এক দেখায় পর্ব ১৯
সুরভী আক্তার
রাফির ডাকে দরজা একটু ফাঁক করে মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দেয় রুহি । রাফি ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় । রুহি ভ্যাবলার মত ফ্যাল ফ্যাল করে একটু হাসে । রাফি গম্ভীর কন্ঠে ডাকে…
” বাইরে থেকে ওমন উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছিস কেনো ? ভেতরে আয় !
অনুমতি পাওয়া মাত্রই সবেগে ভেতরে ঢোকে রুহি । ভাইয়ার সামনে এসে পেছনে হাত গুটিয়ে সরু চোখে ভাবুক ভঙ্গিতে পর্যবেক্ষণ করে তাকে । রাফি ফোনে কিছু একটা দেখছে । ফোন থেকে চোখ সরিয়ে রুহির পানে সম্পুর্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল…
” কি হয়েছে,, কি দেখছিস ওভাবে ?
রুহি বড়দের মতো ভাব নিয়ে জবাব দেয়…
” দেখছি তুমি আসলেই বড় হয়ে গেছো ।
রাফি ভ্রু দুখানা বেশি করে কুঁচকে ফেলে । ভাইয়ার দৃষ্টি দেখে রুহি খাটের উপর বসতে বসতে মেকি স্বরে বলে…
” আমার সেই ছোট্ট গুলু’মুলু ভাইয়াটা আজ এতো বড় হয়ে গেল – যে তার জীবনে একটা মায়াবতী জুটিয়ে ফেললো আর আমি জানতেও পারলাম না ।
” কি সব বলছিস ?
” ঠিকি তো বলছি ,, তুমি এতো বড় একটা পদক্ষেপ নিয়ে ফেললে আর আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ টুকুও করলে না । আমি কিন্তু কষ্ট পেলাম ভাইয়া…
নাক টেনে টেনে কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে কথা গুলো বলে রুহি । রাফি বিরক্তি প্রকাশ করে খানিক । কন্ঠ ভার করে বলে…
” দিন দিন শান্তর মতো হচ্ছিস ? সহজ ভাবে কথা বলতে পারিস না ?
রুহি তড়িৎ বেগে খাট থেকে উঠে দাঁড়ায় । হাত নেড়ে বাঁধ সেধে বলে…
” আরে না বাবা, আমি কেনো ওনার মতো হতে যাবো ।
একটু থেমে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে…
” আচ্ছা ভাইয়া একটা কথা বলবো ?
রাফি ফোনের দিকে তাকিয়েই রাশভারী কন্ঠে বলল….
” হাজারটা বল ।
রুহি মুচকি হাসে । ভাইয়ার পাশে গিয়ে দুরত্ব বজায় রেখে বসে । ভাইয়ার দিকে ঘুরে কোমল স্বরে প্রশ্ন করে…
” ভাইয়া তুমি কি আমার পাখি কে পছন্দ করো..?
আচমকা রুহির এমন প্রশ্নে তব্দা খায় রাফি ।
রুহির প্রশ্নে তৎক্ষণাৎ জবাব দেয় না রাফি । ফোনের দিকেই তাকিয়ে থাকে , তবে মনযোগ নেই তার । মিহি নাম আর রুহির এমন প্রশ্ন দুটোই রাফির শান্ত চিত্তে তোলপাড় চালানোর জন্য যথেষ্ট । রাফি শুল্ক ঢোক গেলে । রাফির উত্তর না পেয়ে রুহি ঠোঁট উল্টে আবারো বলে…
” কি হলো ভাইয়া,, বলো ? তুমি কি আমার পাখি কে পছন্দ করো ? আমার পাখি কি তোমার সেই মায়াবতী ?
রাফি সময় নিয়ে ক্ষীন স্বরে আলতো বাক্য উচ্চারণ করে …
” হুম !
রাফির এই ছোট্ট উত্তরেই লাফিয়ে ওঠে রুহি । খুশিতে গদগদ হয়ে বলে…
” সত্যি ভাইয়া,, তার মানে তুমি আমার পাখি কে বিয়ে করবে, ও আমার ভাবি হবে ?
রাফি মুচকি হাসে । রুহি আগে থেকেই অনেক বার মিহির দিক থেকে রাফি কে লক্ষ্য করেছে । মিহিকে আবেশিত কন্ঠে আপনি বলে সম্বোধন করা, ম্যাডাম বলে ডাকা , সবকিছুই লক্ষ্য করেছে রুহি । সেইদিন সকালে রাফি আর মিহিকে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কথা বলতেও শুনেছে রুহি, তবে ডিস্টার্ব করে নি । রুহি রাফি কে চেনে,,যে ছেলে কখনো কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায় নি, মেয়েদের এড়িয়ে চলতো, সেই ছেলে মিহির দিক থেকে একদম আলাদা ছিল ।
রুহি জানতো রাফি কখনো রুহিকে মিথ্যে কথা বলবে না । হাজারো কঠিন সত্য দোটানা হীন স্বীকার করে নেওয়ার ক্ষমতা আছে রাফির ।রাফি মিথ্যে বলে না । তাইতো রুহি অনেক ভেবে চিন্তে রাফি কে আজ এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছে ।
রুহি খুশিতে দুহাত মেলে এক চক্কর ঘুরে নেয় । রাফির দিকে ঘুরে বলে…
” জানো ভাইয়া, আমার পাখির মতো দুটো মেয়ে হয় না ,, ওকে দেখলেই না আমার অনেক আপন লাগে, ওকে দেখলেই না কেমন ভাবি ভাবি ফিল হয় । আমি খুব করে চাইতাম যে ও আমার ভাবি হোক ।
জানো আমি কত্ত খুশি, আমি জানতাম তুমি ওকে পছন্দ করো । ও আমার ভাবি হবে ভাইয়া ,, আমি ওকে সব সময় কাছে পাবো ।
বোনের কান্ড দেখে রাফি ঠোঁট টিপে হাসে । রুহি আবারো বলে…
” জানো ভাইয়া, তুমি সেই দিন রাতে বললে না , যে তোমার একজন মায়াবতী আছে । তুমি জানো – মিহি ভেবেছিল সত্যি সত্যি তোমার জীবনে কেউ আছে । ও বেচারি তো জানেই না যে – ও নিজেই সেই মায়াবতী ।
রাফি ভ্রু কুঁচকে আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে…
” মানে ? ওর ভাবনার কথা তুই কি করে জানলি ?
” আরে, সেই দিন হসপিটালে ও আমাকে বলছিল যে – তোমার হাতের এই খামচির দাগ দেখলে নাকি আমার ভাবি ব্যাকুল হয়ে পড়বে । তখন জানতে পারলাম, যে তোমার সেই দিনের ঐ কথাটাকে ও সত্যি সত্যি ভেবে নিয়েছিল । তবে এখন ওর এই ভুল ধারণা মিটে গেছে ।
বোনের কথা মনযোগ দিয়ে শোনে রাফি । ভারী শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে….
” তাহলে এই কারনেই ম্যাডাম আমাকে এড়িয়ে চলছিলেন । এবার বুঝতে পারলাম , মেহজাবিনের বিয়ের পর থেকে কেনো উনি আমাকে এভয়েড করেছিলেন ।
এদিকে রুহি বকবক করতেই আছে….
” ভাইয়া আমি আজ থেকে ওকে ভাবী বলেই ডাকি ? প্লিজ !
” হুম… তোর ইচ্ছে , মজার ছলে ডাকতেই পারিস । তবে হ্যাঁ ও যেন এসব বিষয়ে কিছু না জানে ।
” কেনো ?
” এমনি,, সময় হলে সব হবে । তবে এখন নয় ।
রুহি একটু চুপ থাকে । কথা ঘুরিয়ে নিচু স্বরে মিনমিন করে বলে…
” ভাইয়া , কালকে ১৮ ই জুলাই ,, পাখির বার্থডে । আমি কি কালকে কোচিংয়ে যাবো ?
রাফি বরাবরের মতো চুপ থেকে খানিক বাদে উত্তর করে…
” যাবি,, তবে আমি গিয়ে রেখে আসবো , আর নিয়েও আসবো ।
রুহি আর কিছু বলে না । মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ।
রাত ১১ টা পেরিয়েছে । বিকেলে একটু ঘুমানোর কারনে চোখে ঘুম নেই মিহির । সেই তখন থেকে আধশোয়া হয়ে ফেসবুক স্ক্রল করে যাচ্ছে । বিরক্ত ধরে যাচ্ছে মাঝে মাঝে । মিহি কপাল কুঁচকে বিরক্তি নিয়েই ফোন স্ক্রল করছে । এছাড়া আর কিছু করার নেই । আব্বু অসুস্থ , অন্য সময় হলে আব্বুর কাছে গিয়ে আব্বুর কোলে মাথা রেখে গল্প জুড়ে দিতো । তবে এখন সেটা হচ্ছে না । সাবিনা বেগমও ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে গেছেন হয়তো ।
তাই কাউকে বিরক্ত না করে নিজে নিজেই বিরক্তিকর সময় কাটাচ্ছে ।
হঠাৎ সময়ের দিকে নজর দেয় মিহি । ১১ টা বেজে ৫৮ মিনিট । অমনি হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে সে । আর মাত্র দুই মিনিট , তারপর ১৮ বছরের অষ্টাদশী যুবতী হয়ে যাবে সে ।
মিহির মনে একটু ভালো লাগা জাগরণ ঘটে । প্রত্যেক বছর আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগম জন্মদিনে নতুন নতুন ভাবে সারপ্রাইজ দেয় মিহি কে ।
ঠিক ১২ টায় মেয়েকে আশ্চর্য করে দেন তারা ।
মিহি আজ জেগেই আছে , মিহি দেখতে চায় আজ আব্বু আম্মু ওকে কিভাবে সারপ্রাইজ দিতে আসে । পাশে ফোন রেখে খাটের উপর গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ে মিহি । চোখ দুটো আধো খোলা । ঘরে ডিম লাইটের আলোতেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সবটা ।
ঠিক ১২ টায় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকেন আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগম । মুখে ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’ বলতে বলতে হাতে জলন্ত মোমবাতি সমেত কেক নিয়ে খাটের পাশে এসে দাঁড়ান তারা । লাইট জ্বালাতেই মিহি এক ঝটকায় শোয়া থেকে খাটের উপর উঠে দাঁড়ায় । মুখে প্রফুল্ল হাসি । আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগম আচমকা মেয়ের কান্ডে অবাক হয়ে মাথা উঁচিয়ে দেখছেন মেয়ে কে । তাদের দৃষ্টি দেখে মিহি মুখে হাসি রেখেই কোমরে হাত রেখে ভ্রু যুগল নাঁচায় । আজমাল হোসেন বলেন…
” এটা কি হলো আম্মু , তুমি ঘুমাও নি ?
” উহুম… তোমাদের অপেক্ষাতেই ছিলাম । আব্বু আজ আমার বার্থডে,, আমার ১৮ বছরের বার্থডে, তুমি জানো আমি কতো খুশি ?
উচ্ছ্বাসিত স্বরে কথা গুলো বলে খাট থেকে এক লাফে নিচে নামে মিহি । আব্বু আম্মুর মাঝখানে গিয়ে দু’জনের কাঁধ জড়িয়ে বলে…
” মাই ডিয়ার লাভ বার্ডস,,আই মিন আব্বু আম্মু তোমাদের মেয়ে কিন্তু বড় হয়ে গেছে , আজ থেকে তার ১৮ বছরের পূর্ণতা পেল । আমাকে কিন্তু আর ছোট ভাববে না বলে দিলাম । আজ থেকে আমি স্বাধীন, আমাকে কিন্তু কোনো কিছুতে আটকালে চলবে না ।
আজমাল হোসেন হাতের কেকটা খাটের উপর রাখেন । রেখে মেয়ের দিকে ঘুরে বলেন…
” সত্যি তো , আমার আম্মু টা বড় হয়ে গেছে । এবার তো আমার দায়িত্ব বেড়ে গেলো । বিয়ে দিতে হবে না আমার মেয়েকে, কি বলো সাবিনা ?
মিহি ভ্রু কুঁচকে নাক ফুলিয়ে বলে…
” আবার শুরু করলে আব্বু ,, আমি কিন্তু বিয়ে-টিয়ে এসব কিছু করবো না । তোমাদের ছেড়ে কখনো কোথাও যাবো না আমি ।
সাবিনা বেগম মুচকি হাসেন বাবা মেয়ের খুনসুটি দেখে ।
” আমি কি ভেতরে আসবো, নাকি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো ?
পরিচিত কন্ঠে সবাই একসাথে দৃষ্টিপাত করে দরজার দিকে । সাফি দাঁড়িয়ে আছে । একহাতে বড় একটা ফুলের বুকে, অন্যহাতে বড় সাইজের একটা গিফট বক্স । সাবিনা বেগম আর আজমাল হোসেনের সাথে সাফিও এসেছিল মিহিকে সারপ্রাইজ দিতে । তবে ঘরে ঢোকে নি সে । এতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে সবাইকে দেখছিলো ।
সাফি কে দেখে অস্বস্তিতে পড়ে যায় মিহি । মিহির পড়নে একটা ঢিলে ঢালা টিশার্ট আর ট্রাওজার । বাসায় ঘুমানোর সময় এসব পড়েই ঘুমায় মিহি । গায়ে ওরনা নেই । এমন অবস্থায় অপরিচিত একটা ছেলের সামনে যাওয়া অস্বস্তিকর । যদিও সাফি এখন আর অপরিচিত নয় । মিহির সাথে এখন বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ওর । সাফির উপর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই মিহির ।
মিহি উদ্বেগ সঞ্চারি হয়ে আব্বুর পেছনে একটু আড়াল হয় । খাটের পাশ থেকে ওরনা নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নেয় ।
আজমাল হোসেনের অনুমতি পাওয়া মাত্রই সাফি বরাবরের মতো প্রাণবন্ত হেসে ভেতরে ঢোকে । মিহির দিকে ফুলের বুকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে….
” Happy birthday মিহি,, জন্মদিনের অনেক অনেক অনেক বেশি শুভেচ্ছা ।
মিহি অপ্রস্তুত হেসে ফুলের বুকে হাতে নেয় । মুখে বলে…
” Thank you…
সাফি অপর হাতের গিফটের বক্সটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে…
” এটা আমার পক্ষ থেকে ছোট্ট একটা উপহার ।
মিহি ফুলের বুকে খাটের উপর রেখে বক্সটা হাতে নেয় । বক্সটা বেশ বড় ,, উচ্চতায় মিহির কোমর পর্যন্ত । তবে ভারী নয় । আজমাল হোসেন গিফটের বক্সটা দেখে বলেন….
” কি বলো বাবা,, এটা কি ছোট্ট উপহার নাকি ? এতো বড় বক্স..!
সাফি হাসে । সাবিনা বেগম বলেন…
” হয়েছে, এসব বাদ দিন । এখন তো কেক কাটতে হবে নাকি , সেই কখন ১২ টা পেরিয়েছে ।
সাবিনা বেগমের কথায় নড়েচড়ে ওঠে সবাই । একটা ছোট টেবিলের উপর কেক রাখা হয় । মিহি মোমবাতি নিভিয়ে কেক কাটে । সবার প্রথমে খাইয়ে দেয় আব্বু কে , তারপর আম্মু কে । আজমাল হোসেন মেয়ের গলায় একটা স্বর্নের চেন পড়িয়ে দেন । মিহি খুশি হয়ে আব্বু কে জড়িয়ে ধরে । সামনে ফোন ক্যামেরা বের করে সাফি বলে…
” অ্যাটেনশন প্লিজ , সবাই স্মাইল করো….
মিহি মাঝখানে দাড়িয়ে আব্বু আম্মুকে জড়িয়ে ধরে । তিন জনের সুখি পরিবারের একটা সুন্দর হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্ত বন্দি হয় ফোনের ক্যামেরায় ।
এখন ঘড়িতে প্রায় ১ টা ১০ । মিহি ওয়াশ রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে খাটে এসে বসে । সাবিনা বেগম আর আজমাল হোসেন নিজেদের ঘরে চলে গেছেন । সাফিও চলে গেছে নিজের বাড়ি । মিহি কেবল ফ্রেশ হয়ে বসলো । সময় দেখার জন্য ফোনটা হাতে নিতেই পিলে চমকে ওঠে মিহির । ৫৭ টা মিসড কল । সব রুহির নাম্বার থেকে । মেসেজ ও এসেছে অনেক । নাদিয়া, সোহেল,রৌনক, মিরা আরো অনেক বন্ধু-বান্ধবীরা মেসেজ করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে মিহিকে । রুহি ও অনেক মেসেজ করেছে । সাথে একের পর এক ফোন কল । মিহির ফোন সাইলেন্ট থাকায় লক্ষ্য করে নি মিহি । এতক্ষণ ধ্যানেও আসে নি এই বিষয়ে ।
মিহি ফোন হাতে নিয়েই তড়িঘড়ি করে রুহির নাম্বারে ফোন লাগায় । প্রথম বার রিসিভ হয় না । মিহি আবারো ডায়াল করে । পরের বার কয়েক বার রিং হতেই রিসিভ হয় ফোন । তবে ফোনের ওপাশ থেকে কেউ কথা বলছে না । শুধু ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে ।
মিহি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে…
” Sorry পাখি ,, আমি দেখতে পাই নি তুই ফোন করেছিলি । আমার ফোন সাইলেন্ট ছিল , তাই বুঝতে পারি নি । তুই এতো বার কল করেছিস, আমি ধরতে পারি নি, আই এম সরি জান….
” আপনার পাখি আপনার উপর রাগ করে ঘুমিয়ে পড়েছে , আমি আপনার পাখির ভাইয়া বলছি ।
রাফির নরম শীতল ঘুম জড়ানো আবেশীত কন্ঠে মৃদু শিহরণ খেলে যায় মিহির শরীরে । বক্ষ স্থল ধক্ করে ওঠে । গায়ের লোম অবধি দাঁড়িয়ে যায় । নিঃশাস আটকে যায় । মিহি চোখ বন্ধ করে তৎক্ষণাৎ । দম খিচে রাখে । ফোনের ওপাশ থেকে আর কেউ কিছু বলছে না । শুধু ভেসে আসছে গুমোট ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ । মিহি কোথাও একটা দেখেছিলো – সম্ভবত পুরুষের ঘুম জড়ানো কন্ঠ নেশা’কেও হার মানায় । আজ মিহি সেটা নিজেই অনুভব করলো । সব পুরুষের ঘুম জড়ানো কন্ঠ এমন হয় বুঝি ?
এতোটা আবেশিত ? মিহি শুল্ক ঢোক গেলে । কেউ কোন কথা বলছে না । ফোনের ওপাশেও নীরবতা । শুধু শোনা যাচ্ছে রাফির কম্পিত ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ । কিছু মুহূর্ত এভাবেই কেঁটে যায় । অবশেষে নীরবতা ভেঙে ফোনের ওপাশ থেকে আবারো মাদকীয় স্বরে রাফি বলে…
” কি হলো ম্যাডাম ? কোথায় হারিয়ে গেলেন ? এতো রাতে আমার ঘুম উড়িয়ে দিয়ে নিজে ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি ?
মিহির শরীরে পুনরায় শিহরণ বয়ে যায় । হাতের তালু ঘামছে মিহির । মিহি তপ্ত শ্বাস টেনে ক্ষীন স্বরে বলে….
” রু..রুহি কোথায় ? ও..ওর ফোন আপনার কাছে কেনো ?
” আপনার বান্ধবী ঘুমিয়ে পড়েছে । ওর ফোনটা আমার ঘরে রেখে গেছিলো ।
” ওও আ…আচ্ছা…. তা.. তাহলে রাখি…
কোনো রকমে কথাটা বলে মিহি কান থেকে ফোন নামায় । তবে ফোন কাঁটার আগেই আবারো রাফির সেই বিমোহিত কন্ঠ ভেসে আসে…
” শুনুন….
মিহি চোখ বন্ধ করে রেখেই আবারো ফোন কানে লাগায় । রাফির প্রতিটা শ্বাস প্রশ্বাস অবধি শুনতে পারছে মিহি । মিহি কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে…
” হুম.. বলুন….
রাফি উবু হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ রেখেই মৃদু হাসে । সেই একই স্বরে বলে…
” শুভ জন্মদিন…
মিহি চোখ খোলে । মিষ্টি হেসে বলে…
” ধন্যবাদ….
” শুধু ধন্যবাদ..?
এতো রাতে আমার ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলেন যে,, এর বিনিময়ে আপনার শাস্তি স্বরূপ কিছু পাওয়ার নেই আমার ?
মিহি খানিক চুপ থাকে । নিজেকে স্বভাবিক করে, বলে…
” আমার জন্মের এই দিন টা আপনাদের জন্য সুখের নয় । ১৮ ই জুলাই কাল ,, আপনারা নিশ্চয়ই এই দিনেও বাইরে বের হন না, আর রুহিকে ও নিশ্চয়ই বের হতে দেন না । আমার পক্ষ থেকে আপনাদের ট্রিট’টা পাওনা রইলো , পরের দিন দিয়ে দেবো ।
মিহির উহ্য অভিমানী কন্ঠে রাফি ঘুম জড়ানো বন্ধ চোখ দুটো খোলে । মিহি আবারো বলে…
” সরি আপনার ঘুম ভাঙানোর জন্য ,, এখন রাখি..?
” মিহি….
কান থেকে ফোন নামানোর আগে রাফি ডাকে মিহিকে । মিহি থমকায় । রাফি মিহির নাম সম্মধন করে খুব কম ডাকে । এতদিনে রাফির মুখে নিজের নাম খুব কম শুনেছে মিহি । শুনেছে হাতে গোনা কয়েকবার । মিহি ভেজা কন্ঠে বলে…
” জ্বি বলুন….
” সেই দিনের আমার ঐ বিহেভিয়ার এর জন্য আপনি এখনো রেগে আছেন আমার উপর ?
মিহি হাসার চেষ্টা করে । স’শব্দে উত্তর দেয়…
” আপনার উপর রেগে থাকার কোনো কারণ নেই । আর না আমি রেগে আছি ।
আর আপনার উপর রাগ বা অভিমান করার কোনো অধিকারো আমার নেই ।
কথাটা বলেই চুপ করে মিহি । রাফি কিছু বলছে না । মিহি আগ বাড়িয়ে বলে…
” রাখি…?
” হুম..!
রাফির ছোট্ট উত্তরেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে ফোন কেটে দেয় মিহি । ফোনটা খাটের এক কোনে ছুড়ে মারে । কিছু মুহূর্ত বসে থাকে একই ভঙ্গিতে । তারপর জড়োসড়ো হয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে ।
পরদিন আবারো সোমবার । আজমাল হোসেন এখন সুস্থ । অফিসের ছুটি ও শেষ । মিহির জন্মদিন হওয়ায় সাবিনা বেগম আর মিহিকে নিয়ে একটু ঘুরতে যেতে চেয়েছিলেন আজমাল হোসেন । এরমধ্যে মিহির সাথে রুহির কথা হয় নি আর । মিহি ভেবেছিল রুহি হয়তো আজকে কোচিংয়ে আসবে না । তাই আব্বু আম্মুর সাথে ঘুরতে যেতে চেয়েছিল মিহি । কিন্তু দুপুর দুটোর আগে কোচিং থেকে বাধ্যতামূলক ডাকা হয় সবাইকে । কোচিং ছুটি চার টায় । কোচিং শেষে আব্বু আম্মুর সাথে ঘুরতে যাবে এই ভেবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোচিংয়ে এসেছে মিহি ।
মিহি জানে আজকে রুহি কোচিংয়ে আসবে না । মুখ ভার করে একা একা কোচিংয়ে ঢোকে মিহি । ক্লাসে এসেই চোখ যায় রুহির দিকে । রুহি বসে আছে । মিহিকে দেখে উঠে এসে জড়িয়ে ধরে রুহি বলে…
” Happy birthday, Pakhi , Many Many Many happy returns of the day Jan .
মিহি অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে আছে । রুহি মিহিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে…
” কি রে , কি হলো ? রাগ করেছিস ? জানিস আমি ১২ টার পর তোকে কতবার ফোন করেছি , কতো গুলো মেসেজ করেছি ।
” আজকে তুই বাড়ি থেকে বের হয়েছিস ? তোকে আসতে দিয়েছে ?
” কেনো আসতে দেবে না , ভাইয়া নিজে আমাকে নিয়ে এসেছে ।
বাড়িতে কেউ নেই । সবাই অনাথ আশ্রমে গেছে সবার জন্য খাবার আর কাপড় বিতরণ করতে । জানিসই তো ।
আমি বাড়িতে একা একা বোর হচ্ছিলাম,তাই ভাইয়া নিয়ে আসলো আমাকে ।
” ওও আচ্ছা ।
” হুম…
চল এখন বাইরে যাই…
” কেনো, ক্লাস করবি না ?
” আজকে তো তেমন ক্লাস নেই , আমাদের শিফটের ক্লাস আজ সকালেই শেষ হয়ে গেছে । দেখ, আমাদের ক্লাসের কেউ নেই এখানে…
মিহি সবার দিকে তাকিয়ে দেখে । ওদের ক্লাসের কেউ নেই এখানে । রৌনক, মিরা, নাদিয়া সোহেল বাদবাকিরা কেউ নেই । মিহি কপাল কুঁচকে বলে…..
” তাহলে ফোন করে জানানো হলো কেনো, যে আজকে ইমপরটেন্ট ক্লাস আছে ? আর তুই বা তাহলে এসেছিস কেনো ?
” আমি তো তোর জন্য এসেছি, আজ আমার পাখির জন্মদিন আর আমি আসবো না ?
শুধু আমি নোই , উনি আর ভাইয়াও এসেছে । বাইরে আছে , চল….
মিহি কিছুই বুঝতে পারে না । অবুঝের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রুহির পানে । রুহি মিহিকে নিয়ে কোচিং থেকে বের হয় । বাইরে বড় একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে । রাফির গাড়ি । ভেতরে ঢোকার সময় গাড়িটা দেখেছিল মিহি , তবে অতটা লক্ষ্য করে নি ।
কালো রোদ চশমা পড়ে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে দুই যুবক ।
দুই জনের পড়নেই লেদার সুট। মিহির হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে ওদের সামনে দাঁড়ায় রুহি । মিহি গম্ভীর মুখে চোখ তুলে তাকায় । চশমার আড়ালে তাদের দৃষ্টি বোঝা যাচ্ছে না । মিহি চোখ নামিয়ে নেয় । শান্ত হেলান দেওয়া থেকে উঠে গাঁ ঝেড়ে বলে…
” Happy birthday আমার জানের Pakhi,, জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ।
মিহি মুচকি হেসে বলে…
” Thank you ভাইয়া ।
রাফি গম্ভীর স্বরে বলে….
” গাড়িতে বসো সবাই ।
মিহি রুহির দিকে ঘুরে বলে….
” আমাকে বাসায় ফিরতে হবে পাখি । আমি যাই ..?
” যাবি মানে ?
হুম যাবি, তবে আমাদের সাথে । চল , গাড়িতে বস ।
” কিন্তু কোথায় যাবো আমরা ?
” গেলেই দেখতে পাবি ।
রুহি মিহির হাত ধরেই গাড়িতে গিয়ে বসে । মিহি আর কোন কথা বলে না । মিহির মুখে হাসি নেই । আর না রাফি কে একবারও দেখেছে ও । চশমার আড়াল থেকে এক দৃষ্টিতে মিহিকে দেখছিল রাফি । মিহির এই গোমড়া মুখ মোটেই সহ্য হচ্ছে না ওর ।
রাফি ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে । গাড়ি স্টার্ট দেয় । বেশ কিছু সময় পর গাড়ি থামে কোথাও একটা । এতক্ষণ গাড়িতে ছিল পুরোপুরি নীরবতা । কেউ একটা কথাও বলে নি । সব সময় পকর পকর করে প্যাঁচাল পারা শান্ত ও চুপ ছিল । গাড়ি থামতেই শান্ত নেমে পড়ে সবার আগে । শান্ত কে দেখে রুহিও নেমে পড়ে । পিছু পিছু নামে মিহি । মিহি এদিক ওদিক তাকায় । জনবসতিহীন ফাঁকা একটা এলাকা । একেবারে জনবসতি হীন নয় , তবে জনবসতি কম । সামনে প্রাচিরে ঘেরা বিশাল জায়গা নিয়ে একটা আশ্রম । অনাথ আশ্রম । আশ্রমের বিশাল লোহার গেট খুলে যায় মুহূর্তেই ।
রাফি গাড়ি পার্ক করে এসে দাঁড়িয়েছে ওদের সাথে । মিহি বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । রুহি মিহির হাত ধরে বলে…..
” চল ভেতরে….
একসাথে ভেতরে পা বাড়ায় চারজনে । চার তলা ভবনের একটা আশ্রম ।
পুরো ভবন বাচ্চাদের কোলাহলে পরিপূর্ণ । ভিতরের বিশাল স্পেস জুড়ে ফুলের বাগান । কয়েক জন মালি গাছের গোড়া খুঁড়ে মাটি উর্বর করছেন ।
অনেক ছোট ছোট বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে মাঠে । খেলছে তাঁরা । তাঁরা অনেকেই সমবয়সী । কেউ কেউ বড় , তাদের দল আলাদা ।
মিহি নিষ্ক্রিয় চোখে আশেপাশে ঘুরে ফিরে দেখতে থাকে । আনমনে হাসি ফুটে ওঠে মিহির মুখে ।
আচমকা বাচ্চাদের খেলার একটা বল গড়িয়ে এসে পড়ে মিহির পায়ের কাছে । বলের পেছনে ছুটে আসে একটা বাচ্চা । বয়স হবে সাত কি আট । মিষ্টি একটা ফুটফুটে বাচ্চা । যার কেউ নেই , আছে কি না জানা নেই । থাকলে নিশ্চয়ই তাকে এখানে রেখে যেত না ।
মিহি নিজ হাতে বলটা কুড়িয়ে বাচ্চাটার হাতে দেয় । বল হাতে পেতেই মন জুড়ানো কোমল হাসে বাচ্চাটা । আবারো ছুটে যায় বল নিয়ে । মিহি আশেপাশে নজর বোলানোর মাঝেই দেখতে পায় জেনি কে । বাচ্চাদের সাথে খেলছে ও । মিহি রুহির দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে বলে….
” জেনি..?
রুহি উপর নিচ মাথা নাড়ায় । মিহির হাত ধরে সামনে এগোতে এগোতে বলে….
” আরো আছে… চল….
মিহিকে নিয়ে যাওয়া হয় ভবনের নিচ তলার একটা কক্ষে । ঘরে প্রবেশ করতেই থমকে যায় মিহি । এই ঘরে চৌধুরী পরিবারের সবাই আছে – রাশেদ রায়হান চৌধুরী, জুবায়ের চৌধুরী , আফসানা বেগম, হেনা বেগম, হালিমা বেগম, জাকির হোসেন, সবাই আছেন । মেহজাবিন আর মাহিম’ ও আছে সবার সাথে । মিহি ঘরে ঢুকতেই সবাই তাকায় দরজার দিকে । সবার চোখ গুলো ভেজা ।
পাশে একটা সোফায় পা তুলে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন রাবেয়া চৌধুরী । রাফি কে ঘরে ঢুকতে দেখেই সোফা ছেড়ে উঠে রাফির কাছে আসেন তিনি । রাফির হাত ধরে বলেন….
” আমি এখানে থাকবো না , আমাকে বাসায় নিয়ে চল । আমার মেয়েকে বাসায় একা রেখে এসেছি , ও তো ভয় পাবে । আমি আর থাকবো না এখানে । তুই এতো দেরি করে এলি কেনো ?
রাফি স্থির কন্ঠে বলে…
” বাসায় যাবো তো মামনি ! আর একটু শুধু অপেক্ষা করো ।
রাবেয়া চৌধুরী কিছু বলার আগে তার নজর যায় মিহির দিকে । মিহিকে দেখে তার চোখে মুখে খুশির ভাব স্পষ্ট ফুটে ওঠে । তিনি মিহির দিকে এগিয়ে মিহির মুখে আলতো হাত বুলিয়ে বলেন….
” তুই ও এসেছিস ? ভালো আছিস তুই ? তুই সবসময় আমার কাছে আসিস না কেনো বলতো ? জানিস, তোকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে ।
মিহি মিষ্টি হাসে । তবে চোখ দুটো করুন হয়ে আছে মিহির । মিহি বলে….
” আমি ভালো আছি আন্টি,, আপনি কেমন আছেন ?
” আমিও খুব ভালো আছি । আয় ভেতরে আয় ,, বস আমার কাছে….
রাবেয়া চৌধুরী মিহির হাত ধরে টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে যান । নিস্তেজ পায়ে এগিয়ে যায় মিহি ।
আচমকা মিহিকে জড়িয়ে ধরে মেহজাবিন । মিহি আবারো থমকায় । বুকটা কেঁপে ওঠে । গলা ভারী হয়ে আসে । মিহিকে জড়িয়ে ধরতেই মেহজাবিনের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে মিহির কাঁধে । মেহজাবিন সময় নিয়ে মিহি কে ছেড়ে চোখ মুছে ভেজা কন্ঠে বলে…
” শুভ জন্মদিন মিহি ,, ভালো আছো..?
আজ যদি আমার বোনটা বেঁচে থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই তোমার মতোই হতো ।
তাই না বড় মা ?
শেষের কথাটা হেনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে মেহজাবিন । হেনা বেগম চোখ মুছে মিহির কাছে এগিয়ে আসেন । মিহিকে জড়িয়ে ধরেন তিনিও । স্নেহ মাখা হাত বুলিয়ে ছুঁয়ে দেন মিহির পুরো মুখ । চুমু খান মিহির কপালে । কাঁপা গলায় বলেন….
” তোর ও আজ জন্মদিন মা ? জানিস আজ আমাদের মেয়ের ও জন্মদিন , কিন্তু ও আর নেই রে । এই দিনেই ও চলে গেছে নিজের আব্বুর সাথে ।
হেনা বেগম আবারো ফুঁপিয়ে ওঠেন । অজানা কষ্ট অনুভব হয় মিহির । গলা ভার হয়ে আসে । মিহি এতক্ষণ সামলেছে নিজেকে , তবে এখন আর পারলো না । ঠোঁট কামড়ে কেঁদে ওঠে মিহি । জাপটে জড়িয়ে ধরে হেনা বেগম কে । হেনা বেগমের কান্নার তোপ বেড়ে যায় এতে । পাশে ফুঁপিয়ে কাঁদছে রুহি আর মেহজাবিন । হালিমা বেগম আর আফসানা বেগম শাড়ির আঁচলে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন । পুরো ঘরে কান্নার রোল । রাবেয়া চৌধুরী পিটপিট করে অবুঝ নয়নে তাকিয়ে দেখছেন সবাইকে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর জুবায়ের চৌধুরী নিজেদের শক্ত রাখার চেষ্টা করেছেন । পুরুষ মানুষদের কাঁদতে নেই । শত কষ্ট বুকে চেপে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন তারা ।
মেহজাবিন সেই শুরু থেকে কেঁদেই যাচ্ছে । মাহিম আর সহ্য করতে পারছে না এটা । মাহিম মেহজাবিন কে নিয়ে ঘরে থেকে বেরিয়ে আসে ।
বাচ্চাদের কাছে নিয়ে যায় ওকে । নিজ হাতে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলে…
” ঐ দেখো কতগুলো বাচ্চা , ওদের তো কেউ নেই । না বাবা ,না মা , না ভাই , না বোন , আর না কোনো পরিবার । ওদের কষ্ট হয় না ?
মেহজাবিন ফুঁপিয়ে উঠে ,, তাকায় বাচ্চা গুলোর দিকে । পর মূহুর্তে মাহিমের দিকে । মাহিম মেহজাবিনের চোখের শুকনো পানি আবারো দুহাতে মুছে দেয় । মেহজাবিনের মুখ আগলে বলে…
” ওরা ওদের কষ্ট গুলো কি করে সহ্য করে বলোতো ? ওরা তো কত ছোট , মাসুম বাচ্চা । ওরা যদি ওদের কোমল হৃদয়কে মানাতে পারে, তাহলে তুমি কেনো পারছো না ? ওরা যদি সহ্য করতে পারে তাহলে তুমি কেনো পারবে না ?
মেহজাবিন কান্না আটকে বলে..
” আমি শুধু আমার বোন কে হারাই নি, আব্বু কেও হারিয়েছি , হারিয়েছি আম্মু কেও । কি পেয়েছি আমি বলো তো জীবনে ? সবাইকে পেয়েছি,, কিন্তু ওদের শূন্যতাও ছিল আমার মাঝে ।
আমি নিজে যদি সেই দিন ওদের সাথে থাকতাম, তাহলে হয়তো আমিও হারিয়ে যেতাম । এটাই ভালো হতো বলো ,, আর কষ্ট হতো না আমার ।
মাহিম মেহজাবিনের দুই ঠোঁটের মাঝখানে শাহাদাৎ আঙুল চেপে কথা আটকে দেয় । কপালের পাশের চুল গুলো কানের পাশে গুজে দিয়ে বলে….
” তুমি হারিয়ে গেলে আমি কাকে পেতাম ? কাকে ভালোবাসতাম আমি ?
আমি জানি না আমি তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি , কিন্তু এটা জানি আমি তোমাকে ভালোবাসি । আর যাকে ভালোবাসা যায়,তার চোখে কখনো পানি সহ্য করা যায় না মেহজাবিন । তোমার চোখের পানি সহ্য হয় না আমার । কেঁদো না প্লিজ ।
মেহজাবিনের চোখের কোনে আবারো পানি জমেছে, তবে মুখে আছে হাসি । চোখের কোনের পানি টুকু হাওয়ায় মিলিয়ে যায় । মাহিমের হাত শক্ত করে ধরে মেহজাবিন । মাহিম মুচকি হাসে । মাহিমের মোটা ফ্রেমের চশমায় রোদের এক টুকরো ঝিলিক এসে পড়ে । দুরে রোদের মধ্যেই বাচ্চাদের সাথে খেলছে জেনি । মেহজাবিন মুচকি হেসে মাহিমের হাত ধরে সেদিকে এগোয় ।
এদিকে ঘরের ভেতর কারোর কান্নার বেগ থামে নি এখনো । রাশেদ রায়হান চৌধুরী কাউকে একবারও কান্না থামাতেও বলছেন না । তিনি নিস্তেজ শরীরটা নিয়ে সোফায় বসে পড়েন ।
রাফি অনেকক্ষণ যাবত সহ্য করছে এসব । রাফির বুক ভার হয়ে আসছে , গলায় নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে । চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে বন্দি লাগছে । রাফি বড় বড় এলোমেলো পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য উদ্ধত হয় , দরজার পাশে মাথা নিচু করে কাঁদছে রুহি । রুহিকে দেখে রাফি ওর চিবুক ধরে মুখখানি উঁচু করে দেয় । বোনের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে ইশারা করে কান্না থামাতে । রাফি কথা বলতে পারছে না । দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে ।
রাফি বের হতেই রাশেদ রায়হান চৌধুরী শান্তকে উদ্দেশ্য করে বলেন…..
” রাফির কাছে যাও শান্ত , ওকে একা ছেড়ো না ।
শান্ত মাথা নেড়ে ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ায়, দরজার কাছে এসে রুহির চোখের পানি আবারো নিজ হাতে মুছে দেয় ও । তার পর ছুটে যায় রাফির পেছনে ।
ধীরে ধীরে শান্ত হয় ঘরের সবাই ।
চৌধুরী বাড়ি থেকে আশ্রমের বাচ্চাদের জন্য যেসব পোশাক নিয়ে আসা হয়েছিল, সব মিহির হাত দিয়ে বিলিয়ে দেওয়া হয় সবাইকে । প্রত্যেক বছর এই দিনটায় আশ্রমের সব বাচ্চাদের জন্য খাবার আর কাপড় নিয়ে আসা হয় চৌধুরী বাড়ি থেকে । এবছর ও তার ব্যতিক্রম হয় নি । একটু ব্যতিক্রম হয়েছে বটে , সেটা হলো মিহির হাত দিয়ে সবার মাঝে বিতরণ করা । মিহি নিজ হাতে আশ্রমের সব বাচ্চাদের খাবার পরিবেশন করেছে । এর মুল কারন হলো আজ এই দিনেই মিহির জন্মদিন হওয়া ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী নিজেই মিহির হাতে সবটা করার কথা বলেছিলেন ।
আশ্রমের সব কাজ মিটিয়ে আশ্রম থেকে বের হয় সবাই । বাইরে দুটো গাড়ি আর একটা বাইক । মেহজাবিন আর মাহিম বাইকে এসেছে । ওরা দুজনেই আজ চৌধুরী বাড়িতেই যাবে ।
গাড়িতে উঠে পড়েছে সবাই ।
মিহিকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে হলে আলাদা গাড়ির প্রয়োজন । এদিকে এতগুলো মানুষের জন্যেও দুটো গাড়ি প্রয়োজন ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী পরিস্থিতি বুঝে রাফি কে বলেন….
” রাফি, তুমি বাইকে করে মিহি মামনি কে ওর বাড়িতে পৌঁছে দাও । গাড়ি নিয়ে গেলে এতগুলো মানুষের একটা গাড়িতে যেতে অসুবিধা হয়ে যাবে । তার চেয়ে ভালো তুমি বাইক নিয়ে যাও , আমরা গাড়িতে যাচ্ছি । তোমার কোনো অসুবিধা নেই তো ?
রাফি আর শান্ত গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ছিল । আব্বুর কথায় ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে রাফি । মুখে বলে….
” ঠিক আছে আব্বু , অসুবিধা নেই । তোমরা যাও ।
” সাবধানে গাড়ি চালাবে ।
” জ্বি আব্বু ।
ছেলের সমিত আশ্বাসে রাশেদ রায়হান চৌধুরী গাড়িতে উঠে বসেন । তিনি চলে যেতেই শান্ত মুখ গোল করে রাফির কাঁধে হাত রেখে বলে…
” আরে বাহ্ , বাপ নিজেই ছেলের ইটিশ পিটিশের রাস্তা ক্লিয়ার করে দিচ্ছে । ভালো ভালো, আমারে তো আর কারো চোখে পড়ে না । তুই কি তোর বাপেরে দারাজ থাইকা অর্ডার দিছিলি নাকি Bro ? এমন বাপ কোই পাওয়া যায় ?
রাফি মুচকি হাসে, তবে শান্তর কথায় নয় । অন্য কিছু একটা ভেবে ।
শান্তর দিকে ফিরে মুখে বলে….
” আবার শুরু করলি ?
” হুম,, তবে যাই হোক – All the best,, Bro । কোন টিপস লাগলে আমার কাছ থেকে জেনে নিতে পারিস । তোর বোনের সাথে আমি অনেক ঘুরেছি বাইকে । অভিজ্ঞতা আছে বুঝলি , যদিও কেউ এমন সুযোগ করে দেয় নি আমাকে । তবুও তোর থেকে একটু হলেও এগিয়ে আছি আমি ।
রাফি ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তার পর আচমকা হেসে ওঠে । এতক্ষণ গম্ভীর মুখে ছিল রাফি । সেই যে আশ্রম থেকে বেরিয়েছে আর ভেতরে যায় নি । তখন থেকে গাড়ির ডিকির উপর পা ঝুলিয়ে মাথা চেপে ধরে বসে ছিল । রাফি কে হাসানোর জন্য কথাগুলো বলেছে শান্ত । অবশেষে এখন একটু হাসলো রাফি, সে যে কারনেই হোক, হাসলো তো । এতেই খুশি শান্ত । শান্ত চোখে চশমা লাগিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে । রুহি স্মিথ হেসে মিহিকে জড়িয়ে ধরে ।
গাড়িতে আগেই উঠে পড়েছে সবাই । গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দুটো গাড়িই নিমিষেই ধুলো উড়িয়ে চোখের আড়াল হয়ে যায় ।
মিহি একপাশে দাঁড়িয়ে আছে, কাঁধে ব্যাগ । রাফি বাইক স্টার্ট দিয়ে ওর সামনে এসে থামে ।
মাথায় হেলমেট । মিহি চোখ তুলে তাকায়, রাফি হেলমেটের আড়ালে মুচকি হাসে । মিহির দিকে আরো একটা হেলমেট এগিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে….
” এটা পড়ে নিন ।
মিহি হেলমেট হাতে নেয় । নাক সিটকে এদিক ওদিক উল্টে পাল্টে দেখে । আবার রাফির দিকে চোখ কুঁচকে তাকায় ।
নিজে নিজেই হেলমেট মাথায় ঢোকানোর চেষ্টা করে, তবে ঠিক মতো পারছে না । রাফি কিছু না বলে নিজেই হাত বাড়িয়ে যত্ন সহকারে মিহির মাথায় হেলমেট পড়িয়ে দেয় ।
মিহি পিটপিট করে তাকিয়ে আছে । রাফি বলে…
” বসুন…!
মিহি মাঝখানে দুরত্ব বজায় বাইকে উঠে বসে । রাফি কে একবারের জন্যও ছোঁয় না পর্যন্ত । দুজনের মাঝখানে বেশ অনেকটা দুরত্ব । মিহি কোন রকমে বাইক ধরে বসে আছে । রাফি বাইকের মিররে মিহিকে দেখে বলে…..
” ভালো করে ধরে বসুন , পড়ে গেলে আমার ক্ষতি হবে না নিশ্চয়ই । আপনারি ক্ষতি হবে, পরে আমাকে দোষারোপ করতে পারবেন না কিন্তু ।
রাফির কথায় মিররের দিকে তাকায় মিহি । চোখাচোখি হয় দুজনের । হেলমেটের আড়ালে মিহির সমস্ত মুখ ঢেকে আছে,, ভেসে আছে শুধু ওর টানা টানা চোখ দুটো ।
মিহি দুরত্ব ঘুচে একটু কাছাকাছি বসে । তবুও রাফি কে ধরে বসে না ।
রাফি মিররের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বাইক স্টার্ট দেয় ।
আচমকা টাল সামলাতে না পেরে মিহি হুমড়ি খেয়ে রাফির পিঠের উপর । অমনি আঁকড়ে ধরে রাফিকে । রাফির কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে । রাফি ক্রুর হেসে বলে….
এক দেখায় পর্ব ১৮
” সমস্যা না থাকলে আমার কাঁধে হাত রাখতে পারেন । ধরে বসুন আমাকে । নয়তো পড়ে যাবেন….
মিহি খানিক অপ্রস্তুত হলেও রাফির কাঁধ থেকে আর হাত সরায় না । বরং দুরত্ব বজায় রেখে হলেও একটু করে ধরে বসে ।
