সে খলনায়ক পর্ব ৩০
ফারহানা সানিয়াত
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা পরিপাটি হয়ে চুল চিরুনি করছে প্রাণপ্রিয়া। ইভানের সাথে দেখা করতে যাবে। আজ যেভাবেই হোক তাকে বুঝাতে হবে সবকিছু অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে, আশেপাশের মানুষ তার একগুঁয়ে পাগলামি জন্য কথা বলা শুরু করে দিয়েছে এখন এগুলো থামানোর জন্য উপায় একটাই যা সে আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে জানে ইভান ও তার সিদ্ধান্তে অটল তবে বিশ্বাস আছে ইভান কখনোই চাইবে না তাকে খারাপ বলা হোক । প্রানপ্রিয়া মনে মনে ভেবে আয়নার দিকে তাকিয়ে গভীর শ্বাস ফেলে,
বিছানায় বসা সেলিনা তাঁর দিকে তাকিয়ে।
মেয়েটা কোথায় যাচ্ছে কেনো যাচ্ছে সে জানে সকালে অনুমতি নিয়েছে তার কাছ থেকে,
__ প্রিয়া! তার নরম কন্ঠের ডাক , মুখে কিঞ্চিত অপরাধবোধ।
আয়নায় দিক তাকিয়ে থাকা প্রানপ্রিয়া চোখ সরিয়ে অলস ভঙ্গিতে ঘুরে তাকায়।
__ আমরা কখনোই তোমার খারাপ চাই না, তুমি এটা অবশ্যই জানো। সেলিনা বসা থেকে উঠে দাঁড়ান, সাথে এটা ও জানো কেনো আমারা ,,, কিছু টা থেমে হাঁসফাঁস করে ওঠে।
কি বলবে সে, ছেলে মেয়ে বন্ধুত্ব কেমন সে যানে।, দুজনের মাঝে কখনোই তাদের অবস্থান নিয়ে কিছু ছিল না ভালো বন্ধু তারা কিন্তু কাল রহমান ভাইজান একটু কড়াভাবেই বলেছে কি করার বড় হয়েছে আশেপাশে সবার চোখে পড়ছে আর,,,
__ আমি জানি আন্টি! প্রানপ্রিয়ার শুকনো মুখে হাসি,
সেলিনা তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়ান,, কারন তুমি খুব বুঝদার মেয়ে খোদা তায়ালা তোমার জ্ঞান বুদ্ধি আরো বাড়িয়ে দেক। কিন্তু প্রিয়া সবার চিন্তাধারা এক হয় না। যার যার দৃষ্টি কোণ আলাদা, অসহায়দের সুযোগ সকলে নিতে চায় আর আমাদের ভাগ্য কি বলবো । এটা ভেবো না ইভানকে কিছু বুঝিয়েছি ইভান কতটা ভালো ছেলে আমি জানি আমি তার দুনিয়ার বাকি লোকদের কথা বলছি যারা তিল কে তাল বানাচ্ছে এবং পরবর্তীতে এটা আরো কতদূর যেতে পারে ,, সেলিনা হা করে শ্বাস ফেলেন,, সত্যি বলতে আমার মনে ও তোমাদের নিয়ে কিছু অবাস্তব আশা ছিল হয়তো খুশিও হোতাম কিন্তু বাস্তবতা নিজেকে নিজে ঠেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার মত তবে আমার খারাপ লাগছে তোমাদের পবিত্র বন্ধুত্ব নিয়ে যারা কানাঘষা করছে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে আর অপরাধবোধ ,, বাকি কথা বলার মাঝে প্রানপ্রিয়া শব্দ করে হেসে উঠে,,
__ আরে আন্টি কি বলছো এসব বাদ দাও না এবার। আমি ইভান কে আজ বলবো। আসলে আমাদের ই দোষ আমরা যে বড় হয়ে গেছি ভুলেই যাই। আর মানুষের চোখে পড়া কি স্বাভাবিক নয়। তবে এবার বুঝেছি এখন থেকে এমন কথা আর না ,,
প্রাণপ্রিয়ার শুকনো মুখে উজ্জ্বল হাসি দেখে সেলিনা তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,,
__ কাল তোমার আঙ্কেল তোমায় অনেক কথা বলেছে কিছু মনে করো নি তো আসলে ভাইজান তোমাকে নিয়ে চিন্তিত থাকেন ,,
প্রানপ্রিয়া সরে আবার আয়নার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়,
__ এটা আমি জানি আন্টি আঙ্কেলের কথায় আমার কিচ্ছু মনে হয়নি কারন আঙ্কেল আমাকে সব সময় সঠিক কথাই বলেন,
সেলিনা মৃদু হাসেন, হুম প্রানপ্রিয়া মুচকি হেসে ফের চিরুনি করা শুরু করে।
আফতাব নগর কনস্ট্রাকশন এরিয়ায় দাঁড়িয়ে আছে দামিয়ান পাশে আহানাফ। আবরার আর চৌধুরীর বিশাল বড় ফ্যাক্টরির কাজ শুরু আজ থেকে, আদনান চৌধুরী আর হুমায়ুন এক পাশে ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে কথা বলছেন।
আহানাফ চোখের সানগ্লাস পড়ে ,,
এই রৌদ্রে আর দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না ব্রো।
দুপুরের উত্তপ্ত সূর্য তাদের মাথার উপর জ্বলজ্বল করছে।দামিয়ান পকেটে হাত গুজে দাঁড়িয়ে তার ফর্সা ত্বক লাল হয়ে গেছে, বাবার সাথে এখানে এসেছে মিস্টার চৌধুরী সাথে যে ডিল হয়েছিল তার আর সারার বিয়ে নিয়ে সেটা আজ থেকে শুরু। দামিয়ান শান্ত মুখে হাত ঘড়ির দিকে এক নজর তাকিয়ে পাশে বাবার দিকে দৃষ্টি ফেলে, হুমায়ুন কথা বলায় ব্যস্ত।
দামিয়ান পিছে ঘুরে গাড়ির দিকে পা বাড়ায়। তার এখানে প্রয়োজন নেই হুমায়ুন তাকে দেখানোর জন্য নিয়ে এসেছিল ।আহানাফ ভাইকে চলে যেতে দেখে নিজেও তার পিছে হাটা ধরে।
গাড়ির সামনে নিলয় দামিয়ান কে আসতে দেখে দ্রুত দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে।
আহানাফ পিছন থেকে দামিয়ান কে বলে,
__ লাঞ্চ রেস্টুরেন্ট থেকে করে এরপর বাসায় যাওয়া যাক এখন অলরেডি লাঞ্চ টাইম বাসায় যেতে লেট হবে।
দামিয়ান গাড়ির পিছনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে চোখের সানগ্লাস খুলে বাহিরে দিকে তাকায়।
__ যা ভালো বুঝো।
বাস থেকে মানুষের ঠেলাঠেলি ভিড় থেকে অতি কষ্ট বের হয়ে প্রানপ্রিয়া স্বস্তি শ্বাস ফেলে। মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তদের জন্য যাতায়াত করার ব্যবস্থা হলো বাস। প্রানপ্রিয়ার অভ্যাস আছে এখন স্কুলের জন্য মাঝে মাঝে দূরের পথ যাওয়া হয় কাজের ক্ষেত্রে বাসে চড়ে ইভানের সাথে ও অনেক জায়গা ঘুরা হয়েছে। তাই রাস্তাঘাট অনেকটা চেনা পরিচিত। যাইহোক,,
প্রানপ্রিয়া রোড পাড় হয়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি দিকে যাচ্ছে যেখানে ইভান পড়াশোনা করে। তাদের কালকের কথা অনুযায়ী ইউনিভার্সিটি পাশে রেস্টুরেন্ট বসে অপেক্ষা করবে। তবে কথা উঠেছিল ইভানের সাথে আসার কিন্তু সে চাই নি,
গাছগাছালি পরিবেশ রেখে ব্যস্ত রাস্তায় ব্যস্ত মানুষের চলাফেরা মধ্য দিয়ে প্রানপ্রিয়া হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার একপাশ কিনারায় এসে থামে। গরমে হাঁপিয়ে উঠেছে সে , আজ সূর্যের তাপ হয়তো আগের দিনগুলো থেকে অনেকটা বেশি এর মধ্যে রাস্তাতায় এতো মানুষ চলাচল গাড়ি সব মিলিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত। প্রানপ্রিয়া তার ব্যাগ থেকে চুলের কাঠি বের করে খোলা চুল পেছিয়ে বাঁধে এবার একটু শান্তি পাওয়া যাবে।
আফতাব নগর থেকে বের হয়ে রামপুরা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বরাবর দা উইন্ড লঞ্চ রেস্টুরেন্টের কাছে গাড়ি থামতেই দামিয়ান আর আহানাফ বের হয়। তারা বের হতেই গাড়ি নিয়ে নিলয় পার্কিন লডে দিকে চলে যায়।
তৎক্ষণাৎ ফোন ভেজে ওঠে দামিয়ানের।
দামিয়ান ফোন বের করে ফোনের স্ক্রিনে দিকে তাকায়।
__ তুমি যাও আমি আসছি।
ফোন রিসিভ করে দামিয়ান আহানাফকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে।
আহানাফের দৃষ্টি ও তার হাতের ফোনে দিকে ছিল।ভাইয়ের কথা শুনে এক নজর তাকে দেখে অতঃপর চলে যায় নিজের মত।
দামিয়ান ফোন কানে ধরে রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে বলতে ঘুরে মেইন রাস্তার দিকে দৃষ্টি ফেলে আর আচমকা চোখ পড়ে,গারো নীল রংয়ের গোল চুড়িদার পড়া একটি মেয়ে দিকে যাকে রাস্তায় চলাচল মানুষের মাঝে মুহূর্তে চেনা মুসকিল ছিল না দামিয়ানের কাছে।
রাস্তার কিনার ধরে হাঁটছে প্রানপ্রিয়া দৃষ্টি তার
আশেপাশে ইভানকে মেসেজ করে জানিয়ে দিয়েছে সে এসে পড়েছে এবং রেস্টুরেন্টে দিকে যাচ্ছে।
এদিকে দামিয়ানের দৃষ্টি সুরু হয় মেয়েটিকে চিনতে পেরেও তার এগিয়ে আসার প্রতিটা কদমে আরো তাকে নিশ্চিত করছে এটা সেই আশ্রিতা মেয়েটি যাকে তিন মাস পর দেখা গেল গাছগাছালি পরিবেশ রেখে ব্যস্ত রাস্তায় তবে এমন জায়গায় আশা করার মত ছিল না।
প্রানপ্রিয়া আশপাশ দেখতে দেখতে ইভান আর তার ঠিক করা রেস্টুরেন্টের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। আটতলা বিল্ডিংয়ের একদম উপরে রেস্টুরেন্ট, প্রানপ্রিয়া রৌদ্রের কারণে কপালে হাত দিয়ে মিটিমিটি করে এক নজর বিল্ডিংয়ের দিকে চোখ বুলিয়ে ফের হাঁটা শুরু করে।
দামিয়ানের সুরু দৃষ্টি স্থির ছিল ফোন কান থেকে নামিয়ে কৌতুহল হয়ে তাকে অনুসরণ করা শুরু করে। খুবই অদ্ভুত ছিল এটা, সামান্য ওই মেয়ের পিছনে যাচ্ছে , কত টা আকৃষ্ট হয়েছে সে তার প্রতি,
দামিয়ান কিঞ্চিত ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে।
প্রানপ্রিয়া দ্রুত পায়ে হাঁটছে লিফটের দিকে যাওয়ার জন্য সাথে মনে মনে নানান কথা ঠিক করছে ইভানকে কি কি বলবে কিন্তু তার জীবনে আবারো যে কালো মেঘে ধীরে ধীরে ছেয়ে যাচ্ছে তার কি টের আছে। প্রানপ্রিয়া নিজ ভাবনায় বেখালি,
আট তলা বিল্ডিংয়ের প্রথম তলায় শপিং মল মানুষের গিজগিজ ভর দুপুরেও কম ছিল না ।
দামিয়ান তার পিছে হাত বেঁধে ধীর গতিতে হাঁটছে, সামনে প্রানপ্রিয়া হাঁটা গতি দ্রুত তাদের মধ্যে দূরত্ব মোটামুটি অনেকটা মানুষের চলাচলের মধ্যে দামিয়ান তাকে ঘরিষ্ঠ নজরে রেখেছে। সে জানে মেয়েটি তাকে দেখলে পালাবে ঠিক তার স্বীকার করা পাখিদের মত অবশ্য এর আবেগপূর্ণ কারন ও আছে।
প্রানপ্রিয়া অবশেষে লিফটের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, বড় একটা নিশ্বাস ফেলে লিফট খোলার বাটনে চাপ দিতেই সাথে সাথে খুলে যায়। মনের ভেতর চিন্তাভাবনা নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে সে।
সে ঢুকে পড়তেই তার পাশ কেটে একজন লোক ভেতরে প্রবেশ করে যাকে প্রানপ্রিয়া খেয়াল করেনি তবে যখন সে এইট বাটনে চাপ দিবে তার আগেই পাশের লোকটি বাটনে চাপ দিয়ে ধরে।
প্রানপ্রিয়ার কপালে হালকা ভাঁজ এভাবে বাটনে চাপ দিয়ে ধরে রাখা দেখে সে পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।
কুঁচ কুচেকালো মনির গভীর চোখ দুটির সাথে প্রথম প্রানপ্রিয়ার চোখাচোখি হয় এরপর চেনা পরিচিত সুদর্শন মুখ যা কখনোই তার আর দেখার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু তিন মাস পর!!! কেনো!! সেই পাগল!!
প্রানপ্রিয়া বিস্মিত মুখ ফ্যাকাশে,নিশ্বাস তার বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
দামিয়ান ঠোঁটের কোনে হাসি ঝুলিয়ে বাটন থেকে হাত সরিয়ে দাঁড়ায় কিছুটা ঝুঁকে ছিল এতক্ষণ সে।
সে খলনায়ক পর্ব ২৯
__ long time no see miss pranpriya, তার শান্ত ভারি কণ্ঠ।
এরমধ্যে ধীর গতিতে লিফটের দরজাটাও লেগে যায় যা একদম আট তলায় গিয়ে খুলবে।
দামিয়ান পকেটে হাত গুজে দাঁড়ায় তাকে কিছুক্ষণের জন্য আটকানো এর থেকে ভালো কিছু নেই।
প্রানপ্রিয়া ঘামছে এলোমেলো দৃষ্টি নিয়ে চোখ দ্রুত সরিয়ে ফেলে। ভুলে যাওয়া কিছু বাজে স্মৃতি তার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে,,
দামিয়ান শান্ত মুখে তার দিকে তাকিয়ে চিকন চাকন ছোট মেয়েটি তিন মাসে আগের থেকে বেশ আরো আবেদনময়ী হয়ে উঠেছে ,
