নিবৃতা পর্ব ৬
নেহার ছায়ালিপি
ভাগ্য সহায় না থাকায়, নিবৃতা জানতে পারলো না, রান্নার চুলো ঠিক কিভাবে জ্বালায় বা জ্বলে। তানহা ওকে টেনে নিয়ে আসার পরই দেখে হাঁড়িতে টগবগ করে পানি ফুটছে। সেটাতেই এখন আটা মিশাচ্ছে তাবিব। পুরুষালী পেটানো শক্ত পোক্ত হাতে তার নিদারুণ গতি ও নিপুনতা। মুখাবয়বে বেশ মনোযোগী ভাব। রিমলেস চশমার আড়ালে থাকা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার কাজে নিবদ্ধ। তবে ও যা ভুলে নি সেটা হলো, আড়চোখে একবার নিবৃতাকে পরখ করা। কিন্তু পরপরই নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পরেছে তাবিব। যে মানুষটা নিজের উপর আলাদা করে নজর কিংবা মনোনিবেশ পছন্দ করে না, এতে বিব্রত বোধ করে, সেই মানুষটাকে এতটুকু স্বস্তি তো দেওয়াই যায়। অন্তত একয়দিন। তবে নিবৃতার দৃষ্টিতে এবার আর জড়তা কিংবা সংশয় মিশে নয়, বরঞ্চ তাকে বেশ মনোযোগী মনে হচ্ছে। এক নাগাড়ে সে তাবিবের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। কিচেনের টপ কাউন্টারের সম্মুখেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রুটি বেলছে সে। কপালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কিঞ্চিৎ ভেজা চুলগুলো। নিবৃতার এতোদিন এসব কাজের প্রতি কোন কৌতুহল কাজ করে নি, কিংবা পরিবারের কেউ নিবৃতাকে ডেকে নিয়ে এসব শেখানোর প্রয়োজনও মনে করে নি৷ সে সবসময় ঘরে আবদ্ধ থাকাতেই আরাম পেতো। আর ও যেভাবে ভালো থাকে, শান্তি পায়, সবার লক্ষ্য ছিল ঠিক সেগুলোই করা। তাই শেষমেশ এগুলোর কিছুই ওর জানা হয় নি।
এ যাত্রায় দেখতে দেখতে তাবিবের একটি রুটি বানানো শেষ। আকারে পুরোপুরি গোল। একটি তুচ্ছ ভাজ কিংবা ছেঁড়া ফাটাও নেই। একদম পারদর্শী, অত্যন্ত দক্ষ। তাবিব সেই রুটিটি তুলে তানহার হাতে দিতেই ও সেটি নিবৃতার সম্মুখে তুলে ধরে সমস্বরে বলে,
– দেখেছ রুটিটা? বাবা ইজ এন এক্সপার্ট। অনেক সুন্দর হয়েছে না?
তাবিব এদিকে না তাকালেও তার কান দুটো খাঁড়া হয়ে আছে। যেন সে কারও প্রত্যুত্তর শুনতে ভীষন আগ্রহী! এবং তাকে এবার আর নিরাশ হতে হয় নি। কারণ মানুষটা একমাত্র তানহার ক্ষেত্রেই সচল গতি সম্পন্ন। নতুবা তার মুখ ফুটে একটি শব্দ বেরোতেই দিন ফুরিয়ে রাত হয়।
– সুন্দর।
– থ্যাঙ্কস্।
উত্তরটি রুটি তৈরীতে মশগুল মানুষটাই দিয়েছে। নিবৃতা কিছু না বলে দেওয়ালে সেঁটে যায় আরও। এদিকে তানহাও বেশ কাজের। বাবাকে সাহায্য করার জনঢ় নিজ থেকেই রুটি গুলো ভেজে নিচ্ছে। সুন্দর মতন ফুলে ফুলে উঠছে সেগুলো। নিবৃতা গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকে। যেন সে, নীরবে সেগুলো মস্তিষ্কে ধারণ করছে। তাকে শিখতে হবে এগুলো। সে তো এখন, একজনের আম্মু। মা’দের কি অকর্মার ঢেঁকি হলে হয়?
– তোমার নানুর দেওয়া খাবারগুলো ফ্রিজে আছে। একটু ওভেনে দিয়ে আসো তো মা।
তাবিবের আদেশ পালনে তানহা তটস্থ। তাই কিছু একটা ভেবে খুন্তিটা সরাসরি নিবৃতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,
– তুমি একটু রুটিগুলো দেখো। আমি খাবার গরম করতে দিয়ে আসি।
খুন্তি হাতে নিয়ে আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো নিবৃতা। একবার নিজের হাতের দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার চুলোর উপরপ প্যানের মাঝে থাকা রুটির দিকে। আবার আঁড়চোখে তার একদম পাশেই দাঁড়ানো তার ভাষায়, কঠোর লোকটাকেও দেখলো এক পলক।
– রুটি পুরে যাচ্ছে নিবেদিতা।
সাবলীল পুরুষ কন্ঠস্বর। সেখানে কোন উদ্বেগ কিংবা তাড়া নেই। শুধু যেন ওকে সচেতনতায় আনার ক্ষুদ্র চেষ্টা। অক্লিষ্ট ঢোক গিলে এগিয়ে গেলো সে। তাবিব সবটাই তেঁড়ছা নজরে খেয়াল করলো। সে দেখতে চায়, মেয়েটা ঠিক কি করে।
নিবৃতা ঠোঁট দুটো গুটিয়ে নিলো। একবার পূর্ণ দৃষ্টি মেলে দেখলো সবটা। এরপর কম্পিত হাতটি এগিয়ে দিলো। কিন্তু আশ্চর্য সে রুটিটি উল্টাতে পর্যন্ত পারছে না। আয়ত্তেই আসছে না। তবুও চেষ্টা করলো। প্যানে খটখট আওয়াজ হলো। ততক্ষণে রুটি পুড়তে শুরু হয়ে গিয়েছে। কটু, তেঁতো গন্ধ ছড়িয়েছে এই রান্নাঘর জুরে।
তাবিব এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। খুন্তি যদি ভেতরে না নিয়ে শুধু সামনেই থাকে তাহলে রুটি উল্টানো সম্ভব? এতোটা নির্বোধ, আহাম্মক ও বুদ্ধিহীন মানুষও হয়? এর চেয়ে তো ওর মেয়েটা হাজার গুনে ভালো। ক্লাস টু থেকে বাবাকে কাজে সাহায্য করে। হতাশায় মাথা নাড়িয়ে আচমকাই ও নিবৃতার হাতটা আলতো করে ধরলো। তৎক্ষনাৎ ঝক্কি দিয়ে বড় বড় চোখে চাইলো নিবৃতা। তাবিব সেটা না দেখেও অনুভব করতে পারলো। অত্যন্ত শীতল গলায় বললো,
– এভাবে তাকানোর কিছু নেই। আমি আপনার স্বামী হই, দোকানের কোন অপরিচিত সেলসম্যান না যে এতো অবাক হতে হবে। শান্ত থাকুন।
পৌরুষ হাতটি বুঝতে পারলো সেই লতানো কলির ন্যায় সরু, নরম হাতদুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। তবুও তাবিব ছাড়লো না। আবারও যথা সম্ভব গম্ভীর গলায় বললো,
– ধরুন আমি আপনার টিচার। আপনাকে এখন রুটি ভাজা শেখাবো। আপনার মনোযোগ সেখানেই থাকা উচিত। ভেবে দেখুন, আপনার মেয়ে এতো ভালো করে এই কাজটা করতে পারে, অথচ আপনি প্রথম বারেই রুটিটা পুড়িয়ে ফেললেন। কতটা অপমানজনক। তাই না?
সত্যি বলতে একটু আগে তো এই কথাটাই ভাবছিলো নিবৃতা। এই লোকটা কিভাবে জানলো সে কথা? সে কি মন পড়তে পারে? ভাবুক তার ভাবনা ছোটাতে তাবিব আবার বলে,
– শিখবেন?
নিবৃতা ওতো কিছু আর ভাবলো না। হালকা করে মাথা কাত করলো। এই মেয়ে এমন কেন? তাবিব নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রেখে আবারও বললো,
– কি?
আবারও সেই ভুল, যা তাবিবের চোখে গর্হিত অপরাধ সেটা করতে গিয়েই জ্বিভ কাটলো নিবৃতা। চোখ বুঁজে অস্ফুটে বললো,
– জ্বি শিখবো।
ঠোঁটের কোনে সূক্ষ্ম হাসি ফুটলেও সেটি ভীষন পটুত্বে আড়াল করে নিলো তাবিব। এরপর নিজের মতো করে দেখিয়ে দিতে লাগলো রুটি ঠিক কিভাবে ভাজতে হয়। ছোট্ট থেকে ছোট্ট বিষয় পর্যন্ত নিবৃতার আয়ত্তে পৌছানোর চেষ্টা করলো। নিবৃতা অবশ্য ভালো ছাত্রী। বুঝিয়ে বললে সে বুঝে নেয়। এরপর আর সে আটকে যায় নি। তাবিব পাশ থেকে দেখলো এবং নিজের শিক্ষকতার উপর নিশ্চুপে বড়াই করলো। তার মতে, নিবৃতার মতো ঢিমে মেয়েকল একবারেই কোন কাজ শিখিয়ে ফেলার মতো এক অসাধ্য সে সাধন করেছে। শেষে যখন তানহা ফিরে এলো, ততক্ষণে সব রুটি ভাজা শেষ। নিবৃতাই করেছে সেগুলো। পরপর যখন রুটিগুলো নিয়ে খাবার ঘর অভিমুখে চললো তারা, নিবৃতা জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তার শ্রমকেই দেখে চললো। ঠোঁটের কোণে তার স্বচ্ছ এক হাসির রেখা। নিজের উপর তার গর্ব হচ্ছে। আর তীক্ষ্ণ নজরের তাবিব সবটা লক্ষ্য করে নিজেও মিটিমিটি হাসলো। কিন্তু এক পর্যায়ে সে নিজের উপর নিজেই অবাক হলো। এখানে এতো হাসার কি আছে? বিয়ের এক দিন পার না হতেই মাথাটা ওর গিয়েছে বোধহয়।
– তুমি এতো কম খাও সবসময়ই?
তানহার কথার প্রেক্ষিতে নিবৃতাকে বিভ্রান্ত দেখালো। ও ঠিক বুঝতে পারছে না। এরকমই করেই তো ও সবসময় খায়। কোন সমস্যা হয় নি। তাহলে আজ?
ডাইনিং টেবিলে বসে, সবাই নৈশভোজে ব্যস্ত ছিল। তবে তাবিবের বিশেষ নজর আড়াল হতেও নিৃবতার উপরই ছিলো। সে তার ওয়াদা পালনে বদ্ধ পরিকর। নিবৃতার কোন ধরনের অসুবিধা হোক সেটা ও চায় না।
– তানহা আপনার থেকে এতো ছোট হয়েও তিনটা রুটি খেলো অথচ আপনি এখনও একটাই শেষ করতে পারেন নি।
স্বভাবতই গম্ভীর শোনালো তাকে। তানহা ও নিবৃতা পাশাপাশি বসলেও তাবিব মধ্যভাগের চেয়ারটায় নিজের আসন বুঝে নিয়েছে। কিন্তু নিবৃতার এই আচরণে ও আবারও কথা বলতে বাধ্য। নিবৃতা কি বলবে বুঝে পায় না, এর মধ্যে তাবিব আবারও বলে,
– সমস্যা থাকলে মুখ ফুটে বলা শিখুন। এটাই এখন থেকে আপনার বাসা ও আমরাই আপনার আপনজন৷ নিজ পছন্দ ও অপছন্দ প্রকাশ না করলে, আমরা বুঝতে পারবো না। বরং যদি মনে করেন, আপনি কিছু বললে, আমরা স্বাভাবিকভাবে নিবো না, তাহলে সেটা সম্পূর্ণই আপনার ভ্রান্ত ধারণা।
এতো কঠিন কঠিন কথা বলে লোকটা, নিবৃতা বুঝে পায় না, কি বলবে উত্তরে। তাও পরিস্থিতি সামাল দিতে ধীর স্বরে বললো,
– আমি তো এতোটুকুই খাই।
ভ্রু কুঁচকে চায় তাবিব। কথাটা একদমই তার কর্নকুহর পর্যন্ত পৌছায় নি। তবে মাঝ থেকে তানহা বলে,
– আম্মু বলে, এতোটুকুই খায় রাতের বেলা।
শক্ত, মসৃণ কপালে স্পষ্ট ভাজ পরে। নিজ মনে বিরক্ত কন্ঠে আওড়ায়,
– এমনিতেই পাটকাঠি, সে নাকি আবার ডায়েট করে!
আওয়াজটা নত হলেও সকলে শুনলো। সাথে নিবৃতাও! আশ্চর্য সে কখন বললো, ও খাবার পরিমাপ করে খায়? লোকটার সব বিষয়েই এমন হটকারিতা করা জরুরি! না বুঝে কথা বলার অভ্যাস। ওর মেজাজ খারাপ হলেও স্বভাবের বাহিরে গিয়ে কিছু বলতো পারলো না। ঘন, ভ্রুদ্বয়ের মাঝে দৃশ্যমান ভাজ পরলো। পেলব ঠোঁট গুটিয়ে গেলো। এই পরিবর্তনটুকু দেখে তানহার ভালো লাগলো না। ও প্রসঙ্গ পাল্টাতে তাবিবকে বললো,
– আম্মুর গিফট কোথায় বাবা?
খাওয়া থামিয়ে দিয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকায় তাবিব। গিফট? ওর মনে পরে গেলো, নব বধুকে বিয়ের রাতে দিতে হয় কিছু একটা। কিন্তু ও সেরকম কিছু হিসেব করে নি। কিন্ত মুখের উপর পরাজয় স্বীকার করতে গিয়েও থেমে গেলো ও। চুপচাপ বসে থাকা নিবৃতাকে দেখে ওর মাথায় অন্য বিষয় খেলে গেলো। মাথা নত সে করবে না। তাই দাম্ভিক কন্ঠে বললো,
– তোমার আম্মুর কোন পছন্দ, অপছন্দ তো আমার জানা নেই। সে কিছুই বলে নি। তাই আমিও আগ বাড়িয়ে কিছু করি নি। যদি পরে ভালো না লাগে?
উত্তরটা তানহার পছন্দ হয় নি। ও মুখ ফুলিয়ে বললো,
– তাই বলে তুমি কিছুই আনো নি?
তাবিব বক্র হেসে বলে,
– তোমার আম্মুর জন্য একটা বেস্ট অফার আছে অবশ্য।
তানহা উৎসুক গলায় বলে,
– কি সেটা?
– উনি যা চাইবেন, আমি তা-ই দিবো।
– সত্যি?
– হ্যা।
তানহা এবার নিবৃতার দিকে ফিরে জোর গলায় বললো,
– কি চাও আম্মু? এক দমে বলে ফেলো। এটাই কিন্তু সুযোগ! পরে কিন্তু আফসোস করতে হবে।
শূন্য মস্তিষ্কের নিবৃতা আজও ভ্রুক্ষেপহীন। স্বাভাবিকভাবেই বললো,
– আমি কিছু চাই না।
– আরে এটা বললে হয়? কিছু তো একটা চাইতেই হবে।
কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে ভাবলো নিবৃতা, কিন্তু সফল হলো না। তার ভাবনায় কিছুই আসছে না। অথচ এদিকে তাবিব ভাবছে, মেয়েটা ওর ক্ষেত্রে সর্বদাই কেমন ত্যাড়ামো করে। সমস্যাটা কোথায়? ওর মেজাজ উঠে যাচ্ছে। তাই অপেক্ষা না করে দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো,
– তোমার আম্মুকে সারারাত ভাবতে বলো। আমার এখন সময় নেই।
তানহা বুঝলো বাবা তার রাগ করেছে৷ ও নিজেও নিস্তেজ হয়ে বসে রইলো। এদিকে নির্বোধ নিবৃতা ভেবে চলেছে কি চাওয়া যায়! তানহা যেহেতু চায়, নিবৃতা কিছু একটা চেয়ে নিক তার বাবার কাছ থেকে, তাহলে ওকে চাইতেই হবে!
ঘড়ির কাটা রাত এগারোটা পেরিয়ে গিয়েছে। নিয়ম শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত তানহা রাত দশটা বাজেই ঘুমিয়ে পরে। তাই এখন সে ভীষন ক্লান্ত ও ঘুমো ঘুমো অবস্থায় আছে।
– আম্মু আমি এখন ঘুমাবো।
নিবৃতা পাশেই ছিল। সম্মতি জানিয়ে বললো,
– আচ্ছা!
সফেদ আলো নিভে গেলেও প্রাণোচ্ছল তানহার ঘর আঁধারে ডুবলো না। বরঞ্চ এ যেন ভিন্ন এক দুনিয়া উদ্ভাসিত হলো। পুরো ঘর অন্য রকম দ্যুতিতে ঝলমল করছে। প্রথম প্রথম চোখে লাগলেও এখন ভীষন আরাম জোগাচ্ছে মস্তিষ্কে। উষ্ণ এক অনুভূতি, যেখানে নিরবিচ্ছিন্ন গভীর ক্লেশের কোন উপস্থিতি নেই। নিবৃতার চারপাশে তাকিয়ে বেশ ভালো লাগলো। দ্বিতীয় কিছু না ভেবে যখন তানহার পাশে শুতে বসলো তখন এক ঝটকায় লাফ দিয়ে উঠলো তানহা। হতভম্ব গলায় বললো,
– তুমি আমার সাথে ঘুমাবে?
নিবৃতা একটু হকচকিয়ে গিয়েছে। গোল গোল চোখে তাকিয়ে থেকে বোকার মতো বলে উঠে,
– হ্যা। কোন সমস্যা?
বুঝদার তানহা আপাত দৃষ্টিতে ছোট হলেও একটু বেশিই পরিপক্ব মস্তিষ্কের। নিয়মনীতি একটু হলেও বোঝে। তাই কিছুটা অবাক হয়েছিল। তবে এমন উত্তরে এবার তার খুশির ভান্ডার কানায় কানায় ভরে গিয়ে উপচে পরলো। নিবৃতাকে জাপটে ধরে বললো,
– সমস্যা কেন হবে? আমি তো অনেক খুশি।
স্মিত হাসলো নিবৃতা। তানহার চুলের ভাজে নিজের নরম হাত গলিয়ে দিলো। এতে আরাম বোধ করে দ্রুতই ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো মেয়ে তার। এদিকে নিবৃতার চোখে ঘুম নেই। ভাবতে ভাবতে তার মাথায় একটি বিষয় উঠে এসেছে। ভীষন করে মন বলছে, এটাই চেয়ে নিতে তাবিবের কাছ থেকে। কিন্তু মাঝখান থেকে বিবেক, আত্ম সম্মানও তাকে পাল্টা অভিযোগ জানাচ্ছে। মাথায় আসছে না ঠিক কি করা যায়!
কিছু মেডিকেল কেইস সমাধানের চেষ্টায় ছিল তাবিব। খেয়ালই করে নি কখন রাত বারোটা পেরিয়ে গিয়েছে সময়। আড়মোড়া ভেঙে উঠলে দাঁড়ালো ও। একবার তানহাকে দেখে আসা উঠিত। আর নিবৃতাই বা কি করছে?
পুরো ঘর জুড়ে শীতলতা বিরাজমান। শুধু থেমে থেমে ভারি নিশ্বাসের শব্দ পরছে। খাটের মাঝে, কাঁথার নিচে, দুই মানবী একে অপরকে আঁটসাঁট করে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে নিমগ্ন। তাবিবের চোখ জুড়ালো। একাকিত্বে ভোগা তার মেয়ে অবশেষে সঙ্গী পেলো। সন্তান ও পিতা মাতা একে অপরের যতটা নিরবিচ্ছিন্ন অংশই হোক না কেন, একটি বয়সে এসে তাদের মাঝে দুরত্ব চলে আসা অনিবার্য। তাই না চাইতেও মেয়ের সব বিষয়ে কাছাকাছি থাকা সম্ভব হয় না তাবিবের। তবে নিবৃতার আগমনে, ওর চিন্তা এবার কিছুটা হলেও লাঘব হলো।
ঘর জুড়ে থাকা সোনালী আলোয় নিবৃতার শুভ্র মুখটা চকচক করছিলো বেশ। না চাইতেও চোখ পরেই গেলো সেখানে। নিবৃতা সুন্দর, একটু বেশিই সুন্দর। তবে সেই সৌন্দর্যে প্রাণ, যত্ন ও মনোযোগের অভাব৷ কেমন যেন নিস্তেজ, মলিন, ফ্যাকাশে! এর কারণ কি শুধুই অতীত? কেউ নিজেকে এতোটা অবহেলা করতে পারে? তাবিব জানে না। হয়তো একা থাকলে এও সম্ভব। প্রথম বিয়ে ভাঙার ব্যথা অনুভব করার ফুসরতই মিলে নি তাবিবের। পড়ালেখা, দুধের শিশুর দায়িত্ব, সবসময়ই ওর মন মস্তিষ্ককে কর্তব্যের বেড়াজালে বেঁধে রেখেছে। যান্ত্রিক হয়ে উঠেছিল ও। এক দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে। আর অপেক্ষা করে না ও। দরজাটা সুন্দর মতন চাপিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে আসে।
মেয়ের একাকিত্ব তো ঘুচলো, কিন্তু তাবিব? ওর নিঃসঙ্গতা কাটবে কবে? যান্ত্রিক মানুষটার মাঝে আবার কবে সতেজ অনুভূতিদের আনাগোনা শুরু হবে?
সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করেছে। তাবিব মসজিদ থেকে ফিরেই নিজের ঘরে ঢুকেছে। বারান্দায় তার শরীরচর্চার সামগ্রী রাখা। সেখানে সকাল বেলা নিয়মিত বেশ কিছুটা সময় খরচ করা হয়। পাঞ্জাবি ছেড়ে একটা সাদা সিঙ্গলেট জড়িয়ে পথ ঘুরতেই বুঝলো ওর দরজার সম্মুখে কেউ দাড়িয়ে আছে। পর্দার নিচ দিয়ে দু’টো ফর্সা পা নজরে আসছে। তাবিব জানে সে কে, তবে এতো সকালে তার উপস্থিতিতে ও অনেকটাই অবাক হয়েছে। আগ বাড়িয়ে আসতে বলতে গিয়েও ও থেমে গেলো। যার প্রয়োজন, সে নাহয় নিজ থেকেই প্রশ্ন করুক। জড়তা, দ্বিধা কাটিয়ে সহজ হোক। তাবিব এমনভাবে চলে গেলো বারান্দায় যেন কাওকে ও দেখেই নি।
এদিকে নিবৃতা ভয়ে ভয়ে এখানে চলে এলেও এখন কিভাবে আগ বাড়িয়ে কথা বলবে, কি করবে, ওর মাথায় আসছে না। দু কদম বাড়ালে, তিন কদম পিছিয়ে যায়। ইচ্ছে করলো ঘরে ফেরত যেতে, আবার ও জানে সেই হটকারিতায় অভ্যস্ত লোকটা, স্পষ্ট বিবৃতি না শোনা পর্যন্ত ওকে ছাড়বেও না। তাই দ্বিতীয় কোন উপায় নেই।
এদিকে ব্যায়ামে মনোযোগ দিতে ব্যর্থ তাবিব। মেয়েটা এখনও তাকে ডাকলো না। সারাদিন কি দরজার সম্মুখে দাড়িয়েই কাটিয়ে দিবে? দিতেও পারে, অসম্ভব কিছু না। পুশ আপ শেষ করে এক লাফে উঠে পরলো ও। এতক্ষণে শরীর ঘামতে শুরু করেছে। পেশিবহুল হাতদুটো ঘামে চিকচিক করছে। তোয়ালে নিয়ে মুখে মুছে ও বেরিয়ে পরলো সেখান থেকে। একবারে গিয়ে দরজার সামনে থেকে সহসা পর্দা সরিয়ে দিয়ে বলে,
– আসুন!
আচমকা এমন হওয়াতে, ভীত চোখে বারকয়েক অক্ষিপল্লপ ঝাপটালো নিবৃতা। তাবিব ওকে জায়গা করে দিয়ে এক পেশে দাঁড়িয়ে। ও হতভম্ব ভাব কাটিয়ে পা বাড়ালো সেদিকে। যেই ঘরটা ওকে অস্বস্তি অনুভব করিয়েছে, সেখানে এক রাতের ব্যবধানে নিজ থেকে এসেছে ও, এবং যার থেকে আড়ালে আবডালে থাকবে বলে ভেবেছিলো, এখন স্বেচ্ছায় তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হজম করছে।
– বসুন।
চেয়ার এগিয়ে দিয়ে তাবিব বিছানার প্রান্তে বসলো। একদম নিবৃতার মুখোমুখি। নিবৃতাও চুপটি করে আসন গ্রহণ করলো।
– নিশ্চয়ই কোন প্রয়োজনে এসেছেন?
– জ্বি।
– জানি জানি। এছাড়া আমার ত্রিসীমানায় বুঝি আপনি আসবেন?
বিড়বিড় করলো তাবিব। একটু হলেও এই অদ্ভুতুরে মেয়েটিকে বুঝতে সক্ষম হচ্ছে ও।
– প্রয়োজনটা কি?
চোখ নামানো নিবৃতার দৃষ্টিতে বারংবার পুরুষালী শ্যামবর্ণের পেটানো শরীরটাই আটকে যাচ্ছে। কেমন বেহায়ার মতো শুধুমাত্র একটা সিঙ্গলেট পরে একটা মেয়ে মানুষের সামনে বড্ড অবলীলায়, নিঃসংকোচে বসে আছে! কুন্ঠা, ব্রিড়ায়, মনি জোড়া অস্থির ভঙ্গিতে এদিক সেদিক ঘুরে নিবৃতার। দু হাত ভাজ করে ক্রমাগত কচলে চলে। সবটা দেখে হতাশায় মাথা নাড়ায় তাবিব। হাতের তোয়ালেটা দু’কাধের উপর ছড়িয়ে দেয় নিঃশব্দে। তার আগেই খেয়াল রাখা উচিত ছিল।
– বলে ফেলুন।
তাড়া দেয় তাবিব। নিবৃতা সংগোপনে বড় করে করে এক শ্বাস টেনে বলে,
– আপনি তো জানেনই আমি স্কুলে চাকরি করি।
– না জানলে কি আর মেয়ের মা বানিয়ে আনতে পারতাম?
কাটকাট উত্তর। কোন রাখঢাক নেই। নিরুত্তাপ, নির্ভেজাল। নিবৃতা নিজের টালমাটাল দশা সামলে বলে,
– আমি একজন কর্মরত মানুষ। এতে আপনার কোন সমস্যা আছে?
– থাকলে বিয়ের আগেই পরিষ্কার করে নিতাম আমি।
কিন্তু নিবৃতার সমস্যা সেখানে নয়। ও আবারও বললো,
– আর, আমি চাকরি না করলে কোন সমস্যা হবে?
এবার তাবিবের অবাক লাগে। এরকম প্রশ্ন কেন হঠাৎ?
– একটু খুলে বলুন। কি সমস্যা?
এতো কথায় অভ্যস্ত নয় নিবৃতা। হাত দুটো শক্ত করে বলে,
– আজ আমি যদি আর চাকরি না করি, তাহলে আমার কোন আয় থাকবে না। নিজের খরচ নিজে চালাতে পারবো না। আপনার উপর নির্ভরশীল হয়ে পরবো। আপনার খরচ বেড়ে যাবে। বিষয়টা কিভাবে দেখেন?
কপাল কুঁচকে চেয়ে আছে তাবিব। মেয়েটা কি ইনিয়ে বিনিয়ে ওর সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে? বিষয়টা আত্ম মর্যাদায় লাগলো ওর। এমনিতেই অতীতের পাওয়া আঘাত এখনও ওর মন গহীনে জ্বলজ্বল করে। ও শক্ত গলায় বললো,
– সামর্থ্য না থাকলে ও তো আর বিয়ে করতাম না। আর বিয়ে করার অর্থই তো হলো নতুন কারও ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া। তার অভিভাবক হওয়া। আপনি চাকরি করেন কি না করেন, কত আয় বা ব্যয় হয় আপনার, সেটা আমার দেখায় বিষয় না। এর এক বিন্দু পরিমাণও মূল্য নেই আমার কাছে। তবে আপনার প্রতি আমার যতটুকু দায়িত্ব আছে, সেটা আমি পরতে পরতে পালন করে দেখিয়ে দিবো।
– আমার খরচ চালানো আপনার জন্য বোঝা হয়ে যাবে না? পরবর্তীতে খোঁটা দিতে মন চাইবে না?
– যারা এরূপ আচরণ করে তারা কাপুরুষ। ওদের সাথে আমার তুলনা করবেন না।
স্বস্তি মিললো। নিবৃতা আর অপেক্ষা না করে বললো,
– গত রাতে বলেছিলেন, আমি যা চাইবো আপনি তা-ই দিবেন।
তাবিবের মেজাজ পরে গেলো আচমকা। থমকানো দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। মেয়েটা কি বড় কিছু চাইবে বলেই এতসব প্রশ্ন করলো? কিছু পলের জন্য ওর মনে শঙ্কা জাগলো। আজ আবার বড় মুখ করতে গিয়ে অপমানিত না হতে হয়। তবুও আপন মান বাঁচাতে বললো,
– জ্বি। কি চান আপনি?
– আমি আমার চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাই।
সরল আবদার। তাবিব কিছুক্ষণ মুক বনে তাকিয়ে থাকলো। আজকাল মেয়েরা সাবলম্বী হওয়ার জন্য সংগ্রাম করে, সেখানে নিবৃতা তার একদিনের স্বামীর কাছে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার বায়না করছে। ওর বিষয়টা মেনে নিতে কষ্ট হলো।
– চাকরি আপনার, জীবন ও সিদ্ধান্ত আপনার। আমার কাছে অনুমতি চাইছেন কেন?
– আপনিই তো বললেন, আপনি আমার অভিভাবক।
অত্যন্ত নিচু ও দ্বিধান্বিত স্বর। কিন্তু তাবিব সেটা শুনলো। আর কেন যেন তৎক্ষনাৎ ওর অন্তঃকরণে এক লিলুয়া হাওয়ার ঝাপটা খেলে গেলো। নিজের প্রসন্নতা না লুকিয়ে কোমল স্বরে বললো,
– আপনার ইচ্ছে। আমার কোন আপত্তি নেই। তবে কারণটা জানতে পারি?
– আমার বাহিরি দুনিয়া ভালো লাগে না। আমি বাসায় থাকতে চাই আর তানহার সাথে বেশি বেশি সময় কাটাতে চাই।
কেমন সাদাসিধা তার চিন্তাধারা। চমৎকার এক উত্তর পেয়ে গিয়ে তাবিব সেই প্রসঙ্গ আর তুললো না। কিন্তু এটা কি কোন উপহার হলো? তাই ফের বললো,
নিবৃতা পর্ব ৫
– এটা কোন চাওয়া হলো?
– আমার কাছে এটাই চাওয়া।
– উহুম। হলো না তো। একদমই না।
নিবৃতার ঠোঁট দুটো আবারও গুটিয়ে গেলো। তাবিব খেয়াল করেছে, তার গভীর ভাবনায় ডুবে যাওয়ার আগাম সংকেত সেটা। ক্ষণকালে পর নিবৃতা পরাজিত গলায় বলে,
– পরে ভেবে জানাবো তাহলে।
এবার আর বিরক্ত বোধ হলো না তাবিবের। বরঞ্চ ধেয়ে আসা প্রফুল্ল হাসিটা বহু কষ্টল লুকিয়ে রেখে, সন্তুষ্ট চিত্তে বললো,
– আপনি যত ইচ্ছা তত সময় নিন। আমি অপেক্ষায় থাকবো নিবেদিতা।
