Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৭

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৭

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৭
নীতি জাহিদ

…ভোর চারটা।
ফজরের ওয়াক্ত হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ল্যাপটপ ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে। রাজশাহীতে মিটিংটা গুরুত্বপূর্ণ, যেতেই হবে। সালাত আদায় জায়নামাজ ভাঁজ করে ঘুমন্ত অর্ধাঙ্গীনির ললাটে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো জোরালো ভাবে। মোনালিসাকে ডাকলো। মেয়েটা উঠে সালাত আদায় করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে ইমরানের গোছগাছ আর শুনছে মূল্যবান সব উপদেশ এবং নিষেধাজ্ঞা। ভোরে রওয়ানা হওয়ার কারণ ফিরতে যেন দেরি না হয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ সেরে ফেরা যায়। মোনার ডেলিভারির সময় সন্নিকটে। গত কয়েকমাস বাড়ির বাইরে দূরে কোথাও এক পাও রাখেনি। আজ না গেলে সমস্যা গুরুতর হবে। সোহান, ইশান এবং ইশতিয়াককে শক্তপোক্ত ভাবে জানিয়েছে, যে কোনো প্রয়োজনে যেন বিলম্ব না করে তৎক্ষনাৎ জানায়। হাসপাতালে ইনফর্ম করা আছে। সূর্যের আলোয় চারদিক আলোকিত। নিচে বাড়ির সকলে অপেক্ষা করছে। মোনার নিরবতায় পাশে বসে বললো,

– কি হয়েছে? এমন মুখের দিকে তাকিয়ে যদি বের হই তবে দিনটাই নিরাশায় কাটবে।
স্বামীকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– আসতে আসতে রাত হবে তাই না?
– হুম।
– তাহলে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে যান। এখন ঘুমালে বারোটায় উঠবো। ছয় ঘন্টা শেষ। এরপর দুপুরে খেতে খেতে বিকেল হয়ে যাবে। আরো ছয় ঘন্টা শেষ।
– এরপর?
– এরপর আপনি গাড়িতে থাকবেন তখন ভিডিও কল দিব। আপনাকে দেখতে দেখতে সময় কেটে যাবে। এরপর ডিনার, অপেক্ষা আরো চার পাঁচ ঘন্টা শেষ।
মোনাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় ইমরান। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গলার টাই খুলে ফেলে। শার্টের বাটন খুলতেই মোনা প্রশ্ন করলো,
– কি হলো? খুলছেন কেনো?
ইমরান সব কটা বাটন খুলতে খুলতে বললো,

– যেখান থেকে ফিরে আসার প্রতিক্ষায় বউ আমার প্রহর গুণবে সেখানে না যাওয়াই শ্রেয়। শুয়ে পড়ো। ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।
মোনা জিভে কামড় দিয়ে বসা থেকে উঠে গেলো। যাওয়ার আগে মুখটা এমন না বানালেই হতো। উফ এজন্যই দাদী, ফুফির বকা খায়। না বুঝে কাজ করে। কাউকে বিদায় সংলগ্নে এসব বলে! সে যদি হয় স্বামী তবে তো মুখ সংযত রাখা বাধ্যগত। স্বামী শ্রেণীর মানুষদের মাথায় থাকে রাজ্যের চিন্তা। পেছন থেকে ইমরানের কোমড় জড়িয়ে বললো,
– আর এমন কথা বলবোনা, খুব স্যরি। দয়া করে আপনি কাজটা সেরে আসুন। যাওয়াটা যে গুরুত্বপূর্ণ সে কথা আমিও জানি। বেশ কয়েকবার এই মিটিং পিছিয়েছেন, এবার মিনিস্টার সাহেব খুব রাগ করবেন। ওয়াদার বরখেলাপ তো আপনি করেন না।সময় চলে যাবে। একদম মন খারাপ করবো না। প্রমিজ।
মোনা নিজেই শার্ট এর বোতাম লাগিয়ে দিলো। সহধর্মিণীর কোমল হাতে ওষ্ঠ ছোঁয়াতেই হেসে উঠলো মেয়েটা। ইমরান কথা বাড়ায় নি। নিজ থেকে শুয়ে চোখ বন্ধ করলো মোনা। ইমরান চুলে বিলি কেটে দিতেই ঘুমের জগতে হারালো। এর মাঝে ইশান এসেছে। দরজায় কড়া না নেড়েই ধুম করে ঢুকে পড়েছে। বাবা- মাকে এই অবস্থায় দেখে জিভে কামড় দিলো। ইমরান কড়া চোখে তাকাতেই মিইয়ে গিয়ে কান ধরলো। চোখের ইশারায় ছেলেকে নিচে যেতে বললো। আগাম এক ঝুলি বকা খাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বাবার অপেক্ষায় নিচে দাঁড়ালো সবার সাথে। ইমরান নেমে সবার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে ছেলেকে বললো,

– মাকে দেখে রেখো। দায়িত্ব তোমার। দস্যিপনা করবেনা। ঠিক আছে?
– স্যরি পাপা।
– কেনো?
– নক না করে ঢুকে গিয়েছিলাম।
– ইটস ওকে। নেক্সট টাইম মাথায় রাখবে।
– ইনশাআল্লাহ।
ইমরান বেরিয়ে যেতেই ঘুম থেকে উঠে বসে আছে। একদম ঘুম আসছেনা দুশ্চিন্তায়। প্রায়শই এই দুশ্চিন্তা হয় এখনও তাই হচ্ছে সে না থাকলে কি কি হবে। ইশান উপরে এসে দেখে মা ঘুমায় নি। বসে দুশ্চিন্তা করেছে। মোনা অপরাধীর মত ছেলের দিকে তাকাতেই ছেলে ভ্রু কুচকে বললো,

– ঘুমের অভিনয় করেছো?
– হুম।
– কেনো?
– তোমার পাপা যেতোনা।
– আচ্ছা শুয়ে পড়ো আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
– চিন্তা হচ্ছে।
– কি নিয়ে?
– যদি আমি না বাঁচি?
– এটাকে চিন্তা বলে না, ক্যাটেস্ট্রোফাইজিং বা ওভার থিংকিং বলে। অতিচিন্তা যা শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। নিজের ও ক্ষতি করছো, সাথে আমার বোনের ও। আগে থেকেই মনের মাঝে সব নেগেটিভ চিন্তা ধারণ করে আছো। কেনো করছো এসব মা! তোমার চিন্তায় আমরা অস্থির থাকি তোমার তো উচিত আমাদের কথা ভেবে একটু সুস্থ থাকা। নেগেটিভ ভাবনা গুলো এক্সাজারেট করছো, তার প্রভাব বডিতে ট্রান্সফার হচ্ছে আর রেজাল্ট হলো ঘুমোতে পারছোনা। এই সময় কি এসব ঠিক? কষ্ট হচ্ছে আমার।
ইশানের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
– ঠিক আছে আর বলবোনা।
– এখন ঘুমাও।
চোখ বুজলো মোনা। ঘুমটা যেন প্রশান্তির, চিন্তা মুক্ত হয় ইশান মায়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আইরিন উপরে এসে বসলো পাশে৷ ইশান ইশারায় বসতে বললো পাশে। দুজনের মাঝে মোনাকে নিয়ে চললো আলোচনা।

বিকেলের নাস্তা সেরে সালাত আদায় করে মোনা রুমে বসে তাসবিহ পড়ছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলো মেঘ করেছে৷ ইমরান সাহেব রওয়ানা দিয়েছে ইতিমধ্যে। আচ্ছা মেঘ কি শুধু ঢাকার আকাশে দেখা দিয়েছে নাকি রাজশাহীর আকাশও ঢেকে নিয়েছে নিজের কালো থাবায়! বাতাসের জোর বাড়ছে। ইমরানকে কয়েকবার ফোন করলো না ধরাতে ভাবলো হয়তো ঘুমে বা ব্যস্ত। গাড়িতে উঠার আগেই দেখতে পেলো এভাবে দিনে দিনে জার্নিতে মানুষটা ভীষণ ক্লান্ত।
রাতের খাবার খেয়ে অপেক্ষা করছে ইমরানের জন্য। কেমন যেন অস্থির লাগছে। হঠাৎ মনে হলো শরীর কাঁপছে। পেটের ব্যাথা বেড়ে যাচ্ছে। বিকেলে ভেবেছে ব্যাথা হয়তো দুশ্চিন্তার জন্য বাড়ছে। বসা থেকে উঠে দাঁড়াতেই অনুভব করলো ভেজা চারপাশটা। মুখ দিয়ে বের হলো, ইন্না-লিল্লাহ। পানি ভেঙ্গে গিয়েছে। ইন্টারকমে আইরিনকে ফোন দিতেই বাড়ি সুদ্ধ সবাই ছুটে এলো। ব্যাথার জোর বেড়েই চলেছে এদিকে মেঘের তীব্র আর্তনাদ। লেবার পেইন উঠে গিয়েছে। গাড়ি বের করা হয়েছে। ইশান মাকে কোলে নিয়েই নেমে গেলো সিড়ি দিয়ে। সোহান ড্রাইভিং সিটে বসলো। পাশে বসলো, আইরিন ও তুশি। ইশতিয়াক আগেই বের হয়ে গিয়েছে পুলিশ জিপটা নিয়ে ফরমালিটিস পূরণে যেন দেরি না হয়। একেকটা বজ্রপাত মনে হচ্ছে যেন গাড়ি উলটে দিবে। থেমে থেমে গাড়ি চালাচ্ছে সোহান। বাতাসের সাথে পাল্লা দেয়া কি সহজ কাজ! দোয়া দরুদ পড়ছে আইরিন- তুশি। গাছ উপড়ে রাস্তায় পড়ে যাচ্ছে, ফুটপাতের পাশে দেয়ালগুলো কাঁপছে। ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে। নয় নম্বর বিপদ সংকেত চলছে উপকূলীয় অঞ্চলে। ব্যাথায় মোনা নিজেকে সামলাতে পারছেনা। এই পর্যায়ে গাড়ির সামনে সুউচ্চ আওয়াজে বজ্রপাত পড়লো। চিৎকার দিয়ে উঠলো সকলে। রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছটা দুভাগ হয়ে সামনে পড়লো সেই সাথে রাস্তা ব্লক । ইশান পেছন ফিরে দেখে মোনা দুচোখে পানি। আইরিন কাঁদছে। চেঁচিয়ে উঠলো,

– থেমে থাকিস না বাবা, অন্য রাস্তা ধর। মোনার কষ্ট হচ্ছে।
গাড়ি ঘুরিয়ে সোহান গলির ভেতরের রাস্তা ধরলো। রাস্তায় পানি জমে যাচ্ছে। এবড়ো-থেবড়ো রাস্তা। মোড় নিবে এমন সময় দেয়াল ভেঙে পড়লো রাস্তায়। গাড়ি যাওয়ার পথ আটকে দিলো। তুশি চিৎকার দিয়ে বললো,
– ইন্না-লিল্লাহ। দেয়াল পড়ছে আপা।
মোনা আইরিনের হাত ধরে বললো,
– আপা আর পারছিনা, আমি না থাকলে ইমরান সাহেবকে বলবে আমি চেষ্টা করেছি নিজেকে সামলে রাখতে।
– কিচ্ছু হবেনা তোর ইনশাআল্লাহ।

– মাঝে মাঝে বাড়ির মানুষ গুলোর কেয়ারলেস নেস দেখে আমি ভীষণ বিরক্ত হই, বুঝেছো রবিন। কেউ ফোন ধরছেনা।
– স্যার আমিও চেষ্টা করছি। কল ঢুকলেও ধরছেনা আবার কয়েকবার নেটওয়ার্ক প্রবলেম বলছে।
– এখানেই ঝড় উঠে গিয়েছে, নিউজ বলছে ঢাকাতে তোলপাড় করছে। সবাই কি সেইফ আছে? চিন্তা হওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়?
ঢাকা পৌঁছাতে আরো ঘন্টা দুয়েক লাগবে। বার বার কল করতেই কেউ একজন ফোন ধরলো। রিসিভ হাওয়ার সাথে সাথে ইমরান ধমকে বললো,
– সেন্স থাকেনা তোমাদের, ফোন ধরছোনা কেনো?
– স্যার আমি রুবিনা।
– বাকিরা কোথায়?
– কেউ নেই বাড়িতে, ম্যাডামের লেবার পেইন উঠেছে সবাই হসপিটালের জন্য বের হয়েছে প্রায় আধ ঘন্টা আগে। বাইরে সব তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। কিচ্ছু স্বাভাবিক নেই।
মুখ পাংশুটে বর্ণ ধারণ করলো। এটাই কি ভবিতব্য! রক্ত যেন শরীর থেকে উবেই গেলো। রবিনকে ক্ষীণ আওয়াজে বললো,

– রবিন স্পিড বাড়াও। এপোলোতে চলো।
– কি হয়েছে স্যার।
– তোমার ভাবীর পেইন উঠেছে। সবাই হসপিটালে।
কিছু দূর আগানোর পর জোরে ব্রেক কষলো রবিন। গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছেনা। বুকের ধুকপুক বেড়ে গেলো। ইমরানের প্রশ্ন,
– রবিন কি হয়েছে?
– স্যার গাড়ি স্টার্ট হচ্ছেনা।
গাড়ি থেকে নেমে পড়লো ইমরান। রাস্তায় এখনো বাস চলছে টুকটাক। রবিনকে বললো,
– গাড়ি নিয়ে বেক করবে। আমি লোকাল বাসে চলে যাচ্ছি।
এমন উদ্ভ্রান্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ইমরানকে রবিন আগে দেখেছিলো যেদিন মোনার গুলি লেগেছিলো। রবিন দেখতে পেলো ঢাকাগামী লোকাল বাসে উঠে পড়েছে ইমরান।

ইশান, সোহান ভিজে একাকার। রাস্তায় নেমে দ্রুততার সাথে ভাঙা দেয়াল সরিয়ে গাড়ি যাওয়ার জায়গা টুকু করে নিলো। পুনরায় সোহান স্টিয়ারিংয়ে চাপ দিলো৷ স্পিড ধরে রেখে আধ ঘন্টার মাঝে পৌঁছে গেলো হসপিটাল। মোনা প্রায় অবচেতন। শরীর মিইয়ে গিয়েছে। হাসপাতালে মিনহাজ, নয়ন চলে এসেছে। দ্রুত স্টেচারে করে মোনাকে ভেতরে ঢুকানো হলো। এর মাঝেই ইশতিয়াকের ফোনে ইমরানের ফোন ঢুকলো। আসছে তা জানিয়েছে, কিভাবে কি করতে হবে ভাইকে জানিয়ে দিলো ইমরান।
চলন্ত বাসের গ্লাসের ফাঁকে ইমরান দেখতে পাচ্ছে ঢাকার আকাশের বুক ফাটা আর্তনাদ। বাস চলছে ধীরে। বজ্রনাদের জন্য আগাতে পারছেনা। রাস্তায় এ পাশ ওপাশ পানি, ভাঙা গাছের গুড়ি , দ্বিখণ্ডিত দেয়াল, টিনের চাল, তেরপাল, আসবাবপত্র ছড়ানো ছিটানো। আপাতদৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে মনে হবে ধ্বংসের শহর ঢাকা। সামনে বিশাল গর্ত দেখে ড্রাইভার বাস থামিয়ে দিলো। গাড়ি আর আগাচ্ছেনা। যেহেতু হসপিটালে আছে মোনা, কিছুটা নিশ্চিন্ত। পকেট কেঁপে ফোন এলো। ফোন রিসিভ করেই বললো,

– হ্যাঁ ইশতিয়াক বল?
– ভাইয়া ডা. রত্না আপার সাথে কথা বলো।
রত্না ফোন ধরতেই বললো,
– রত্না বল, কি অবস্থা?
– ডিসিশন দে।
– কিসের?
– দেরি করে ফেলছে ওরা, একদম পানি নেই। সি সেকশন করবো। আল্লাহ জানেন কি হবে। বেবির মুভমেন্ট নেই। ভাবীর অবস্থাও ভালোনা। যেকোনো কিছু হতে পারে।
নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো ইমরান,
– পাগল হয়েছিস? কি বকছিস আবোল তাবোল। ও একদম সুস্থ ছিলো।
এরপর রত্না কি বললো ইমরানের মস্তিষ্ক আর গ্রহন করেনি। শুধু একটাই বাক্য উচ্চারণ করলো,
– এতকথা জানিনা। আমাকে নিঃস্ব করে দিস না।

বাসের হেল্পারের কাছ থেকে একটা পলি ব্যাগ নিয়ে ফোন মুড়িয়ে পকেটে ঢুকিয়ে নেমে গেলো মাঝ রাস্তায়। পেছন থেকে ড্রাইভার, হেল্পার সবাই বাঁধা দিলো। কারো বাঁধা মানেনি। ফাঁকা রাস্তায় ছুটছে। কতদূর এসেছে জানেনা। কেনো ছুটছে তাও জানেনা। হাঁপিয়ে উঠলো। ভেজা শরীর নিয়ে আর পা এগোচ্ছে না। রাস্তায় পড়ে থাকা ভাঙা ইটের সাথে হোঁচট খেল জোরে। শরীরের ভারসাম্য সামলাতে না পেরে ফুটপাতের উপর বসে পড়লো। মাথা নুইয়ে পানির মধ্যে বসে আছে। আশপাশে মানুষ তো দূর একটা কুকুর, বেড়ালের অস্তিত্ব নেই। চোখের চশমা খুলে বৃষ্টির পানি বরাবর আকাশের দিকে তাকালো। দু চোখ বেয়ে গরম উষ্ণ জলের উপস্তিতি। স্থায়ী নয় এই জল। বৃষ্টি ধুয়ে মুছে দিচ্ছে। অনেক মাস হলো ইমরান কাঁদেনা। সেদিন ও এতটা ভয় পায়নি আজ যতটা ভয় পাচ্ছে। মোনার গুলি লাগার পর মনে বিশ্বাস ছিলো বেঁচে যাবে। আজ মোনা একা নয়। চিন্তা দুজনের জন্য। এদের মধ্যে দুজনই ইমরানের নিজস্ব। কাকে বেছে কাকে নেবে! এমন দিন কেনো দেখতে হয়! সুনশান-নিস্তব্ধ কালো রাত্রিতে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিলো,

– আমার মোনালিসা চাই। কেড়ে নিও না আল্লাহ।
অনড়, নিশ্চল বসে আছে রাস্তায়। পানি পড়ছে চুইয়ে চুইয়ে শরীর বেয়ে৷ পায়ের ব্যাথাটা একটু করে বাড়ছে সম্ভবত। হুঁশ নেই। আগাবে না আর। এভাবে এখানেই পড়ে থাকবে৷ হাসপাতালে গিয়ে কোনো দুঃসংবাদ শুনতে চায়না। কেনো শুনবে! সারাজীবন কি এসব তার সঙ্গ দিবে! কখনো কাঁকন ছেড়ে যাবে, কখনো বাবা এতিম করে দিবে, কখনো বা আম্মা মাফ না করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে। সব কষ্ট তো ভুলিয়ে দিয়েছিলো অনাহূত অতিথি হয়ে জীবনে এসে মেয়েটা। কি মারাত্মক পরিকল্পনা ছিলো তার! সকালে বুঝিয়ে রাজশাহী পাঠিয়ে দিলো। পকেটের ফোন বেজে যাচ্ছে। তুলবেনা পন করেছে। সময় পেরিয়ে গেলো। প্রকৃতি শান্ত, বৃষ্টি কমেছে। ফোন বের করে দেখলো বাড়ির লোকজনের কল। রবিনের কলটা বেক করতেই রবিন বললো,
– স্যার আপনি কোথায়?
– জানিনা।
ফোন কেটে গেলো। কিছুক্ষন পর লোকেশন ট্র্যাক করে ইমরান যে জায়গায় অবস্থান করছে সেখানে পৌঁছে গেলো রবিন। অনেকটা বুঝিয়ে ইমরানকে গাড়িতে উঠালো। গাড়ির ইঞ্জিনে ত্রুটিজনিত কারণে স্টার্ট হচ্ছিলোনা তখন। বৃষ্টি বন্ধ হতেই সারিয়ে নিলো। তোয়ালেটা এগিয়ে দিলো ইমরানের দিকে। চুপচাপ মাথা মুছে বসে আছে। হসপিটালের সামনে গাড়ি থামলো। নেমেই ছুটলো আপন মানুষদের অস্তিত্বের সন্ধানে। অপারেশন থিয়েটারের সামনে থাকা প্রত্যেকে ইমরানকে আসতে দেখে হতচকিত হলো। ভেজা শরীর, মারাত্মক লাল চোখ দুটো। রবিন পেছনে ইমরানের ব্যাগ নিয়ে ছুটে আসছে। ইশতিয়াক ভেতরে নক করতেই রত্না বেরিয়ে এসে সবার সামনে ধমকে বললো,
– কতক্ষন অপেক্ষা করিয়ে রেখেছিস সবাইকে জানিস? এই ভেজা পোশাকে বাচ্চা কোলে নিবি কি করে?
নিরেট মস্তিষ্ক, তাকিয়ে শুনছে রত্নার কথা। জবাব আসছেনা রত্নার কাছে। বেশ অবাক হয়ে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে রত্না। ইমরানের ভাবমূর্তি বুঝতে পারছেনা। নিরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রত্না বললো,

– ভাবী আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছেন।
এতটুকু শোনার জন্যই কি শ্বাস আটকে ছিলো! রবিন ইমরানের দিকে পোশাক এগিয়ে বললো,
– স্যার চেঞ্জ করে আসুন।
ব্যাগ টা নিয়ে নার্সের দেখানো পথে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলো। রবিন ইমরানকে কিভাবে পেলো, কি হলো পুরো ঘটনা বলতেই আঁৎকে উঠলো সবাই। ব্যাগের ভেতর সাদা পাঞ্জাবি এবং পাজামা, আর এক জোড়া স্যান্ডেল ছিলো ওটাই পরলো। গাড়িতে মাঝে মাঝে এক্সট্রা কাপড় রাখে ইমরান। পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করতে করতে এগিয়ে এসে ইশান এবং সোহানের দিকে তাকিয়ে দেখলো ছেলে দুটো কাক ভেজা হয়ে আছে। বললো,
– বাসায় চলে যাও দুজন। ঠান্ডা লেগে যাবে।
ইশান বললো,
– বোনকে দেখে যাই?
নিরবে মাথা নাড়লো। মিনহাজ তাকিয়ে দেখছে মেয়ের জামাইকে। এমন ইমরান সে দেখেনি। চোখাচোখি হতেই মৃদু হাসলো মিনহাজ। সেই হাসির উত্তরে খানিকটা হাসলো ইমরান নিজেও। মিনহাজ জানেনা ইমরানের এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে আজ রাতের মত বিভৎস রাতের গল্প। প্রকৃতি কেনো এত তান্ডব চালালো! বুঝিয়ে দিলো মানুষ ঠিক কতটা অসহায় তার কাছে। রত্না সাদা তোয়ালে মোড়ানো ছোট্ট প্রাণটা নিয়ে বের হলো। ইমরানের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। হাসিমুখে দুহাতে থাকা প্রাণটাকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

– নে। তোকে আল্লাহ নিঃস্ব করেনি। জান্নাত দিয়েছেন।
নিশব্দে পেশীবহুল দু হাত মেলে আগলে নিলো সাদা তোয়ালে মোড়ানো এক টুকরো আনন্দ। যার ভার বইতেই শরীর জুড়ে ইমরানের সুখের শিহরণ। ঢেকে রাখা মুখের উপর থেকে তোয়ালে সরাতেই সবাই কাছে এসে দাঁড়ালো এক নজর দেখার চেষ্টায়। আইরিন কাঁদছে। মেয়ের কপালে ঠোঁট ছুইয়ে এতটুকুই বললো,
– তুমি বাবার এক সমুদ্র কষ্টের সমাধান, আমার ঔশান ইমরান খান।
গড়িয়ে পড়ছে নিরন্তর জল। রত্নার দিকে তাকাতেই হাসি মুখে বললো,
– ভাবী ঘুমাচ্ছে, জ্ঞান আসলে যাস। কেবিনে দিব কিছুক্ষন পর।
মিনহাজ কাঁধে হাত রেখে বললো,
– দুশ্চিন্তা করিস না।
ইমরান মাথা কাত করে বললো,
– তুমি দেখা করেছো?
– না, জিজ্ঞেস করেছিলাম। কেবিনে দিলে তখন দেখা করতে বললো।
নার্স বেবিকে নিয়ে গেলো। ইমরান ওটির সামনে রাখা বেঞ্চিতে বসে পড়লো। পায়ের দিকে তাকিয়ে ইশতিয়াক বললো,

– ভাইয়া পায়ে কি হয়েছে তোমার?
– মনে হয় রাস্তায় কিছুর সাথে লেগে কেটে গিয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে।
ইশতিয়াক ছুটলো নার্সের কাছে। ড্রেসিং করা প্রয়োজন। ইশারায় ইমরান সোহান এবং ইশানকে ঢেকে পাশে বসিয়ে জড়িয়ে ধরলো। ঠান্ডা লেগেছে সোহানের। গলা ভেঙে গিয়েছে অনেকটা। কাশছে এতক্ষন ইমরান খেয়াল করলো। ভাঙা গলায় বললো,
– মামা আমরা চেষ্টা করেছি। আরো আগে বুঝলে আগেই বের হয়ে যেতাম। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ ছিলো…
ইমরান থামিয়ে বললো,
– আমি কিছু তোকে বলেছি?
– না মামা, কিন্তু ডাক্তার যখন বললো দেরি হয়ে গিয়েছি। তখন নিজেকে সবচেয়ে ব্যর্থ মনে হয়েছে। আরো জোরে কেনো গাড়ি চালালাম না সেই আক্ষেপে কষ্ট লাগছিলো।
ইশান বললো,
– পাপা, ভাইয়া চেষ্টা করেছে। এত বৃষ্টিতে আমরা কখনো বের হইনি। বুঝতে পারছিলাম না কিভাবে আসবো। একেকটা বজ্রপাত মনে হচ্ছিলো সব ঝলসে দিবে।
– চুপ এত সাফাই কেনো দিচ্ছো তোমরা। আমিও একই রাস্তা দিয়ে এসেছি। দেখেছি রাস্তা। আসতে কি পেরেছি তোমাদের আগে? তোমরাই পেরেছো। আমার রিয়েল হিরোস’ তো তোমরা। দুজন বাসায় যাও। ফ্রেশ হয়ে ঘুম দাও। কাল এসো।
দুজনই নারাজ বাসায় যেতে। মোনাকে দেখে এরপর যাবে। সবাইকে রেখে ইমরান উঠে গেলো। বেশ কিছুক্ষন পর আসলো মোনাকে নতুন করে যেই কেবিনে শিফট করেছে সেখানে। পোস্ট অপারেটিভ রুমে রাখতে চেয়েছিলো। রত্না নিজ দায়িত্বে কেবিনে দিতে বললো। ইমরানকে দেখে আইরিন প্রশ্ন করলো,

– কোথায় ছিলি?
– মসজিদে।
আইরিন মাথা নেড়ে বললো,
– আমিও বাসায় যাব। শোকরানা নফল আদায় করা দরকার। মেয়েটার জ্ঞান ফিরলে দেখা করে যেতাম।

মিনহাজ কেবিন থেকে বের হতেই ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আগে গেলেই পারতি। তোর শরীর গরম হয়ে আছে।
– অধিকার আমার চেয়ে তোমার বেশি। এখন বাসায় যাও। বেশি রাত জাগা ঠিক নয় তোমার শরীরের জন্য। আমি আছি এখানে।
মিনহাজ হেসে কথায় সায় দিয়ে চলে গেলো। কেবিনে প্রবেশ করতেই দেখলো মোনা দরজার দিকে চেয়ে আছে। হয়তো প্রতীক্ষায় আছে কখন ইমরান সাহেব আসবে! ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে পাশের টুলটা টেনে বসে বললো,
– মা-মেয়ে এক রাতেই বুঝিয়ে দিলে সবাইকে নাকানিচুবানি কাকে বলে?
মোনার দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে। কথা বলছেনা মেয়েটা। হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো। কম্পিত ঠোঁট আওড়ে মোনা বললো,
– আমি ভেবেছি আপনার কাছে আর কখনো ফিরবোনা।
আলতো করে সযতনে সহধর্মিণীর অধরে ওষ্ঠ ছুঁয়ে বললো,
– মাঝে মাঝে সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহনশীলতার পরীক্ষা নেন। আমি বোধহয় উত্তীর্ণ হয়ে গেলাম বউসোনা। এই যে তুমি আর আমার মেয়েটাকে উপহার হিসেবে দিলেন।
মোনা শান্ত দৃষ্টিতে বললো,

– আপনি খুশি?
মোনার এক হাত মুঠোতে নিয়ে হাতে ঠোঁট ছুয়ে চোখ বুজলো। ভাবতে পারছেনা আজকে যদি পথে আরো দেরি হত কি হতো! যদি প্রকৃতি আরো প্রতিকূলে চলে যেত! মোনা দেখতে পাচ্ছে মানুষটার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
– কাঁদছেন ইমরান সাহেব?
চোখ খুলে বললো,
– না, ঠিক আছি। তুমি রেস্ট নাও। আমি এখানেই আছি।
– কথা লুকাচ্ছেন?
– না নিজেকে সামলে নিচ্ছি। আর কোনো কঠিন বাস্তবতা চাই না জীবনে। ধন্যবাদ মোনালিসা আমাকে আরো একটি সুখ দেয়ার জন্য। তোমার ঋণ শোধ করতে পারবোনা। কষ্টের শেষ সময়টাতে তোমার পাশে থাকতে পারলাম না, এই আফসোসে জীবন কেটে যাবে।
মোনা হেসে বলে,
– আপনি আমার মনে ছিলেন।
ইমরান নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। ইমরানের মন ভালো করতে মোনা খানিকটা হেসে দুষ্টুমি করে বললো,
– সাদা পাঞ্জাবিতে আপনাকে বেশিই সুন্দর লাগছে ইমরান সাহেব।
ইমরান ভ্রু কুচকে বললো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৬

– এখন মেয়েরও বাবা হয়েছি মোনালিসা, এত সৌন্দর্য্য কিভাবে পাও আমার মাঝে।
– আপনি সবসময় সুন্দর, আমার প্রিয় পুরুষ।
– এখন বলোনা প্রেমে পড়ে গিয়েছো?
– যদি বলি, আমি প্রেমে পড়ে গেছি ওগো, ওগো জেন্টেলম্যান।
– মোনালিসা দশমাস কিন্তু শেষ! সময় এখন আমার।
দাঁতে নিম্নোষ্ঠ চেয়ে হাসলো ইমরান। মোনা লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। ইমরান হাসছে সহধর্মিণীর লাজুক মুখে তাকিয়ে। কষ্টপ্রহর গুলো এভাবে কেটে যাক, সুখ শান্তিতে ছেয়ে যাক তার ছোট্ট পরিবার এইতো চাওয়া।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৮