অস্ফুট কম্পন আর্যর তীক্ষ্ণ শ্রাবণেন্দ্রিয় এড়িয়ে যেতে পারল না। ওপাশ থেকে আর্যর কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই গম্ভীর থেকে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল,
-‘ তৃষা, তোমার গলার স্বর এমন লাগছে কেন? কাঁদছো তুমি? কী হয়েছে? বাসায় কেউ কিছু বলেছে? টেল ম্যি তৃষা, আই অ্যাম লিসেনিং।
তৃষা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও এক হাতে নিজের ওষ্ঠাধর চেপে ধরল যাতে কান্নার শব্দ ওপাশে না পৌঁছায়। এদিকে ওর এমন আচরণে আর্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে। ও বারংবার শুধাচ্ছে,,
-‘ টেল ম্যি। প্লিজ টেল ম্যি মাই লাভ। হোয়্যাট হ্যাপেন? অসুস্থ লাগছে তোমার? বলো না,জানপাখিই?
আর্যর কণ্ঠস্বর তৃষার কর্ণকুহর অবধি পৌঁছালো কিনা বলা দায়। শত সহস্র মধুর সম্বোধন আর উৎকণ্ঠার সুরগুলো আজ তৃষার কাছে কেবলই অস্পষ্ট গুঞ্জনের ন্যায় শ্রুত হচ্ছে‌। দু চোখ ভরা শূন্যতায় ও সম্মোহিতের ন্যায় সমস্ত নীরবতা চূর্ণ করে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শুধালো আমূল প্রশ্ন,

-‘ ডু ইউ্য লাভ মি, ক্যাপ্টেন?
আকস্মিক তৃষার এমন প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে গেলো আর্য। ও নিশ্চিত হতে বলল,,
-‘ তৃষা?
তৃষা এবার উন্মাদের ন্যায় আওড়ালো,-‘ প্লিজ ক্যাপ্টেন। প্লিজ টেল।
ওর কাকুতি ভরা কন্ঠে আর্য ‌অপ্রস্তুত স্বরে বলল,,-‘ অ্যাকচুয়ালি….!
তৃষার কর্ণকুহরে আর্যর দ্বিধাগ্রস্ত অ্যাকচুয়ালি শব্দটা তপ্ত সীসার মতো বিঁধল। মাহেরিনের সেই বিষাক্ত অট্টহাসি আর বলা কথাগুলো মুহূর্তেই ওর মস্তিষ্কে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। আর্য হয়তো আরও গূঢ় কোনো অনুরাগের ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছিল, হয়তো বলতে চেয়েছিল তৃষা তার অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা এক অবিনশ্বর নেশা। কিন্তু অভিমানে অন্ধ তৃষা সেই অবকাশটুকু দিল না।
তৃষার ওষ্ঠাধরে এক করুণ তাচ্ছিল্যভরা হাসির রেখা ফুটে উঠল; ও রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
-‘ থাক; আর কিছু বলতে হবে না আপনাকে। আমি আমার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছি।
বলেই তৃষা এক ঝটকায় কলটা বিচ্ছিন্ন করে দিল। ফোনের নিস্তেজ পর্দার দিকে চেয়ে ও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল; চোখের সামনে এক নিমেষেই ওর তিল তিল করে গড়ে তোলা বিশ্বাসের অট্টালিকাটি তাসের ঘরের ন্যায় ভেঙে পড়লো্ ওর।

-‘ ভাবি আমি তোমাদের সাথে গ্রামে ফিরতে চাই।
নিস্তব্ধ ড্রয়িংরুমে সিঁড়ির ওপর থেকে ভেসে আসা তৃষার ভারী কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি ঊর্ধ্বমুখী করে দিল। তৃষা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে; কর্নিয়ার চারপাশের শুভ্রস্বচ্ছতা আজ র/ক্তা/ক্ত জবার ন্যায় রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে ওর।
সবার সচকিত দৃষ্টির মাঝেই তৃষা সরাসরি শায়লা বেগমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,,
-‘ ভাবি, আমি তোমাদের সাথে গ্রামে ফিরতে চাই। এখনই।
উপস্থিত সবাই যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের সম্মুখীন হলেন। শায়লা বেগম অবিশ্বাস্য কন্ঠে শুধালেন,
-‘ সত্যিই যাবি তৃষা? তুই তো বললি..!
তৃষা ম্লান হেসে উত্তর দিল,
-‘ র/ক্তে/র টান তো অগ্রাহ্য করা যায় না ভাবি। ভাইয়া অসুস্থ, এখন আমার পাশে থাকাটাই উচিত।
জাহানারা বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এলেন,
-‘ তৃষা মা, তুই এভাবে হুট করে… আর্যর সাথে কথা বলেছিস একবার?
তৃষার বুকটা আর্যর নাম শুনেই বিদীর্ণ হয়ে উঠল, কিন্তু ও নিজেকে সামলে নিয়ে ভীষণ শান্ত স্বরে বলল,
-‘ সবাই সব কথা জানে না আম্মু। আর আমার যাওয়ার সিদ্ধান্তটা একান্তই আমার।
আফজাল আহমেদ জাহানারা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,

-‘ যেতে চাইছে যখন, যেতে দাও। ওর মনটা ভালো নেই,মনে হচ্ছে। আর্য টাও নেই এখানে অনেকদিন হলো। ওকে যেতে দাও। হয়তো কয়েকদিন নিজের শেকড়ে থাকলে শান্তি পাবে।
ঠিক তখনই টুইংকেল দৌড়ে এসে তৃষার কোমর জড়িয়ে ধরল। ওর বড় বড় চোখে জল টলমল,
-‘ বানি, আমাকেও নিয়ে যাবে তো? আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না!
তৃষা টুইংকেলের মাথায় হাত রাখতে গিয়েও থমকে গেল। আফজাল আহমেদ এবার গম্ভীর স্বরে বললেন,
-‘ না দাদুভাই, তুমি যেতে পারবে না। দুদিন পরেই তোমার হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা। সবচেয়ে বড় কথা এটা তোমার ‌জীবনের প্রথম পরীক্ষা দাদুভাই। এই সময় পড়াশোনা ফেলে বাইরে যাওয়া একদম চলবে না।
টুইংকেল কিঞ্চিত ঠোঁট উল্টালো; তৃষার নিজেরও ইচ্ছা করছে না টুইংকেলকে রেখে যেতে, তবে ও মাহেরিনের দেওয়া দহনে আজ এতটাই দগ্ধ যে, আপাতত সবকিছু থেকে দূরে পালাতে চাইছে।ও যান্ত্রিকভাবে শায়লা বেগমের দিকে ফিরে বলল,
-‘ তোমরা ব্যাগ গুছিয়ে নাও ভাবি। আমি রেডি হয়ে আসছি।
শায়লা বেগম কিছু বলতে গিয়েও থামলেন। এমনিতেও উনিতো তৃষাকেই নিতে এসেছে মেয়েটা এত দ্রুত রাজি হয়ে যাবে সেটা ওনার ভাবনার বাইরে ছিল। যাইহোক বিনা বিঘ্নতায় কাজটা সম্পন্ন হচ্ছে ও যেতে চাইছে এই অনেক। উনি আর তৃষাকে বেশি ঘাটালেন না।

এদিকে তৃষা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতেই আর্যর বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। উন্মাদের মতো ও বারবার ডায়াল করতে লাগল, কিন্তু প্রতিবারই ওপাশ থেকে সুইচড অফ বার্তাটি ওর ধৈর্যকে অগ্নিদগ্ধ করল। এক অসহ্য হাহাকারের তীব্র আক্রোশে আর্য নিজের হাতের মুঠোফোনটি সজোরে দেয়ালে ছুড়ে মারল। যান্ত্রিক যন্ত্রটি মুহূর্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ল।
শব্দ শুনেই পার্শ্ববর্তী কেবিন হতে ফারহান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। কেবিনের শ্রীহীন দশা আর আর্যর রক্তবর্ণ চোখ দেখে ও স্তব্ধ হয়ে কম্পিত স্বরে শুধাল,
-‘ হোয়্যাট হ্যাপেন আর্য?
আর্য বিধ্বস্ত ভঙ্গিমায় ওর দিকে চাইল একে একে সবটা খুলে বলল ফারহানকে। সমস্ত কিছু শ্রুতশেষে ফারহান বড্ড বিচলিত হলো;কপালে হাত দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,

-‘ আর ইউ্য ক্রেজি, আর্য? স্রেফ একটা অ্যাকচুয়ালি তেই সব শেষ করে দিলি? হোয়্যাই ডিড ইউ মেস আপ দিস অপরচুনিটি? তুই তো জানিস ও কতটা ইমোশনাল, একবার আই লাভ ইউ্য বললে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো!
আর্য ফারহানের কলার চেপে ধরে অবর্ণনীয় হাহাকার মিশ্রিত কন্ঠে উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল, ,
-‘ আই ক্যান’ট লুজ হার, ফারহান! আই জাস্ট ক্যান’ট! শ্যি ইজ্য মাই অক্সিজেন। ওকে হারালে এই আর্য এহসান জীবন্ত লা/শ হয়ে যাবে। আ’ম হ্যাল্পলেস ফারহান প্লিজ হেল্প ম্যি!
ফারহান ওর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল,,
-‘ ও যখন শুনছিল তখন বলতে কি হয়েছিল।এখন নাটক করোস ক্যা?
-‘ আমি তখন একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। ও একদম হুট করেই শুনছে;আমি তো ফিরেই ওকে বলতাম সব। কিন্তু।
-‘ কিন্তু,কি? আগের দিনই তো আমার সামনে কত কথা বললি। সেইগুলাই বলতি।
-‘ ইট ওয়্যাজ ইম্পসিবল।
-‘ হোয়্যাই?
আর্য ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো,-‘ ওর কিছু একটা হয়েছে ফারহান। সামথিং রং উইথ হার। আই নো হার ভেরি ওয়্যেল। ও এমন করতেই পারে না। আ’ম ড্যাম শিওর সামথিং রং উইথ হার!
ফারহান আর্যর বলিষ্ঠ কাঁধে হাত রেখে ওকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টায় ধীর গলায় বলল,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৭

-‘ রিলাক্স দোস্ত, আমি আছি তো। এভরিথিং অলরাইট!
আর্য এবার ফারহানের দিকে মরিয়া দৃষ্টিতে তাকাল; পরক্ষণেই পেশাদারী তীক্ষ্ণ চোয়ালে ও বলল,,
-‘ নো ফারহান, কিচ্ছু ঠিক নেই! আই নিড ইমিডিয়েট লিভ। আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট দ্য প্রোটোকল। আমাকে যেভাবেই হোক সামনের দুই দিনের ভেতরে ঢাকা পৌঁছাতে হবে। ও অভিমান করে কোথায় হারিয়ে যাবে, আমি সেটা হতে দেব না। আই হ্যাভ টু স্টপ হার। রাইট নাউ!

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৯

2 COMMENTS

  1. 🥀🥀গল্পটা পর্বগুলো খুব ভালো লাগছে।😥😥😥😥😥😥😥😥😥😥😥 পরের পর্বগুলো তারাতাড়ি চাই।

Comments are closed.