Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ১৭

নিবৃতা পর্ব ১৭

নিবৃতা পর্ব ১৭
নেহার ছায়ালিপি

আজ শীতের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। সন্ধ্যার নামার খানিক বাদেই সাদাটে কুজ্ঝটিকা মিশে গিয়েছে বাতাসের সনে। ডিসেম্বরে, মানুষের অলস সময় কাটে সেজন্যই তো এখনই রাস্তাঘাটে লোক সংখ্যা সাধারণের তুলনায় সীমিত। গাড়ির হেডলাইটের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত পথ অনুসরণ করে ড্রাইভিং করছে তাবিব। পাশেই সর্বদার ন্যায় মৌনতা অবলম্বন করে শান্ত হয়ে বসে আছে নিবৃতা। দৃষ্টি বাহিরের তমসাচ্ছন্ন পরিবেশের উপর। তানহা চলে যাওয়ার পর থেকে নীরবতা যেন আরও জেঁকে ধরেছে ওকে। প্রাঞ্জল তানহার সহচরে নিবৃতার মাঝেও প্রাণের সঞ্চার থাকে। টুকটুাক কথা বলবে, শব্দ করবে, নিজের উপস্থিতি জাহির করবে। তবে আজ সেইটুকুও যেন হারিয়ে গিয়েছে। কাওকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা ভুল নয়, তবে এতে ব্যক্তি আপন নিজস্বতা হারায়।

কারও অনুপস্থিতি আমাদের পীড়া দিতে পারে, বিরহ যন্ত্রণায় কাতর করতে পারে, মনের মাঝে সাময়িক অস্থিতিশীলতাও সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু দিনশেষে মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রত্যেকের জীবন আলাদা, রয়েছে ভিন্ন কিছু উদ্দেশ্য ও ধারা। কারও আশায় পথ চেয়ে নিজেকে থেমে গেলে হবে না। তাবিব জানে, নিবৃতার গোটা অস্তিত্বই এখন তানহা জুড়ে আবর্তিত হয়। ওর স্বকীয়তা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, সে বিষয়ে হয়তো নিবৃতার নিজেরও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তানহাকে দুরে পাঠানোর পেছনে তাবিবের ভিন্ন আরেকটি লক্ষ্যও রয়েছে। নিবৃতাকে কিছুটা স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার চেষ্টা। আজ তানহা আছে, কাল জীবনের ধারায়, নানান প্রয়োজন ও তাগিদে যখন ওকে দুরে গিয়ে থাকতে হবে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে, তখন কি করবে নিবৃতা? সামলাতে হবে না নিজেকে? তখন বোধহয় সময় দীর্ঘতার কারণে বেড়ে যাওয়া মমত্ববোধ ও নির্ভরতায় সেটা আরও কঠিন ও জটিলতর হয়ে উঠবে। তাই আগে থেকেই যদি ওকে বোঝানো যায়, বাস্তব সম্পর্কে ধারনা দিয়ে বাগে আনা যায়, তাহলে সেই চেষ্টা টুকুন তাবিব করে দেখবে। মায়া, মমতা, ভালোবাসা, আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। তবে অতিরিক্ত কোনকিছুই মঙ্গল সাধন করে না।

গাড়ি এসে এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে এসে যখন স্থির হলো, তখনও নিবৃতার মাঝে কোন নড়চড় খেয়াল করা গেলো না। একদম স্থির সে। বিষন্নতার চাদরে মুড়িয়ে চুপটি করে আছে। তাবিব এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওর মাথায় আলতো করে হাত রেখে বললো,
– বাসায় চলে এসেছি নিবেদিতা।
আচমকা ধ্যান ভাঙায় কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে পরেছে ও। আসপাশে তাকিয়ে নিজ অবস্থান বুঝতেই লজ্জায় মাথা হেট হলো।
– দুঃখিত, খেয়াল করি নি।
– এতো ছোট ছোট বিষয়ে বিব্রত হওয়ার স্বভাবটা পরিবর্তন করবে।
লোকটা যা বলে, তা এক বাক্যে মেনে নেয় নিবৃতা। শিক্ষা হিসেবে মস্তিষ্কে গেঁথে নেয়। ও সায় জানিয়ে বলে,
– আচ্ছা।
– গুড। এখন নেমে আসো। আগে গিয়ে দরজা খুলতে হবে তোমার।
সন্তুষ্ট চিত্তে তাবিব বেরিয়ে এলো। সিকিউরিটি গার্ড ডেকে নিয়ে গাড়ির পেছন থেকে বাজার সদাইগুলো তুলে নিয়ে চললো ফ্ল্যাট অভিমুখে।

ঘরের কাজে এখন পারদর্শী সে। পটুতার সাথে চলা হাত যুগল তাবিবের সাহচর্য পেতে নেয় নি। সহোযোগিতার প্রস্তাবকে নাকোচ করে দিয়ে নিজেই সবকিছু গোছগাছ করে রাখছে। ভীষন মনোযোগ তার কাজের প্রতি। এই সংসারের প্রতিটি কোন এখন এই নারীর দখলে। অথচ দেখলে মনে হবে, এখনও বুঝি তাবিবই সব সামলায়। বহু বছর আগে থেকে, ওর নিজ হাতে সাজানো প্রতিটি বস্ত নিজ নিজ স্থানে এখনও দন্ডায়মান। সংরক্ষিত তাদের অবস্থান। যেমনটা পূর্বে ছিল ঠিক বরাবর সেরকমই রয়ে গিয়েছে। শুধু বাড়তি যোগ হয়েছে যত্ন ও গুরুত্ব। নিবৃতা নামক মেয়েটির নিজস্ব কোন পছন্দ নেই। নাইবা আছে কোন মতামত। যেভাবে শেখানো হবে, সেভাবেই শিখবে, অন্যকে পইপই করে অনুকরণ করে যাবে। আপন অভিমতের বেলায় সে বড্ড উদাসীন!

কাজে নিমগ্ন নিবৃতাকে রেখে তাবিব ঘরে চলে এলো। রাতের খাবার বাহির থেকেই করে এসেছে তারা। ভেবেছিল নিবৃতার মন ভালোর চেষ্টা করা যাক একটু, কিন্তু ও তো ভুলেই গিয়েছে যে, জাগতিক বিষয়াদি নিবৃতাকে অভিভূত করে না। বরঞ্চ এসব থেকে দূরে থাকতেই সে আরামবোধ করে। সোয়েটারটা খুলতে গিয়েও থেমে গেলো তাবিব। কিছু একটা মনে পরতেই মোবাইল নিয়ে চলে গেলো বারান্দায়। তার শাশুড়ী মায়ের সাথে বেশ কয়েকদিন আগে কথা হয়েছিল। দেশে আসার পরও কোন খোঁজ খবর নেওয়া হয় নি। তবে কাজের চাপে তাবিব সময় সামলে না উঠতে পারলেও, মায়ের মতোন এই মানুষটা ভীষন দায়িত্বশীল ও যত্নবান। নিয়ম করে তাবিবের খবরাখবর তিনি নিয়ে রাখেন। তবে আজ প্রয়োজনেই তাকে কল করছে তাবিব। সময় বুঝে একটু তার সাথে মুখোমুখি বসে কিছু জরুরি আলাপ সেরে নেওয়া অতীব গুরুত্বপূর্ণ। নিবৃতার জন্য অন্তত। রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কানে ফোন ঠেকালো ও। প্রথম বার রিং হয়ে কেটে গেলো। ভ্রু কুঁচকালো তাবিব। ব্যস্ত কি খুব বেশি? ঠিক করলো, আবারও নিরুত্তর পেলে নাহয় পরে কল করবে পুনরায়। তবে দ্বিতীয়বার নিরাশ হতে হয় নি।

– আসসালামু আলাইকুম।
কন্ঠটা যথেষ্ট নিচু ও চিকন। তাবিব মিহি গলায় উত্তর জানিয়ে বললো,
– ভালো আছেন ভাবি?
রত্না আসেপাশে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে বলে,
– জ্বি ভাইয়া। আপনি ভালো?
– আলহামদুলিল্লাহ।
– আচ্ছা।
তার সাথে কি কথা বলবে, খুঁজে পেলো না তাবিব। কাষ্ঠ হেসে বললো,
– মা’কে দেওয়া যাবে?
– ভাইয়া আমরা তো নিবুর নানাবাড়ি এসেছি।
তাবিব অবাক হয়ে বলে,
– ওহ! আমার জানা ছিল না।
– নিবু বলে নি?
– জ্বি না।
– কিছু মনে করবেন না। ওতো এরকমই৷ এতোদিনে নিশ্চয়ই জানা হয়ে গিয়েছে।
রত্নার গলায় সামান্য উপহাসের আভাস। তাবিবের ভালো লাগলো না সেটা। ও মুখ আঁধার করে থমথমে গলায় বলে,

– মা কি খুব ব্যস্ত?
– নিবুর বড় মামা অসুস্থ তো। এজন্যই হঠাৎ করে আসতে হলো। নাহলে হয় না আসা। মা আপাতত বাড়িতে নেই।
– মামা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন। আজ তাহলে রাখছি ভাবি।
– আচ্ছা ভাইয়া। ভালো থাকবেন।
কল কেটে রত্না ভারি শ্বাস ছাড়ে। নিবৃতা বলেছিল তাবিব দেশে আসছে। আর দেশে আসলে যে পুরোনো কথা আবার উঠবে সেটা ওর জানা ছিল। সত্য হয়তো চাপা থাকে না কখনও, কিন্তু যতক্ষণ পারা যায়, ও সেটা এড়িয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। কারও চোখে নিজের মাথা নত করা ওর একদমই পছন্দ নয়। যা করেছে বেশ করেছে! নিবৃতার মতো মানসিক বিকারগ্রস্ত মেয়ে এর চেয়ে ভালো আর কিই বা পেতো? নিজের কাজে সামান্য অপরাধবোধও জাগে না রত্নার। কঠিন মুখে বসে থাকতেই শিউলির কন্ঠস্বর ভেসে আসে। দ্রুতই, কল লিস্ট থেকে তাবিবের নামটা মুছে রত্না চলে যায় শাশুড়ির ডাকে সাড়া দিতে।
তাবিব শুকনো মুখে দাড়িয়ে রয়। ওর শাশুড়ী যতদিন না বাসায় ফিরে আসছেন, ততদিনে নিবৃতার বিষয়ে যে আর কথা বলা যাবে না, সেটা স্পষ্টতই বুঝে এসেছে। ও এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এখন, নিজ বুঝ থেকে যতটুকু সম্ভব, ও নিবৃতাকে সহজ হতে সাহায্য করবে। চেষ্টা করবে, ওর সবচাইতে আস্থাভাজন ও শান্তির স্থান হয়ে উঠতে।

কাজে মগ্ন ছিল তাবিব। একটি জটিল কেইস ওকে রেফার করা হয়েছে। সেটারই সমস্যা ও এর সমাধান নিয়ে ভাবনায় মশগুল ছিল। গভীর নিবেশনের মাধ্যমে কখন যে সময় কেটে গেলো, সে খেয়ালই ছিল না। যখন ক্লান্তিতে আড়মোড়া ভাঙলো তখন ঘড়ির কাটা রাত এগারোটার ঘর ছাড়িয়েছে। তৎক্ষনাৎ সেখানেই ওর দৃষ্টি আটকে গেলো। মস্তিষ্কে সহসাই ভেসে উঠলো একটি নাম। নিবেদিতা! মেয়েটা একা একা কি করছে? ঘুমিয়ে গিয়েছে কি? ওর মাঝে তো অবশ্য তাবিবকে নিয়ে কোন ভাবাবেগ নেই। নেই কোন উদ্বেগ কিংবা ভাবনা। কিন্তু তাবিব! ওর মনটা জুড়ে তো এখন সেই এক নারীরই বসবাস। ও বাধ্য ও দুর্বল স্বীয় এই ছটফটে হৃদয়ের কাছে। ও শ্বাস ছেড়ে উঠে গেলো। বিছানা পরিপাটি করে চললো তানহার ঘরের দিকে। যেটা বলতে গেলে তার তথাকথিত স্ত্রীরও কক্ষ।
নিবৃতা চুপচাপ বিছানার উপর বসে ছিল। দৃষ্টি ওর গভীর বিষন্নতায় ঘেরা। মুখাবয়ব শুকনো, ক্লেশে জর্জরিত। উদাস নজরে কোন প্রাণ নেই। ঘুমের সময় পার হয়ে গিয়েছে সেই কখন, অথচ বালিশে মাথা দেওয়ার কোন তাড়া নেই। আদোও ঘুম আসবে কি না, সে বিষয়েও বেশ সন্দিহান। এই কক্ষে এর আগে কখনও একা থাকা হয় নি। বিছানায় তানহার সঙ্গ ছাড়া ঘুমাতে হয় নি। নরম সেই উষ্ণতা ব্যতীত চোখ জোড়ায় আচ্ছন্নতা ভীড়ে না। পর্দার ওপাশে এই বিষাদে ডোবা অভিব্যক্তি খেয়াল করলো তাবিব। হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই নিবৃতা সচকিত হয়ে চাইলো।

– ঘুমাও নি কেন এখনো?
নিবৃতা দৃষ্টি নামালো। দু-হাত ভাজে আবৃত করে মিইয়ে আসা গলায় বললো,
– ঘুম আসছে না।
কন্ঠটি কেমন অসহায় শোনালো। একাকিত্বে খাবি খাওয়া এক অবোধ যেন সে।
– একা একা লাগছে?
নিরুত্তর রইলো সে অথচ মুখশ্রীর অবস্থা আরও করুণ হয়ে গেলো। কি হলো অকস্মাৎ, তাবিব গিয়ে আঁকড়ে ধরলো সেই নরম হাতটি। বল খাটিয়ে, অধিকার নিয়ে বললো,
– আমার সাথে আসো।
বড় বড় নেত্র যুগল মেলে সে তাকালো। মুখ ফুটে কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে আটকে দিলো। অবাধ্য হওয়া যাবে না। হোক সেটা সংসার কিংবার তানহার জন্যই। হয়তো অবচেতন মন নিজেকে নিয়েও ভাবে। কিন্তু সেদিকে বোকা নিবৃতার দৃষ্টিপাত হয় না কখনোই!
তাবিব ওকে সোজা নিয়ে আসলো নিজের ঘরে। নিবৃতার হাতটা গিয়ে ছাড়লো ঠিক বিছানার বাম পাশে গিয়ে।
– এই ঘরটা যে তোমার নয়, কিংবা একান্তই আমার, সেটা কিন্তু ভুল ধারণা। তুমি মানো আর না মানো, এটা কিন্তু আসলেই আমাদের ঘর।
অস্বস্তি নেমে এলো শুভ্র মুখে। নম্র বদন এক লহমায় গাঁট হলো। কি বলবে এ কথার প্রেক্ষিতে সেটা এলোমেলো মস্তিষ্কের নিবৃতা ঠাহর করে গুছিয়ে উঠতো পারলো না।

– শুয়ে পরো। দিনটা ক্লান্তিকর ছিল।
বাস্তবতা একটু হলেও বুঝতে শেখা নিবৃতা প্রতিবাদ করতে পারলো না। নিশ্চুপে জড়তা ও নিদারুন সংকোচে বসে পরলো খাটের উপর। ওকে বিনা তর্কে রাজি হতে দেখে তাবিব সরল হাসে। নরম কাদামাটিকে নিজের ইচ্ছে মতো আকৃতি দিচ্ছে যেন সে। তবে মাটি শুকনোর আগে যথাযথ এক চমৎকার শিল্পকর্ম সৃষ্টি করতে হবে এই অস্তিত্ব মাঝে, তবেই না তাবিব সফল হবে।
তাবিব গিয়ে আলমারি থেকে আরেকটি কম্বল বের করে এনে বিছানায়, নিবৃতার সম্মুখে রাখলো। সুন্দরমতন প্যাকেট থেকে সেটি খুলে বের করলো। অতঃপর ভাজ খুলে ছড়িয়ে দিলো নিবৃতার উপর।
– পুরোপুরি অন্ধকারে ঘুমাতে পারবে না ডিম লাইট লাগবে? তানহার রুমে তো কতকিছু জ্বলে। ঠিকমতো নামই জানি না আমি সেগুলোর।
বলেই তাবিব কানের পিছ চুলকে হাসলো। যেন কোন অপরাধ করে ফেলেছে। নিবৃতা আড়ালে চোখে হাসলো।
– সমস্যা নেই।

তাবিব সরতেই নিবৃতা শুয়ে পরলো। ও এতক্ষণ চুপটি করে লোকটার কাজ কর্মই দেখছিলো। ছোট ছোট কাজই তবুও সেগুলো অমায়িক যত্নের নিদর্শন।। অতীব জরুরি বিষয়গুলো তো সবারই চোখে লাগে। তাই সেগুলোর দায়িত্ব নেওয়া সহজ হয়। কিন্তু এই যে, পর্যবেক্ষণ করে খুটিনাটি বিষয়গুলো তুলে নিয়ে আসা। অবান্তর, তুচ্ছ জিনিসগুলোকেও মূল্য দেওয়া, এটা এক উন্নত মানসিকতার পরিচয়। এতটুকু তো নিবৃতা অনুভব করতেই পারে। নতুবা স্বামীরা কেমন হতে পারে, সেটা কিছুটা হলেও নিজের ভাইকে দেখে জেনেছিল ও। খারাপ নয়, তবে সম্পর্কের সমীকরণে আত্মকেন্দ্রীক সে অবশ্যই। অথচ তাবিবের রয়েছে সব দিকে সমান নজর।

পাশে আরেকজনের আভাস পেতেই এতক্ষণের হারিয়ে যাওয়া অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভূতি ফিরে এলো। কেমন যেন লাগছে। ডাইনিং এরিয়া থেকে আসা আলোয় এ ঘরের অন্ধকার কিঞ্চিৎ কেটে যেতেই, পরিষ্কার হলো দুই মানব মানবীর মাঝে থাকা ঠিক এক হাত পরিমান দুরত্ব টুকুন। যথেষ্ট ফাঁকা। তবুও আরেকটু গুটিয়ে গেলো ও। শক্ত করে বুঁজে নিলো অক্ষি পল্লব। তাবিব আড়চোখে দেখতে থাকে নিবৃতাকে। দেখে ওর কপালের মাঝে থাকা অস্পষ্ট ভাজ। চোখের পাতার অন্দরে অস্থিরভাবে পায়চারি করা মনি জোড়া। চেপে রাখা ওষ্ঠ যুগল। ও সময় পেরোতে দেয়। কে জানে, কোথায় মিলে এতো ধৈর্য! এতো সংযম। তবুও খারাপ লাগে না তাবিবের। মনে হয়, মেয়েটাকে শান্তি ও আরাম দিতে পারলেই বোধহয় ওর অন্তরে প্রশান্তি মিলবে।
গাঁট হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে এলেও নিবৃতার চোখে ঘুম আসে না। অসহনীয় ঠেকছে সবকিছু। নিস্তব্ধ ঘরে, ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দ মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলছে। এই কম্বলের নিচে থেকেও ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। নীরবতার এই ছায়া কেটে হঠাৎ করেই উষ্ণতা ওর অত্যন্ত নিকটে এসে ঠেকলো। পরপর ভারি অথচ যত্নশীল একটা হাত গিয়ে বসলো ওর মাথার উপর। নম্র তালে সেটি বুলিয়ে দিতে দিতেই গভীর পুরুষালী কন্ঠটা বলে উঠলো,
– তানহা ছাড়াও এখানে তোমার এক অতীব আপনজন থাকে নিবেদিতা। এমন একজন কেউ, যে তোমাকে তোমার স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার জন্য সবটা করতে রাজি। তুমি মুখ ফুটে বললেও সে করবে, না করলেও করবে। তাই একটু ভরসা করাই যায়।

নিবৃতা পর্ব ১৬

– আমি করি তো।
নিবৃতা আচমকা জবাব দিয়ে বসলো। জানে না ঠিক কোন তাগিদে, কিন্তু দিলো। তাবিব অবাক হয়েছে বটে। ও ফের বললো,
– কি করো?
– ঐ যে, ভরসা।
সরল কন্ঠী উত্তর অথচ অতলস্পর্শী গভীরতায় ডোবা। তাবিবের এতোটুকুতেই চললো। ও নিরলসভাবে মেয়েটাকে এক গভীর মায়ার মেঝে টেনে নিলো, যার আবেশে আচ্ছাদিত হয়ে এক সময়, নির্ভার হয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো তাবিবের নিবেদিতা। শুধু একসময়, অবচেতন মনেই আশ্রয় খুঁজে নিলো তাবিবের পরনে থাকা টি-শার্টের আস্তিনের মাঝে। শক্ত বাধনে আঁকড়ে নিলো সেটা স্বীয় আঙুলের ভাজে।

নিবৃতা পর্ব ১৮