অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৪
সাজিয়া জাহান সুবহা
রাতটি ছিলো উদাসীন। দীর্ঘ প্রহরের দম বন্ধকর অসুস্থতা টুকু কাটিয়ে, ক্লান্ত দেহটা বিছানায় শায়িত ছিলো কেবল। কান্নারত আঁখিদুটি মধ্যরাত্রিতে শুকিয়ে এলো ঠিকই। কিন্তু ঘুম নামলো না একদন্ড। অতঃপর, ভোরের আযান ধ্বনি কানে বাজার কয়েক মিনিট পূর্বে, হয়তোবা শয়তানের প্ররোচনায় বুজে এলো চোখদুটো। বুক ভর্তি উদ্বিগ্নতা নিয়ে ঘুমালো প্রায় তিন, চার ঘন্টা। একটানা ঘুমিয়ে আচমকা চোখ মেললো সে। ভোরের ঝকঝকে রোদের ঝলকানি চোখেমুখে স্পর্শ করতেই মস্তিষ্ক থমকে গেলো এক মুহুর্তের জন্য। তাড়াহুড়ায় উঠে বসলো। চঞ্চল হাতে কুড়িয়ে নিলো মুঠোফোন। লক স্ক্রিনে ঝাপসা নজর তাক করতেই হতভম্ব হয়ে গেলো। ৮টা বেজে ২মিনিট! এতো দেরি! অনেকটা ঝড়ের গতিতে বিছানা ছাড়লো সে। এলোমেলো মস্তিষ্কে হানা দিলো গত রাতে সাফওয়ানের সঙ্গে কাটানো দুর্বিষহ মুহুর্তটুকু। বুকের কোণে গুটিশুটি মেরে থাকা বিষাক্ত অনুভূতি গুলো ফের ছটফটিয়ে উঠলো। সাফওয়ান ভাই এখনো রেগে আছে তার উপর? নয়তো কেনো আজ ফোন করলো না তাকে? সায়েরী তো এমন দের অবধি ঘুমুতে পারে না কখনো। ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘটে পৌঁছাতেই ককর্শ মুঠোফোনের শব্দে তার ঘুম ভাঙ্গে। কিন্তু আজকের এই সকাল এমন ভিন্ন কেনো? রোজকার মতো মানুষটা আদুরে কন্ঠে ডাকলো না কেনো? সায়েরীর ফাঁকিবাজি ধান্দায় হতাশ চিত্তে বকলো না কেনো? কেনো একটাবার ফোন দিলো না সায়েরীকে?
একাধিক প্রশ্নে জর্জরিত হলো মন-মস্তিষ্ক। বিনা দোষে অতগুলো কথা শোনার পরেও মন বললো,
“আমি কি আবার কোন বোকামি করেছি? আমার কোন কাজে সাফওয়ান ভাই কষ্ট পেয়েছে কি? অজান্তে কিছু করে উনাকে রাগিয়ে দেইনি তো?”
শতবার ভেবেও নির্দিষ্ট কোন কারণ খুঁজে পেলো না মেয়েটা। তাও মনে মনে স্থির করলো, নিশ্চিত সে-ই কোন ভুল করেছে৷ নয়তো সাফওয়ান ভাই কখনো তাকে এমন বাজেভাবে বকতো না। সজ্ঞানে এতোটা কষ্ট দিতোনা। কাঁচের পুতুলের মতো আগলে রেখেছে যেই রমনীকে, তার পুতুল শরীরে ফাটল ধরার মতো ছুরাঘাত সে কখনো করতো না।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বেলা ন’টা বাজার আগ মুহুর্তে একপ্রকার তাড়াহুড়ো করেই ঘর থেকে বেরুনোর প্রস্তুতি নিলো সায়েরী। তাকে ইউনিফর্ম পরে পরিপাটি হতে দেখে মেহরিন বেগম বেশ কয়েকবার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। যেনো অসুস্থ শরীরে আজ কোচিংয়ে কিংবা কলেজে না যায়। কিন্তু মেয়েটা শুনলো না সেকথা। মায়ের উদ্বিগ্নতা বুঝে শারিরীক দুর্বলতা টুকু সে চেপে গেলো। কৃত্রিম স্বাভাবিকতা দেখিয়ে জানালো,
‘ এখন কোচিং মিস দিলে অনেক কিছু মিস হয়ে যাবে,আম্মু। মাত্র দুই একটা মাস আছে হাতে। একটু কষ্ট না করলে চলবে? ‘
ফাঁকিবাজ মেয়েটার মুখে এমন বাক্য শুনে মেহরিন বেগম কথা হারিয়ে ফেললেন। উনার নিরবতার মাঝেই সায়েরী ছুটে বেরিয়ে গেলো। যেতে যেতে একটাবার নজর দিলো মোবাইল স্ক্রিনে। আধ ঘন্টা পূর্বে সাফ্রিনের আইডি থেকে আসা মেসেজটাতে চোখ বুলালো আরও একবার।
‘ ভাইয়ার সঙ্গে আম্মুর কথা হয়েছে। রাতে গ্রীন ভ্যালিতে ছিলো। তুই একটু গিয়ে দেখ। ‘
সায়েরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে আন্দাজ করেছিলো সাফওয়ান হয়তো রাতে বাড়ি ফিরেনি। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য সাফ্রিনকে মেসেজ দিয়েছিলো। কাঙ্ক্ষিত উত্তরটুকু পেয়ে এবার আর দেরি করলো না সে। রাস্তায় নেমে রিকশা নিয়ে নিলো। উদ্দেশ্য তার একটাই, সুখ নীড়।
অন্যান্য দিনে মতোই নিস্তব্ধ, স্নিগ্ধ পরিবেশ গ্রীণ ভ্যালি জুড়ে। গোলাপ বাগান পরিচর্যায় ব্যস্তরত করিম চাচার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো সায়েরীর। স্বল্প বাক্যে কথা সেরে মেয়েটা চঞ্চল কদমে প্রবেশ করলো বাড়ির অভ্যন্তরে। কাঁধের ব্যাগটা কাউচে ছুড়ে ফেলে সে দ্রুত পায়ে সিড়ি বেয়ে উঠলো দোতলায়। সাফওয়ানের বেডরুমের বদ্ধ দরজায় দুই একবার করাঘাত করেও ভেতর থেকে উত্তর পেলো না কোনো। অগত্যা দরজার নব ঘুরিয়ে কিঞ্চিৎ ফাঁক হওয়া দরজা দিয়ে উঁকি দিলো সে। শূণ্য বিছানা,রোদের আলোয় জনশূন্য ফকফকা কক্ষ। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির উপস্থিতি না দেখে এবারে সায়েরীর মনের উদ্বিগ্নতা বৃদ্ধি পেলো। চট জলদি দরজাটা পুরোপুরি মেলে ওয়াশরুম, বারান্দা সহ আনাচে-কানাচেতে খুঁজলো সাফওয়ানকে। নেই। কোথাও মানবটার অস্তিত্ব নেই। সায়েরী ফিরে আসে। করিডর ধরে একে একে বাড়তি তিনটি কক্ষেও খোঁজ করে।
শেষে গিয়ে থামে করিডরের পশ্চিম দিকের, সর্ব শেষ কক্ষটির সম্মুখে। তার জানা মতে, এটি সাফওয়ানের জিমিং রুম। এই রুমে কখনো আসেনি সে। যতবার সাহস করেছে,ততবার চড়া গলায় তাকে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো সাফওয়ান। মেয়েটা যে হারে ঝামেলা পাকায়,দেখা গেলো ডাম্বেলের সঙ্গে পা আটকে মুখ থুবড়ে পড়ে চিৎ হয়ে আছে। সেই ভয়েই সাফওয়ান সবসময় রুমটা লক করে রাখতো। কে জানে আজ খোলা আছে কিনা! দ্বিধান্বিত চিত্তে দরজার নব ঘোরানো মাত্র ক্ষীণ শব্দ তুলে লক খুলে গেলো। জানলায় ঝুলানো ভারী পর্দার কারণস্বরূপ সূর্যের আলো ঢুকতে পারেনি ভেতরে। আবছা অন্ধকার কক্ষটিতে সীমিত কিছু সরঞ্জাম। ট্রেডমিল,পুশ আপ বার, মাঝামাঝি স্থানে ঝুলন্ত পাঞ্চিং ব্যগ, এক কোণায় ছোট বড় ডাম্বেরল সহ আরও টুকটাক সরঞ্জাম যাদের নামও জানেনা সায়েরী। রুমের এক কোণায়, ফ্লোরে বিছিয়ে রাখা মেট্রেস। সেথায় অস্পষ্ট এক পুরুষালি অবয়ব। সায়েরীর নজর সেদিকেই স্থির হয়ে রইলো কয়েক পলকের জন্য।
ভেতরে কদম ফেলতেই চির পরিচিত পুরুষালি সুঘ্রাণ টুকু তীব্র ভাবে ধাক্কা খেলো নাসারন্ধ্রে। তাতেই সে নিশ্চিত হলো, উপস্থিত মানবটা স্বয়ং সাফওয়ান ভাই। নিশ্চিত মনে এগিয়ে আসলো সে। শুরুতেই মেলে দিলো জানলার পর্দাগুলো। হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো রোদেরা। সায়েরী ফিরে তাকালো। দেখলো, মেট্রেসের উপর উদাম শরীরে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা সাফওয়ানের কপাল কুঁচকে এসেছে আলোর প্রতিফলনে৷ তার উদাম পৃষ্ঠদেশ নজরে আসতেই বিষ্ময়ে, আড়ষ্টতায় সায়েরী জমে গেলো। কেবলমাত্র গ্যাবাডিং প্যান্ট পরনে,শার্ট বিহীন দেহটি দেখে গলা শুকিয়ে চৌচির হলো। বেলাজ দৃষ্টি পলকহীনভাবে ঘুরেফিরে বেরালো আকর্ষণীয় খাঁজকাটা উদাম দেহটিতে। ফুলেফেঁপে থাকা পেশিবহুল বাহুদ্বয়ে। দুহাতে বালিশ জড়িয়ে রাখার কারণে মেরুদণ্ড বরাবর এক সূক্ষ্ম ভাঁজের সৃষ্টি হয়েছে। দুই পাশের উঁচু খাঁজযুক্ত মাংশপিন্ড ফুলে রয়েছে।
আকৃতিতে যেনো কোন শুভ্র প্রজাপতি। কেমন সম্মোহনী, লোভনীয় এই দৃশ্য, এই দেহ! হাঁসফাঁস চিত্তে একের পর এক ঢোক গিললো সায়েরী৷ প্রায় বছর খানিক আগে, বান্দরবানে থাকাকালীন সাফওয়ানকে উদাম শরীরে দেখেছিলো সে৷ পরবর্তীতে এতগুলো মাসে কখনো দেখেনি। যার কারণে লজ্জাটা একটু বেশিই ঝেঁকে বসেছে। স্তব্ধ চিত্তে প্রায় মিনিট খানিক জানলার ধারেই জমে রইলো সায়েরী। পরবর্তীতে হঠাৎই বেখেয়ালি নজর গেলো সাফওয়ানের হাতের উল্টো পিঠে৷ গতরাতের জখমী হাতের ক্ষতটুকু বর্তমানে উন্মুক্ত। দগদগে লাল মাংসপিণ্ড স্পষ্ট লক্ষ্যনীয়। সেদিক তাকিয়ে মুহুর্তেই বিচলিত হলো মেয়েটা। এগিয়ে এলো চঞ্চল কদমে। নিঃশব্দে আসন গেড়ে বসলো ঠিকঠিক সাফওয়ানের মুখের কাছটায়।
ক্লান্ত, ঘুমন্ত মুখশ্রীটি দেখে ভেতরটা ভার হয়ে এলো তার। আলতো দুই হাতে জখমী হাতটা তুলে নিলো কোলে। কেমন থেতলে ফেলেছে! দেখেই তো গা গুলিয়ে আসছে সায়েরীর। ঝাপসা হতে চাচ্ছে চক্ষুদ্বয়। কিন্তু মেয়েটা কাঁদলো না। বড় অবলীলায় স্বাভাবিক রাখলো নিজেকে। কাতর চোখে দেখলো, সাফওয়ানের ঘুমন্ত মুখাবয়ব। কপালে ছড়িয়ে থাকা ঝরঝরে চুলগুলো আদুরে হাতে সরিয়ে দিলো সে। খরশান চোয়ালে স্পর্শ করলো আলতো ভাবে। কি ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে সাফওয়ান ভাইকে! রাতভর কি ঘুমাইনি সে? বেডরুমে না শুয়ে এখানে এভাবে উদাম হয়ে শুয়ে আছে কেনো? এমন শীতের রাতে উদাম শরীরে শুতে কি একটুও কষ্ট হয়নি? অনুভূতি সব মরে গেছে নাকি?
আপনমনে প্রশ্নগুলো করে রুমের আনাচে-কানাচেতে উত্তর টুকুও খুঁজে পেলো সায়েরী। সাফওয়ান রাতভর কি করেছে তার জবাব স্বরূপ নজরে এলো ঘুমন্ত দেহটার পার্শ্ববর্তী স্থানে, ফ্লোর জুড়ে এলোমেলো ছড়িয়ে আছে আধপোড়া সিগারেট, দু-দুটো শূন্য বিয়ারের বোতল৷ সেই সঙ্গে সাফওয়ানের টি-শার্ট, জ্যাকেট, স্নিকার্স৷ সবকিছু অগোছালো ভঙ্গিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা৷ সব দিকে চোখ বুলিয়ে সায়েরীর বুক ছিড়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস নির্গত হলো। স্বভাবে অত্যাধিক গোছানো ছেলেটার এহেন অগোছালো রূপ মেনে নেওয়া দ্বায়। মন-মস্তিষ্ক কতটা বিক্ষিপ্ত হলে এমন বেপরোয়া হয় মানুষ! সায়েরী জবাব পেলো না কোন। তার মোলায়েম হাত আদুরে ভঙ্গিতে কেবল স্পর্শ করে চললো সাফওয়ানের খসখসে মুখের একপাশ। সেই আদুরে স্পর্শের বিনিময়ে সাফওয়ানের ঘুমন্ত মুখাবয়বে দৃশ্যমান এক প্রশান্তি ভাব ফুটে উঠলো। খানিকটা ঘাড় নাড়ালো সে। বন্ধ চোখে,হঠাৎই হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো নিজ গালে লেপ্টে থাকা সায়েরীর কোমল হাতখাটা। কিঞ্চিৎ জোর প্রকাশ করে চেপে রাখলো গালে। ঘুমো ঘুমো, অস্পষ্ট কন্ঠে হঠাৎই ডেকে উঠলো,
‘ উম.ম..ম বোকাপাখি!! ‘
সায়েরীর শিরদাঁড়া বেয়ে হীম শীতল স্রোত বয়ে গেলো যেন। গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল এই ডাকে,এক কন্ঠে,এমন আদুরে স্পর্শে। এক সেকেন্ডের জন্য হৃদস্পন্দন থমকে, পরমুহূর্তেই দ্বিগুণ বেগে ছুটলো। সাফওয়ান ভাই বুঝতে পেরেছে তার উপস্থিতি! অনুভব করতে পারছে তাকে! হৃদ মাঝারে সুখ সুখ অনুভূতি ঝেঁকে বসলো নিমেষেই। গত রাতে সাফওয়ানের সেই রূঢ় আচরণ গুলোর পর, এটুকু ডাক শুনে আবেগে টইটম্বুর হলো মন। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিয়ৎক্ষণ সে কেবল দেখেই গেলো সুদর্শন প্রেমিক পুরুষটাকে। অতঃপর, চট করে গ্রীবা নামালো সে। বিনা সংকোচে তার তুলতুলে অধর যুগল ছুঁয়ে গেলো সাফওয়ানের কপাল। বেশ সময় নিয়ে, মিষ্টি এক আদর দিয়ে মাথা উঁচালো সায়েরী। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে আপনমনে হাসলো। নিজেকে সামলে যখনই ভাবলো এবারে সাফওয়ানকে ডাকবে। পরক্ষনে সাফওয়ানের শুকনো মুখ দেখে আন্দাজ করলো, ছেলেটা রাত থেকে না খেয়ে আছে। কেমন শুকনো লাগছে চেহারাটা! ভেবেই অস্থির হয়ে উঠলো সে।
নিঃশব্দে সাফওয়ানের হাতের ভাঁজ হতে নিজের হাতখানা ছাড়িয়ে, দ্রুত উঠে এলো। দরজা লাগিয়ে সোজা নেমে এলো নিচে। গ্রীণ ভ্যালিতে সায়েরীর আনাগোনা হওয়ার আগে যেমন সাদামাটা পরিবেশ ছিলো,বর্তমানে ঠিক ততটাই চাকচিক্য, পরিপূর্ণ বাড়িটি। ছোট্ট একটি সংসারে যত যা সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়,সবই সামিল রয়েছে। পূর্বে সাফওয়ান মাসে কয়েকটা দিন এসে সময় কাটাতো বন্ধুদের সঙ্গে। বাহির থেকেই তারা খাবার কিনে নিতো। কিন্তু এখন সায়েরীর জন্য ঘরেই অল্পস্বল্প রান্নাবান্না হয় বিধায় সাফওয়ান প্রায় সবই কিনে রেখেছে। সায়েরীর জানা আছে সব। তাইতো, শুরুতেই সে ফ্রিজ খুলে চোখ বুলালো সেথায়। ভাগ্যবশত পেয়েও গেলো ভারী খাবার। বক্স ভর্তি কাঁচা গরু মাংস। সেসব সিঙ্কে রেখে সে ছুটে গেলো বাহিরে। সকল ধরনের রান্নায় পটু শিউলি মেয়েটাকে বগলদাবা করে নিয়ে এলো সঙ্গে। রান্নার ব্যাপারে সায়েরী বরাবরই আনাড়ি।
বড়জোর নুডলস ব্যতীত অন্য কিছু সে করতে পারে না। আজকের এমন বিড়ম্বনায় পড়ে তার মন বললো, এতোটা আনাড়ি হওয়াটাও তাকে মানাচ্ছে না। আজ নাহয় শিউলি আছে বলে বাঁচা গেল। কিন্তু অন্য কোনো সময় যদি সাফওয়ান ভাইয়ের জন্য কিছু করা লাগে, তখন কে সাহায্য করবে তাকে? আচরণে, পড়াশোনায়, কথাবার্তায় খুব তো উন্নতি আনলো। এবার তবে সাফওয়ান ভাইয়ের জন্য হাতের কাজেও পটু হওয়া যাক! আপন ভাবনায় সে মনস্থির করলো, পরীক্ষার পর ছুটির সময়গুলোতে সে রান্না শিখবে। সব রকমের রান্না। উমম..সব? সব রকমের রান্না শিখা সম্ভব তার পক্ষে? সব না হোক, শুধুমাত্র সাফওয়ান ভাইয়ের পছন্দের খাবারগুলো রান্না করে শিখবে সে। মন দিয়েই শিখবে।
পরোটার সঙ্গে সাফওয়ানের পছন্দ মতো ঝাল ঝাল গরু মাংস রান্না করবে বলেই পরিকল্পনা করা হয়েছে। শিউলি মাংস রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত হয়েছে দেখে সায়েরী নিজেই আগ বাড়িয়ে পরোটা বানাতে উদ্যত হলো। এই ব্যাপারে অবশ্য দক্ষ সে। নিজ বাড়িতেও প্রায়শই বানায় কিনা। আধ ঘন্টার মাঝে চার চারটা পরোটা বানিয়ে হটপটে ঢুকিয়ে নিলো সে। অন্যদিকে শিউলি মাংসের জন্য কুচি করা পেঁয়াজ গুলো কিচেনের তাকে রেখে চুলোয় পাতিল বসালো। তেল ঢেলে চুলোর আঁচ কমিয়ে সে যখন অন্যদিকে ব্যস্ত হলো। তখন, কাজ ফুরানোর তাগিদে সায়েরী নিজেই আগ বাড়িয়ে পেঁয়াজ ঢেলে দিলো গরম তেলে। তেল-পানির সংমিশ্রণে অকস্মাৎ ছিটকে উঠলো সব। একাধিক ছিটা এসে লাগলো সায়েরীর ডান হাতের কব্জি হতে খানিকটা উপর অবধি। সঙ্গে সঙ্গে অস্পষ্ট শব্দে আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা। জ্বলে উঠেছে জায়গাগুলো। শিউলি আৎকে উঠলো এমন কান্ডে। সায়েরীর হাত টেনে সিঙ্কে নিয়ে গেলো৷ ট্যাপ ছেড়ে ঠান্ডা পানির নিচে ধরলো হাত। সায়েরী দাঁতে দাঁত চেপে জ্বলন টুকু সহ্য করে নিলো। শিউলির বাড়িয়ে দেওয়া আইস ব্যাগ চাপলো উক্ত স্থানে। শিউলি পূর্ণ দৃষ্টিতে অবলোকন করলো মেয়েটাকে। বহু মাসের চেনাজানা আছে বিধায় সায়েরীর এমন শীতল আচরণ হজম হচ্ছে না তার। তাছাড়া এমন উদ্বিগ্ন হয়ে হঠাৎ রান্নায় ব্যস্ত হলো কেনো? মেয়েটা তো ঝাল একেবারেই খায়না। অর্থাৎ, এই রান্নাটুকু সাফওয়ানের জন্য। মনে মনে হিসেব মিলিয়ে সে গাঢ় হেসে জানতে চাইলো,
‘ ভাইজান গোসসা করছে নাকি,আপা? ‘
সায়েরী চোখ তুলে। দীর্ঘশ্বাস টুকু গোপন করে মিনমিন কন্ঠে প্রতি উত্তর করে, ‘ ওই আরকি, একটু.. ‘
তার অপ্রস্তুত ভাব দেখেই শিউলি উত্তর বুঝে নিলো। পাতিলে চামচ নাড়তে নাড়তে বলে উঠলো,
‘ ব্যাডা মানুষ খালি গোসসা করতেই জানে৷ হেগো এতো মাথায় তুলে রাখিয়েন না আপা। আপনিও গোসসা দেখান। পিছে ছুটতে ছুটতে আইবো দেইখেন। ‘
সায়েরী শুনলো। বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখালো না। আপনমনে ভাবলো, মাথায় তো তাকে চড়িয়ে রেখেছে সাফওয়ান ভাই। সর্বদা কথায় কথায় রাগ,অভিমান সে-ই দেখায়। প্রেমিকাদের ধর্ম যে এটাই। সাফওয়ান নিজেও রাগ দেখায় না এমনও নয়। কিন্তু এবারের বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। সায়েরীর সঙ্গে করা সাফওয়ানের আচরণটুকু ছিলো ভীষণ অপ্রত্যাশিত। এতোটা রূঢ় হওয়া সাফওয়ানের সঙ্গে যায় না। অন্তত সায়েরীর সঙ্গে তো নয়ই। ঠিক এই কারণেই সায়েরী উদ্বিগ্ন ভীষণ। মন বলছে, সাফওয়ান ভাই ঠিক নেই। এবং কেনো ঠিক নেই, সেটা তাকে জানতে হবে।
সাফওয়ান কখনো বেলা করে ঘুমায়না। এইযে বেলা প্রায় সাড়ে ন’টা হতে চললো৷ এতক্ষণে নিশ্চয়ই ঘুম ছুটে গিয়েছে তার। ব্যাপারটা মাথায় আসতেই সায়েরী তাড়া দিলো শিউলিকে। রান্না শেষ। কথামতো সব ডাইনিংয়ে গুছিয়ে নিলো শিউলি। নিজের জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষটি হতে সায়েরী তুলে আনলো ফার্স্ট এইড বক্স। সাফওয়ানের হাতের ক্ষততে মলম লাগানো প্রয়োজন। কেমন অবহেলায় ফেলে রেখেছে সেটা!
সব গোছগাছ শেষে মেয়েটা চঞ্চল কদমে ছুটলো দোতলার দিকে। নিঃশব্দে প্রবেশ করলো জিমিং রুমে। কক্ষটি ফাঁকা। সাফওয়ানের অস্তিত্ব নেই কোথাও। সায়েরী বিশেষ চমকালো না। পুণরায় ছুটে গেলো সাফওয়ানের বেডরুমের দিকে। ঢিপঢিপ বুকে দরজা খুললো। কদম এগুলো অভ্যন্তরে। কক্ষটি চেনা পরিচিত সুভাবে মম করছে। সম্মুখেই দন্ডায়মান লম্বা,চওড়া মানবটি। এক পলক তাকিয়ে বাড়ন্ত পদচারণ স্থির হয়ে গেলো সায়েরীর। একই দিনে দ্বিতীয় বারের মতো গভীর ঘোরে আচ্ছন্ন হলো প্রেমময়ী হৃদয়। বেলাজ দৃষ্টিতে নিষ্পলক দেখেই চললো সে। সদ্য স্নান সেরে আসা উদাম দেহটিতে জলকণার অস্তিত্ব দৃশ্যমান। গলার দুইপাশে ঝুলিয়ে রাখা সফেদ তোয়ালের কারণে প্রসস্থ বক্ষপট ঢেকে রয়েছে কিছুটা। যার মাঝে উঁকি দিয়ে আছে বহু পুরনো ক্ষত চিহ্ন। অ্যাবস নামক টুকরো টুকরো মাংশপিন্ডের খাঁজে খাঁজে বেহায়ার মতো জলকণা আটকে। কেমন চিকচিক করছে দেখো! লোভাতুর দৃষ্টিতে সেদিক তাকিয়ে গলা ভেজাল সায়েরী। আজ আবার নতুন করে ক্রাশ খেলো যেনো। চোখ তুললো বুক,গলা বেয়ে মুখের দিকে। গৌড় বর্নের মুখখানা ফিরে রয়েছে অন্য দিকে।এলোমেলো ভেজা চুল লেপ্টানো কপালে। তোয়ালের একাংশ দিয়ে মুচছে তা। ডান হাতে মোবাইল চেপে রেখেছে কানে। রুমের নিরবতা ছেদ করে হঠাৎই গমগমে কন্ঠটি ভেসে এলো,
‘ ডাবল জার্নির পর এক্সাম দিতে পারবো কি পারবো না সেটা তো তোর দেখার বিষয় না, রূপ। যতটুকু বলেছি ততটুকু শোন। এর বাইরে কোন কথার জবাব দিতে ইন্টারেস্টেড নই আমি। যা বলেছি কর। ইনফরমেশন সব কালেক্ট করে দে। ‘
…………..
‘ আমিও ভেবেছিলাম সময় আছে। বাট মাই ব্লাডি রাবিশ লাক! প্ল্যান সব চপাট করে ছেড়েছে আমার ব..’
কথার মাঝেই ঘাড় ফিরালো সাফওয়ান। সায়েরীকে দেখে চমকালো বেশ। মুখের কাঠিন্য ভাব আরও গাঢ় হলো। ভাঁজ পড়লো সিক্ত কপালে মধ্যখানে। বিনা বাক্যে কল কাটলো সে। গলা থেকে তোয়ালে সরিয়ে বিছানায় রাখা টি-শার্ট তুলে নিয়ে পলকেই জড়িয়ে নিলো গায়ে। ভরাট কন্ঠে শুধালো,
‘ তুমি এখানে কি করছো? ‘
‘ ক্রাশ খেতে এসেছিলাম। ‘
‘ হোয়াট!!!!!! ‘
আপন খেয়ালে মশগুল থাকায় মেয়েটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে হঠাৎই আবুল তাবুল বকে বসেছে। এবং প্রতিউত্তর শুনে বিষ্ময়ে আপনাআপনি চেঁচিয়ে উঠলো সাফওয়ান। নিজের ভুল টুকু বুঝতে পেরে সায়েরী থতমত খেয়ে গেলো। চটজলদি আবারো প্রতিউত্তর করলো,
‘ ন..না মানে আমাকে খেতে আসার জন্য ডাকতে এসেছিলাম। ‘
দ্বিতীয় দফায় এহেন প্রতিউত্তর শুনে সাফওয়ান বোবা বনে গেলো। কান গরম হয়ে উঠেছে তার। শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে এক গভীর শ্বাস ফেললো সে। এগিয়ে এলো লম্বা কদমে। তার কঠোর মুখাবয়ব দেখে দ্রুত পিছু হাঁটতে চাইলো সায়েরী। তৎক্ষনাৎ তার দুগাল শক্ত করে চেপে কাছে টেনে নিলো সাফওয়ান। গ্রীবা নামিয়ে কঠোর দৃষ্টি মিলালো ওই ভীতু দৃষ্টিতে। রাশভারি কন্ঠে অনেকটা ধমকের সুরে বললো,
‘ বিয়ে করতে রাজি হবে না, কিন্তু নিজেকে খেতে নিমন্ত্রণ জানাচ্ছ, ডাফার! ‘
অক্ষিপট বৃহৎ হয়ে এলো সায়েরীর। ছিহ! এমন কথা কখন বলে ফেললো! ফুলে থাকা ঠোঁট জোড়া নেড়ে সে তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
‘ আ-আপনার জন্য নাশতা তৈরি করেছি। সেজন্যেই ডাকতে এসেছিলাম। ‘
সাফওয়ান গাল ছাড়লো তার। মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে একই সুরে জানতে চাইলো,
‘ এখানে কেনো এসেছো? কার সঙ্গে এসেছো? ‘
সায়েরী চোখ নামায়। মিনমিন কন্ঠে জবাব দেয়,
‘ একাই এসেছি।আপ-আপনি নিতে আসেননি কেনো? ‘
‘ নিতে আসিনি মানে তোমার এখানে আসার প্রয়োজন নেই। এটুকু বুঝার বুদ্ধি হয়নি তোমার? কোন আক্কেলে এমন কুয়াশার মাঝে একা একা বেরিয়েছ? আমি বলেছিলাম আসতে? ‘
একেকটা ধমকে সায়েরীর রূহ কেঁপে কেঁপে উঠলো। ভয়ে,অভিমানে মেয়েটা কোন প্রতিউত্তর করতে পারলো না। গলায় দলা পাকানো কান্নাগুলো চেপে রেখে থম মেরে রইলো। অনুভব করলো, রুম হতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে সাফওয়ান। তৎক্ষনাৎ সায়েরী সামলে নিলো নিজেকে। এতগুলো ধমক শুনেও মন কোটরে জন্মানো চিন্তাগুলো অভিমানের নিচে চাপিয়ে ফেলতে পারলো না মেয়েটা। সাফওয়ানের লম্বা কদমের পেছনেই ছুটন্ত পায়ে এগোল সে। সিড়ি বেয়ে সদর দরজার দিকে এগোনো সাফওয়ানের রুক্ষ হাত টেনে ধরলো। ফলস্বরূপ, থমকালো সাফওয়ান। হাঁপিয়ে উঠে শ্বাস ফেলে ভীতু মুখ তুলে চাইলো সায়েরী। অত্যন্ত শীতল গলায় আবদার করলো,
‘ কাল থেকে না খেয়ে আছেন। আমি খাবার বানিয়ে রেখেছি। একটু খেয়ে যান.. ‘
মোলায়েম কন্ঠের সরল আবদার। সাফওয়ানের মনে হলো যেনো এই ছোট্ট, মাথামোটা মেয়েটা হুট করে প্রেমিকা থেকে বউ রূপে রূপান্তরিত হয়েছে। সংসারে অশান্তির পর বউয়েরা যেমন করে স্বামীর কাছে খাবার খাওয়ার জন্য অনুরোধ করে,ঠিক তেমন ভাবেই আবদার জুড়েছে মেয়েটা। ব্যাপারটা যে তার পছন্দ হয়েছে তা কঠোর মুখশ্রী দেখে মোটেও আন্দাজ করতে পারলো না সায়েরী। তাছাড়া খাবারের কথা উঠতেই পুরনো খিদে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো সাফওয়ানের। গতকাল দুপুরে শেষ বারের মতো খেয়েছে। এরপর ছাইপাঁশ গুলো ছাড়া অন্য কোন দানা পানি পড়েনি পেটে। অগত্যা সে নিঃশব্দে সম্মতি দিলো। মুখে না বললেও গিয়ে বসলো ডাইনিংয়ে। সায়েরী গাঢ় করে হাসলো তা দেখে। প্রফুল্ল চিত্তে মেয়েটা ঝটপট বাটিতে মাংস নিলো। সাফওয়ান তখন মোবাইলে মশগুল। মুগ্ধ করা ঘ্রাণে একপলক তাকিয়েছিলো কেবল। কিন্তু কিচ্ছুটি বললো না। প্লেটে পরোটা দিতেই সে হাত বাড়ালো। কিন্তু ছিড়ে খাওয়ার মতো শক্তি অবশিষ্ট রইলো না হাতে। জোর প্রকাশ করতেই তীক্ষ্ণ ব্যথায় কপাল কুঁচকে এলো তার। সায়েরী সবই দেখলো, বুঝলো। সরল গলায় বললো, ‘ আমি খাইয়ে দেই? ‘
এবারেও নিরব সম্মতি। কোন বাক্য বিনিময় করতে শুনল না সায়েরী। কেবল দেখলো, প্লেটের উপর হতে আহত হাতটা সরে গিয়েছে। তাতেই উত্তর বুঝে নিলো মেয়েটা। সাফওয়ানের পাশে দাঁড়িয়েই ঝোলে ডুবানো টুকরো টুকরো পরোটার অংশ মুখে তুলে দিলো। চেয়েছিলো এই মুহুর্তেই গত রাতের বিয়ে প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলবে। কিন্তু তাকে বিন্দুমাত্র সুযোগ দিচ্ছে না সাফওয়ান। একাধিক ব্যক্তি বর্গের সঙ্গে কল,মেসেজ,ভয়েস মেসেজে তার আলাপ চলছে তো চলছেই। এসব কি সায়েরীকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা! এখনো এতোটাই রেগে আছে মানুষটা? সায়েরীর মুখ ছোট হয়ে এলো। বুঝলো, সরাসরি ওভাবে বিয়ের জন্য না করাটা তার উচিত হয়নি। সাফওয়ান ভাই কষ্ট পেয়েছে, হয়তো অপমানিত ও হয়েছে। যেখানে সাফওয়ান সবসময় তাকে পড়াশোনা নিয়ে ক্যারিয়ার গড়া নিয়ে লেকচার দিতে থাকে। সেখানে এই অপরিপক্ক বয়সে বিয়ের কথা তুলেছে মানে ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। কোনো না কোনো বাধ্যবাধকতা ছিলো হয়তো তার। ব্যাপার গুলো কেনো একটাবার ভাবলো না সায়েরী? ভেবেচিন্তে না করতে পারতো। মুখের উপর কেনো ওভাবে প্রত্যাখ্যান করে দিলো সে?
দুজনের আপন ভাবনার মাঝে হঠাৎই সায়েরীর কব্জিতে বাঁধা হয়ে ধরলো সাফওয়ান। বাড়ন্ত অংশটুকু আর মুখ অবধি পৌঁছাল না। সায়েরী খেয়াল করলো পুরোপুরি তিনটা পরোটা এবং আরও একটির অর্ধেক অংশ ইতোমধ্যে শেষ। দৌঁড়ঝাপ করে এতো আয়োজন করাটা সার্থক মনে হলো তার। বুক ছিড়ে এক টুকরো স্বস্তির শ্বাস নির্গত হলো। সাফওয়ান উঠেই যাচ্ছিলো। ফের একবার টান পড়লো হাতে। ফিরে তাকালো সে। এবার সায়েরী কিছুই বললো না। সাফওয়ানের দেখাদেখি নিজেও গাম্ভীর্য টেনে আনলো মুখে। এতক্ষণে গিয়ে চেয়ার টেনে বসলো পাশে। ফার্স্ট এইড বক্স হতে একে একে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সব বের করে লেগে পড়লো ড্রেসিং এর কাজে। সাফওয়ান অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, সেই কলেজের সময়কার মতো এবারে সায়েরীর হাত কাঁপছে না। আর না মেয়েটা ভয়ে জুবুথুবু আছে। বড় আবলীলায় সময় নিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করছে সে। কর্ম অব্যাহত রেখে হঠাৎ করেই সে বলে উঠলো,
‘ আপনার ছোট থেকে ছোট আঘাত দেখেও আমি ভীষণ কষ্ট পাই। ব্যাপারটা আপনার বেশ জানা আছে। তবুও আপনি জেনে-বুঝে নিজেকেই আঘাত করেছেন। কোনো ট্রিটমেন্ট নেননি। আমাকে কষ্ট দিতে এতো আয়োজন কেনো? আপনার অবহেলায় যথেষ্ট আমাকে পাথর বানানোর জন্য। ‘
এমন গম্ভীর বাক্যে সাফওয়ান খেই হারায়। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। কথাটা শতভাগ সত্য, গতকাল সায়েরীর পক্ষ থেকে রিজেকশন পাওয়াটা ভীষণ অপ্রত্যাশিত তার কাছে। ঠিক এজন্যেই সে ক্ষতস্থান অবহেলায় ফেলে রেখেছিলো। মেয়েটা দেখুক,কাঁদুক,আফসোস করুক। বিকেল হতে জমানো রাগে উন্মাদ বনে গিয়েছিলো সে। এতো এতো ভালোবাসা দেওয়ার পরেও মেয়েটা কীভাবে মুখের উপর না বললো? একই দিনে একাধিকবার মেইন ইগো চরম মাত্রায় আহত হয়েছে বলেই যা তা ব্যবহার করে ছেড়েছে সে। অবশ্য এখনো অবধি নূন্যতম আফসোস নেই তার। চাপা অভিমানে মন-মস্তিষ্ক বিগড়ে আছে।
ব্যান্ডেজ করে সাফওয়ানের হাতটা নিজ দুইহাতের মাঝে আবদ্ধ রেখেই মুখ তুলে তাকালো সায়েরী। চোখাচোখি হলো দুজনার। শোনা গেলো সায়েরীর রিনরিনে কন্ঠস্বর,
‘ আমি জানি কাল রাতে ওভাবে না করাটা আমার উচিত হয়নি। কিন্তু আপনি আমাকে কিছু ভাবার সুযোগ কই দিয়েছেন? এখনো রেগে আছেন, জানি আমি। এমন সিলি কুয়েশ্চন করে রাগ ধরে রাখাটা আপনাকে মানায় না, সাফওয়ান ভাই। আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নিজেকে আঘাত করছেন কেনো? যেদিন আমিও আপনার মতো নিজের উপর আঘাত টেনে আনবো, সেদিন আপনি আফসোস করেও কুল পাবেন না। আর..আমার মনে হচ্ছে সেইদিন খুব দূরে নয়। আমি চাইনা এমন কিছু হোক। আমি স্যরি বলছি তো। রাগ ঝেরে ফেলুন না! ‘
“সিলি কুয়েশ্চন” শব্দ দুটো শুনে সাফওয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে। মেয়েটা জানে সে কতোটা আবেগী হয়ে প্রশ্নটা করেছিলো? একে তো না করেছে,এখন তার আবেগ-অনুভূতি সবটাকে নিছক ছেলেমানুষী বলে দাবী করছে? ঠিক কোন কারণে গিয়ে বিয়ের প্রসঙ্গ তুলতে বাধ্য হয়েছিলো সে, তা না জেনেই এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে কি করে? গম্ভীরমুখে ঝাড় মেরে হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো সাফওয়ান। যেতে যেতে বললো,
‘ ক্লাস ফাঁকি দিতে যেনো না শুনি। গাড়ি বের করছি আমি। ‘
সায়েরীর কথাগুলো সম্পূর্ণ রূপে অগ্রাহ্য করে গেলো সে। ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পেরে আরও একবার দুমড়েমুচড়ে গেলো মেয়েটা। সাফওয়ানের এমন ছেলেমানুষী রাগ-অভিমান মেনে নিতে পারছে না সে। ছোট্ট একটা বিষয় নিয়ে এমন গুম হয়ে থাকার মানে আছে কোনো?
মোটামুটি কোলাহল পূর্ণ কলেজ প্রাঙ্গণে একাকী হাঁটছিল সায়েরী। দেরি করে পৌঁছেছে বিধায় বন্ধুরা কোথায় যে জানে না। অবশ্য খুঁজে দেখার আগ্রহ ও পায়নি সে। আপন খেয়ালে মশগুল থাকা তার উপর আতর্কিত হামলা হলো। পুরুষালি একটি বাহু তার ঘাড় পেঁচিয়ে মাথাটা রীতিমতো চেপে ধরলো নিজের সঙ্গে। কিঞ্চিৎ ভয়ে,বিষ্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলো মেয়েটা।
‘ নুহাশ!! লাগছে আমার। ছাড়.. ‘
‘ লিলিপুটের বাচ্চা ক্লাস চুরামি করবি আমাকে জানালি না কেন? আমি হুদাই একা একা মশা মারছিলাম। অন্য মেয়েরা পাত্তা দেয় না মানলাম, তোরাও আমাকে বেপাত্তা করলে আমি বেঁচে থেকে লাভ কি? সত্যি সত্যিই হারপিক খাওয়াইতে চাস আমাকে? ‘
‘ উফফ!! ছাড়বি তুই? ‘
সায়েরী পুণরায় চেঁচিয়ে উঠতেই তার ঘাড় ছাড়লো নুহাশ। এবারে মুখোমুখি হলো দুজন। নুহাশ হাস্যজ্বল বদনে ফের কথা বলতে উদ্যত হলো। তৎক্ষনাৎ সায়েরীর রক্তিম মুখশ্রী, ফুলোফুলো চোখ দেখে চমকে উঠলো সে। এ কি অবস্থা করেছে চোখে মুখের? হলো কি মেয়েটার?
‘ তুই..তুই কেঁদেছিলি, সায়ু? হইছে কি? কেউ কিছু বলছে তোরে? ‘
চিন্তিত কন্ঠে পরপর প্রশ্ন ছুড়ল নুহাশ। শেষের দিকে কন্ঠস্বর গম্ভীর হয়ে এলো। যেনো কেউ কিছু বলেছে জানলেই গর্দান নিয়ে নিবে। তার উদ্বিগ্নতা বুঝেও চুপ করে রইলো সায়েরী। মুখে মিথ্যে হাসি টেনে প্রতিউত্তর করতে চেয়েও ব্যর্থ হলো মেয়েটা। কন্ঠ ভাড় হয়ে আছে। মুখ খুললেই যেনো কেঁদে ফেলবে এমন ভাব। তার অবস্থা অবলোকন করে নুহাশের চিন্তা বাড়ে। সায়েরীর মাথায় হাত রেখে পুণরায় বলে,
‘ কি হইছে বলবি তো। শরীর খারাপ লাগছে নাকি? আমি..আমি সাফওয়ান ভাইকে জানাই? ‘
বলতে না বলতেই পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করলো সে। তৎক্ষনাৎ মুখ খুললো সায়েরী। রাগ্বত স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো প্রায়,
‘ সব কথার মাঝে সাফওয়ান ভাইকে টেনে আনতে হবে কেনো? সে ছাড়া কি আর কোন গতি নেই আমার? মরে যাচ্ছি নাকি আ-আম… ‘
কন্ঠ ভেঙ্গে এলো। পূর্ণতা পেলো না বাক্যটি। কথাটা নুহাশটা উদ্দেশ্য করে বললেও, মনে হলো যেনো নিজেই নিজেকে বুঝাচ্ছে। যে সাফওয়ান ভাইয়ের অবহেলা নিয়েও দিব্যি বেঁচে থাকতে পারবে সে। কিন্তু সত্যিই কি পারছে? দিনের শুরু সবে। তাতেই বুকের ভিতরটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে তার এমন অপ্রত্যাশিত আচরণে নুহাশ তাজ্জব বনে গেলো। বুঝে নিলো অনেক কিছু। মাথা নেডে শান্ত সুরে আওড়াল,
‘ আচ্ছা,আচ্ছা জানাচ্ছি না কাউকে। আমার সাথে ক্যান্টিনে চল। কিছু খাবি আয়.. ‘
সায়েরীকে দ্বিমত করার ও সুযোগ দিলনা সে। টেনে নিয়ে গেলো সঙ্গে। একই সাথে ডান হাতের অভিজ্ঞ আঙ্গুলের চাপে ছোট্ট একখানা বার্তা পাঠালো ফ্রেন্ডস গ্রুপে। দুজন গিয়ে বসলো আলাদা টেবিল দখল করে। তাদের দেখেই ছুটে এলো বারো বছরের এক নাবালক শিশু। নাম রাজু। মাত্র মাস দুয়েক হলো সে এই ক্যান্টিনের কর্মচারী হিসেবে নিয়োজিত হয়েছে। সে উপস্থিত হতেই নুহাশ ঝটপট বলে উঠলো,
‘ রাজু মিঞা! আজ তোর আপার মন-মেজাজ দুটোই খারাপ। দ্রুত গিয়ে গরম গরম চা,সিঙ্গারা নিয়ে আয়। যা.. ‘
রাজু বারে বারে ফিরে তাকালো সায়েরীর দিকে। মেয়েটা চোখ বুজে মাথা এলিয়ে দিয়েছে নুহাশের কাঁধে। চোখ-মুখে অস্বাভাবিকতা৷ কি হয়েছে তা জানার জন্য উদগ্রীব হওয়া স্বত্তেও আপাতত চুপচাপ কাজে লেগে গেলো সে। সায়েরীর মন-মেজাজ শত খারাপ থাকলেও খাবার খেয়ে স্বাভাবিক হয়ে যায়,এই বিষয়টি অল্প কয়েক দিনে সে নিজেও জেনে গিয়েছে। তাই জলদি জলদি খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত হলো। তাছাড়া, তার বসতি হওয়ার পেছনে এই মেয়েটারই তো হাত। মাস দুয়েক আগে এক কুয়াশাজড়ানো ভোরে রাজুকে ফুটপাতে জুবুথুবু হয়ে শুয়ে শীতে কাঁপতে দেখেছিলো সায়েরী। এমনিতেও সে মানব দরদী। সেদিন আরও বেশি উতলা হয়ে উঠেছিলো। সঙ্গে থাকা সাফওয়ানের কাছে সুপারিশ করেছিলো, যেনো কোথাও এই বাচ্চাটাকে ঠাই দেওয়া হয়। সাফওয়ান সেদিন প্রতিউত্তর করেনি কোন। কিন্তু পরদিন থেকে রাজুকে লাগিয়ে দিয়েছে এই নতুন কাজে। পূর্বের চেয়ে এখন শতগুণ ভালো আছে ছেলেটা। এসব কাজের ঊর্ধ্বে গিয়ে তার অন্যতম কাজ হলো তাকে কাজ দেওয়া সেই সুন্দর ভাইটার সুন্দরী প্রেমিকাকে ক্যান্টিনের হাবিজাবি খাবার খাওয়া থেকে আটকানো। ত্যাড়ামি করলেই নালিশ করা। যেই কাজটা করতে বেশ আনন্দ পায় রাজু।
প্রথম ক্লাস শেষ হয়েছে। বেল বাজার মিনিট খানিকের মধ্যেই ক্যান্টিনে হুড়মুড়িয়ে আগমন ঘটলো সায়েরীর বন্ধুমহলের। সকলের আগে দেখা মিলেছে সাফ্রিনের। এমনিতেই মেয়েটা রাতভর চিন্তায় নির্ঘুম ছিলো। প্রথম ক্লাসে সায়েরীকে দেখেনি বলে ভেবেছিলো মেয়েটা আসবেই না। কিন্তু নুহাশের টেক্সট পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিলো সে। ভাগ্যিস ক্লাস টাও পরপর শেষ হয়েছে। আজ দু-দুটো ইম্পর্ট্যান্ট পিরিয়ড থাকা স্বত্তেও সাফ্রিনের মন টললো না সেদিকে। তার ধ্যান জুড়ে সায়েরীর জন্য উদ্বিগ্নতা। তন্মধ্যে মেয়েটার চোখে মুখের হাল দেখে সে দ্বিগুণ অস্থির হলো। কিন্তু তাকে দেখে মোটেও বুঝা গেলো না সেটা। সব সময় শান্ত থেকে পরিস্থিতি সামলানোতে অভিজ্ঞ বলে আজও তাকে বেশ শান্ত দেখালো।
টেবিলের উপর একে একে চায়ের কাপ,সিঙ্গারার প্লেট সাজিয়ে দিলো রাজু। গাঢ় হেসে সায়েরীর উদ্দেশ্য বললো,
‘ আপা! আর কিছু আনি? ‘
সায়েরী চোখ মেলে তাকায়। লাল লাল চোখে ঘুরেফিরে দেখে বন্ধুদের। সকলে গোলগোল চোখে তাকেই দেখছে। আবার একে অপরের সঙ্গে ইশারাই আলাপ সারছে। সবটা দেখেও চুপ মেরে রইলো সে। ক্ষুধার জ্বালায় আরও বেশি অসহ্য লাগতে লাগলো সব। বললো,
‘ চিপস নিয়ে আয়, তিনটা। ‘
‘ খালি পেটে চিপস খাইবেন? ভাইজান জানলে কিন্তু আমারে রাগ দেখাইবো আপা। এগুলা খান আগে? ‘
এখানেও সাফওয়ান! সব যায়গায় সকলে তাকে শুধু ওই মানুষটার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যার কাছে সায়েরীর কোন মূল্যই নেই এখন। রাতারাতি সব আদর ভালোবাসা উবে গিয়েছে। মেয়েটা যে না খেয়ে আছে, সেটা সবাই বুঝলো। এই বাচ্চাটাও বুঝলো কিন্তু সাফওয়ান ভাই বুঝলো না। হাত পুড়িয়ে ফেলেছে কিন্তু সেসব তার নজরেও এলো না। আসবে কি করে? সে তাকিয়ে দেখেছিলো সায়েরীর দিকে? তাকানোর ইচ্ছেও মরে গিয়েছে নিশ্চয়ই? আপন মনে কথাগুলো ভেবে উত্তেজিত হয়ে উঠলো সায়েরী। তীব্র অভিমানে, দহনে জর্জরিত হয়ে হঠাৎই চেঁচিয়ে উঠলো সে,
‘ তোর ভাইজানের কেনা গোলাম আমি? তার ইচ্ছেমতো চলতে হবে এমন কোন চুক্তি করেছি? আমার কোন ভালো লাগা, আবেগ, অনুভূতি নেই? সবসময় তার মর্জিতে চলতে হবে কেনো? ‘
রাজু আৎকে উঠে ছিটকে সরে গেলো। তীব্র বিষ্ময়ে চোয়াল ঝুলে এলো বন্ধুদের৷ হইচইপূর্ণ ক্যান্টিনের গুটিকয়েক স্টুডেন্ট ও শুনলো কথাগুলো। ফিরে ফিরে তাকালো তারা। টলমলে চোখে চেয়ে ফোঁসফোঁস শ্বাস ফেললো সায়েরী। দাঁড়িয়ে পড়লো হুট করেই।
‘ বাড়ি যাবো আমি। ভালো লাগছে না। ‘
ব্যাগ কাঁধে তুলে কদম বাড়ালো সে৷ কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারলো না। হাত টেনে ধরেছে সাফ্রিন। শান্ত চোখে চেয়েই মেয়েটা টেনে নিলো সায়েরীকে। পেছন হতে তোহা, নাজরাত দুজনেও আসলো পিছু পিছু। একজনের হাতে ওয়াটার বোতল। অন্যজন সিঙ্গারা এবং চিপসের প্যাকেট কিনে এগোলো পিছু পিছু।
গার্লস কমন রুম আজ মোটামুটি ফাঁকা। তেমনই এক ফাঁকা ব্যাঞ্চের নিকট সায়েরীকে টেনে নিয়ে বসতে বললো সাফ্রিন। কিন্তু মেয়েটা ঠাঁই দাঁড়িয়ে। সাফ্রিন জোর করলো না তাকে। কিন্তু মুখোমুখি দাঁড়ালো। দুহাতে আগলে নিলো সায়েরীর দুই গাল। ধীর স্বরে আওড়াল,
‘ অন্তত আমাকে বল কি হয়েছে? আমি তো চাইলেও তোর সাফওয়ান ভাইকে খারাপ ভাবতে পারবো না, তাইনা? সে আমার ভাই মানলাম। কিন্তু আমি তোকেও ভীষণ ভালোবাসি, সায়ু। প্লিজ বল কি হয়েছে। আমাকে না জানালে আমি সলিউশন দিবো কি করে? ‘
সায়েরীর দৃশ্য ঝাপসা হয়ে এসেছে। থুতনি কাঁপছে তিরতির। নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে। না বলা স্বত্তেও সাফ্রিন বুঝে ফেললো সব! সায়েরী চায়নি কেউ সাফওয়ানের ব্যাপারে খারাপ মনোভাব পুষণ করুক। এজন্যেই কাউকে কিচ্ছুটি বলতে চায়নি মেয়েটা। কিন্তু সাফ্রিন সেটাও ধরে ফেলেছে! এতো আদর,আহ্লাদ দেখানোর পর বান্ধবীর কাছে নিজেকে আর শক্ত রাখতে পারলো না সায়েরী। ঠোঁট ফুলিয়ে ডুকরে উঠলো। সহসা তাকে বুকে টেনে নিলো সাফ্রিন। সায়েরী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। সাফ্রিনের বুকের ভিতরটা কেমন চুরমার হলো এই কান্নায়। ভাইয়ের উপর ভীষণ রাগ জন্মালো তার। যেই যায়গায় মায়ের সামনেই এতো এতো রাগ ঝেরেছে সাফওয়ান, সেখানে সায়েরীর সঙ্গে ঠিক কেমন ব্যবহার করেছে তা আন্দাজ করেই বুক কাঁপছে মেয়েটার। ভাইয়ের এমন কি বাধ্যবাধকতা ছিলো যার কারণে এই অবুঝ মেয়েটাকে কষ্ট দিচ্ছে সে?
নাজরাত,তোহা এসে এমন দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে রইলো। সায়েরী নিজেকে সামলালো বেশ সময় নিয়ে। বসলো বেঞ্চের উপর। পাশাপাশি সাফ্রিন বসলো। সম্মুখেই নাজরাত-তোহা। ভেজা গাল মুছতেই সায়েরীর দিকে পানি এগিয়ে দিলো তোহা। নিঃশব্দে সেটা গ্রহণ করে গলা ভেজাল সায়েরী। তার অবস্থা দেখে সাফ্রিন আর কিছুই জানতে চাইলো না। সময় হলে মেয়েটা নিজেই বলবে সেই আশায় চুপ মেরে রইলো সে। গম্ভীর দেখা গেলো নাজরাতকে। এক ধ্যানে ছোট বোনকে আগাগোড়া পরখ করলো সে। কন্ঠে গাম্ভীর্য টেনে শুধালো,
‘ আজকেও না খেয়ে এসেছিস? ‘
সায়েরী আড়চোখে তাকায়। জবাব দেয় না কোন। তার দিকে কাগজে মোড়ানো সিঙ্গারা দুটো বাড়িয়ে দিলো তোহা। সেসব হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছিলো মেয়েটা। এমন মুহুর্তে টান পড়লো হাতে। নাজরাত টেনে ধরেছে ডান হাতটা। তেল ছিটকে পড়া হাতের দুটো স্থানে ফোসকা উঠেছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সে ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
‘ রান্না বান্না করার প্রয়োজন হলো কবে থেকে? কার জন্য হাতের এই অবস্থা করেছিস? ‘
নজর লুকিয়ে নিলো সায়েরী। কাজিন হওয়া স্বত্তেও যে সায়েরী-নাজরাত দুজনেই একে অপরের ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত পজেসিভ, তা সকলেরই জানা। তাই তোহা কিংবা সাফ্রিন আগ বাড়িয়ে বললো না কিছু। সায়েরী নিরবে সাফ্রিনের কাঁধে মাথা রাখতেই তার চুলে হাত ডুবালো সাফ্রিন। নাজরাতের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ এমনিতেই মন খারাপ করে রেখেছে। পরে বকিস। খেতে দে ওকে। ‘
ঠোঁটের ডগায় কিলবিল করা কথাগুলো গিলে নিলো নাজরাত। ইচ্ছে হলো সাফওয়ানের রাগ সব সাফ্রিনের উপর ঝাড়তে। কিন্তু বিবেকে বাঁধলো খুব। বলতে পারলো না কিছু। সিঙ্গারায় কামড় বসিয়ে আড়চোখে নাজরাতের দিকে তাকালো সায়েরী। ভাবলো, সাফওয়ান ভাই যদি মেয়ে হতো, আর জুনিয়র কেউ হতো। তবে এই মুহুর্তে তার সবকটা চুল উপড়ে ফেলতো নাজরাত। একেকটা ঘটনা কেন্দ্র করে গুণে গুণে ছিড়তো চুল সব।
ক্যালেন্ডার হতে মুছে গেলো আরও তিনটি দিন৷ এই তিন দিনে সাফওয়ানের দেখা পায়নি সায়েরী। অন্যান্য প্রেমিক-প্রেমিকার মতো কখনোই দিনে রাতে ফোনালাপ হয়না তাদের। তাই সাফওয়ানের লাপাত্তা হওয়ার ব্যাপারটা সায়েরী খেয়াল করলো দুটো দিন অতিক্রম হওয়ার পর। সেদিন সাফওয়ানের বকা শুনে পরের দুটো দিন আর একা একা যায়নি গ্রীণ ভ্যালি। দুই দিন সাফওয়ান নিতে আসেনি তাকে। কিছুটা অভিমান সায়েরীর ও ছিলো বলে সে নিজেও কোন কল,মেসেজ দেয়নি। কিন্তু তৃতীয় দিনেও সাফওয়ানের দেখা না পেয়ে অস্থির হলো মেয়েটা। নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে ছুটে গেলো গ্রীণ ভ্যালি। কিন্তু সাফওয়ানের অস্তিত্ব ছিলো না কোথাও। শিউলির মতে, সেদিন সায়েরীর সঙ্গে বের হওয়ার পর এই তিন দিনে সাফওয়ান এখানে আসেনি।
যা শুনে মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেলো সায়েরীর। কি করবে, কোথায় সাফওয়ানের দেখা মিলবে, কীভাবে মানুষটার রাগ ভাঙ্গাবে কিচ্ছুটি মাথায় এলো না তার। কলেজেও আর যাওয়ার রুচি হলো না তার। সহস্র মেসেজ পাঠিয়ে সারাটাদিন অপেক্ষা করলো একটি ফিরতি বার্তার। অথচ সাফওয়ান একটা মেসেজও সিন করলো না। উপায় না পেয়ে সন্ধ্যা হতে না হতেই সাফ্রিনকে কল করলো সায়েরী। তীব্র অভিমান, উদ্বিগ্নতা, উত্তেজনায় মেয়েটার দুই গাল ভিজে চলেছে তখন। সাফ্রিন কল রিসিভ করে কি হয়েছে জানতে চাওয়া মাত্র আবেগী মেয়েটা হু হু করে কেঁদে ফেললো। কন্ঠে রাজ্যের অসহায়ত্ব ঢেলে বললো,
‘ সাফওয়ান ভাই আমাকে এভাবে অবহেলা করছে কেনো, সাফা? আমি কতবার স্যরি বলেছি তাও কেনো এমন করছে? গ্রীণ ভ্যালিতেও যায়নি সে। কোথায় আছে বল? আমি তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছি। আর কতো অপেক্ষা করলে আমার শাস্তি শেষ হবে? ‘
সাফ্রিন নিশ্চুপ রইলো প্রায় সেকেন্ড দশেক। বেশ শব্দ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো সে। বেশ শান্ত সুরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ অপেক্ষা করিস না৷ ভাইয়া নেই এখানে। আসবে না তোর কাছে। ‘
সায়েরীর কান্না থামলো নিমেষে। কি বললো মেয়েটা? নেই মানে কি? এখানে না থাকলে তবে কোথায় আছে? অতী উত্তেজনায় সে কথা বলতেই ভুলে গেলো। সাফ্রিন নিজেই বললো,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৩
‘ সিলেটে গিয়েছে দুই দিন আগে। আমি সঠিক জানি না কিছু, কিন্তু শুনেছি মেঝো চাচ্চুর হেল্প নিয়ে কোন একটা মার্কেটের শেয়ার কিনে নিয়েছে। নিজের বিজনেস স্টার্ট করতে চাইছে। জানি না কীভাবে করবে। কিন্তু আপাতত ভাইয়া এসব নিয়েই ব্যস্ত। এক্সাম থাকলে এর আগের দিন আসবে। বাকি সব দিন ওখানেই থাকবে। ‘
কথাগুলো বলে থামলো সে। অপেক্ষা করলো সায়েরীর প্রতিউত্তরের। কিন্তু মেয়েটার কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে সে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ সায়ু! তোর আর ভাইয়ের সম্পর্কে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। ভাইয়া নিজেও বদলে গিয়েছে, আই ক্যান ফিল দ্যাট। তুই ও মেনে নে। যত তাড়াতাড়ি নিজেকে মানিয়ে নিবি, তোর জন্যে ততোটাই ভালো। ‘
