প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১১
নীতি জাহিদ
ইউনিমার্টে এসেছে বাবার হাত ধরে। সাথে আছে সেই ভদ্রলোক। বাসার মানুষজনদের অবস্থা নাজেহাল তরুনীর চকলেট প্রেমের জন্য। ছোট বেলায় বাসায় কেউ আসলে বলেই বসতো,
– চক্কেত এনেতো? না আনলে বেল অউ। দানো না এ বাতায় ছোত বাত্তা আতে। পতা মেহমান।
লজ্জায় পড়ে যেত পরিবারের সবাই। আজও এমন একটা কাজ হয়েছে। বাসায় একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ইমরান এসেছিলো। মোনা মুখ ভেঙচি দিয়ে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছে,
– এই বাসায় যে একটা সুইট মেয়ে আছে এটা কি কারো নজরে পড়েনা, একটা ডেইরি মিল্ক তো হাতে করে নিয়ে আসা যেত! কার্টেসি ও বুঝেনা।
অথচ এই মেয়ে তখনো চকলেট খেতে ব্যস্ত। সবে মাত্র খেয়ে উঠেছে। হাত পা ছড়িয়ে কার্টুন দেখছে আর চকলেট নামক মিষ্টান্নভোজনে নিজেকে মগ্ন করে রেখেছে। কতটা চকলেট খোর স্বভাবের হলে হাতে চকলেট নিয়ে পুনরায় চকলেট চায়। ইমরান লজ্জা পেয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
– স্যরি, একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসেছি তোমার বাবার কাছে। চাইলে তুমি আধ ঘন্টা পরে আমার সাথে যেতে পারো শপে।
খুশিতে ঢগমগ করে উঠলো মোনা। দু পাশে মাথা নেড়ে চোখ ঝাপটে বললো,
– থ্যাংকিউ এংরি জেন্টেলম্যান।
বড়ই অদ্ভুত এই মেয়ে! আবার নতুন সম্বোধন। মামুন সাহেব এবং মিনহাজ দুজনই হাসছে মোনার ব্যবহারে। কয়েকটা দিনে সবাই বেশ সুন্দর ভাবেই মানিয়ে নিয়েছে প্রতিটি ব্যাপার। তবে ইমরান বেশ চিন্তিত। তার মন অজানা কারনে অসংগত কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। মিনহাজের সাথে কাজ শেষ করেই ইউনিমার্টের দিকে রওয়ানা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি এই যে, মেয়েটা পছন্দ অনুযায়ী চকলেট নিচ্ছে। ইমরান আলাদা হয়ে টুকটাক শপিং করছে ইশান, তুশি ও সামান্তার জন্য। বেড়াতে এসেছে মামার বাড়ি সামান্তা। বংশের একমাত্র আদরের মেয়ে। সব আদর প্রাপ্তি তার।
পেছন ফিরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে মোনা শপিং করছে তার বাবার সাথে, তবে ফোনে মেসেজ এলো কি করে মোনার নাম্বার থেকে? জন্মদিনের দিন ইমরানের কেবিনে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় কিছু কথা বলে এসেছে। যা মোটেও কাম্য নয়। ফোনের মেসেজ পড়ছে বিড়বিড় করে,
– সরে দাঁড়ান বলছি। ক্যাশে বসা মেয়েটি আমার ইমরান সাহেবের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
স্তব্ধ হয়ে মেসেজটি এক দমে পড়ে ঘাবড়ে গেলো ইমরান। আগের জায়গায় ঢের দাঁড়িয়ে আছে। কি বলেছে এই মেয়ে? আমার ইমরান সাহেব! অস্বস্তিতে ভরে গেলো ভেতরটা। বড্ড অপরাধী লাগছে নিজেকে। নামের সম্বোধনের যাচ্ছে তাই অবস্থা। ঘেমে উঠেছে শরীর। পাশে মিররে নিজেকে খুটিয়ে দেখতে লাগলো। অফ হোয়াইট শার্ট, পরনে কুচকুচে রঙা গ্যাভার্ডিন প্যান্ট। হাতে একটা খুব সাধারণ হাত ঘড়ি। দামটাও জানা নেই। আইরিন আপা উপহার হিসেবে দিয়েছে। নিজের বলতে শুধু Chanel De Blue পারফিউমটি। পারফিউম ভাবতেই মনে পড়লো সেদিনের কথা। মোনা নীল শাড়ির আঁচল গুছিয়ে ইমরানের কামরায় এসে বললো,
– কেক কাটবো, আসুন আমার সাথে।
উপেক্ষা করে ইমরান কাট কাট উত্তর দিলো,
– আমার কাজ আছে তুমি যাও। ছবি তুলো। আমি পরে ছবি দেখে নিব।
– না গেলে কিন্তু আপনার অপছন্দের কিছু করে বসবো।
ইমরান চোখ ছোট করে বুঝার চেষ্টা করলো মোনার গতিবিধি। মোনা পুনরায় বললো,
– আপনাকে একটা খুশির সংবাদ দিতে আসলাম। এহসান স্যার বিয়েটা করেন নি। আমার কাছে চয়নের জন্য এহসান স্যারকে বেশ লেগেছে।
ইমরান কথা না বাড়িয়ে অনিচ্ছুক মৃদু হেসে বললো,
– আচ্ছা। তাদের অভিনন্দন জানিয়ে দিও আমার পক্ষ থেকে।
– তা দিব… একটা কথা ছিলো?
– কি কথা?
– আমারও এহসান স্যারের মত একজনকে নিজের জন্য পছন্দ হয়েছে। তবে আমার জন সেরা। কে জানেন?
– কে?
– আমার ইমরান সাহেব।
তীক্ষ্ণ চক্ষুদ্বয় স্থির তরুনীর পানে। এতদিনের সন্দেহ কোনোভাবেই যেন সত্যের দিকে না যায় মনে মনে প্রার্থনা ছিলো। এভাবে তা বাস্তব হবে কে জানতো! মাঝে মাঝে জীবনে অযাচিত কিছু ঘটে যায়। অল্প বয়সের আবেগ মেয়েটার ভেতরটা নাড়িয়ে দিয়েছে। ভয়ংকর এই আবেগ। আগ্নেয়গিরির মত ফুলে ফেপে উঠবে। মনের আড়ালে থাকা ভয়টা তবে সত্য হলো! মোনা একেবারে কাছে চলে এসেছে ইমরানের। সন্নিকটে এসে জোরে শ্বাস টেনে বললো,
– ইমরান সাহেব দ্য স্মেল ইজ হিলিং মাই মাইন্ড।
খুশখুশ করে কেশে মোনাকে পাশ কাটিয়ে সামনে চলে গেলো। গ্লাসের পানি পান করে বললো,
– ঠিক আছে যাও তুমি কেক কাটো।
– আর আপনি?
– আসছি।
কিছুক্ষন আগে না যাওয়ার ভাবনা চিন্তা করলেও মত বদলে ফেললো মিনিটের মাঝে। যাবেনা বললে যদি এই মেয়ে নতুন কান্ড ঘটিয়ে বসে? এই কটা দিন ইমরান সঠিক বুঝতে পেরেছে মোনা ‘না’ শব্দটি পছন্দ করেনা। না উচ্চারণ করলেই সেই কাজ ‘ by hook or crook ‘ হ্যাঁ করিয়েই ছাড়বে। যা ইমরানের ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দনীয়। এর মাঝে ইমরানের নাম নিয়ে ঘটনা আরো পরিষ্কার করে দিয়েছে। স্মার্টলি হ্যান্ডেল করা হবে বুদ্ধিমানের কাজ৷ নতুবা দড়ি বেশি টাইট দিলে ছিড়ে যাবে।
মোনা হেসে বের হতে হতে গেয়ে উঠলো,
– না জানি কি মন্ত্র পড়ে জাদু করিলো, সোনা বন্ধে;
ও সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইলো।
মিষ্টি মধুর সুরেলা কণ্ঠ। যেন এই গান শুধু এই কন্ঠের জন্য তৈরি। হতচকিত ইমরান মোনার দিকে চক্ষু নিবদ্ধ করলো। উপস্থিত মানব-মানবী এতটুকুও উপলব্ধি করতে পারেনি সামান্য একটি গানের দুটো চরণ কিভাবে… কিভাবে… দুজনের মনে ভিন্ন রকম ঝড় তুলেছে। কারো মনে এক আকাশ সন্দেহ, অন্যমনে নব্য, সদ্য জেগে উঠে অনুভূতি চরের উপাখ্যান যাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা, সন্দেহ সম্পন্ন ব্যক্তি ও নব্য প্রেম জাগা কিশোরী দুজনের পক্ষেই প্রবলভাবে অসম্ভব কিছু৷ স্তব্ধ ইমরানের হুঁশ ফেরার পূর্বেই রমনী কামরা ত্যাগ করেছে। কিন্তু এই গান কেনো গাইলো এই মেয়ে!
আশপাশের চেঁচামেচি পূর্বের ধ্যান থেকে বের করে এনেছে ইমরানকে। শোরগোলের আওয়াজ শুনে তাকিয়ে দেখে ক্যাশে বসা মেয়েটির সাথে গায়ে পড়ে তর্ক করছে মিনহাজ কন্যা। মিনহাজ কিছুতেই মেয়েকে থামাতে পারছেনা। ইমরান এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলো,
– কোনো সমস্যা?
মোনা চেতে বললো,
– অবশ্যই সমস্যা। কয়েকটা লিপস্টিক চেয়েছি, বলে কিনা নেই। যাই বলি তাই নেই রেখেছে টা কি? যখন বললাম কেনো নেই। তখনই মুখে মুখে তর্ক শুরু। আসলে সব লিপস্টিকই আছে ধ্যান তো অন্য দিকে। আমি খুঁজে খুঁজে বের করলাম। শপে কোনো হ্যান্ডসাম পুরুষ আসলে সেদিকে নজর দেয়।
মিনহাজ ইমরান একে অপরকে দেখছে। মিনহাজ প্রশ্ন করলো,
– এই মেয়ে কি আমার দিকে তাকিয়েছে আম্মা?
বাবার কথা বুঝতে পেরে মোনা বেকুপ বনে গেলো। হায় কি বুঝালো আর বাবা কি বুঝলো! বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
– জ্বি বাবা, তোমাকে দেখছিলো সাথে আরো অনেকজনকেই। বাদ দাও। আমি এখানে শপিং করবোনা।
বলেই হনহন করে বের হয়ে গেলো। ইমরান যা বোঝার স্পষ্ট বুঝেছে। অধর চেপে হাসি লুকালো। এই মেয়ের এত তেজ! সেলস গার্ল মেয়েটার চাকরি নিয়ে টানাটানি। এদিকে ম্যানেজার হাত জোর করে ক্ষমা চাইছে ইমরান এবং মিনহাজের কাছে। ইমরান আশ্বস্ত করে বললো,
– প্যাক করে দিন সব যা যা ম্যাডামের পছন্দ হয়েছে। আর একটু সাবধানে থাকবেন স্টাফদের ব্যাপারে। তবে ক্যাশে বসা মেয়েটির সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না। ভুল মানুষই করে।
ম্যানেজার খুশি হয়ে গুছিয়ে দিলেন সব প্রোডাক্ট।
মিনহাজ বোকা বনে ইমরানকে বললো,
– মেয়েটা এমন করলো কেনো রে?
ইমরান আফসোস করে মনে মনে বললো, তোমার মেয়ের মতিগতি ও নিজে বুঝে কিনা সন্দেহ। সবাইকে নাজেহাল করে ছাড়ে। যদি জানতে কেনো এসব করছে, তাহলে এতক্ষনে দুবার শপিং মলে অজ্ঞান হতে।
মিনহাজকে আশ্বস্ত করে বললো,
– হয়তো মেজাজ খারাপ কোনো কারণে। বাদ দাও।
অসহায় ভঙ্গিতে মিনহাজ বললো,
– কি যে করবো মেয়েটাকে নিয়ে, মা*রতে ও তো পারবোনা।
– ঠিক হয়ে যাবে। রিয়েক্ট করোনা। বয়সটাই এমন।
– রিয়েক্ট করছিনা। তবে মোনা কেমন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
– হুম, সময় দাও।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন। স্কুল,কলেজ,সরকারি এবং বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ। কেবল টিউলিপ ইন্টারন্যাশনাল খোলা আজ। টিউলিপ খোলা রাখার কারণ হলো তামান্নার আজ বিয়ে। সবাই অফিস থেকে একসাথে যাবে গাড়ি নিয়ে। তবে
কাজ-পাগল তিন বস আজ অফিসে এসেছে ভোরে। ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স করছে। বাকিদের উপর প্রেশার নেই। সাজুগুজু করে সবাই আড্ডা দিচ্ছে। অফিস থেকে বিয়ে বাড়ি অনেকটাই দূরে।
অফিসের নিচে অপেক্ষা করছে আরো কিছু কলিগদের জন্য। মোনা রিকশা থেকে নামতেই রিমি , চৈতি ঝাপটে ধরলো। এমন সময় অফিসের এক্সিট দরজা দিয়ে তিন বসকে বের হতে দেখতে পেলো সকলে। তিনজনকেই আকর্ষণীয় লাগছে। রিমি হাতটা বুকের কাছে নিয়ে বললো,
– কি দরকার এভাবে মেয়েদের নজর কাড়ার?
রিমির কথা মোনার কানে বাজলো। বোঝার চেষ্টা করলো কথাটি কার উদ্দেশ্যে বলা। সাদাফের দিকে ফিরে বললো,
– রিমি আপু কি বললো, ভাইয়া?
সাদাফ তিরস্কার করে বললো,
– আর বলো না দিবাস্বপ্ন দেখছে। ইমরান স্যারকে নাকি মনে ধরেছে। সকাল সন্ধ্যা স্যারের নাম জঁপে।
চৈতি বললো,
– তাই তো স্যার ওর কর্মকান্ডে বিরক্ত। সিক্সথ সেন্স বলেও ব্যাপার আছে। কেউ কাউকে পছন্দ করলে মানব মন সহজেই ধরে ফেলে।
মোনার বিমর্ষ মনে ভয়ের চাপ। রিমির সাজ দেখে এতক্ষন ভালো লাগলেও এখন বড্ড বিরক্ত লাগছে। ইচ্ছে করছে চুল গুলো টেনে এলোমেলো করে দিতে, সাজ নষ্ট করে দিতে, ল্যাং মে/রে মাটিতে ফেলে দিতে। আফসোস কিছুই করতে পারছেনা। ইমরানের দিকে তাকাতেই দেখলো মিনহাজ এবং নয়নের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। সাজগোছ পরিপাটি। অফ সাদা ব্লেইজার স্যুট। কালো শার্ট। বেশ রুচিসম্মত আজকের সাজ। ঠোঁট বাঁকিয়ে মোনা ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো। পরে দেখে নিবে। আজকের দিনটা পন্ড হোক চায়না সে।
এরই মাঝে সবার গাড়ি চলে এসেছে। মোনাকে দেখে নয়ন এগিয়ে এলো। ভাগ্নীকে আগলে ধরে সামনে নিয়ে এলো। মিনহাজ হালকা হাসলো। বাবার কাছে ছুটে এলো। বাবা মাথায় হাত রেখে বললো,
– মা শা আল্লাহ আমার মেয়েটা বেশ বড় হয়েছে। এটা তো তোমার মায়ের শাড়ি, তাই না?
উপর নিচে মাথা নাড়লো মোনা। নয়ন ভাগ্নীর গাল টেনে বললো,
– একটা প্রিন্সেস লাগছে আমার মা টাকে।
মোনা হেসে প্রতিউত্তর করে,
– লাগছে না জমিদারের বউ?
মিনহাজ হো হো করে হেসে উঠলো। মেয়ের এই ফ্যান্টাসি কবে যাবে? এই শতকে জমিদার কোথায় পাবে? ইমরানের দিকে তাকিয়ে মোনা উচ্চ স্বরে সালাম দিলো। এতক্ষন মানুষটা রোদচশমায় অক্ষিযুগল ঢেকে ফোনের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা করছিলো পরিবেশটা। মোনার ডাকে এত মানুষের সামনে উপেক্ষা করতে পারেনি। ফোন থেকে মাথা তুলে ইষৎ হাসলো। প্রশ্ন করলো,
– কেমন আছো হামিং বার্ড ?
– আলহামদুলিল্লাহ। আমি এতক্ষন এত কথা বলছি বাবা,মামার সাথে আপনি শোনেন নি।
অনিচ্চাসূচক হাসি দিয়ে বললো,
– স্যরি ফোনে একটা গুরুত্বপূর্ণ মেইল পড়ছিলাম খেয়াল করিনি।
মোনা পুনরায় বললো,
– আমাকে জমিদারের বউ লাগছেনা?
পূর্বের বাক্যটিও শুনেছে ইমরান। আলোচনা এড়াতে বলেছিলো, শুনেনি। লাভের লাভ তো হলোনা, এই মেয়ে পুনঃ বাক্য উচ্চারিত করলো। ইমরান রোদচশমার আড়ালে পূর্ণ মনোযোগে তাকিয়ে দেখলো সবুজ আর মেজেন্টা কম্বিনেশনে জামদানী পরেছে। চুলে বেলীর গাজরা, হাতে চুড়ির গোছা। গলায় সীতা। কানের সাথে লাগানো কুন্দনের ইয়ার স্টাড। ইমরানের জায়গায় অন্য কেউ হলে নির্ঘাত প্রেমে পড়ে যেত। অফিসের অনেকেই আড়চোখে মোনাকে দেখছে ইমরানের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ইঙ্গিত দিচ্ছে অন্যকিছু। বড্ড পরিণত লাগছে এই মেয়েকে। চোখ ফেরাতে পারছেনা। অবাধ্য চোখ দুটো বার বার ফিরে ফিরে চায় রমনীর পানে। মোনা ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে বললো,
– বললেন না তো?
– হ্যাঁ ভালো লাগছে, তবে কার বউ লাগছে জানিনা।
মোনা মুখ ভেঙচি দিয়ে নয়নকে বলে,
– উনাকে কোথায় পেয়েছো তোমরা। রোবট একটা।এমন প্রাণহীন,অনুভূতিহীন কেনো?
মিনহাজ খুশখুশে কেশে উঠলো। মেয়েকে সাবধানী ইশারায় বললো,
– সামনে আগাও। সাদাফদের সাথে যাবে নাকি আমাদের সাথে?
মোনাকে পেছন থেকে সকলে ডাকছে। এদিকে রিমি,তিহান,সাদাফ এবং চৈতি এগিয়ে এলো। সাদাফ আগ বাড়িয়ে বললো,
– আমাদের সাথে গেলে…
কথা শেষ হওয়ার আগেই ইমরান বলে উঠলো,
– মোনালিসা গাড়িতে বসো।
নয়নের মস্তিষ্ক ফাংশন করছে অন্যভাবে। কিছু একটা বুঝে সাদাফকে বললো,
– আমাদের গাড়িতে তো আমরা তিনজন। তোমাদের টাতে উঠলে চাপাচাপি হয়ে যাবে। আমাদের সাথে যাক। বমি করার প্রবনতা আছে মোনার।
বসের কথার উপর কথা বলেনি আর। এরা খুব করে চেয়েছিলো একই গাড়িতে উঠবে। তিহান আজ গিটার এনেছে। মোনার মন চাইলো ওদের সাথে যেতে। কত মজা করবে গাড়িতে সবাই। অথচ মানুষটা দিলোই না। আগ বাড়িয়ে বাঁধা দিলো। নয়ন মিনহাজ গাড়িতে উঠে বসেছে। মোনা বাইরে দাঁড়িয়ে সাদাফকে ইশারা দিচ্ছে। ইমরান মোনার পেছনে দাঁড়াতেই সাদাফ ঢোক গিলে নিজেদের গাড়িতে উঠে গেলো। এদিকে মোনা সাদাফের কান্ডে পেছন ফিরে দেখে ইমরান দাঁড়িয়ে আছে। ভ্রু কুচকে ভেঙচি দিয়ে গাড়িতে উঠে বসবে এর আগেই ইমরান বলে উঠলো,
– বিয়ে কি তোমার? এত সাজের কি আছে?
স্তব্ধ মোনা। বার বার অক্ষিপলক ঝাপটে যাচ্ছে। খারাপ লাগা সব গলায় দলা পাকিয়ে এলো। নয়ন ডাকছে। বের হয়ে ভাগ্নীকে টেনে ভেতরে ঢোকালো। রবিনের সাথে ইমরান বসলো। মোনা স্থির হয়ে সামনে দৃষ্টি দিলো। মুহুর্তেই জমে গেলো। ভর করলো এক গুচ্ছ খারাপ লাগা। জোরে শ্বাস টেনে চোখ বুজলো গড়িয়ে পড়লো ফোঁটা ফোঁটা জল। গাড়ির উপরে মিররে চোখ যেতেই ভেসে উঠলো বিষন্ন মোনা, অশ্রুসিক্ত আঁখি। নয়ন এবং মিনহাজ গল্পে মগ্ন। মোনাকে কাঁদতে দেখে আচানক পেছন ফিরলো ইমরান। মেয়েটা তখনো অশ্রু জল মুছছে মুখটা আড়াল করে। ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে বাইরে চোখ দিলো।
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১১
ইউনিমার্টের ঘটনা কিছুতেই ভুলতেই পারছেনা। জন্মদিনের কেক কাটতে অফিসে এসে যা বললো, বার বার সেই কথাটি মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে। সেদিন লেডিস স্টাফের সাথে দূর্ব্যবহারের কারণ ছিলো মেয়েটি ইমরানকে দেখছিলো। রাস্তায় পথ চলতে অনেক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। তবে এমন ঘটনা বিরল যা মোনা ঘটালো। ইমরানের যখন ব্যাপারটা বোধগম্য হলো তখন থেকেই নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হওয়া শুরু হলো। এই মেয়ে নিজেকে শেষ করার উদ্দেশ্যে আগুন নিয়ে খেলতে নেমেছে। আবেগের বয়সটাতে এভাবে পিছলে পড়লে এই মেয়ের ভবিষ্যত শেষ ! এ যেন কল্পনাতীত। মিনহাজ ভাইকে কি করে মুখ দেখাবে? মনের মাঝে যেসব কু-ভাবনা আসছে সব কিছু যদি মিথ্যে হত!
