Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬ (২)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬ (২)

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬ (২)
সাঞ্জেনা শাজ

কৃত্রিম আলোয় রাতের আধার ছাপিয়ে এক মায়াবী, অথচ নিষ্ঠুর আলো-আঁধারির খেলায় মেতেছে তালুকদার বাড়ির ছাদটা আজ। অনুষ্ঠানের উদ্দ্যেশ্যে সেট করা নিচের নিয়ন আলোগুলো এক একটা জ্বলন্ত স্মৃতির মতো তার চোখে এসে বিঁধছে ক্রন্দনরত রমনীর । যে শহর এত আলোয় আলোকিত, সেই শহরের বুকে সোহানার নিজের পৃথিবীটা আজ বড্ড অন্ধকার। রাতের হিমেল বাতাস তার এলোমেলো চুলে পরশ ভুলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই শীতলতা মেয়েটার বুকের ভেতরের একতরফা প্রেমের দহনকে কিছুতেই নেভাতে পারছে না। অবাধ্য চোখের জল গাল বেয়ে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে ছাদের কার্নিশে। যাকে কোনোদিন নিজের করে পাওয়া যাবে না, তার জন্য কেন এই তীব্র ব্যাকুলতা? কেন এই বোবা কান্না?

মেয়েটা অঝোরে কাদে, হিচকি উঠে যায়, দু হাতে চেপে ধরে মুখ। সে এক বাড়িতে থেকে কিভাবে দেখবে ভালোবাসার মানুষটার ভালোবাসা? তার রুহ টা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে না? কোথায় গেলে এ অসহ্য দহন থেকে মুক্তি পাবে একটু সে? কোথায় গেলে চিৎকার করে ভেতরের আর্তনাদ গুলোর মুক্তি দিতে পারবে? কোথায়……
দু হাতে মুখ চেপে হু হু কান্নায় মেতে উঠা রমনীর কান্নার তোপে নাজুক তনু নুয়িয়ে আসতে চায়। আঁকড়ে ধরে ছাদের কার্নিশ। এদিকে উদ্বেগভরা পদক্ষেপে ছাদে উপস্থিত হয়েছে আদনান। হাপড়ের মতো উঠা নামা করছে চওড়া বুক। নিয়ন আলোর ঝলকানিতে ক্রন্দনরত রমনীর মুষড়ে পড়তে চাওয়া দেহ চোখের সামনে উদ্ভাসিত হতেই বুকের ভেতর তীব্র জ্বলুনে আন্দোলিত হলো মানবের। কে যেন বুকটায় খুব সময় নিয়ে খতিয়ে খতিয়ে ক্ষত করে দিচ্ছে। ছুড়ি চালাচ্ছে৷ রক্তাক্ত করে দিচ্ছে পুরোদমে।

মেয়েটার এ কান্না কি আদনানের জন্য? আদনানকে না পাওয়ার জন্য? চঞ্চল মেয়েটাও বুঝি এতো ভালোবাসতে পারে? এই ভালোবাসার ভার আদনান কিভাবে সামলাবে? কোন কুঠোরিতে আবদ্ধ করবে?
মূহুর্তেই দিশেহারা হয়ে উঠলো আদনান। ঝড়েরবেগে দুটো ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের দূরত্ব গুচালো। সেদিনের মতো আজ আর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন বোধ টুকুও করলো না। তীব্র অনুভূতির তাড়নায় কিংবা ভালোবাসার পূর্নতায়, এক লহমায় আশটেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো ক্রন্দনরত রমনীকে পিছু হতে।
আকস্মিক এহেন কর্মকাণ্ডে সোহানা স্তম্ভিত হয়ে গেলো। ছিটকে দূরে সরে যেতে চাইলো মেয়েটা। কান্না ভুলে আতংকে সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জমে গিয়েছে মেয়েটার অতর্কিত এ ছোঁয়ায়। চেঁচিয়ে উঠতে যাবে তার আগেই পুরুষালি হাতের নিচে আলতো ছোঁয়ায় চাপা পরল নোনাপানির সিক্ত ওষ্ঠজোড়া। এতক্ষনের তার হু হু কান্নায় মাতোয়ারা ছাদ জুড়ে ধ্বনিত হলো পুরুষালী স্বরের আবেগ ঢালা ব্যাকুল ফিসফিসানি,
“আ’ম সরিহ, হু? কাদে না, প্লিজ? কাদে না। এভাবে ছোয়ার জন্য সরিহ, কাদানোর জন্য সরিহ। সব কিছুর জন্য সরিহ, সোহা পাখি। ”

সোহানা জমে গেলো স্থীর হয়ে। পুরুষালী কন্ঠটির ফিসফিস ধ্বনি ঝংকার তুলছে সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে। প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে আসে হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক কার্যক্রম। কণ্ঠনালী চিড়ে কোন শব্দ বের হতে চায় না। প্রেম বিরহের আকস্মিক পূর্নতায় মেয়েটা খেঁয় হারায়। দু’পায়ের নড়বড়ে অস্থিরতায় আকস্মিক দোলে পরে আদনানের বক্ষস্থলে। আদনান আশ্চর্য, বিমূঢ়, বিস্মিত।
‘মেয়েটা জ্ঞান হাড়ালো? সিরিয়াসলি? মেহরাদ তাকে আস্ত রাখবে জানলে? কি ভাববে? তার ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে? মাই গড! সোহায়ায়ায়ায়া? প্রেম নিবেদনে জ্ঞান হারালেও, আদর নিবেদনে জ্ঞান হারালে কিন্তু আমি একদম মানবো না! ভুলেও নায়ায়া! ‘ অতর্কিত মনে মনে রুক্ষস্বরে বিড়বিড় করলো আদনান।
জমের মুখোমুখি হতে হবে ভেবেও সোহানাকে পাজোকোলে তুলে নিলো। মেয়েটার বিবর্ন ফ্যাকাশে মুখশ্রী জুড়ে নিদারুণ উদ্বেগ যেনো তখনও প্রস্ফুটিত। অবিলম্বে অধর বেকে আসে আদনানের। স্ব’গোক্তিতে আওড়ায়,
“খুব শিগগিরই নিজের করে নিবো আপনায়, মিস। একা একা আর ভালোবেসে কষ্ট পেতে হবে না। এবার দু’জন দু’জনকে মিলেমিশে ভালোবাসবো, হু? আপনার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো আদর মেখে রাঙিয়ে দেওয়ার অধিকার টুকু খুব শিগগিরই আমার হবে, প্রণয়ীনি। খুব শিগগিরই। ”

শান্তা অস্থির পাইচারি করছে ঘরময়। দ্বীপের কোন কন্টেন্ট নাম্বার নেই তার কাছে। কিভাবে যোগাযোগ করবে? কার কাছ থেকে জানবে ছেলেটা কি করছে? কোথায় আছে?
ভাগ্য বুঝি সহায় হলো মেয়েটার। শুভ্রতা আসলো রুমে সেই মূহুর্তে। শান্তা ঢোক চাপলো শিক্ত করে। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগছে মেয়েটার। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মনে হচ্ছে নিজেকে। শুভ্রতা কেন এসেছে তা জিজ্ঞেসের প্রয়োজন বোধ করলো না মেয়েটা। অগোছালো পায়ে মেয়েটার কাছে এগিয়ে গিয়ে খপ করে ধরে ফেললো মেয়েটার সরু কবজিটা ।
আকস্মিক এহেন কান্ডে ভরকে গেলো শুভ্রতা। শান্তার মুখশ্রী জুড়ে দুশ্চিন্তার নিদারুণ উদ্বেগ। কেমন চঞ্চল, ছন্নছাড়া দৃষ্টি । মেয়েটার কন্ঠে উদ্বেগ্নিতায় ছেয়ে গেলো। সহসা জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে আপু? এরকম দেখাচ্ছো কেন তোমাকে? অসুস্থ লাগছে?”
শান্তার ভেতরটা যেন চাপা কষ্টে হু হু করে উঠলো। মেয়েটা কালবিলম্ব না করেই অগোছালো স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“দ্বী…দ্বীপ দ্বীপের নাম্বার আছে তোর কাছে? একটু দিবি? দে না? এ…একটু দরকার ছিল। খুব দরকার। একটু দে না….”

শুভ্রতা আশ্চার্যিত। তার কাছে দ্বীপের নাম্বার আসবে কোথা থেকে! আগে যা-ই ফেসবুক আইডি ছিলো তারপর তো কারো সাথেই যোগাযোগ হতো না। এখনো তেমন কারোই নাম্বার নেই। ঢাকা আসার পর মেহুরাদ নতুন সেট কিনে দিলো, সেখানে গুটিকয়েক মানুষের নাম্বার ছাড়া তেমন কারোই নেই। দ্বীপ ভাইয়ের নাম্বারও না। বলা বাহুল্য কখনো প্রয়োজন পরে নি। সে বোনের অস্থিরতা দেখে হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কেনো আপু? হটাৎ দ্বীপ ভাইয়ের নাম্বার? আমার কাছে নেই তো। কোন সমস্যা হয়েছে? ”
শান্তার নিজেকে অসহায় অসহায় লাগে। বাচ্চাদের মতো চিবুক কেঁপে উঠে অনুভূতির তোড়ে। যে বেপরোয়া ছেলে! যদি উলটাপালটা কিছু করে বসে! সে তো এখনো জানতেই পারলো তা সিনিয়র তার ভালোবাসায় নিজেকে বেধেঁছে। মায়ার বাধনে ফেসেছে! মেয়েটা অসহায়ের ন্যায় আওড়ায়,

“একটু ব্যাবস্থা করে দে না? একটু দেখ না কারো কাছ থেকে পাস কি-না। প্লিজ বইনা। আমার লক্ষি বোন না…..”
শুভ্রতা মনে মনে ভাবলো। মেহরাদের কাছে থাকলে থাকতে পারে। নয়তো আর কারো কথাই মনে পরছে না তার। একটু ভেবে জানালো,
“দাড়াও দেখি তোমার ভাইয়ার কাছে পাই কি-না। ওনার কাছে তো থাকার কথা বোধহয়…. ”
বলেই শুভ্রতা বেরিয়ে গেলো। শান্তার বুকে বুঝি এক পশলা শীতল বৃষ্টির ছাট বয়ে গেলো! মেয়েটা মাথা চেপে বসে পরলো বিছানার উপর। বুক চিড়ে বেরিয়ে আসে ব্যথাতুর চাপা আর্তনাদ, ‘ এই যে জগৎ কাল ভুলে বছর খানেক ছোট তোমার জন্য এভাবে তড়পাচ্ছি। এর
চিরকাল এর মর্যাদা রাখবে তো দ্বীপ? আমি কিন্তু পাগল হয়ে যাবো?’

শুভ্রতা পুরো রুম টোম খুজে এলো। মেহরাদ নেই। মেয়েটা কদম এগিয়ে সিড়ি ভেঙে নিচে নেমে দেখলো পরিবারের সকলের সাথে বসে আছে ভদ্রলোক। কি বিষয়ে যেন আলাপ আলোচনা চলছে। সকলের চেহারায় চাপা উদ্বিগ্নতা। মেহরাদ ভাবলেশহীন ভাবে একের পর এক বক্তব্য রাখছে গগম্ভীর মুখশ্রীতে, বসা আয়েশী ভাঙ্গিতে।
শুভ্রতা মুখ মোচড়াল। সব জায়গায় ভাব এ লোকের। দেখো? কিভাবে ভাব নিয়ে আছে! যেনো কোথাকার রাজপুত্র! সে পিলপিল পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো মেহরাদের সোফার পাশাপাশি। তারা ছোট রা ছাড়া সবাই উপস্থিত সেখানে। আগামীকালের দোয়া অনুষ্ঠান নিয়ে নাকি অন্য বিষয়ে আলোচনা চলছে সে সঠিক বুঝতে পারলো না। সে মেহরাদের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো যেন তাদের আলোচনায় সমস্যা না হয়। সে একটু করে ডেকে মোবাইলটা নিয়ে আসবে, ব্যাস।

কিন্তু বেচারি যেতে যেতে সকলের দৃষ্টিতেই পরলো। এবার শুভ্রতা অস্বস্তি তে পরলো। সকলের একে একে প্রশ্নাত্নক চাহনিতে মেয়েটা অস্বস্তিতে ঘেমে উঠলো। কি বলে ডাকবে এখন সকলের সামনে মেহরাদকে? সন্ধ্যায় ভাই বলায়, কতগুলো সুন্দর উপহার পেয়েছে গলায়, গাড়ে। উফফফ, গলা ঘাড়টা আরেকবার জ্বলে গেলো একদম, মনে হতেই। আড়ষ্টতায় জমে গেলো মেয়েটা স্ব’স্থানে।
সকলের দৃষ্টিতে মেহরাদ ঘার বাকিয়ে পিছু তাকাতেই শুভ্রতার অস্তিত্ব দৃষ্টি গোচর হলো। সহসাই কপালে সরু রেখার আবির্ভাব ঘটলো মানবের। একটু আগে না শুয়িয়ে দিয়ে আসলো ঘুমাতে ? এখনো ঘুমোয় নি? প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি জোড়া দেখেই শুভ্রতা শিরদাঁড়া বাকিয়ে হকচকিয়ে, হড়বড়িয়ে বলে ফেললো,
“একটু আপনার মোবাইলটা দিন না? ”
মেহরাদের দৃষ্টির প্রগাঢ়তা বাড়লো। বাড়তেই শুভ্রতা ফের ধরফরিয়ে করে উঠলো,
“ঘুম ধরছে না আর কি! আমার টার চার্জ শেষ। ”

মেহরাদ স্বাভাবিক ভাবেই প্যান্ট এর পকেট হতে মোবাইল বের করে ওর হাতে দিলো। এখানের আলোচনা প্রায় শেষের দিকে। সন্ধ্যা হতে দৌড়ঝাপ, শাওয়ার নিতে হবে। আরেক পকেট হতে মানিব্যাগ, রেড মার্লবোরো সিগারেটের প্যাকেট ওর হাতে ধরিয়ে দিলো। গমগমে গলায় বলল,
“রুমে যা। ড্রেস রেডি কর, এসে শাওয়ার নিবো। ”
শুভ্রতা চোখ মুখ কুচকে মাথা নাড়ালো। বড় মা’রা দেখছে তাকে। ইশ, ইশ, কি লজ্জা! কি লজ্জা! সে কি গিন্নি হয়ে গেলো!সকলেই সত্যিকারেই বাড়ির ছেলে আর মেয়ের ছোট্ট খাট্টো সংসার কার্যালাপ দেখে প্রশান্তিতে দু’চোখ জুড়ালেন। মেয়েটা লজ্জা, আড়ষ্টতায় দু চোখ খিঁচে ফেলার আগেই মস্তিষ্কটা হুট করে কেন যেন জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠলো। এটা কি সিগারেটের প্যাকেট দিলো? সে যে এ নিয়ে প্রতিদিন গাল ফোলায় এটা দেখে না?
শুভ্রতা নাক মুখ সংকুচিত করেই দ্রুত সিড়ির দিকে পা টানলো। কখন আবার বলে ফেলে, দাঁড়া আমিই নিয়ে যাচ্ছি! তার নিয়ে যাওয়া মানেই তো কোলে চড়ানো।বেচারি সকলের সামনে আর লজ্জায় পরতে চায় না। তবে হুট করেই করে বসলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যাদি। সিড়ির দোরগোড়ায় পৌছাতেই আকস্মিম ডাইনিং রুমের দিকে অদূরে ছুড়ে মারলো হাতের সিগারেটের প্যাকেট টা। অসহ্য জিনিস একটা। সে ছিলো না, খেয়েছে। মানা যায়। সে থাকতে খাবে কেন? মাত্রাছাড়া করছে না,এ লোক এখন? হুহ! যা ভাগ আমার জামাইর কাছ থেকে!

সিগারেটের সাথে মনে মনে দ্বন্দ্ব সেড়ে এক পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে আবারও উপরে উঠতে লাগলো মেয়েটা। ভেতরের অঙ্গার মেয়েটা কাউকে বুঝতে দিলো না। খুব স্বাভাবিক, শান্তশিষ্ট মেয়ে সে।
আকস্মিক শব্দের উৎসে সকলে ঘুরে তাকাতেই দেখলো মেহরাদের ব্র‍্যান্ডেড সিগারেটের প্যাকেট খানা অদূরে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সকলে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে একবার মেহরাদের দিকে তাকালো তো আরেকবার উপরে উঠতে থাকা শুভ্রতার দিকে।
তর্জনী দিয়ে ভ্রু চুলকালো মেহরাদ। সকলের বিহ্বলিত দৃষ্টির কবলে ফুস করে শ্বাস ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। রাশভারি কন্ঠে জানালো,
“বাকি কথা পরে শেষ করছি,হু।”
আলতাফ তালুকদার ছেলেকে একটু চটিয়ে দিতে আফসোসের সুরে আওড়ালেন,
“মেয়েটার জন্য নিচে রুমের ব্যাবস্থা করো জাহানারা। সে কবে বললাম তোমায়! এভাবে সিড়ি দয়ে চলাচল করতেও ত অসুবিধে হয়! ও নয়তো নিচেই থাকুক!”

সকলের একযোগের দৃষ্টি আবার মেহরাদের দিকে পতিত হলো। নিশ্চিত ছেলেটাকে ফুঁসাতে এসব বলছে! দাপুটে মানব থোরাই না ক্যায়ার করে বাবার ছদ্য আফসোস! সকলকে বিহ্বলতার আরেক দাপ উপরে উঠিয়ে সিড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে স্ব’গক্তিতে আওড়াতে থাকে,
“আমি আছি না? প্রয়োজন হলে লিফট করে দিবো। এলিভেটর, এক্সেলেটর সব।”
এরপর মাত্র কয়েক কদমেই শুভ্রতার কাছে পৌছে গেলো মেহরাদ৷ কোন কালবিলম্ব না করেই মেয়েটাকে পাজাঁকোলে তুলে শান্ত কদমে রুমের দিকে অগ্রসর হলো। খুব দ্রুতই সকলের দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেলো তাঁরা।
হতচকিত শুভ্রতা সরু দু হাতে খামচে ধরে স্বামীর চওড়া কাধ। দু ‘চোখের তারায় লজ্জার আবরন। আবার সকলের সামনে এহেন কান্ড ঘটালো লোকটা! দূর ভাল্লাগে নায়ায়ায়া! মনে মনেই আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা।

“সাহস যে দেখাস মাঝেমধ্যে, বুঝে শুনে দেখাস তো?” শুভ্রতাকে বিছানায় বসাতে বসাতে ডান ভ্রু উচিয়ে শুধালো মেহরাদ।
“ভালো করেছি।” শুভ্রতার তৎক্ষনাৎ একগুঁয়ে জবাব।
মেহরাদের ঠোঁটের আগায় মৃদু হাসি ফুটে উঠে প্রিয়তমার বাচ্চাসুলভ আচরণে। হাতের ঘড়ি খুলে, শার্টের বোতামে হাত চালাতে চালাতে বলে,
“শাওয়ার নিয়ে আসছি। এতো ভালোর কিছু পুরষ্কার আপনিও ডিজার্ভ করেন। ওয়েট টিল দ্যান….”
ছেলেটা ঢুকে গেলো ওয়াশরুমে। অঁধর কোলে লাজুক হাসির ফোয়ারা উঁকি দিলো মেয়েটার। পরক্ষণেই কিছু মনে পড়তে এক মূহুর্তও অপেক্ষা করলো না শুভ্রতা। ছটফট কদমে শান্তার রুমের দিকে ছুটলো মোবাইল হাতে। তার বোনটাকে এতো বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন….? এতো উৎকন্ঠা নিয়ে দ্বীপের নাম্বারই চাইছে কেন?

রাতটা দুশ্চিন্তায় গেলো ভগ্ন হৃদয়ের রমনীর। নাম্বার জোগাড় করতে পারলেও মোবাইল বন্ধ পেয়েছে। দুশ্চিন্তা যেন পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। এক রাতেই চোখের নিচে আমাবস্যার আঁধার নেমেছে লালিত্য মাখা চেহারায়।
বাহিরে তখন টুকিটাকি মানুষের আনাগোনা। মেহরাদ, শান্তাদের বাড়ি থেকেও মেহমানরা চলে আসছে আস্তেধীরে। শান্তার দু’তিনটে কাজিন আছে। তারাও আসছে। মেয়েটা উদাস মুখে জানালা মুখী হয়ে শতশত চিন্তার মধ্যেই দরজার মধ্যে টোকা পরলো। ঘার ঘুরিয়ে দেখতে দেখতেই সোহানা এসে বোনের সামনে হাজির হলো কাদোঁকাদো মুখ নিয়ে। আচমকা বোনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেদে উঠলো মেয়েটা। আকস্মিক ঘটনাপ্রবাহে শান্তা হকচকিয়ে উঠলো। জড়িয়ে ধরলো বোনকে। কিছুক্ষণের জন্য দ্বীপের চিন্তা মস্তিষ্ক থেকে হাটলো।ব্যতিব্যস্ত হয়ে সোহানাকে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হলো কাঁদছিস কেন? এই সোহানা? কেউ কিছু বলেছে? আম্মু বলেছে কিছু? সোহানা?”
সোহানা লজ্জায়, আড়ষ্টতায়, হীনমন্যতায় বোনের বক্ষস্থলে মিশে যায় পুরোপুরি। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আওড়ায়,

“আ’ম সরি আপু। আমি খুব করে সরি। আমি….আমি কাউকে ভালোবাসি না। তুমি ভুল বুঝো না আমায় হ্যাঁ ? আমি…আমি…..”
মেয়েটার কন্ঠ জড়িয়ে আসে কান্নার তোপে। আর বলতে পারে না কিছুই। শান্তা বুঝলো বোনের দুঃখ কষ্টের কারণ। মেয়েটার অঁধরে হাসি ফুটে উঠলো। ঠোঁট টেনে, মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে আদর মাখা গলায় জানালো,
“আপু কিচ্ছু মনে করি নি বোকা। কান্না করছিস কেন? কান্না থামা? এক্ষুনি থামাবি। না-হয় মা’র দিবো কিন্তু?”
সোহানা নিজেকে স্বাভাবিক করতে চায়। মেয়েটা নাক টানে ঘনঘন, কান্না আটকানোর চেষ্টায়। অশ্রুসিক্ত নয়নে বোনের দিকে তাকাতেই আবারও অশ্রুর ঢেউ খেলে যায় দু’চোখে। ঠোঁট উলটে আসে অপরাধ বোধে। তার আপু নিশ্চয়ই বিয়ে নিয়ে অনেক ঝল্পনা কল্পনা করে ফেলেছে! আপু কিভাবে ভুলে যাবে সব? সে কিভাবে এগুলো মেনে নিবে?

শান্তা এবার বোনের অশ্রুপাত দেখে জোড়ালো ধমক ছুড়লো। বিরক্তি ঝরে পরলো তার কন্ঠে,
“সত্যি সত্যিই মা’র খাবি কিন্তু! আরে বাবাহ্! আমি কিচ্ছুহ্ মনে করিনি। তোরা দু’দজনকে ভালোবাসিস এটা কতো খুশির খবর জানিস? জানিস আমি কতটা দুশ্চিন্তায় ছিলাম এই একটা মাস? আমি এ বিয়েতে কখনোই নিজ ইচ্ছেয় মত দিতাম না। ইনফেক্ট কোন বিয়েতেই না। খুব শিগগিরই সব ঠিক হয়ে যাবে, টেনশন করিস না। ভাইয়া ঠিক করে দিবে সব। ”
মনের আঙ্গিনায় কিছুটা শীতলতা ছড়ানোর আগেই সোহানা আৎকে উঠলো ভাইয়ার কথা শুনে। দু’চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। স্তব্দায় মেয়েটার অস্তিত্ব জমে আসে যেন। বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে বোনের দিকে অবিশ্বাস্য নয়নে। পরক্ষণেই হুশ ফিরতে আৎকে উঠে বলে,
“ভা…ভাই য়া ঠিক করে দিবে মানে? ভাইয়া জানে এসব?”
“জানে মানে? আদনান ভাইয়া কি বলেছে জানিস? বলেছে,’ বিয়ে করলে ওঁকেই করবো। উই লাভড ইচ আদার। আমার ভালোবাসায় একদম ভিলেন ভাই সাজতে আসবি না মেহরাদ। যদি আসিস, একদম গুলি করে খুলি উড়িয়ে দিবো।’ ” বলেই ফিক করে হেসে দিলো শান্তা।

সোহানা বেচারি লজ্জায় এ টুকুনি হয়ে গেলো। আর কি কি বলেছে কে জানে! মেয়েটা অস্বস্তিতে গাট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এর মধ্যেই শুভ্রতা রুমে ঢুকলো মুখশ্রীতে কালবৈশাখীর আঁধার জমিয়ে। যেন শরৎের মেঘের সবটুকু ভার ওর মায়াবী মুখশ্রীতে আস্তানা জমিয়েছে। মেয়েটা আদো আদো কন্ঠে শান্তার উদ্দেশ্যে বলল,
“তোমাকে, তোমার ভাইয়া যযেতে বলেছে। ”
ওর কথায় ঠাট্টা ভুলে উদ্বেগে পরলো শান্তা। শুভ্রতার কথায় মাথা নাড়িয়ে তৎক্ষনাৎ বের হয়ে গেলো রুম ছেড়ে। সোহানা শুভ্রতার বাহুতে খোচা দিয়ে, চোখ উচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“হটাৎ ভাইয়া ডেকে পাঠালো কেন? কিছু হয়েছে? ”
শুভ্র‍তা ঠোঁট উলটে এদিক সেদিক মাথা নাড়ালো। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। রাতে শান্তার রুম থেকে মোবাইল নিয়ে রুমে ঢুকতেই দেখে মেহরাদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে। তার দিকে কিছুপল তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিলো। এরপর তো কিছুই জিজ্ঞেস টিজ্ঞেস করলো না! সে ভেবেছে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ চলবে বুঝি তারউপর ! কই, কিছুই হলো না। স্বাভাবিক ভাবেই বুকে টেনে তার মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে ঘুম টুম পাড়িয়ে দিলো।
এরপর এখন বলছে শান্তা আপুকে ডেকে দিতে। মেয়েটার বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করছে। শান্তা কেন দ্বীপের নাম্বার নিলো, আর মেহরাদই কেন শান্তার খোঁজ করলো? সে বেচারি ছোট্ট মস্তিকে কিছুই ঠাহর করতে পারলো না। চিন্তিত বদনে কদম ফেলে শান্তার রুম ত্যাগ করলো ও সোহানাকে রেখেই। যদি কান পেতে কিছু শোনা টোনা যায়!
শুভ্রতা আবার বরাবরই লক্ষিমন্তর মেয়ে। এসব সে কস্মিনকালেও করে না। এখন একদিন করলে বেশি গুনাহ হয়ে যাবে? থাক, নিজের রুমের থেকেই তো শুনবে, ওটাও কি গুনাহ হয়ে যাবে? স্বামীর কথা শুনলে কিসের গুনাহ!
কতো হাবিজাবি ভাবতে মেয়েটা নিজের রুমের দিকে গেলো আস্তেধীরে পা ফেলে। সে বেচারি এটা মাথায় আনলো না তার কচ্ছপের গতিতে যেতে যেতে কথা বলাও তো শেষ হয়ে যেতে পারে!

“ডেকেছিলে ভাইয়া?” আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো শান্তা। মেয়েটার চার হাত পা ঘেমে-নেয়ে একাকার। অসহ্য অনুভূতির তাড়নায় হৃৎপিণ্ডটা ফেটে বেরিয়ে আসার উপক্রম। তবুও ভাইয়ের সামনে স্ট্রিট-কাট দাড়িয়ে। কি বলে, কি করে, আল্লাহ জানে!
মেহরাদ অতিশয় শান্ত, নীরব। নিস্প্রভ চোখ দুটো শান্তার মুখশ্রী জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মেয়েটার একেকটা এক্সপ্রেসন তাকে তার অনুমানকে সঠিক করার শতভাগ জন্য এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিছুপল আরও নীরবতায় কেটে গেলো ওদের দু’জনার মধ্যে। কি যেন ভাবলো তীক্ষ্ণ চোখে। তারপর খুবই শানিত, শীতল গলায় প্রশ্ন ছুড়লো বোনের দিকে,
“দ্বীপকে ভালোবাসিস?”

বজ্রহাতের ন্যায় তীব্র বিস্ময়ে শান্তা পিছিয়ে গেলো কয়েক কদম। মেয়েটার পা দুটো যেন মোমের তৈরি, তপ্ত আতঙ্কে গলে যাওয়ার মতো নড়বড়ে। যে খবর তার মন’ও সঠিক জানে না, ভাইয়া কিভাবে বুঝলো?
শান্তার এক্সপ্রেশন দেখে মেহরাদ পুরোটা বুঝে ফেললো এবার। হাতের আঙুলে কপাল ঘষলো। গতকাল বিয়ের কথা শুনে দ্বীপের ওভাবে চলে যাওয়া, রাতে শান্তার তার মোবাইল থেকে দ্বীপের নাম্বার নেওয়া সব কিছুই একে একে মিলিয়ে ফেললো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানবটা। রাতে এরকম কিছুই সন্দেহ করেছিলো মোবাইল চেক করে।
তার মোবাইলে সবসময় ডিজিটাল ওয়েলভেয়িং’ অন করা থাকে। রাতে শুভ্রতাকে মোবাইল হাতে নিয়ে ঢুকতেই সন্দেহ করেছে সে। দু’তলায় তখন শান্তা ছাড়া কারো জেগে থাকার কথা না। অনায়াসেই বুঝেছি ফেলেছিল সব।
“আমি…আমি চাইনি এ অলুক্ষনে কাজ আমার দ্বারা হোক। কিভাবে যেন হয়ে গেলো! আমি আমি চেয়েও নিজেকে আটকাতে পারি নি ভাইয়া! ” কান্নার তোপে কণ্ঠনালী বুদ হয়ে আসে মেয়েটার। নমনীয় তনু নুয়িয়ে আসে কম্পনের তোড়ে। একরাশ জড়তা কন্ঠায়।

“ভাইয়া? একটা অনুরোধ রাখো না? একটু দেখো না ও কোথায়? ও তো পাগল কিসিমের ভাইয়া! কি পাহাড় চেপে গতকাল বাড়ি থেকে বের হলো! একটু দেখো না ও কোথায়? আমি তোমার সব কথা শুনবো ভাইয়া। তুমি যা বলবে তা-ই হবে। সব শুনবো। এই অবাধ্য মনটাকে শিকলে বাঁধবো। একটু ওর খোঁজ করে দাও ভাইয়া….. ” মেহরাদের প্রতি ভয়, ভালোবাসা, বিশ্বাস সব কিছুর মিশলে মেয়েটার ভাইয়ার কাছে সব অনুরোধ অনুযোগ উল্থিত করলো ।
মেহরাদ বুক ফুলিয়ে শ্বাস ছাড়লো। যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে বুঝতে পেড়ে বসা হতে উঠে দাঁড়াল। বোনদের কখনোই কোন সৎ ইচ্ছে অপূর্ন রাখে নি সে। এগিয়ে এসে বোনের মাথায় হাত ভুলিয়ে দিলো। শান্তা যেন আরেকটু ভেঙে গেলো ভাইয়ের নমনীয়তার সামনে। ভাইয়ের উষ্ণ মমতায় মনটা শীতলতায় ভিজে উঠলো। তার এ বিচ্ছিরি ভালোবাসার দায়ে তার পরিবারকে সমাজ থেকে কি কি শুনতে হবে? তার ভাইয়ার কি বেশিই সম্মানহীন হবে?
মেহরাদ বুঝে বোনের মানসিক বিধ্বস্ততা। তবুও ভেতরের গম্ভীরতা ছাপিয়ে কন্ঠ নমনীয় করতে পারলো না সে। রাশভারী স্বরে বোনকে জানালো,

“ভালোবাসা হচ্ছে মুক্ত বিহঙ্গের মতো। এঁদের কখনো খাচাঁয় আটকে রাখা যায় না। সময়, জ্ঞান ভালোবাসা বুঝে, না তাকে বুঝানো ও যায় না। শুধু মানুষ চিনে সৎ পাত্রে তা ঢালতে হয়। দ্বীপের কিচ্ছু হবে না। আমি ট্র‍্যাক করছি ওঁকে, হু? কাদে না। ” তার দ্বারা আর বোনকে সান্তনা বানী শুনানো সম্ভব হলো না। ব্যাস্ত কদমে মোবাইল পকেট হতে বের করতে করতে রুম ত্যাগ করতে যাবে ঠিক দরজাতেই শুভ্রতার দেখা মিললো। দেখা গেলো বললে অবশ্য ভুল হবে।
মেয়েটা সবে নিজেকে আড়াল করে মাথা বের করে উঁকি দিচ্ছিলো ভেতরে। আকস্মিক মেহরাদের চওড়া ঢেউ খেলানো বুকে মাথাটা ঠুকে গেলো একদম। মেহরাদ তীক্ষ্ণ চোখে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও শুভ্রতা কপাল ডলতে ডলতে চোখ মুখ কুচকে ফেললো পুরোদমে। মুখ দিয়ে তিতবিরক্ত শব্দ বের করে মেহরাদের উদ্দেশ্য ছুড়ে দিলো প্রশ্ন বান,

” উফফফফ, দেখে আসবেন না? দিলেন তো কপাল টা ফাটিয়ে? এতো শক্ত বুক হয়? গন্ডারের মতো? এতো তাড়াতাড়ি কথা শেষ হয়ে গেলো? উফফফ, একটু শুনতেও পারলাম না। এতো অল্প কথা বলতে কেউ ডেকে আনে? যত্তসব…. ” মেয়েটা বিরক্তি ঝাড়তে থাকলো অনর্গল। এর মাঝখানেই মেহরাদ ওর কপাল তর্জনী দিয়ে চেপে ধরলো। চোখ দুটোয় তীক্ষনায় ছেয়ে। তীর্যক কন্ঠে শুধালো,
“কি বললি? আবার বল?”

শুভ্রতা সতর্ক হলো তৎক্ষনাৎ। দীগল চোখ জোড়ার ভারী পল্লব ঝাপটিয়ে বুঝতে চাইল তার অবাধ্য মুখটা কতটুকু ছুটেছে। মেহরাদের শানিত চোখ জোড়ায় দৃষ্টি মিলতেই মেয়েটার ভেতরটা জলোচ্ছ্বাসের ন্যায় উছলে উঠলো। কাজ তো বাগিয়েছে! তৎক্ষনাৎ মুখশ্রী জুড়ে আদুরে, আহ্লাদী ভাব টেনে এনে, দু হাত বাড়িয়ে, মেহরাদের শক্তপোক্ত বুকের কাছটায় মিশে যাওয়ার মিছে বাহানায় বিগলিত স্বরে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“এই মাত্র ব্যাথা পেলাম না মাথায়? কষ্ট হলো না আমার?কি পাথরে যেন বারি খেলাম? দুঃখী বালিকার কথা ধরতে আছে? উঁহু, একদম নেই। একটু আদর করে দিন…..”

মেহরাদ মোটেও বিগলিত হলো না আদুরে স্বরে। বউয়ের ছদ্ম আহ্লাদীপনায়। অঁধর পিষে যায় দাতের সনে,হাসি সংবরণে। তবুও মুখশ্রী যথাযথ গম্ভীর রাখলো সে। মেয়েটার শুভ্র ললাটে তর্জনী ঠেকিয়েই দূরত্ব বজিয়ে রাখলো। শুভ্রতা নাছোড়বান্দা। গলছে না লোকটা বুঝতে পেরে, অসহ্য হয়ে দু’চোখ কুচকে মেহরাদের দিকে দৃষ্টি তাক করলো। মনে মনে আওড়াল, ‘আসলেই পাথর হয়ে গিয়েছে না-কি! তার আহ্লাদেও গলছে না! ধূর! ‘
“ড্রামা অফ রাখেন, ম্যাডাম৷ আপনি এমনিই ড্রামা কুইন। হাতে সময়, পরিস্থিতি দুটোর একটাও নেই। না-হয় পুরুষ্কার পেয়ে যেতেন তৎক্ষনাৎ। ”

ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতো মুখটা কাচুমাচু করে এদিক সেদিক ঘুরালো মেয়েটা। পরক্ষণেই মুখ গুজো করলো ব্যার্থতায়। সবসময় ধরে ফেলে। উফফফফ!
“আড়ি পাতা কবে থেকে শিখেছিস? দ্বিতীয় বার দেখবো?” মেহরাদের ধারালো কন্ঠঃ।
শুভ্রতা আশ্চর্যের ন্যায় তাকালো স্বামী নামক প্রানীটার দিকে। সে তো সুযোগই পেলো না! এই অপবাদ কেন নিবে সে? তৎক্ষনাৎ ঘোর বিরোধিতা করে বলে উঠলো,
“একদম আড়ি পাতি নি। সত্যিই বলছি! সুযোগ ই তো পেলাম না!” শেষের টা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতেই দু হাতের তালুতে মুখ চেপে ধরলো মেয়েটা।
মেহিরাদ ডান ভ্রু উচিয়ে শানিত কন্ঠে প্রশ্নবাণ জাড়ি রাখলো,

“পেলে পাততি?”
শুভ্রতা এদিক সেদিক মাথা নাড়ায়। ভুলেও সে স্বীকার করবে না। পাগল না-কি সে!
মেহরাদ ওর প্রসঙ্গ ছাড়লো। বৃদ্ধা আঙুলে কপালের কাছটায় আদুরে ছুঁয়িয়ে দিলো খানিক। হাতে সময় কম। নিচে মেহমানরা উপস্থিত হচ্ছে। ঘড়িতে নজর ভুলিয়ে ব্যাস্ততা বাড়িয়ে, হুশিয়ারি কন্ঠে জানালো,
“দ্বিতীয় বার যেন না দেখি এসব। হুম? রুমে যা। আসছি আমি। নিচে যেন ভুলেও ছুটোছুটি করতে না দেখি! সাবধান?”
শুভ্রতা মুখ গুজো করে নিলো। বাড়িতে এতো মানুষ, সে নিচে যাবে না! কুঞ্চিত মুখেই সহসাই পালটা জিজ্ঞেস করলো,
“গেলে?”
“আজকে যদি ছুটোছুটি করে কোন ব্যাথা পাশ শুভ্রা?? তোকে আমি জাস্ট খু’ন করে ফেলবো । নোট মাই ওয়ার্ড। ”
চলে গেলো লোকটা। শুভ্রতা মুখ ভেঙালো অগোচরে। সে তো যাবেই! খেয়ে ফেললে, খেয়ে ফেলুক! হুহ!
মেহরাদ যেতেই শান্তা রুম ছেড়ে বেরিয়ে এসে শুভ্রতার পাশাপাশি দাড়ালো। মেয়েটা ছোট্ট বোনের এ নাটক দেখেই কুপোকাত। আর, বের হবে কি! রুমের সামনেই দু’জন দাঁড়িয়ে। মেয়েটার দু’চোখে আশ্চর্যতা যেন ঠিকরে পরছে। হতবাক কন্ঠে শুধালো,
“এই, তুই এতো নাটক কিভাবে পারিস শুভ্রতা? এই আহ্লাদ করে আমার ভাইয়ের মাথাটা কিনেছিস? ঢংঙ্গী একটা…. ”

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৬

বলেই থুতনি চেপে ধরলো আদুরে ছোয়ায়। তারপর, ফুরফুরে মনে নিজের রুমের দিকে অগ্রসর হলো। তার ভাইয়া যেহেতু দেখবে বলেছে, সে এখন কিছুটা নিশ্চিন্ত।
এবার একটু রেডি হয়ে নিচে নামা যাক। মেয়েটার মনে কতো নাম না জানা প্রজাপতিরা হৃদয়ে দোলা দিতে লাগলো! প্রশান্তি বুঝি একেই বলে!

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৭