Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৫+২৬

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৫+২৬

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৫+২৬
সাজিয়া জাহান সুবহা

ভোর ৪টা। অন্ধকার কাটিয়ে আলোর দেখা মিললেও দেখা মিললো না সূর্য মামার। ঘন মেঘের আড়ালে হয়তো ঢাকা পড়ে আছে সে। আকাশে একটা গুমোট ভাব। ধূসর মেঘ জমে আছে। হোটেলের কর্মচারীরা সেই সকাল থেকেই নিজেদের কাজ শুরু করে দিয়েছে৷ নিস্তব্ধ করিডোর দিয়ে মিহাদের রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো সাফওয়ান। মাথায় চিন্তারা ভর করেছে, কারণ রাতে ইরা তাদের কাউকে ডাকেনি। মিহাদ হয়তো নেশার ঘোরে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ইরাও কি তবে তার সাথে! ভাবতে ভাবতে রুমের দরজার সামনে এসে দাড়ালো সে। নক করতে গিয়ে আবার থেমে গেলো হঠাৎ। মনে হচ্ছে কোথাও কিছু একটা স্বাভাবিক নেই। তাছাড়া মিহাদ, ইরা’র প্যাচাপ করানোর জন্যই তো দুজনকে একা ছেড়েছিলো। না জানে কি হয়েছিলো রাতে! আদো মিহাদের মুখ থেকে সত্য কথাটুকু বের করতে পেরেছে কিনা। বন্ধ দরজার দিকে একপলক তাকিয়ে অন্যদিকে পা বাড়ালো সে। মিহাদ, ইরা যদি এই রুমে থেকেও থাকে তবে থাকুক৷ সব মিটমাট হলেই হলো।

একেবারে গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে দরজা খুলে হোটেল থেকে বেরিয়ে গেলো সে। বাগান পেরিয়ে যাওয়ার সময় কারো গুনগুন কথার আওয়াজ শুনে থেমে গেলো কদম৷ মেয়েলি কন্ঠ। অনেকটা পরিচিত বলে হচ্ছে। কিন্তু এই সাতসকালে কে উঠবে! তাও কিনা বাগানে? কৌতুহল বশত বাগানের দিকে এগিয়ে গেলো সে। কয়েক কদম যেতেই সামনের দৃশ্যটুকু দেখে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হলো। সম্পূর্ণ বাগান জুড়ে সূর্যমুখী ফুলের সমাহার। লম্বা প্রায় পাঁচ ফুট হবে। এমনই একটা ফুলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সায়েরী। বাতাসের তালে তালে ফুলটা দুলছে। সেই সাথে দুলছে সায়েরী। আবার গুনগুন করে কিছু বলেছে। সাফওয়ান অবাক হতে গিয়েও ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেললো। এই মেয়ের যে টপ ফ্লোর খালি সেটা দফায় দফায় বুঝা যায়। কোনো কাজই তার স্বাভাবিক না। তা নয়তো এই ভোর সকালে ফুলের সাথে কোন পাগলে কথা বলে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ কি করছো এখানে? ‘
মৃদু মৃদু শরীর দুলিয়ে আপনমনে কথা বলতে থাকা সায়েরী আচমকা গম্ভীর কন্ঠটা শুনে ভয়ে লাফিয়ে উঠলো। পেছন ঘুরতে গিয়ে লম্বা স্কার্টের সাথে পা পেছিয়ে ধরাম করে পড়লো মাটিতে।
ব্যাথায় চোখ খিচে “আম্মুওও!!!!” বলে চেঁচিয়ে উঠলো সে। চোখ খুলে সামনে উপস্থিত সাফওয়ানকে দেখে বুকে থুথু দিলো৷ মুখ কুঁচকে বললো,
‘ আপনি! আপনি এখানে কি করছেন? ‘
বিগত দুয়েক সেকেন্ডে ঘটে যাওয়া ঘটনায় সাফওয়ান রীতিমতো হতবাক। সায়েরীর ডাক শুনে সে হাঁটু গেড়ে বসলো সায়েরীর মুখোমুখি। তীক্ষ্ণ চোখে সায়েরীকে আগাগোড়া পরখ করে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

‘ আগে ডাউট ছিলো। আজ ক্লিয়ার হয়েছে। থ্যাংকস টু ইউ। ‘
পিটপিট চোখে তাকিয়ে সায়েরী বললো,
‘ কিসের ডাউট? ‘
খানিকটা কাছাকাছি আসলো সাফওয়ান। চোখে চোখ রেখে ভাবুক কন্ঠে বললো,
‘ এটারই ডাউট যে তোমার ব্রেনের সাথে সাথে হাতে পায়েও সমস্যা আসে। নয়তো যেখানে সেখানে হুটহাট চিৎপটাং হয়ে যাও কেনো? আর এই ভোর বেলা ফুলের সাথে কোনো পাগলও কথা বলবে না৷ সেখানে তুমি তাকে ইতিহাস শুনাচ্ছিলে। এসব কি কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের কাজ! নাউ ইউ টেল মি, (ফিসফিস করে) এই অস্বাভাবিক পা নিয়ে কোথাও হোচট খেয়ে কি মাথায় চোট পেয়েছিলে? না মানে আমার জানামতে তোমার ফ্যামিলিতে বাকিরা যথেষ্ট সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ মাশাল্লাহ। সেখানে তু.. ‘

আর সহ্য করতে পারলো না সায়েরী। একহাতে সাফওয়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলো নিজের কাছ হতে৷ ক্ষিপ্ত স্বরে কিছু বলবে এমন সময় আচমকা বুকে হাত চেপে অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো সাফওয়ান। সায়েরী চমকে উঠলো। আতংকের সাথে লক্ষ্য করলো দুই হাটু গেড়ে বুকে হাত চেপে বসে পড়েছে সাফওয়ান। মাথা নিচু করা। জোর দিয়ে চেপে ধরেছে নিচের ঠোঁট। চোখজোড়া বন্ধ৷ ভয়ে হাত, পা কেঁপে উঠলো সায়েরীর। অবচেতন মনে এ কি করে বসলো সে! নিজের উপর নিজেরই রাগ উঠলো তার। চোখের সামনে ভেসে উঠলো গত কালকের দেখা সাফওয়ানের বুকের ক্ষত চিহ্ন। কতোটা গভীর ছিলো সেটা। সেখানে কিনা এভাবে ব্যাথা দিলো সে! এমনিতেই খুব নরম মনের মেয়ে সে। সেখানে আজ নিজের ভুল টুকু বুঝতে পেরে মুহূর্তেই চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো তার। এগিয়ে গেলো সাফওয়ানের কাছাকাছি। হতদন্ত গলায় বললো,

‘ স..সরি। ভীষণ সরি। আ..আমি আমি বুঝতে পারিনি আপনি এভাবে ব্যাথা পাবেন। আমি ইচ্ছে করে করিনি। সত্যি বলছি। ‘
আকুতিভরা রিনরিনে কন্ঠটা শুনে চোখ তুললো সাফওয়ান। তার মুখের অনেকটা কাছাকাছি সায়েরীর কান্নারত মুখ। তার দৃষ্টি সাফওয়ানের প্রসস্থ বুকের দিকে। ডাগর ডাগর চোখ জোড়া ছলছল করছে। থুঁতনি কাঁপছে। থেমে থেমে পাতলা ঠোঁটজোড়াও কাঁপছে৷ বুক থেকে চোখ তুলে সাফওয়ানের বাদামি চোখজোড়া দিকে তাকালো সায়েরী। ঠোঁট উলটে বললো,
‘ আমি ইচ্ছে করে করিনি। বিশ্বাস করুন! ‘
নিশ্চুপ সাফওয়ান চোখ সরিয়ে নিলো। হঠাৎ করেই আপমনে হাসি পেলো সায়েরীর অবস্থা দেখে। এই কয়েকদিনে এটুকু বুঝেছে, এই মেয়ের রিয়েকশন সিস্টেম একেবারে অটো। কাঁদতেও সময় লাগেনা, হাসতেও সময় লাগেনা। মুহুর্তে রেগে বোম, আবার পরমুহূর্তে গলে একেবারে পানি। গলা ঝেড়ে গম্ভীর কন্ঠে সাফওয়ান জবাব দিলো, — আ’ম ফাইন।

টলমল চোখ নিয়ে সায়েরী তখনো সাফওয়ানের বুকের দিকে তাকিয়ে। আন্দাজ করার চেষ্টা করছে, ঠিক কতোটুকু ব্যাথা দিয়েছে সে সাফওয়ান’কে৷ তার দিকে একপলক তাকিয়ে চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো সাফওয়ান। প্যান্টের ময়লা ঝেড়ে হাত বাড়িয়ে দিলো সায়েরীর দিকে। কান্না ভুলে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে বাড়ন্ত হাতটার দিকে তাকিয়ে সায়েরী। দ্বিধা দ্বন্দ্বের সাথে নিজের নরম হাত রাখলো সাফওয়ান শক্তপোক্ত হাতে৷ এরপর উঠে দাঁড়িয়ে স্কার্টের ধুলো ঝাড়লো। ততক্ষণে সাফওয়ান পা বাড়িয়েছে বাগান থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য। তার দিকে একপলক তাকিয়ে সায়েরী দৌড় লাগালো। সাফওয়ানের লম্বা লম্বা পায়ের গতির সাথে নিজের গতি মেলাতে বেশ বেগ হতে হলো তাকে। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নম্র কন্ঠে বললো,

‘ ঘুরতে যাচ্ছেন? ‘
‘ হু! ‘
‘ আমিও যাই সাথে? ‘
সাফওয়ান হ্যাঁ বা না কিছুই বললো না। সায়েরী ভাবলো হয়তো সে বিরক্ত হচ্ছে৷ তাই কদম থামিয়ে দিলো৷ সাফওয়ান আনমনে তখন খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিলো। সায়েরীকে থেমে যেতে দেখে পেছন ফিরলো সে। সায়েরীর মনোভাব বুঝতে পেরে ঘড়িতে সময় দেখে বললো,

‘ বান্দরবানের আসল সৌন্দর্য মিস না করতে চাইলে দ্রুত চলো। সময় তোমার জন্য থেমে থাকবে না। ‘
সাফওয়ানের বলতে দেরি। কিন্তু সায়েরীর দৌড়ে আসতে দেরি নেই। একটু আগের কান্না ভুলে দিব্যি হাসিমুখে সে সাফওয়ানের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে চলছে৷ সাথে বড় বড় চোখ মেলে দেখছে বান্দরবানের ভোরের দৃশ্য। সূর্যের দেখা নেই বিন্দুমাত্র। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। শীতল বাতাসে সবদিক স্নিগ্ধ করে তুলছে। চারপাশে দেখতে দেখতে সায়েরীর চোরা চোখ এসে থামলো সাফওয়ানের উপর। তখন খেয়াল না করলেও এখন ছোট খাটো একটা ধাক্কা লাগলো বুকে৷ সারাজীবন শুনে এসেছে ঘুম থেকে উঠার পর মেয়েদের সো বিউটিফুল, সো প্রিটি একেবারে কিউটের ডিব্বা লাগে। কিন্তু আজ সাফওয়ানকে দেখে সেসব কথা নেহাৎ মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে তার৷ এই যে তার পাশে অবস্থানরত ছেলেটাকে ঘুম থেকে উঠার পর অত্যাধিক ফর্সা লাগছে। ক্লিন সেভ করা ফর্সা গাল, খাড়া নাকটা লাল হয়ে আছে। বাদামী মণির চোখজোড়ায় অনেকটা ফোলা ফোলা ভাব৷ আর ঠোঁট! দেখতে দেখতে ফাঁকা ঢোক গিললো সায়েরী। মনে মনে বেশ কয়েকবার “আসতাগফিরুল্লাহ” পড়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো৷ এ কি অসভ্য চিন্তা ভাবনা! ছিঃ! ছিঃ!

কিন্তু বেশিক্ষণ আর এই মনোভাব রাখতে পারলো না সে। খানিকটা মাথা উঁচু করে আড়চোখে আবারো তাকালো সাফওয়ানের দিকে। সাফওয়ানের হালকা ব্রাউন সিল্কি চুলগুলো কি সুন্দর এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে কপালজুড়ে। বলিষ্ঠ শরীরে হোয়াইট টি-শার্ট, তারউপর ডার্ক ব্রাউন শার্ট। যার সব বোতাম খোলা রেখেছে, এবং হাতা বরাবরের মতোই কনুই অবধি গুটানো। সাথে ব্ল্যাক জিন্স এবং হোয়াইট স্ন্যাকারস। হাতে সবসময়ের মতোই ব্ল্যাক অ্যাপল ওয়াচ। গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে রেখেছে৷ সায়েরী জানে এই ক্যামেরাটা জিমনের৷ আগাগোড়া সাফওয়ানকে পরখ করে সে গাল ফুলিয়ে ভাবলো, এই ছেলে সমসময় এতো পরিপাটি কি করে থাকে? কই সে তো পারে না৷ এইযে ঘুম থেকে উঠে কোনো রকমে চলে এসেছে বাগানে। লম্বা চুলগুলো কোনো রকমে ক্লিপ দিয়ে আটকানো। তাও কিছু চুল চোখে মুখে এসে বিরক্ত করছে৷ আর ঘুম থেকে উঠলে তো তার ফোলা ফোলা গাল আরো ফোলে থাকে৷ তখন নিজেকে নিজের কাছে জলজ্যান্ত মিষ্টিকুমড়ো মনে হয়৷ সৌন্দর্য নামক কিছু আছে বলে মনে হয়না। তাছাড়া রাতে সে ঘুমুতেই পারেনি। চোখ বুজলেই সেই মর্মান্তিক ঘটনাটা চোখে ভাসছিলো। ভীষণ রকমের আতঙ্কে গুটিয়ে ছিলো নাজরাতের সঙ্গে। কেঁদেছেও খুব। ভোরের দিকে একটুখানি ঘুম ধরা দিয়েছিলো চোখে। কিন্তু সেই মুহূর্তে তোহার এক ধাক্কায় সোজা তার স্থান হয়েছিলো ফ্লোরে। কপাল! কপাল! গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সায়েরী। তার জানা আছে, এই জীবনে তার এসব তাড়াহুড়ো, এলোমেলো স্বভাব বদলাবার নয়। সায়েরী যখন গভীর ভাবনা নিয়ে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে ঠিক তখনই সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো তার দিকে। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ আমাকে চেক আউট করা শেষ হলে এবার গাড়িতে উঠো। ‘

থমথম খেয়ে গেলো সায়েরী। লজ্জায় গাল গরম হয়ে উঠলো। ইশশ! কেমন ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে ছিলো সে! মাথা নিচু করে চুপচাপ গাড়িতে চড়ে বসলো। পরপরই উঠে আসলো সাফওয়ান। সে ভেবেছিলো ভোরের সময় হওয়ায় গাড়ি পেতে বেশ বেগ পেতে হবে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে পেয়ে গিয়েছে৷ গন্তব্যে পৌঁছে আবারো হাঁটা ধরলো তারা। পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটছে দুজন। আশেপাশে মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। সায়েরী হাঁটতে গিয়ে আশেপাশে তাকানোর অবকাশ পাচ্ছে না। মাটির দিকে তাকিয়ে সাবধান পায়ে এগিয়ে চলছে। পাহাড়টি ছোট, তবুও হাটতে বেশ ক্লান্ত লাগছে৷ অবশেষে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে দুহাত কোমড়ে রেখে হাঁপাতে লাগলো সে। বড় বড় শ্বাস নিয়ে সামনে তাকাতেই হঠাৎ চোখ আটকে গেলো। কোমড়ে রাখা হাতদুটো অবশ হয়ে ঢলে পড়লো। একি দেখছে সে! এতো সমুদ্র! পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের সমুদ্র!

মন্ত্রমুগ্ধের মতো সামনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আশ্চর্য চোখ তুলে সে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। জানতে চাইলো, সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? কিন্তু কণ্ঠনালী দিয়ে কথা বের হলো না৷ তার প্রশ্নবিদ্ধ চোখজোড়া দেখে সাফওয়ান ছোট্ট করে জবাব দিলো,
‘ এটা নীলাচল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ফুট উপরে দাঁড়িয়ে আছো তুমি। ‘
বিষ্ময়ে চোয়াল ঝুলিয়ে হা হয়ে গেলো সায়েরী’র। ভাবতেই অবাক লাগছে সে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এখন দুই হাজার ফুট উপড়ে আছে। নামটাও কি সুন্দর “নীলাচল”! মুগ্ধ চোখ সামনের দিকে তাকিয়ে কুয়াশার মতো সাদাটে ধোঁয়া গুলোর দিকে কম্পিত হাত বাড়িয়ে দিলো সায়েরী। সাথে সাথে ভিজে গেলো তার হাত। সায়েরী চমকে উঠলো। অদ্ভুত অনুভূতি’তে কেঁপে উঠলো দেহ। চোখ বড় বড় করে ভেজা হাতের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠলো,
‘ সাফওয়ান ভাই! আ..আমার হাত ভিজে গেলো কেনো? এটা…এটা কি মেঘ! ‘

উত্তেজনায় কথা জড়িয়ে আসলো সায়েরীর। গলা কাঁপছে। তার অবস্থা দেখে মুচকি হাসলো সাফওয়ান। মাথা নেড়ে বুঝালো হ্যাঁ, এটা মেঘ। তা দেখে উত্তেজনায় কথা বলতেই ভুলে গেলো সায়েরী। কম্পিত পা জোড়া এগিয়ে এক কদম সামনে এগোতেই শুভ্র রাঙা মেঘ এসে ভিজিয়ে দিলো তার মুখশ্রী। আবেশে চোখ বুজে ফেললো সে। আবার চোখ খোলে দুহাতে মুখ চেপে ধরলো। অত্যাধিক খুশিতে তার চোখ ভিজে উঠেছে। পুণরায় মেঘ এসে মুখ ছুঁয়ে দিতেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো সে৷ অথচ চোখে ছাপিয়ে তখনো জল গড়িয়ে পড়ছে তার৷ পাশে অবস্থানরত সাফওয়ান সায়েরীর আনন্দে ভরা মুখ দেখে অন্যকোনো দিকে তাকাতেই ভুলে গেলো। সায়েরীর ডাগরডাগর ভেজা চোখ জোড়া তার চোখের দিকে তাকাতেই থমকে গেলো সে। কালো মণির এই বড় বড় আঁখি পল্লব ভীষণভাবে আকর্ষণ করছে তাকে।কেমন এক সম্মোহনী দৃষ্টি!

হাতের ক্যামেরা দিয়ে মুহুর্তটা বন্দী করে নিলো সাফওয়ান। শুভ্র মেঘের রাজ্যে শুভ্র রাঙা কাপড় জড়িয়ে মেঘের সাথে মিশে আছে এক শ্যামকণ্যা। ঠোঁটে হাসি, চোখে জল। হাত খোপা করা চুলগুলো খুলে গিয়েছে অনেক আগেই। যা মৃদু বাতাসের তালে উড়ছে।এর চেয়ে মুগ্ধকর দৃশ্য যেনো আর হওয়ার নয়। এই দৃশ্য দেখে সাফওয়ান নামক প্রাপ্ত বয়স্ক যুবকটাও হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেলো যেনো। সায়েরীর সম্মোহনী চোখের দৃষ্টিতে এই প্রথম ঠের পেলো বুকের বাম পাশে কিছু একটার অস্তিত্ব। ধকধক শব্দ তুলে লাফাচ্ছে সেটা। সেই সাথে কেমন একটা তীক্ষ্ণ ব্যাথা উপলব্ধি হচ্ছে। চোখ বুজে বুকের বাম পাশে হাত চেপে বড় বড় শ্বাস নিলো সে। এ কেমন অনুভূতি! কোন মায়াজালে আটকা পড়ছে সে! পূনরায় সায়েরীর দিকে তাকাতেই ভেজা লম্বা পাপড়ি নেড়ে ঘন ঘন পলক ফেলে তার দিকে তাকালো সায়েরী। নিজের উত্তেজনা দমাতে না পেরে অবচেতন মনে হুট করে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো সাফওয়ানের এক বাহু। উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,

‘ থ্যাঙ্কিউ, থ্যাঙ্কিউ সোওও মাচ সাফওয়ান ভাই! আপনি সাথে না আনলে আমি কখনো এতো সুন্দর দৃশ্য দেখতেই পারতাম না। থ্যাঙ্কিউ সো মাচ! ইশশ!! আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না আমি মেঘ ছুঁয়েছি! ‘
আকস্মিক এতোটা কাছাকাছি এসে পড়ায় সাফওয়ান থমকে গেলো। বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে রাখা সায়েরীর লম্বা চুল হতে খুব সুন্দর একটা ঘ্রাণ এসে প্রবেশ করছে নাসা রন্ধ্রে। সাফওয়ান বিমোহিত হতে বাধ্য হলো। অবচেতন মনে চোখ বুজে ফেললো। শক্ত হলো হাতের মুষ্টি। ঠিক তখনই তাকে ছেড়ে দিলো সায়েরী। যেমন বেহুশে কাছে এসেছিলো, তেমন করেই আবার দূরে সরে গেলো। এখনো সে হুশে নেই। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে সে হারিয়ে গিয়েছে। কি করছে, কি বলছে কিছুতেই ধ্যান নেই তার। ধীরে ধীরে আকাশের গুমোট ভাব কেটে গিয়ে সূর্যের দেখা মিললো। আলোকিত হয়ে উঠলো ধরনী। একটু একটু করে পাহাড়ের কোল ছেড়ে সূর্য উদিত হচ্ছে। সেদিক তাকিয়ে আরেকদফা মুগ্ধ হলো সায়েরী।

কি মনোরম সেই সৌন্দর্য! কমলা রাঙা রৌদ্র তেজে তার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। চিকচিক করছে খোলা চুল। সেদিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিলো সাফওয়ান। গম্ভীর কন্ঠে বললো, ‘ চুল বাঁধো। ‘
ভ্রুঁ কুঁচকালো সায়েরী। তবে বললো না কিছু। দক্ষ হাতে সব চুল একত্রিত করে খোপা করে নিলো। যতোক্ষণ তার হাত ঘাড় বেড়ে নিচে না নেমেছে, ততক্ষণ তাকিয়ে রইলো সাফওয়ান। এরপর হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বললো এবার ফিরতে হবে। সায়েরী বাধা দিলো না। বরং হাসিমুখে লাফিয়ে লাফিয়ে সাফওয়ানের আগেই নামতে লাগলো। পেছন থেকে সাফওয়ান সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে পরখ করছে তাকে। সাদা শার্ট এবং নিচে মাল্টি কালারের লং স্কার্ট পরেছে সায়েরী। এই পাহাড়ি রাস্তায় স্কার্টটা সামলাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাকে। মাত্র উদিত হওয়া সূর্য মামা আবারো মুখ লুকাতে বাধ্য হলো ঘন মেঘের আড়ালে। আজ মেঘের আনাগোনা বডড বেশি। আকাশে গুমোট ভাবটা আবারো ফিরে এসেছে। দেখে মনেই হচ্ছে না একটু আগে সূর্য উঠেছিলো। সাফওয়ান এবং সায়েরী পাহাড় থেকে নেমে মেইন রোডে পৌঁছাতই হঠাৎ গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি নামলো। খুশিতে নেচে উঠলো সায়েরীর মন। হাটতে হাটতে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো বৃষ্টিকণা। বৃষ্টির গতি বাড়লো। আচমকা থেমে গেলো সায়েরী। পেছন ফিরে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে আতংকিত গলায় বললো,

‘ সে কি! আপনি বৃষ্টিতে ভিজছেন কেনো? ‘
সাফওয়ান চোখ কুচকে তাকালো। আপাতত তার ধ্যান জ্ঞান একটা গাড়ি পাওয়ায় আকাঙ্খায়। কিন্তু সায়েরীকে দেখালো বড্ড অধৈর্য। আশেপাশে তাকিয়ে লক্ষ্য করলো রাস্তার পাশে প্লাস্টিক দিয়ে বাধানো একটা ছাউনি রয়েছে। হয়তো ছোট খাটো দোকানপাট বসে এখানে। সেদিকে তাকিয়ে হুট করেই সাফওয়ানের হাত টেনে দ্রুত পা বাড়ালো সে। জোর গলায় বললো, ‘ তাড়াতাড়ি চলুন! ‘
সাফওয়ান হতবাক। টেনে নেওয়া হাতটার দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগলো, এই পুচকি মেয়ে তাকে হুকুম করছে! যে হাত টেনে ধরেছে, এই মুহূর্তে কানের নিচে সেই হাত দিয়ে শক্ত এক থাপ্পড় মারলেই তো দুদিন যাবত সে রাস্তায় পড়ে থাকবে৷ ছাউনির নিচে এসেই হাত ছাড়লো সায়েরী। নিজের শরীরের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে খানিকটা তেজি কন্ঠে বললো,

‘ পাগল নাকি আপনি! ডাক্তার বলেছিলো না শরীরে পানি না লাগাতে? ইনফেকশন হলে কতো ক্ষতি হবে ধারণা আছে? ‘
সাফওয়ান এবারেও নিশ্চুপ। অবশ্য তার উত্তরের আশা করলো না সায়েরী। নিজের শরীরের পানি ঝেরে শার্ট-টা একটুখানি ঠেলে দিলো কাধের দিকে। ফলস্বরূপ হলদেটে ঘাড় কিঞ্চিৎ দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। আনমনে সেদিকে একপলক তাকিয়ে চোখ আটকে গেলো সাফওয়ানের। সায়েরীর ঘাড়ের বাম দিকে গলা ঘাড় সংলগ্ন স্থানে পাশাপাশি লাল,কালো দুটো তিল। ফোটা ফোটা জলকণা জলে আছে তাদের আশেপাশে। যার কারণে জ্বলজ্বল করছে সেগুলো। মেয়েদের শরীরের তিল আকর্ষণীয় হয় শুনেছে সে, তবে এতোটা আকর্ষণীয় হয় তা জানা ছিলো না তার। শুকনো ঢোক গিললো সে। আচ্ছা, মেয়ে বলেই কি এতোটা আকর্ষিত হচ্ছে সাফওয়ান? নাকি সায়েরী বলে? উত্তর মিললো না কোন। দৃষ্টি সরিয়ে সে ধমকের সুরে বলে উঠলো,

‘ এই মেয়ে! চুল বেঁধে রেখেছো কেনো? খোল! ‘
ভরকে গেলো সায়েরী। বলে কি এই ছেলে! একটু আগেই চুল বাধতে বলেছে, এখন আবার ধমক দিচ্ছে চুল কেনো বেধেছে বলে। মাথা মন্ডু নষ্ট হয়ে গিয়েছে নাকি? সাফওয়ানের কথায় বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আবারো বৃষ্টি দেখায় মন দিলো সে। এমন ব্যাবহারে আচমকা তার কনুই ধরে কাছে টেনে নিলো সাফওয়ান। খোপা টান দিয়ে নামিয়ে দিলো ভেজা চুল। এরপর নিজের ব্রাউন শার্ট খুলে সায়েরীর ভেজা শরীর ঢেকে দিতে দিতে রাগী কন্ঠে বললো,
‘ বুদ্ধি-সুদ্ধি কি হবে না এই জীবনে? এমন ভেজা পিঠ দেখিয়ে কি বুঝাতে চাইছো? ইউ আর সো অ্যাক্ট্রাক্টিভ? অর..ইউ ওয়ান্ট টু সিডিউস মি, হুহ? ‘

অপমানে কান গরম হয়ে উঠলো সায়েরীর। সেই যে মাথা নিচু করে সাফওয়ানের শার্ট দিয়ে শরীর ঢেকে নিলো, এরপর আর তাকালোই না। সাফওয়ান আর খাটাল না তাকে। আরো অনেক্ষন পর বৃষ্টি থামলো। দুজন পৌঁছালো হোটেলে। ভার মুখে সায়েরী আগে আগেই ঢুকে গেলো ভিতরে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছাতেই দেখলো তোহা, নাজরাত এবং সাফ্রিন’কে। তিনজন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো সায়েরীকে আগাগোড়া পরখ করে। তাদের অদ্ভুত চাহনি দেখে ভরকে গেলো সায়েরী। পরপরই নিজের শরীর থেকে সাফওয়ানের শার্ট- টা খুলে মাত্র উপস্থিত হওয়া সাফওয়ানের হাতে ধরিয়ে দিলো। সাফওয়ান নিঃশব্দে স্থান ত্যাগ করলো। দুজনের অবস্থা দেখে তোহা কিছু বলতে চাচ্ছিলো কিন্তু তার আগেই তোহার মুখ চেপে ধরলো সায়েরী। চাপা স্বরে ধমকে উঠলো,

‘ খবরদার মুখ খুলবি না তোহার বাচ্চা। নিজের নষ্টালজিক মাথা থেকে সব চিন্তা ভাবনা ধুয়েমুছে ছুড়ে ফেল। ‘
তাদের অবস্থা দেখে নাজরাত এবং সাফ্রিন মিটিমিটি হাসছে। তোহা সায়েরীর ভেজা চুলে হাত গলিয়ে ন্যাকামি কন্ঠে বললো,
‘ ওহো বেবি! তুমি কি করে বুঝলে আমি নষ্টালজিক কিছু বলতে চাচ্ছিলাম? তবে কি এমন কিছু….. ‘
বাকি কথা শুনার আগেই কান চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলো সায়েরী,
‘ ছি! ছি! জঘন্য কথাবার্তা! ‘
এরপর আবার কন্ঠে খাদ নামিয়ে বললো,

‘ এই তোরা জানিস না ওই গোমড়া মুখোটা কেমন স্বভাবের? জীবনেও দুই দন্ড মিষ্টি কথা তার মুখ দিয়ে বের হবেনা, আর তোরা আছিস কিসব..ছিহ! শুন, আমার মতো এক্সটা সুইট, একদম ইয়াম্মি আইস্ক্রিমের মতো মেয়ের সাথে এমন করলা মানবকে কোনো ভাবেই মানায় না বুঝেছিস! তাই এই নষ্টালজিক চিন্তা জানলা দিয়ে ছুড়ে মার। গেলাম আমি, চেঞ্জ করতে হবে। ‘

তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় বিভোর হলো বাকি তিন রমনী। সকলে জানে সাফওয়ান, সায়েরীর মাঝে আকাশ পাতাল তফাৎ। একজন উত্তর মেরু তো আরেকজন হলো দক্ষিণ মেরু। এদের নিয়ে একত্রিত কোনো চিন্তাভাবনা কারো মাথায় আসেনা। তবে বিগত কয়েকদিনের ঘটনায় তারা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। তোহা এবং নাজরাতকে এমন গভীর ভাবনায় দেখে সাফ্রিন গলা ঝেরে বললো,
‘ তোরা বেশি বেশি ভাবছিস। আমার যে অনুভূতিহীন ভাই, একে দিয়ে প্রেম-ট্রেম কোনো কালেই হবে না। নেভার। ‘
নাজরাতও সায় জানিয়ে বললো,

‘ একদম ঠিক। আর প্রেম যদিও করেও থাকে সেটা সায়ু’র মতো ঝামেলা বস্তা মেয়ে অবশ্য হবে না। সাফওয়ান ভাই যা ম্যাচিউর! উনার সাথে উনার মতো একজনকেই মানাবে। না কি এই চলতি ফিরতি তুফান উরফে সায়েরী। যে হাটতে গেলেই উষ্ঠা হয়ে চিৎ হয়ে থাকে। বাকি কথা না-ই বা বললাম। ‘
সবকথা শুনেও মেনে নিতে পারলো না তোহা৷ বিড়বিড় করে বললো,
‘ তবে আমার কেনো মনে হচ্ছে যে, বাতাস আজকাল অন্যদিকে বইছে!! ‘

সাফওয়ান নিজের রুমে পৌঁছানো মাত্র জিমন এবং রায়ানের কাছ থেকে শুনতে পেলো ভোর বেলা মিহাদ নিজের কাপড়চোপড় নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে৷ কথা শুনে চমকে উঠলো সে৷ ইরার খোঁজ নিতেই জানতে পারলো সে নীতির সাথে আছে। তারা আন্দাজ করেছে আবারো ঝগড়া বাধিয়েছে দুজনে৷ কিন্তু ঠিক কি হয়েছে জানে না কেউ। ইরা সেই সকাল থেকে মুখ দিয়ে টু শব্দ অবধি করে নি। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এক জায়গায় বসা। মিহাদকে শখানেক কল করেও পাওয়া গেলাও না। কি এমন হয়েছে বুঝে উঠতে পারলো না তারা৷

ব্রেকফাস্টের সময় ইরা শুধু বলেছে সে রেস্ট করতে চাই। কেউ যেনো তাকে বিরক্ত না করে। নীতি সাথে থাকতে চাইলেও ইরা তাকে ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিলো বাকিদের সাথে৷ অগত্য কথামতো ইরাকে রেখেই সবাই ঘুরতে বের হলো। ভাবলো হয়তো কিছুক্ষণ একা থাকলে মাইন্ড ফ্রেশ হবে তার৷ ব্রেকফাস্টের পর বেরিয়ে পড়লো সকলে। নাফাকুম খুমতায়া ঝরণা, ডিম পাহাড়, মিলনছড়ি, চিম্বুক পাহাড় সহ গুটিকয়েক জায়গায় ঘুরেছে। বান্দরবানের সৌন্দর্যে বিমোহিত সকলে। সব শেষে হোটেলে ফিরেছে প্রায় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা’র দিকে। ক্লান্তিতে একেকজনের চোখে বুজে আসছে৷ ট্যুরের শেষ রাত্রি। আগামীকাল সকালের বাসে ফিরে যাবে সকলে। সাথে নিয়ে যাবে শুধু স্মৃতিটুকু। কিছুটা সুখময়, আবার কিছুটা দুঃখের। কে জানে কোন মোড় আসবে আজকের পর তাদের জীবনে!

দীর্ঘ ছয় ঘন্টার জার্নি শেষ করে সকলে এসে পৌঁছালো কাঙ্ক্ষিত স্থানে। কলেজ গেইটের সামনে দাঁড়িয়েছে সবকয়টি বাস। যার যার ব্যাগপত্র নিয়ে একে একে নেমে দাঁড়ালো সকলে। সায়েরীর পিঠে ছোট্ট একটা ব্যাগ ঝুলছে শুধু। বাকি দুই ব্যাগের একটা আয়ানের এবং অন্যটা ফায়াজের হাতে৷ সব জিনিসপত্র বুঝে নিয়ে সাফ্রিন বাদে বাকি ছয় জন এবার মেইন রোডে এসে দাঁড়িয়েছে৷ ঠিক সেই মুহূর্তে দেখা মিললো আবরারের৷ তাকে দেখে পেছন থেকে সাফওয়ান, জিমন, রায়ান এবং নীতি এগিয়ে আসলো। আবরার মুখ খুলে কিছু বলতেই নিচ্ছিলো, এমন সময় আচমকা সায়েরী সকলকে উপেক্ষা করে আবরারের কাছে এসে চুল খামচে ধরলো তার। তেজি কন্ঠে চেঁচিয়ে বললো,

‘ শয়তান ছেলে! কিভাবে পারলে একটা সাইকেলের জন্য আমাকে বেচে দিতে? কেমন ভাই তুমি! ‘
আকস্মিক আক্রমণে আবরার হতভম্ব। কিন্তু বাকিরা উচ্চস্বরে হেসে উঠলো সায়েরীর কথা শুনে। সাফওয়ান নিজেও একটুখানি হাসলো নিঃশব্দে। চুল থেকে হাত সরিয়ে গাল ফুলিয়ে তাকালো সায়েরী৷ ঠোঁট উলটে বললো,
‘ এতোটা স্বার্থপর তুমি ভাইয়া! তোমার সাথে কথায় নেই। ‘
হতবাক আবরার প্রশ্নবিদ্ধ চোখে বন্ধুদের দিকে তাকালো। সাফওয়ান কাঁধ ঝাকিয়ে বুঝালো এসবে তার কোনো হাত নেই। জিমন ফিচেল হেসে বললো,
‘ আরে বুঝতে পারছিস না নাকি! এসব গোপন রহস্য ফাঁস করার কাজ মিহাদ ছাড়া আর কে করবে? ওই ব্যাটা বলেছে এসব সবার সামনে। ‘

মাথা নেড়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো আবরার৷ বললো,
‘ তা কোথায় তিনি? ডাক দে। একটু খাতিরদারি করি। ‘
এই পর্যায়ে চুপসে গেলো বন্ধুরা। কাল থেকে মিহাদের সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারছে না তারা৷ ইরাও কেমন যেনো হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে পড়েছে৷ কাল থেকে খুব প্রয়োজন ছাড়া মুখ খুলে একটা কথাও বলেনি সে৷ তারপর আবার সকালে নীতি জানালো সারারাত নিঃশব্দে কেঁদেছে ইরা৷ কি হচ্ছে কিচ্ছুটি মাথায় ঢুকছে না তাদের। কারো জবাব না পেয়ে কপালে ভাঁজ পড়লো আবরারের। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ব্যাগ হাতে এগিয়ে আসলো ইরা। অনেকগুলো মাস পর আবরারের সাথে তার দেখা। একটুখানি হাসার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু ঠিকঠাক সফল হলোনা। তবে আবরার গাল ভরে হাসলো। কাছে গিয়ে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরলো ইরাকে। ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলো। ইরা শুধু জবাবটুকু দিলো, বাড়তি একটা কথাও বললো না৷ আবরারের সাথে কথা শেষে ক্লান্ত স্বরে সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,

‘ তোদের গাড়ি এসেছে? আমাকে ড্রপ দে পারলে৷ ভীষণ টায়ার্ড লাগছে। ‘
গাড়ি অনেক আগেই এসেছিলো। হাত বাড়িয়ে ইরার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সাফওয়ান এগোলো গাড়ির দিকে। পেছনে সাফ্রিন এবং ইরা। একে একে বাকিরাও চলে গেলো যার যার গন্তব্যে। সায়েরী এবং নাজরাত আবরারের সাথেই যাবে। তোহা একা বিধায় আয়ান তাকে নিজের সাথে যেতে বললো। কিন্তু তোহা রাজি হলো না। গম্ভীর হলো আয়ানের মুখ৷ এই প্রেম, ভালোবাসার চক্করে দিনদিন তাদের সুন্দর বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে সেদিনের পর তোহার অস্বস্তি হয় আয়ানের আশেপাশে থাকতে৷ কিন্তু আয়ান নির্বিকার থাকে। যেনো কিছুই হয়নি৷ আজও তোহার কথায় কান না দিয়ে একই রিক্সায় চেপে বসলো দুজন৷ এই সময়টার একটুখানি দুরত্ব দুজনের মাঝে বিশাল দুরত্ব হয়ে দাঁড়াবে একদিন৷ যেটা আয়ান কোনো কালেই প্রত্যাশা করেনা৷ তার জন্য সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে বন্ধুরা। এদের সে হারাতে চাইনা। হারিয়ে যেতে দেবে না।

বাসায় ফিরে সোজা নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকে গিয়েছে ইরা। তার এমন আচরণে মা-বাবা দুজনেই হতবাক। ভেবেছিলো ট্যুর থেকে ফিরলে মেয়েকে একটু স্বাভাবিক দেখবে৷ কিন্তু হলো ঠিক উল্টো-টা। শত ডাকাডাকি করেও ইরাকে রুম থেকে বের করতে পারলো না। ক্লান্ত কন্ঠে সে শুধু একবার বলেছিলো, “মাথা ব্যাথা করতে আম্মু! আমি রেস্ট করবো। কেউ বিরক্ত করবে না প্লিজ!!”

কথামতো কেউ আর আসলো না তাকে বিরক্ত করতে। রুম অন্ধকার করে বালিশে মুখ চেপে ধরলো ইরা। গলায় দলা পাকানো কান্নাগুলো আটকাতে না পেরে হু হু করে কেঁদে উঠলো। অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ করএ উঠলো ,
‘ আমাকে কেনো দূরে সরিয়ে দিলি মিহাদ! কেনো এতো কষ্ট দিচ্ছিস! ‘
তার এক একটা আর্তনাদ চাপা পড়লো চার দেয়ালে মাঝে। কাঁদতে কাঁদতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়লো সে। গলা ভেঙ্গে আসলো। আটকে আসলো শ্বাস। লালছে ফোলা ফোলা চোখজোড়া বড্ড জ্বলছে। ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে নিজেকে একটুখানি শান্ত করার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু চোখ যেনো বাধ মানছে না। অনেকটা বাধ্য হয়েই চোখ খিচে শুয়ে রইলো। মনকে বুঝালো, কাঁদবে না আর ওই নিষ্ঠুর পুরুষটার জন্য৷ যে ইরার হাজার আকুতি তাচ্ছিল্য করতে পেরেছে, ইরার কাছ থেকে নিজেকে দূরে রেখে হাসিখুশি থাকতে পারছে, সে পুরুষটার জন্য কান্না করাটা বোকামি বাদে কিছু নয়৷ কিন্তু বেহায়া মন তবুও শান্ত হলো না। ক্ষান্ত হলো না চোখ দুটো। বন্ধ চোখে পুণরায় ভেসে উঠলো গতকাল ভোরের দৃশ্যটুকু……

ভোর সাড়ে ৪টা তখন। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মিহাদের উন্মুক্ত বুকে ঘুমিয়ে ইরা। মিহাদের দুইহাত আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে তাকে। আচমকা ঘুম ভেঙে গেলো ইরার। শরীর জুড়ে এক অসহনীয় ব্যাথা অনুভব হলো। নড়তে গিয়ে বাধা পড়লো। সচল হলো মস্তিষ্ক। চট করে মাথা তুলে তাকালো সে। খুব কাছে মিহাদের নিষ্পাপ, ঘুমন্ত মুখখানার দেখা পেলো৷ ভালোলাগা-ময় অনুভূতি’তে ছেয়ে গেলো হৃদয়। এরপর আচমকা মনে পড়লো বিগত কয়েকমাসের ঘটনাগুলো। বুক ধরফর করে উঠলো তার। একি করে বসলো ঘোরের বশে! কেনো আটকালো না মিহাদকে! মিহাদ কেমন রিয়েক্ট করবে? মিহাদের ঘুম ভাঙ্গলে কি জবাব দিবে সে? মাথায় জট পাকালো আরো অনেক প্রশ্ন। অস্থির চিত্তে মিহাদের বন্ধন থেকে বেরিয়ে আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা কাপড় তুলে নিয়ে ওয়াশরুমে ছুটলো সে। এর মিনিট দশেক পর ঘুম ভাঙ্গলো মিহাদের।

মাথা প্রচন্ড ভারী ভারী ঠেকছে তার। চোখ মেলে তাকানো দায়। উপুড় হয়ে পুণরায় ঘুমানোর চেষ্টা করলো সে। হঠাৎ অনুভব করলো তার শরীর উন্মুক্ত। আচমকা তার টনক নড়লো যেনো। চট করে উঠে বসলো শোয়া থেকে। ঘুম উবে গেলো। মিলিয়ে গেলো মাথা যন্ত্রণা। তার পরণে একটা টু কোয়াটার প্যান্ট মাত্র। অনুভব করলো ঘাড় এবং পিঠ জ্বলছে। অজানা আতংকে বুক ধরফরিয়ে উঠলো তার। বেড থেকে নেমে দেয়ালে আটকানো লম্বাটে মিররে চোখ বুলালো। মনে প্রাণে চাইলো, সে যা ভাবছে তা যেনো না হয়। কিন্তু তার চাওয়াটুকু পূরণ হলো না। ঘাড়ে, পিঠে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে আঁচড়ের দাগ। তা দেখে থমকে গেলো মিহাদ। এ কি হয়ে গেলো! এরপর আচমকা মনে প্রশ্ন জাগলো, কাল রাতে সে কার সাথে ছিলো!

কার এতো বড় সর্বনাশ করে বসলো সে! ভাবনার মাঝে কানে আসলো ওয়াশরুমের পানির শব্দ। বন্ধ দরজার পানে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো সে। তাড়াহুড়ো করে প্যান্ট পড়ে নিলো৷ ফ্লোর থেকে শার্ট-টা সবে তুলেছে এমন সময় ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসলো ইরা। ভেজা চুল নেড়ে ধীর পায়ে রুমে প্রবেশ করতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেলো সে। সম্মুখে হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মিহাদ। চোখে মুখে একরাশ বিষ্ময় তার। বুক ঢিপঢিপ করছে ইরার। গলা শুকিয়ে আসছে। মিহাদের অবাক দৃষ্টি তখনো তার পানে৷ অবচেতনে মিহাদের হাত ফসকে শার্ট-টা পুণরায় ফ্লোরে পড়ে গেলো। ধপ করে বসে পড়লো সে বেডে। দু’হাতে মুখ ঢাকলো। মাথায় একটু জোর দিতেই মনে পড়ে গেলো গত রাতের আপসা ঝাপসা স্মৃতি। রাগে,জেদে নিজের চুল নিজেই খামচে ধরলো সে। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বললো, শিট! শিট! শিট!
ইরা তখনো থমকে দাঁড়িয়ে। মিহাদের এমন নিরবতায় তার ভেতরের অনুশোচনা বাড়লো যেনো৷ ধীর পায়ে কাছে এগিয়ে আসলো। নিম্ন কন্ঠে ডাকলো, ম..মিহাদ!
সাথে সাথে চোখ তুলে তাকালো মিহাদ৷ তার লাল লাল চোখের ভয়ানক দৃষ্টি দেখে ভড়কে গেলো ইরা। কম্পিত কন্ঠে বললো,

‘ ম..মিহাদ! আমি..আমি আসলে…. ‘
আচমকা শক্ত হাতে ইরার বাহু খামচে ধরলো মিহাদ। ইরার কথাটুকু সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চিৎকার করে বললো,
‘ হাউ কোড ইউ ডু দিস ইরা! একটাবার বিবেক বাঁধা দিলো না তোর? আমি নাহয় ড্রাংক ছিলাম বলে লিমিট ক্রস করে ফেলেছিলাম, কিন্তু তুই আটকাতে পারলি না? এতোটা বিবেকহীন কবে থেকে হলি তুই! বুঝতে পারছিস না আমি তোকে নিজের থেকে দূরে রাখতে চাইছি? বারবার বলার পরেও কীভাবে পারলি এটা করতে? ‘
মিহাদের বলা একেকটা বাক্যে বুকের ভিতরটা ক্ষত বিক্ষত হয়ে উঠলো ইরার৷ তীব্র অভিমানে চোখ ভিজে উঠলো৷ কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা করে সে কম্পিত কন্ঠে বললো,
‘ আ..আমি তোকে ভ..ভালোবাসি মিহাদ! সব রাগ, অভিমান, বিবেক, বুদ্ধির ঊর্ধ্বে গিয়ে ভালোবাসি। এজন্য পারিনি তোর উন্মাদনা আটকাতে। ‘

বিরক্তি’তে মুখ দিয়ে ‘চ’ ধরনের শব্দ করে ইরাকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো মিহাদ৷ রাগে শরীর থরথরিয়ে কাঁপছে তার৷ মিহাদের এমন আচরণে না চাইতেও ফুঁপিয়ে উঠলো ইরা। পূণরায় কাছে এগিয়ে এসে হাত টেনে ধরলো মিহাদের। কান্নারত, আকুতিভরা কন্ঠে বললো,
‘ প্লিজ মিহাদ একটাবার বল কেনো এমনটা করছিস তুই! কেনো দূরে সরিয়ে দিচ্ছিস আমাকে? আই প্রমিজ আ..আমি.. আমি সব শুধরে নিবো। কোনো অভিযোগের সুযোগ রাখবো না৷ এভাবে আমাকে ফিরিয়ে দিস না মিহাদ। আমি সবটা ঠিক করে নিবো। একটাবার বল শুধু! ‘

মিহাদের শক্ত মন এবারেও গললো না। চোখ, মুখ শক্ত করে সে ঠাই দাঁড়িয়ে। ইরার দিকে তাকালো অবধি না। ইরা তখনো মিহাদের হাত ধরে কান্না করে যাচ্ছে। তার বন্ধন থেকে একপ্রকার ঝটকা মেরে মিহাদ ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত। অস্থির চিত্তে পায়চারি করলো বারকয়েক। তবুও যেনো শান্ত হচ্ছে না ভেতরটা। শার্ট গায়ে জড়িয়ে নিয়ে পূণরায় এসে দাঁড়ালো সে ইরা’র সম্মুখে। নিজেকে যথাসম্ভব শক্ত রেখে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ যা হয়েছে ভুলে যা। ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান এক্সিডেন্ট! আই হোপ টিপিক্যাল মেয়েদের মতো এই ঘটনার রেশ ধরে তুই রিলেশন কন্টিনিউ করার শর্ত দিবি না। যেখানে ভালোবাসায় নেই, যেখানে এসবের কোনো মূল্য আছে বলে মনে হয়না। আমি চাইনা তোকে আমার লাইফে। প্লিজ! আমাকে নিজের মতো বাঁচতে দে। যা হয়েছে তা ভুলে যাওয়া-টাই তোর আর আমার, দুজনের জন্যই ভালো। ‘

দরজা বন্ধ করার শব্দে কেঁপে উঠলো ইরা। তার পৃথিবী যেনো এখানেই থমকে গিয়েছে। একটা কথাও বলতে পারলো না মিহাদের বিপরীতে। এসব কি বলে গেলো মিহাদ! এই ছিলো তার ভালোবাসা! তাদের মিলনটা’কে সামান্য একটা এক্সিডেন্ট বলে মনে হচ্ছে তার! সে কি জানে ইরা ঠিক কি বিসর্জন দিয়ে বসেছে তার জন্য! মিহাদের কাছে এসবের কোনো মূল্যই নেই। কতোটা অবলীলায় সে বলে দিলো যে তার মনে কোনো ভালোবাসা নেই। ইরা কীভাবে মেনে নিবে সেটা! চারবছর ধরে যে ছেলেটাকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসে এসেছে, আজ এই ছেলের সাথে সেই আগের মিহাদের যেনো কোন মিল নেই। ইরার সামান্য মন খারাপে যে ছেলেটা অস্থিরতায় ছটফট করে উঠতো, আজ সে প্রতিনিয়ত মরণ যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে তাকে। এতোসব যন্ত্রণা কি করে সইবে ইরা! কিভাবে সহ্য করবে ভালোবাসার মানুষটার এমন অবহেলা! অসহ্য যন্ত্রণায় হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সে। এই কান্না যেনো থামবার নয়। একটা সময় ক্লান্ত হয়ে ফ্লোরে ঢলে পড়লো সে।

কিন্তু তখনো শব্দ বিহীন কান্নায় চোখের কার্নিশ ভিজে উঠছে। ঠিক কতোক্ষন যাবত রুমে ছিলো জানা নেই তার। বেশ অনেক্ষন পর নিজেকে ধাতস্থ করে উঠে দাঁড়ালো সে। শরীর জুড়ে অসহনীয় এক যন্ত্রণা বিরাজ করছে। কিন্তু মনের যন্ত্রণা ফিকে পড়লো শরীরের যন্ত্রণার কাছে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে গাল মুছে এলোমেলো বিছানাটা গুছিয়ে সম্পূর্ণ রুম পরিপাটি করে নিলো সে। তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে৷ নিজেদের রুমে গিয়ে দেখলো নীতি মোবাইল হাতে দাঁড়িয়ে। ইরা’কে দেখে ভারী অবাক হলো সে। কাছে এসে হাজারখানেক প্রশ্ন করলো কিন্তু উত্তর মিললো না কোনো। নীতি নিজ থেকেই বললো, রায়ান জানিয়েছে একটু আগে মিহাদ নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। কথাটা শুনে কিঞ্চিৎ চমকালো ইরা। এরপর নিজের উপর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো৷ বড় কষ্টে নিজের অনুভূতি-টুকু চেপে চোখ বুজে পড়ে রইলো বিছানায়।

দরজায় করাঘাতের শব্দে ঘোর ভাঙ্গলো ইরার। তার মা ডাকছে অনবরত। চোখ মেলে তাকাতে পারছে না সে। একপ্রকার জোর করেই দুর্বল শরীর টেনে নিলো দরজা অবধি। কোনো রকমে লক খুলে দরজার নব ঘুরিয়েছে, এমন সময় নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে ঢলে পড়লো সে ফ্লোরে। মাত্র রুমে প্রবেশ করে মেয়েকে এই অবস্থায় দেখে আৎকে উঠলো ইরা’র মা। চিৎকার করে এগিয়ে গেলেন তিনি ইরার কাছে। তার আওয়াজ শুনে ইরার বাবা এবং কাজের মহিলা এগিয়ে আসলো। মেয়ের এই অবস্থা দেখে দিশেহারা মা, বাবা দুজনেই। জরুরি তলবে ডাক্তার আনা হলো। চেক-আপ করে জানতে পারলো অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে সেন্সলেস হয়ে পড়েছে ইরা। তাছাড়া শরীর প্রচন্ড দুর্বল তার। প্রেশার ফল হয়েছে। খাওয়া দাওয়া করেনি ঠিক মতো। ডাক্তারের কথা শুনে ইরার মা মুখে আঁচল গুজে কেঁদে ফেললেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালেন মেয়ের ফ্যাকাসে মুখটার দিকে। স্যালাইন দিয়ে গিয়েছে ডাক্তার। ক্যানোলা লাগানো হাতটা আলতো করে ধরে তার পাশেই চুপটি করে বসে রইলেন ইরার বাবা৷ বিগত চার-মাস ধরে মেয়ের এই করুণ অবস্থা সহ্য করতে পারছেন না তিনি। হঠাৎ পাশ থেকে ইরার মা বলে উঠলো,

‘ মিহাদ ছেলেটাকে মেনে নাও। আমার মেয়ের এই অবস্থা আমি অবস্থা আমি সহ্য করতে পারছি না৷ কি হবে এতো টাকা, সম্পত্তি দিয়ে যদি মেয়েটাকেই হারিয়ে ফেলি! ‘
ইরা’র বাবা নিশ্চুপ হয়ে ভাবলেন কিছু সময়। মিহাদের ব্যাপারে তিনি জেনেছে মাস চারেক আগে। মধ্যবিত্ত পরিবারের মিহাদকে নিজের মেয়ের জন্য ঠিক মেনে নিতে পারেননি তিনি। বেশ খুশি ছিলেন দুজনের বিচ্ছেদে। তিনি একজন হোটেল ইনভেসটর’স। বিভিন্ন জায়গা বড় বড় হোটেল রয়েছে উনার। টাকা পয়সায় কমতি নেই বিন্দু পরিমাণে। ইরা তাদের প্রথম সন্তান। বড্ড আদরে আহ্লাদে বেড়ে উঠেছে সে। রাজকন্যার মতো বড় করে তোলা মেয়ের জন্য কি করে মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ একটা ছেলেকে মেনে নিবেন তিনি? কিন্তু আজ যেনো সব অহংকার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মিলিয়ে গেলো। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজে গিয়ে কথা বলবে মিহাদের সাথে৷ মেয়ের সুখটাই যে সব কিছুর ঊর্ধ্বে।

সন্ধ্যার শেষ প্রহর। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। উতালপাতাল বাতাস বইছে চারিদিকে ।বাউন্ডারি’র সাদাটে লাইটের আলোয় অনেকটা আলোকিত হয়ে আছে চারদিক। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি উপভোগ করছে সায়েরী। বাটিতে আইসক্রিম নিয়ে একটু একটু করে মুখে তুলছে৷ বৃষ্টির ঠান্ডা পানিতে অর্ধেক শরীর ভিজে গিয়েছে। কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের পানে তাকিয়ে সে। মাথায় ঘুরছে বিগত দিনগুলোর এক একটা ঘটনা৷ গত দুই দিনে অনেকের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে৷ কপালের চোট দেখে সবার কৌতুহলের শেষ ছিলো না যেনো। বড় কষ্টে গলার দাগগুলো লুকিয়েছে। তবুও হয়তো নজরে পড়েছে দুয়েক জনের। কেমন বাঁকা নজকে দেখছিলো তাকে। সব থেকে বেশি আশ্চর্য হয়েছে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের হীনা মেয়েটার আচরণে। যে মেয়ে কখনো রূপ এবং টাকার অহংকারে সায়েরীদের দিকে চোখ তুলে তাকাইনি, সেই মেয়ে যেচে এসে কথা বলেছে তার সাথে। অবাক করা বিষয় হলো হীনা সরাসরি জানতে চেয়েছে ট্যুরের প্রথম রাত্রি’তে সায়েরী কোথায় ছিলো?

কেনো ডিনারের সময় দেখা পায়নি তার! হীনার এমন প্রশ্নে হকচকিয়ে গিয়েছিলো সে। ভাগ্যক্রমে বন্ধুরা থাকায় তারা সামলে নিয়েছে সব। কিন্তু সায়েরীর মনে এখনো খচখচানি বিরাজ করছে। কেনো হঠাৎ এই প্রশ্ন করলো হীনা৷ সে কি তবে জানতে পেরেছে কিছু? সাথে ইপ্সিতা, হীনা, জুঁই তিন বান্ধবী কেমন নজর দিয়ে গিলে খাচ্ছিলো তাকে। তপ্ত শ্বাস ফেললো সায়েরী। বাসায় এসেও কপালের ব্যান্ডেজ দেখে পরিবারের সকলে বেশ উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলো৷ বড় কষ্টে সামাল দিয়েছে সে। এমনিতেই সায়েরীর স্বভাব সম্পর্কে অবগত সকলে। তাই বেশি কিছু বলেনি কেউ৷ ভাবনার মাঝে হঠাৎ বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকালো।

আকাশে একটুখানি আলোর দেখা মিলে পুণরায় মিলিয়ে গেলো সেটা। পরক্ষণেই বিদ্যুৎ নিভে গেলো সবখানে। অন্ধকারে তলিয়ে গেলো সব। ভাবনায় বিভোর সায়েরী চমকে উঠলো। চোখের সামনে সব ঘুটঘুটে অন্ধকার দেখে ধ্ক করে উঠলো বুক। মনে পড়ে গেলো জঙ্গলের সেই কালো অন্ধকার রাতটার কথা। আচমকা আবারো বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকালো। ভয়ে চিৎকার করে উঠলো সায়েরী। হাত ফসকে পড়ে গেলো কাঁচের বাটি। দুহাতে কান চেপে ধরলো সে। ভাঙ্গা কাঁচ ছড়িয়ে পড়ে বারান্দার আনাচে কানাচে। অন্যদিকে সায়েরীর চিৎকার শুনেই দ্রুত পায়ে ছুটে আসলো সকলে। সায়েরীর রুমের পাশেই ডাইনিং রুমে বসে ফোনে কথা বলছিলো আবরার। সাফওয়ান কল দিয়েছে কিছু জরুরি কথা জানাতে। এমন সময় সায়েরীর চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেলো সে। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করে দ্রুত পায়ে এগোচ্ছে, তার আগেই ছুটে গেলো সায়েরীর মা। পেছনে আবরার-সহ তার মা, বাবা এবং ছোট্ট মিনহা। বারান্দায় ভয়ে জুবুথুবু হয়ে থাকা সায়েরীকে দেখে চমকালো তারা। লাইটের আলোয় চোখ মেলে তাকালো সায়েরী। সম্মুখে মা’কে দেখে দু’হাতে ঝাপটে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। তার এমন আচরণে বিচলিত হয়ে উঠলো বাকিরা। সায়েরীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তার বাবা উত্তেজিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করতে লাগলো কি হয়েছে! ভয় পেয়েছে কি না!

মা’য়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকা সায়েরী চোখ বন্ধ অবস্থায় বলতে লাগলো,
‘ লাইট জ্বালাও আব্বু। আমি এই অন্ধকারে থাকতে পারছি না। আ..আমার ভয় লাগছে। ভীষণ ভয় লাগছে। ‘
কান্নার দমকে কন্ঠ ভেঙ্গে আসছে সায়েরীর৷ দৃশ্যমান রূপে থরথরিয়ে কাঁপছে শরীর। উপস্থিত সকলে হতবাক তার এমন অবস্থা দেখে। এর আগে কখনো অন্ধকারে এমন ভয় পায়নি সায়েরী। আজ হলো কি মেয়েটার! হতবাক নয়নে তাকিয়ে থাকা আবরার হঠাৎ খেয়াল করলো হাতের মোবাইলটার অপর প্রান্ত হতে সাফওয়ানের হ্যালো! হ্যালো! কন্ঠস্বর ভেসে আসছে। দ্রুত ফোন কানে চাপলো সে। হতদন্ত গলায় বললো,

‘ হ্যালো! হ্যাঁ আমি তোকে পরে কল ব্যাক… ‘
‘ আবরার! আমার কথা মন দিয়ে শুন। আসলে… ‘
‘ আমি পরে কল করবো তোকে। সায়েরী… ‘
আবরারের এমন তাড়াহুড়ো আচরণে আচমকা রেগে গেলো সাফওয়ান। চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
‘ আবে সায়েরীর জন্যই ফোন করেছি তোকে। সি ওয়াজ মলেস্টেড ইয়ার। ভয় পেয়েছে ভীষণ। কয়েকদিন একটু কাউকে সাথে থাকতে বল। একা থাকলে এমনই প্যানিক করবে। ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত কথাটা শুনে কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো আবরারের। একরাশ বিষ্ময় নিয়ে সে আদুরে বোনটার দিকে তাকিয়ে। বিছানায় বসে মায়ের সাথে লেপ্টে আছে সে। বাবা হাতে লাইট নিয়ে অন্যপাশে বসা। আবরারের বিশ্বাস হলো না সাফওয়ানের কথাটা। কম্পিত কন্ঠে সে বললো,

‘ ক..কীসব বাজে কথা বলছিস তুই! ‘
আবরারের কন্ঠটা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সাফওয়ান। ধীর কন্ঠে বললো,
‘ ইজ সি অলরাইট? ‘
ঘোর কাটলো আবরারের। নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। সাফওয়ানের কথার জবাবে বললো,
‘ ঠিক আছে। কারেন্ট চলে গিয়েছিলো বলে অন্ধকারে ভয় পেয়েছে। তুই বল, কি যেনো বলেছিলি? ‘
কোনো প্রকার জড়তা না রেখে সাফওয়ান খুব সংক্ষেপে খুলে বললো সব ঘটনা। শুনতে শুনতে একপর্যায়ে চোখ রক্তিম হয়ে উঠলো আবরারের। চোয়াল শক্ত হলো। সাফওয়ান বোধহয় আঁচ করতে পারলো তার মনোভাব। শান্ত কন্ঠে বললো,

‘ এখন ওর কাছে কিছু জিজ্ঞেস না করাটাই বেটার। গত দুইদিন বান্ধবীদের সাথে ছিলো বলে ঠিক ছিলো। ফ্রেন্ডরা কেউ ওকে একা ছাড়েনি। আরো কয়েকটা দিন সবার সাথে সাথে রাখ। হোপফুলি ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পারবে৷ ‘
আবরার ছোট করে জবাব দিলো, হুহ!

কল কেটে মোবাইলটার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ান। বুকে অদ্ভুত এক অস্থিরতা অনুভব হচ্ছে তার। আবরারকে সায়েরীর ব্যাপারে জানানোর জন্যই ফোন করেছিলো সে। কথার মাঝে স্পষ্ট কানে আসলো সায়েরীর চিৎকার। পরপরই কান্নার আওয়াজ। যেটা শুনে বিচলিত হয়ে পড়েছিলো সে। চোখের সামনে ভাসছিলো সায়েরীর এক একটা আর্তনাদ, শরীরের ক্ষত চিহ্ন। অজান্তেই বুকে এক তীক্ষ্ণ ব্যাথার সৃষ্টি হলো তার। সহসা চোখ খিচে বুক চেপে ধরলো সে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৩+২৪

এই নিয়ে পরপর দুই বার এই ব্যাথা উপলব্ধি করেছে সে। প্রথমবার যখন সায়েরীকে নীলাচলের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তখন উপলব্ধি করেছিলো। এখন আবারো সেই একই তীক্ষ্ণ ব্যাথা। সাফওয়ান বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক কি ঘটছে তার সাথে। মাথা ঝাড়া দিয়ে নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে ফেললো সে৷ গত তিনদিনে প্রচুর ধকল গিয়েছে। এবার একটুখানি শান্তি দরকার। একটা শান্তির ঘুম দরকার!!

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৭+২৮