Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৪

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৪

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৪
নওরিন কবির তিশা

ভোরের স্নিগ্ধতা কাটিয়ে সূর্য তার রক্তিম আভা ছড়িয়ে মধ্যগগনে আরোহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ এই স্নিগ্ধতা উপভোগ করার মত মানসিকতা আজ নেই কারো। গৃহের প্রতিটি কোণ বিস্তর মৌনতায় নিমগ্ন। আজ-ই ঢাকায় ফিরে যাবে তৃষারা। অথচ পরিকল্পনা ছিল আরো সপ্তাহখানেক এখানে কাটানোর। কিন্তু সাবরিনার বিয়ের খবরে ছেদ পড়েছে তাতে।
শায়লা বেগম স্যুটকেস গোছানোর নামে অগোচরে অশ্রু বিসর্জন করছেন পরক্ষণেই দক্ষ হস্তে আঁচলের আড়ালে লুকাচ্ছেন অশ্রুকণা। টুইংকেল বারান্দায় তৌফিক নেওয়াজের সঙ্গে বসে; ও তৌফিক নেওয়াজের আঙ্গুল টেনে বলল,,

“মামাই? আমি তো চলে যাচ্ছি। কিন্তু তুমি কিন্তু ঔষধ ঠিকমতো খাবে হ্যাঁ? আর শোনো-শোনো প্রতিদিন সকালে ওই যে ভোর বেলায় উঠে তুমি আমার জন্য চকলেট আনতে না? এখন তো আমি থাকবো না তাই তোমার ভোর বেলাতে ওঠা লাগবে না। ঠিক আছে? রেষ্ট করবা।”
টুইংকালের বাচ্চমীপূর্ণ কথাগুলোতে চোখ ভিঁজে আসলো তৌফিক নেওয়াজের, কম্পিত হস্তে টুইংকেল কে কাছে টেনে কোলে বসিয়ে তিনি বললেন,,
“তোমাকে খুব মিস করব মামনি।”
টুইংকেলও মামার গলা জড়িয়ে আদুরে স্বরে বলল,,“আমিও তোমাকে খুব মিস করবো মামাই।”

সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদায়ী প্রহর ঘনিয়ে আসছে। প্রকৃতিটা ও আজ ভারাক্রান্ত যেন। সকাল থেকেই কৃষ্ণকালো মেঘগুচ্ছ পুঞ্জিভূত হয়ে আছে উত্তর পার্শ্বে। তৃষাদের শ্যাওলা ধরা গেটের বাইরে অপেক্ষমান ‌আর্যর গাড়ি। টুইঙ্কল তখনো তৌফিক নেওয়াজের কোলে। একে একে বিদায় নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে তৃষারা।
আরিয়ান-আরিশা তৃষার সাথে আলাপ সেরে আর্যর পাশে এসে দাঁড়ালো। তৃষা তখন শায়লা বেগমের সঙ্গে জরুরি কথোপকথন সারছে;পাশাপাশি তৌফিক নেওয়াজকে আড়চোখে শাসিয়ে নিজের খেয়াল রাখার এক প্রচ্ছন্ন হুমকি দিতেও ভুলছে না। আর্য মৃদু আলিঙ্গন করল আরিয়ানের সঙ্গে অতঃপর আরিশার মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে প্রস্থান প্রস্তুতি চূড়ান্ত করলো।
তৃষা ও ততক্ষণে আলাপ সেরে এগিয়ে এসেছে। আকাশের অবস্থা ভালো না থাকায় আর্য আর সময়ক্ষেপণ না করে তৎক্ষণাৎ গাড়িতে উঠল। তৃষা বসলো ওর পাশের সিটে। আর্য গাড়ি স্টার্ট দিতেই টুইংকেল তখন গাড়ির জানালা দিয়ে হাত নাড়িয়ে লন্ডনি সবার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল,
“মামাই, মামিয়া, দাদাভাই,আপি, বাই বাই! উই উইল কাম ব্যাক সুন!”
আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে ধীরলয়ে এগিয়ে চলল ‌গাড়িটা। পথের দু’ধারে প্রাচীন বৃক্ষরাজি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে, ঘন পত্রপল্লবের অরণ্য বড্ড নিবিড়ভাবে ঘিরে আছে পথটাকে। ডালপালার ফাঁক দিয়ে ম্লান রৌদ্র রশ্মি এসে পড়ছে ধুলোমাখা প্রান্তরে। বাতাসের হিল্লোলে পাতাদের মর্মর ধ্বনি ছাপিয়ে ছায়ানিবিড় বনবীথির বুক চিরে গাড়িটা ছুটে চললো নিরুদ্দেশের পানে।

অবশেষে গাড়িটা ঢাকার কোলাহলে এসে পৌঁছেছে।তবে ততোক্ষণে দিনমণি বিদায় নিয়ে আকাশের পটে কালিমালিপ্ত অন্ধকারের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। তৃষার কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে ছোট্ট টুইংকেল। তৃষাও অবিরাম আদুরে পরশ বুলিয়ে চলেছে টুইংকেলের মাথায়। যাতে ওর ছোট্ট রাজকন্যার নিদ্রা যাপনে সামান্যতম বিঘ্নেরও সৃষ্টি না হয়।
ওরা সরাসরি সাবরিনাদের বাসায় যাবে; তাই এতটা বিলম্ব হচ্ছে নতুবা এতক্ষণে বাসায় পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল ওদের। তৃষার শরীরেও শ্রান্তি বাসা বেধেছে, ঝিমুনি দিয়ে ঘুম আসছে। তবে তন্দ্রাচ্ছন্নতা লাঘবের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ও। অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছে অবাধ্য চোখের পাতার সঙ্গে। ঘুমের ঘোরে ওর মাথাটা বারবার নুয়ে পড়ছে, আবার পরক্ষণেই সচেতন হয়ে সোজা হয়ে বসার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ও।
আঁধারঘেরা রাজপথের নিয়ন আলোয় আর্যর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনের পথে। তবে মাঝেমধ্যেই তার চোখ চলে যাচ্ছে পাশের সিটে বসা মেয়েটির দিকে। দীর্ঘক্ষণিক বিশ্লেষণ পর্ব শেষে তৃষার এহেন কান্ডে আর্য চাপা হেসে বলল,,

“ঘুম আসছে?”
নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ ভেসে আসা আর্যর কন্ঠে তৃষা ধড়ফড়িয়ে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করল। বড় বড় চোখ করে তন্দ্রা কাটানোর ব্যর্থ প্রয়াসে বলল,
“না না, কে বলল ঘুম আসছে? আমি তো একদম ঠিক আছি। আসলে দীর্ঘ জার্নি তো, তাই চোখটা একটু লেগে আসছিল হয়তো।”
স্টিয়ারিং হুইলে এক হাত রেখে ড্যাশবোর্ডের মিটমিটে আলোয় তৃষার বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে সে ধীর স্বরে বলল,
“এত মিথ্যা বলো কেন? চোখ দুটো তো পরিষ্কার বলে দিচ্ছে তুমি কতটা টায়ার্ড।”
তৃষা একটু অপ্রস্তুত হয়ে মুখটা জানালার দিকে ফেরাল। অন্ধকার রাস্তার দুপাশে নিয়ন আলোরা ক্ষণিকের জন্য দৃশ্যমান পরক্ষণেই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল,
“আসলে টুইংকেল কোলে তো, তাই ভাবলাম…”
তৃষার কথা শেষ হওয়ার আগেই আর্য বাধা দিয়ে বলে উঠল,,
“বাসায় পৌঁছাতে এখনো আধা ঘন্টা লাগবে। সো আই থিংক ইউ্য শ্যুড টেক এ ন্যাপ।”
তৃষা চোর ধরা পড়ার মতো মুখ করে তাকাল। আর্য এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করে অন্য হাতটা তৃষার দিকে প্রসারিত করে নিজের কাঁধটা সামান্য এগিয়ে দিলো। সম্মুখে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলল,,

“ ডোন্ট বি সো স্টাবর্ন। ইউ্য ন্যিড দ্যিস রেস্ট।”
আর্যর এই আকস্মিক অধিকারবোধে তৃষার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। এক নিবিড় প্রশান্তি ধেয়ে এলো সর্বাঙ্গে। ও আর দ্বিমত করল না। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে লাজুক হাসির রেখা টেনে অতি সাবধানে টুইংকেলকে সামলে নিয়ে নিজের মাথাটা আর্যর প্রশস্ত কাঁধে এলিয়ে দিল।
তৃষার চুলের মৃদু সুবাস আর্যর নাসিকারন্ধ্রে এসে বিঁধল;কাঁধে তৃষার ভার অনুভব করতেই আর্যর মনে হলো, এই মুহূর্তটুকু যেন অনন্তকালের জন্য থমকে যায়। ও অত্যন্ত সন্তর্পণে গাড়ির গতি আরও কমিয়ে দিল, যাতে সামান্যতম ঝাঁকুনিও তৃষার ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটায়।
আর্য এক পলক তৃষার প্রশান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“স্লিপ টাইট, মাই ডিয়ার। আমি তো আছিই তোমার পাহারায়।”
ক্লান্তির চাদর মুড়ি দিয়ে তৃষাও ততক্ষণে তলিয়ে গেছে গভীর ঘুমের রাজ্যে। আঁধারভেদী রাজপথের নিস্তব্ধতায় আর্য একবার ঘাড় ফিরিয়ে পাশে তাকালো। তার প্রশস্ত কাঁধে তৃষার ভারহীন নির্ভরতা আর কোলে নিষ্পাপ টুইংকেলের নিশ্চল ঘুমের দৃশ্যে আর্যর অধরে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটে উঠল।
ও অত্যন্ত সযতনে ঝুঁকে পড়ে প্রথমে তার ছোট্ট রাজকন্যার কপালে পিতৃস্নেহের এক পলি পরশ বুলিয়ে দিল। পরক্ষণেই তৃষার ললাটে অবাধ্য হয়ে লুটিয়ে পড়া কয়েকগাছি রেশমি চুলে তার আঙুলগুলো আলতো করে খেলা করে গেল;পরম মমতায় সেগুলো কানের পিছে গুঁজে দিয়ে সে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল তৃষার কপালে।

পরদিন প্রভাত এক ব্যস্তময় স্নিগ্ধতা নিয়ে হাজির হয়েছে। কাল রাতে পৌঁছাতে অনেকটা বিলম্ব হওয়ায় তৃষারা এক প্রকার শ্রান্ত দেহ নিয়েই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ সকাল হতেই সেই নিঝুম পুরী যেন সহসা প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠেছে। যদিও কথা ছিল অনুষ্ঠান হবে ছিমছাম, কিন্তু সম্ভ্রান্ত পরিবারের বড় মেয়ে বলে কথা, আর পাত্রপক্ষও তো যে সে নয়! তাই ছোটখাটো আয়োজনের তকমা থাকলেও তোড়জোড়ে তার লেশমাত্র নেই।
মেহমানদের উপস্থিতিতে ড্রয়িংরুমে টেকা দায়। সাবরিনার মামা বাড়ি, দাদা বাড়ির লোক সহ বাদ পড়েনি একটা আত্মীয়ও। যদিও আকদ হওয়ার কথা শুক্রবার তবে সপ্তাহের শুরু থেকেই মেহমানদের আনাগোনা বড্ড ভারী। সেই ব্যস্ততার সামিল হয়েছে মেহসানাও। আদ্রিয়ান এর বাবা আফজাল হোসেনের কড়া নির্দেশ বিয়ে শেষ না হওয়া অব্দি এ বাড়ি থেকে এক চুল নড়তে পারবে না ও।
এদিকে এই এলাহি কাণ্ড আর উৎসবের আমেজে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে তৃষাকে। একে তো কাজের অন্ত নেই, তার ওপর ছোট্ট টুইংকেল আজ নাছোড়বান্দা। খাওয়ার নামগন্ধ নেই তার মুখে, বরং লোকলস্কর দেখে সে যেন দ্বিগুণ উৎসাহে ডানপিটে হয়ে উঠেছে। তৃষা এক বাটি খাবার হাতে নিয়ে বাড়ির এমাথা-ওমাথা হন্যে হয়ে ছুটছে।
​“টুইংকেল, মামনি! লক্ষ্মী সোনা আমার, আর একটা লোকমা খেয়ে নাও? দেখো কত লোকজন,বানি একটু পরেই সব ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তখন তোমাকে কে খাওয়াবে বলো তো?”

​টুইংকেল তখন খুশিতে আত্মহারা। সে তৃষার কথা গায়েই মাখছে না, বরং খিলখিল করে হাসতে হাসতে ড্রয়িংরুমের সোফার চারপাশ দিয়ে গোল হয়ে দৌড়াচ্ছে। তৃষাকে দেখলেই সে ভেঙিয়ে বলছে,
“নো বানি। আই অ্যাম বিজি নাও। দেখো কত আঙ্কেল-আন্টি! আমি এখন খাবো না।”
বলতে বলতেই সে আবার এক দৌড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটল। তৃষাও নাছোড়বান্দা, সে-ও পেছনে পেছনে ছুটছে। কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় আসতেই ঘটল বিপত্তি। তাড়াহুড়ো করে টুইংকেলকে ধরতে গিয়ে তৃষার পায়ের জুতাটা কার্পেটে আটকে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে ও সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তে যেতেই ভয়ে চোখ বুঁজে ফেলল।

কিন্তু প্রত্যাশিত আঘাতের বদলে সে অনুভব করল এক জোড়া শক্ত ও বলিষ্ঠ হাতের বেষ্টনী। পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে আর্য তাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে ধরে ফেলেছে। ও এতক্ষণ ফোনের ওপাশে কারো সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করছিল, কিন্তু তৃষার এই টালমাটাল অবস্থা দেখে ফোনটা কানে রেখেই ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এসেছে।
তৃষা কাঁপা কাঁপা চোখে তাকিয়ে দেখল আর্যর তীক্ষ্ণ শীতল চোখদুটো সরাসরি ওর দিকেই নিবদ্ধ। আর্য ফোনটা পকেটে রেখে তৃষাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল। হাত না সরিয়েই ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে শুধাল,,
“আর ইউ ক্রেজি? সিঁড়ির সামনে এভাবে কেউ দৌড়ায়? জাস্ট হোপ ইফ ইউ হ্যাড ফলেন?”
তৃষা তখনও হাঁপাচ্ছে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বাটিটা দেখিয়ে অসহায় স্বরে বলল,
“দেখুন না টুইংকেলকে! সকাল থেকে কিচ্ছু মুখে দিচ্ছে না। শুধু সারা বাড়ি টম অ্যান্ড জেরি খেলে বেড়াচ্ছে।”
আর্য এবার টুইংকেলের দিকে তাকাল। বাবার গম্ভীর চেহারা দেখে টুইংকেল থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আর্যর চোখের ইশারায় সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল। আর্য নিচু হয়ে টুইংকেলকে কোলে তুলে নিল। ওর নাকে আলতো টোকা দিয়ে বলল,,

“সো, প্রিন্সেস ইজ্য গিভিং হার বানি এ হার্ড টাইম, হুহ্?”
টুইংকেল মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু মুখে বলল,
“পাপা, আই ওয়াজ জাস্ট প্লেয়িং।”
আর্য তৃষার হাত থেকে বাটিটা নিজের হাতে নিল। তারপর তৃষার দিকে এক পলক তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“গো অ্যান্ড ফ্রেশেন আপ। তোমাকেও অনেক টায়ার্ড দেখাচ্ছে। আই উইল হ্যান্ডেল দিস লিটল ফেইরি। তুমি না খেলে তোমার পাপাও কিন্তু আজ খাবে না, ডান?”
টুইংকেল অমনি হাঁ করে মুখ বাড়িয়ে দিল। আর্যর এমন হঠাৎ শান্ত-কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণে তৃষা অপলক চেয়ে রইল। বাবা-মেয়ের খুনসুটি যেন এক চিলতে শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে ওর ক্লান্ত হৃদয়ে। আর্য এক লোকমা খাইয়ে দিয়ে তৃষার এমন দৃষ্টিতে ভ্রু উঁচালো,
“কী দেখছো এভাবে? প্রেমে পড়ে গেলে নাকি আবার?”
তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল। সদ্য ফোঁটা কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল ওর শ্বেতশুভ্র মুখশ্রীতে। কোনো কথা না বলে দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে পা বাড়াল, এদিকে ওর এমন কাণ্ডে পিছে মৃদু হাসলো আর্য।

“হ্যালো হ্যালো? কি বলছিস? শুনতে পাচ্ছি না হ্যালো।”
বিয়ের বাড়ির উৎসবমুখর কোলাহলে যখন সবাই ব্যস্ত, তখন ড্রয়িংরুমের পেছনের ছোট অলিন্দে এক চিলতে নির্জনতা খুঁজে নিয়েছিল মেহসানা। কিন্তু সেখানেও শান্তি পাওয়ার জো নেই। আকস্মিক এক ভরাট কণ্ঠে ওর চিন্তার সুতোটা ছিঁড়ে গেল।
​মেহসানা আড়চোখে তাকিয়ে দেখল, আদ্রিয়ান এক হাতে ল্যাপটপ আর অন্য হাতে ফোন কানে চেপে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে নেভি ব্লু ক্যাজুয়াল শার্ট, হাতা দুটো বরাবরের মতোই কনুই পর্যন্ত গোটানো। ও মেহসানার দিকে এক পলক তাকিয়ে ওষ্ঠকোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসির রেখা ফুটিয়ে ফোনে বলতে লাগল,,
​ “আরে না রাফি, আই আন্ডারস্ট্যান্ড ইওর পয়েন্ট। বাট তুই যে স্পিকারের কথা বলছিস, সেটার এখন কোনো দরকার নেই। আই মিন, নো নিড অফ অ্যানি এক্সটার্নাল সাউন্ডবক্স। এমনিতেই বাসায় যে হাই-ভলিউমের ন্যাচারাল সাউন্ডবক্স অলরেডি প্রেজেন্ট আছে, তাতে আর নতুন কোনো নয়েজ পলিউশনের প্রয়োজন পড়বে না। আই্যাম অলরেডি ডিলিং উইথ আ লাইভ ডিজে!”

​মেহসানা এতক্ষণ ফল কাটার চামচ হাতে নিয়ে বেশ শান্তভাবেই কাজ করছিল, কিন্তু আদ্রিয়ানের মুখে ওই সাউন্ডবক্স আর লাইভ ডিজে শব্দ দুটো কর্ণগোচর হতেই ওর কান দুটো খরগোশের ন্যায় খাড়া হয়ে গেল। ও চট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো সরু করে আদ্রিয়ানের দিকে তিল ধারণের ন্যায় এক তীক্ষ্ণ চাউনি নিক্ষেপ করল।
​আদ্রিয়ান ফোনটা কেটে দিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ল্যাপটপটা একপাশের টেবিলে রাখল। মেহসানার এই রাগত রূপটা ও যেন বড্ড বেশি উপভোগ করে।​মেহসানা হাতের চামচটা টেবিলে ঠকাস করে নামিয়ে রেখে কোমরে হাত দিয়ে ত্যাড়া স্বরে বলল,,

“মিস্টার ল্যাম্পপোস্ট, আপনি কি নিজের সীমাটা ইদানীং একটু বেশিই পার করছেন না? কার সাথে ফোনে কথা বলছেন আর কাকে ইনডাইরেক্টলি টোন্ট মারছেন, আমি কিন্তু বোকা নই!”
​আদ্রিয়ান আলস্যভরে টেবিলের কোণায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত বুকে আড়াআড়ি করে বাঁধল। চোখে-মুখে প্রচ্ছন্ন কৌতুক নিয়েই ও শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বলল,,
“ওয়াও! সেলফ-রিয়ালাইজেশন একেই বলে! আমি তো কারো নাম নিইনি মিস মেহসানা। কিন্তু আপনি যেভাবে চোর ধরবার মতো রিয়্যাক্ট করলেন, তাতে তো রান্নাঘরে কে, আমি তো কলা খাইনি প্রবাদটাই সত্যি মনে হচ্ছে। সো, আর ইয়্যু এক্সেপ্টিং দ্যাট ইয়্যু আর দ্য ওয়ান অ্যান্ড ওনলি সাউন্ডবক্স অফ দিস হাউস?”
​মেহসানা রাগে রি রি করে উঠে এক কদম এগিয়ে এসে বলল,,
“ইয়্যু নো হ্যোয়াট? আপনার এই সারকাজম আর এই ইরিটেটিং বিহেভিয়ার কোনো নরমাল মানুষের পক্ষে সহ্য করা ইমপসিবল! আমারই ভুল হয়েছিল আপনার মত একটা লোককে ভালো হয়ে গিয়েছে ভাবা! আস্ত ঘোড়ার ডিম, হুতুম পেঁচার নানা!”
মেহেসানার এমন গালিতে হো হো করে হেসে উঠল আদ্রিয়ান,

“ হুতুম পেঁচার নানা? সিরিয়াসলি? আপনার এই ক্রিয়েটিভ গালিগালাজ শোনার জন্যই তো আমি অধীর আগ্রহে ওয়েট করি। ইউ নো হোয়াট, এই বিয়ে বাড়ির এত নয়েজের মধ্যেও আপনার এই ত্যাড়া কন্ঠস্বরটা আমার কানে একদম ডিফরেন্টলি টিউন করে। সো, ডোন্ট স্টপ ইয়োর লাইভ পারফরম্যান্স, আই্যাম অলরেডি আ ফ্যান!”
মেহসানা রাগে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে ইতিমধ্যেই। ও হাতের কাটার চামচটা আদ্রিয়ানের দিকে উঁচিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“লিসেন টু ম্যি ভেরি কেয়ারফুলি মিস্টার ল্যাম্পপোস্ট! আর একটাও ফালতু কথা বললে এই চামচ দিয়ে আপনার ওই ব্রিলিয়ান্ট ল্যাপটপের বারোটা বাজিয়ে দেব, আন্ডারস্ট্যান্ড? জাস্ট গেট লস্ট ফ্রম হেয়ার!”
আদ্রিয়ান দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে বাঁকা হেসে বলল,
“ওকে, ওকে, কাম ডাউন মাই লেডি ডন! ল্যাপটপটা আমার জান, সো এটার ওপর দয়া করুন। আমি যাচ্ছি, বাট রিমেম্বার… আপনি যতই ঝগড়া করুন না কেন, এই ল্যাম্পপোস্ট কিন্তু আপনার এই হাই-ভলিউম সাউন্ড ছাড়া একদম ব্লাইন্ড। সো, কিপ ইট আপ!”

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৩

বলেই আদ্রিয়ান এক চিলতে দুষ্টু হাসির আভাস মুখমন্ডলে বিদ্যমান রেখেই পা বাড়াল ‌ড্রয়িংরুমের উদ্দেশ্যে। মেহসানা ওর প্রস্থানপথের দিকে তাকিয়ে রাগে পা ঠুকে বিড়বিড় করল,
“ড্যাম ইট! এই লোকটার সাথে আমি কোনোদিন তর্কে জিততে পারব না! আস্ত একটা ইডিয়ট!”

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৫