প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪১
নীতি জাহিদ
কত দ্রুত সময় পেরিয়ে যায়। এত গুলো মাসের ঝক্কি ঝামেলা, শ্রমের মাধ্যমে শেষ হলো দেশীয় জামদানী প্রদর্শন। হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে জাকজমক ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শেষ মুহুর্তে ইশান এবং মোনালিসা একজনও স্টেজে উঠেনি। শো স্টপার হিসেবে স্টেজে উঠেছে চৈতি। মোনার ডিজাইন করা ফিউশন জামদানী লেহেঙ্গা নিয়ে উঠার কথা ছিলো যা হারিয়ে যায়। পরে জামদানী শাড়ি নতুন করে কাজ করিয়ে তা শো কেইজিং করা হয় এবং সাথে মেইল মডেল হিসেবে উঠেছে জুয়েল,সাদাফ, তিহান সহ আরো কয়েকজন। চারদিকে সাড়া ফেলে দিয়েছে জামদানীর প্রতিটি কাজ। একটি সফল প্রোগ্রামের পর সকলের মন আজ প্রফুল্ল। সংবাদিকদের প্রথম প্রশ্ন ইমরানকে,
– স্যার আপনার পন্য মোনালিসা তো ছড়িয়ে পড়া শুরু করেছে এই ব্যাপারে আপনার অনুভূতি?
ইমরান হেসে বলে,
– মোনালিসা একটা নাম। যাকে কেন্দ্র করে বাংলার পন্য এগিয়ে যাচ্ছে। আমার পন্য নয়। আমি মোনালিসাকে বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরিনি, জামদানী মোনালিসাকে বিশ্বের সাথে পরিচয় করাচ্ছে।
– জ্বি স্যার এভাবেই আমাদের পন্য একদিন সকলে চিনবে। স্যার আরেকটা প্রশ্ন আপনাদের তো ফ্যামিলি বিজনেস। শুনেছি ম্যাডাম মোনালিসা ব্র্যান্ড দেখেন। মোনালিসা কি আপনি ম্যাডামকে সহায়তা করতে ওপেন করেছেন?
– না তা নয়। ম্যাডাম নিজেই মোনালিসা। আমি ম্যাডামকে দেখে ইন্সপায়ার হয়ে মোনালিসা ওপেন করেছি। সেই ক্ষেত্রে ম্যাডাম আমাকে সহায়তা করেছেন। আপাতত আমি ম্যাডাম ছাড়া অনেকাংশেই অচল স্বীকার করতে হবে।
মোনা এলো খানিক বাদে কয়েকটা প্রশ্ন করার পর যে যার যার মত নিজের কাজে ব্যস্ত হলো। একটি সফল ফ্যাশন মোমেন্ট শেষ করে সবাই বাড়ি ফিরছে। সেদিনের পর থেকে মান অভিমানে ভরা হৃদয়যুগল। আজ মোনা অফিস থেকে শুরু করে হলে আসা অবধি অফিসের দু একজন ছাড়া কারো সাথেই কথা বলেনি। বাইরে গাড়ির জন্য প্রত্যেকে ছন্নছাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মোনার হাতে ফোন। ইশান ও মাকে বিরক্ত করছেনা। পরশু থেকে বাবা- মায়ের মাঝে বিরোধ চলছে। ব্যক্তিগত ঝামেলায় কেউ হস্তক্ষেপ করা পছন্দ নয় ইমরানের। ইমরান অদূরে বিভিন্ন কোম্পানির এ.জি.এম, সি ই ও, চেয়ারম্যান এবং ক্লায়েন্টদের সাথে আলাপে মগ্ন। মোনার শো স্টপার হওয়ার সিদ্ধান্ত যে সে নিজেই বাতিল করেছে তা কেউ টের পায়নি। সবাই ভেবেছে ইমরানই হয়তো বাঁধা দিয়েছে। তামান্না,চৈতি,সাদাফ এগিয়ে এলো। সাদাফ প্রশ্ন করলো,
– ম্যাডাম আপনার কি মন খারাপ?
মোনা হেসে দিলো। দু পাশে মাথা নেড়ে বললো,
– ভাইয়া ঠিক আছি।
তিহান কোথা থেকে উড়ে এসে বললো,
– এই ভাই দেখতো কে যেন আমার শার্ট টাতে কি ফেলছে?
সাদাফ তিহানের গায়ের শার্টটা ঘুরিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো,
– তিহানের বাচ্চা, শার্টে কি লাগাইছিস এসব?
তিহান লাফিয়ে উঠে গায়ে থেকে শার্ট খুলে চিৎকার দিয়ে উঠলো,
– কি লাগাইছি? দোস্ত কি আছে আমার শার্টে?
তামান্না এবং চৈতি এগিয়ে এলো। তামান্না বলে উঠলো,
– কি লাগছে তা না বলে চিল্লাস কেনো?
– আরেহ কি বলব, দূরে যাহ। এ্যাই তুই শার্ট খোল শরীর থেকে। আমার একটা টি শার্ট আছে এটা পর। কোথায় ছিলো এই শার্ট?
– রিমির ব্যাগে।
ভেতর থেকে রিমি ছুটে আসছে। একই কাজ কে যেন রিমির শাড়িতেও করেছে। এখনো কস্টিউম ছাড়ে নি। এদের মাঝে হট্টগোল দেখে নয়ন এবং ইমরান এগিয়ে এলো। সাদাফের এক্সট্রা টি- শার্ট ছিলো বলে তিহান রেহাই পেলো। বকেই যাচ্ছে। এদিকে রিমির অবস্থা করুন। এই শাড়িটা আজ শখ করে পরে এসেছিলো। আদি মোহিনী মোহন কাঞ্জিলালের শাড়ি। গত বছর অফিস ট্যুরে ইন্ডিয়া গিয়েছিলো সবাই,তখন কিনেছে। পুরো ঘটনা শুনে নয়ন বললো,
– যা হওয়ার হয়েছে, বাসায় নিয়ে যেতে চাইলে নিয়ে যাও নতুবা ফেলে দাও। আমার প্রশ্ন গ্রীন রুমে নোংরা এলো কি করে? গ্রীন রুম তো সিকিউরড।
তিহান বলে উঠলো,
– স্যার কাজটা গ্রীন রুমের পাশের রুমটাতে হয়েছে। রিমির জন্য সব হয়েছে। আমার আর ওর আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো না, তখন আমি শার্ট টা খুলে ড্রেস চেঞ্জ করেছিলাম পাশের রুমে। পরে রিমিও সম্ভবত ওখানে করেছে। আর ওর ব্যাগে আমার শার্ট ছিলো।
রিমির দিকে তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে বললো,
– তোকে কে বলেছিলো আমার শার্ট তোর শাড়ির সাথে রাখতে। আমার ব্যাগে রাখলিনা কেনো?
রিমি বলে উঠলো,
– দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে।
সাদাফ বলে উঠলো,
– ব্যাগে আর কি কি আছে দেখ?
রিমি ব্যাগে হাত দিয়ে একটা নোংরা ডায়াপার বের করে চিৎকার দিয়ে উঠলো। ইশান দূর থেকে মিটমিট করে হাসছে। মোনার চোখ ইশানের দিকে যেতেই পিছিয়ে এসে প্রশ্ন করলো,
– বাবা হাসছো কেনো?
ইশান মাথা নামিয়ে মাকে ফিসফিস করে বলে,
– মা কাজটা কিভাবে হয়েছে আমি দেখেছি।
মোনার চক্ষু ছানাবড়া।
– কিভাবে?
– ইনফ্যাক্ট ডায়াপার টা এই ব্যাগে রাখতেও আমি দেখেছি কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি যে এটা ওই বাচ্চার মায়ের ব্যাগ না, আর এটা নোংরা ডায়াপার । এই মহিলার জন্য তোমার আর পাপার মাঝে ঝামেলা হয়েছে। দেখো কিভাবে শাস্তি পেয়েছে। প্রোগ্রামে একজন গেস্ট এই কাজ করেছে। ওই রুমে বেবির ডায়াপার চেঞ্জ করে ফেলার জায়গা পাচ্ছিলো না দেখে মনে হয় এই ব্যাগে রেখেছে।
আচমকা জুয়েল কান্নার মত আওয়াজ করে উঠলো। রিমি জুয়েলের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে বলছে,
– মাফ করে দাও। আমার এত টাকার শাড়িও শেষ।
এদিকে জুয়েল ইতিমধ্যে শার্ট, প্যান্ট পরে নিয়েছে যা রিমির ব্যাগে ছিলো। ঘটনা বুঝতে পেরে ইমরান গাড়ির ড্রাইভারকে ডেকে এনে টাকা দিয়ে জুয়েল এবং তিহানের জন্য ড্রেস নিয়ে আসতে বললো। রিমির দিকে তাকিয়ে বললো,
– পরনে শাড়িটি আপনি নিয়ে নেন। স্টোরে আর দেয়ার প্রয়োজন নেই। দু একটা দূর্ঘটনা এমন হয়। একেক জনের রিয়েকশন দেখে আমি ভীষণ অবাক। আপনারা সামান্য ডায়াপার নিয়ে এমন হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিয়েছেন কেনো? আমি কিছু বললে বলবেন বস বাজে ব্যবহার করেছে। বস ভালো না। ওই মহিলা না হয় না বুঝে রেখেছে আপনাদের কি কমনসেন্স ছিলোনা? আমরা ড্রেস চেঞ্জ করার আগে দেখেশুনে চেঞ্জ করি। প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে অনেক আগে এতক্ষন বসে সময় নষ্ট না করে, আগে চেঞ্জিং সেরে নিলেই হতো। শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করে চেঞ্জ করেছেন বলেই তো এই দশা। যাক যা হওয়ার হয়েছে। তিহান এবং জুয়েল ভেতরে যেয়ে বসেন। ফ্রেশ হয়ে এরপর বের হবেন। আমি ম্যানেজারকে বলে দিচ্ছি। ড্রাইভার ড্রেস এনে দিচ্ছে। আর মেয়েরা সব বাসায় যান।
ইশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ইশান, মাকে নিয়ে গাড়িতে উঠো।
মোনা সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় জোরেই বললো,
– যে যেমন তার সাথে তাই ঘটে।
তিহান নাকে কান্না করে বলে,
– আমি কি করেছি?
– বান্ধবীকে আশকারা দিয়েছেন। আরো দিবেন এখন তো বাচ্চার ডায়াপার। কদিন পরে কমোডের মধ্যে পড়বেন।
মোনা ইশানের হাত ধরে গাড়িতে উঠে গেলো। ইশান অনবরত হাসছে। ইমরান নয়ন পরিচিত একজনের সাথে আলোচনায় ব্যস্ত। রবিন ইশানের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলো। ইশান চোখের দিকে সানগ্লাস টা ঠেলে দিয়ে গাড়িতে মায়ের পাশে আরাম করে বসলো। মনে পড়ে গেলো কিছুক্ষণ আগের কথা, পুরো কারসাজি ইশানের। রিমির ব্যাগে ডায়াপার রাখার পরামর্শ ইশান ও রবিন দিয়েছে সেই গেস্টকে। কদিন ধরেই রবিন খেয়াল করছিলো রিমির এসব। রবিনের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য নিতে চাইতো। বাড়ির কাজের বুয়া এবং ড্রাইভার এই দুইজন হলো তথ্যের ভান্ডার। সেই থিওরী এপ্লাই করতে চেয়েছিলো। রবিন ইশানকে জানিয়ে দেয়। আর আজ দুটো মিলে এসব করেছে। রিমি জানেও না সামনে ওর জন্য ইশান, রবিন এবং সোহান কি রেডি করে রেখেছে!
গাড়ি থেকে নেমেই রিমি বাসায় ঢুকে সব এলোমেলো করে নিজের রাগ ঝাড়ছে। মোনাকে সে দেখে নিবে। এই জবটা সে ছাড়তে চাইছেনা। মোটা অংকের বেতন পায় এখানে। অন্যদিকে জুয়েলকে আজ নিজের দলে আনতে চেয়েও পারেনি। জুয়েল জব করবেনা তা ইমরানকে জানিয়েছে। যেখানে মোনা আছে সেখানে ইমোশন থাকবেই। নিজ থেকে ইমরানকে জানিয়েছে। ইমরান আরেকটা কোম্পানিতে রেফার করেছে জুয়েলকে। জুয়েলের এই উদ্যোগ টা বেশ মনে ধরেছে ইমরানের। মুখ ফুটে না বললেও সে নিজেও চেয়েছে জুয়েল না থাকুক। থাকলেও অন্য ব্যবস্থা করতো।
রিমি ইমরানের অতীত জেনে ফোন দিয়েছে কাকনকে। মোনার অবস্থা নাজেহাল করে তবেই সে শান্তি পাবে। কাকন ফোন রিসিভ করতেই নিজের দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা বললো। মনোযোগ দিয়ে ও পাশ থেকে সব শুনে কাকন জানালো সে সাহায্য করতে রাজি। রিমি সঙ্গী পেয়ে আমোদিত। মাথায় যত দুষ্টু পরিকল্পনা সব সাজিয়ে নিলো।
গাড়ি গেট পেরুতেই বাড়ির পাশটা ঝলমলে রোশনাইতে রাঙানো। গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির সকলের সাথে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলো লিভিং এরিয়াতে অতিথিদের সমাগম। মোনা বিস্মিত হলো। রিক্তা,সালমা এগিয়ে এলো। সালমা জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে বললো,
– তোকে অনেক দিন ধরে দেখতে আসবো করে করে সময় পাচ্ছিনা। জামাই ফোন দিয়ে বলার সাথে সাথে চলে এলাম আমরা। তোর চাচ্চুও আসছে, রাস্তায়।
রিক্তাও আদর করছে। মোনা এখনো বুঝতে পারছেনা এত অতিথির কারণ! ইশান সোফায় বসে থাকা অতিথিদের সাথে কোলাকুলি করছে। উৎসব মুখর পরিবেশ। ইমরান নয়ন বাইরে এখনো। আইরিন এগিয়ে এলো। মোনার হাত ধরে সবার মাঝে নিয়ে এলো। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো,
– এই হচ্ছে আমাদের মোনা। খান সাহেবের বউ। এই বাড়ির সদর দরজার চাবি।
আইরিনের দিকে তাকালো হাসিমুখে। কি সুন্দর সম্বোধন। একজন প্রৌঢ়া এগিয়ে এসে মোনাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– আমগো ইমনের বউ?
আইরিন প্রতিউত্তরে বললো,
– হ খালা। সুন্দর না!
– হয়, তয় কচি। পাইলি কনে এমন বউ? লইয়া যামু লগে কইরা?
তুশি বাঁধা দিয়া বলে,
– ইশ সাহস কত বুড়ির? ভাবীরে নিতে দিলেই তো নিবা। তোমার ফন্দি বুঝিনা। আমারে ও নিছিলা। নিয়া তুমি গোবর ধরাইছো। ভাবী জীবনেও এই বুড়ির বাড়ি যাবানা। তোমার হাতে মাটির চুলা লেপাপে, গোবর ধরাবে। ভাগ্যিস আপা যেয়ে আমাকে উদ্ধার করছিলো নয়তো বুড়ি সব কাম আমাকে দিয়ে করাতো।
রোকেয়া অভিমান করে বলে,
– ও আইরিন, ইশতুর বউটার সোপা বেশি। আমি তো গেরামের কাম শিখাইতেছিলাম।
আরো কয়েকজন এসে মোনার সাথে পরিচিত হলো। এর মাঝে ইমরান ভেতরে প্রবেশ করতেই সকলে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। পুরুষরা কোলাকুলি করছে। খালা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো। ফুফু সিড়ি দিয়ে নামছে ইশতিয়াকের সাহায্য নিয়ে। ইমরানকে পেয়ে আত্মহারা। এক পাশে ফুফু অন্য পাশে খালা। দুজনকে জড়িয়ে ধরে ইমরান প্রশ্ন করলো,
– ভালো আছো তোমরা?
এতদিন পর ছেলেকে পেয়ে দুজনই আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদছে। কেউ ইমরানের মায়ের কথা বলছে তো কেউ বাবার কথা। কিছুটা আবেগে ভাসলো ইমরান নিজেও। লিভিং এরিয়া জুড়ে নিরবতা। সকলকে সামলে ইমরান বলে উঠলো,
– বসো তোমরা। আর কাঁদতে হবেনা। সময় চলে যায় তো। বাবা মায়ের জন্য কাঁদছো, আমার বয়স কম হয়েছে? দুদিন পর দেখবে আমিও থাকবোনা। সব জল একসাথে ফেলে দিবে নাকি?
বড় চাচা এসে ইমরানের কাঁধে হাত দিয়ে বললো,
– আল্লাহ তোকে সুস্থ রাখুক, বাঁচিয়ে রাখুক সবার জন্য। কি বলিস এসব। ছেলেটা ছোট। সবে বিয়ে করলি। অশুভ কথা মাথায় আনবিনা।
মাশফি, আশফি সবাই এসে চাচাকে জড়িয়ে ধরলো। বউয়েরা এসে পরিচিত হলো। মোনার সাথে পরিচয় পর্ব শেষ হলো। আইরিন মোনাকে আড়ালে ডেকে বললো,
– আগামীকাল তোদের রিসিপশন টা ইমরান সেরে ফেলতে চাচ্ছে মোনা। তাই এত আয়োজন।
মোনা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো! বাবাকে ছাড়া রিসিপশন। এরা কি করে পারছে? নিজেদের কথাই ভাবলো? চোখ গুলো টলমল করে উঠলো। মোনাকে কি একটি বার ও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন অনুভব করলো না! ভেতর টা কষ্টে হু হু করে উঠলো। মাথা টা কাত করে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো। কেনো যেন সব কিছু তিতকুটে লাগছে। আজ প্রথমবার মনে হলো এরা কেউ আপন নয়! কিসের আনন্দ এদের। ইশান ছুটে এসে মায়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো সবার মাঝে। এর মাঝে ইমরান পোশাক ছেড়েছে। সোফায় এসে বসলো। সাদা পাঞ্জাবীতে ইমরানকে মধ্য বয়স্ক সুপুরুষ লাগছে। মোনার পরনে এখনো জামদানী শাড়ি। মাশফি এবং আশফির স্ত্রী দুজন খুব মনোযোগের সহিত মোনাকে দেখছে। কি মুগ্ধ লাগছে! পরনে মায়ের সবুজ জামদানী। আজকের দিনটাতে মোনা নিজের সংগ্রহের জামদানী পরেছে। আশফির স্ত্রী বলে উঠলো,
– চাচীজান ওখানে দাঁড়িয়ে কেনো আসুন বসুন।
ডাক শুনে মোনা সম্বিত ফিরে ভাবলো, চাচীজান! কত বড় ডাক। চুপচাপ মোনা বসলো। সালমা,রিক্তা সবাই গল্পে মাতোয়ারা। মোনা বাহানা দিয়ে উঠে চলে এলো। রুমে এসে ঘর অন্ধকার করে বসে আছে। বাবাকে ফোন দিয়েই চলেছে। ফোন না ধরাতে আঁছাড় দিলো খাটে। চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো। কিসের উৎসব, কিসের আয়োজন!
মাকে ডাকতে ইশান রুমে এসেছিলো। দরজা লাগানো দেখে কড়া নাড়বে এর আগেই মায়ের আর্তনাদ শুনে ভয় পেয়ে গেলো। মা কাঁদছে ভেতরে। দিশাশূণ্য হয়ে ছুটে গেলো নিচে। এভাবে ইশানকে ছুটতে দেখে সবাই সিড়ির দিকে তাকালো। ইমরান সোফা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। ইশান জোরে বললো,
– পাপা রুমে আসো।
আইরিন আসতে চাইলে বলে,
– ফুফি তুমি পরে আসো তোমাকে ডাকবো আমি।
ইমরান প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে?
ইশান বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে এলো রুমে। রুমের বাইরে থেকে মোনার কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ইমরান কড়া নাড়লো জোরে। খুলছেনা দরজা। ইশান আইরিনের কাছ থেকে অতিরিক্ত চাবিটা নিয়ে এলো। ভেতরে ইশান প্রবেশ না করে বাবাকে বললো,
– মায়ের মন খারাপ আজ তিন দিন ধরে। হয়তো খারাপ লাগা কাজ করছে। সামলে নাও। নিচটা আমি দেখছি। এর মাঝে পাপা তুমি প্রোগ্রামটা করবে বলেছো। নানা ভাই আসলেও করা যেত এটাই হয়তো মায়ের মনে উঠছে নামছে। বুঝতে পারছো পরিস্থিতি?
ইমরান ছেলেকে বিস্মিত হয়ে দেখলো। ছেলে বড় হয়েছে। কলেজে ভর্তি হলো। আজ বাবাকে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলছে। ইমরান ছেলেকে জবাবে বললো,
– হুম।
– আমি জানি পাপা তুমি বেশ আপসেট । নানাভাইয়ের অসুস্থতার ব্যপারটা মায়ের কান অবধি পৌঁছালে তো আমরা পাগল হয়ে যাবো। সামলাবো কি করে তখন? এর মাঝে তুমিও অবুঝের মতো কাজ করো। কি না রিমি টিমির কথা নিয়ে দুজনের মাঝে বিরোধ ঘটালে। পাপা মানায় তোমাকে এসব?
– তুমি কিন্তু আমাকে ভুল বুঝছো বাবা। আমি তোমার মায়ের এরোগেন্ট আচরনের জন্য রাগ করেছি।
– না করবে নাতো। কেনো করবে? রাগটা তোমার জন্য দেখিয়েছে। তুমি কারো ভালোবাসা না পেতে পেতে অনুভূতিহীন হয়ে যাচ্ছো পাপা। তাই মায়ের ভালোবাসা চোখে পড়ছেনা। এনিওয়ে আমরা পরে ওসব ভাববো। আমি নিচটা সামলাই। তুমি মাকে ঠিক করো। গেলাম।
এক ছুটে নেমে গেলো ইশান। ইমরান ছেলেকে দেখছে আর ভাবছে এই ছেলে এত বুঝদার হলো কি করে! ভাবনা ছেড়ে রুমে ঢুকে দেখতে পেলো মোনা মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে। মাথা খাটে। দরজা আটকে লাইট জ্বালিয়ে নিচে বসলো ইমরান। চোখের কাজল ছড়াছড়ি। মোনার কাঁধে হাত দিতেই মেয়েটা অনড় হয়ে ঠোঁটে আওড়ালো,
– মেয়েরা বিয়ের পর বুঝি এতটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠে যে পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য মত আছে কি নেই সেটুকু দেয়ার অধিকার থাকেনা?
ইমরান মোনার হাত দুটো মুঠো ভর্তি করে বললো,
– অবশ্যই থাকে। আমি ঘরোয়া অনুষ্ঠান করছি। বাবাই নির্দেশ দিলো কদিন আগে। ব্যস্ততায় বলিনি। এছাড়া গত দুদিন তো…
– গত দুদিন তো আপনি রাগ করেই কূল পাচ্ছেন না কি এসব বলবেন তাই না।
মোনার মুখটা আজলে নিয়ে দুচোখ মুছে দিয়ে বললো,
– তোমাকে ওসবে মানায় না মোনালিসা। তুমি আমার মোনালিসা। রাস্তায় এভাবে ঝগড়া কতটা অশোভনীয় বলো?
– হুম।
– কি হলো চুপ কেনো?
– প্রতিবাদ আর করবোনা।
ইমরান হেসে উত্তর দেয়,
– সত্যি?
– হুম
– কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি আবার করবে।
– দরকার নেই তো। অনেক করেছি।
– তখন এবার শাকচুন্নীদের চোখ যদি আবার পড়ে ইমরান সাহেবের উপর।
– আপনি চাইছেন টা কি?
– যেমন আছো তেমনই থাকো।
– এরপর আমাকে বকা দিবেন। রাগ করবেন।
– দিবোনা। না দিবার ব্যবস্থা করছি।
– মানে?
– পরে বলবো। এখন মন ভালো করো।
– বাবাকে মনে পড়ছে।
ইমরান মোনাকে কাছে টেনে বুকে চেপে ধরলো। নিজেকে সামলে বললো,
– বাবা তো আসবে আর কটা দিন পর। বাবা এসে গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন করবে জানিয়েছে। এখন আপাতত সবাইকে আমরা ছোট্ট করে জানাবো। প্রোগ্রামটা বাড়িতেই করবো। আমি করতে চাইনি। কিন্তু সবাইকে জানাতে তো হবে ইমরানের একটা ছোট্ট কুইন আছে। এতদিন সবাই বড়াই করেছে, আমি দেখতাম। আজ সবাই দেখছে, আমার রানীকে। আমার কি যে ভালো লাগছে। জানো নিচে সবাই গল্প করছিলো, মোনা কত সুন্দর। আমি তখন প্রতিবার মাশা আল্লাহ বলছিলাম আর শুকরিয়া আদায় করছিলাম। মোনালিসা ধন্যবাদ।
– কেনো?
মোনার দুচোখ মুছে দিলো ইমরান। কপালে অধর ছুঁয়ে বললো,
– স্টেজে উঠোনি বলে, তুমি নিচে যখন বসেছিলে তখনই সকলে হা করে ছিলো। উপরে উঠলে অনেকে ছবি তুলতো। ওখানে সবাই ভালো ছিলোনা। ইভেন আমি মোটেও চৈতিদের হাঁটার পক্ষে ছিলাম না। মডেলদের ব্যাপারটা অন্য রকম। তারা অভ্যস্ত। পরে চৈতির আগ্রহ দেখে বাঁধা দিই নি। মেয়েটা কষ্ট পেতে পারে।
মোনা চুপচাপ গুটি মেরে ইমরানের বুকে লেপ্টে আছে। ইমরান থুতনি উঠিয়ে বললো,
– ফ্রেশ হবেনা? সবাই নিচে অপেক্ষা করছে। এতক্ষনে বউ পাগল তকমা পেয়ে গিয়েছি হয়তো।
– পেলে পাবেন। আমি পাইনি জামাই পাগল?
– পেয়েছো নাকি?
– হুম ক্যাম্পাসে সবাই সিনিয়র সিটিজেনের বউ ডাকে। তখন আমি গর্ব করে বলি, আমার ইমরান সাহেব আছে, তোদের কি আছে?
– পাগলী একটা। মন ভালো হলো? তোমার জন্য কাল অনেক সারপ্রাইজ আছে।
– কি কি?
– কালই দেখবে এখন উঠো। নিচে চলো।
ইশান এবং মোনা দুজনের মুখে হাত। ইশান মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মা এসবের মানে কি? আমরা কি ভাবলাম আর হলো টা কি?
সোহান ফোনটা ইশানের হাত থেকে নিয়ে বলে,
– ফোন দে আরো দেখাই। আমি নিজেও অবাক। এইচ.আর যখন আমাকে ফোন দিয়ে বললো, রিমির জব নেই। আমি তো চমকে গেলাম। জব যে নেই তা রিমি জানেই না। ওকে ইন্সটেন্ট টার্মিনেট করবে মামা।
মোনা সোহানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– অপরাধ কি?
– তাতো জানিনা মামী। এতটুকু জানি। জব গত মাসে চলে গিয়েছে। এই মাসটা ওকে সহ্য করছে কারন ওর কাজ অলরেডি নতুন একজন বুঝে নিচ্ছে। আর ওকে না জানানোর নির্দেশ নাকি মামাই দিয়েছে। ভিতরের খবর যতটুকু জানি হিসেবে গড়মিল করেছে এবং আমাদের একজন ক্লায়েন্টের সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিলো।
ইশান সোহানের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আমি পাপাকে বুঝিনা। কেমন ঠান্ডা আচরণ করে। এমন ভাব মনে হয় যেন দিন দুনিয়ার সব কিছুর প্রতি উদাসীন। কিন্তু পাপা তো এমন না।
মোনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
– সবই ঠিক আছে। শুধু আমার ব্যাপারেই উদাসীন তোমার পাপা।
সোহান বলে উঠলো,
– ভুল বললে মামী। তোমরা জানোই না মামা কি কারণে চুপচাপ।
– কি কারণে?
– মামা তোমার উপর গুলি চালানো লোকটাকে ধরে ফেলেছে। তাই অন্যদিকের সব মনোযোগ সরিয়ে সেদিকে মন দিয়েছে।
মোনা মুখে হাত দিয়ে বলে,
– ইয়া আল্লাহ সেই লোক সুস্থ আছে?
– জানিনা তো। আপাতত চুপ থাকো। কেউ ঘাটাবেনা। জুয়েল আর রিমি দুইটার কপালেই দুঃখ আছে।
ইশান হেসে বলে,
– আরেকটা নিউজ দিই?
মোনা ভ্রু নাচিয়ে বলে,
– কি?
– জুয়েল জব ছেড়ে দিয়েছে।
সোহান, মোনা এবং ইশান একে অন্যের দিকে তাকিয়ে নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে। অপেক্ষা এখন ঝড়ের। মোনা নিজেও সবকিছু নিয়ে বেশ চিন্তিত।
খাবার টেবিলে হালকা আয়োজন। মোনাকে হলুদ দেয়ার আলোচনা হচ্ছে। বাবার হাতে ছাড়া মোনা হলুদ লাগাবেনা জেদ ধরেছে। ইমরানের ও আপত্তি এই ব্যাপারে। সুতরাং এই আয়োজন বাতিল হলো। রাতের খাবার শেষে সকলে আড্ডায় বসেছে পুনরায়। সবকিছু যত্নে সামলে নিয়েছে ইশান। সাথে ছিলো সোহান এবং ফুফি। নয়ন আজ ইশানের গিটার নিয়ে বসেছে। লিভিং এরিয়াতে আসর জমেছে। মাশফি খুব ভালো গান জানে। একটার পর একটা গান বাজছে, এর মাঝে নয়ন বলে উঠলো আমি একটা পাঁচ মিশালি গান গাইতে চাই। রিক্তা চাল বুঝে না করে দিলো দিলো। ইমরান ভ্রু কুচকে রেখেছে। সে নিশ্চিত এলোমেলো কিছু গাইবে। এখন মান সম্মান কিছু থাকবে? সকলের আগ্রহে নয়ন প্রথম কটা লাইন গাইলো,
– রসিক দিলকা জ্বালা ওই লাল কুর্তাওয়ালা
দিলি বড়ো জ্বালা রে পাঞ্জাবিওয়ালা
মাইনষে বলে তারে কালার কালা
আমারই কাছে লাগে কত যে ভালা
কালা গলার মালা, ওই লাল কুর্তাওয়ালা
দিলি বড়ো জ্বালা রে পাঞ্জাবিওয়ালা…
ইশান কপাল চাপড়াচ্ছে। বত্রিশটা দাঁত দেখিয়ে নয়ন বলে আরেকটা গাই। বাকিরা কেউ গানের ভাবার্থ বুঝতে না পারলেও মোনা,সোহান,ইশান এবং ইমরান সব বুঝতে পারছে। নয়নের পরবর্তী গান,
– ওরে কালাচান
তোমার লাগি মন করে আনচান
হায়রে, ওরে কালাচান
একখান বাটার পান খাইয়া যান।
আশফি হঠাৎ বলে উঠলো,
– নয়ন আংকেল আপনার কি কালো রঙ অনেক পছন্দের?
নয়ন আশফিকে থামিয়ে বলে,
– হ অনেক, আরেহ ব্যাটা শুন আরেকটা গাই।
কালো জলে কুচলা তলে ডুবল সনাতন
আজ চার আনা, কাল চার আনা পাই যে দর্শন…
মোনার ধমক খেয়ে নয়ন থেমে গেলো। সবাই মোনার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। মোনা মামার দিকে তাকিয়ে বললো,
– তুমি কি মনে করো তুমি সুন্দর হয়ে এক্কেবারে সব উদ্ধার করেছো? মামী তোমার বরকে বলো আমার বরের পেছনে যেন না লাগে। সারাক্ষন শুধু কালা,কুলা গায়।
নয়ন মুখ ভেঙচি দিয়ে বলে,
– ইশ নিজে ডাকিস না ব্ল্যাক ডায়মন্ড!
– ঠিকই তো হিরাই তো ইমরান সাহেব।
ইমরান মোনার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। নয়ন প্রতিউত্তর করলো,
– সাথে কালা ও বলিস।
– আমি আমার স্বামীকে যা খুশি বলব। তুমি বলবানা। এহ, তুমি দেখছো আয়নায় তোমাকে কেমন লাগে, সাদা মুরগী লাগে। পুরুষ মানুষ কালো না হলে সুন্দর আছে! আমার বাপ ও কালো, জামাই ও কালো। ছেলেটা একটু শ্যাম বর্ণ আমার মত। সমস্যা নেই। তুমি ফরসা সুন্দরের বংশ নিয়ে বসে থাকো।
মামা- ভাগ্নীর তর্ক দেখে বাকিরা মুখ লুকিয়ে হাসছে। ইমরান মাথা নুইয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। এদিকে বাড়ির বাচ্চা গুলা হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। ইমরান এক পর্যায়ে গলা খাকারি দিয়ে বললো,
– ঠিক আছে। থামো তোমরা। নয়ন চুপ থাক। ধন্যবাদ এত সুন্দর গানের জন্য। তোর গানের টেস্ট দূর্দান্ত। এভ্রিওয়ান পুট ইয়ুর হ্যান্ডস টুগেদার ফর নয়ন।
সকলে হাত তালি দিচ্ছে। নয়ন মুখ ভেঙচি দিয়ে বললো,
– পুচকে বউ দিয়ে অপমান করালিনা মনে রাখিস।
– ঠিক আছে মামা।
প্রথমে খেয়াল করেনি। আচমকা নয়ন বসা থেকে দাঁড়িয়ে বললো,
– তুই আমাকে মামা ডাকলি? আমার রাত টা দিন হয়ে গেলোরে ,দিনটা জ্বলছে তারার মত? আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে…
ইমরান হাসতে হাসতে বলে,
– থাম রাতে তারা থাকে দিনে না…
খুনশুটিতে ভরে উঠেছে লিভিং এরিয়া। মোনার ফুফু শাশুড়ী মোনাকে পাশে বসিয়ে গল্প করছে। আচমকা খালা শাশুড়ী মোনার পেটে হাত দিয়ে বললো,
– ও বউ, বিয়ার তো দুই তিনমাস হইলো কোনো খবর আছে নি?
মোনা পেটের দিকে তাকিয়ে দেখে উনার হাত। লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে। পাশের সোফায় ছিলো ইমরান। বেচারা হকচকিয়ে গেলো। ফুফু ইমরানের দিকে ফিরে বললো,
– ও বাপ, দেরি করোস কেনো? বয়স দেখছোস তোর। আরেকটা পোলা /মাইয়া হইলে তো তাড়াতাড়ি পাইলা দিতে পারবি শরীরে শক্তি থাকতে থাকতে। চুলে পাকন ধরছে তোর। বউয়ের ও বয়স কম। নিয়া ফেল একটা বাচ্ছা।
ইমরান জমে গিয়েছে। ইশান বাবার দিকে তাকিয়ে লজ্জা পেয়ে উঠে গেলো। ইমরান না পারছে উঠে যেতে না পারছে খালাকে প্রতিউত্তর করতে। আইরিন ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে বললো,
– ইমন, চা কফি কিছু খাবি?
বোনের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ালো খাবেনা বলে। মোনার কেঁদে দেয়া বাকি। আরো বড় বাজ ফেলে খালা শাশুড়ী বলে উঠলো,
– এই মাইয়া, তুমি খাও না? শইলে এক কাডি গোস্ত নাই। বিয়া করছো তোমার চাইতে দশ গুন বড় এক ব্যাডা মানুষ। জানোনা ব্যাডা সামলাইতে বেশি খাইতে হয়। এক ম্যাচের কাডির শইলে নিজের ব্যাডা খুশি অয়?
মোনা দু অধর আলগা করে ফেললো। ইমরান আর একটি মুহুর্তও বসে নি। সোজা উঠে দাঁড়ায়। গলা ঝেড়ে বলে,
– আপা আমি একটু আসছি। কাজ আছে। ইশান সবাইকে নিয়ে উপরে চলে যাও। যার যার রুম দেখিয়ে দিও।
হনহন করে বের হয়ে গেল ইমরান। নয়ন এবং মনসুর দাঁড়িয়ে পড়েছে। সালমা, রিক্তার জিভে কামড়। বাসায় ফেরার জন্য দাঁড়িয়েছে। আশফির ওয়াইফ দুই বুড়িকে সকলের সামনে ধমকে বলে,
– পাগল হলে বুড়িরা। কি বলতে হয় কোথায় জানোনা। চাচাজান লজ্জা পেয়ে উঠে গেছে। উনার সাথে মশকরা করার বয়স এটা?
– কেন? ও কি পোলা পয়দা করে নাই?
মোনা চোখ মুখে অসহায় ভাব এনে বললো,
– খালাম্মা। আমি উপরে যাই একটু? ওয়াশরুমে যাবো।
কোনো রকম পার পেয়ে মোনা ছুটে কামরায় এলো। কিছুক্ষনের মাঝে পিছু পিছু সালমা, রিক্তা বিদায় নিতে এলো। বাকিরাও এলো। আশফির স্ত্রী ফাহিমা বলে উঠলো,
– চাচীজান, চাচাজান লজ্জা পেয়েছে। তুমি কিছু মনে করোনা দাদীদের কথায়। উনারা তো একটু বয়স্ক তাই।
মোনা মৃদু হেসে বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪০
– না কিছু মনে করিনি। খানিকটা লজ্জা পেয়েছিলাম এভাবে সবার সামনে বলাতে…
সবাই এটা নিয়ে মজা করছিলো। ধীরে ধীরে সকলে চলে গেলো। বাকিরা যার যার কামরায় প্রবেশ করেছে। ঘড়ির কাটা অনেকটা সময় পেরিয়েছে। মোনা ইমরানকে কল করতেই মেসেজ দিয়ে জানালো আসছে।
