Home পৌষপার্বণ পৌষপার্বণ পর্ব ২৮

পৌষপার্বণ পর্ব ২৮

পৌষপার্বণ পর্ব ২৮
Irfa Mahnaj

পৌষকে কেবিনে দেওয়ার পর থেকেই ওর শিয়রে বসে আছে পার্বণ। ওর হাত দুটো মুঠোয় পুড়ে কপালে ঠেকিয়ে বসে আছে।
এর মধ্যে কপালে, গালে, হাতে অজস্র চুমু খাওয়া শেষ পার্বণের।শুধু বিশেষ একটা জায়গায় চুমু খাওয়া বাকি যেটা পৌষ উঠলে উশুল করবে।
এরকম ভাবে অচেতন থাকলে ফিল আসে না আরকি! সেসব যাকগে চুমু খেয়ে পুরো মুখ ভিজিয়ে ফেলেছে পার্বণ। গাল দুটো লাল হয়ে গেছে।
তাহলে বুঝো এই চুমুখোর পার্বণ ব্যাটা কি পরিমানে বেচারি পৌষকে চুমু থেরাপি দিয়েছে। এখন এমন ভাবে বসে আছে বুঝায় সে কতো শান্ত।
বসে থাকতে থাকতেই পার্বণের কাঁধে হাত রাখে ভাদ্র। ওকে উদ্দেশ্য করে বলে,

— সারাদিন ধকলের উপর দিয়ে গিয়েছে। কিছুই খাসনি এখন পর্যন্ত যা এখন গিয়ে খেয়ে আয়।
— খাবো না ভাই। তুমি এখন এখান থেকে যাও।
— তা বললে হয় নাকি? খেয়ে আয়।
— আমার পুরো দুনিয়া নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে, খাবার আমার গলা দিয়ে নামবে না।
পার্বণের এরূপ কথায় স্তব্ধ ভাদ্র। বুকটা প্রশান্তি প্রশান্তি লাগছে। প্রতিটা ভাইই চায় তার বোন ভালো থাকুক।
ভাদ্র মনে মনে ভাবে,
— পোলা একটু জাউরামি করে, একটু ভন্ড আছে, সবাইরে বাঁশ দেয়, চিন্তার খনি, মানুষের হার্ট অ্যাটাকের কারণ এছাড়া তো এমনে ভালো মানুষই।
ভাদ্রের ইমোশনাল বিলাস বেশিক্ষন টিকলো না। ও বোধহয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভুলেই গিয়েছিলো এটা পার্বণ!
মানুষ করে বৃষ্টি বিলাস, দুঃখ বিলাস হেনটেন বিলাস আর ভাদ্র করছিলো ইমোশনাল বিলাস!
— ভাদ্র ভাই তোমার বোন নেওয়ার বদলে আমি কিন্তু আমার বোন দিয়েছি। নিজের বোন আর বোনজামাইয়ের পিছে পড়ে আছো কেনো? আমি কি আমার বোনের পিছে ঘুরি?
পার্বণের হুট করে বলা কথা ভাদ্রের বোঝা তো দূর মাথার দশ হাত উপর দিয়ে গিয়েছে। ও বিস্ময় ভরা কণ্ঠে জানতে চাইলো,

— মানে?
— আমার বোনকে তোমায় দিয়েছি না?
— হু।
— তো হু হু না করে যাও তার কাছে। এখানে কি? দেখছো না আমি পৌষের সাথে একটু সময় কাটাচ্ছি!
বিষম খেলো ভাদ্র। এতক্ষনে বুঝেছে। এই ছেলের প্রশংসা কিনা ও একটু আগে করেছে!ওর পুরো আক্কেল হয়ে গেছে!
থমথমে সুরে ভাদ্র জবাব দিলো,
— আশ্চর্য বোনকে দেখতে এসেছি।
— বোন কি পালিয়ে যাচ্ছে?
— না।
— তাহলে আমি যখনি একটু সময় কাটাতে যাই তুমি তোমার বডি ঢুকিয়ে দেও। বেশি করলে আমি আমার বোন নিয়ে যাবো।
জোরে জোরে কাঁশি উঠে গেলো ভাদ্রের। ও জিজ্ঞেস করলো,

— তুই কি আমাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছিস।
— আরে না কিসের ওয়ার্নিং!
ভাদ্র যেই না এ কথা শুনে বলতে যাবে ” তোর কথা শুনে তাইই মনে হচ্ছিলো!” তার আগেই পার্বণের কথা শুনে ওর মাথা ঘুরে উঠে।
— ওয়ার্নিং দেওয়ার দিন শেষ। ডিরেক্ট থ্রেট দিচ্ছি মানে হুমকি দিচ্ছি। তোমার বোন যেমন আমার বউ তেমনি আমার বোন কিন্তু তোমার
বউ। তাই বুঝে শুনে কাজ কইরো!

ডাক্তার আশার কেবিনে বসে আছে পার্বণ। বিশেষ ভাবে তলব করা হয়েছে পার্বণকে। পৌষের সুস্থতার পর থেকেই আবারো চাঙ্গা হয়ে গেছে পার্বণ।
এই যে এখন নিজের সামনে যে এতো বড় একজন ডাক্তার বসে আছে পার্বণের মধ্যে কোনোরুপ সেরকম উদিগ্ন নেই।
চেয়ারের উপর দুই পা ছড়িয়ে নিজের কমফোর্ট ওয়েতে বসে আছে সে। ডাক্তার আশা যে কিনা পার্বণকেই জহুরি নজরে পরখ করছে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
— এভাবেই আমাকে দেখে যাবেন নাকি কিছু বলবেন ও? আমি তো আরো ভেবেছি আমার জন্য চা, কফি সাজিয়ে রেখেছেন। যেভাবে বিশেষ তলব!
বিশেষ কথাটা একটু টেনে টেনেই বলল পার্বণ। তারপর নিজের চুলের মাঝে হাত গলিয়ে সেগুলোকে পিছনে ঠেললো।
পরনের গেঞ্জিটা টেনে টুনে ঠিক ঠাক হয়ে বসে ফের শুধালো,

— আমাকে দেখার জন্যই বুঝি ডেকেছিলেন? তা আগে বলবেন না পৌষের মেকআপ চুরি করে মুখে মেখে আসতাম। আচ্ছা যাই হোক সেসব বাদ দিন। কিছু খাওয়ান আগে।
— আমি খাই আপনি আমাকে দেখেন।
মুখ দিয়ে “চ” বর্গীয় আওয়াজ বের করে পার্বণ বলে,
— আশ্চর্য কিছু বলেন ভাই!
এই এতক্ষন পর পার্বণ নিজের ভাঙা রেডিও থামালে বিরস মুখ বানানো আশা বলে উঠলো,
— বলার সুযোগ তো দেওয়া লাগবে নাকি?
জিভ কাটলো পার্বণ। তবে হেরে যেতে সে নারাজ। বলে,
— আমি সুযোগ কেন দিবো আপনি করে নিবেন।
আশার মাথাটা কি ঘুরছে? হ্যা। এটুকু সময়েই ও ওর মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। আশাকে আগেই জ্যৈষ্ঠ সাবধান করেছিল।
— দেখ আশা আমি আবারো বলবো তুই বিষয়টা ভেবে দেখ।
— এখানে এতো ভাবার কি আছে? বাচ্চা একটা ছেলে ওর সাথে আমি কথা বলবো।
— এ কোনো সাধারণ পোলা নয় লা!
মনে মনে এটা বললেও মুখে বলে,

— আমার সাবধান করার দরকার আমি করে দিয়েছি এখন বাকিটা তুই বুঝিস।
এবারে আশা বুঝতে পারলো এতো সাবধান বাণী কেন।
— এ পোলা নয় এ আগুনের গোলা!
গলা খাকারি দিয়ে কথা আরম্ভ করলো আশা। বলল,
— তোমার মনে হয় না তুমি একটু বেশিই তাড়াতাড়ি বাবা হয়ে গেছো?
আরেকটু আরাম করে বসলে। হাত দিয়ে নখ খুটতে খুটতে এটা কোনো কথাই না এমন ভাব করে বলল,
— কই না তো আমার এমন মনে হয় না। বিয়ের হিসেব করলে দেখা যায় আমি আরো পিছিয়ে আছি। আমাদের জেনারেশনটাই এমন সব কিছুতে ফার্স্ট। আফটারঅল Gen-Z বলে কথা!
আশা শেষ! ওর এখন নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। শিক্ষা হয়ে গেছে। ও যদি আর কোনোদিন এই ছেলের সামনে আসে।
ডাক্তার যেখানে অন্যের অসুখ সারায় সেখানে এই জাউড়া ছোকরা ওকেই অসুস্থ বানিয়ে দিলো!

পূর্ণা, বনচাঁপা এসেছিলো পৌষকে দেখতে। আর ওদের নিয়ে আসছিলো কালমেঘ।
ঘটনা হলো তিনজন রুগী দেখতে এসে এখন রুগী হয়ে বসে আছে। ব্যাপারটা হাস্যকর হলেও এটাই ঘটেছে।
মূলত পূর্ণা, বনচাঁপা পাশাপাশি দাড়িয়ে ছিলো রিকশার জন্য। পিছনেই ছিলো কালমেঘ। বনচাঁপা কথা বলতে বলতে সামনে একটু এগিয়ে যায়।
আর তখনই পূর্ণা দেখতে পায় একটা গাড়ি এদিকেই আসছে বনচাঁপাকে বাঁচাতে পূর্ণা ওর হাত ধরে টান দিয়ে পিছনে ছুড়ে মারে।
বনচাঁপা গিয়ে পড়ে কালমেঘের উপর।ব্যাস দুই ভাই বোন মিলে গিয়ে পড়ে ময়লার ভাগাড়ে। ওখানে থাকা কাঁচে ওদের হাত পা জখম হয়ে যায়।
কাহিনী এখানেই শেষ না আমরা জানি পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় “প্রত্যেকটা ক্রিয়ারি বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে ” সেটাই ঘটে পূর্ণার সাথে।

পূর্ণা যেই ফোর্সে বনচাঁপাকে ধাক্কা দিয়েছিলো সমপরিমান ফোর্স এ গিয়ে সামনে গিয়ে পড়ে। আর ঠাস করে গিয়ে একটা সাইকেলের সাথে বাড়ি খেয়ে ঠুস হয়ে যায়!
এখন তিন বান্দা হসপিটালে আছে। সাদা ব্যান্ডেজ করা হয়েছে ওদের। কালমেঘের হাত ঝুলে আছে গলার সাথে। পূর্ণার পা। আর বনচাঁপার মুখে ব্যান্ডেজ।
এই দৃশ্য দেখে হেসে লুটুপুটি খাচ্ছে পার্বণ। ওর হাসি হসপিটালের এই কেবিনে জংকার তুলছে।
কালমেঘ কটমট করে তাকিয়ে আছে পূর্ণার দিকে। এর অর্থ এই একবার সুস্থ হতে দে তারপর দেখিস কি করি!
আর পূর্ণা বেচারি কি করবে ও তো জীবন বাঁচাতে গিয়ে যে পঙ্গু করে ফেলবে সেটা কি বুঝেছে!
হসপিটালে যাতে ভর্তি হওয়া না লাগে তাইতো বনচাঁপাকে টানলো এখন যে পাশা উল্টে হসপিটালেই ভর্তি হয়ে বসে থাকবে সেটা কে জানতো!

সব শেষে পার্বণ আবারো পৌষের কেবিনে। পৌষের জ্ঞান ফিরেছে। তবে ওর মুখটা এখন দেখার মতো।
মূল হোতা আর কেউ না পার্বণ। পার্বণের আবদার ওর সেই অধুরা থাকা চুমু খাবে।আর পৌষের বক্তব্য এটা হাসপাতাল।
— সো হোয়াট? হাসপাতাল তো কি হয়েছে?
— তোর মাথা হয়েছে। আমার সেন্স না থাকার সুযোগ নিয়ে যে এতো গুলো চুমু খেয়েছিস তাতে হয়নি?
আঙ্গুলের সাহায্যে গণনা আরম্ভ করলেও হিসেবে কুলাতে পার্বণ। যে ও কতগুলো খেয়েছে।
ওর কাহিনী দেখে তেতে উঠলো পৌষ।বলল,

— দেখছো কতো গুলো যে খেয়েছে গুনতেই পারছে না!
— সরি জান কিন্তু এখন আমার তৃষ্ণা মিটাতেই হবে।
পার্বণের এই ভোল পালাটানোর কারণ ভাবার টাইমও পেলো না। তার আগেই পার্বণ গিয়ে পৌষের ঠোঁট জোড়া আঁকড়ে ধরে।
দীর্ঘ চুমু খাওয়া শুরু করে। এই অধর চুম্বন কোনো সাধারণ চুম্বন নয়। এটা একটা স্বামীর তার স্ত্রীর সান্নিধ্যে না পেয়ে যে তৃষা তা মেটানোর জন্য।

পৌষপার্বণ পর্ব ২৭

এতক্ষনের সব অভিযোগ আর ব্যাকুলতা সব চুমুর মধ্যে ঢেলে দিচ্ছে পার্বণ। পৌষ হিমশিম খাচ্ছে তাল মিলাতে তবুও বুঝলো পার্বণের অভিযোগ, অভিমান আর এতক্ষনের নীরবে সহ্য করা যন্ত্রনা গুলো।
পার্বণ যা এতক্ষণ নিজের মধ্যে চেপে রেখেছে সেটাই এখন উগড়ে দিচ্ছে। সবার কাছ থেকে লুকায়িত অনুভূতি প্রকাশ করছে নিজ নীড়ে পার্বণ।
বেশ অনেক্ষন পর পৌষের ঠোঁট ছেড়ে দিলো পার্বণ। দুজনেই হাঁপাচ্ছে। বৃদ্ধাআঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট মুছে বাঁকা হাসলো পার্বণ। অতপর পৌষের দিকে এগিয়ে গেলো।

পৌষপার্বণ পর্ব ২৯