অপ্রিয় সেই প্রিয়জন পর্ব ৩ || Ishita Rahman Sanjida

1982

অপ্রিয় সেই প্রিয়জন পর্ব ৩
Ishita Rahman Sanjida

সকাল দশটা বাজে আর এখনই সূর্যমামা তার প্রখরতা বাড়িয়ে চলছে। খাড়াভাবে কিরণ দিয়ে সবার রক্ত চুষে খাচ্ছে। এতেই যেন তার তৃপ্তি। এই রোদে চারজন মানুষ ঘামে ভিজে দাঁড়িয়ে আছে খান বাড়ির গেইটের সামনে। পিহু সেই কখন থেকে ইফাজকে ফোন করে যাচ্ছে কিন্তু ফোন বন্ধ। তবে পিহু এতে দমছে না ফোন করেই যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। সামির আর মুক্তা পিহুর অস্থিরতা দেখছে।

রোদে পিহুর ফর্সা গাল লাল হয়ে গেছে। তারওপর চোখ থেকে পানি পড়তাছে। পিহুর শ্বাস আটকে আসছে। বারবার মনে একটা কথাই নাড়া দিচ্ছে যে ইশান আর ইফাজ ওকে ছেড়ে চলে গেল না তো??তাহলে ও বাঁচবে কি নিয়ে??নাহ এভাবে ভুল বুঝে চলে যেতে পারে না ইফাজ। সামির আর মুক্তা পিহুর মুখ দেখে বুঝতে পারলো। মুক্তা বলল,

‘ফোন বন্ধ??’
পিহু মাথা নাড়িয়ে বলে,’হুম’
‘তাহলে নিশ্চয়ই ফ্লাইটে উঠে পড়েছে তাই ফোন বন্ধ করে রেখেছে।’
‘নাহ,এটা হতেই পারে না। ইফাজ আমাকে ছেড়ে যেতে পারে না। আমার ইশান আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না।’

সামির পিহুকে ওখান থেকে নিয়ে এলো। রাস্তার পাশের একটা বেন্ঞ্চিতে বসিয়ে দিল। পিহু কাঁদছে আর জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। মেয়েটা এমনিতেই নরম। একটুতেই ভেঙে পড়তো। ইফাজ কতো বোঝাতো যে সে যেন একটু শক্ত হয়। কিন্তু পিহু নিজেকে কিছুতেই কঠোর মনের মানুষ হিসেবে তৈরি করতে পারেনি। মুক্তা পিহুকে শান্তনা দিয়ে বলে,

‘এভাবে ভেঙে পড়িস না। কোথাও হয়তো ভুল হচ্ছে। বাড়িতে চল তারপর সব ভাবা যাবে।’
পিহু চিৎকার দিয়ে উঠে বলে,’না আমি কোথাও যাবো না। আমি ইফাজের কাছে যাব। আমি ওদের ছাড়া থাকতে পারবো না মুক্তা। সামির ভাইয়া আপনি বলুন না ইফাজের কোথায় আছে??ও লন্ডন যায়নি??’
সামির বলে,’আমার জানামতে এক রাতে এতকিছু করা সম্ভব নয়। তবে বড়লোকদের কাছে এটা কিছুই না। টাকা দিলেই সব রাতারাতি করা যায়। কিন্তু আমার ভাবনা ইফাজ ভাই এক রাতে এত বড় সিদ্ধান্ত কিভাবে নিলো??’

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

পিহু আর ভাবতে পারছে না। দুহাতে নিজের চুল টেনে ধরে কাঁদছে। শেষে উপায় না পেয়ে পিহুকে নিয়ে বাড়িতে চলে যায় ওরা।
দারোয়ান ইফাজের বাবাকে ফোন করতেই তিনি বলেন,’ওরা চলে গেছে??’
‘জ্বী স্যার।’
‘গুড এরপর আসলে একই কথা বলবি। বাড়ির ভেতরে কিছুতেই ঢুকতে দিবি না।’
‘আচ্ছা স্যার।’

ইফাজের বাবা বুদ্ধি করে দারোয়ানকে দিয়ে এসব কথা বলিয়েছে। যাতে পিহু ইফাজের খোজ না পায়। এতদিন পর নিজের ছেলেকে ফিরে পেয়েছেন তিনি। কিছুতেই তিনি ছেলেকে নিজের কাছ থেকে দূরে থাকতে দেবে না। খুব শিগগিরই ইফাজকে তিনি লন্ডন পাঠিয়ে দেবেন। সেখানে গিয়ে তার বিজনেস সামলাবে ইফাজ। এটাই চান তিনি।

ইশান ইফাজের রুমে বসে আছে। হাতে তার রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি। একটু আগেই একটা মহিলা এসে তাকে দিয়ে গেছে। আব্বুর কাছে শুনেছে মহিলা টা নাকি ওর দাদী হয়। সকালে দাদী ইশানকে খাইয়ে দিয়েছিল কিন্তু ইশানের তাতে পেট ভরেনি। আম্মুর কথা খুব মনে পড়ছে। আম্মু কি সুন্দর করে ওকে খাইয়ে দিতো। তাতে পেট আর মন দুটোই ভরে যেতো তার। কিন্তু আজকে তো পেটই ভরেনি মন তো দূরের কথা। তার উপর দাদী এসে মায়ের নামে একগাদা বাজে কথা বলে গেছে। ইশানের খুব রাগ হচ্ছে ওর দাদীর উপর। ওর মা’কে কেন বাজে কথা বলবে সে??আর এতদিন তারা কই ছিলো?? এখন এসেছে তার মায়ের নামে বাজে কথা বলতে। ইশান ঠিক করলো এই পঁচা দাদীর সাথে কথাই বলবে না।

এসব ভাবছে আর গাড়িটা ধরে দেখতেছে। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ইশানের। ছুঁড়ে ফেলে দিলো গাড়িটা। তখনই ইফাজ এলো রুমে। এতক্ষণ সে মায়ের কাছে ছিলো। ইশানের থমথমে মুখ দেখে ইফাজ ওর পাশে গিয়ে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
‘কি হয়েছে ইশান বাবুর??মন খারাপ??’
ইশান ছলছল নয়নে আব্বুর দিকে তাকালো বলল,’আম্মু ফোন করেনি আব্বু?? আমার খুব খারাপ লাগছে। আম্মুর কাছে যেতে ইচ্ছা করছে।’

ইশানের কথায় ইফাজের বুকটা ধক করে উঠল। সেও তো অপেক্ষা করছিল যাতে পিহু একবার হলেও তাকে ফোন করে। কিন্তু না পিহু তাকে ফোন করেনি। তাহলে কি সত্যি সে নেহালের সাথে থাকতে ইচ্ছুক??তাই বোধহয় ফোন করছে না। তাহলে কাল এতো নাটক করার কি দরকার ছিল?? সোজাসুজি বললেই পারতো। তাহলে ইফাজের কষ্টটা একটু কম হতো। ইফাজ দুহাতে জড়িয়ে ধরে ইশানকে। ওর চোখ দিয়ে পানি ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ে। ইশান বুঝতে পারলো যে ওর বাবা কাঁদছে ওর মায়ের জন্য। ইশানের ও খুব কান্না পাচ্ছে।

বারবার শুধু এটাই মনে পড়ছে যে কেন ওর মা এসব করলো?? কালকের কথা মনে পড়তেই মায়ের প্রতি তার ঘৃণা জন্মায়। কিন্তু ইফাজ জানে না যে তার আড়ালে তার মা ফোন থেকে সিম কার্ড বের করে ফেলে দিয়ে নতুন সিম ঢুকিয়েছে। ইফাজের তা দেখার সময় কই। যেখানে তার লাইফ শেষ হতে বসেছে সেখানে সে সামান্য একটা ফোন নিয়ে কি বসে থাকবে??এসব নিয়ে কি ভাবার সময় আছে??সে শুধু পিহুর অপেক্ষা করছে। কিভাবে ছাড়বে সে পিহুকে??বড্ড বেশি ভালোবাসে যে পিহুকে।

সোফায় মাথা রেখে মেঝেতে বসে কেঁদে চলছে পিহু। সামির আর মুক্তা তা দেখতেছে। শান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেনা তারা। পিহু মেয়েটা যে এতো কাঁদতে পারে তা জানা ছিল না মুক্তার। এতো নরম হলে তো লাইফে চলাটাই মুস্কিল। নিরবতা ভেঙ্গে সামির আর মুক্তা পিহুকে অনেক বোঝায় কিন্তু পিহু কিছু বুঝতেছে না। তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ ইফাজ আর ইশান। অন্ধকার জগত থেকে ইফাজই ওকে আলোতে নিয়ে এসেছে। কিন্তু ইফাজ যে ওকে আবার অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে চলে গেছে। এখন এই অন্ধকার থেকে ও কিভাবে বের হবে??

মাঝপথে যদি ছেড়ে যেতে হয় তাহলে শুরুতে হাত ধরার দরকার কি ছিল??পিহু শুধু একটা কথাই ভাবছে যে ইফাজ কি করে পিহুকে অবিশ্বাস করলো?? একবার ও সত্যিটা জানার চেষ্টা করলো না কেন??কেন বলল না যে সত্যিটা কি পিহু আমি জানতে চাই?? তাহলেই তো সব মিটমাট হয়ে যেতো। এতো রাগ কিসের ইফাজের??পিহুর একরাশ অভিমান জন্মায় ইফাজের প্রতি। খাওয়া দাওয়া ঘুম সব ভুলে যায় সে। ভেঙ্গে পড়ে পিহু।

কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত পায় পরেরদিন ডিভোর্স পেপার হাতে পেয়ে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো পেপারের দিকে। শেষমেষ ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিলো ইফাজ। পেপারটা হাতে নিয়ে পিহু খাটের উপর বসে রইল। পেপারে চকচক করছে ইফাজের সাইন। তাহলে কি সত্যি ইফাজ তাকে তার জীবন থেকে বের করে দিলো??এতো জেদ এতো রাগ ইফাজের?? এতদিনের ভালোবাসা কি তাহলে মিথ্যা ছিল??তাই হবে। নাহলে একদিনের ব্যবধানে কিভাবে ডিভোর্স পেপার পাঠায় সে??পিহু কিছুক্ষণ পেপারের দিকে তাকিয়ে থেকে চোঁখের পানি ফেললো। তারপর গড়গড় করে সাইন করে দিলো পেপারে। উকিল পেপার নিয়ে চলে যেতেই কান্নায় ভেঙে পড়লো পিহু। মুক্তা ওর সাথেই ছিল। পিহুর সাইন করাতে বেশ অবাক হয় সে। মুক্তা কিছু বলার আগেই পিহু চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

‘আমি এখন কিভাবে থাকবো মুক্তা?? আমার সবকিছু যে শেষ হয়ে গেল। আমার ইশানকেও নিয়ে গেল ইফাজ। আমি থাকবো কিভাবে??ইফাজ কেন আমাকে একবার বুঝলো না??কেন সত্যিটা জানতে চাইলো না?? এতদিনের ভালোবাসাকে এক নিমিষেই শেষ করে দিলো কেন?? আমি এখন কি করবো?? আমার যে দম বন্ধ হয়ে আসছে মুক্তা!!’

মুক্তাও এবার কেঁদে দিলো। একজন কঠোর মনের মানুষ হয়েও মুক্তা কেঁদে দিয়েছে পিহুকে দেখে। তাহলে ইফাজ কেন বুঝলো না??মুক্তা পিহুকে ধরে বলল,’তোকে বাঁচতে হবে পিহু। নিজের জন্য না হলেও মীরার জন্য বাঁচতে হবে। মীরার তো তুই ছাড়া কেউ নেই। তাছাড়া ইফাজ ভাই তো সারাজীবনের জন্য চলে যায়নি। একদিন না একদিন তো ঠিকই আসবে তখন না হয় সবটা বলা যাবে। এভাবে কলঙ্ক গায়ে মাখিস না। ইফাজ ভাই তোকে ভুল বুঝেছে। তুই তার ভুলটা বুঝিয়ে দিবি। তাই তোকে বাঁচতে হবে।’

পিহু মুক্তার হাত সরিয়ে দিয়ে বলে,’সব দোষ কি আমার একার??ইফাজ কেন সত্যি জানতে চাইলো না?? এতো জেদ তার যে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দেবে?? আমি একদম ঠিক করেছি। ইফাজ যদি আমাকে ছাড়া থাকতে পারে তবে আমিও পারবো। বেশ করেছি পেপারে সাইন করে। আমি বাঁচবো। হ্যা মীরার জন্য বাঁচব। আমি মীরাকে নিয়েই থাকব। দরকার নেই ইফাজকে সত্যি বলার। যদি সে নিজে থেকে কোনদিন জানতে পারে সত্যি তাহলে সেদিনই জানবে। আমি কিছু বলবো না।’

পিহু উঠে দাঁড়িয়ে হনহনিয়ে রুমে চলে গেল। মীরা ঘুমিয়ে রয়েছে। পিহু মীরার পাশে গিয়ে বসে পড়লো। কিন্তু ওর কান্না কোনমতেই থামছে না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো সে।
মুক্তা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও বেশ বুঝতে পারছে যে পিহু অভিমান করেছে ইফাজের উপর। কিন্তু এভাবে তো সবকিছু ঠিক হবে না। দু’জনেই যদি অভিমান করে বসে থাকে তাহলে তো সমস্যা আরো বাড়বে। যেকোন একজনকে আগে গিয়ে সবটা বলতে হবে তো?? কিন্তু পিহু অভিমানের বশে পেপারে সাইন করেছে ঠিকই এরপর সেই আফসোস করবে।

মান অভিমানের কারণেই অনেক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অভিমান সবচেয়ে খারাপ জিনিস। এটা মুক্তা আজ বেশ বুঝতে পারছে। দুজন অভিমানী মানুষ দুজনের জন্য বসে থাকে। দু’জনেই ভাবে যে সে আগে তার রাগ ভাঙাবে। এই অপেক্ষায় থাকলে সারাজীবন পার হয়ে যাবে তবুও কেউ কারো রাগ ভাঙাতেই আসবে না। এটাই কি জীবন?? এভাবে তো কোনদিন কেউ কারো কাছে যাবে না। তাহলে কি কোনদিন ইফাজ আর পিহুর মিল হবে না??বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মুক্তার। রুমে গিয়ে একবার উঁকি দেয় পিহুর দিকে। আগের মতোই সে বসে বসে কাঁদতেছে।

আকাশটা আজ চমৎকার দেখাচ্ছে। চাঁদের পাশে হাজার তারা চিকচিক করছে। মনে হচ্ছে মুক্তাদানা ছড়িয়ে আছে আকাশ জুড়ে। চাঁদের আলো পড়ে মুক্তোগুলো আরো ঝকঝক করে উঠছে। প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে আছে ইশান। একটু পরেই প্লেন ছাড়বে। ইফাজ ইশানের পাশেই বসে আছে। এভাবে নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাবে তা কখনোই ভাবেনি ইশান। এইটুকু বয়সে একের পর এক আঘাত পেয়েই চলছে সে। প্লেন ছাড়ার সময় চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। চোখের সামনে পিহু আর মীরার মুখটা ভেসে ওঠে ইশানের।

কতই না খেলা দুষ্টুমি করেছে সে মীরার সাথে। আর মায়ের বকা খেয়েছে। মেয়েটাকে বড্ড জ্বালাতো ইশান। কখনো মীরা হাসতো তো কখনো ঘর কাঁপিয়ে কান্না করে দিতো। আর পিহু এসে ইশানকে বকতো। তবে ইশানের পছন্দের একজন ছিলো মীরা। মারামারি কাটাকাটির পরেও শেষে দুজনে একসাথে খেলা করতো। ইশানের এসব ভাবতেই মন খারাপ হয়ে গেল। জড়িয়ে ধরলো ইফাজকে। ইফাজ ও ছেলেকে ধরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।

সাতদিন হয়ে গেছে পিহুকে ছেড়ে আসার। আর এই সাতদিনে ইফাজ ঠিক করেছে সে লন্ডন চলে যাবে তার ছেলেকে নিয়ে। পিহুর মুখ সে কখনো দেখবে না। এই সিদ্ধান্ত ইফাজ সেদিন নিয়েছে যেদিন সে পিহুর দেওয়া ডিভোর্স পেপার পেয়েছে। পিহুকে ছেড়ে আসার দুদিন পর সে ডিভোর্স পেপার পায়। সেদিন ইফাজের মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। এই দুদিন ভেবেছিল হয়তো কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। পিহু তো এরকম মেয়ে নয়। কিন্তু ওর ভুল ভাঙাতেই পিহু বোধহয় ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছে। পিহু সত্যি নেহালের সাথে থাকতে চায়।

তাই ইফাজ অশ্রুসিক্ত নয়নে পেপারে সাইন করে দিয়েছিল। কিন্তু ইফাজ গভীর ষড়যন্ত্রের জাল ধরতেই পারেনি। তার আড়ালে যে তার বাবা মা কতবড় ষড়যন্ত্র করেছে তার বিন্দুমাত্র টের পায়নি সে। তারপরই ইফাজ ঠিক করলো দেশ ছেড়ে চলে যাবে। আর তাই হলো। ইফাজ সবকিছু ঠিকঠাক করে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল। প্লেন উড়ে চললো লন্ডনের উদ্দেশে। বাংলাদেশ ছেড়ে সে উড়াল দিলো আকাশের বুকে। চলে গেল অভিমান নিয়ে দুটো মানুষ। তাদের সত্যিটা জানাই হলো না। শুধু জমা রইল প্রিয়জনের প্রতি এক বুক অভিমান যা ভাঙার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। একজন শত অভিমান বুকে চেপে নতুন দেশে পাড়ি দিচ্ছে আর অন্যজন তার অভিমান নিয়ে বাংলাদেশে পরে রইলো।

“”আজকে ভোরের বাতাসটা খুবই স্নিগ্ধ। চারপাশে পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে আছে। জানালার পাশে একটা বেলি ফুলের গাছ। তাতে অসংখ্যক ফুল ধরেছে। সকাল বেলা বেলি ফুলের সুবাস পেতেই মনটা ভরে ওঠে আমার। গাছটা মীরা লাগিয়েছে খুব যত্ন করে। মীরার যখন দশ বছর বয়স তখন স্কুল থেকে ফেরার সময় গাছটা নিয়ে আসে। ড্রেস না খুলেই গাছটা জানালার পাশে লাগায়। সেদিন ওর ড্রেসে কাঁদা লেগেছিল বলে খুব বকেছিলাম। কিন্তু আমার ছোট্ট মীরা সেদিন একগাল হেসে বলেছিল তোমার জীবন সুগন্ধিময় করতে হলে এটুকু কাঁদায় কিছু হবে না। পাগলিটার কথা শুনে সেদিন হেসে ফেলেছিলাম। এভাবে কত বাহানায় যে ও আমাকে হাসিয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু ওর কথা একটুও মিথ্যা হয়নি। পরের বছর বেলি ফুলগাছটায় অনেক ফুল আসে আর আমার ঘর জুড়ে সুগন্ধে ভরিয়ে দেয়। এখনও খুব যত্ন করে গাছটার। কাউকে ছুঁতে পর্যন্ত দেয়না।

আমি ভাবতে পারছি না যে সেই ছোট্ট মীরা যে এতো বড় হয়ে গেছে। সতেরোটা বছর পার হয়ে গেছে আমার আর মীরার জীবন থেকে। সেদিনই তো মীরাকে ছোট দেখেছিলাম। ছোট ছোট হাতে সে আমার গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খেতো। আর আজকে সেই মীরা আমাকে তার হাতের রান্না খাওয়ায়। আর তিনমাস পর বাইশ বছরে পদার্পণ করবে মীরা। ভাবতেও অবাক লাগছে। হয়তো আমার ইশান ও অনেক বড় হয়েছে??কেমন দেখতে হয়েছে ইশান?? বাবার মতোই লম্বা চওড়া আর সুদর্শন হয়েছে নিশ্চয়ই। মায়ের প্রতি ঘৃণা নিয়ে সে বড় হয়েছে। কিন্তু ওর এই ভুল যে ভাঙাতে হবে না হলে যে আমি মরেও শান্তি পাবো না।””

অপ্রিয় সেই প্রিয়জন পর্ব ২

এটুকু লিখেই ডাইরির লেখা শেষ করলো পিহু। ইফাজ চলে যাওয়ার পর থেকে তার জীবনের প্রতিটা মূহুর্ত সে ডাইরিতে বন্দি করে। একদিন সে এই ডাইরিটা ইফাজের হাতে পৌঁছে দেবে যেভাবেই হোক। ও যদি মারাও যায় তবে অন্য কারো হাত দিয়ে পাঠাবে। এই দৃঢ় চিন্তা সবসময় পিহুর মাথায় ঘুরপাক খায়।
ফজরের নামায আদায় করে সে প্রতিদিন নিয়ম করে ডাইরি লিখে। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না। চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে লম্বা নিঃশ্বাস নিলো সাথে সাথে নাকের ভেতর দিয়ে বেলি ফুলের সুবাস সুড়সুড়ি দিয়ে গেল।

সূর্য উঠতে এখনও দেরি আছে। মীরা নিশ্চয়ই এখনো ওঠেনি। মেয়েটার এই একটাই অভ্যাস। ফজরের নামাজ কিছুতেই পরতে চায় না। কিন্তু বাকি চার ওয়াক্ত ঠিকই পড়বে। এনিয়েও অনেক বকা খায় সে তবুও ঘুম থেকে নিজে নিজে কখনো ওঠে না। প্রতিদিন পিহুই গিয়ে মীরাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে নামাজ পড়তে পাঠায়। পিহু ধীর পায়ে মীরার রুমের দিকে গেলো।

অপ্রিয় সেই প্রিয়জন পর্ব ৪